কম্বল (ছোট গল্প)
মো:বজলুর রশীদ
রাত পৌনে একটা। চারদিকে নিঝুম অন্ধকার। আনিস সাহেব ড্রয়িংরুমে একা বসে আছেন। তাঁর হাতে চায়ের কাপ, প্রচন্ড শীতের কারণে তা ইতিমধ্যে বরফ হয়ে গেছে।
শীতটা এবার একটু বেশিই পড়েছে। ঢাকা শহরে সাধারণত এত শীত পড়ে না। কিন্তু এ বছর পড়েছে।
আনিস সাহেবের গায়ে একটা পাতলা চাদর, কিন্তু সেটা শীত আটকাতে পারছে না। কোথা থেকে যেন শীতল বাতাস এসে তার কাঁপানি ধরিয়ে দিচ্ছে।
আনিস সাহেব ডাকলেন, রেণু? ও রেণু!
ভেতর থেকে কোনো শব্দ এল না। আসার কথাও না। রেণু মারা গেছেন তিন বছর আগে। মানুষ মরে গেলে ডাক শুনতে পায় কি না, তা নিয়ে বড় বড় দার্শনিকরা অনেক গবেষণা করেছেন, কিন্তু আনিস সাহেবের ধারণা রেণু শুনতে পায়। বিশেষ করে বিপদে পড়লে রেণু ঠিকই সাড়া দেয়।
হঠাৎ আনিস সাহেবের মনে পড়ল আলমারির ওপরের তাকে একটা নতুন কম্বল রাখা আছে। লাল রঙের কম্বল। বিয়ের পর পর রেণুর মামাতো ভাই বিদেশ থেকে পাঠিয়েছিলেন। রেণু সেটা খুব যত্ন করে তুলে রেখেছিল।
আনিস সাহেব অনেক কষ্টে টুল নিয়ে আলমারির ওপর থেকে কম্বলটা নামালেন।
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
আনিস সাহেব চমকে উঠলেন। এত রাতে কে আসবে? এই বাড়িতে তিনি একা থাকেন। কাজের ছেলেটা ছুটি নিয়ে গ্রামে গেছে। তিনি ভয়ে ভয়ে দরজা খুললেন।
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে ছোট একটি মেয়ে। বয়স সাত-আট হবে। গায়ের রঙ কুচকুচে কালো, কিন্তু চোখ দুটো বেশ বড় বড় আর মায়াবী। মেয়েটার পরনে শুধু একটি পাতলা ফ্রক। শীতে তার ঠোঁট নীল হয়ে গেছে, থরথর করে কাঁপছে।
আনিস সাহেব অবাক হয়ে বললেন, তুমি কে মা? কোত্থেকে এসেছ?
মেয়েটি কথা বলল না। শুধু বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইল। তার হাত-পা প্রচন্ড শীতে কাপছে ।
আনিস সাহেবের মায়া হলো। তিনি বললেন, ভেতরে এসো। খুব শীত লাগছে তোমার তাই না।
মেয়েটি কোন উত্তর দিল না।
মেয়েটিকে সোফায় বসতে বলে আনিস সাহেব সেই লাল কম্বলটা বের করলেন। যত্ন করে মেয়েটির গায়ে জড়িয়ে দিলেন। কম্বলটা গায়ে দেওয়ার সাথে সাথে মেয়েটির কাঁপুনি বন্ধ হলো।
মেয়েটি অসাধারণ একটি সুন্দর হাসি দিল। আনিস সাহেব লক্ষ্য করলেন, মেয়েটির হাসিটা হুবহু রেণুর মতো। তাঁর বুকটা কেঁপে উঠল।
তিনি বললেন, তুমি এখানে বসো মা, আমি তোমার জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসছি।
আনিস সাহেব কিছু খাবার আনতে রান্নাঘরের দিকে গেলেন। খাবার নিয়ে যখন ড্রয়িংরুমে ফিরলেন, দেখলেন ঘর খালি। কেউ নেই।
দরজা ভেতর থেকে আটকানো। জানালাগুলোও বন্ধ। সোফার ওপর শুধু লাল কম্বলটা পড়ে আছে। আনিস সাহেব কম্বলটা হাতে নিলেন। অবাক হয়ে দেখলেন, কম্বলটা প্রচণ্ড গরম। যেন এইমাত্র কেউ ওটা ব্যবহার করেছে।তিনি কম্বলটা গায়ে জড়িয়ে সোফায় বসলেন। কম্বলটি গায়ে জড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত এক অনুভূতি কাজ করলো।
হঠাৎ তাঁর মনে হলো, তিনি এই ঘরে একা নয়।
মনে হচ্ছে পাশের সোফায় রেণু বসে আছে.....