১।
বেশ কয়েকদিন থেকে বাংলা ভাষায় কোন কোন শব্দ ব্যবহার করা উচিৎ, কোন শব্দ উচিৎ নয়, এই আলাপ বেশ উত্তাপ ছড়াচ্ছে। আমার ধারণা, আমার মত অনেকের মাথায় ভাষা নিয়ে অনেক প্রশ্ন খাবি খাচ্ছে। এ কারণে কিছুটা ঘাটাঘাটি করে যা পেলাম, তা এরকম।
উদ্ভবের দিকে বাংলা ও ইংরেজি ভাষা প্রায় সমসাময়িক। একই সময় জন্ম নিলেও ইংরেজি ভাষায় শব্দ সংখ্যা ৬-১০ লক্ষ, এর বিপরীতে বাংলা ভাষার শব্দ সংখ্যা ১.৫০-২ লক্ষ। অর্থাৎ অন্য ভাষার শব্দ গ্রহণে বাংলা যে হারে কিপটে, ইংরেজি ঠিক ততটাই উদার। এ নিয়ে আমার নিজের একটা অভিজ্ঞতা আছে, সেটা এ লেখার শেষে শেয়ার করবো।
ইংরেজি ভাষার উৎপত্তি ৫ম-৭ম শতাব্দীতে ব্রিটেনে, অ্যাঙ্গলো-স্যাক্সন মাইগ্রেন্টস যারা উত্তর-পশ্চিম জার্মানি, ডেনমার্ক এবং নেদারল্যান্ডস থেকে এসে ইংল্যান্ডে বসতি স্থাপন করে। এর আগের ব্রিটেনের স্থানীয় সেল্টিক ভাষা পরবর্তীতে ওল্ড ইংলিশ হিসেবে পরিচিত।
বাংলা ভাষার জন্ম খ্রিস্টীয় ৭ম শতাব্দী (৬০০-৭০০ খ্রিস্টাব্দ)তে, ৮ম-১২শ শতাব্দীতে রচিত চর্যাপদ (যা মূলত বৌদ্ধ গান) প্রাচীন বাংলার আদি উদাহরণ।
বর্তমানে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ বাংলায় কথা বলে। এর বিপরীতে ১৫০ কোটি মানুষ ইংরেজিতে কথা বলে (native + 2nd language speakers)। ইংরেজি ভাষা বর্তমানে বিশ্বের Lingua Franca (সর্বজনীন যোগাযোগের ভাষা)।
ইংরেজি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী/প্রভাবশালী ভাষা। এর মূল কারণঃ
১) সবচেয়ে বেশি মানুষের কথিত ভাষা
২) অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাব
৩) আন্তর্জাতিক কূটনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, মিডিয়া ও ইন্টারনেটে প্রভাব
৪) ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব
সুতরাং বাংলা ভাষা কেন খুব বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি সেটা খুব সহজে অনুমান করা যায়।
ইংরেজি ভাষায় ব্যাপক হারে অন্য ভাষার শব্দ গ্রহণ করার কারণে সেটা সমৃদ্ধ হয়েছে। বাংলা ভাষার বেলায় ঠিক উল্টা যাত্রা দেখি। শব্দ সংখ্যা-ই যার প্রমাণ।
২।
মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, ইংরেজরা ভারত বর্ষ থেকে এত বেশি সম্পদ লুট করেছে যে, হিন্দি 'লুট' শব্দটা পর্যন্ত ওদের (ইংরেজি ভাষায়) করে নিয়েছে। অর্থাৎ হিন্দি/বাংলায় লুট বলতে যা বোঝায়, ইংরেজিতেও তাই। ইংরেজরা আবার এই বাণী গ্রিনিচ মানমন্দির সংলগ্ন মিউজিয়ামে খোদাই করে রেখেছে। ঘুরতে গিয়ে দেখেছিলাম।
৩।
বাংলা ভাষায় মূল বাংলা শব্দ (তদ্ভব) প্রায় ৬০%, সংস্কৃত থেকে আগত তৎসম শব্দ প্রায় ২৫%, অর্ধতৎসম ৫%, বিদেশি ৮% আর খাঁটি দেশি শব্দ ২% । দেশে যাদের বুদ্ধি বেশি তাঁদের অধিকাংশই বিদেশি শব্দ ব্যবহারের বিপক্ষে। সাম্প্রতিক আলাপ সালাপে সেরকমই বোঝায়। উনারা সম্ভবত খাঁটি গরুর দুধ চায়।
বিদেশি শব্দের বিপক্ষে থাকা মানে বিচ্ছিন থাকা, আর বিচ্ছিন্ন মানে উল্টা পথে হাটা। বেশি বেশি বিদেশি শব্দ গ্রহণ করে কানেক্টেড থাকাই উত্তম। কানেক্টেড মানে সমৃদ্ধি। সমৃদ্ধি আসলে আমরা খাঁটি গরুর দুধ না হোক, গরুর খাঁটি দুধ খেতে পারবো।
25
View