এদেশে আইন আছে, নীতি আছে, বিধি আছে—সবই আছে; শুধু নেই তাদের জীবন্ত উপস্থিতি। তারা ফাইলের ভাঁজে বন্দী, নোটশিটের মার্জিনে আটকে থাকা শব্দ। বাস্তবায়ন যেন কেবল সভার উপস্থাপনায়, বার্ষিক প্রতিবেদনের চকচকে পাতায় সীমাবদ্ধ। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কষ্ট, অনিশ্চয়তা, অন্যায়ের ভার—সেখানে পৌঁছায় না সেই আইনগুলোর ছায়া।
সত্যিকারের তথ্য পাওয়া যেন এক দুরূহ সাধনা। অর্ধসত্য, বিকৃত পরিসংখ্যান আর সাজানো ভাষ্যই হয়ে ওঠে গ্রহণযোগ্য বাস্তবতা। প্রশ্ন তোলা কঠিন, উত্তর পাওয়া আরও কঠিন। ফলে মানুষ ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যায়—যা শোনে, তাই মানে; যা দেখে না, তা নিয়েই নীরব থাকে।
মনেহয় দেশের আকাশে আইনগুলো ঘুড়ির মতো উড়ে—রঙিন, দৃষ্টিনন্দন, আশাব্যঞ্জক। জাতীয় দিবসে, সেমিনারের ব্যানারে, ঘোষণার ভাষণে তারা উজ্জ্বল। কিন্তু সেই ঘুড়ির সুতো থাকে কারও অদৃশ্য হাতে। দিক নির্ধারণ করে অন্য কেউ; মাটির মানুষ শুধু তাকিয়ে থাকে—হয়তো বিস্ময়ে, হয়তো অসহায়তায়। তাদের হাত বাড়িয়ে ধরার অধিকারও যেন নেই।
কাগজে লেখা প্রতিশ্রুতিগুলো এসি-রুমের মিষ্টি আলোয় ঝলমল করে। নীতির ভাষা হয় সুসজ্জিত, পরিপাটি, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে রচিত। অথচ জনজীবনের অন্ধকার গলিতে, হাসপাতালের বারান্দায়, বিদ্যালয়ের ভাঙা বেঞ্চে, কৃষকের খালি গোলায়—সেই প্রতিশ্রুতির ছায়াও পড়ে না। আইন থাকে, কিন্তু ন্যায় অনুপস্থিত।
আশ্চর্যের বিষয়, মানুষ এসবের সবটুকুই জানে—তবু চুপ থাকে। হয়তো দীর্ঘদিনের বঞ্চনা তাদের শিখিয়েছে মানিয়ে নিতে। হয়তো তারা বুঝে গেছে, উচ্চস্বরে প্রতিবাদ করলে দেয়ালই কেবল প্রতিধ্বনি ফিরিয়ে দেয়। তাই প্রতিবাদের আগুন ধীরে ধীরে নিভে গিয়ে শুধু ধোঁয়া হয়ে ভাসে ভেতরে ভেতরে। বাইরে শান্ত, ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভের স্তূপ।
কিন্তু ইতিহাস বলে—ধোঁয়া যতদিন জমে থাকে, একসময় তা আগুনের রূপ নেয়। প্রশ্ন শুধু, সেই আগুন হবে ধ্বংসের, নাকি শুদ্ধির?