হোসেন আলী ও তাঁর পাঁচ সন্তানের জীবনকথা
একটি গ্রামীণ পারিবারিক বংশীয় আখ্যান
— যে মাটিতে জন্ম, সে মাটিতেই শেষ —
উৎসর্গ
বাংলার সেই সব মানুষদের জন্য,
যাঁরা মাটি কামড়ে বেঁচে থেকেছেন —
ঝড়ে ভেঙে পড়েননি, শুধু নুয়ে গেছেন,
আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন।
আর সেই সব বাবাদের জন্য,
যাঁরা নিজেরা না খেয়ে সন্তানদের মুখে তুলে দিয়েছেন।
লেখকের কথা
এই বইটি কোনো কল্পনার ফসল নয়। এই বইয়ের প্রতিটি চরিত্র, প্রতিটি ঘটনা বাংলার হাজার হাজার গ্রামের চেনা ছবি। হোসেন আলী একজন মানুষ নন — তিনি বাংলার লক্ষ কৃষকের প্রতিনিধি, যাঁরা ভোরের আজানের আগেই মাঠে যান এবং রাতের তারা ফোটার পরেই ঘরে ফেরেন।
এই পরিবারের গল্পে আপনি পাবেন হাসি, কান্না, ভালোবাসা, হিংসা, ক্ষমা এবং মানুষের অদম্য বেঁচে থাকার জিদ। গ্রামের মানুষের জীবন সরল কিন্তু সহজ নয়। এই সরলতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে গভীর দর্শন।
পাঠক, এই বই পড়তে পড়তে যদি আপনার চোখে একবারও জল আসে, যদি একবারও মনে হয় — 'আরে, এটা তো আমাদের পাড়ার গল্প!' — তাহলে আমার লেখা সার্থক হবে।
ভূমিকা — মাটির কথা
ময়মনসিংহ জেলার একটি ছোট্ট গ্রাম — চরভাটি। ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী পুরনো ব্রহ্মপুত্রের কোলে গড়ে ওঠা এই গ্রামটির বয়স কমপক্ষে তিনশো বছর। গ্রামের পুরনো মানুষেরা বলেন, এই চরে একসময় বাঘ আসত। এখন বাঘ নেই, তবে মানুষের সংগ্রাম আছে।
চরভাটি গ্রামের পূর্বে বিলের জমি, পশ্চিমে নদী, উত্তরে আরেকটি গ্রাম — বাজারপাড়া, এবং দক্ষিণে বিশাল মাঠ। বর্ষায় এই গ্রামের তিন দিক পানিতে ডুবে যায়। তখন নৌকা ছাড়া চলাচলের উপায় থাকে না। কিন্তু শীতে এই মাঠই হয় সোনার জমিন — হলুদ সরিষার ফুলে ভরা, সবুজ ধানের কচি পাতায় ঢাকা।
এই গ্রামেই ১৯৪৫ সালের এক ভোরে জন্ম নিয়েছিলেন হোসেন আলী। দেশভাগের আগের মানুষ। দুর্ভিক্ষের কথা যাঁর শৈশবের স্মৃতিতে আছে। যুদ্ধের আওয়াজ যাঁর কানে এখনো বাজে।
হোসেন আলীর বাবার নাম ছিল করিম বকশ। করিম বকশ ছিলেন গ্রামের সবচেয়ে কম জমির মালিক — মাত্র দেড় বিঘা। কিন্তু তাঁর মাথা সব সময় উঁচু ছিল। তিনি বলতেন, 'জমি কম থাকলে কী হয়, মান-ইজ্জত কম রাখতে নেই।'
করিম বকশ মারা যান হোসেন আলীর বয়স যখন মাত্র বারো বছর। সেদিন থেকে হোসেন আলীর শৈশব শেষ হয়ে যায়। বারো বছর বয়সেই তাঁকে মাঠে নামতে হয় — হাতে লাঙল, পায়ে কাদা।
প্রথম অধ্যায়
হোসেন আলীর জীবন — শুরু থেকে শুরু
ভোর চারটায় আজান পড়ে চরভাটি গ্রামে। সেই আজানের আগেই হোসেন আলীর চোখ খুলে যায়। ষাট বছরের অভ্যাস। শরীর এখন ভেঙে পড়েছে, হাঁটু ব্যথা করে, পিঠে যন্ত্রণা আছে — তবুও ওঠার অভ্যাস যায়নি।
তিনি উঠে বসেন। অন্ধকারে হাতড়ে লুঙ্গিটা ঠিক করেন। তারপর উঠোনে বের হয়ে আকাশের দিকে তাকান। তারা এখনো আছে। ভালো লক্ষণ। তারা থাকলে মেঘ নেই, মেঘ না থাকলে বৃষ্টি নেই, বৃষ্টি না থাকলে আজ মাঠে যেতে পারবেন।
পানির কলসি থেকে গলায় জল ঢালেন। ঠান্ডা। কাঁপন লাগে। তবুও ভালো লাগে। এই ঠান্ডা জলের স্বাদ তাঁর কাছে যেন জীবনের স্বাদ।
"আল্লাহ, আরেকটা দিন দিলে। শুকরিয়া।"
হোসেন আলীর স্ত্রীর নাম রহিমা বেগম। তাঁরা বিয়ে করেছিলেন ১৯৬৮ সালে। হোসেন আলীর বয়স তখন তেইশ, রহিমার পনেরো। সেকালের গ্রামে এটাই ছিল স্বাভাবিক।
রহিমা বেগম ছিলেন পাশের গ্রাম মাটিয়ালীর মেয়ে। বিয়ের দিন তিনি এসেছিলেন নৌকায় করে, মাথায় লাল টুকটুকে ঘোমটা দিয়ে। হোসেন আলী সেদিন প্রথমবার স্ত্রীর মুখ দেখেছিলেন বাসর রাতে — এবং মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।
সে মুগ্ধতা আজও আছে। চুলে পাক ধরেছে, মুখে বলিরেখা পড়েছে — তবুও রহিমা বেগমকে দেখলে হোসেন আলীর বুকের মধ্যে কী একটা হয়। এই অনুভূতির নাম তিনি জানেন না। শুধু জানেন, এই অনুভূতি ছাড়া বাঁচা যায় না।
হোসেন আলী ও রহিমা বেগমের পাঁচ সন্তান। তিন ছেলে, দুই মেয়ে।
বড় ছেলে — কাদের আলী। বয়স পঞ্চাশ। গ্রামেই থাকে। কৃষিকাজ করে।
দ্বিতীয় ছেলে — জব্বার আলী। বয়স পঁয়তাল্লিশ। শহরে চাকরি করে, ঢাকায় থাকে।
বড় মেয়ে — হাসিনা। বয়স বিয়াল্লিশ। বিয়ে হয়েছে পাশের উপজেলায়। সংসার ভালো।
ছোট ছেলে — সেলিম। বয়স আটত্রিশ। প্রবাসী। মালয়েশিয়া থাকে।
ছোট মেয়ে — লায়লা। বয়স পঁয়ত্রিশ। স্বামী মারা গেছেন দুর্ঘটনায়। এখন বাপের বাড়িতে থাকে।
দ্বিতীয় অধ্যায়
কাদের আলী — মাটির মানুষ
কাদের আলীকে গ্রামের মানুষ ডাকে 'বড় ভাই' বলে। শুধু ছোট ভাই-বোনেরা নয়, পাড়ার মানুষেরাও। এই নামটা তাঁর অনেক আগে থেকেই আছে — যখন তিনি স্কুলে পড়তেন, তখনো পাড়ার ছোটরা তাঁকে 'বড় ভাই' বলেই ডাকত।
কাদের আলী কখনো শহরে যাননি থাকতে। একবার ঢাকায় গিয়েছিলেন, ছোট ভাই জব্বারের কাছে। তিন দিন থেকেই মন ভার হয়ে গেছিল। রাস্তার গোলমাল, মানুষের ভিড়, বদ্ধ হাওয়া — কিছুতেই মন লাগেনি। চতুর্থ দিন সকালে উঠে বললেন, 'ভাই, আমি যাই। এই জায়গায় আমার দম বন্ধ লাগে।'
জব্বার হেসেছিল। বলেছিল, 'দাদা, তুমি আসলে মাটির মানুষ। শহর তোমার জন্য না।'
কাদের আলী সেদিন কিছু বলেননি। কিন্তু মনে মনে ভেবেছিলেন — এটা কি অপমান? নাকি প্রশংসা? পরে বুঝেছিলেন, এটা দুটোই।
কাদের আলীর সংসার
কাদের আলীর স্ত্রীর নাম মর্জিনা। মর্জিনা এসেছিলেন বিয়ের পর এই বাড়িতে, এবং তারপর থেকে এই বাড়িটাই তাঁর নিজের বাড়ি হয়ে গেছে। শ্বশুর-শাশুড়িকে সেবা করেছেন, দেবর-ননদদের বড় করেছেন।
মর্জিনার তিনটি সন্তান। বড় ছেলে রাসেল এইচএসসি পাস করে এখন ঢাকায় পড়ছে। মেঝ মেয়ে তুলি এবার ক্লাস নাইনে উঠেছে। ছোট ছেলে রিপন এখনো প্রাইমারিতে।
কাদের আলীর স্বপ্ন — ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ার বানাবেন। এই স্বপ্নের জন্য তিনি রাত্রিবেলা ঘুম কম ঘুমান। হিসাব করেন — এই জমিটা বেচলে কত পাব? ওই জমিতে ধান হলে কত আসবে? সব মিলিয়ে কি রাসেলের পড়ার খরচ হবে?
একদিন সকালে কাদের আলী মাঠ থেকে ফিরে দেখেন বাবা হোসেন আলী উঠোনে বসে আছেন একা। চোখ দুটো কেমন ভেজা ভেজা।
"বাবা, কী হইছে?"
"কিছু না, ভাত দে।"
"আগে কও কী হইছে।"
"কইলাম তো কিছু না।"
কাদের আলী আর জিজ্ঞেস করেননি। কিন্তু মর্জিনার কাছ থেকে পরে জানলেন — হোসেন আলীর সেদিন মনে পড়ছিল তাঁর নিজের বাবার কথা। করিম বকশ মারা গেছেন ৬০ বছর আগে। তবুও ভোলা যায় না।
কাদের আলী সেদিন রাতে বাবার পা টিপে দিয়েছিলেন। কোনো কথা নেই, শুধু হাতের স্পর্শ। হোসেন আলী বুঝেছিলেন। বলেছিলেন, 'তুই ভালো পোলা রে, কাদের।'
কাদের আলীর চোখ ভিজে এসেছিল।
তৃতীয় অধ্যায়
জব্বার আলী — দুই দুনিয়ার মানুষ
জব্বার আলী ঢাকায় থাকেন মিরপুরে। একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে চাকরি করেন — সেলস ম্যানেজার। বেতন ভালো। গাড়ি আছে। ফ্ল্যাটও ভাড়া নেওয়া। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে — সফল মানুষ।
কিন্তু জব্বার জানেন, এই সাফল্যের ভেতরে একটা শূন্যতা আছে। রাত তিনটায় যখন ঘুম আসে না, তখন সেই শূন্যতাটা বড় হয়ে ওঠে। মনে পড়ে চরভাটির সেই রাতগুলো — জোনাকি জ্বলত, ব্যাঙ ডাকত, দূরে কোথাও শেয়াল ডাকত, আর বাবা বলতেন, 'ঘুমাও, ঘুমাও — রাইত থাকতে উঠতে হইবো।'
জব্বার এখন ঘুমান দেরিতে, ওঠেন আরো দেরিতে। তবু সেই ডাকটা কানে বাজে।
জব্বারের স্ত্রী শিউলী
জব্বারের স্ত্রী শিউলী ঢাকার মেয়ে। বিএ পাস। স্মার্ট, আধুনিক। শ্বশুরবাড়ি মানে তাঁর কাছে গ্রামের সেই বাড়িটা — যেখানে মশা আছে, ময়লা রাস্তা আছে, টয়লেটে ফ্লাশ নেই।
কিন্তু হোসেন আলী এবং রহিমা বেগমের সামনে শিউলী অন্যরকম। সালাম দেয়, পায়ে হাত দেয়, ভালো থাকতে জিজ্ঞেস করে। শ্বশুর-শাশুড়ি ভাবেন — কী ভালো বউ পেয়েছে জব্বার!
জব্বার জানে সত্যিটা। শিউলী ভালো মেয়ে, কিন্তু গ্রামকে ভালোবাসে না। এই নিয়ে দুজনের মাঝে মাঝে কথা হয়। জব্বার বলে, 'বছরে একবার তো যাওই।' শিউলী বলে, 'যাই তো! কিন্তু বেশিদিন থাকতে পারি না।'
জব্বার আর কথা বাড়ায় না। কারণ সেও জানে — শিউলীকে জোর করে ভালোবাসা যায় না। আর ভালোবাসা ছাড়া যাওয়া মানে আরো না যাওয়া।
ঈদের সময় জব্বার গ্রামে আসে। তখন একটু অন্যরকম হয়ে যায় সব। হোসেন আলী বলেন, 'আয়, আয়, বস।' রহিমা বেগম রান্না করেন হাঁসের মাংস, কই মাছের ঝোল। বাড়িতে আনন্দ হয়।
ঈদের রাতে বাবার পাশে বসে জব্বার একবার বলেছিল, 'বাবা, তুমি কি কখনো কষ্ট পাও আমাকে দেখলে না পেয়ে?'
হোসেন আলী অনেকক্ষণ চুপ থেকেছিলেন। তারপর বলেছিলেন, 'কষ্ট পাই কিনা সেইটা বড় কথা না। তুই ভালো আছিস কিনা — সেইটাই বড় কথা।'
জব্বার সেদিন বুঝেছিল — বাবারা সন্তানের জন্য নিজের কষ্ট লুকিয়ে রাখেন। এটাই ভালোবাসার সবচেয়ে বড় রূপ।
চতুর্থ অধ্যায়
হাসিনা — শক্ত মনের মেয়ে
হাসিনা হোসেন আলীর বড় মেয়ে। ছোটবেলা থেকেই একটু আলাদা — কথা কম বলে, কাজ বেশি করে। পাড়ার মেয়েরা যখন গল্প করে বসে থাকত, হাসিনা তখন মায়ের কাপড় ধুয়ে দিত, রান্নাঘরে সাহায্য করত।
হোসেন আলী মেয়েকে স্কুলে পাঠিয়েছিলেন। সেকালে গ্রামে মেয়েদের স্কুলে পাঠানো ছিল সাহসের কাজ। পাড়ার মানুষ কথা বলেছিল — 'হোসেন আলী মেয়েকে পড়াচ্ছে! বেশি পড়লে বিয়ে হবে না!' হোসেন আলী কানে তুলেননি।
হাসিনা ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়েছে। তারপর বিয়ে হয়ে গেছে — তারাকান্দা উপজেলার একজন ব্যবসায়ীর সাথে। সংসার ভালো। স্বামী ভালো মানুষ। দুই ছেলে, এক মেয়ে।
হাসিনার মনের কথা
হাসিনা প্রতি মাসে একবার আসে বাপের বাড়ি। আসলেই সে একটু ঘরের মতো হয়ে যায়। বাবার জন্য ওষুধ আনে, মায়ের জন্য শাড়ি আনে। ছোট ভাই-বোনদের জন্য মিষ্টি।
কিন্তু ফিরে যাওয়ার সময় তার কান্না পায়। মা কেঁদে ফেলেন। হোসেন আলী বলেন, 'যা মা, সংসার দেখ।' কিন্তু মেয়ে গেলে তিনিও একা একা বসে থাকেন অনেকক্ষণ।
একবার হাসিনা মাকে বলেছিল, 'আম্মা, বিয়ে মানেটা কী? বাপের বাড়ি ছেড়ে যাওয়া আর শ্বশুর বাড়িতে থাকা — দুই জায়গায়ই পর।' রহিমা বেগম হেসেছিলেন। বলেছিলেন, 'না মা, দুই জায়গায়ই নিজের।'
হাসিনা বুঝেছে — মা ঠিকই বলেছেন। দুই জায়গায়ই ভালোবাসা আছে। শুধু ভালোবাসার ভাষাটা আলাদা।
হাসিনার একটা গোপন শখ আছে — সে গান শোনে। পুরনো গ্রামীণ গান, ভাটিয়ালি, মারফতি। রান্নাঘরে একা থাকলে গুনগুন করে গায়। স্বামী জানে না। বাচ্চারা জানে না। শুধু মা জানেন।
রহিমা বেগম একদিন রান্নাঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে মেয়ের গান শুনেছিলেন চুপ করে। তারপর ভেতরে এসে বলেছিলেন, 'তোর গলা তোর দাদির মতো।'
হাসিনা চমকে গিয়েছিল। বলেছিল, 'দাদি গাইতেন?'
রহিমা বলেছিলেন, 'রাইতের বেলা, যখন মনে কষ্ট থাকত।'
কষ্টের গান — এটাও তো একটা পারিবারিক ঐতিহ্য।
পঞ্চম অধ্যায়
সেলিম — স্বপ্নের পরদেশ
সেলিম গেছে মালয়েশিয়া ছয় বছর আগে। যাওয়ার আগে হোসেন আলীর চোখে জল এসেছিল। সেলিম দেখেছিল কিন্তু বলেনি কিছু। বুকে জড়িয়ে ধরেছিল শুধু।
বিমানবন্দরে গেট পার হওয়ার আগে সেলিম একবার পেছনে ফিরেছিল। দেখেছিল — বাবা দাঁড়িয়ে আছেন, মা মুখে আঁচল চাপা দিয়েছেন, বড় ভাই কাদের হাত নাড়ছে।
সেই দৃশ্যটা সেলিমের মনে এখনো আছে। কুয়ালালামপুরের উঁচু ফ্যাক্টরিতে যখন রাত্রিশিফটে কাজ করে, মাথায় হেলমেট, হাতে গ্লাভস — তখন মনে পড়ে সেই দৃশ্যটা।
দেশ থেকে দূরে
সেলিম প্রতি মাসে টাকা পাঠায়। বাবার ওষুধের জন্য, ভাতিজার পড়ার জন্য, বোনের সংসারের জন্য। নিজের জন্য রাখে কম।
একবার ঈদে সেলিম আসতে পারেনি। ফোনে কথা হয়েছিল। হোসেন আলী বলেছিলেন, 'ঠিক আছে বাবা, আগামী বছর আসিস।'
কিন্তু ফোন রাখার পর হোসেন আলী বাইরে গিয়ে বসেছিলেন একা। রহিমা বেগম দেখেছিলেন। কিছু বলেননি।
কিছু কষ্ট আছে যা কথায় বলা যায় না। শুধু বহন করতে হয়।
সেলিম এক রাতে ভিডিও কলে বাবাকে দেখেছিল — বাবার মাথার চুল সব সাদা হয়ে গেছে। কপালে আরো বলিরেখা পড়েছে। হাতদুটো কাঁপছে একটু।
সেলিম বলেছিল, 'বাবা, তুমি কি ঠিকঠাক আছো?'
হোসেন আলী হেসেছিলেন, 'হ্যাঁ, আছি। তুই কেমন আছিস?'
সেলিম সেদিন রাতে একা কেঁদেছিল। ঘরে কেউ ছিল না — রুমমেটরা ফ্যাক্টরিতে গেছে। কাঁদার পর মনে মনে ঠিক করেছিল — আগামী বছর দেশে যাবেই। বাবার সাথে একটা ঈদ করবেই।
ষষ্ঠ অধ্যায়
লায়লা — ভাঙা ডালের গল্প
লায়লা হোসেন আলীর সবচেয়ে ছোট মেয়ে। সবার আদরের। বিয়ে হয়েছিল ২০১৫ সালে — পাশের জেলার এক স্কুলশিক্ষকের সাথে। মানুষটি ভালো ছিলেন।
২০১৮ সালে বাস দুর্ঘটনায় লায়লার স্বামী মারা যান। ফিরে যাওয়ার পথে — জেলা শহরে কাজ সেরে ফিরছিলেন। তারপর আর ফেরা হয়নি।
লায়লার কোলে তখন দুই বছরের একটি মেয়ে — নীলা। নীলাকে নিয়েই লায়লা চলে এসেছে বাপের বাড়ি।
বাপের বাড়িতে লায়লা
হোসেন আলী মেয়েকে বলেছিলেন, 'এইটাই তোর বাড়ি। যতদিন খুশি থাক।' রহিমা বেগম বলেছিলেন, 'তুই যখন ছোট ছিলি, আমি তোরে পালছি। এখন তুইও তোর মেয়েরে পাল। আমি তোর পাশে আছি।'
লায়লা সেদিন অনেকক্ষণ কেঁদেছিল। মায়ের বুকে মাথা রেখে। রহিমা বেগম কিছু বলেননি — শুধু পিঠে হাত বুলিয়েছিলেন।
গ্রামের মানুষ নানা কথা বলে। কেউ সহানুভূতি দেখায়, কেউ আবার পরামর্শ দেয় — 'আবার বিয়ে করলে হয় না?' হোসেন আলী এই কথা শুনলে রেগে যান। বলেন, 'আমার মেয়ে আমার কাছে ভালো আছে। আপনাদের এত চিন্তা কেন?'
লায়লা এখন গ্রামের স্কুলে পড়ায় — অতিথি শিক্ষক হিসেবে। বেতন কম, কিন্তু ব্যস্ত থাকা যায়।
নীলা এখন সাত বছর। দাদার সাথে তার ভারী বন্ধুত্ব। প্রতিদিন সন্ধ্যায় হোসেন আলীর পাশে বসে গল্প শোনে — বাঘের গল্প, ভূতের গল্প, পুরনো দিনের গল্প।
হোসেন আলী নাতনিকে বলেন, 'তোমার বাবা ভালো মানুষ ছিলেন। আল্লাহ তাঁকে নিয়ে গেছেন। কান্দো না। বড় হও, মানুষ হও।'
নীলার চোখে জল আসে। হোসেন আলীর চোখেও।
দুইজন মিলে চুপচাপ বসে থাকেন একটু। তারা বলা লাগে না — বোঝা হয়ে যায়।
সপ্তম অধ্যায়
গ্রামের জীবন — হাসি-কান্নার মেলা
চরভাটি গ্রামে প্রতিদিন কিছু না কিছু ঘটে। একদিন পাড়ার একজনের সাথে আরেকজনের জমি নিয়ে মারামারি। পরের দিন সেই দুইজনই একসাথে বসে চা খাচ্ছে।
গ্রামের মানুষের রাগ দ্রুত আসে, দ্রুত যায়। এটাই গ্রামের মানুষের সৌন্দর্য।
হোসেন আলীর পাড়ায় বছরে একটি করে বিচার বসে। কখনো জমির বিবাদ, কখনো টাকার বিবাদ, কখনো মিথ্যা অভিযোগ। হোসেন আলী এই বিচারে থাকেন। তাঁর কথার ওজন আছে।
একবার পাড়ার এক যুবক তার বউকে মেরেছে। খবর পৌঁছেছে হোসেন আলীর কানে। তিনি সেই যুবককে ডেকে এনেছিলেন। বলেছিলেন, 'মেয়েমানুষ মারার কোনো ধর্ম নেই। এইটা কি তুমি জানো না?' যুবক মাথা নিচু করে বসেছিল। সেদিনের পর থেকে সে আর মারে না বলে মানুষ বলে।
সন্ধ্যার উঠোন
সন্ধ্যাবেলায় হোসেন আলীর উঠোনে জমজমাট হয়ে ওঠে। পাড়ার দুই-তিনজন বুড়ো এসে বসেন। চা চলে। কথা চলে।
কথার বিষয় থাকে নানা রকম। আজ বৃষ্টির আশা আছে কিনা, সার কত টাকায় পাওয়া যাচ্ছে, সরকার কী করছে কী করছে না।
মাঝে মাঝে পুরনো কথা ওঠে। ১৯৭১ সালের কথা। হোসেন আলী তখন যুবক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই গ্রাম থেকেও কয়েকজন গেছিলেন। এই গ্রাম থেকেও দুজন শহীদ হয়েছিলেন।
হোসেন আলী ধীরে ধীরে বলেন সেই কথা। শুনতে শুনতে পাড়ার মানুষের চোখ ছলছল করে ওঠে।
একদিন পাড়ায় একটি বিপদ ঘটল। রাশেদের মা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। রাশেদ দরিদ্র মানুষ — হাসপাতালে নেওয়ার টাকা নেই। রাতের বেলা।
খবর পেয়ে হোসেন আলী উঠলেন। পাড়ার তিন-চারজনকে ডাকলেন। মিলে চাঁদা তুললেন। রাতের মধ্যেই রাশেদের মাকে হাসপাতালে নেওয়া হলো।
পরের দিন সকালে রাশেদ হোসেন আলীর পায়ে পড়ল। বলল, 'চাচা, আপনি না থাকলে আম্মা বাঁচত না।'
হোসেন আলী বললেন, 'এইটা আমি করছি না। পাড়া করছে। এই গ্রামের মানুষ একে অপরের জন্য থাকে — এইটাই গ্রামের নিয়ম।'
অষ্টম অধ্যায়
রহিমা বেগম — নীরব শক্তি
এই বইতে হোসেন আলীর কথা লেখা হয়েছে, পাঁচ সন্তানের কথা লেখা হয়েছে — কিন্তু এই পুরো পরিবারের আসল স্তম্ভ হলেন রহিমা বেগম।
রহিমা বেগম কখনো রাগ করেননি বেশি, কখনো কাঁদেননি প্রকাশ্যে। সব কিছু ভেতরে রেখে সংসার টেনেছেন। পাঁচ সন্তানকে মানুষ করেছেন। স্বামীর পাশে থেকেছেন — সুখে-দুঃখে।
হোসেন আলী বলেন, 'আমার সংসার আমি একা টানিনি। রহিমা না থাকলে আমি এত দূর আসতে পারতাম না।'
রহিমার রান্নাঘর
রহিমা বেগমের রান্নাঘর একটি আলাদা জগৎ। সেখানে মাটির চুলা আছে, মাটির পাতিল আছে। আর আছে রহিমার হাতের জাদু।
রহিমার হাতের রান্না একবার খেলে ভোলা যায় না। পাঁচ ধরনের ভর্তা — আলু ভর্তা, শুঁটকি ভর্তা, শিম ভর্তা, বেগুন ভর্তা, কাঁচামরিচ ভর্তা। ডাল — ঘন, মাখো মাখো। আর মাছের ঝোল — কই মাছ, শোল মাছ, পুঁটি মাছ।
ঈদে ও বিশেষ দিনে রহিমা রান্না করেন পোলাও, কোরমা, হাঁসের মাংস। তখন সারা পাড়ায় সুবাস ছড়িয়ে পড়ে।
একদিন জব্বার এসেছিল ঢাকা থেকে। রান্না খেয়ে বলল, 'আম্মা, তোমার হাতের রান্নার মতো রান্না ঢাকার কোনো রেস্টুরেন্টে নেই।'
রহিমা বললেন, 'রেস্টুরেন্টে ভালোবাসা দেয় না। আমি দিই।'
জব্বার অনেকক্ষণ চুপ থেকেছিল। তারপর বলেছিল, 'হ্যাঁ, আম্মা। সেটাই পার্থক্য।'
নবম অধ্যায়
ভালোবাসা ও বিরোধ — একই সংসারের দুই রূপ
এই পরিবারে সব সময় সব ঠিকঠাক থাকেনি। ভাই-ভাইয়ে মনোমালিন্য হয়েছে। জমির বিষয়ে মতবিরোধ হয়েছে।
একবার হোসেন আলীর বাপের আমলের একটুকরো জমি নিয়ে কাদের ও জব্বারের মধ্যে ঝামেলা হয়েছিল। কাদের চাইছিল জমিটা ধরে রাখতে, চাষ করতে। জব্বার বলছিল বিক্রি করে টাকাটা ভাগ করে নেওয়া যাক।
কথা থেকে কথা বাড়ল। একদিন দুই ভাই কথা বলছিলেন না।
হোসেন আলী এটা দেখে কিছু বললেন না। তিন দিন চুপ থাকলেন। তারপর একদিন সন্ধ্যায় দুই ছেলেকে ডাকলেন।
"তোরা দুইজনই আমার ছেলে। সেই জমি আমার বাবার। আমি তোদের দিয়ে যাব।"
"কিন্তু আমি চাই — আমি মরার পরেও তোরা ভাই থাকিস।"
"জমি গেলে আরেক জমি হবে। কিন্তু ভাই চলে গেলে আর আসে না।"
সেদিন দুই ভাই একে অপরের দিকে তাকিয়েছিল। তারপর কাদের বলেছিল, 'তোর কথাই ঠিক, জব্বার।' জব্বার বলেছিল, 'না, তোর কথাই ঠিক।' এবং শেষ পর্যন্ত জমি বিক্রি না করে রাখা হয়েছিল।
মনোমালিন্য মিটে গিয়েছিল। কিন্তু সেই রাতের কথাগুলো কেউ ভোলেনি।
এই পরিবারে আরো একটা বিষয় আছে — পাড়ার মানুষের নাক গলানো। গ্রামের স্বভাব — একজনের বিষয় সবার। কেউ ভালো মনে করে বলে, কেউ বলে মজা নিতে।
হোসেন আলী এই বিষয়ে বলেন, 'পাড়ার মানুষ কথা বলবেই। কিন্তু বিপদে পাড়ার মানুষই পাশে থাকে। তাই কথায় রাগ করলে চলে না।'
দশম অধ্যায়
হোসেন আলীর শেষ বিকেল
এখন হোসেন আলীর বয়স আটাত্তর। শরীর দুর্বল। বেশিক্ষণ হাঁটতে পারেন না। কিন্তু মাথা পরিষ্কার। স্মৃতি পরিষ্কার।
প্রতিদিন বিকেলে তিনি উঠোনের পুরনো কদমগাছের নিচে বসেন। একটি পুরনো মোড়া। কোলে নাতনি নীলা।
নীলা জিজ্ঞেস করে, 'দাদা, তুমি ছোটবেলায় কেমন ছিলে?'
হোসেন আলী হাসেন। বলেন, 'তোমার মতোই। দুষ্টু ছিলাম খুব। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার পর দুষ্টুমি ভুলে গেলাম।'
নীলা বলে, 'তোমার বাবাকে মিস করো?'
হোসেন আলী বলেন, 'প্রতিদিন।'
সন্তানদের চোখে বাবা
কাদের বলেন, 'বাবা আমাকে শিখিয়েছেন — কাজকে সম্মান করতে হয়। যে কাজই হোক, সেটা ভালো করে করতে হয়।'
জব্বার বলেন, 'বাবা আমাকে শিখিয়েছেন — দূরে থেকেও শিকড় ভুলতে নেই।'
হাসিনা বলেন, 'বাবা আমাকে শিখিয়েছেন — মেয়ে হলেও মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়।'
সেলিম বলেন, 'বাবা আমাকে শিখিয়েছেন — কষ্ট করলে ফল পাওয়া যায়। কিন্তু পরিবারের চেয়ে বড় কোনো পুরস্কার নেই।'
লায়লা বলেন, 'বাবা আমাকে শিখিয়েছেন — ভেঙে পড়লেও আবার উঠতে হয়। কারণ পৃথিবী থেমে থাকে না।'
একটি পরিবার মানে শুধু রক্তের সম্পর্ক নয়। একটি পরিবার মানে — একসাথে কষ্ট করা, একসাথে কাঁদা, একসাথে হাসা। আর তারপরও একসাথে থাকা।
হোসেন আলীর পরিবার ঠিক এইরকম।
উপসংহার — শিকড় যেখানে
বাংলার গ্রামগুলো পাল্টে যাচ্ছে। নতুন বাড়ি উঠছে, পাকা রাস্তা হচ্ছে, বিদ্যুৎ আসছে। কিন্তু কিছু একটা পাল্টাচ্ছে না — মানুষের মনের গভীরে যে টান, সেই টান।
হোসেন আলীর মতো মানুষেরা সেই টানের প্রতীক। তাঁরা মাটির মানুষ — শুধু পেশায় নয়, মনেও। তাঁদের হাসিতে মাটির গন্ধ, তাঁদের কান্নায় বৃষ্টির স্পর্শ।
এই পরিবারের গল্প কোনো বিশেষ পরিবারের গল্প নয়। এটা বাংলার প্রতিটি গ্রামের গল্প। প্রতিটি বাবার গল্প, প্রতিটি মায়ের গল্প, প্রতিটি ছেলেমেয়ের গল্প।
পাঠক, আপনার পরিবারেও নিশ্চয়ই আছেন একজন হোসেন আলী। হয়তো তিনি এখনো আছেন, হয়তো নেই। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া কথাগুলো, তাঁর হাতের পরশ, তাঁর চোখের চাহনি — এগুলো আছে।
এগুলো থাকে। সব সময় থাকে।
মাটিতে জন্ম, মাটিতেই ফেরা —
কিন্তু মাঝখানের গল্পটা, সেটাই জীবন।
— সমাপ্ত —
বংশ তালিকা — হোসেন আলীর পরিবার
করিম বকশ (পিতামহ) × ফাতেমা বিবি
হোসেন আলী (জন্ম ১৯৪৫) × রহিমা বেগম
কাদের আলী | জব্বার আলী | হাসিনা | সেলিম | লায়লা
কাদের আলী × মর্জিনা → রাসেল, তুলি, রিপন
জব্বার আলী × শিউলী → সোহান, মিম
হাসিনা × আলমগীর → জামাল, শিরিন, রাফি
সেলিম × সুমাইয়া (প্রবাসে বিবাহিত) → তানভীর
লায়লা × মৃত তৌফিক → নীলা