বসন্ত ফুরিয়ে আসে। বনে-বাদাড়ে, ঘরে-বাইরে কিংবা ছাদ বাগানের ফুল ঝরতে থাকে। পেলবতা মাখা প্রকৃতি রুক্ষ হতে শুরু করে। কালবৈশাখী এসে পলিমাটি দিয়ে গড়ে ওঠা প্রান্তরের ধুলো-বালি উড়িয়ে নেয়। পথে চলতে চলতে সেই ধুলোর স্নো-পাউডার আপনা আপনি গায়ে মেখে যায়। ভবনে প্রতিফলিত হয়ে সূর্যের তাপ দ্বিগুণ হয়ে ফিরে আসে। বাতাসে বর্ধিত আদ্রতা গায়ে হুল হয়ে ফুটতে চায়। আর তখন ফোটা ফোটা বৃষ্টির জন্য আমরা সবাই চাতক পাখি হতে থাকি। এরপর একদিন বিনা নোটিশে হুড়হুড় করে বৃষ্টি নামে। প্রকৃতি বার্তা দেয় বৈশাখ এসে গেছে।
গ্রামে মফস্বলে যাদের শৈশব কৈশোর কেটেছে তাঁরা জানে, নারিকেল পাতার তৈরি রোদ-চশমা ও ঘড়ি পরে সাহেব হওয়ার কি আপ্রাণ চেষ্টা ছিল। আমার শৈশবও গ্রামে কেটেছে। আমাদের জীবন ছিল দিন ভর খেলা ধুলা করা। খেলার সময় আমরা সবাই সাহেব হতে চাইতাম। কেউ-ই গরীব মিসকিন থাকতে চাইতাম না। সাইকেল কিংবা রিকশার বিয়ারিং দিয়ে তৈরি হত গাড়ি। সাহেব সেই গাড়িতে চড়ে পৌঁছে যেত কল্পনার শহরে। একে একে সবাই সেই সাহেবের রোল প্লে করতাম। বিয়ারিং এর গাড়িতে বসা সাহেবকে ঠেলে নেয়া লাগতো বাকী গরীব মিসকিনদের। বৈশাখ এলে চরক ডাঙ্গার মাঠে পূজা শুরু হত। পূজার শুরু হলে চরকডাঙ্গার মাঠে মেলা বসত। মেলায় গরম গরম জিলাপি, হাওয়াই মিঠাই, হরেক রকমের বাতাসা মৌ মৌ গন্ধ ছড়িয়ে দিত। সার্কাস, যাত্রা পালা, হরেক রকমের খেলনার উপস্থিতি আমাদের রক্তে নাচন ধরিয়ে দিত। কিন্তু চরকডাঙ্গার মেলা ছিল অনেক দূরে। সেখানে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। মেলা ফেরত বড়দের কাছে গল্প শুনেই আমাদের আনন্দের টগবগে ঘোড়া তীব্র গতিতে ছুটে চলত।
একবার সাগর টকিজের পশ্চিমে তিলাই নদীর পাড়ে বসা মেলায় যাই। জিলাপি বাতাসা কিনে খাই। ৫ টাকায় ১০ টা চুড়ি কিনে ওদের বেঁধে দেয়া দড়ির গা ঘেঁষে দাঁড়াই। সামনে থাকা পুরস্কারের উপর ফেলতে হবে। চুড়ি নিক্ষেপ করে আটকাতে পারলে পুরস্কার। পুরস্কারের মাপ আর চুড়ির সাইজ সমানে সমান। এরপরেও একটা চুড়ি দামি সাবানে ফেলতে পারি। আমাকে একা পেয়ে পুরস্কার দিতে অস্বীকার করে। আমি কাঁদতে থাকি। পরিচিত কেউ আছে কিনা খুঁজতে থাকি। এদিক ওদিক ছুটতে ছুটতে দেখি অনেক লোকের ভিড়। চুড়ি নিক্ষেপের কথা ভুলে যাই। ভিড় ঠেলে ভিতরে ঢুকি। এরপর সেখানে যা দেখি তাতে কান্না কখন থেমে যায়, টের পাইনা। চোখের সামনে একটা টেবিল। সেই টেবিলে শোয়ানো একটা লোকের শরীর একপাশে, অন্য পাশে মাথা। গলা বরাবর কেটে ফেলেছে জাদুকর। রক্তের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। মাথাটা এদিক ওদিক দুলছে, চোখ মুখে আতঙ্ক। মুখে বলছে, আমাকে বাঁচান। প্লিজ, আমাকে বাঁচান। জাদুকরও বলছে, ভাইয়েরা আমার, ওকে বাঁচাতে চাইলে টাকা দিন। নাইলে ওকে বাঁচানো যাবে না। গ্রামের সহজ সরল মানুষ। হয়ত বাড়ি থেকে এসেছে ছোট মেয়ের জন্য স্যান্ডেল কিনতে। কেউ কেউ হয়ত টয়লেটের বদনা, বুড়া বাপের জন্য চেয়ার কিনতে এসেছে। জাদুকরের সম্মোহনীতে সেই টাকা তাঁর হাতে তুলে দিচ্ছে। সন্ধ্যায় হয়ে এসেছে। আমি ভীষণ আতঙ্কিত। দৌড় দিয়ে বাড়ির দিকে ছুটতে থাকি। এরপরেও সেই মাথাটা যেন আমার পিছন পিছন ছুটে আসে। সাথে রক্তের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। আমি শুনতে পাচ্ছি, প্লিজ আমাকে বাঁচান। কোন রকমে বাড়ি চলে আসি। কিন্তু এরপরেও বহুদিন শরীর থেকে আলাদা হয়ে পড়ে থাকা সেই মাথাটা আমাকে তাড়িয়ে বেরিয়েছে।
২।
এখন সেই সময় নেই, শৈশবও নেই। বদলে যাওয়া বৈশাখ এখন আমাদের দোরগোড়ায়। সারাদেশ জুড়ে উদযাপিত হয় বৈশাখ। সকালে পান্তা ইলিশ খেয়ে বাঙ্গালী-লাইসেন্স রিনিউ হয়। যদিও ইলিশের প্রজনন মৌসুম হওয়ায় পান্তার প্লেট থেকে ইলিশ বাদ পড়েছে। দিন ভর লাল সাদা পাঞ্জাবি, কিংবা শাড়ি পরে টই টই করে ঘোরা। পরের ৩৬৩ দিন পহেলা বৈশাখের হালচাল লকারে বন্দি থাকে। ইদানিং অবশ্য পহেলা বৈশাখের উৎসব মানে অর্থনীতির যোগ। মাস জুড়ে চলে বৈশাখী কালেকশন ও বৈশাখী অফার।
পহেলা বৈশাখের সাথে অবশ্য অর্থনীতির গভীর সম্পর্ক। হালখাতা উৎসব এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বৈশাখ মাসের প্রথম দিনে অনুষ্ঠিত হয়। আগের বছরের হিসেব চুকিয়ে দিয়ে নতুন খাতা খোলা, এই হল হালখাতা। ভিন্ন আঙ্গিকে এই প্রথার শুরু অনেক আগে। মোঘল সম্রাট আকবর ফতেহুল্লাহ সিরাজিকে দায়িত্ব দেন নতুন পঞ্জিকা তৈরিতে। ফসল কাটার সময়ের সাথে মিলিয়ে সেই পঞ্জিকা তৈরি হয়। ঘরে ঘরে ফসল পৌঁছানোর আগে একটা অংশ চলে যায় সম্রাটের খাজানায়। পহেলা বৈশাখকে পুণ্যের দিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পুর্বে প্রচলিত হিজরি সাল অনুসারে খাজনা পরিশোধে প্রজাদের কষ্ট হত। সেই কষ্ট লাঘবে পহেলা বৈশাখের প্রবর্তন।
সময় পেরিয়ে বৈশাখ একটি সর্বজনীন উৎসবে রূপ নিয়েছে। এই উৎসব বাংলাদেশের সকল জাত পাত ধর্মের মানুষ এক সাথে পালন করে। আমরা সবাই ঐক্যের এক বিন্দুতে মিলতে পারি। এই আলাপ আমরা বিভিন্ন জায়গায় শুনতে পাই। আদতে কি তাই? বৈশাখী উৎসবে নিজস্ব মতবাদ/বিশ্বাস/ন্যারেটিভের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার কৌশল বন্ধ হোক। আর এই কারণে অনেক ক্ষেত্রে বিতর্কের সৃষ্টি করা হচ্ছে। ঐ সকল কায়েমি স্বার্থ বন্ধ হোক। বৈশাখ হোক কৃষকের, প্রজাদের। শত শত বছর ধরে গ্রামের সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হয়ে আসছে। বৈশাখে সেই বঞ্চনার অবসান হোক। যুগ যুগ ধরে আমরা কেন গরীব রয়ে যাচ্ছি সেটা নিয়ে আলোচনা হোক। বৈশাখ হোক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রস্তুতি মঞ্চ।