রমজানে প্রায় সময় মসজিদে নামাজ পড়ে বাহিরে হাঁটতে যেতাম। কখনো কখনো ফিরতে ঘণ্টা খানেক দেরি হতো। ফিরে এসে দেখতাম আব্বা ঘরের সদর দরজার সামনে চেয়ারে বসে কোরআন তেলাওয়াত করতেন। ঘরের ঠিক কাছাকাছি এলেই শোনা যেতো।
আব্বার কোরআন পড়ার আলাদা একটা ভঙ্গি ছিল। ওই কণ্ঠটা আমার ভীষণ ভালো লাগতো। ঘরে ঢোকা মাত্রই আব্বা বলতেন, 'ও পুত আগে কোরআন শরীফ পড়।' আব্বার কোরআন পড়া দেখে আমরাও পড়তে বসতাম। মাঝে মাঝে আব্বা নিজের পড়াটা থামিয়ে আমাদের পড়া শুনতেন।
আহা, একে একে কতো রমজান পার হয়ে যাচ্ছে। আর ঘরে, আমার শিয়রে আব্বা নেই। কারে কোরআন পড়া শোনাবো! আব্বা কি কবর থেকে তাকিয়ে আছে! এমন ভাবনা আমার মনে তোলপাড় করে তোলে। এই ভোরে মসজিদ থেকে বাসায় ফিরতেই আব্বার কথা মনে হয়। আব্বারে ছাড়াই রমজান পার হয়ে যাচ্ছে। দূরের কবরে শুয়ে আছে আব্বা। পাহাড়ের নির্জনে।
রমজানের আমেজ দুয়ারে হাজির। দুই দিন আগে অফিস থেকে বাসায় ফেরার সময় রমজান নিয়ে নানান আলাপের মধ্যে আমার কলিগ জাফরান নূরের সাথে আব্বার বিষয়ে আলাপ উঠছিল। রমজানে আব্বা যে কোরআন খতম করতে বলতেন তা নিয়ে বলছিলাম। অনেক সময় হয়ে উঠতো না। চট্টগ্রাম থাকার সময়ে আব্বা ফোন দিয়ে জানতে চাইতেন। নিয়মিত খোঁজ খবর নিতেন।
আলাপকালে আমরা রিকশায় মতিঝিলের প্রায় কাছাকাছি। জাফরান প্রশ্ন করলেন আব্বা নেই? আমার চোখ ছলছল করছিল। আর ভাবতে ভাবতে বললাম, আব্বা কবর থেকে বোধহয় তাকিয়ে আছে আমার ছেলে কোরআন পড়ছে কি-না। তখন অজান্তেই আব্বার ওই সুরটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। ভরাট ও দরদী একটা একটা কণ্ঠ। যেন এখনো শুনছি আমি।
পরদিন অফিসে গিয়ে দেখি টেবিলে একটা প্যাকেট রাখা। হাতে নিয়ে দেখলাম একটা কোরআন শরীফ। জাফরান ভাই বললেন এটা আপনার জন্য। আমি কি বলবো বুঝে উঠতে পারছি না। আমার কথা যেন ফুরিয়ে গেছে! একদিন আগের আলাপে তিনি আমার জন্য কোরআন শরীফ আনলেন। আব্বার ওই কথাটা তারে এতোটা টাচ্ করেছে! আমি মাথা নিচু করে বসে আছি। আনন্দের অশ্রুতে আব্বার কথাগুলো চোখে ভাসছে।
রমজান পার হয়ে যাচ্ছে। আব্বা নেই, ফজর পড়ে বাসায় ফিরলাম। টেবিলে রাখা ওই কোরআন শরীফটা দেখতেই আব্বার কথা মনে হলো। সুরা আর রহমানটা আব্বার ভীষণ প্রিয় ছিল। প্রায় সময়ই এটা পড়তেন। মাঝে মাঝে বলতেন আগে এটা পড়। তারপর.... আমি কোরআনের পৃষ্ঠা উল্টিয়ে আব্বার ওই চেনা সুরে পড়তে লাগলাম—'ফাবি আইয়ি আলা ইরাব্বিকু মা তুকাজ্জিবান'।
27
View