ছোট্ট শহর মেন্ডার ঘণ্টি টাওয়ার থেকে সবেমাত্র মধ্যরাতের ঘণ্টাধ্বনি ভেসে এল। জনৈক তরুণ ফরাসী অফিসার দুর্গের বাগানের শেষ প্রান্তে দীর্ঘ চত্বরের পাঁচিলে হেলান দিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিল। সেই মগ্নতা এমনই গভীর যে উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপন করে এসেছে এমন একজন সৈনিকের পক্ষে সেটাকে ঠিক স্বাভাবিক বলা চলে না। তবে একথাও স্বীকার করতে হবে যে অনুধ্যানের জন্য অন্য কোন ক্ষণ, পরিবেশ বা রাত্রি এর চেয়ে বেশী অনুকূল হতে পারত না।
তরুণ অফিসারটির মাথার উপরে স্পেনের মেঘহীন নীল আকাশের গম্বুজ; দৃষ্টি নাম না জানা নক্ষত্র আর চাঁদের কোমল আলোয় আলোকিত সুন্দর উপত্যকাটির লাজুক পাঁকগুলোর উপর দিয়ে সামনে প্রসারিত। একটি পুষ্পিত কমলা গাছে হেলান দিয়ে অফিসারটি দাঁড়িয়েছিল, তার একশ ফুট নীচে মেন্ডা শহরটি – যেটা উত্তুরে হাওয়া থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য যেন এই পাহাড়ের পাদদেশে আশ্রয় নিয়েছে, উর্ধ্বদেশে এই দুর্গটি। মাথা ঘুরাতেই সে সমুদ্র দেখতে পেল; চন্দ্রালোকিত তরঙ্গমালা এই নিসর্গদৃশ্যে রূপালী বর্ণের এক বিস্তৃত মাত্রা যোগ করেছিল।
দুর্গের জানালাগুলোতেও আলো। বল নাচের হৈ হুল্লোড় আর ঘূর্ণি, বেহালার শব্দ, নৃত্যরত অফিসার ও সঙ্গিনীদের হাসিঠাট্টা তার কানে ভেসে আসছিল আর সাগরতরঙ্গের দূর গর্জনের সাথে মিশে যাচ্ছিল। দিনের উত্তাপে নেতিয়ে থাকা স্বত্ত্বেও হিমেল এই রাত্রি তার দেহ প্রাণে এক ধরণের সতেজ ভাব এনে দিয়েছিল। বাগানের সুগন্ধি গাছ আর ফুলের কড়া, মিষ্টি সুবাসে ভরা বাতাস গায়ে মেখে সে যেন স্নান করছিল।
মেন্ডার এই দুর্গটির অধিকারে ছিলেন এক স্প্যানিশ সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। সেই সময়ে তিনি তার পরিবার নিয়ে এই দুর্গে বাস করছিলেন। সারা সন্ধ্যা পরিবারের বড় মেয়েটি এই ফরাসী অফিসারের দিকে এমন ব্যাকুলভাবে তাকিয়ে থেকেছিল যে সেই সহানুভূতি ভরা দৃষ্টিতে তরুণ অফিসারের মনে এক ধরণের স্বপ্নের ইন্দ্রজালও তৈরী হয়ে থাকতে পারে। ক্লারা সুন্দরী ছিল। তার আরও তিন ভাই ও এক বোন থাকা স্বত্ত্বেও তাদের বাবা মারকুয়েজ ডি লেগানেসের বিশাল জমিজমা এই ফরাসী ভিক্টর মারচান্দের মনে এমনও বিশ্বাসের জন্ম দিতে পারে যে, তরুণীটির ভাগে এক বড় অংশই যৌতুক হিসেবে নির্ধারিত আছে। কিন্তু কোন সাহসে সে স্বপ্ন দেখতে পারে যে, সারা স্পেনে বংশকৌলীন্যে বিশ্বাসীদের মধ্যে সবচেয়ে উগ্র ব্যক্তিটি তার মেয়েকে প্যারিসের এক মুদি দোকানদারের ছেলের হাতে তুলে দিবেন? আরও কথা হচ্ছে, এখানে ফরাসীদের ঘৃণার চোখে দেখা হয়। ফরাসীদের সন্দেহ ছিল যে, মারকোয়েজ এলাকাটিকে সপ্তম ফার্দিনান্দের পক্ষে সংগঠিত করে তুলছেন এবং আর এজন্য প্রদেশের ফরাসী গভর্নর জেনারেল জি...... ভিক্তর মারচান্দের ব্যাটালিয়নকে এই ছোট্ট মেন্ডা শহরে নিয়োজিত করেছিলেন যাতে আশেপাশের এলাকার মানুষজন ভয়ে কম্পমান থাকে। এলাকাবাসী আবার মারকুয়েজ ডি লেগানেসের কথাকে আইন বলে মনে করত। সম্প্রতি মার্শাল নে’র কাছ থেকে আসা একটি বার্তা ফরাসীদের মনে এমন ভয়ও উস্কে দিয়েছিল যে, শীঘ্রই ইংরেজরা উপকূলে ঘাঁটি গাড়তে পারে এবং মারকুয়েজ গোপনে লন্ডনের ক্যাবিনেটের সাথে চিঠি চালাচালি করছেন।
সুতরাং স্থানীয় স্প্যানিশরা ভিক্টর মারচান্দ ও তার বাহিনীকে যেভাবে বরণ করেছিল তা স্বত্ত্বেও তাকে সবসময় সতর্ক থাকতে হত। চত্বর ধরে শহর ও আশেপাশের এলাকার উপর চোখ বুলিয়ে নিতে নিতে সে নিজেকেই প্রশ্ন করছিল মারকুয়েজ তার প্রতি যে বন্ধুত্ব দেখিয়েছে সেটার কি ব্যাখ্যাই সে করবে আর তার জেনারেলের অস্বস্তির সাথে এলাকার আপাত শান্ত অবস্থাকেও কিভাবে মিলিয়ে নিবে? কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই এইসব চিন্তাভাবনা এক সহজাত সতর্কতা আর যৌক্তিক কৌতূহলের তাড়নায় তার মন থেকে উবে গেল। হঠাৎ তার খেয়াল হল যে, নীচে শহরে আজ অতিরিক্ত রকমের আলো। যদিও আজ সেইন্ট জেমসের স্মরণে ভোজ উৎসব, সে নিজে আজ সকালে এই আদেশ দিয়েছে যে, সেনা বিধির আওতায় নির্ধারিত সময়ে শহরের সব আলো নিভানো থাকবে। একমাত্র এই দুর্গটাই এই আদেশের বাইরে থাকবে। সে এখানে ওখানে তার সৈন্যদের জন্য নির্ধারিত পোস্টে বেয়োনেটে আলোর ঝলক দেখতে পেল; কিন্তু শহর জুড়ে এক গভীর নীরবতা বিরাজ করছে আর এমন কোন লক্ষণ নেই যে, স্প্যানিশরা উৎসবের মাদকতায় নিজেদের ভাসিয়ে দিয়েছে। অধিবাসীরা কেন এই আদেশ অমান্য করল তার একটা ব্যাখ্যা পাবার জন্য সে কিছুক্ষণ মনে মনে হাল্কা একটা চেষ্টা চালাল; কিন্তু রহস্যটা অধরাই রয়ে গেল। তার মনে পড়ল যে, সে তার কয়েকজন অফিসারকে রাতে পুলিশী দায়িত্ব পালন করতে আর শহরে টহল দিতে নির্দেশ দিয়েছিল।
যুবাসুলভ এক হঠকারিতার বশে হঠাৎ সে পাহাড়ের গা বেয়ে দ্রুত নামার উদ্দেশ্যে আগে থেকেই তৈরী করা দেওয়ালের একটি ফোঁকর দিয়ে লাফ মারতে উদ্যত হল – তার লক্ষ্য ছিল ক্ষয়ে যাওয়া পথ না ধরে আরো দ্রুত গতিতে যেন শহরের সবচেয়ে কাছের প্রবেশদ্বারের ছোট প্রহরা-চৌকিটিতে পৌঁছতে পারে। কিন্তু একটা ক্ষীণ শব্দ তাকে থামিয়ে দিল। তার মনে হল যে, বাগানের নুড়ি বিছানো পথ ধরে এক নারীর হাল্কা পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। সে মাথা ঘুরাল কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না; মুহুর্তের জন্য সাগরের বিস্ময়কর ঔজ্জ্বল্যে তার চোখ ধাঁধিয়ে গেল- পরমুহুর্তেই সে এমন এক সর্বনাশা দৃশ্য দেখল যে, বিস্ময়ে সে স্থাণুর মত দাঁড়িয়ে রইল – নিজের ইন্দ্রিয়গুলোকে তার বিশ্বাস হচ্ছিল না। সাদা চন্দ্রকিরণে দিগন্ত আলোকিত হয়ে গিয়েছিল, সেই আলোয় সে স্পষ্টভাবে দূরে সাগরের বুকে জাহাজের পাল দেখতে পেল। ভয়ের এক ঠাণ্ডা স্রোত তার মধ্য দিয়ে বয়ে গেল; নিজেকে সে এই বলে আশ্বস্ত করতে চাইল যে, এই দৃশ্যটি সাগর তরঙ্গে আপতিত চন্দ্রকিরণের দৈব প্রভাবে সৃষ্ট এক দৃষ্টি বিভ্রম। সে লাফ মারতে যাবে, এমন সময় একটি কর্কশ কণ্ঠ তাকে তার নাম ধরে ডাকল। অফিসারটি দেওয়ালের ফোঁকরের উপর চোখ ফেলল, দেখল একজন সৈনিকের মাথা বের হয়ে আসছে। সে সৈনিকটিকে চিনতে পারল, একজন গ্রেনেড নিক্ষেপক, যাকে সে দুর্গে আসার সময় সঙ্গে থাকতে নির্দেশ দিয়েছিল।
‘স্যার, আপনাকেই খুঁজছি।’
অফিসারটি নীচু স্বরে জিজ্ঞাসা করল, ‘হ্যাঁ, কি ব্যাপার?’ একটা অমঙ্গল আশঙ্কায় সে সতর্কতা অবলম্বন করছিল।
‘নীচের ঐ হতচ্ছাড়াগুলো কীটের মত কিলবিল করে উঠে আসছে। আপনার কথামত আমি এই এদিক ওদিক খোঁজ খবর নিয়েই যত তাড়াতাড়ি পেরেছি আপনাকে জানাতে চলে এসেছি।’
‘হ্যাঁ, বলতে থাক’, ভিক্তর মারচান্দ উত্তর দিল।
‘দুর্গ থেকে একটা লোক লণ্ঠন হাতে বের হয়ে এই এদিকেই আসছিল, আমি তার পিছু নিয়েছিলাম। লণ্ঠন মানেই তো বহুত সন্দেহের ব্যাপার! আমার তো মাথাতেই আসে না যে এত রাত্রিতে সেই ভদ্র খ্রীস্টানের সলতে জ্বালানোর কোনও প্রয়োজন আছে। মনে মনে আমি বলি, ‘ওরা তো আমাদের গপাগপ গিলে খাওয়ার মতলবে আছে!’ আমি তাকে বেকুব বানিয়ে এদিকটায় এসে খোঁজ পাই যে, এখান থেকে এই দুই তিন কদম দূরেই জ্বালানী কাঠের একটা স্তূপ আছে।’
হঠাৎ নীচের শহর জুড়ে এক ভয়ঙ্কর আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়ল, তাতে সৈনিকটার কথা থেমে যায়। অফিসারটির মুখে একটা আলো এসে লাগে, আর হতভাগা গ্রেনেড নিক্ষেপক সৈনিকটি মাথায় একটা বুলেটের আঘাত নিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। দশ কদম দূরে দাবানলের মত একটা আগুন জ্বলে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে বলরুমে গান আর হাসির হল্লা থেমে যায়; উৎসবের ছন্দোময় গুঞ্জনের পরিবর্তে নেমে এল মৃত্যুপুরীর নিস্তব্ধতা - মাঝে মাঝে তাতে কাতর ধ্বনির বিরতি। সমুদ্রের সাদা সমতল থেকে কামানের গোলা বর্ষণের আওয়াজ ভেসে আসতে লাগল।
অফিসারটির কপালে ঘামের একটা শীতল ধারা ভেসে ওঠে। সে তার তরবারি ফেলে রেখে এসেছে। সে বুঝতে পেরেছে যে, তার সৈন্যরা মারা পড়েছে, আর ইংরেজরা মাটিতে নামতে শুরু করল বুঝি। সে জেনে গেছে, যদি সে বেঁচেও যায় তবু কলঙ্ক থেকে যাবে; কল্পনায় নিজেকে সে সামরিক আদালতের মুখোমুখি দেখতে পেল। মুহুর্তের মধ্যে তার চোখ উপত্যকার গভীরতা মেপে নিল, তারপর সে লাফ দিতে যাবে, এমন সময় ক্লারার হাতে তার হাত বাধা পেল।
‘পালাও,’ ক্লারা চীৎকার করে বলে উঠল, ‘আমার ভাইয়েরা তোমাকে খুন করতে পেছন পেছন ছুটে আসছে। ঐ দূরে পাহাড়ের নীচে জুয়ানিটোর আন্দালুসিয়ানটা খুঁজে পাবে। দৌড়াও’। সে তাকে একটা ধাক্কা দিল। তরুণ অফিসার মেয়েটির দিকে বোকার মত বিস্ময়ের চোখে তাকাল; কিন্তু আত্মরক্ষার সহজাত যে প্রবৃত্তি সবচেয়ে সাহসী মানুষটিরও মজ্জাগত তার বশবর্তী হয়ে সে দৌড়ে বাগান পার হয়ে মেয়েটির নির্দেশিত পথে ছুট মারল, পাথরের পর পাথর লাফিয়ে লাফিয়ে সম্পূর্ণ অচেনা পথ পেরিয়ে যেতে লাগল। শুনতে পাচ্ছিল পেছনে ক্লারা তাকে ধাওয়া করার জন্য ভাইদের ডেকে যাচ্ছে; তার খুনীদের পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে; তাদের ছোড়া গুলি বারবার কানের পাশ দিয়ে শিস কেটে ছুটে যাচ্ছিল; শেষ পর্যন্ত সে পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছুতে পারল, ঘোড়াটাকে খুঁজে পেল, তাতে উঠে বসল, তারপর বিদ্যুৎ বেগে ছুট লাগাল।
কয়েক ঘণ্টা পর তরুণ অফিসারটি জেনারেল জি-----র বাসায় পৌঁছল। জেনারেল তখন অন্য অফিসারদের সাথে রাতের খাবারে ব্যস্ত।
‘আমার বাঁচা মরা আপনার হাতে’, জেনারেল জি--------কে উদ্দেশ্য করে বলল মেন্ডার বিধ্বস্ত, নিঃশেষিত অধিকর্তা।
সে একটি সোফায় বসে তার ভয়াবহ কাহিনী বর্ণনা করল। এক ভয়ঙ্কর নিস্তব্ধতার মধ্য দিয়ে কাহিনীটিকে গ্রহণ করা হল।
সবশুনে জাঁদরেল জেনারেল বললেন, ‘আমার মনে হচ্ছে তোমাকে দোষ না দিয়ে করুণা করাটাই ঠিক কাজ হবে। স্প্যানিশদের অপকর্মের জন্য তোমাকে আমি দায়ী করছি না। মার্শাল কি রায় দেয় জানি না, আমি তোমাকে ছেড়ে দিচ্ছি।’
হতভাগা অফিসারের কাছে কথাগুলো নামে মাত্র সান্ত্বনার মত মনে হল।
‘সম্রাট যখন জানতে পারবেন!’ সে কেঁদে উঠল।
জেনারেল বললেন, ‘ওহ! তিনি তোমাকে গুলি করার আদেশ দিবেন। ব্যাপারটা আমরা দেখব। এখন এ নিয়ে আর কোনও কথা বলতে চাই না।’ কিছুটা কঠোর স্বরে যোগ করলেন তিনি, ‘শুধু এমন একটা প্রতিশোধের কথা চিন্তা করতে চাই যাতে এই দেশে একটা সমুচিত ভয় নেমে আসে। বর্বরের মত যুদ্ধ করে এরা।’
এক ঘন্টার মধ্যেই একটা পুরো রেজিমেন্ট সৈন্য, একদল অশ্বারোহী আর গোলন্দাজ বাহিনীর একটা অংশ রাস্তায় নেমে এল। পুরোভাগে জেনারেল আর ভিক্টর মারচান্দ। সহযোদ্ধাদের পরিণতি সম্বন্ধে সৈন্যদের আগেই জানানো হয়েছিল, সুতরাং তাদের ক্ষোভের কোনও সীমা পরিসীমা ছিল না। সদর দপ্তর থেকে মেন্ডা শহরের পথটা প্রায় অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে পার হয়ে এল তারা। পথের ধারের গ্রামবাসীদের অস্ত্রসজ্জিত অবস্থায় দেখা গেল; দুর্দশাগ্রস্ত ছোট গ্রামগুলো ঘেরাও করে অধিবাসীদের কচুকাটা করা হল।
দৈব দুর্বিপাকে ঘটনা যা ঘটেছিল সেটা এরকম যে, ইংরেজদের রণতরী তখনও সমুদ্রে এবং উপকূল থেকে বেশ দূরেই। ব্যাপারটা প্রথমদিকে দুর্বোধ্য ঠেকলেও পরে জানা গিয়েছিল যে, নৌবাহিনীর গোলন্দাজ অংশটা বাকীদের পেছনে ফেলে অনেক আগে এসে পড়েছিল। সুতরাং মেন্ডার অধিবাসীরা যে সাহায্যের উপর নির্ভর করেছিল সেটা ভেস্তে গিয়েছিল এবং যখন ইংরেজদের রণতরী এসে পৌঁছল, কোনরূপ আঘাত হানার আগেই ফরাসী সৈন্যদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে পড়েছিল। ঘটনাক্রমে মেন্ডার অধিবাসীরা এমনই ভয় পেয়েছিল যে তারা পরিস্থিতি বিবেচনা করে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দিতে বাধ্য হল। এক ধরণের প্রেমময় অনুভূতির তাড়না, যা কিনা পেনিন্সুলার ইতিহাসে ঠিক বিরল কোনও দৃষ্টান্ত নয়, ফরাসী সৈন্যদের কসাই অংশটাকে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো থেকে নিবৃত্ত করেছিল, শহরটা রক্ষা পেয়েছিল; কারণ জেনারেলের নিষ্ঠুরতার খ্যাতির জন্য সবাই ধারণা করেছিল যে, উনি মেন্ডা শহরটাকে আগুনে ভস্মীভূত করে ছাড়বেন, পুরো শহরবাসীকে তলোয়ারের নীচে ছেড়ে দিবেন। জেনারেল জি...... মেন্ডা শহরবাসীর আত্মসমর্পণের প্রস্তাবে সম্মত হলেন, তবে শর্ত দিলেন যে, দুর্গের প্রত্যেকটা প্রাণী অর্থাৎ ভৃত্য থেকে শুরু করে মারকুয়েজ পর্যন্ত সবাই তাদের ভাগ্য জেনারেলের হাতে সঁপে দিবেন। এই শর্ত মেনে নেওয়া হল এবং জেনারেল শহরবাসীদের রেহাই দিলেন, তার সৈন্যদের লুটপাট বা আগুন লাগানো থেকে বিরত রাখবেন বলে কথা দিলেন। একটা বিশাল অংকের চাঁদা ধার্য করা হল, এবং সবচেয়ে ধনী অধিবাসীদের জিম্মি করে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে চাঁদা পরিশোধের সময়সীমা ধার্য করা হল।
জেনারেল তার সৈন্যদের নিরাপত্তার জন্য সবরকমের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিলেন, জায়গাটার প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা করলেন আর যেসব সৈন্য বাসাবাড়ীতে অস্থায়ীভাবে থাকত তাদের সেখানে থাকতে নিষেধ করলেন। তারা অস্থায়ী শিবির স্থাপন করার পর জেনারেল একজন বিজেতার মত শহরে প্রবেশ করলেন। লিগানেসের পুরো পরিবারের কণ্ঠরোধ করা হল, বলরুমে বন্দী করে সতর্ক প্রহরায় রাখা হল। জানালা থেকে শহরের উপরকার চত্বরের পুরোটাই দেখা সহজ ছিল। একটা লাগোয়া গ্যালারীতে অফিস স্থাপন করা হল, যেখানে জেনারেল মুহূর্তের মধ্যেই ইংরেজদের তীরে নামা থেকে বিরত রাখার সবচেয়ে কার্যকর কৌশল সম্পর্কে একটা সভা করলেন। মার্শাল জে’র কাছে একজন সহকারী প্রেরণ করা হল, উপকূল জুড়ে ব্যাটারী স্থাপন করার নির্দেশ দেয়া হল; এরপর জেনারেল ও তার অফিসাররা বন্দীদের ব্যাপারে মনোযোগ দিলেন। শহরবাসীরা দু’শো স্প্যানিয়ার্ডের জীবনের ব্যাপারে আশা ছেড়েই দিয়েছিল, তাদেরকে তৎক্ষণাৎ চত্বরে গুলি করে মারা হল। জেনারেল বলরুমের বন্দীদের জন্য সেই জায়গাতেই শিরোচ্ছদের মঞ্চ তৈরী করতে আর শহরের বাইরে থেকে জল্লাদ নিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন। ভিক্টর রাতের খাবারের আগের এই বিরতিতে বন্দীদের সঙ্গে দেখা করার একটা সুযোগ নিল। অল্পক্ষণের মধ্যেই সে জেনারেলের কাছে ফিরে এল।
সে আমতা আমতা করে বলল, ‘আমি একটা অনুগ্রহের জন্য ছুটে এসেছি।’
‘তুমি!’ জেনারেল বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, তীব্র শ্লেষ মেশানো ছিল তাতে।
ভিক্টর বলল, ‘হায়! আমি একটা মর্মস্পর্শী অনুগ্রহের কথা বলছিলাম। মারকুয়েজ আমাদের শিরোচ্ছেদের মঞ্চ দাঁড় করাতে দেখেছেন। তিনি আশা করছেন যে, আপনি তার পরিবারকে শাস্তি দিবেন। তিনি এই অভিজাত পরিবারটির শিরোচ্ছেদ করতে অনুরোধ করেছেন।’
‘আবেদন মঞ্জুর।’ জেনারেল বললেন।
‘তিনি আরও অনুরোধ করেছেন যে, তাদের বেলায় ধর্মের বিধি বিধান পালন করা হোক এবং তাদের বাঁধন খুলে দেওয়া হোক। তারা কথা দিচ্ছেন যে, তারা পালানোর কোনও চেষ্টা করবেন না।’
জেনারেল বললেন, ‘আমি তাও মেনে নিলাম। কিন্তু এর সমস্ত দায়-দায়িত্ব তোমার।’
‘এই বৃদ্ধ অভিজাত লোকটি তার যা কিছু আছে সব আপনাকে সঁপে দিবেন যদি তার সবচেয়ে ছোট ছেলেটাকে রেহাই দেওয়া হয়।’
‘তাই নাকি!’ জেনারেল চীৎকার করে উঠলেন, ‘রাজা যোসেফের নামে তার সম্পত্তি ইতোমধ্যে বাজেয়াপ্ত হয়ে গেছে।’ তিনি একটু থামলেন, একটা কুটিল চিন্তায় তার কপাল কুঁচকে উঠল, তারপর কথা শুরু করলেন, ‘তারা যা চাইছে তার চেয়েও ভাল কিছু আমি দেব। শেষ অনুরোধ দিয়ে তিনি কি চাইছেন তা আমি বুঝতে পারছি। ভাল কথা। ঠিক আছে, তিনি তার নাম উত্তরপুরুষের কাছে রেখে যান; কিন্তু যখনই তা উচ্চারিত হবে তখনই সারা স্পেন তার রাজদ্রোহ আর শাস্তির কথা মনে করবে। আমি তার সম্পত্তি ও জীবন তার যে কোনও ছেলের কাছে রেখে দিয়ে যেতে রাজী আছি যদি সে জল্লাদের কাজটা করে। অনেক হয়েছে, তাদের ব্যাপারে আমার কাছে আর কিছু বলো না।’
রাতের খাবার পরিবেশিত হয়েছে। অফিসাররা রাজ্যের ক্ষুধা নিয়ে টেবিলে বসে গেছেন। একজনই অনুপস্থিত – সে ভিক্টর মারচান্দ। অনেক দ্বিধা দ্বন্দ্বের পর সে বলরুমে গেল, লিগানেসের অহঙ্কারী পরিবারটির শেষ দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনতে পেল। চোখের সামনের দৃশ্যের দিকে সে বিষণ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। এই তো গত রাতে, এই সেই রুমে সে এই মুখগুলোকে ওয়ালটয নৃত্যের তালে তালে তার চারদিকে ঘূর্ণিতে মেতে উঠতে দেখেছে; আর কিছুক্ষণ পরেই মেয়েলি মুখাবয়বের এই তিন ছোট ভাইয়ের মাথা জল্লাদের তরবারির কোপে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে – ভাবতেই সে কেঁপে উঠল। বাবা, মা, তিন ছেলে ও দুই মেয়ে কারুকাজ করা চেয়ারের সাথে বাঁধা অবস্থায় একেবারে নিশ্চলভাবে বসে আছে। তাদের পেছনে আট গৃহকর্মী হাত বাঁধা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। মৃত্যুর পরোয়ানা মাথায় নিয়ে এই পনের জন বন্দী একজন আরেকজনের সঙ্গে বিষণ্ন দৃষ্টি বিনিময় করছিল; তারা কি চিন্তা করছিল সেটা তাদের চোখ থেকে বুঝে উঠা কষ্টকর হলেও তাদের পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার গভীর হতাশা ও বিষাদের চিহ্ন একাধিক জনের কপাল জুড়ে লেখা ছিল।
যে নির্বিকার সৈন্যরা পাহারায় নিয়োজিত ছিল তারা তাদের চরম শত্রুর এই দুর্দশার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। ভিক্টর যখন প্রবেশ করল সবার চেহারায় একটা কৌতূহলের ভাব ফুটে উঠল। সে দণ্ডিত বন্দীদের বাঁধন খুলে দেওয়ার আদেশ দিল, নিজ হাতে ক্লারার দড়ি খুলল। ক্লারা তাকে একটা বিষণ্ন হাসি উপহার দিল। অফিসার তরুণীর হাতটা একটু আলতোভাবে ছুঁয়ে দেওয়ার লোভ সম্বরণ করতে পারল না; মনে মনে সে তার কালো চুল, সরু কোমরের প্রশংসা না করে পারল না। স্প্যানিশ গাত্রবর্ণ আর কাকের দীঘল বাঁকা চোখের পাতার চেয়েও অধিক কালো স্প্যানিয়ার্ড চোখের অধিকারিনী তরুণীটি ছিল সবদিক দিয়েই স্পেনের এক কন্যা।
‘তুমি কি কিছু করতে পেরেছ?’, মেয়েটি একটা বিষণ্ন হাসি হেসে জিজ্ঞাসা করল, প্রশ্নটায় এক ধরণের বালিকাসুলভ আমুদে ভাব মেশানো ছিল।
ভিক্টর তার কাতরতা দমিয়ে রাখতে পারল না। সে একবার তিন ভাইয়ের মুখ চেয়ে ক্লারার দিকে তাকাল, তারপর আবার সেই তিন স্প্যানিয়ার্ডের দিকে দৃষ্টি ফেরাল। প্রথমজন, যে কিনা সবচেয়ে বড়, বছর তিরিশের হবে। খাটো এবং কিছুটা দুর্বল গড়নের; উদ্ধত ও দাম্ভিক দেখালেও তার ভাবসাবে এক ধরণের সুক্ষ্ণ বিশিষ্টতার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়; আগেকার স্পেন নাইটদের যে বীরোচিত কর্মকাণ্ডের জন্য বিখ্যাত ছিল সেই সুখ্যাতির প্রতি শ্রদ্ধার অনুভূতি এর বেলায়ও প্রযোজ্য ছিল। তার নাম জুয়ানিটো। দ্বিতীয় পুত্রটির নাম ফেলিপ, প্রায় ত্রিশ বছর বয়সী এবং বোন ক্লারার মতই দেখতে। সবচেয়ে ছোট ছেলেটি আট বছর বয়সী। এই ছোট পুত্রটির মধ্যে একজন চিত্রকর রোমান দৃঢ়তার ছাপ দেখতে পাবেন যার ছোঁয়া ডেভিড অঙ্কিত রিপাবলিকান সিরিজের ছবিগুলোতে শিশুদের মুখমণ্ডলে ধরা পড়ে। বৃদ্ধ মারকুয়েজ তার শুভ্র কেশরাজি নিয়ে যেন মুরিলোর ক্যানভাস থেকে অবতীর্ণ হয়েছেন। ভিক্টর তার এই পর্যবেক্ষণ শেষে হতাশায় ঘাড় ঘুরিয়ে নিল। কেমন করে এদেরই একজন জেনারেলের প্রস্তাব কার্যকর করবে! তবুও সে সাহস সঞ্চয় করে ক্লারার কাছে তার কথাটা খুলে বলল। স্প্যানিশ মেয়েটার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা স্রোত নেমে গেল কিন্তু প্রায় মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সামলে নিয়ে পিতার সামনে হাঁটু গেড়ে বলল,
‘বাবা, আপনি জুয়ানিটোকে আপনার আদেশ পালন করতে বলবেন, আমরা সবাই তা মেনে নিব।’
মারকুয়েজের স্ত্রী আশায় কেঁপে উঠেছিলেন কিন্তু যখন তার স্বামীর পাশে হেলান দিয়ে ক্লারার বীভৎস সত্য শুনলেন তখন মূর্ছা গেলেন। জুয়ানিটো সবটা বুঝতে পেরে খাঁচায় বন্দী সিংহের মত লাফ দিয়ে উঠল। ভিক্টর মারকুয়েজের পূর্ণ বশ্যতার নিশ্চয়তা পেয়ে নিজের উপর দায় নিয়ে সৈন্যদের সরিয়ে দিল। ভিক্টর যখন ঘরে একাকী প্রহরায় নিয়োজিত তখন বৃদ্ধ মারকুয়েজ উঠে দাঁড়ালেন।
তিনি ডাকলেন, ‘জুয়ানিটো।’ উত্তর দেওয়ার জন্য জুয়ানিটো যেভাবে মাথা নিচু করল তাতে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের চিহ্নই ব্যক্ত ছিল, সে তার আসনে বসে পড়ল, বাবা ও মায়ের দিকে এক অসহনীয় দৃষ্টি নিয়ে ভেজা চোখ স্থাপন করল। ক্লারা তার কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল, তার কাঁধে হাত দিয়ে চোখে চুমু খেয়ে উচ্ছ্বলভাবে বলল, ‘জুয়ানিটো, তুমি যদি জানতে তোমার হাতে মারা যাওয়া আমার জন্য কতই না আনন্দের হবে! আমাকে জল্লাদের নোংরা আঙুলের ছোঁয়ার কাছে নত হতে হবে না। সামনের অশুভ ব্যাপারগুলো থেকে তুমি আমাকে ছিনিয়ে নিতে পারবে, আর ........ । আর, জুয়ানিটো, আমার অন্য কারোর অধিকারে থাকার চিন্তাটা তুমি সহ্যই করতে পারতে না ........ তাহলে, আপত্তি কিসের?’
মখমলের মত চোখগুলো ভিক্টরের দিকে এক অগ্নিদৃষ্টি হানল, সে যেন জুয়ানিটোর মনে ফরাসীদের প্রতি তার ঘৃণার আগুন উস্কে দিতে চাইছিল। তার ভাই ফেলিপ বলল, ‘সাহস ধর। নাহলে আমাদের রাজকীয় বংশের ধারা প্রায় শেষ হয়ে যাবে।’
হঠাৎ ক্লারা উঠে দাঁড়াল, জুয়ানিটোর চারপাশের দলটা হটে গেল, যে পুত্র এতক্ষণ সুবিবেচকের মত প্রতিরোধ করে যাচ্ছিল, তার বৃদ্ধ পিতার আদেশের মুখোমুখি হল,
‘জুয়ানিটো, আমি আদেশ দিচ্ছি,’ মারকুয়েজ গম্ভীর স্বরে বললেন।
যুবা কাউন্ট সম্মতির কোনও চিহ্ন দেখাল না।
তার পিতা হাঁটু মুড়ে বসল; ক্লারা, ম্যানুয়েল আর ফেলিপ অচেতনের মত পিতাকে অনুসরণ করল, তার সামনে অনুনয়ের ভঙ্গীতে হাত মেলে ধরল, যে কিনা তাদের বংশকে বিলুপ্তির গ্রাস থেকে রক্ষা করবে। তারা তাদের পিতারই কথার প্রতিধ্বনি করল।
‘বাছা, এও কি সম্ভব যে তোমার মধ্যে স্প্যানিয়ার্ডের বীরত্ব আর সত্যিকারের বিচার বুদ্ধির অভাব আছে? তুমি কি চাও যে আমি হাঁটু গেড়ে বসেই থাকি? তোমার নিজের জীবন আর নিজের যন্ত্রণা নিয়েই ভাবার কি অধিকার আছে তোমার?’, স্ত্রীর দিকে ফিরে বললেন, ‘এই কি আমার ছেলে, ম্যাডাম?’
মা তীব্র যন্ত্রনায় কেঁদে বললেন, ‘ সে রাজী হবে।’ তিনি জুয়ানিটোর ভ্রুতে একটু সংকোচনের চিহ্ন দেখে একথা বললেন, যে চিহ্ন কেবল তিনিই পড়তে পারলেন।
দ্বিতীয় কন্যা মারিকুইটা চিকন বাহু দিয়ে মাকে ধরে হাঁটু গেড়ে বসল, তার চোখ বেয়ে উষ্ণ অশ্রু পড়তে লাগল। তার ছোট ভাই ম্যানুয়েল এই কান্নার জন্য তাকে একটা ধমক দিল। সেই মুহূর্তে দুর্গের যাজক ঘরে ঢুকলেন; পুরো পরিবার তাকে ঘিরে জুয়ানিটো পর্যন্ত নিয়ে গেল। ভিক্টর অনুভব করল তার পক্ষে এই দৃশ্য আর সহ্য করা সম্ভব হবে না; ক্লারাকে ইঙ্গিত করে সে তাদের জন্য শেষ চেষ্টাটা করতে ঘরের বাইরে চলে গেল। সে জেনারেলকে ফুর্তির মেজাজে পেল; অফিসাররা তখনও খাবার ও পানীয় নিয়ে ব্যস্ত; মদ তাদের রসনার লাগাম ঢিলে করে দিয়েছে।
এক ঘণ্টা পরে জেনারেলের আদেশে মেন্ডার একশ’ বিশিষ্ট নাগরিককে দুর্গের চত্বরে লিগানেসের পরিবারের শিরোচ্ছেদ দেখার জন্য ডেকে পাঠান হল। মারকুয়েজের চাকরবাকরদের যেখানে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল সেখানে জমায়েত স্প্যানিশ নগরবাসীদের মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য একদল সৈন্যকে নিয়োজিত করা হল; জীবন উৎসর্গ করা এসব মানুষদের পা নগরবাসীদের মাথা ছুঁই ছুঁই অবস্থায় ঝুলছিল। ত্রিশ কদম দূরে ফাঁসির মঞ্চটি স্থাপিত হয়েছিল; উপরের খড়্গটি চকচক করছিল আর একপাশে জুয়ানিটোর বিকল্প হিসেবে জল্লাদ দাঁড়িয়েছিল যদি শেষ মুহূর্তে জুয়ানিটো বেঁকে বসে।
এক গভীর নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল; কিন্তু শীঘ্রই অনেক পায়ের আওয়াজ, একদল সৈন্যের মাপা পদক্ষেপ আর অস্ত্রের ঝনঝনানিতে সেই নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে গেল। এর সঙ্গে যোগ হল আরও শব্দ – অফিসাররা যেখানে খাচ্ছিলেন সেখান থেকে ভেসে আসা উচ্চস্বরের কথা আর হাসি – গতরাতেও যেমন সংগীত আর নাচিয়েদের পায়ের আওয়াজ বিশ্বাসহন্তারক হত্যাযজ্ঞের প্রস্তুতিকে চাপা দিয়েছিল।
সব চোখ দুর্গের দিকে ঘুরে গেল আর সম্ভ্রান্ত পরিবারটিকে মৃত্যুর প্রতি অবিশ্বাস্য স্থৈর্য নিয়ে সামনে আসতে দেখা গেল। প্রত্যেকটি চোখ স্থির, শান্ত। কেবল একজনকেই যাজকের বাহুতে হেলান দেয়া অবস্থায় দেখা গেল – যাজক বেঁচে থাকার দণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত এই চোখ মুখ বসে যাওয়া সর্বস্বান্ত ব্যক্তিটিকে ধর্মের সব সান্ত্বনাবাণী শোনাচ্ছিলেন। দর্শকদের মত নিয়মিত জল্লাদও বুঝতে পারল যে, জুয়ানিটো একদিনের জন্য তার দায়িত্ব পালনে সম্মতি দিয়েছে। বৃদ্ধ মারকুয়েজ আর তার স্ত্রী, ক্লারা ও মারিকুইটা আর তাদের দুই ভাই অভিশপ্ত জায়গাটির একটু আগে হাঁটু গেড়ে বসল। জুয়ানিটো যাজকের নির্দেশনা মোতাবেক সেখানে পৌঁছল। যখন সে ফাঁসিমঞ্চের কাছে গেল নিয়মিত জল্লাদ তার জামা টেনে একপাশে সরিয়ে নিল, সম্ভবত কিছু উপদেশ দেওয়ার জন্য। কনফেসর দণ্ডিতদের এমনভাবে দাঁড় করাল যে তাদেরকে যেন শিরোচ্ছেদের দৃশ্যটি দেখতে না হয়, যদিও সবাই ছিল ঋজু আর নির্ভীক – স্প্যানিয়ার্ডরা যেমন হয়।
ক্লারা সবার আগে তার ভাইয়ের সামনে এসে দাঁড়াল।
‘জুয়ানিটো, আমার সাহসের ঘাটতিকে ক্ষমা কর। আমাকে প্রথম শেষ কর’, ক্লারা বলল। যখন সে কথাগুলো বলছিল, একজন লোকের পূর্ণোদ্যমে ছুটে আসার আওয়াজের প্রতিধ্বনি শোনা গেল, ভিক্টর দৃশ্যপটে হাজির হল। ক্লারা মঞ্চের পাদদেশে হাঁটু গেড়ে বসেছিল, তার সাদা গ্রীবা ব্লেডটিকে পতিত হওয়ার জন্য যেন অনুনয় করছিল। অফিসারের মূর্ছা যাওয়ার মত অবস্থা হল, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই ক্লারার পাশে দাঁড়ানোর মত শক্তি খুঁজে পেল।
‘জেনারেল তোমাকে নিষ্কৃতি দিবেন যদি তুমি আমাকে বিয়ে করতে রাজী হও,’ সে বিড়বিড় করে বলল।
স্প্যানিশ মেয়েটি অফিসারের দিকে একটা অহঙ্কার মিশ্রিত ঘৃণার দৃষ্টি ফিরিয়ে দিল।
‘জুয়ানিটো, এখনই’, সে গম্ভীর স্বরে বলল।
তার মাথা ভিক্টরের পায়ের কাছে পতিত হল।
মারকুয়েজা ডি লিগানেসের শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল, যদিও একটা খিঁচুনির দমক তিনি রোধ করতে পারলেন না তবে তার যন্ত্রণার আর কোনও অভিব্যক্তি দেখালেন না।
‘প্রিয় জুয়ানিটো, আমি ঠিক জায়গায় দাঁড়িয়েছি তো? সবকিছু ঠিকঠাক তো?’ ছোট্ট ম্যানুয়েল তার ভাইকে জিজ্ঞাসা করল।
‘মারিকুইটা, তুমি কাঁদছ!’ তার বোনের পালা এলে জুয়ানিটো বলল।
‘হ্যাঁ’, মেয়েটি বলল, ‘হায়, জুয়ানিটো, আমি তোমার কথাই ভাবছি। আমরা চলে গেলে কী দুঃখীই না তুমি হবে।’
এরপর মারকুয়েজের দীর্ঘ শরীর দেখা গেল। তার ছেলেমেয়েদের রক্তে রঞ্জিত জায়গাটা তিনি দেখলেন, নির্বাক নিশ্চল জনতার দিকে একবার ফিরে তাকালেন, তারপর জুয়ানিটোর সামনে তার হাত প্রসারিত করে উচ্চস্বরে বললেন,
‘স্প্যানিয়ার্ডগণ! আমি আমার পুত্রকে এক পিতার আশীর্বাদ দিয়ে যাচ্ছি। মারকুয়েজ, ভয় না পেয়ে এখন আঘাত কর, তোমার কোনও দোষ নেই।’
যখন কনফেসরের বাহুতে হেলান দিয়ে তার মা এসে দাঁড়ালেন, তখন জুয়ানিটো কেঁদে উঠল, ‘উনি আমাকে তার বুকের দুধ খাইয়েছেন!’ তার গলার স্বরে উপস্থিত জনতার মধ্যে আর্তরব শোনা গেল। সেই হাহাকারে মদ্যপানরত অফিসারদের উল্লাসধ্বনি চাপা পড়ে গেল। মারকুয়েজা বুঝলেন জুয়ানিটোর সাহস শেষ হয়ে গেছে, তিনি একলাফে বারান্দার খুঁটির কাছে এসে দাঁড়ালেন, লাফ দিলেন এবং মুহূর্তের মধ্যেই নীচের পাথরে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেলেন। দর্শকদের মধ্য থেকে শ্রদ্ধা মেশানো আর্তরব ভেসে এল। জুয়ানিটো মূর্ছা গেল।
অর্ধ-মত্ত এক অফিসার বললেন, ‘জেনারেল, মারচান্দ এই শিরোচ্ছেদ পর্ব নিয়ে আমাকে কিছু একটা বলছিল। আমি বাজি রেখে বলতে পারি, এটা আপনার আদেশে হয় নি।’
‘জেন্টলম্যান, আপনি ভুলে যাচ্ছেন যে, এরকম না করলে এক মাসের মধ্যেই ফ্রান্সের পাঁচশ’ পরিবার শোকের মাতম করবে,’ জেনারেল চীৎকার করে উঠলেন, ‘আর আমরা তো এখন স্পেনেই আছি। আপনি কি চান যে, আমরা এখানে আমাদের হাড় রেখে যাই?’
জেনারেলের এই কথার পর টেবিলের আর কোনও লোক, এমনকি একজন সাব-অলটার্নও তার গ্লাসের মদ উদরপূর্তি করার সাহস পেল না।
এরপর সাধারণ জনগণ মারকুয়েজ ডি লিগানেসকে যতই সম্মানের চোখে দেখুক না কেন এবং তার আভিজাত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ স্পেনের রাজা তাকে ‘এল ভারডিউগো’ (জল্লাদ) উপাধি দিয়ে থাকুন না কেন, একটা দুঃখবোধ এই সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিটিকে কুড়ে কুড়ে খায়। তিনি একটা অবসর জীবন যাপন করেন এবং কদাচিৎ জনসমক্ষে আসেন। তার বীরোচিত অপরাধ তার জন্য এক বিশাল ভার হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং দ্বিতীয় এক পুত্র সন্তান জন্ম নিয়ে তাকে মুক্তি না দেওয়া পর্যন্ত তিনি যেন অধৈর্য হয়ে অপেক্ষা করছেন যাতে যে ছায়াগুলো তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় তাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারেন।
...............*...............