Posts

গল্প

লাল মোজা (ছোট গল্প)

March 4, 2026

মোঃ বজলুর রশীদ

Original Author মোঃ বজলুর রশীদ

15
View


 


ঘরের বাইরে কুয়াশা। ঘন কুয়াশা। সাদা ঘন কুয়াশা চারদিক ঢেকে রেখেছে। কুয়াশার কারণে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। মাঝরাত-কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই। টিনের চালে শিশির পড়ছে-টুপটাপ, টুপটাপ-একটানা, থামছে না। দূরে কোথাও একটা কুকুর ডাকছে।

মতি মিয়ার ঘুম আসছে না। পাতলা কাঁথাটা কোনোভাবেই তার হাড়কাঁপানো শীত আটকাতে পারছে না। সে পাশ ফিরলো। পাশে তার ছোট মেয়ে টুনি আর স্ত্রী রাহেলা অঘোরে ঘুমাচ্ছে।

টুনিটা ঘুমের ঘোরে মাঝে মধ্যে বিড়বিড় করছে। হয়তো স্বপ্নে দেখছে। মতি মিয়া উঠে বসলো। ঘরের কোণে ছোট জানালাটা দিয়ে কুয়াশার হিম বাতাস ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে। মতি মিয়া আস্তে করে বলল, রাহেলার মা, ও রাহেলার মা, একটু উঠত।

রাহেলা একটু নড়েচড়ে উঠল। ঘুমে জড়ানো গলায় বলল, এত রাতে ডাকাডাকি করেন ক্যান? পেটের ব্যথাটা আবার বাড়ছে নাকি?

মতি মিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, না, ব্যথা না। শীতটা আজ খুব বেশি মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন বরফ পড়ছে।

রাহেলা উঠে বসলো। কুপির আলোটা একটু বাড়িয়ে দিল।

রাহেলা বলল, শীত তো পড়বেই, পৌষ মাস। কাল সকালে টুনি পিঠা খেতে চেয়েছিল। চালের গুঁড়ো নেই, গুড়ও নেই। আপনি তো খালি হাতে ফিরলেন।

মতি মিয়া চুপ করে রইল। গরীবের শান্ত থাকাটা খুব ভয়ংকর ধরনের হয়। সে উপরে ঘরের টিনের দিকে তাকিয়ে রইলো। হঠাৎ টুনি জেগে গেল। ছোট ছোট চোখে তাকিয়ে বলল, বাবা, আমার পায়ে খুব ঠান্ডা লাগছে। আমাকে এক জোড়া মোজা কিনে দিবে।

মতি মিয়া মেয়ের পায়ে হাত দিল। সত্যিই বরফের মতো ঠান্ডা। সে নিজের খসখসে হাত দুটো দিয়ে টুনির পা ঘষতে লাগল। বলল, কাল শহর থেকে তোর জন্য এক জোড়া মোজা নিয়ে আসব। লাল রঙের। তোর পছন্দ হবে তো?

টুনি হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে খুশি মনে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।

কিন্তু মতি মিয়া জানে, কাল তার পকেটে এক জোড়া মোজা কেনার মতো টাকা থাকবে কি না।

ভোর হতে এখনো অনেক দেরি। বাইরে কুয়াশা আরও ঘন হয়েছে। রাহেলা উঠে রান্নাঘরের দিকে গেল।

রাহেলা রান্নাঘরে গিয়ে দেখল, চুলায় আগুন নিভে গেছে। ছাই পড়ে আছে। কাল সন্ধ্যায় যে আগুন জ্বালিয়েছিল, তা-ই। কাঠও নেই নতুন করে জ্বালানোর মতো।

সে ফিরে এলো। মতি মিয়া তখনো বসে আছে, চুপচাপ।

রাহেলা বলল, আগুন নিভে গেছে। কাঠও নেই।

মতি মিয়া কিছু বলল না। শুধু মাথা নাড়ল।

রাহেলা আবার শুয়ে পড়ল টুনির পাশে। মেয়েকে জড়িয়ে ধরল। নিজের শরীরের উষ্ণতা দিয়ে মেয়েকে গরম রাখার চেষ্টা করল।

মতি মিয়া জানালার দিকে তাকিয়ে থাকলো। কুয়াশার ভেতর দিয়ে বাহিরে কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

মতি মিয়া ভাবলো আগামীকালের কথা। সকালে উঠে কোথায় যাবে? কোথায় কাজ পাবে? শীতে কাজ কমে যায়। যা পায়, তাতে দিন আনি দিন খাই।

টুনির কথা মনে পড়ল। লাল মোজা চায় মেয়ে। কত ছোট্ট একটা আবদার। অন্য বাড়ির মেয়েরা হয়তো নতুন জামা চায়, জুতো চায়, পুতুল চায়। আর তার মেয়ে চায় শুধু একজোড়া মোজা।  এ কথা ভাবতেই মতি মিয়ার চোখে পানি চলে এলো।

ঠিক এইসময় ভোরের আজান এর আওয়াজ এলো দূরের মসজিদ থেকে। মতি মিয়া উঠলো, ওজু করার জন্য । বাহিরে পুকুরের পানি বরফের মতো ঠান্ডা। হাত ডুবাতেই মনে হলো হাত জমে যাবে। তারপরও ওজু সারলো। তার দাঁত কটকট করছে। সারা শরীর কাঁপছে। নামাজ পড়লো ঘরের এক কোণায়। সেজদায় গিয়ে আল্লাহর কাছে চাইলো...

হে আল্লাহ, আমি গরিব মানুষ। কিছু পারি না। তুমি সব পারো। আমার মেয়েটাকে একজোড়া মোজা কিনে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দাও। আমাকে আজ কাজ দাও। যেন মেয়েকে একজোড়া মোজা কিনে দিতে পারি। নামাজ শেষে বসে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর উঠলো।

রাহেলা তখন জেগে উঠেছে। টুনি ঘুমাচ্ছে। রাহেলা আস্তে করে বলল, নামাজ পড়ে এলেন? 
হ্যাঁ।
আজ কোথায় যাবেন? 
শহরের দিকে যাই। দেখি কিছু একটা পাওয়া যায় কি না।
রাহেলা কিছু বলল না। জানে, কাজ পাওয়া কত কঠিন।

সকাল হলো। কুয়াশা একটু পাতলা হলো। টুনি জেগে উঠল। খুশি মনে বলল, বাবা, তুমি আজ আমার লাল মোজা কিনে আনবা তো?

মতি মিয়া মেয়ের মাথায় হাত বুলালো। হেসে বললো, আনব মা। তোর জন্য লাল মোজা আনব।

টুনি খুশিতে হাততালি দিল।

মতি মিয়া বেরিয়ে পড়লো। পকেটে মাত্র পনেরো টাকা আছে। জানেন না আজ কী হবে। কিন্তু মেয়েকে কথা দিয়েছে। সেই কথা রাখতেই হবে। যে করেই হোক......

Comments

    Please login to post comment. Login

  • Kazi Eshita 6 days ago

    This was a nice story

  • RIPON SHAIKE 1 week ago

    আমিও গল্পও লিখতে চাই কিভাবে লিখবো স্যার