Posts

গল্প

শুধু বড়লোক হলেই কী জীবন সফল?

March 5, 2026

Meherab Hossain Rudro

Original Author মেহেরাব হোসেন রুদ্র

59
View

আমাদের বর্তমান সমাজে এই রীতি চলে আসছে যেইভাবেই হোক বড়লোক হতেই হবে।অনেকে বড়লোক হতে গিয়ে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে নিজের জীবনকে।অর্থ সম্পত্তি সব ফেলে দিচ্ছে নদীর বুকে।আবার অনেকেতো এই ধারণা নিয়েও বসে আছে বড়লোক হতে পারলেই জীবন সফল।তাই যেই ভাবেই হোক বড়লোক হতেই হবে।বড় বড় কয়েকটা সুউচ্চ আকাশচুম্বি বহুতল বিশিষ্ট বাসা থাকবে,বিলাসবহুল গাড়ি থাকবে,দামি ফোন থাকবে,পকেটে কোটি কোটি টাকা সম্পত্তি থাকবে তাহলেই তো লোকে বলবে সেই সফল সেই বড়লোক তার দিকে চেয়ে বসে থাকবে যেন রাতের গভীর অন্ধকারেও প্রজাপতি ধরতে গিয়েছে।কিন্তু বড়লোক হলেই যে সে সফল এমন তা নয়।বরং সেই সফল যে সফলতার চিন্তাই রাতে ঘুমাতে পারে না,চিন্তা তাকে রাতে ঘুমাতে দেই না।এইখানে বড়লোক হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই এই সকল লোক সংস্কৃতি যা লোকে মুখেই প্রচার হবে যা বাস্তবে গ্রহণযোগ্যতা নেই।সফল তো সেই যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লক্ষকে বাস্তবায়নের জন্য দিন রাত এক করে দেই যেই লক্ষের দ্বারা সেই দেশ ও দশের কথা চিন্তা করতে যেয়ে নিজের শরীরের কথায় ভুলে যাই।টাকার পিছনে না ছুটে বরং সময়ের পিছনে ছুটে।তার লক্ষ বাস্তবায়নে কোন ক্ষুদা,ক্লান্তি তাকে পথ ছাড়া করতে পারে না।মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়েই সেই এ যুদ্ধক্ষেত্রে নামে যেইখানে সফলতা আসে শেষ জীবনে।সেই ক্লান্তি ক্ষুদা তাকে সফলতার আনন্দে সামিল হতে দেখতে ও সফলতার ঘ্রাণ ও স্বাদ অনুভব করতে তাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে না।নিচে এমনই কয়েকজন ব্যক্তিবর্গের নাম উল্লেখ করা হলো:

১. মহানবি হযরত মুহাম্মদ (সা:)

মানবজাতির ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব এবং ইসলামের শেষ নবী ও রাসুল মহানবি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনী প্রতিটি মানুষের জন্য এক উজ্জ্বল আদর্শ। হযরত মুহাম্মদ (সা.) ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে আরবের মক্কার কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন; তাঁর পিতার নাম আব্দুল্লাহ ও মাতার নাম আমিনা। জন্মের আগেই পিতাকে এবং শৈশবে মাতাকে হারিয়ে তিনি দাদা আব্দুল মুত্তালিব ও পরে চাচা আবু তালিবের কাছে বেড়ে ওঠেন। সততার জন্য 'আল-আমিন' উপাধি পাওয়া এই মহামানব ২৫ বছর বয়সে বিবি খাদিজা (রা.)-কে বিবাহ করেন এবং ৪০ বছর বয়সে হেরা গুহায় নবুয়ত লাভ করেন। এরপর দীর্ঘ ১৩ বছর মক্কায় তাওহীদের দাওয়াত দেওয়ার পর কাফিরদের নির্যাতনের মুখে ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদিনায় হিজরত করেন (যা থেকে হিজরি সনের গণনা শুরু হয়)। মদিনায় তিনি একটি আদর্শ রাষ্ট্র গঠন করেন এবং বদর, ওহুদ ও খন্দকের মতো যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে সত্য প্রতিষ্ঠা করেন। অবশেষে ৮ হিজরিতে বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয় করেন এবং ১০ হিজরিতে বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে ইসলাম পূর্ণাঙ্গ হওয়ার ঘোষণা দেন। ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে (১১ হিজরি) ৬৩ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন, রেখে যান পবিত্র কুরআন ও তাঁর সুন্নাহ যা কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য পথপ্রদর্শক।

২. আব্রাহাম লিংকন 

​যুক্তরাষ্ট্রের ১৬তম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের জীবন ছিল দারিদ্র্য আর সংগ্রামের গল্প। একটি সাধারণ কাঠের কুঁড়েঘরে তার জন্ম। ছোটবেলায় তাকে কঠোর কায়িক শ্রম করতে হতো এ।  ড়ার জন্য মাইলকে মাইল পথ হাঁটতেন। জীবনের অধিকাংশ সময় ব্যর্থতা আর অর্থকষ্টের সাথে লড়াই করেও তিনি দাসপ্রথা বিলুপ্ত করেন এবং ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

​৩. এ পি জে আবদুল কালাম

​ভারতের 'মিসাইল ম্যান' ও সাবেক রাষ্ট্রপতি কালামের শৈশব ছিল অভাবের। তার বাবা ছিলেন একজন সাধারণ নৌকাচালক। নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতে এবং পরিবারকে সাহায্য করতে ছোটবেলায় তিনি রেলস্টেশনে পত্রিকা বিক্রি করতেন। সেই সাধারণ বালকটিই পরবর্তীতে মহাকাশ বিজ্ঞান ও পরমাণু শক্তিতে ভারতকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান।

​৪. আলবার্ট আইনস্টাইন

​তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী আইনস্টাইনের শুরুর জীবন খুব একটা মসৃণ ছিল না। এক সময় তিনি বেকার ছিলেন এবং ছোটখাটো কাজ খুঁজে বেড়াতেন। আর্থিক টানাপোড়েন থাকা সত্ত্বেও তিনি তার গবেষণার কাজ থামাননি। তার অভাবী জীবনের সেই ধৈর্যই তাকে পরবর্তীকালে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের জনক এবং নোবেল বিজয়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

৫. জয়নুল আবেদিন

​তিনি বাংলাদেশের 'শিল্পাচার্য' বা শিল্পের শিক্ষক। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের করুণ ছবি এঁকে তিনি বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কোনো রকম বিলাসবহুল সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই তিনি চারুকলা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন এবং বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পকলার ভিত্তি স্থাপন করেন।

৬. স্যার ফজলে হাসান আবেদ
​তিনি বিশ্বের বৃহত্তম বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা BRAC-এর প্রতিষ্ঠাতা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের মানুষের সেবা করার জন্য তিনি ব্র্যাক প্রতিষ্ঠা করেন। তার দূরদর্শী নেতৃত্ব ও সেবামূলক কাজের জন্য তিনি নাইটহুডসহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক সম্মাননা পেয়েছেন। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে তার অবদান অতুলনীয়।
​৭. ড.মুহম্মদ ইউনুস
​শান্তিতে নোবেল জয়ী এবং গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি 'ক্ষুদ্রঋণ' ও 'সামাজিক ব্যবসা'র ধারণার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্য বিমোচনে বিপ্লব ঘটিয়েছেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার জীবন প্রমাণ করে যে, একটি নতুন ধারণা ও দৃঢ় সংকল্প বিশ্বকে বদলে দিতে পারে।

৮. মাদার তেরেসা 

​আলবেনিয়ায় জন্ম নেওয়া এই মহিয়সী নারী ত্যাগের মাধ্যমে সফলতার সংজ্ঞা বদলে দিয়েছেন। তিনি যখন কলকাতায় কাজ শুরু করেন, তখন তার কাছে কোনো অর্থ বা সম্পদ ছিল না। তিনি কেবল নিজের সেবার মানসিকতা দিয়ে বিশ্বের অন্যতম বড় সেবা প্রতিষ্ঠান 'মিশনারিজ অফ চ্যারিটি' গড়ে তোলেন এবং শান্তিতে নোবেল জয় করেন। তার কাছে সফলতা ছিল মানুষের চোখের জল মোছানো।

৯. নেলসন ম্যান্ডেলা 

​দক্ষিণ আফ্রিকার এই মহান নেতা বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে জীবনের ২৭ বছর জেলখানায় কাটিয়েছেন। তার কাছে কোনো রাজকীয় ক্ষমতা বা অর্থ ছিল না, ছিল শুধু আদর্শ। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট হন এবং বিশ্বজুড়ে শান্তি ও ক্ষমার প্রতীক হিসেবে পরিচিতি পান।

​১০. জে. কে. রাউলিং 

​বিখ্যাত 'হ্যারি পোর্টার' সিরিজের লেখিকা। হ্যারি পোর্টার লেখার আগে তিনি ছিলেন একজন ডিভোর্সি, বেকার এবং চরম দরিদ্র মা। তার বই ছাপানোর জন্য তিনি ১২ জন প্রকাশকের কাছে গিয়েছিলেন এবং সবাই তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। আজ তিনি বিশ্বের অন্যতম ধনী এবং সফল লেখিকা। তার জীবন শেখায় যে, বারবার ব্যর্থ হওয়ার মানেই শেষ নয়।

আরো অনেকের নাম রয়েছে যেমন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক,ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর,মার্টিন লুথার কিং,কাজী নজরুল ইসলাম,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,মাইকেল মধুসূদন দত্ত,সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত,আল মাহমুদ,অমর্ত্য সেন,সত্যেন্দ্রনাথ বসু,ইবনে সিনা,ইমাম আবু হানিফা (র.),আব্দুস সালাম,শেখ সাদি,আহমেদ জুয়েল ইত্যাদি।এই সকল ব্যক্তিবর্গের উদাহারণই বলে দেয় তারা বড়লোক হওয়ার জন্য নয় বরং বেঁছে নিয়েছিলেন নিজের লক্ষ অর্জনের পথকে।নিজের চিন্তা নয় বরং দেশ ও দশের চিন্তা করেই এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করেছেন।তাদের মনে বিন্দু মাত্র বড়লোক হয়ে ভোগ বিলাসের কোন ইচ্ছাই ছিলো না বরং জনগণের সুবিধা ও সেবাই ছিলো মূল উদ্দেশ্য।আবার এই ও অনেক মানুষ আছেন যারা মনে করেন গরিব হয়ে জন্মিয়েছি সফলতা নিয়ে কী করবো দু-চারদিনের জীবন অলসতা করে শুয়ে বসেই তো কাটিয়ে দেওয়া যায়।তাদের স্মরণ করা উচিত এই সকল ব্যক্তি/মনীষী দের কথা যারাও এক সময় দুই বেলা খাওয়ার জন্য সংগ্রাম করেছে রাস্তার আলোয় পড়াশুনা করেছে তাদের আজ বিশ্ব চিনে কারণ তাদের কর্ম,লক্ষ,পরিশ্রম,অধ্যবসায় বিশ্বকে চিনতে ও জানতে সাহায্য করেছে।তাদের কথা মেনে চলতে সাহায্য করেছে।তাই বলে কী টাকা উপার্জন করবো না?অবশ্যই টাকা উপার্জন করবেন তবে এই চিন্তা করে নই যে নিজে সেই টাকা অন্যের শ্রম কে চুষে ভোগ করবেন।বর্তমান পৃথিবীতে ভালো মতো চলতে গেলে টাকা উপার্জন জরুরি।তবে জনগণের কথা চিন্তা ও ভালোবাসা সম্মান শ্রদ্ধা টাকা উপার্জনের চেয়েও অনেক বেশি।সফলতা ও সম্মান কখনো টাকা দিয়ে কিনা যাইনা এইটি আপনাকে অর্জন করে নিতে হয়।হা সফল হওয়ার পর আপনার সম্মান আপনি টাকার মাধ্যমে বাড়াতে পারবেন কিন্তু আপনার দুনিয়া ত্যাগের পর আপনাকে কেও মনে রাখবে না।কত কত রাজা মহারাজা আছে সফলতার কথা চিন্তা না করে জনগণের কথা চিন্তা না করে দেশের কথা চিন্তা না করে শত শত বছর বেঁচেছেন তাও তাদেরকে নিয়ে কোন চর্চা নাই কিন্তু কবি শুকান্ত ভট্টাচার্য মাত্র ২১ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেও তার চর্চা আজও হয়।সফল হলেই আপনি বড়লোক হতে পারবেন কিন্তু বড়লোক হলেই যে আপনি সফল এই ধারণাটি যুক্তিহীন।যা শুধু লোকে মুখেই প্রচারিত।

প্রকৃত সফলতা অর্থ বা বিত্তে নয়, বরং প্রতিকূলতা জয় করে নিজের মেধা, সততা এবং কর্মের মাধ্যমে মানবকল্যাণে অবদান রাখার মধ্যেই নিহিত।

​সহজ কথায়: টাকা আপনার জীবনকে আরামদায়ক করতে পারে, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা এবং ইতিহাসে অমরত্ব কেবল আপনার আদর্শ ও ত্যাগই এনে দিতে পারে।

Comments

    Please login to post comment. Login