স্মৃতির পাতা উল্টালে কিছু শৈশব এমনভাবে ধরা দেয়, যা আজীবন অমলিন থাকে। আমাদের সেই দিনগুলো ছিল রূপকথার মতো। তখন আমরা ছিলাম চার মূর্তি—আমি (জাহিদ), আর আমার তিন চাচাতো ভাই মোহাম্মদ আলী, সুজন ও সিয়াম। আজ আপনাদের শোনাব আমাদের গ্রামের সেই রোমাঞ্চকর অভিযানের গল্প, যা শুরু হয়েছিল এক শীতের রাতে তবারকের সন্ধানে।
কদমতলীর ডাক ও অভিযানের শুরু
আমাদের গ্রাম তামাই থেকে পাশের গ্রাম কদমতলীর দূরত্ব খুব বেশি না হলেও ছোটদের জন্য তা ছিল দুর্গম পথের মতো। খবর এলো কদমতলীতে বড় এক মাহফিল হবে। আর মাহফিল মানেই তো শুধু ওয়াজ শোনা নয়, আমাদের প্রধান আকর্ষণ ছিল সেই কাঙ্ক্ষিত 'তবারক'। মোহাম্মদ আলী আমাদের মধ্যে বয়সে বড়, তাই সে-ই ছিল লিডার। সে গম্ভীর গলায় বলল, "আজ রাতে কদমতলীর তবারক না নিয়ে ফিরলে তামাইয়ের সম্মান থাকবে না!"
মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে এশার নামাজের পর আমরা চারজন বের হলাম। শীতের কুয়াশা ভেদ করে চার ভাই একে অপরের হাত ধরে মেঠো পথে পা বাড়ালাম। সিয়াম ছিল সবচেয়ে ছোট, ওর ভয় তাড়াতে আমরা বীরত্বের গল্প শোনাতে শোনাতে এগোতে লাগলাম।
তবারকের লড়াই
মাহফিল প্যান্ডেলে তখন তিল ধারণের জায়গা নেই। পেটে ক্ষুধা আর নাকে খাসির বিরিয়ানির সুবাস। আমরা চার ভাই প্যান্ডেলের এক কোণে চটের ওপর বসে আখেরি মোনাজাতের অপেক্ষা করতে লাগলাম। মোনাজাত শেষ হতেই শুরু হলো এক বিশাল বিশৃঙ্খলা। শত শত মানুষ তবারকের দিকে দৌড়াচ্ছে।
মোহাম্মদ আলী আমাদের সাবধান করে দিল, "কেউ কারও হাত ছাড়বি না!" ভিড়ের চাপে ছোট সিয়াম একবার কেঁদে ফেলল, বড় বড় মানুষগুলো আমাদের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু আমরা দমে যাইনি। অনেক যুদ্ধের পর যখন চারটা গরম বিরিয়ানির ঠোঙা হাতে পেলাম, তখন মনে হলো যেন বিশ্বজয় করেছি। প্যান্ডেলের এক কোণে বসে যখন সেই বিরিয়ানি মুখে তুললাম, সেই স্বাদের কাছে আজকের পঞ্চব্যঞ্জনও হার মানবে।
বিলের বিভীষিকা ও পথ হারানো
আসল রোমাঞ্চ শুরু হলো ফেরার পথে। রাত তখন গভীর, কুয়াশা এত ঘন যে হাত বাড়ালেই সাদা ধোঁয়া ছোঁয়া যায়। মেঠো পথ দিয়ে আসার সময় হঠাৎ সুজন থমকে দাঁড়াল। "আলী ভাই, ওই দেখ! বিলের মাঝখানে ওটা কী জ্বলছে?"
তাকিয়ে দেখি বিলের ধারে একটা নীলচে আলো দপদপ করছে। আমাদের দাদি বলতেন বিলের ধারে 'আলেয়া' থাকে যা মানুষকে ভুল পথে নিয়ে যায়। ভয়ে আমাদের হাত-পা হিম হয়ে গেল। দৌড়াতে শুরু করলাম আমরা, কিন্তু কুয়াশায় পথ হারিয়ে ফেললাম। গ্রামের পরিচিত পথগুলো সব অচেনা মনে হতে লাগল। সিয়াম ডুকরে কেঁদে উঠল, "আমি বাড়ি যাব! মা'র কাছে যাব!"
হঠাৎ অন্ধকারের ভেতর থেকে এক ছায়া এগিয়ে এল। ভয়ে আমরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরলাম। কিন্তু কাছে আসতেই দেখলাম তিনি একজন বয়স্ক জেলে। তিনি আমাদের পথ চিনিয়ে বড় রাস্তায় তুলে দিলেন। সেই বিপদে চার ভাইয়ের যে বন্ধন ফুটে উঠেছিল, তা ছিল আমাদের জীবনের প্রথম বড় শিক্ষা।
বাড়ির আঙিনায় দুরুদুরু বুক
রাত তখন প্রায় আড়াইটা। তামাই গ্রামের প্রতিটি ঘর অন্ধকার। আমরা চারজন পা টিপে টিপে বাড়িতে ঢুকলাম। কিন্তু সদর দরজায় আব্বাকে হাতে কঞ্চি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমাদের অবস্থা করুণ। "এতক্ষণ কোথায় ছিলি তোরা?" আব্বার ধমকে আমাদের তবারকের তৃপ্তি মুহূর্তেই উধাও।
সেই রাতে পিটুনি না জুটলেও মা'র চিন্তিত মুখ আর আব্বার কড়া শাসন আমাদের মনে করিয়ে দিল যে আমরা বড় অন্যায় করেছি। কিন্তু বিছানায় শুয়ে আমরা চার ভাই এক গোপন চুক্তি করলাম—কেউ যেন না জানে আমরা বিলের ধারে ভয় পেয়েছিলাম বা পথ হারিয়েছিলাম। ওটা ছিল আমাদের চারজনের গোপন বীরত্বগাথা।
এক অটুট বন্ধন
আজ আমরা বড় হয়েছি, জীবিকার প্রয়োজনে একেকজন একেক জায়গায় থাকি। এখন আর মাহফিলের তবারকের জন্য কয়েক মাইল হাঁটা হয় না। কিন্তু আজও যখন কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের রাত আসে, তখন চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই—চারটি ছোট ছেলে একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে কুয়াশার ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।
সেই তবারক আসলে শুধু খাবার ছিল না, ওটা ছিল আমাদের ভ্রাতৃত্বের সুতো। তামাইয়ের সেই ধুলোবালি আর কদমতলীর সেই রোমাঞ্চকর রাত আজও আমার কাছে জীবনের সেরা স্মৃতি।