[ডিসক্লেইমার: এই গল্পে চিত্রিত প্রভাবশালী চরিত্র ও ক্ষমতার অলিগলি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। মানুষের মনের গহীনের অন্ধকার ও জটিল প্রবৃত্তিগুলো বাস্তব হলেও, এখানকার চরিত্র, তাদের কর্মকাণ্ড এবং প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বাস্তবের কোনো ব্যক্তি বা স্থানের মিল নেই।]
বসন্তের ভর দুপুরে ছোট্ট স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টের ফ্লোরটায় দুই পা ছড়িয়ে বসে সুঁইয়ের নড়াচড়া নিয়ে ভীষণ পেরেশান হয়ে আছে স্নেহা। পেছনেই ল্যাপটপের ফোল্ডিং টেবিলের উপরে রাখা জেবিএল ফ্লিপ সেভেন পোর্টেবল ওয়্যারলেস স্পিকারে বাজতেছে উস্তাদ মেহদি হাসান-
আপ তো নাজদিক সে নাজদিক-তার আ তে গেয়ে
পেহ্লে দিল, ফির দিলরুবা, ফির দিল কে মেহ্মান হো গেয়ে
রাফতা রাফতা ও মেরি হাস্তি কা সামা হো গেয়ে…
কিন্তু এই গজলটার একটা সমস্যা এত বছরে এই প্রথম ও আবিষ্কার করলো, তাও আবার ঠিক এই মুহূর্তেই। এখন ওর বয়স চল্লিশ হলে মিনিমাম ত্রিশ বছর যাবত এই গজল শুনতেছে। অর্থাৎ দশ বছর বয়সে কিংবা নয় বছর বয়স পূর্ণ করার কয়েক মাস পর থেকেই হবে। আব্বার বিলাতি গ্রামোফোনেই প্রথম এই গজল শুনছিল। সন-তারিখ-ক্ষণ এখন আর মনে নাই যদিও; কিন্তু এতকাল কেন “প্যায়ার যাব হাদ সে বাড়হা, সারে তাকাল্লুফ মিট গেয়ে” লাইনটারে ওর সমস্যা মনে হয় নাই? এই ভাবনা ভাবতে গিয়ে আরো কিছুক্ষণ সুঁই-লাইটারের মিস্ত্রিগীরি বন্ধ রাখতে হইতেছে।
মিষ্টিমুখ করার পথে এতসব যান্ত্রিক ত্রুটি সত্যিই অসহনীয়! এরমধ্যে উস্তাদের এই মিষ্টি লাইনটা ঠিক কী পরিমাণ যে একটা তিতা ভাব দিতেছে এই মুহূর্তে, তা নিয়ে মোটামোটি ‘মি ভার্সেস মি’ টাইটেলে একটা বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যাবে। হালকা রি-ওয়াইন্ড করে আবারও লাইনগুলাতে মনোযোগ দেওয়ার পর ওর মনে হলো- নাহ! ঠিকই আছে অবশ্য; গানে-গজলে, গল্প-নভেলে আর সিনেমার পর্দায় এইসব মিঠা মিঠা প্রেম কাহিনী থাকতেই পারে, এইগুলা তো আর বাস্তব না আসলে! সেই তুলনায় কবিতাকে ওর কিছুটা বাস্তব আর গ্রহণযোগ্য মনে হয়। কবিতাগুলা সব কবিদের মতোই- চিরদুঃখী!
'তাকাল্লুফ’ শব্দটা বিনা কারণেই কয়েকবার জোরে জোরে উচ্চারণ করলো ও। বেশ মজার শব্দ! উচ্চারণে একটা আভিজাত্যের ভাব আছে। এই একলা ফ্ল্যাটে নিজেই নিজের শিক্ষক, নিজেই নিজের শিক্ষার্থী হয়ে একা একা কথা চালিয়ে যাইতেছে স্নেহা। ‘তাকাল্লুফ’ বলতে বলতে ওর মনে হলো- উর্দু কী মিষ্টি একটা ভাষা! শুধু রাজনৈতিক কারণে এই ভাষাটাকে এ দেশের অনেক মানুষ না বুঝেই কটাক্ষ করে। অথচ উর্দুর শব্দের ভাণ্ডার কত সমৃদ্ধ! এক প্রেমকেই যে উর্দুতে কত নামে ডাকে- ইশক, পেয়্যার, মোহাব্বাত, উলফাত, চাহাত, আশিকি, জুনুন, দিলবারি, দিললাগি…আর না জানি কত কী! এখানেও কাহিনী আছে, ওর মনে পড়ে। কোনো একটা লেখায় একবার পড়ছিল- এই সবগুলা শব্দে ভালোবাসা বোঝায় ঠিকই; কিন্তু এদের মধ্যেও আবার আলাদা আলাদা স্তর আছে। পেয়্যারে যেই ভালোবাসা বোঝায়, ইশক বা জুনুনে একই ভালোবাসা বোঝায় না!
ভালোবাসারও রকম ফের আছে! সেইগুলা প্রকাশের জন্য আছে আবার আলাদা আলাদা শব্দও। ভাবা যায় এইগুলা?- মাথা চুলকাতে চুলকাতে ও বিড় বিড় করে। এই কয়দিনে প্রচুর সাদা চুল আগাছার মতো মাথার আনাচে-কানাচে আবির্ভূত হওয়ায় হঠাৎ হঠাৎই যখন-তখন চুলকানোর উপদ্রব শুরু হইছে। বেশ বিরক্তিকর একটা ব্যাপারই এটা। যদিও ওর জীবনে এই মুহূর্তে সহনীয় ব্যাপার কী আছে- এটা মনে করতে গিয়ে হাসির ছলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলার ট্রাই করলো ও, তাও ঠিকঠাক বের হলো না ভেতর থেকে। শালার কপাল! একলা এই ফ্ল্যাটে চিৎকার করেই ও বলে উঠে- এসনেএএহা; দেখো, তোমার দীর্ঘশ্বাসরাও তোমার সঙ্গে বিট্রে করতেছে! ই-উ-জ-লে-স! কিন্তু খালি ফ্ল্যাটের অলমোস্ট খালি এই রুমটার দেয়ালে বাড়ি খেয়ে ওর ওই চিৎকার নিজের কানেই বাউন্স ব্যাক করে। গমগম করে ফিরে আসা শব্দে ওর খেয়াল হয়- নিজেকে স্নেহা না ডেকে, এসনেএএহা ডাকতেছিল ও।
ছোটবেলায় ওদের বাড়িতে একজন মেইড ছিলেন- স্বপনের মা বুয়া। যদিও তার আসল নাম ছিল ফিরোজা। উনার গলায় একটা রূপার চেইনের মাঝখানে ঝুলানো লকেটে ‘ফিরোজা’ নামটা লেখা ছিল, ওর মনে আছে এখনো। তখন মাত্র স্নেহার অক্ষর জ্ঞান হইতেছিল সম্ভবত। উনার কোলে উঠলেই লকেটটা খুলে ও বানান করে পড়তো- ফ রশ্শো ই ফি, র ও-কার রো, বর্গীয় জ আকার- জা… ফি-রো-জা! উনার একমাত্র ছেলের নামই স্বপন। মানে, উনি তার ছেলেকে এই নামেই সবার কাছে পরিচয় করাতেন। নিজেকে পরিচয় করাতে পছন্দ করতেন- ‘স্বপনের মাও’ বলে। ময়মনসিংহ-কাওরাইদ অঞ্চলের মানুষ সম্ভবত মাকে ‘মাও’ বলে ডাকতেই অভ্যস্ত ছিল এক সময়। নাকি এখনো ডাকে? এ বিষয়ে ওর তেমন একটা জ্ঞান নাই যদিও। তবে ফিরোজা বুয়া খুব গর্বের সঙ্গেই নিজেকে ‘স্বপনের মাও’ বলতেন। ওই পরিচয়ের মধ্যে উনার একটা অন্য রকম তৃপ্তি বোধ ছিল।
ছেলের নামও উনিই রাখছিলেন। প্রেগনেন্ট থাকা অবস্থায় স্বপনের আব্বা উনাকে ফেলে চলে যান। পরে ওই লোক নাকি ব্যাক টু ব্যাক আরো দুইটা বিয়েও করছেন। ওই দুই বউ আর তাদের ছেলে-মেয়েদের নিয়ে একই গ্রামে থাকলেও, ফিরোজা বুয়া বা স্বপনের কোনো খোঁজখবরই উনি রাখেন নাই। ভরণপোষণ দেওয়া তো দূর, স্বপনকে নিজের ছেলে পরিচয় দিতেও কমফোর্টেবল ছিলেন না উনি। এই স্বপন যখন স্নেহার নানাজানের মাদ্রাসায় দাখিল পাশ দিলেন, তখন থেকে সে নিজেকে পরিচয় করাতেন শামীম নামে। স্বপন বলে ডাকলে উনার মুখমণ্ডলে প্রচণ্ড বিরক্তি ভাব ফুটে উঠতো। স্নেহাকেও কিছুদিন উনি কায়দা পড়াইছেন, সেই সূত্রে তাকে ডাকতে হতো- শামীম হুজুর। ভুলেও যদি কোনোদিন স্বপন হুজুর ডেকে ফেলতো, আকাশের সব মেঘ এসে উনার চেহারায় ভিড় জমাতে দেখা যেত।
এই রহস্য স্নেহা উন্মোচন করতে পারছে বড় হয়ে। স্বপন নামটা সংস্কৃত শব্দ ‘স্বপ্ন’ থেকে আসছে। এর অর্থও তেমন একটা সুবিধার না। সব স্বপ্ন যে ভালো হবে, এর কোনো গ্যারান্টি নাই। অহরহ খারাপ খারাপ স্বপ্নের নজির আছে দুনিয়ায়। অন্যদিকে, শামীম শব্দটা আসছে আরবী থেকে, ফার্সিতেও এই শব্দ বহুল প্রচলিত। এর অর্থ হইতেছে- ‘সুবাস’ বা ‘সুগন্ধী’, তাও আবার এই নামের মাধ্যমে সম্ভবত ‘পবিত্র সুবাস’ই বোঝানো হয়। দাখিল পড়াকালীন সময় স্বপন ওরফে শামীম হুজুরকে মাদ্রাসার কোনো বড় হুজুর হয়তো এই দুই নামের বুৎপত্তি স্থল এবং অর্থ বুঝাইয়া ‘স্বপন’ নামটা ত্যাগ করতে উদ্বুদ্ব করতে পারছিলেন। নিশ্চয় মায়ের দেওয়া নামের চেয়ে ধর্মের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বড়- স্নেহা ভাবে!
সেই স্বপন অথবা শামীম হুজুরের আম্মা স্নেহাকে ডাকতেন ‘এসনেএএহা’ বলে। তাও আবার ‘এস’ বলার পর ‘হা’ এর আগে ‘নে’ তে উনি দুই আলিফ টান দিতেন। এমন ঘোর অমাবস্যাকালে উনার কথা খুব মনে পড়লো ওর। নাম ঠিকমতো উচ্চারণ করতে না পারলেও উনি প্রচণ্ড আদরই করতেন স্নেহাকে। মানুষ তো এমনই, আদরের কাঙ্গাল! যেখানেই মায়া-মমতা পায়, ঋণী হয়ে থাকে। চোখ বুঁজে, ফিরোজা বুয়ার জন্য ও আল্লাহর কাছে দোয়া চাইলো দুই হাত জড়ো করে- হে খোদা, ফিরোজা বুয়া আমাকে যেমনভাবে ছোটবেলায় স্নেহ-মমতা দিয়ে আগলাইয়া রাখছিলেন, তুমি তাকে তেমন মমতায় সুরক্ষিত রাইখো। আমিন।
দোয়া-প্রার্থনা শেষে আবার সুঁই-লাইটারের কারিগরিতে মশগুল হওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে স্নেহার মনে হলো- কেমন যেন একটা বিশ্রীরকম বিষণ্ণতা চারপাশ থেকে ওকে জাপটে ধরে আছে। দুনিয়ার সবাই ছেড়ে গেলেও, এই দুঃখ আর বিষণ্ণতা বোধ কোনোভাবেই ছাড়তেছে না ওকে। "বিংশ শতাব্দীতে নাকি মানুষের শোকের আয়ু বড় জোর এক বছর”- এমনটাই তো লিখছিলেন নাজিম হিকমত। কবিরা অবশ্য আবেগে অনেক ভুলভাল লেখেন। কবিদের সব আবেগ কিংবা সব লেখাকে এত সিরিয়াসলি নেওয়ার কিছু দেখে না ও। এখন অবশ্য একবিংশ শতাব্দী চলতেছে। শোকের আয়ু কি কিছুটা বাড়লো? হিসাবে তো কমার কথা আসলে।
দশ টাকার লাইটারের ফুটায় সুঁই সেট করতে ব্যর্থ হয়ে বিশ টাকার লাইটারের সঙ্গে কারিগরি শিক্ষার পরীক্ষা দিতে যাবে ভাবতেই ভিকি কৌশলের মাসান সিনেমার কথা মনে পড়লো ওর। অ্যাক্সিডেন্টে প্রেমিকা মারা যাওয়ার পর প্রচণ্ড দুঃখ আর যন্ত্রণায় বন্ধুদের সঙ্গে নৌকার উপর মদ্যপান করতে করতে ভিকি বলতেছিলেন- “শালা, এ দুখ কাহে খাতাম নেহি হোতা বে?” স্নেহার সিলেবাসে এই ডায়লগ কমন পড়ছে। দুনিয়ার সব বিষয় তো আর সবার জীবনের সিলেবাসে কমন পড়বে না।
মাসানের ওই অকালে প্রেমিকা হারানো প্রেমিকের দুঃখের মতোই ওর দুঃখও অফুরন্ত, শেষই হইতেছে না কিছুতেই! ফলে উস্তাদজি যখন গাইতেছেন, “পেয়্যার যাব হাদ সে বাড়হা, সারে তাকাল্লুফ মিট গেয়ে”, ওর তখন ভাবনায় আসলো- এই লাইনে তো প্রেম চরমে পৌঁছাইলে আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজনীয়তা ফুরানোর কথা বলা হইছে আসলে। ‘তাকাল্লুফ’ বলতে এখানে জড়তাকে বোঝানো হইছে, যা মূলত প্রেম প্রেম বোধ হওয়ার সময়ই শুধু দৃশ্যমান থাকে। প্রেমটা দুই তরফ থেকে কনফার্ম হয়ে গেলেই আর এইসবের বালাই থাকে না। তখন চলে শুধু অভিযোগ করা আর অভিযুক্ত হওয়ার সিলসিলা। কিন্তু দুনিয়ার সব পেয়্যার হাদ সে বাড়লে কি একই রকম ঘটনা ঘটে, উস্তাদজি? সিলেবাস কমন পড়ে নাই!
আরো কত কথা যে মনে আসতেছে এই এক গজলের লাইন থেকে; এই যেমন- এই দুনিয়ায় যেটাকে পেয়্যার বলে, কয়জনই বা তা এক্সপেরিয়েন্স করছে ঠিকঠাক? অধিকাংশ ভালোলাগা, প্রেম বা ভালোবাসাই তো ‘একতরফা দাখিলা পদ্ধতি’র মতো অসম্পূর্ণ। অবশ্য এটা এক হিসাবে ভালো; কখনোই না পাওয়ার বেদনার চেয়ে পেয়ে হারানোর কষ্ট তুলনামূলকভাবে বেশি যন্ত্রণার। মিষ্টির দুনিয়ায় প্রবেশ করলে এই এক প্যারা! কত কত যে ভাবনা মাথায় গিজ গিজ করে! কত প্রশ্ন! প্রশ্নের ভেতর আবার গুটি কয়েক এমবেডেড প্রশ্ন! এতসব সওয়াল-জবাব, গজল-কবিতা-গান-সিনেমা-ফিলোসফি কপচানোর পরও মাসানের ওই ভিকি কৌশলের ক্যারেক্টারটার মতো ওর দুঃখও কোনোভাবেই শেষ হইতেছে না।
মুড ভালো থাকলে অথবা নরমাল সময়ে উস্তাদের এই গজলের সঙ্গে স্নেহা নিজেও গলা মেলানো শুরু করতো এতক্ষণে। এই গজল বহু আগে থেকে পছন্দের হলেও একেকটা লাইন এখন বিষের মতো লাগতেছে। নিজের ধৈর্য্য পরীক্ষা করতেই কি না কে জানে, পুরা গজলটা ও শুনে যাইতেছে গভীর মনোযোগে! গত ত্রিশ বছর বা এর কাছাকাছি সময় ধরে শুধু শোনার খাতিরেই যেন শুনে আসতেছিল, আজকে এর পুঙ্খানুপুঙ্খ সন্ধি বিচ্ছেদ করেই ছাড়বে! দুই-একবার ‘রিপিট’ বাটনে চাপ দিয়ে যতক্ষণ কলিজা পুড়তে পুড়তে আর পোড়া ভাবটা টের পাওয়া যাবে না; ঠিক ততক্ষণ পর্যন্তই শুনতে মন চাইলো, কিন্তু এরমধ্যেই আসতেছে আবরারের কল। এখন কাউন্সেলিংয়ের সেশনে বসে থেরাপিস্টের জ্ঞান-গর্ভ উপদেশ শোনার মতো অবস্থা ওর কোনোভাবেই নাই।
লাইটার থেকে বারবার সুঁই লাফ দিয়ে কই কই যে পড়তেছে, দুই দুইটা লাইট জ্বালিয়ে রাখতে হইছিল আনমোল এই রতন খোঁজার জন্যে। মুখের সঙ্গে সঙ্গে কাঁপাকাঁপি শুরু হইছে ডান হাতটাও। হোক, সব ধ্বংস হয়ে যাক! আর কী বাকি আছে ধ্বংস হওয়ার- স্নেহা ভাবে! একটা সময় নিজেকে এমন দুর্বল অবস্থায় দেখতে ওর প্রচণ্ড ঘৃণা লাগতো। এখনকার বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন। ভেতর থেকে এখন ও পুরাটাই ৯/১১ এর টুইন টাওয়ারের মতো ধ্বংসাবশেষ! যদিও ওইখানে নাকি ওয়ান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার না কী যেন নামে ইউএসএ-এর সবচেয়ে উঁচু ভবন বানানো হইছে পরে। ফ্রিডম টাওয়ার নামে এর আবার নিকনেমও আছে!
শালা; ভালোবেসে-আদর করে, কিংবা অবজ্ঞাতেও তো কেউ ওকে বিশেষ কোনো নামে ডাকলো না কোনোদিন- স্নেহা ভাবে! অথচ একটা জড় পদার্থেরও নিকনেম থাকে! নিজেকে এই মুহূর্তে একটা জড় পদার্থের চেয়েও বড় অপদার্থ মনে হইতেছে ওর! টাকা থাকলে মানুষ কত কী করে দুনিয়ায়, স্নেহা সুঁই খুঁজতে খুঁজতে ভাবে। টাকায় খালি মানুষ পাওয়া যায় না; নাহ, যায় মনে হয়! পিকি ব্লাইন্ডার্সে টমি শেলবি তার প্রেমিকাকে একটা ডায়লগ দেয় না? “এভ্রিওয়ান ইজ হোর, গ্রেস। উই জাস্ট সেল ডিফরেন্ট পার্টস অব আওয়ারসেলভ্স।” জীবনের সিলেবাসে আবার কিছু একটা কমন পড়ার আনন্দ সুঁই খুঁজে না পাওয়ার বেদনাটাকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য ভুলাইয়া দিলো। ওই আনন্দের মধ্যেই হঠাৎ ও চিৎকার করে- জ্বি মুহতারমা, আপনি নিজেও এক প্রকার বেশ্যা! জীবনে নিজের কিছু না কিছু তো ও অবশ্যই বেচছে! মস্তিষ্কে খুব একটা চাপ প্রয়োগ করার আগেই মনে পড়ে- আত্মমর্যাদা! যাহ! ও তো তাইলে ‘দ্য কুইন অব বেশ্যা’!
মন খারাপ থাকলে বসুন্ধরার এই ছোট্ট আপ্যার্টমেন্টে ও নিজের মতো কিছু সময় কাটাতে আসে। আজকে খুব ভোরেই চলে আসছিল। বাদবাকি দিন এটা তালাবদ্ধই থাকে। একটা সময় স্নেহা একা থাকতেই পছন্দ করতো; ইন ফ্যাক্ট, একাই তো থাকতো আসলে। জীবনের একটা বিশাল সময় নিজের মতো একা ফ্ল্যাটে, একাই নিজের সঙ্গে ও সংসার করছে। যেহেতু সবার কপালে সব থাকে না, ওর কপালে যে কারো সঙ্গে যৌথ সংসার লেখা নাই- এটা বহু আগেই ও মেনে নিছে। যদিও কারো সঙ্গে সংসার করতে যে খুব মন চাইছে কখনো, এমনও না। তবে হঠাৎ হঠাৎই কেমন যেন বিশ্রী রকম নিঃসঙ্গ লাগে; কেমন যেন সব ফাঁকা ফাঁকা, কেমন একটা তীব্র-গাঢ় শূন্যতা বোধ। নিজের সঙ্গ উপভোগ করতে না পারলে ওই নিঃসঙ্গতা বোধই জোঁকের মতো ওর মনের ভেতর ঢুকে ঘাপটি মেরে বসে থাকে। তখনই শুরু হয় অস্থিরতা, নাইলে প্রচণ্ড এক বিষণ্ণতায় অনবরত ও ডুবতে থাকে তীব্র অন্ধকারাচ্ছন্ন গভীর এক গহ্বরে।
আবির জীবনে আসার আগ পর্যন্ত এমন নিঃসঙ্গতা বোধে স্নেহা কখনো ভুগছে বলে দূর-দূরান্তের স্মৃতি ঘেটেও ওর মনে পড়ে না। কাজ; অফিস শেষে কলিগদের সঙ্গে আড্ডা, সন্ধ্যায় এক ঘণ্টা ইভিনিং ওয়াক, বাসায় ফিরে গাছেদের সঙ্গে খুনসুটি আর আলাপচারিতা, গান শোনা, বই পড়া, লেখালেখি…এরমধ্যেই চট জলদি ডিনারের জন্য কোনো ডিশ রেডি করতে করতেই রাকিনের সঙ্গে ফোনে গ্যাজানো। ফোন লাউড স্পিকারে রেখে ডিনার শেষ করা, তারপর আর্লি টু বেড- এই ছিল ওর কর্মব্যস্ত দিনগুলার রুটিন।
উইকেন্ডে কখনো রাকিন অথবা মিতা আপার সঙ্গে গ্লোরিয়া জিন্সের আড্ডায়, নাহলে বাসায় শুয়ে-বসে কোনো সিরিজ বা মুভি দেখতে দেখতে বেশ সুন্দর সময়ই পার হয়ে যেত। এইসবের ফাঁকেই টুক টুক করে সারা সপ্তাহে জমানো ঘরের কাজগুলাও ও সেরে ফেলতো। এরপর ডিনারে কোনো না কোনো স্পেশাল ডিশ বানাতো নিজেকে স্পেশাল ট্রিট দিতে। লাইফ ছিল একদম বিন্দাস! এর বাইরে আর কোনো প্যারাই ছিল না ওর জীবনে।
নিজের নাক এমনিও খুব একটা কোনোকিছুতে গলাতো না ও, বরং একা থাকতে শুরু করার বছর দুয়েক আগে থেকে ফ্যামিলি বিষয়ক প্যারাতে মাথা ঘামানোটাও আলহামদুলিল্লাহ ছাড়তে পারছিল। সবকিছু থেকে নিজেকে এবং সবকিছুকে নিজের থেকে একটা সম্মানজনক দূরত্বে অবস্থান করানোই শান্তিপূর্ণ মনে হইতেছিল ওর। শান্তিতে আসলেই ছিল কি না, সেটা হয়তো শিওর বলতে পারবে না; তবে একটা পূর্ণতা যে ছিল জীবনে- এই বিষয়ে ও মোটামোটি নিশ্চিতই। আত্মা আর হৃদয়টা নিজ নিজ স্থানেই ছিল হয়তো তখন, এখন তাদের স্থানচ্যুতি ঘটছে। তিলে তিলে বহু বছর যাবত ধরে গড়া ওর শক্ত খোলসটা পুরাপুরি চুরমার হয়ে গেছে আবিরের সঙ্গে পরিচয়ে।
একা ফ্ল্যাটে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর যে মানুষ নিজের মতো মহানন্দে একা একাই জীবন কাটিয়ে আসতেছিল, তার এখন বেশিক্ষণ একা থাকতে দমবন্ধ লাগে। নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস এতটাই নষ্ট হইছে, ঘণ্টা খানিক একা থাকলেও ওর মনে হয়- এই বুঝি নিজের কোনো ক্ষতি করে বসবে এখনই! অথচ আবির যদি ওই আড়াইটা দিন একটানা একসঙ্গে না কাটাতো গত বছর, একাকীত্বের এই বিশ্রী অনুভূতি এতটা কাবু করার ক্ষমতা রাখতো বলে ওর মনে হয় না।
এর মানে যে স্নেহা ওর জীবনের সব সমস্যার মূল আবিরকেই মনে করে, এমন না ব্যাপারটা! রাগ করে ও যা খুশিই বলুক না কেন, ও তো আসলে এটাও জানে- নিজে না চাইলে কাউকেই অন্য কেউ ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে না, করতে পারেও না। ইদানিং ওর মনে হয়- নিজের ধ্বংসের সহযাত্রী হিসেবে আবিরকে সম্ভবত ও একটু বেশিই পছন্দ করে ফেলছিল। সমস্যা তো তাইলে ওর নিজের সিলেকশনেই, অন্যের ঘরের ময়লা ঘেটে আর লাভ কী!
গত বছর আবিরকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে বাসায় ফেরার পর, জীবনে প্রথমবারের মতো স্নেহা তীব্র এক মহাশূন্যতা বোধ অনুভব করে। বাড়ির মেইন ডোরের লক খুলে ঘরে ঢুকতেই সমস্ত কিছু ফাঁকা ফাঁকা লাগা শুরু হয় ওর। ১২০০ স্কয়ার ফিটের ওই বাসার প্রতিটা রুমে ঘুরতে ঘুরতে বারবার ও বিড়বিড় করে একই কথাই বলতেছিল কেবল-
আমার এ ঘর সমস্তটাই ফাঁকা
সহসা মৃত্যু চুমু খায় কপালে;
ইচ্ছে হলে ঘুরে যেও, ফিরে এসো
আমার পৃথিবী অস্থিরতায় স্থির…
ওই রাতে আবিরকে ড্রপ করে কিছুটা সময় ও এয়ারপোর্টের পার্কিংয়েই বসে থাকে। এর আগের দুই দিনে বুকিং দেওয়া ছয়টা ফ্লাইট আর দুইটা বাসের টিকেটের মধ্যে কোনোটা আবির মিস করছে; কোনোটা ক্যান্সেল করতে সায় দিছে, কোনো কোনোটা আবার নিজের ইচ্ছাতেই ক্যান্সেল করছে। ওইটা ছিল ওর সাত নম্বর ফ্লাইট, ওই রাতে রাজশাহী যাওয়ার শেষ ফ্লাইটও।
ইলেভেন্থ আওয়ার পর্যন্ত ওই ফ্লাইটটাও অলমোস্ট মিস হবে বলেই মনে হইতেছিল ওদের। শেষমেশ রিজেন্সির সামনে জ্যামে বসে নভো এয়ারের অফিসে কল করে আবির। বাধ্য হয়েই ফোনে নিজের পরিচয় দিতে হয় ওর। যেভাবেই হোক, রাতেই ইমার্জেন্সি রাজশাহী ফিরতে হবে জানিয়ে ফ্লাইটটা আধা ঘণ্টা ডিলে করাতে রিকোয়েস্ট করে। এছাড়া আর উপায়ও ছিল না আসলে। পরদিন সকালে হেডকোয়ার্টার থেকে ওদের ওয়ার্ক স্টেশন ভিজিট করতে যাওয়ার কথা ছিল চিফের। এর আগে ও রাজশাহী পৌঁছাতে না পারলে বিরাট কেলেঙ্কারি ঘটার সম্ভাবনা ছিল!
বাই এনি চান্স ওই ফ্লাইটটাও যদি মিস হয়ে যায়, এর বিকল্প ব্যবস্থাও জ্যামে বসে ভেবে রাখছিল স্নেহা। ঢাকায় যেহেতু ওই কয়দিন আবির ওর সঙ্গেই ছিল, তাই সহী সালামত ওকে ডেসটিনেশনে পৌঁছানো ও নিজের দায়িত্ব বলেই মনে করতেছিল। এখানে ইশক-মোহাব্বতের রেফারেন্স বেহুদা না টানলেও চলে বলে ওর মত। যেকোনো অতিথির জন্য এইটুকু দায়িত্বপালনকে ও নিজের কর্তব্য হিসাবেই গণ্য করে। তাই বলে যে স্নেহা শিষ্টাচার বিষয়ক বিরাট আলেম, তেমনটা ভাবার মতো কারণ নাই যদিও; কিন্তু যতটুকু না থাকলেই না, ওইটুকু ওর সবসময়ই ছিল- এমনটাই ও বিশ্বাস করতো এত দিন! এখন অবশ্য ওর ঈমান নড়বড়ে হয়ে পড়ছে নানা কারণে।
ফ্লাইটের বিকল্প হিসাবে বাই রোডে রাজশাহী যাওয়ার পরিকল্পনা আবিরকে ইনফর্ম না করেই ও ঠিক করে রাখে। সবকিছুতেই আবিরের অস্থিরতা। সমাধান না খুঁজে ও শুধু সমস্যার সম্ভাবনা আর সমস্যা কত প্রকার এবং কী কী- এসবই বারবার রিপিট করতে থাকে। নিজেও তাতে অস্থির হয়, আশেপাশের মানুষকেও অস্থির করে তোলে। গাড়িতে বসে ও চুক চুক করে একবার মামের বোতল থেকে হুইস্কি গিলতেছিল, আরেকবার দাঁত দিয়ে নখ কামড়াতে কামড়াতে বলতেছিল- স্নেহা! আই হ্যাভ টু গো বাই টুনাইট! দে উইল কিক ইন মাই অ্যাস্, নো ডাউট! প্যানিকড হয়ে অ্যাংজাইটিতে একই কথাই ও রিপিট করতেছিল বারবার।
স্নেহা তাতে বিন্দুমাত্র মনোযোগ বা পাত্তা না দিয়ে ওর এক অফিস কলিগকে কল করে যেভাবেই হোক কিছুক্ষণের মধ্যেই ইমার্জেন্সি একটা গাড়ি ম্যানেজ রাখতে বলে। ফ্লাইট কোনো কারণে মিস হলেও ওরা যেন ঘণ্টা খানিকের মধ্যেই বাই রোডে রাজশাহী রওনা হতে পারে- বিষয়টার আর্জেন্সি আর গুরুত্ব ভালোমতো ব্রিফ করে কল কাটলেও, একটু পর পরই টেক্সট পাঠিয়ে গাড়ি পাওয়া গেল কি না, আপডেট নিতে থাকে। আবির ওর মুখের দিকে তখন ফ্যাল ফ্যাল করে কতক্ষণ তাকিয়ে কী দেখলো বা ভাবলো, কে জানে! অবশ্য ওই মুহূর্তে ওইটা বোঝার প্রয়োজনীয়তা আছে বলে স্নেহার মনে হলো না। ভোরের আগেই আবিরকে যেভাবেই হোক রাজশাহী পৌঁছাতে হবে, ওইটাই ছিল তখন ওর একমাত্র কনসার্ন।
যদি শেষ পর্যন্ত বাই রোডেই যাওয়া লাগে, আবিরকে রাজশাহীতে ড্রপ করে ওই গাড়িতেই আবার ঢাকায় ব্যাক করবে, মনে মনে তাও স্নেহা ঠিক করে ফেলছিল। কিন্তু এইসবের কোনোকিছুরই আর প্রয়োজন হয় নাই। ফ্লাইটটা আবিরের জন্য আধা ঘণ্টা ডিলে করানো হইছিল। ভিআইপি বা ভিভিআইপি ছাড়া অন্য সাধারণ প্যাসেঞ্জারের জন্য কোনো এয়ারলাইনসই এইভাবে ফ্লাইট ডিলে করতো বলে মনে হয় না। আবিরকে এর আগে কখনোই কোথাও নিজের পরিচয় দিতে দেখে নাই স্নেহা। অবশ্য বারের বাইরে কয়বারই বা ওদের দেখা হইছে অন্য কোথাও? এটা ভাবলে আবিরের ওপর হালকা রাগ উঠে ওর। সবসময় অবশ্য রাগটা দেখানো যায় না। দেখালেও যে খুব একটা লাভ হবে, তেমনটা মনে হয় নাই বলেই পারতপক্ষে না দেখানোর চেষ্টাটাই করে গেছে অধিকাংশ সময়।
কী যেন একটা গান আছে না রবীন্দ্রনাথের? মনে করার চেষ্টা করে…ওহ! “আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ…”। আবিরের জন্য এর প্যারোডি হতে পারে- “আমার এই মদ খাওয়াতেই আনন্দ…!” এই আনন্দকে বাধাগ্রস্ত করবে, সেই সাধ্য কি স্নেহার ছিল? আবির মনে করে- দুইটা বছর ও একাই মনে হয় ভয়ের মধ্যে থেকে জীবন কাটাইছে। অন্যদিকে স্নেহার নিজেকে মনে হয়- ও হলো নদীর ওইপারটা, দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে যে নিজের ভেতরে থাকা হারানোর ভয়টাকে ক্রমাগত লুকানোর চেষ্টা করে যাইতেছিল। কিন্তু অনবরত ওই লুকানোর প্রচেষ্টায় একটা সামান্য ভয়ের ক্ষুদ্র কণা বিশালাকৃতির নিউক্লিয়ার বোমায় পরিণত হলো শেষ পর্যন্ত। ফলাফল- বুউউউউউউউউউম! দুই পারেই এখন ঘুটঘুটে অন্ধকার!
ফ্লাইটে উঠার আগ পর্যন্ত স্নেহাকে এয়ারপোর্টের পার্কিংয়ে অপেক্ষা করতে বলে টার্মিনালের ভেতরে ঢুকছিল আবির। ও আশঙ্কা করতেছিল, ওই ফ্লাইটটাও মিস হতে পারে। সেইক্ষেত্রে স্নেহাই তখন ওর একমাত্র পরিত্রাণদাতা। অবশ্য আবির না বললেও ফ্লাইট ছাড়ার আগ পর্যন্ত ও এমনিতেও বাইরে অপেক্ষা করতো। “তুই তো গল্পের নায়িকা, তুই কেন নায়কের পার্টে অভিনয় করতেছিস”- স্নেহার এইসব স্বভাবের জন্য রাকিন প্রায়ই এই ডায়লগ দিয়ে ওর লেগ পুল করার ট্রাই করে। যদিও ওর এইসব কথা খুব একটা গায়ে মাখে না স্নেহা। তবে হাসির একটা আবহ তৈরি করার জন্য মাঝে মাঝে ও নিজেই আবিরকে দুষ্টুমি করে বলতো- তুমি তো অন্যের আমানত; তোমাকে সুরক্ষিত রাখা আমার রেসপনসিবিলিটি, সহিসালামত ডেসটিনেশনে পৌঁছে দেওয়াও। ইভেন যতক্ষণ তুমি আমার সঙ্গে আছো, ততক্ষণ তোমাকে প্রটেক্ট করার দায়িত্বও আমারই। আমানতের খেয়ানত করা উচিত না! কিন্তু প্রতিবারই হাসির আবহ তৈরিতে ওর ব্যর্থ হওয়া লাগতো আবিরের দীর্ঘশ্বাসের কারণে।
টার্মিনালের ভেতর থেকে আবিরের কল আসতে দেরি হওয়ায় এয়ারলাইনসের এয়ারপোর্ট ব্রাঞ্চে কল করে আবিরের ফ্লাইটে উঠার ব্যাপারে কনফার্ম হয় স্নেহা। নির্ভার মনে এরপর ওয়েটিংয়ে থাকা উবার ড্রাইভারকে গাড়ি স্টার্ট দিতে বলে। একদিকে আবিরের ফ্লাইটে উঠার খবরে ও যেমন রিলিফ ফিল করতেছিল, অন্যদিকে ওর কিছুটা আফসোস বোধও হইতেছিল। নিজেকে হঠাৎই কেমন যেন লোভী লোভী মনে হইতেছিল ওর। খুবই বিশ্রী একটা ফিলিং এটা! জীবনে কোনোকিছুতেই ও লোভ করে নাই, অথচ বাই রোডে রাজশাহী পর্যন্ত গেলে আরো কিছুটা সময় আবিরকে পাশে পাওয়া যেত, কিছুক্ষণের জন্য ওর মন আর মস্তিষ্ক এই লোভে আটকে গেছিল। পরদিনই ওর জন্মদিন। একসঙ্গে রাজশাহী যাত্রায় অন্তত জন্মদিনের প্রথম প্রহরটা আবিরের সঙ্গে কাটানো যেত- এমন সম্ভাবনা মিস হয়ে যাওয়ার ফ্রাস্ট্রেশনে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে!
আনন্দের বা বিশেষ মুহূর্তের উপলক্ষ খুব কমই আসছে স্নেহার জীবনে। ও দাবি করে- হাতে গুনেই এইসব দিন-ক্ষণ-তারিখ ও বলে দিতে পারবে মুহূর্তের মধ্যে। ওর আরো মনে হয়- যে কয়টাই হোক না কেন, ওর জীবনের আনন্দের কিংবা বিশেষ দিনগুলার অধিকাংশই আবিরকে কেন্দ্র করে অথবা ও আবিরের কৃপাতেই পাওয়া। এখন ওইসব কৃপাই মনে হয় ওর আসলে।
আগামী বছর এই দিনে আবিরই বা কই থাকবে, ও-ই বা কই থাকবে! ওদের সম্পর্কই বা কোথায় গিয়ে ঠেকবে, অথবা থমকে যাবে- এইসব চিন্তায় ওর চোখ দুইটা ছলছল করে উঠলো। ডান হাতের উল্টা পিঠে ভেজা চোখ মুছতে যাওয়ার মাঝ রাস্তায় আবিরের কল আসে। স্নেহার উবার তখন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের টোলের সিরিয়ালে দাঁড়ানো। কল রিসিভ করেই ও বলে- খবর পাইছি, তুমি ফ্লাইটে উঠছো। ওই প্রান্তে আবিরের অস্থির কণ্ঠ- স্নেহা...স্নে...হা...স্নেহা...। স্নেহা শান্ত স্বরে জবাব দেয়- আমি শুনতেছি তো আবির, বলো। ফ্লাইটের মানুষদের কাছে এটা প্রুভ করার দরকার আছে যে তুমি ড্রাঙ্ক? আবিরের ওই একই অস্থিরতা- স্নে....হা, এ্যাই মেয়ে...আই লাভ ইউ। স্নে...হা...আই লাভ ইউ...আই লাভ ইউ। হ্যালো। আর ইউ লিসেনিং?
স্নেহার দুই চোখ ততক্ষণে দুইটা পাহাড়ি ঝর্ণাতে পরিণত হইছিল। ঝিরি ঝিরি জলপ্রপাতে ভাসানো শুরু করে দিছিল- দেহ-মন-প্রাণ, সমস্ত সত্তাই। আবির আবার ডাকলো, স্নেহা...স্নেহা...। মনের অস্থিরতা বাইরে প্রকাশ না করে খুব শান্তভাবেই ও আবারও বলে, ঠিক আছে। শুনলাম তো। আই লাভ ইউ টু। কিন্তু এর পরপরই বুকের জমিনটা নিখুঁতভাবে ছারখার করে দেওয়ার জন্য প্রাণঘাতী হাউইটজারের তীব্র আঘাতের মতো ভেসে আসলো আবিরের বিধ্বংসী বাক্য- স্নেহা...স্নেহা…উই…উই…উইল নেভার মিট এগেইন।
বুকের ভেতরটায় মুহূর্তেই দাবানলের মতো আগুন ছড়িয়ে গেল দাউ দাউ করে। এই রকম কিছুর আশঙ্কা ও আগে থেকেই করতেছিল। স্নেহার মনে হলো; এর চেয়ে নরিঙ্কো কিউএসজেড-৯২, গ্লক ১৯, সিগ-সাউয়ার পি২২৯ অথবা আবিরের নামে ইস্যুকৃত যে পিস্তলই থাকুক না কেন, ও যদি সরাসরি স্নেহার বুকে ওইটা ঠেকিয়ে জাস্ট একটা বুলেট খরচায় একেবারে মুক্তি দিয়ে দিতো- হাশরের ময়দান পর্যন্ত এই উপকার ও মনে রেখে দিতো পরম কৃতজ্ঞতায়। এর বদলে, বুকের সমস্ত জমিন আগুনে পুড়িয়ে আবির অঙ্গার করে দিলো।
ওই দিন ছিল ২৬ ফেব্রুয়ারি; রাত তখন আটটা বেজে ৪০ মিনিট। ২৪ ফেব্রুয়ারির রাত পৌনে দশটা থেকে ২৬ তারিখ রাত আটটা ২৭ মিনিট পর্যন্ত- টানা ৪৬ ঘণ্টা ৪২ মিনিট আবির আর স্নেহা একসঙ্গে ছিল। ৯ বছর আগে বিপুলের সঙ্গে সেপারেশনের পর ওইবারই প্রথম এতটা দীর্ঘ সময় ও কারো সঙ্গে এত ভয়ংকর ইনটেন্স ইনস্যানিটির মুহূর্ত কাটালো। যার সঙ্গে কাটালো, তাকে আবার ও তীব্রভাবে ভালোও বাসে। সম্ভবত আবিরের মতো কাউকেই ও কখনো ভালোবাসে নাই- এমনটাই স্নেহার মনে হয়। তবে ও এইটাও ফিল করে- এই অনুভূতি একইসঙ্গে ওর জীবনে আনন্দ, বেদনা, ভয়, এমন কী ভয়ংকর বিষণ্ণতার কারণও।
স্নেহা...এখনই ফ্লাই করবো, নেটওয়ার্ক চলে যাবে। স্নে.....হা্… আবিরের গলার স্বর কানের এত কাছে বাজতেছিল ওর, অথচ মনে হইতেছিল কোনো এক অতল দূরে যেন ও তলিয়ে যাইতেছে…দূরে…বহুদূরে…আবির ওর কাছ থেকে সরে যাইতেছে ক্রমশ। স্নেহা গলাটা পরিষ্কার করে বলে, হ্যাভ অ্যা সেইফ জার্নি, আবির। পৌঁছানোর পর টেক্সট দিও। ওর তখন ইচ্ছা করতেছিল ফোনটা আছাড় দিয়ে চুরমার করে ফেলতে, কিন্তু আবির সেইফলি পৌঁছানো পর্যন্ত ধৈর্য ধরতে চাইলো। যদিও নিজের ভেতরের কান্নাটাকে আর কন্ট্রোল করতে পারলো না কোনোভাবেই। লুকিং গ্লাস দিয়ে উবারের ড্রাইভার কিছুক্ষণ পরপর ওকে দেখতেছিলেন। বয়স্ক ভদ্রলোক। একটা মায়াও দেখা যাইতেছিল উনার চোখেমুখে। নেহাতই উবার চালাইতেছিলেন বলে সম্ভবত ওই মায়া কণ্ঠ পর্যন্ত আনা থেকে বিরত থাকতেছিলেন উনি।
আবিরের সঙ্গে মোটামুটি সমস্ত বিদায় পর্ব অবশ্য এমনই হইতেছিল ওই সময়। ওইবারই প্রথম যে এমন নির্বোধের মতো কাণ্ড করছে ও, এমন না। এর আগেও করছে, এর পর তো প্রতিবারই! ওর ওইসব কাণ্ডে বিদায়ের মুহূর্তে স্নেহা বারবার যন্ত্রণা পেয়ে কখনো কান্না লুকাতো, কখনো বা নিজেকে হাউমাউ করে কাঁদতে দিতো। ওইদিন অনেক চেষ্টার পরও যখন আর কন্ট্রোল করতে পারলো না; আল্লাহর ওয়াস্তে নিজেকে ছেড়ে দিলো- নাও, কাঁদো তোমার প্রভুর নামে! ইচ্ছামতো বুকের যন্ত্রণা নামাও। কিন্তু যন্ত্রণা আর কমে কই!
হাতিরঝিলের শেষপ্রান্তের ট্রাফিক সিগনালে বসে আবিরের টেক্সট পেলো আবার- এ্যাই মেয়ে...স্নেহা...মা...তুমি আমার আম্মা...। একটার পর একটা টেক্সট করতে থাকে ও। অধিকাংশই এলোমেলো। স্নেহা বুঝতে পারে, আবির তখনো ড্রাঙ্ক। রাজশাহী পৌঁছাইছে কি না জানতে চাইলে ও রিপ্লাই দেয়- জাস্ট ল্যান্ডেড। স্ক্রিনে টপটপ করে পড়তে থাকা চোখের পানি সরাতে সরাতে স্নেহা টাইপ করে- ওকে। টেক কেয়ার অব ইউরসেল্ফ। আল্লাহ যেন আজকে থেকেই তোমার মনোবাসনা পূর্ণ করে।
টেক্সটটা সেন্ড করার পর ফোনের সুইচ অফ করে আবারও ও কান্নায় ভেঙে পড়ে। উবারের ড্রাইভার তখন আর নিজেকে অযাচিতভাবে মায়া দেখানো থেকে বিরত রাখতে পারলেন না। গাড়ি হালকা স্লো করে টিস্যুর বক্স পেছন দিকে ঠেলে দিয়ে বললেন- আন্টি, কাঁদলে কোনোকিছু চেঞ্জ হয় না, তবে হালকা লাগে। হালকা হন, দুর্বল হইয়েন না।
বাসা থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত ওদের সমস্ত কনভারসেশনই ভদ্রলোক শুনছেন। ওদের মধ্যে কী সম্পর্ক, সেটা উনার না বোঝার কোনো কারণই নাই। স্নেহা দুই-তিনটা টিস্যু টান দিয়ে নিতে নিতে কান্না সামলানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় আবারও। ওর শুধু আব্বার মুখটাই মনে পড়তে থাকে তখন…