Posts

উপন্যাস

চেজিং দ্য ড্রাগন: ৪৬ ঘন্টা ৪২ মিনিট

March 14, 2026

Shifat Binte Wahid

Original Author সিফাত বিনতে ওয়াহিদ

305
View

[ডিসক্লেইমার: এই গল্পে চিত্রিত প্রভাবশালী চরিত্র ও ক্ষমতার অলিগলি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। মানুষের মনের গহীনের অন্ধকার ও জটিল প্রবৃত্তিগুলো বাস্তব হলেও, এখানকার চরিত্র, তাদের কর্মকাণ্ড এবং প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বাস্তবের কোনো ব্যক্তি বা স্থানের মিল নেই।]

বসন্তের ভর দুপুরে ছোট্ট স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টের এই ফ্লোরটায় দুই পা ছড়ায়ে বসে সুঁইয়ের নড়াচড়া নিয়ে ভীষণ পেরেশান হয়ে আছে স্নেহা। পেছনেই ল্যাপটপের ফোল্ডিং টেবিলটার উপরে রাখা জেবিএল ফ্লিপ সেভেন পোর্টেবল ওয়্যারলেস স্পিকারে বাজতেছে উস্তাদ মেহদি হাসান-

আপ তো নাজদিক সে নাজদিক-তার আ তে গেয়ে
পেহ্‌লে দিল, ফির দিলরুবা, ফির দিল কে মেহ্‌মান হো গেয়ে
রাফতা রাফতা ও মেরি হাস্তি কা সামা হো গেয়ে…

কিন্তু এই গজলটার একটা সমস্যা এত বছরে স্নেহা এই প্রথম আবিষ্কার করলো, তাও আবার এই মুহূর্তেই। এখন ওর বয়স চল্লিশ হলে, মিনিমাম ত্রিশ বছর যাবত ও এই গজল শুনতেছে। অর্থাৎ দশ বছর বয়সে কিংবা নয় বছর বয়স পূর্ণ করার কয়েক মাস পর থেকেই হবে। আব্বার বিলাতি গ্রামোফোনেই প্রথম এই গজল শুনছিল ও। সন-তারিখ-ক্ষণ যদিও এখন আর মনে নাই; কিন্তু এতকাল কেন “প্যায়ার যাব হাদ সে বাড়হা, সারে তাকাল্লুফ মিট গেয়ে” লাইনটারে ওর সমস্যা মনে হয় নাই? এই ভাবনা ভাবতে গিয়া আরো কিছুক্ষণ সুঁই-লাইটারের মিস্ত্রিগীরি বন্ধ রাখতে হইতেছে। মিষ্টিমুখ করার পথে এতসব যান্ত্রিক ত্রুটি সত্যিই অসহনীয়! এরমধ্যে আবার উস্তাদের এই মিষ্টি লাইনটা ঠিক কী পরিমাণ যে একটা তিতা ভাব দিতেছে ওকে, তা নিয়ে ও চিন্তা করতেছে মোটামোটি ‘মি ভার্সেস মি’ টাইটেলে একটা বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যাবে। হালকা রি-ওয়াইন্ড করে আবারও একই লাইনে ও মনোযোগ দিলো। এইবার মনে হইলো- নাহ! ঠিকই আছে অবশ্য; গানে-গজলে, গল্প-নভেলে আর সিনেমার পর্দায় এইসব মিঠা মিঠা প্রেম কাহিনী থাকতেই পারে, এইগুলা তো আর বাস্তব না! সেই তুলনায় কবিতাকে ওর কিছুটা বাস্তব আর গ্রহণযোগ্য মনে হয়। কবিতাগুলা সব কবিদের মতোই- চিরদুঃখী!

তাকাল্লুফ’ শব্দটা বিনা কারণেই ও কয়েকবার জোরে জোরে উচ্চারণ করলো। বেশ মজার শব্দ! উচ্চারণে একটা আভিজাত্যের ভাব আছে। এই একলা ফ্ল্যাটে স্নেহা নিজেই নিজের শিক্ষক, নিজেই নিজের শিক্ষার্থী হয়ে একা একা কথা চালাইয়া যাইতেছে। ‘তাকাল্লুফ’ বলতে বলতে ওর মনে হইলো- উর্দু কী মিষ্টি একটা ভাষা! শুধু রাজনৈতিক কারণে এই ভাষাটাকে এ দেশের অনেক মানুষ না বুইঝাই কটাক্ষ করে, অথচ উর্দুর শব্দের ভাণ্ডার কত সমৃদ্ধ! এক প্রেমকেই যে উর্দুতে কত নামে ডাকে- ইশক, পেয়্যার, মোহাব্বাত, উলফাত, চাহাত, আশিকি, জুনুন, দিলবারি, দিললাগি…আর না জানি কত কী! এখানেও কাহিনী আছে, স্নেহার মনে পড়ে। ও কোনো একটা লেখায় একবার পড়ছিল- এই সবগুলা শব্দতে ভালোবাসা বোঝায় ঠিকই; কিন্তু এদের মধ্যেও আবার আলাদা আলাদা স্তর আছে। পেয়্যারে যেই ভালোবাসা বোঝায়, ইশক বা জুনুনে একই ভালোবাসা বোঝায় না!

ভালোবাসারও রকম ফের আছে! আবার সেইগুলা বোঝানোর জন্য আছে আলাদা আলাদা শব্দও। ভাবা যায় এইগুলা- মাথা চুলকাইতে চুলকাইতে ও বিড় বিড় করে। এই কয়েকদিনে প্রচুর সাদা চুল আগাছার মতো মাথার আনাচে-কানাচে আবির্ভূত হওয়ায় হঠাৎ হঠাৎই যখন-তখন চুলকানোর উপদ্রব শুরু হইছে। এটা বেশ বিরক্তিকর একটা ব্যাপারই। যদিও ওর জীবনে এই মুহূর্তে সহনীয় ব্যাপার কী আছে- এটা মনে করতে গিয়ে ও হাসির ছলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলার ট্রাই করলো, কিন্তু ওইটাও ঠিকঠাক বের হইলো না ভেতর থেকে। শালার কপাল! একলা ফ্ল্যাটে চিৎকার করে স্নেহা বলে উঠলো- এসনেএএহা, দেখো- তোমার দীর্ঘশ্বাসরাও তোমার সঙ্গে বিট্রে করতেছে! ই-উ-জ-লে-স! কিন্তু খালি এই ফ্ল্যাটের অলমোস্ট খালি এই রুমটার দেয়ালে বাড়ি খেয়ে ওর চিৎকারটা প্রতিধ্বনির রূপে বাউন্স ব্যাক করলো। গমগম কানের মধ্যে বাজতে থাকা ওই শব্দ শুনতে গিয়ে স্নেহা খেয়াল করে- ও নিজেকে স্নেহা না ডাইকা, ডাকতেছিল- এসনেএএহা বলে।

ছোটবেলায় ওদের বাড়িতে একজন মেইড ছিলেন- স্বপনের মা বুয়া। তার আসল নাম ছিল ফিরোজা। উনার গলায় একটা রূপার চেইনের মাঝখানে ঝুলানো লকেটে ‘ফিরোজা’ নামটা লেখা ছিল, স্নেহার এখনো মনে আছে। ওর তখন মাত্র অক্ষর জ্ঞান হইতেছিল সম্ভবত। ফিরোজা বুয়ার কোলে উঠলেই লকেটটা খুলে ও বানান করে পড়তো- ফ রশ্‌শো ই ফি, র ও-কার রো, বর্গীয় জ আকার- জা… ফি-রো-জা! উনারই একমাত্র ছেলের নাম স্বপন, মানে ফিরোজা বুয়া তার ছেলেকে এই নামেই সবার কাছে পরিচয় করাইতেন। নিজেকে উনি পরিচয় করাইতে পছন্দ করতেন- ‘স্বপনের মাও’ বলে। ময়মনসিংহ-কাওরাইদ অঞ্চলের মানুষ সম্ভবত মাকে ‘মাও’ বলে ডাকতেই অভ্যস্ত ছিলেন এক সময়, নাকি এখনো ডাকেন? এ বিষয়ে ওর তেমন একটা জ্ঞান নাই যদিও। তবে ফিরোজা বুয়া খুব গর্বের সঙ্গেই নিজেকে ‘স্বপনের মাও’ বলতেন। ওই পরিচয়ে তার মধ্যে একটা তৃপ্তি বোধ দেখা যাইতো। ছেলের নামটা উনি নিজেই রাখছিলেন। প্রেগনেন্ট থাকা অবস্থায় স্বপনের আব্বা ফিরোজা বুয়াকে ফেলে রেখে চলে গেছিলেন। পরে ওই লোক নাকি ব্যাক টু ব্যাক আরো দুইটা বিয়ে করছেন। ওই দুই বউ আর তাদের ছেলে-মেয়েদের নিয়ে ফিরোজা বুয়াদের গ্রাম বেলদিয়াতে থাকলেও, স্বপন বা ফিরোজা বুয়ার কোনো খোঁজখবরই উনি কখনো রাখেন নাই। ভরণপোষণ তো দূরের কথা, স্বপনকে নিজের ছেলে পরিচয় দিতেও কমফোর্টেবল ছিলেন না ওই লোক।

তো এই স্বপন যখন স্নেহার নানাজানের মাদ্রাসায় দাখিল পাশ দিলেন, তখন থেকে সে নিজেকে পরিচয় করাইতেন শামীম নামে। স্বপন বললে উনার মুখমণ্ডলে প্রচণ্ড বিরক্তি ভাব ফুইটা উঠতো। স্নেহাকেও কিছুদিন উনি কায়দা পড়াইছেন, সেই সূত্রে তাকে ডাকতে হইতো- শামীম হুজুর। ভুলে কোনোদিন স্বপন হুজুর ডাইকা ফেললেই তার চেহারায় আকাশের সব মেঘ আইসা ভিড় জমাইতো। এই রহস্য স্নেহা উন্মোচন করতে পারছে বড় হওয়ার পর। স্বপন নামটা সংস্কৃত শব্দ ‘স্বপ্ন’ থেকে আসছে। এর অর্থও তেমন একটা সুবিধার না। সব স্বপ্ন যে ভালো হবে, এর কোনো গ্যারান্টি নাই। স্বপ্ন খারাপ হওয়ার অহরহ নজির আছে দুনিয়ায়। অন্যদিকে, শামীম শব্দটা আসছে আরবী থেকে, ফার্সিতেও এই শব্দ বহুল প্রচলিত। এর অর্থ হইতেছে- ‘সুবাস’ বা ‘সুগন্ধী’, তাও আবার এই নামের মাধ্যমে সম্ভবত ‘পবিত্র সুবাস’ই বুঝাইয়া থাকে। দাখিল পড়াকালীন সময় স্বপন ওরফে শামীম হুজুরকে মাদ্রাসার কোনো বড় হুজুর হয়তো এই দুই নামের বুৎপত্তি স্থল এবং অর্থ বুঝাইয়া মায়ের দেওয়া নাম ত্যাগ করাইছেন। নিশ্চয় মায়ের দেওয়া নামের চেয়ে ধর্মের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বড়!

সেই স্বপন অথবা শামীম হুজুরের আম্মা ফিরোজা বুয়া স্নেহাকে ডাকতেন ‘এসনেএএহা’ বলে। তাও আবার ‘এস’ বলার পর ‘হা’ এর আগে ‘নে’ তে উনি দুই আলিফ টান দিতেন। এমন ঘোর অমাবস্যাকালে ফিরোজা বুয়ার কথা হঠাৎ খুব মনে পড়লো স্নেহার। নামটা ঠিকমতো উচ্চারণ করতে না পারলেও ফিরোজা বুয়া ছোটবেলায় প্রচণ্ড আদর করতেন ওকে। মানুষ এমনই আদরের কাঙ্গাল, যেখানে আদর পায়, ঋণী হয়ে থাকে। স্নেহা চোখটা বন্ধ করে ফিরোজা বুয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া চাইলো- হে খোদা, ফিরোজা বুয়া যেমনভাবে আমাকে ছোটবেলায় স্নেহ-মমতায় আগলাইয়া রাখছিলেন, তুমি তাকে তেমন মমতায় সুরক্ষিত রাইখো। আমিন। দোয়া-প্রার্থনা শেষে আবার সুঁই-লাইটারের কারিগরিতে মশগুল হওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে স্নেহার ফিল হইলো- কেমন যেন একটা বিশ্রীরকম বিষণ্‌ণতা চারপাশ থেকে ওকে জাপ্টাইয়া ধরে আছে। দুনিয়ার সবাই ছাইড়া গেলেও, এই দুঃখ আর বিষণ্‌ণতা বোধ কোনোভাবেই ওকে ছাড়তেছে না।

বিংশ শতাব্দীতে নাকি মানুষের শোকের আয়ু বড় জোর এক বছর- এমনটাই তো লিখছিলেন নাজিম হিকমত। কবিরা অবশ্য আবেগে অনেক ভুলভাল লেখেন। কবিদের সব আবেগ কিংবা সব লেখাকেও এত সিরিয়াসলি নেওয়ার কিছু দেখে না স্নেহা। এটা অবশ্য একবিংশ শতাব্দী চলতেছে। শোকের আয়ু কি কিছুটা বাড়লো? হিসাবে তো কমার কথা। দশ টাকার লাইটারের ফুটায় সুঁই সেট করতে ব্যর্থ হয়ে বিশ টাকার লাইটারের সঙ্গে কারিগরি শিক্ষার পরীক্ষা দিতে নামার আগ মুহুর্তে ওর মনে পড়লো ভিকি কৌশলের মাসান সিনেমার কথা। ওই সিনেমায় ভিকির প্রেমিকা অ্যাক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার পর প্রচণ্ড দুঃখ আর যন্ত্রণায় বন্ধুদের সঙ্গে নৌকার উপর মদ খাইতে খাইতে ভিকি বলতেছিল- “শালা, এ দুখ কাহে খাতাম নেহি হোতা বে?" ডায়লগটা স্নেহার জীবনের সিলেবাসে কমন পড়ছে। দুনিয়ার সব বিষয় তো আর ওর জীবনের সিলেবাসে কমন পড়বে না।

মাসানের ওই অকালে প্রেমিকা হারানো প্রেমিকের দুঃখের মতোই ওর দুঃখও অফুরন্ত, শেষ হইতেছে না কিছুতেই! ফলে উস্তাদজি যখন গাইতেছেন, “পেয়্যার যাব হাদ সে বাড়হা, সারে তাকাল্লুফ মিট গেয়ে”, অর্থাৎ প্রেম চরমে পৌঁছাইলে আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজনীয়তা ফুরায় আর কী; তাকাল্লুফ বলতে এইখানে জড়তারে বুঝায়ে থাকবে, যেটা মূলত প্রেম প্রেম বোধ হওয়ার সময়ই শুধু দৃশ্যমান থাকে। প্রেমটা দুই তরফ থেকে কনফার্ম হয়ে গেলেই আর এইসবের বালাই থাকে না। তখন চলে শুধু অভিযোগ করা আর অভিযুক্ত হওয়ার সিলসিলা। কিন্তু দুনিয়ার সব পেয়্যার হাদ সে বাড়লে কি একই রকম ঘটনা ঘটে, উস্তাদজি? সিলেবাস কমন পড়ে নাই ওর! আরো কত কথা যে স্নেহার মনে আসতেছে এই এক গজলের লাইন থেকে; যেমন- এই দুনিয়ায় যেটাকে পেয়্যার বলে, কয়জনই বা তা এক্সপেরিয়েন্স করছে ঠিকঠাক? অধিকাংশই ভালোলাগা, প্রেম বা ভালোবাসাই তো একতরফা দাখিলা পদ্ধতির মতো অসম্পূর্ণ। অবশ্য এটা এক হিসেবে ভালো। কখনোই না পাওয়ার বেদনার থেকে পাওয়ার পর হারানোর কষ্ট তুলনামূলকভাবে বেশি যন্ত্রণার।

মিষ্টির দুনিয়ায় প্রবেশ করলে এই এক প্যারা! কত কত যে ভাবনা মাথায় গিজ গিজ করে ওর! কত প্রশ্ন! প্রশ্নের ভেতর আবার গুটি কয়েক এমবেডেড প্রশ্ন! এতসব সওয়াল-জবাব, গজল-কবিতা-গান-সিনেমা-ফিলোসফি কপচাইয়াও মাসানের ভিকি কৌশলের ওই ক্যারেক্টারটার মতো স্নেহার দুঃখও কোনোভাবেই শেষ হইতেছে না। মুড ভালো থাকলে অথবা নরমাল সময়ে উস্তাদের এই গজলের সঙ্গে ও নিজেও গলা মেলানো শুরু করতো এতক্ষণে। বহু আগে থেকেই এই গজল ওর ভীষণ পছন্দের, কিন্তু এই মুহূর্তে একেকটা লাইন বিষের মতো লাগতেছে। তবু নিজের ধৈর্য্য পরীক্ষা করতেই মনে হয় গভীর মনোযোগে ও পুরাটাই শুনতেছে! গত ত্রিশ বছর বা এর কাছাকাছি সময় ধরে এই গজল যেন ও শুধু শোনার খাতিরেই শুনে আসতেছিল, আজকে এর পুঙ্খানুপুঙ্খ সন্ধি বিচ্ছেদ করেই ছাড়বে!

দুই-একবার ‘রিপিট’ বাটনে চাপ দিয়ে যতক্ষণ কলিজা পুড়তে পুড়তে আর পোড়া ভাবটা টের পাওয়া যাবে না; ঠিক ততক্ষণ পর্যন্ত গজলটা শুনতে মন চাইলো ওর, কিন্তু এরমধ্যেই আসতেছে আবরারের কল। এখন কাউন্সেলিংয়ের সেশনে বইসা থেরাপিস্টের জ্ঞান-গর্ভ উপদেশ শোনার মতো অবস্থা স্নেহার নাই। লাইটার থেইকা বারবার সুঁই লাফ দিয়া কই কই যে পড়তেছে, সেটা আবার দুইটা লাইট জ্বালাইয়া ওর খুঁইজা আনতে হইতেছে। মুখের সঙ্গে সঙ্গে কাঁপাকাঁপি শুরু করছে ডান হাতটাও। করুক, সব ধ্বংস হয়ে যাক! আর কী বাকি আছে ধ্বংস হওয়ার- ভাবতে থাকে ও! একটা সময় নিজেকে এমন দুর্বল অবস্থায় দেখতে ঘৃণা করতো স্নেহা। এখনকার বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন। ভেতর থেকে ও এখন পুরাটাই ৯/১১ এর টুইন টাওয়ারের মতো ধ্বংসাবশেষ! যদিও ওইখানে নাকি এখন ওয়ান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার না কী যেন নামে ইউএসএ'র সবচেয়ে উঁচু ভবন বানানো হইছে। ওইটার নাকি আবার একটা নিকনেমও আছে- ফ্রিডম টাওয়ার

স্নেহা ভাবে- শালা; ভালোবাইসা-আদর কইরা, কিংবা অবজ্ঞাতেও তো ওরে কোনোদিন কেউ বিশেষ কোনো নামে ডাকলো না! অথচ একটা জড় পদার্থেরও নাকি নিকনেম আছে! নিজেকে ওর এই মুহূর্তে একটা জড় পদার্থের চেয়েও বড় অপদার্থ মনে হইতেছে! টাকা থাকলে মানুষ কত কী যে করে, সুঁই খুঁজতে খুঁজতে ও ভাবে। টাকায় খালি মানুষ পাওয়া যায় না; নাহ, যায় মনে হয়! পিকি ব্লাইন্ডার্সে টমি শেলবি তার প্রেমিকাকে একটা ডায়লগ দেয় না? “এভ্রিওয়ান ইজ হোর, গ্রেস। উই জাস্ট সেল ডিফরেন্ট পার্টস অফ আওয়ারসেলভস।” জীবনের সিলেবাসে আবার কিছু একটা কমন পড়ার আনন্দ সুঁই না খুঁইজা পাওয়ার বেদনাটাকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য ভুলাইয়া দিলো। স্নেহা কয়েক সেকেন্ডের ওই আনন্দের মধ্যেই হঠাৎ চিৎকার করে বলে- জ্বি মুহতারামা, আপনি নিজেও এক প্রকার বেশ্যা! জীবনে নিজের কিছু না কিছু তো ও অবশ্যই বেচছে! মস্তিষ্কে খুব একটা চাপ প্রয়োগ না করতেই মনে পড়লো- আত্মমর্যাদা! যাহ! ও তো তাইলে ‘দ্য কুইন অফ বেশ্যা’!

মন খারাপ থাকলে বসুন্ধরার এই ছোট্ট আপ্যার্টমেন্টে নিজের মতো কিছু সময় কাটায় ও। আজকে খুব ভোরেই চলে আসছিল। বাদবাকি দিন অ্যাপার্টমেন্টটা তালাবদ্ধই থাকে। একটা সময় ও একা থাকতেই পছন্দ করতো; ইন ফ্যাক্ট, একাই তো থাকতো। জীবনের একটা বিশাল পিরিয়ড অব টাইম নিজের মতো একা ফ্ল্যাটে, একাই নিজের সঙ্গে ও সংসার করছে। যেহেতু সবার কপালে সব থাকে না, ওর কপালে যে কারো সঙ্গে যৌথ সংসার লেখা নাই- এটা বহু আগেই ও মেনে নিছে। যদিও কারো সঙ্গে সংসার করতে যে ওর খুব মন চাইছিল কখনো, এমনও না। তবে হঠাৎ হঠাৎই কেমন যেন বিশ্রী রকম নিঃসঙ্গ লাগে; কেমন যেন সব ফাঁকা ফাঁকা, কেমন একটা তীব্র-গাঢ় শূন্যতা। নিজের সঙ্গ উপভোগ করতে না পারলে এই নিঃসঙ্গতা বোধ জোঁকের মতো ওর মনের ভেতর ঢুকে ঘাপটি মেরে বইসা থাকে। তখনই আসলে শুরু হয় অস্থিরতা। নাইলে প্রচণ্ড এক বিষণ্ণতায় অনবরত ও তলাইয়া যাইতে থাকে গভীর-সুবিশাল আর তীব্র অন্ধকার এক গহ্বরে।

আবির জীবনে আসার আগ পর্যন্ত এমন নিঃসঙ্গতা বোধে স্নেহা কখনো ভুগছে বলে দূর-দূরান্তের স্মৃতি ঘাইটাও ওর মনে পড়ে না। কাজ; অফিস শেষে কলিগদের সঙ্গে আড্ডা, সন্ধ্যায় এক ঘণ্টা ইভেনিং ওয়াক, বাসায় ফিরে গাছেদের সঙ্গে খুনসুটি আর আলাপচারিতা, গান শোনা, বই পড়া, লেখালেখি…এরমধ্যেই চট জলদি ডিনারের জন্য কোনো ডিশ রেডি করতে করতেই রাকিনের সঙ্গে ফোনে গ্যাজানো। ফোন লাইড স্পিকারে রেখেই ডিনার শেষ করা, তারপর আর্লি টু বেড- এই ছিল ওর কর্মব্যস্ত দিন আর রাতের রুটিন। উইকেন্ডে কখনো রাকিন অথবা মিতা আপার সঙ্গে গ্লোরিয়া জিন্সের আড্ডায়, নইলে বাসায় শুয়ে-বসেই কোনো সিরিজ বা মুভি দেখতে দেখতেই ওর সুন্দর সময় পার হয়ে যাইতো। এইসবের ফাঁকেই টুক টুক করে সারা সপ্তাহে জমানো ঘরের কাজগুলাও সেরে ফেলতো ও। এরপর ডিনারে কোনো না কোনো উইকেন্ড স্পেশাল ডিশ বানাতো নিজেকে স্পেশাল ট্রিট দিতে। লাইফ ছিল একদম বিন্দাস! এর বাইরে আর কোনো প্যারাই ছিল না ওর জীবনে।

নাক তো কোনোকিছুতে এমনিতেও খুব একটা গলায় না স্নেহা, বরং একা থাকতে শুরু করার বছর দুয়েক আগে থেকে ফ্যামিলি বিষয়ক প্যারাতেও নিজের মাথা ঘামানো আলহামদুলিল্লাহ ছাড়তে পারছিল। সবকিছু থেকে নিজেকে এবং সবকিছুকে নিজের থেকে একটা সম্মানজনক দূরত্বে অবস্থান করানোটাই ওর বেশ শান্তিপূর্ণ মনে হইতেছিল। শান্তিতে আসলেই ও ছিল কি না, সেটা হয়তো শিওর বলতে পারবে না; তবে একটা পূর্ণতা ছিল জীবনে- এই বিষয়ে মোটামোটি ও নিশ্চিত। হৃদয় আর আত্মাটা তখন নিজ নিজ স্থানেই ছিল হয়তো, এখন এইসবের স্থানচ্যুতি ঘটছে। আবিরের সঙ্গে পরিচয়- তিলে তিলে বহু বছর যাবত ধরে গড়ে তোলা ওর শক্ত খোলসটাকে পুরাপুরি ছ্যাড়াভ্যাড়া করে দিছে।

একা ফ্ল্যাটে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর যে নিজের মতো মহানন্দে একাই জীবন কাটাইয়া আসতেছিল, তারই এখন একা ফ্ল্যাটে বেশিক্ষণ থাকতে দমবন্ধ লাগে। নিজের প্রতি ওর আত্মবিশ্বাস এতটাই নষ্ট হইছে যে ঘণ্টা খানিক একা থাকলেও মনে হয়- এই বুঝি ও নিজের কোনো ক্ষতি করে বসবে এখনই! অথচ আবির যদি গত বছর ওই আড়াইটা দিন সময় ওর সঙ্গে না কাটাতো, এই একাকীত্বের অনুভূতি স্নেহাকে এতটা কাবু করার ক্ষমতা রাখতো বলে ওর মনে হয় না। এর মানে এই না যে স্নেহা ওর জীবনের সব সমস্যার মূল আবিরকেই মনে করে! রাগ করে যা খুশি বলুক না কেন, স্নেহা তো আসলে জানে- নিজে না চাইলে কেউই কাউকে ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে না, করতে পারেও না। ইদানিং ওর মনে হয়- নিজের ধ্বংসের সহযাত্রী হিসেবে আবিরকে সম্ভবত ও একটু বেশিই পছন্দ করে ফেলছিল। সমস্যা তো তাইলে ওর নিজের সিলেকশনেই, অন্যের ঘরের ময়লা ঘাইটা আর লাভ কী!

গত বছর আবির রাজশাহী যাওয়ার সময় এয়ারপোর্টে সি-অফ করে বাসায় ফেরার পরই জীবনে প্রথমবারের মতো স্নেহা তীব্র এক মহাশূন্যতা অনুভব করা শুরু করলো। বাড়ির মেইন ডোরের লক খুলে ঘরে ঢুকতেই ওর সমস্ত কিছু ফাঁকা ফাঁকা লাগা শুরু হইলো। ১২০০ স্কয়ার ফিটের তিন বেডরুমের ওই বাসার প্রতিটা রুমে ঘুরতে ঘুরতে স্নেহা ওর কবিতার চারটা লাইনই বারবার বিড়বিড় করে যাইতেছিল-

আমার এ ঘর সমস্তটাই ফাঁকা
সহসা মৃত্যু চুমু খায় কপালে;
ইচ্ছে হলে ঘুরে যেও, ফিরে এসো
আমার পৃথিবী অস্থিরতায় স্থির…


ওই রাতে এয়ারপোর্টে আবিরকে ড্রপ করার পর কিছুটা সময় পার্কিংয়ে অপেক্ষা করে স্নেহা। এর আগের দুই দিন ছয়টা ফ্লাইট আর দুইটা বাসের মধ্যে কোনোটা আবির মিস করছে, কোনোটা ক্যানসেল করতে সায় দিছে, কোনো কোনোটা আবার নিজের ইচ্ছাতেই ক্যানসেল করছে। ওইটা ছিল ওর সাত নম্বর ফ্লাইট, ওই রাতে রাজশাহী যাওয়ার শেষ ফ্লাইটও। ইলেভেন্থ আওয়ার পর্যন্ত ওই ফ্লাইটটাও অলমোস্ট মিস হওয়ার পথেই আগাইতেছিল। শেষমেশ রিজেন্সির সামনে জ্যামে বসে নভো এয়ারের অফিসে কল করে আবিরকে বাধ্য হয়েই নিজের পরিচয় দিতে হইছিল। যেভাবেই হোক, ওই রাতে ইমার্জেন্সি ওর রাজশাহী ফিরতেই হবে- এই তথ্য জানানোর পর ফ্লাইটটা আধা ঘণ্টা ডিলে করাতে ও রিকোয়েস্ট করে। এছাড়া উপায়ও ছিল না আসলে। পরদিন সকালে হেডকোয়ার্টার থেকে ওদের ওয়ার্ক স্টেশন ভিজিট করতে যাওয়ার কথা ছিল চিফের। এর আগে আবির রাজশাহী না পৌঁছাইতে পারলে বিরাট কেলেঙ্কারি ঘটার সম্ভাবনা ছিল!

বাই এনি চান্স ওই ফ্লাইটটাও যদি মিস হয়ে যায়, এর বিকল্প ব্যবস্থাও জ্যামে বসে ভেবে রাখছিল স্নেহা। ঢাকায় যেহেতু ওই কয়দিন আবির ওর সঙ্গেই ছিল, তাই সহী সালামত ওর ডেসটিনেশনে পৌঁছাইয়া দেওয়াও স্নেহা নিজের দায়িত্ব মনে করতেছিল। ওইখানে ইশক-মোহাব্বতের রেফারেন্স না টানলেও চলে। যেকোনো অতিথির জন্যই এটা করা কর্তব্য বলেই ও মনে করতো। স্নেহা যে শিষ্টাচার বিষয়ক বিরাট আলেম, তেমন ভাববার মতো কারণ নাই যদিও; কিন্তু যতটুকু না থাকলেই না, ওইটুকু ওর ছিল- এমনটাই ও বিশ্বাস করতো এতটা দিন! এখন অবশ্য ওর ঈমান নড়বড়ে হয়ে পড়ছে নানা কারণে। ফ্লাইটের বিকল্প হিসাবে বাই রোডে রাজশাহী যাওয়ার একটা পরিকল্পনা আবিরকে ইনফর্ম না করেই স্নেহা ঠিক করে রাখছিল। সবকিছুতেই আবিরের অস্থিরতা। ও সমাধান না খুঁজে শুধু সমস্যার সম্ভাবনা আর সমস্যা কত প্রকার এবং কী কী- এসবই বারবার রিপিট করতে থাকে। নিজেও তাতে অস্থির হয়ে যায়, আশেপাশের মানুষকেও অস্থির করে তোলে। গাড়িতে বসে ও চুক চুক করে একবার মামের বোতল থেকে হুইস্কি গিলতেছিল, আরেকবার দাঁত দিয়া নখ কামড়াইতে কামড়াইতে বলতেছিল- স্নেহা! আই হ্যাভ টু গো বাই টুনাইট! দে উইল কিক ইন মাই অ্যাস্, নো ডাউট! প্যানিকড হয়ে অ্যাংজাইটিতে একই কথাই আবির রিপিট করতেছিল বারবার।

স্নেহা তাতে বিন্দুমাত্র মনোযোগ বা পাত্তা কোনোটাই না দিয়া অফিসের এক জুনিয়রকে কল করে ইমার্জেন্সি একটা গাড়ি ম্যানেজ করার নির্দেশনা দিতে থাকলো। ফ্লাইট কোনো কারণে মিস হইলেও ওরা যেন ঘণ্টা খানিকের মধ্যেই বাই রোডে রাজশাহী রওনা দিতে পারে- বিষয়টার আর্জেন্সি আর গুরুত্ব বেশ খানিকটা সময় নিয়ে খুব ভালোমতো ক্লিয়ারলি ব্রিফ করে একটু পর পর গাড়ি পাওয়ার আপডেট নেওয়া শুরু করলো। আবির ওই সময় ওর মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে কতক্ষণ তাকাইয়া কী দেখলো বা ভাবলো কিছুই বুঝতে পারলো না স্নেহা। অবশ্য ওই মুহূর্তে এইসব বোঝার প্রয়োজন ছিল বলেও ওর মনে হয় নাই। ওই সময় স্নেহার একমাত্র কনসার্ন ছিল- ভোরের আগেই আবিরকে যেভাবেই হোক রাজশাহী পৌঁছাইতে হবে।

যদি শেষ পর্যন্ত বাই রোডেই যাইতে হয়, আবিরকে রাজশাহীতে ড্রপ করে ওই গাড়িতেই স্নেহা আবার ঢাকায় ব্যাক করবে- মনে মনে এমনটাই ঠিক করে ফেলে। কিন্তু এইসবের কিছুই আর প্রয়োজন হইলো না, ফ্লাইটটা আবিরের জন্য আধা ঘণ্টা ডিলে করানো হইছিল। ভিআইপি বা ভিভিআইপি ছাড়া অন্য সাধারণ প্যাসেঞ্জারের জন্য কোনো এয়ারলাইনসই এইভাবে ফ্লাইট ডিলে করতো বলে মনে হয় না। আবিরকে এর আগে কোথাও কখনো নিজের পরিচয় দিতে দেখে নাই স্নেহা। অবশ্য বারের বাইরে কয়বারই বা অন্য কোথাও ওদের দেখা হইছে? এটা ভাবলেই ওর আবিরের ওপর হালকা একটু রাগ ওঠে। সবসময় রাগটা দেখানোও যায় না। দেখাইলেও খুব একটা লাভ হবে বলে ওর মনে হয় নাই, পারতপক্ষে তাই না দেখানোর চেষ্টাটাই করে গেছিল অধিকাংশ সময়।

কী যেন একটা গান আছে না রবীন্দ্রনাথের? স্নেহা মনে করার চেষ্টা করে… ওহ! “আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ…”। আবিরের জন্য এর প্যারোডি হইতে পারে- “আমার এই মদ খাওয়াতেই আনন্দ”! এই আনন্দকে বাধাগ্রস্ত করবে, সেই সাধ্য কি স্নেহার ছিল? আবির মনে করে- দুইটা বছর ও একাই মনে হয় ভয়ে জীবন কাটাইয়া গেছে। অন্যদিকে স্নেহা নিজের কথা ভাবে- ও হইলো নদীর ওইপারটা, যে দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে নিজের ভেতরে থাকা হারানোর ভয়টা ক্রমাগত লুকানোর চেষ্টা করে যাইতেছিল। কিন্তু অনবরত ওই লুকানোর প্রচেষ্টায় একটা সামান্য ভয়ের ক্ষুদ্র কণা বিশালাকৃতির নিউক্লিয়ার বোমায় পরিণত হইলো শেষ পর্যন্ত। ফলাফল- বুউউউউউউউউউম! দুই পারেই এখন ঘুটঘুটে অন্ধকার!

ফ্লাইটে উঠার আগ পর্যন্ত স্নেহাকে এয়ারপোর্টের পার্কিংয়ে অপেক্ষা করতে বলে টার্মিনালের ভেতরে ঢুকছিল আবির। ও আশঙ্কা করতেছিল, ওই ফ্লাইটটাও মিস হইতে পারে। সেইক্ষেত্রে স্নেহাই একমাত্র ওর পরিত্রাণদাতা। অবশ্য আবির না বললেও ফ্লাইট ছাড়ার আগ পর্যন্ত স্নেহা এমনিতেও বাইরে অপেক্ষাই করতো। “তুই তো গল্পের নায়িকা, তুই কেন নায়কের পার্টে অভিনয় করতেছিস”- স্নেহার এইসব স্বভাবের জন্য রাকিন প্রায়ই এই ডায়লগ থ্রো করে ওর লেগ পুল করার ট্রাই করে। যদিও ওর এইসব কথা খুব একটা গায়ে মাখে না স্নেহা। তবে আবিরকে মাঝে মাঝে নিজেই দুষ্টুমি করতে করতে হাসির একটা আবহ তৈরি করার জন্য ও বলতো- তুমি তো অন্যের আমানত; তোমাকে সুরক্ষিত রাখা আর সহিসালামত ডেসটিনেশনে পৌঁছাইয়া দেওয়া আমার রেসপনসিবিলিটি। ইভেন যতক্ষণ তুমি আমার সঙ্গে আছো, ততক্ষণ তোমাকে প্রটেক্ট করার দায়িত্বও আমারই। আমানতের খেয়ানত করা উচিত না! কিন্তু প্রতিবারই এই কথা বলার পর আবিরের দীর্ঘশ্বাসের কারণে হাসির ওই আবহ তৈরিতে ওর ব্যর্থ হওয়া লাগতো।

আবির টার্মিনালে ঢোকার কিছুক্ষণের মধ্যেই ও যে ফ্লাইটে উঠতে পারছে, আর ফ্লাইটটাও কিছুক্ষণের ফ্লাই করবে- এয়ারলাইনসের এয়ারপোর্ট ব্রাঞ্চে কল করে কনফার্ম হয় স্নেহা। এরপর নির্ভার মনে ওয়েটিংয়ে থাকা উবার ড্রাইভারকে গাড়ি স্টার্ট দিতে বলে। একদিকে আবিরের ফ্লাইটে ওঠার খবরে ও যেমন রিলিফ ফিল করতেছিল, অন্যদিকে ওর কিছুটা আফসোস বোধও হইতেছিল। নিজেকে হঠাৎ ওই সময় কেমন যেন লোভী লোভী মনে হইতেই বিশ্রী একটা ফিলিং হইলো ওর! জীবনে কোনোকিছুতেই ও লোভ করে নাই, অথচ গাড়িতে রাজশাহী পর্যন্ত গেলে আরো কিছুটা সময় আবিরকে পাশে পাওয়া হইতো- কিছুক্ষণের জন্য ওর মন আর মস্তিষ্ক এমন বিশ্রী একটা লোভের ভাবনার জালে আটকে যাইতেছিল। পরদিনই ছিল ওর জন্মদিন। বাই রোডে রাজশাহী গেলে অন্তত জন্মদিনের প্রথম প্রহরটায় আবিরের সঙ্গে থাকা যাইতো- এমন সম্ভাবনা মিস হয়ে যাওয়ার ফ্রাস্ট্রেশনে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো ও! আনন্দের বা বিশেষ মুহূর্তের উপলক্ষ খুব কমই আসছে স্নেহার জীবনে। ও দাবি করে- হাতে গুনেই ও এইসব দিনের হিসাব দিতে পারবে মুহূর্তের মধ্যেই। স্নেহা আরো মনে করে- যেই কয়টাই হোক না কেন, জীবনে আসা ওর আনন্দের কিংবা বিশেষ দিনগুলার অধিকাংশই আবিরকে কেন্দ্র করে অথবা ও আবিরের কৃপাতেই ওর এইসব প্রাপ্তি। এখন এইগুলা ওর কৃপাই মনে হয় আসলে।

আগামী বছর এই দিনে আবিরই বা কই থাকবে, ও-ই বা কই থাকবে! ওদের সম্পর্কই বা কোথায় গিয়ে ঠেকবে, অথবা থমকাইয়া যাবে- এইসব চিন্তা মাথায় আসতেই স্নেহার চোখ দুইটা ছলছল করে উঠলো। ডান হাতের উল্টা পিঠে ভেজা চোখ মুছতে যাওয়ার মাঝরাস্তাতেই আবিরের কল আসে। স্নেহার উবার তখন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের টোলের সিরিয়ালে দাঁড়ানো। কল রিসিভ করেই ও বলে- খবর পাইছি তুমি ফ্লাইটে উঠছো। ওই প্রান্তে আবির অস্থির কণ্ঠে বলতে থাকে- স্নেহা...স্নে...হা...স্নেহা...। স্নেহা শান্ত স্বরে বলে- আমি শুনতেছি তো আবির, বলো। ফ্লাইটের মানুষদের কাছে এটা প্রুভ করার দরকার আছে যে তুমি ড্রাঙ্ক? আবির একইভাবে বলতে থাকে- স্নে....হা, এ্যাঁই মেয়ে...আই লাভ ইউ। স্নে...হা...আই লাভ ইউ...আই লাভ ইউ। হ্যালো। আর ইউ লিসেনিং?

স্নেহার দুই চোখ ততক্ষণে দুইটা পাহাড়ি ঝর্ণা হয়ে গিয়ে ঝিরি ঝিরি জলপ্রপাতে ভাসানো শুরু করলো দেহ-মন-প্রাণ, সমস্তটাই। আবির আবার ডাকলো, স্নেহা...স্নেহা...। খুব শান্তভাবে স্নেহা উত্তর দিলো, ঠিক আছে তো। শুনলাম তো। আই লাভ ইউ টু। কিন্তু এর পরপরই বুকের জমিনটা নিখুঁতভাবে ছারখার করে দেওয়ার জন্য প্রাণঘাতী হাউইটজারের তীব্র আঘাতের মতো ভেসে আসলো আবিরের বিধ্বংসী বাক্য- স্নেহা...স্নেহা…আমাদের আর কখনোই দেখা হবে না। বুকের ভেতরটায় মুহূর্তেই দাবানলের মতো আগুন ছড়াইতে থাকলো। এই রকম কিছু স্নেহা আশঙ্কা করতেছিল আগে থেকেই। এর চেয়ে নরিঙ্কো কিউএসজেড-৯২, গ্লক ১৯ অথবা সিগ-সাউয়ার পি২২৯ অথবা ওর নামে ইস্যুকৃত যেই পিস্তলটাই আছে, আবির যদি সরাসরি স্নেহার বুকে ওইটা ঠেকাতো, আর জাস্ট একটা বুলেট খরচ করে ওকে একেবারেই মুক্তি দিয়ে দিতো- এই অসামান্য উপকার স্নেহা হাশরের ময়দানেও স্মরণ করতো পরম কৃতজ্ঞতায়। তা না করে, বুকের সমস্ত জমিনই পুড়াইয়া দিলো ও প্রচণ্ড আঘাতে! ওই দিন ছিল ২৬ ফেব্রুয়ারি; রাত তখন আটটা বেজে ৪০ মিনিট। ২৪ ফেব্রুয়ারির রাত পৌনে দশটা থেকে ২৬ তারিখ রাত আটটা ২৭ মিনিট পর্যন্ত- টানা ৪৬ ঘণ্টা ৪২ মিনিট আবির স্নেহার সঙ্গেই ছিল। ৯ বছর আগে বিপুলের সঙ্গে সেপারেশনের পর ওই প্রথম টানা এতটা দীর্ঘ সময় স্নেহা কারো সঙ্গে এত ভয়ংকর ইনটেন্স ইন্‌স্যানিটির মুহূর্ত কাটাইছিল, যাকে আবার ও এত তীব্রভাবে ভালোও বাসে। সম্ভবত আবিরের মতো কাউকেই ও কখনো ভালোবাসে নাই, এটা স্নেহার মনে হয় আর কী। তবে ও এইটাও ফিল করে- এই অনুভূতি একইসঙ্গে আনন্দের, বেদনার, ভয়ের আবার ভয়ংকর বিষণ্‌ণতার কারণও।

স্নেহা...এখন ফ্লাই করবো, নেটওয়ার্ক চলে যাবে। স্নে.....হা্‌…আবিরের গলার স্বর কানের এত কাছে বাজতেছিল, অথচ মনে হইতেছিল ও কোনো এক অতল দূরে যেন তলিয়ে যাইতেছে, দূরে…বহুদূরে আবির ওর কাছ থেকে সরে যাইতেছে। স্নেহা গলাটা পরিষ্কার করে একই শান্ত স্বরেই বললো, হ্যাভ অ্যা সেইফ জার্নি, আবির। পৌঁছানোর পর টেক্সট দিও। ওর তখন ইচ্ছা করতেছিল ফোনটা আছাড় দিয়ে চুরমার করে ফেলতে, কিন্তু আবির সেইফলি পৌঁছানো পর্যন্ত ধৈর্য ধরতে চাইলো। তবে নিজের ভেতরের কান্নাটাকে আর কন্ট্রোল করতে পারলো না কোনোভাবেই। উবারের ড্রাইভার লুকিং গ্লাসে কিছুক্ষণ পরপর স্নেহাকে দেখতেছিলেন। বয়স্ক ভদ্রলোক। একটা মায়াও দেখা যাইতেছিল উনার চোখেমুখে। নেহাতই উবার চালাইতেছিলেন বলে সম্ভবত ওই মায়া কণ্ঠ পর্যন্ত আনা থেকে বিরত থাকতেছিলেন উনি। স্নেহা কয়েকবার চেষ্টা করলো নিজেকে সামলানোর…কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর পারলো না। অবশ্য আবিরের সঙ্গে মোটামুটি সমস্ত বিদায় পর্বই ওই সময় এমনই হইতেছিল। ওইবারই প্রথম আবির এমন নির্বোধের মতো কাণ্ড করছে, এমন না। প্রতিবারই স্নেহা ওইভাবেই যন্ত্রণা পাইতে পাইতে কখনো কান্না লুকাইতো, কখনো বা নিজেকে হাউমাউ করে কাঁদতে দিতো। ওইদিন ওই মুহূর্তে অনেক চেষ্টার পরও যখন আর কন্ট্রোল করতে পারলো না; আল্লাহর ওয়াস্তে তখন ছেড়ে দিলো নিজেকে- নাও, কাঁদো তোমার প্রভুর নামে! ইচ্ছামতো বুকের যন্ত্রণা নামতে দিলো। কিন্তু যন্ত্রণা আর কমে কই!

হাতিরঝিলের শেষপ্রান্তের ট্রাফিকে বসে আবার আবিরের টেক্সট পায় স্নেহা- এ্যাঁই মেয়ে...স্নেহা...মা...তুমি আমার আম্মা...। একটার পর একটা টেক্সট করতেই থাকে ও। অধিকাংশই এলোমেলো। স্নেহা বুঝতে পারে, আবির তখনো ড্রাঙ্ক। ও পৌঁছাইছে কি না জানতে চাইলে আবির জানায়- জাস্ট ল্যান্ডেড। এরপর স্ক্রিনে টপাটপ করতে থাকা চোখের পানিগুলা সরাতে সরাতেই স্নেহা টাইপ করতে থাকে- ওকে, আবির। টেক কেয়ার অব ইউরসেল্ফ। আল্লাহ যেন আজকে থেকেই তোমার মনোবাসনা পূর্ণ করে। টেক্সটটা সেন্ড করার পরই ফোনের সুইচ অফ করে আবারও কান্নায় ভেঙে পড়ে ও। উবারের ড্রাইভার আর নিজেকে অযাচিতভাবে মায়া দেখানো থেকে বিরত রাখতে পারলেন না তখন। গাড়িটা হালকা স্লো করে টিস্যুর বক্স পেছন দিকে ঠেলে দিতে গিয়ে উনি বললেন- আন্টি, কাঁদলে কোনোকিছু চেঞ্জ হয় না, তবে হালকা লাগে। আপনি হালকা হন, দুর্বল হইয়েন না। বাসা থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত আবির-স্নেহার সমস্ত কনভারসেশনই ওই ভদ্রলোক শুনছেন। ওদের মধ্যে কী সম্পর্ক, সেটা উনার না বোঝার কোনো কারণ নাই। স্নেহা দুই-তিনটা টিস্যু টান দিতে দিতে কান্না সামলানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো আরেকবার। ওর তখন শুধু আব্বার কথাই মনে পড়তে থাকে।

চেজিং দ্য ড্রাগন: দ্য ব্লু বার্ড

Comments

    Please login to post comment. Login