Posts

উপন্যাস

চেজিং দ্য ড্রাগন: ৪৬ ঘন্টা ৪২ মিনিট

March 14, 2026

Shifat Binte Wahid

Original Author সিফাত বিনতে ওয়াহিদ

228
View

বসন্তের ভর দুপুরে ছোট্ট স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টটার ফ্লোরটাতে দুই পা ছড়িয়ে বসে সুঁইয়ের নড়াচড়া নিয়ে ভীষণ পেরেশান হয়ে আছে স্নেহা। পেছনেই ল্যাপটপের ফোল্ডিং টেবিলটার উপরে রাখা জেবিএল ফ্লিপ সেভেন পোর্টেবল ওয়্যারলেস স্পিকারটায় বাজতেছে উস্তাদ মেহদি হাসান-

আপ তো নাজদিক সে নাজদিক-তার আ তে গেয়ে
পেহ্‌লে দিল, ফির দিলরুবা, ফির দিল কে মেহ্‌মান হো গেয়ে
রাফতা রাফতা ও মেরি হাস্তি কা সামা হো গেয়ে।

কিন্তু এই গজলটার একটা সমস্যা এত বছরে এই প্রথম স্নেহা আবিষ্কার করলো, তাও আবার এই মুহূর্তেই। এখন তার বয়স চল্লিশ হলে মিনিমাম ত্রিশ বছর যাবত সে এই গজল শুনতেছে। অর্থাৎ দশ বছর বয়সে কিংবা নয় বছর বয়স পূর্ণ করার কয়েক মাস পর থেকে হবে। আব্বার বিলাতি গ্রামোফোনে প্রথম এই গজল শুনছিল স্নেহা। সন-তারিখ-ক্ষণ যদিও এখন আর মনে নাই। কিন্তু এতকাল কেন ওর “প্যায়ার যাব হাদ সে বাড়হা, সারে তাকাল্লুফ মিট গেয়ে” লাইনটাকে সমস্যা মনে হয় নাই?

এই ভাবনা ভাবতে গিয়ে আরো কিছুক্ষণ সুঁই-লাইটারের মিস্ত্রিগীরি বন্ধ রাখতে হইছে। মিষ্টিমুখ করার পথে এত যান্ত্রিক ত্রুটি অসহনীয়। এর মধ্যে আবার উস্তাদের এই মিষ্টি লাইন স্নেহাকে যে এই মুহূর্তে ঠিক কী পরিমাণ একটা তিতা ভাব দিতেছে, তা নিয়ে সে ভাবতেছে মোটামোটি ‘মি ভার্সেস মি’ টাইটেলে একটা বিতর্ক প্রতিযোগীতার আয়োজন করা যাবে।

হালকা রি-ওয়াইন্ড করে আবার ওই লাইনটাতে গেল স্নেহা। এবার ওর মনে হলো- নাহ! ঠিকই আছে অবশ্য। গানে-গজলে, গল্প-নভেলে আর সিনেমার পর্দায় এইসব মিঠা মিঠা প্রেম কাহিনী থাকতেই পারে, এইগুলা তো আর বাস্তব না! সেই তুলনায় কবিতাকে কিছুটা বাস্তব আর গ্রহণযোগ্য মনে হয় তার। কবিতাগুলা সব কবিদের মতোই চির দুঃখী! ‘তাকাল্লুফ’ শব্দটা কয়েকবার জোরে জোরেই উচ্চারণ করলো ও। বেশ মজার শব্দ। উচ্চারণে একটা আভিজাত্যের ভাব আছে।

এই একলা ফ্ল্যাটে স্নেহা নিজেই নিজের শিক্ষক, নিজেই নিজের শিক্ষার্থী হয়ে একা একা কথা চালিয়ে যাইতেছে। ‘তাকাল্লুফ’ বলতে বলতে ওর মনে হলো- উর্দু কী মিষ্টি একটা ভাষা! শুধু রাজনৈতিক কারণে এই ভাষাটাকে এ দেশের অনেক মানুষ না বুঝেই কটাক্ষ করে। অথচ উর্দুর শব্দের ভাণ্ডার কত সমৃদ্ধ! এক প্রেমকেই যে উর্দুতে কত নামে ডাকে- ইশক, পেয়্যার, মোহাব্বাত, উলফাত, চাহাত, আশিকি, জুনুন, দিলবারি, দিললাগি…আর না জানি কত কী!

এখানেও কাহিনী আছে, স্নেহার মনে পড়ে। ও কোনো একটা লেখায় একবার পড়ছিল, এই সবগুলা শব্দ দিয়ে ভালোবাসা বোঝায় ঠিকই, কিন্তু এদের মধ্যেও আবার আলাদা আলাদা স্তর আছে। পেয়্যার দিয়ে যেই ভালোবাসা বোঝায়, ইশক বা জুনুন দিয়ে একই ভালোবাসা বোঝায় না! ভালোবাসারও রকম ফের আছে, আবার সেইগুলার জন্য আলাদা আলাদা শব্দও আছে। ভাবা যায় এইগুলা? মাথা চুলকাতে চুলকাতে বিড় বিড় করে স্নেহা। এই কয়েকদিনেই মাথায় প্রচুর সাদা চুল আগাছার মতো গজিয়ে হঠাৎ হঠাৎ চুলকানোর উপদ্রব শুরু হইছে ইদানিং। এটা একটা বিরক্তিকর ব্যাপার।

যদিও ওর জীবনে সহনীয় ব্যাপার কী আছে- এটা মনে করতেই হাসির ছলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলার ট্রাই করলো, সেটাও ভেতর থেকে ঠিকঠাক বের হইতেছে না। শালার কপাল! একলা ফ্ল্যাটে চিৎকার করে ও বলে ওঠলো- এসনেহা, দেখো তোমার দীর্ঘশ্বাসেরাও তোমার সঙ্গে বিট্রে করতেছে! ই-উ-জ-লে-স! কিন্তু খালি ফ্ল্যাটে নিজের শব্দ দেয়ালে বাড়ি খেয়ে তার কানেই গম গম করে বাজতে থাকলে স্নেহা খেয়াল করলো, ও নিজেকে স্নেহা না ডেকে, এসনেহা বলে ডাকছে।

ছোটবেলায় স্নেহাদের বাড়িতে একজন মেইড ছিলেন- স্বপনের মা বুয়া। তার নাম ছিল ফিরোজা। উনার গলায় একটা রূপার চেইনের মাঝখানে ঝুলানো লকেটে ‘ফিরোজা’ লেখা ছিল, স্নেহার এখনো মনে আছে। ওর তখন মাত্র অক্ষর জ্ঞান হইতেছিল সম্ভবত। ফিরোজা বুয়ার কোলে উঠলে লকেটটা খুলে ও বানান করে পড়তো- ফ রশ্‌শো ই ফি, র ও-কার রো, বর্গীয় জ আকার- জা…ফি-রো-জা!

উনার একমাত্র ছেলের নাম স্বপন, মানে ফিরোজা বুয়া তা-ই বলেই সবার কাছে পরিচয় করিয়ে দিতেন। নিজেকে উনি পরিচয় করাতে পছন্দ করতেন ‘স্বপনের মাও’ বলে। ময়মনসিংহ-কাওরাইদ অঞ্চলের মানুষ সম্ভবত মাকে ‘মাও’ বলে ডাকতে অভ্যস্ত ছিল এক সময়। নাকি এখনো ডাকে? এ বিষয়ে তেমন একটা জ্ঞান নাই ওর। তবে ফিরোজা বুয়া খুব গর্ব নিয়ে নিজেকে ‘স্বপনের মাও’ বলতেন। এই পরিচয়ে তার মধ্যে একটা তৃপ্তি বোধ দেখা যেত।

ছেলের নামটা ফিরোজা বুয়াই রাখছিলেন। উনি প্রেগনেন্ট থাকা অবস্থাতেই স্বপনের আব্বা তাকে ছেড়ে গেছিলেন। পরে ওই লোক আরেকটা বিয়েও করেন। তো এই স্বপন যখন স্নেহার নানাজানের মাদ্রাসায় দাখিল পাশ দিলেন, তখন থেকে সে নিজেকে পরিচয় করাতেন শামীম নামে। স্বপন বললে প্রচণ্ড বিরক্তি ভাব ফুটে উঠতো উনার মুখমণ্ডলে। স্নেহাকেও কিছুদিন উনি কায়দা পড়াইছেন, সেই সূত্রে তাকে ডাকতে হতো শামীম হুজুর। ভুলে কোনোদিন স্বপন হুজুর ডাকলে তার চেহারা কালো হয়ে যেত। এই রহস্য স্নেহা উন্মোচন করছে বড় হওয়ার পর।

স্বপন সংস্কৃত শব্দ ‘স্বপ্ন’ থেকে আসছে। এর অর্থও তেমন সুবিধার না। সব স্বপ্ন যে ভালো হবে, এর কোনো গ্যারান্টি নাই। স্বপ্ন খারাপ হওয়ার অহরহ নজির আছে। শামীম শব্দটা আসছে আরবী থেকে। ফার্সিতেও এই শব্দ বহুল প্রচলিত। এর অর্থ হচ্ছে ‘সুবাস’ বা ‘সুগন্ধী’। তাও আবার এই নামের মাধ্যমে সম্ভবত ‘পবিত্র সুবাস’ই বুঝাইয়া থাকে। দাখিল পড়াকালীন সময় স্বপন ওরফে শামীম হুজুরকে মাদ্রাসার কোনো বড় হুজুর হয়তো এই দুই নামের বুৎপত্তি স্থল এবং অর্থ বুঝাইয়া মায়ের দেওয়া নাম ত্যাগ করাইছেন। নিশ্চয় মায়ের দেওয়া নামের চেয়ে ধর্মের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বড়!

সেই স্বপন অথবা শামীম হুজুরের মা ফিরোজা বুয়া স্নেহাকে ডাকতেন ‘এসনেএএহা’। তাও আবার ‘এস’ বলার পর ‘হা’ এর আগে ‘নে’ তে উনি দুই আলিফ টান দিয়ে ডাকতেন। এমন ঘোর অমাবস্যা কালে ফিরোজা বুয়ার কথা হঠাৎ খুব মনে পড়লো স্নেহার। নামটা ঠিকমতো উচ্চারণ করতে না পারলেও ফিরোজা বুয়া ছোটবেলায় ওকে প্রচণ্ড আদর করতেন। মানুষ এমনই আদরের কাঙাল, যেখানে আদর পায়, ঋণী হয়ে থাকে। স্নেহা চোখটা বন্ধ করে ফিরোজা বুয়ার জন্য আল্লাহর কাছে বিড় বিড় করে বললো- হে খোদা, ফিরোজা বুয়া যেমনভাবে আমাকে ছোটবেলায় স্নেহ-মমতায় আগলাইয়া রাখছিলেন, তুমি তাকে তেমন মমতায় সুরক্ষিত রাইখো। আমিন।

দোয়া-প্রার্থনা শেষে আবার সুঁই-লাইটারের কারিগরিতে মশগুল হওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে স্নেহার ফিল হলো- কেমন যেন একটা বিশ্রীরকম বিষণ্নতা ওকে আষ্টেপৃষ্টে জড়াইয়া ধরে আছে। দুনিয়ার সবাই ছেড়ে চলে গেলেও, এই দুঃখ আর বিষণ্নতা বোধ কোনোভাবেই ওকে ছেড়ে যাইতেছে না। বিংশ শতাব্দীতে নাকি মানুষের শোকের আয়ু বড় জোর এক বছর? এমনটাই লেখছিলেন নাজিম হিকমত। কবিরা অবশ্য আবেগে অনেক ভুলভাল লেখেন। কবিদের সব আবেগ কিংবা সব লেখাকে এত সিরিয়াসলি নেওয়ার কিছু দেখে না স্নেহা। এটা অবশ্য একবিংশ শতাব্দী চলতেছে। শোকের আয়ু কি কিছুটা বাড়লো? হিসাবে তো কমার কথা।

দশ টাকার লাইটারের ফুটায় সুঁই সেট করতে ব্যর্থ হয়ে স্নেহা বিশ টাকার লাইটারের সঙ্গে কারিগরি শিক্ষার পরীক্ষা দিতে নামবে ভাবতেছিল। ঠিক ওই মুহূর্তে ওর ভিকি কৌশলের একটা সিনেমার কথা মনে পড়লো- “মাসান”। ওই সিনেমায় ভিকির প্রেমিকা অ্যাক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার পর সে দুঃখে-যন্ত্রণায় বন্ধুদের সঙ্গে নৌকার উপর মদ খেতে খেতে বলতেছিল- “শালা এ দুখ কাহে খাতাম নেহি হোতা বে!” এই ডায়লগটা স্নেহার জীবনের সিলেবাসে কমন পড়ছে। দুনিয়ার সব বিষয় তো আর স্নেহার জীবনের সিলেবাসে কমন পড়বে না।

মাসানের ওই অকালে প্রেমিকা হারানো প্রেমিকের দুঃখের মতো স্নেহার দুঃখও অফুরন্ত! শেষই হইতেছে না কিছুতেই! ফলে উস্তাদ জী যখন গাইতেছেন, “পেয়্যার যাব হাদ সে বাড়হা, সারে তাকাল্লুফ মিট গেয়ে”, অর্থাৎ প্রেম চরমে পৌঁছালে আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজনীয়তা ফুরায় আর কী। তাকাল্লুফ বলতে এইখানে জড়তাকে বুঝায়ে থাকবে, যেটা মূলত প্রেম প্রেম বোধ হওয়ার সময়ই শুধু থাকে। প্রেমটা দুই তরফ থেকে হয়ে গেলে আর এসবের বালাই থাকে না। তখন চলে শুধু অভিযোগ করা আর অভিযুক্ত হওয়ার সিলসিলা।

কিন্তু দুনিয়ার সব পেয়্যার হাদ সে বেড়ে গেলে কি একই রকম ঘটনা ঘটে উস্তাদ জী? সিলেবাস কমন পড়ে নাই! আরো কত কথা যে স্নেহার মনে আসতেছে এই এক গজলের লাইন থেকে। যেমন এই দুনিয়ায় যেটাকে বলে পেয়্যার, সেটা কয়জনই বা এক্সপেরিয়েন্স করছে ঠিকঠাক? অধিকাংশই তো একতরফা দাখিলা পদ্ধতির মতো অসম্পূর্ণ। অবশ্য এটা এক হিসেবে ভালো। কখনোই না পাওয়ার বেদনার চেয়ে, পেয়ে হারানোর কষ্ট তুলনামূলকভাবে বেশি যন্ত্রণার।

মিষ্টির দুনিয়ায় প্রবেশ করলে এই এক প্যারা। কত কত যে ভাবনা মাথায় গিজ গিজ করে! কত প্রশ্ন! প্রশ্নের ভেতর আবার গুটি কয়েক এমবেডেড প্রশ্ন! এতসব সওয়াল-জবাব, গজল-কবিতা-গান-সিনেমা-ফিলোসফি কপচাইয়াও মাসানের ভিকি কৌশলের ওই ক্যারেক্টারটার মতো স্নেহার দুঃখ কোনোভাবেই শেষ হইতেছে না। মুড ভালো থাকলে অথবা নরমাল সময়ে উস্তাদের এই গজলের সঙ্গে স্নেহা নিজেও গলা মেলানো শুরু করতো। বহু আগে থেকেই এই গজল তার পছন্দের। কিন্তু এই মুহূর্তে এই গজল তার বিষের মতো লাগতেছে। তবু নিজের ধৈর্য্য পরীক্ষা করতে পুরাটাই এখন খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতেছে। গত ত্রিশ বছর বা এর কাছাকাছি সময় যেন এই গজল শুধু সে শোনার খাতিরে শুনছে, আজকে যেন এর পুঙ্খানুপুঙ্খ সন্ধি বিচ্ছেদ করে ছাড়বে।

দুই-একবার ‘রিপিট’ বাটনে চাপ দিয়ে যতক্ষণ কলিজা পুড়তে পুড়তে পোড়া ভাবটা আর টের পাওয়া যাবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত শুনতে মন চাইলো ওর। কিন্তু এরমধ্যেই আসতেছে আবরারের ফোন। এখন কাউন্সেলিংয়ের সেশনে বসে থেরাপিস্টের জ্ঞান-গর্ভ উপদেশ শোনার মতো অবস্থা স্নেহার নাই। লাইটার থেকে বারবার সুঁই লাফ দিয়ে কই কই পড়ে যাইতেছে, সেটা আবার দুইটা লাইট জ্বালিয়ে খুঁজে আনতে হইতেছে। এইদিকে মুখের সঙ্গে হাতও কাঁপাকাঁপি শুরু হইছে।

যাক, সব ধ্বংস হয়ে যাক৷ আর কী বাকি আছে ধ্বংস হওয়ার- একবার ভাবে ও। কিন্তু এক সময় নিজেকে এমন দুর্বল অবস্থায় দেখতে ঘৃণা করতো স্নেহা। এখনকার বাস্তবতা ভিন্ন। এখন ও ভেতর থেকে পুরাটাই ১/১১ এর টুইন টাওয়ারের মতো ধ্বংসাবশেষ। যদিও ওইখানে এখন নাকি ওয়ান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার না কী যেন নামে ইউএসএ’র সবচেয়ে উঁচু ভবন বানানো হইছে। ওইটার নাকি আবার একটা নিকনেমও আছে- ফ্রিডম টাওয়ার।

স্নেহা ভাবে- শালা ভালোবেসে, আদর করে, কিংবা অবজ্ঞাতেও তো কেউ কোনোদিন কোনো বিশেষ নামে ডাকলো না তাকে! অথচ একটা জড় পদার্থেরও নাকি নিকনেম থাকে! নিজেকে একটা জড় পদার্থের চেয়েও অপদার্থ লাগলো ওর! টাকা থাকলে মানুষ কত কী যে করে- স্নেহা সুঁই খুঁজতে খুঁজতে ভাবে। টাকায় খালি মানুষ পাওয়া যায় না; নাহ, যায় মনে হয়!

পিকি ব্লাইন্ডার্সে টমি শেলবি তার প্রেমিকাকে একটা ডায়লগ দেয় না? “এভ্রিওয়ান ইজ হোর, গ্রেস। উই জাস্ট সেল ডিফরেন্ট পার্টস অফ আওয়ারসেলভস।” স্নেহার জীবনের সিলেবাসে আবার কিছু একটা কমন পড়ার আনন্দ সুঁইটারে না পাওয়ার বেদনা কয়েক মুহূর্ত ভুলাইয়া রাখে। স্নেহা চিৎকার করে নিজেকে বলে- জ্বি, মুহতারামা, আপনি নিজেও এক প্রকার বেশ্যা! জীবনে নিজের কিছু না কিছু তো সে অবশ্যই বেচছে, স্নেহা ভাবার চেষ্টা করে। পর মুহূর্তেই ওর মনে পড়ে- আত্মমর্যাদা! যাহ! সে তো তাহলে দ্য কুইন অফ বেশ্যা!

মন খারাপ থাকলে বসুন্ধরার এই ছোট্ট ফ্ল্যাটটায় এসে নিজের মতো কিছু সময় কাটায় স্নেহা। আজকে খুব ভোরেই চলে আসছিল। অধিকাংশ সময় এই ফ্ল্যাট তালাবদ্ধই থাকে। একটা সময় ও একা থাকতে পছন্দ করতো। একাই তো থাকতো ও। জীবনের একটা বিশাল সময় নিজের মতো একা ফ্ল্যাটে, একাই নিজের সঙ্গে সংসার করছে। যেহেতু সবার কপালে সব থাকে না, ওর কপালে যে কারো সঙ্গে যৌথ সংসার লেখা নাই- এটা ও বহু আগেই মেনে নিছে। যদিও ওর যে খুব কারো সঙ্গে সংসার করতে মন চাইছিল কখনো, এমনও না। তবে হঠাৎ হঠাৎ কেমন যেন বিশ্রী রকম একা লাগে। কেমন যেন সব ফাঁকা ফাঁকা।

নিজের সঙ্গ উপভোগ করতে না পারলেই এই নিঃসঙ্গতা জোঁকের মতো মনের ভেতর চেপে বসে ওর। তখনই শুরু হয় অস্থিরতা, নয়তো প্রচণ্ড এক বিষণ্নতায় ক্রমশ সে ডুবতে থাকে অতল অন্ধকারে। আবির জীবনে আসার আগ পর্যন্ত এমন নিঃসঙ্গতা বোধে ও কখনো ভুগছে বলে দূর-দূরান্তের স্মৃতি ঘেটেও মনে পড়ে না ওর। কাজ, অফিস শেষে কলিগদের সঙ্গে আড্ডা, সন্ধ্যায় এক ঘণ্টা হাঁটা, বাসায় ফেরার পর গাছেদের সঙ্গে আলাপচারিতা, গান শোনা, বই পড়া, লেখালেখি…এরমধ্যেই চট জলদি কোনো ডিনার রেডি করতে করতেই রাকিনের সঙ্গে ফোনে কথা বলা। কথা বলতে বলতেই ডিনার শেষ করে আর্লি বেডে চলে যাওয়া…এই ছিল ওর কর্মব্যস্ত দিনের রুটিন।

উইকেন্ডে কখনো রাকিন বা মিতা আপার সঙ্গে গ্লোরিয়া জিন্সে আড্ডায়, নইলে বাসায় শুয়ে-বসে কোনো সিরিজ বা মুভি দেখেই ওর সুন্দর সময় পার হয়ে যেত। এসবের ফাঁকেই সারা সপ্তাহ ধরে জমানো ঘরের কাজগুলাও টুক টুক করে ও সেরে ফেলতো। এরপর ডিনারে কোনো একটা স্পেশাল ডিশ বানিয়ে নিজেকে ট্রিট দিয়ে দিতো- লাইফ ছিল একদম বিন্দাস! এর বাইরে আর কোনো প্যারাই ছিল না ওর।

এর বছর দুয়েক আগে থেকেই ফ্যামিলি বিষয়ক প্যারায় মাথা ঘামানো ছেড়ে দিছিল ও। সবকিছু থেকে দূরে থাকাটাই ও নিজের জন্য শান্তির মনে করতেছিল। শান্তিতে আসলেই ছিল কি না, সেটা হয়তো শিওর বলতে পারবে না। তবে একটা পূর্ণতা সম্ভবত ছিল, স্নেহার মনে হয়। তখন ওর হৃদয় আর আত্মাটা স্ব স্ব স্থানেই ছিল হয়তো, এখন সেসব স্থানচ্যুত হইছে। আবিরের সঙ্গে পরিচয়- ওর এই তিলে তিলে বহু বছর যাবত ধরে গড়ে তোলা শক্ত খোলসটাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিছে।

বহু বছর যাবত একা ফ্ল্যাটে যে নিজের মতো একাই জীবন কাটিয়ে যাইতেছিল, সেই একই মানুষের এখন একা ফ্ল্যাটে বেশিক্ষণ থাকতে দমবন্ধ লাগে। নিজের প্রতি বিশ্বাস এতটাই নষ্ট হয়ে গেছে যে ঘণ্টা খানিক একা থাকলেই ওর মনে হয়, এই বুঝি নিজের কোনো ক্ষতি করে ফেললো এখনই! অথচ আবির যদি গত বছর ওই আড়াইটা দিন সময় ওর সঙ্গে না কাটাতো, এই একাকীত্বের অনুভূতি স্নেহাকে এতটা কাবু করতো বলে ওর মনে হয় না।

এর মানে এই না যে স্নেহা ওর জীবনের সব সমস্যার মূল আবিরকেই মনে করে! রাগ করে আবিরকে যা খুশি বলুক না কেন, ও তো আসলে এটা জানে- নিজে না চাইলে কেউই কাউকে ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে না, করতে পারেও না। স্নেহা এখন মনে করে, ও হয়তো ওর ধ্বংসের সহযাত্রী হিসেবে আবিরকেই বেশি পছন্দ করে ফেলছিল। সমস্যা তো ওর নিজের সিলেকশনেই। অন্যের ঘরের ময়লা ঘেটে আর লাভ কী!

গত বছর আবিরকে রাজশাহীর ফ্লাইটে ওঠিয়ে বাসায় ফেরার পরই স্নেহা একটা বিশাল শূন্যতা টের পেল। ফ্ল্যাটের মেইন ডোরের লক খুলে ঘরে ঢুকতেই সমস্ত কিছু ওর ফাঁকা ফাঁকা লাগা শুরু হলো। তিন বেডরুমের ১২০০ স্কয়ার ফিটের ওই বাসায় ঘুরে ঘুরে স্নেহা তখন বারবার বিড় বিড় করে বলে যাচ্ছিল-

আমার এ ঘর সমস্তটাই ফাঁকা
সহসা মৃত্যু চুমু খায় কপালে;
ইচ্ছে হলে ঘুরে যেও, ফিরে এসো
আমার পৃথিবী অস্থিরতায় স্থির…

আবিরকে এয়ারপোর্টে ড্রপ করে ফ্লাইট ছাড়া পর্যন্ত এয়ারপোর্টের পার্কিংয়েই অপেক্ষা করতেছিল স্নেহা। এর আগের দুইদিন আবির ৬টা ফ্লাইট আর দুইটা বাসের মধ্যে কোনোটা মিস করছে, কোনোটায় ক্যান্সেল করতে সায় দিছে, কোনোটা নিজের ইচ্ছাতেই ক্যান্সেল করছে। ওইটা ছিল ওর ৭ নম্বর ফ্লাইট।

ওই ফ্লাইটটাও মিস হওয়ার পথেই ছিল। শেষমেশ রিজেন্সির সামনে জ্যামে বসে এয়ারলাইন্সে কল করে নিজের পরিচয় দেয় আবির। ইমার্জেন্সি রাজশাহী ফিরতে হবে জানিয়ে ফ্লাইটটা আধা ঘণ্টা ডিলে করাতে রিকোয়েস্ট করে। এছাড়া উপায়ও ছিল না। পরদিন সকালে হেড কোয়ার্টার থেকে ওর চিফ যাওয়ার কথা ওদের ওয়ার্ক স্টেশনে। আবির এর আগে ওইখানে না পৌঁছাতে পারলে বিরাট কেলেঙ্কারি ঘটার সম্ভাবনা ছিল!

যদিও ওই ফ্লাইটটা যদি বাই এনি চান্স মিস হয়ে যায়, এর বিকল্প ব্যবস্থাও জ্যামে বসেই ভেবে রাখছিল স্নেহা। ঢাকায় যেহেতু ওই কয়দিন আবির ওর কাছেই ছিল, তাই সহী সালামত ওর ডেসটিনেশনে পৌঁছাইয়া দেওয়াও স্নেহা নিজের দায়িত্ব মনে করতেছিল। ওইখানে ইশক-মোহাব্বতের রেফারেন্স না টানলেও চলে। যেকোনো অতিথির জন্যই এটা করা কর্তব্য বলেই শিখে আসছে ও। স্নেহা যে শিষ্টাচার বিষয়ক বিরাট আলেম, তেমন ভাববার মতো কারণ নাই যদিও, কিন্তু যতটুকু না থাকলেই না, ওইটুকু ওর আছে বলেই ও বিশ্বাস করতো এতকাল! এখন অবশ্য ওর ঈমান নড়বড়ে হয়ে পড়ছে নানা কারণে।

৭ নম্বর ফ্লাইটটাও মিস হলে বিকল্প পন্থা হিসেবে বাই রোডে যাওয়ার একটা পরিকল্পনা আবিরকে না জানিয়েই স্নেহা মনে মনে করে ফেলছিল। আবিরের সবকিছুতেই অস্থিরতা। ও সমাধান না খুঁজে শুধু সমস্যার সম্ভাবনা আর সমস্যাটাই বারবার রিপিট করতে থাকে। এসব করে নিজেও অস্থির হয়ে যায়, আশেপাশের মানুষকেও অস্থির বানিয়ে ফেলে। ও যখন জ্যামের মধ্যে চুক চুক করে একবার মামের বোতল থেকে হুইস্কি গিলতেছিল, আরেকবার দাঁত দিয়ে নখ কামড়াতে কামড়াতে বলতেছিল- স্নেহা! আই হ্যাভ টু গো বাই টুনাইট! দে উইল কিক ইন মাই অ্যাস্‌, নো ডাউট! স্নেহা তখন ওর কথায় অস্থির না হয়ে বিকল্প পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি সম্পর্কে ভাবতেছিল। 

আবির বারবার অস্থিরতায় নখ কামড়াতে কামড়াতে একই কথাই বলে যাচ্ছিল স্নেহাকে। স্নেহা ওইদিকে মনোযোগ না দিয়ে অফিসের এক জুনিয়রকে কল করে ঘণ্টা খানিকের মধ্যে একটা গাড়ি ম্যানেজ করতে ব্রিফ দিয়ে দিলো। ফ্লাইট কোনো কারণে মিস হলেও যেন ওরা সঙ্গে সঙ্গেই বাই রোডে রাজশাহী রওনা দিতে পারে, কয়েকবারই তা রিপিট করলো কলে। আবির স্নেহার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে কতক্ষণ তাকিয়ে কী দেখলো বা ভাবলো স্নেহা বুঝতে পারলো না। ওই মুহূর্তে তা বোঝার প্রয়োজন আছে বলেও ওর মনে হলো না। তখন ওর একটাই কনসার্ন- ভোরের আগে আবিরকে যেভাবেই হোক রাজশাহীতে পৌঁছাতে হবে।

ঘণ্টাখানিকের মধ্যেই যেন ওরা গাড়ি করে রাজশাহী মুভ করতে পারে, এই ইমার্জেন্সিটা এরমধ্যে কয়েকবারই ওর জুনিয়রকে কল করে বোঝালো স্নেহা। আবিরকে ড্রপ করে আবার ওই গাড়িতেই স্নেহা ঢাকায় ব্যাক করবে বলে মনঃস্থির করে ফেললো। কিন্তু এগুলার আর প্রয়োজন পড়লো না। ফ্লাইটটা আবিরের জন্য আধা ঘণ্টা ডিলে করানো হইছিল। ভিআইপি বা ভিভিআইপি ছাড়া অন্য কোনো সাধারণ যাত্রীর ক্ষেত্রে এটা হয়তো কোনো এয়ারলাইন্সই করতো না।

আবিরকে এর আগে কোনোদিন ওর পরিচয় কোথাও দিতে দেখে নাই স্নেহা। অবশ্য বারের বাইরে কয়বারই বা অন্য কোথাও তাদের দেখা হইছে- এটা ভাবলেই ওর হালকা একটা রাগ ওঠে আবিরের উপর। সবসময় রাগটা দেখানোও যায় না। দেখালেও খুব একটা লাভ হবে বলে মনে হয় না, তাই পারতপক্ষে না দেখানোর চেষ্টাটাই করে। কী যেন একটা গান আছে না? রবীন্দ্রনাথের? স্নেহা মনে করতে থাকে। ওহ! “আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ…।” আবিরের জন্য এর প্যারোডি হতে পারে- আমার এই মদ খাওয়াতেই আনন্দ!

আবিরের আনন্দকে বাধাগ্রস্ত করবে, সেই সাধ্য কি স্নেহার আছে? আবির মনে করে, দুইটা বছর ও একাই ভয়ে জীবন কাটিয়ে গেছে। আর স্নেহা ভাবে- ও হলো নদীর ওপার, যে দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে নিজের ভয়টাকে ক্রমাগত লুকানোর চেষ্টা করে যাইতেছিল। কিন্তু ক্রমাগত এই হারিয়ে ফেলার ভয়টাকে লুকাতে গিয়েই একটা সামান্য ভয়ের ক্ষুদ্র কণা বিশালাকৃতির নিউক্লিয়ার বোমায় পরিণত হলো শেষ পর্যন্ত। ফলাফল-বুউউউউউউউউউম! দুই পারেই অন্ধকার!

ফ্লাইটে ওঠার আগ পর্যন্ত স্নেহাকে বাইরে অপেক্ষা করতে বলে টার্মিনালের ভেতরে ঢুকছিল আবির। ওর আশঙ্কা ছিল ওই ফ্লাইটটাও ও মিস করতে পারে। সেক্ষেত্রে স্নেহাই একমাত্র ওর পরিত্রাণদাতা। অবশ্য আবির না বললেও ফ্লাইট ছাড়া পর্যন্ত স্নেহা এমনিতেও অপেক্ষা করতো। “তুই তো গল্পের নায়িকা, তুই কেন নায়কের পার্টে অভিনয় করতেছিস?”- স্নেহার এইসব স্বভাবের জন্য রাকিন প্রায়ই এই ডায়লগ দিয়ে ওর লেগ পুল করার ট্রাই করে।

স্নেহা যদিও রাকিনের এসব কথা খুব একটা গায়ে মাখে না। তবে আবিরকে মাঝে মাঝে স্নেহা নিজেই দুষ্টুমি করে বলতো- তুমি তো অন্যের আমানত! আমার কাছে থাকলে তোমাকে সুরক্ষিত রাখা আর সহিসালামত গন্তব্যে পৌঁছিয়ে দেওয়া আমার রেসপনসিবিলিটি। ইভেন যতক্ষণ তুমি আমার সঙ্গে আছো, ততক্ষণই তুমি আমার দায়িত্ব। আমানতের খেয়ানত করা উচিত না বলে ও একটা হাসির আবহ তৈরি করার চেষ্টা করলেও প্রতিবারই আবিরের দীর্ঘশ্বাসের কারণে ব্যর্থ হতো।

আবির ভেতরে ঢুকার কিছুক্ষণ পর ও ফ্লাইটে ওঠতে পারছে আর ফ্লাইট কিছুক্ষণের মধ্যেই ছাড়বে- এই খবরটা এয়ারলাইন্সের এয়ারপোর্ট ব্র্যাঞ্চে কল করে নিজেই জেনে নেয় স্নেহা। নির্ভার হয়ে এরপর ওয়েটিংয়ে থাকা উবার ড্রাইভারকে গাড়ি স্টার্ট দিতে বলে। একদিকে আবিরের ফ্লাইটে ওঠার খবরে ও যেমন নির্ভার ফিল করতেছিল, অন্যদিকে ওর কিছুটা আফসোস বোধও হইতেছিল।

নিজেকে হঠাৎই ওর লোভী লোভী লাগতেই বিশ্রী ফিলিং হলো! জীবনে কোনোকিছুতেই ও লোভ করে নাই, অথচ গাড়িতে রাজশাহী পর্যন্ত গেলে আরো কিছুটা সময় আবিরকে পাশে পাওয়া যেতো- এমন বিশ্রী একটা লোভ কিছুক্ষণের জন্য ওকে আফসোস করালো। পরদিনই ছিল স্নেহার জন্মদিন। বাই রোডে রাজশাহী গেলে অন্তত জন্মদিনের প্রথম প্রহরটায় আবিরের সঙ্গে থাকা হতো, এমনটাই মনে হতেই একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো ও!

স্নেহার জীবনে আনন্দের বা বিশেষ মুহূর্তের উপলক্ষ খুব কম আসছে। ও দাবি করে- এসব দিন ও হাতে গুনেই বলে দিতে পারবে। স্নেহা আরো দাবি করে- এসব আনন্দের দিনগুলার অধিকাংশই আবিরকে কেন্দ্র করেই বা আবিরের কৃপায় পাওয়া। এখন এইগুলাকে ওর কৃপাই মনে হয়! আগামী বছর এইদিনে আবিরই বা কই থাকবে, ও-ই বা কই থাকবে! ওদের সম্পর্কই বা কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে, অথবা থমকে যাবে- এগুলা ভাবতে ভাবতে স্নেহার চোখ সামান্য ভিজে ওঠে।

ডান হাত দিয়ে ভিজে ওঠা চোখ মুছতে যাওয়ার মাঝ রাস্তাতেই আবিরের কল আসে। স্নেহার উবার তখন এলিভেটর এক্সপ্রেসের টোলের সিরিয়ালে দাঁড়ানো। কল রিসিভ করেই স্নেহা বললো- তুমি ফ্লাইটে ওঠছো, খবর পাইছি। আবির অস্থির কণ্ঠে বলতে থাকে- স্নেহা...স্নে...হা...স্নেহা...। স্নেহা শান্ত স্বরে বলে, আমি শুনতেছি তো আবির, বলো। ফ্লাইটের মানুষদের কাছে এটা প্রুভ করার দরকার আছে যে তুমি ড্রাঙ্ক?

আবির আবার বলে- স্নে....হা, এ্যাই মেয়ে...আই লাভ ইউ। স্নে...হা...আই লাভ ইউ...আই লাভ ইউ। হ্যালো। আর ইউ লিসেনিং? স্নেহার দুই চোখ দিয়ে ঝর ঝর করে পানি ঝরতে থাকে। আবির আবার ডাকে- স্নেহা...স্নেহা...। স্নেহা খুব শান্তভাবেই উত্তর দেয়- ঠিক আছে তো। শুনলাম তো। আই লাভ ইউ টু। কিন্তু এর পরপরই আবির বলে- স্নেহা...স্নেহা..আমাদের আর কখনো দেখা হবে না। স্নেহার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে। ও এরকমই কিছু আশঙ্কা করতেছিল আগে থেকে।

সেদিন ছিল ২৬ ফেব্রুয়ারি। রাত আটটা ৪০ মিনিট। ২৪ ফেব্রুয়ারির রাত পৌঁনে দশটা থেকে ২৬ তারিখ রাত আটটা ২৭ মিনিট পর্যন্ত টানা ৪৬ ঘণ্টা ৪২ মিনিট আবির স্নেহার সঙ্গে ছিল। ৯ বছর আগে বিপুলের সঙ্গে সেপারেশনের পর ওই প্রথম টানা এতটা সময় স্নেহা কারো সঙ্গে ছিল, যাকে আবার ও ভালোও বাসে। সম্ভবত আবিরের মতো করে কাউকেই কখনো ও ভালোবাসে নাই, এটা স্নেহার মনে হয় আর কী। তবে ও এটাও ফিল করে- এই অনুভূতি একইসঙ্গে আনন্দের, বেদনার, ভয়ের আবার ওর বিষন্নতারও কারণ।

স্নেহা...এখন ফ্লাই করবো, নেটওয়ার্ক চলে যাবে। স্নে.....হা- আবিরের কণ্ঠ কানের এত কাছে, অথচ মনে হইতেছিল ও অনেক দূরে চলে যাইতেছে। স্নেহা গলা পরিষ্কার করে শান্ত স্বরেই বললো- হ্যাভ অ্যা সেইফ জার্নি, আবির। পৌঁছানোর পর টেক্সট দিও। স্নেহার ইচ্ছা করতেছিল তখনই ফোনটা ভেঙে চুরমার করে দিতে, কিন্তু আবির সেইফলি পৌঁছানো পর্যন্ত ও ধৈর্য্য ধরতে চাইলো। তবে নিজের ভেতরের কান্নাটাকে কন্ট্রোল করতে পারলো না কোনোভাবেই।

উবারের ড্রাইভার লুকিং গ্লাসে কিছুক্ষণ পর পর স্নেহাকে দেখতেছিলেন। বয়স্ক ভদ্রলোক। তার চোখেমুখে একটা মায়াও দেখা যাচ্ছিল। নেহাতই উবার চালাচ্ছিলেন বলে ওই মায়া তার কণ্ঠ পর্যন্ত আনা থেকে সম্ভবত বিরত থাকতেছিলেন উনি। স্নেহা কয়েকবার চেষ্টা করলো নিজেকে সামলানোর, শেষ পর্যন্ত আর পারলো না। অবশ্য আবিরের সঙ্গে স্নেহার মোটামোটি সমস্ত বিদায় পর্ব এমনই হয়। ওইবারই প্রথমবার আবির এমন নির্বোধের মতো কাণ্ড করে নাই।

প্রতিবারই স্নেহা এভাবেই যন্ত্রণা পায়। কখনো কান্না লুকায়, কখনো নিজেকে হাউমাউ করে কাঁদতে দেয়। সেদিনও ওই মুহূর্তে যেমন অনেক চেষ্টা করার পর নিজেকে ও ছেড়ে দিলো আল্লাহর ওয়াস্তে- নাও, কাঁদো তোমার প্রভুর নামে! উবারে বসেই নিজেকে কাঁদতে দিলো, ইচ্ছামতো বুকের যন্ত্রণা নামতে দিলো। কিন্তু যন্ত্রণা আর কমে কই!

হাতিরঝিলের কাছাকাছি আসতেই আবিরের টেক্সট আসলো- এ্যাই মেয়ে...স্নেহা...মা...তুমি আমার আম্মা...।একটার পর একটা টেক্সট করতে থাকে আবির, অধিকাংশই এলোমেলো। তখনো ও কিছুটা ড্রাঙ্ক, স্নেহা বুঝতে পারে। আবির পৌঁছাইছে কি না জানতে চাইলে ও লেখে, জাস্ট ল্যান্ডেড। স্নেহা আস্তে আস্তে টাইপ করে- ওকে, আবির। টেক কেয়ার অফ ইউরসেল্ফ। আল্লাহ যেন আজকে থেকেই তোমার মনোবাসনা পূর্ণ করে। টেক্সট সেন্ড করেই ফোনের সুইচটা অফ করে আবার কান্নায় ভেঙে পড়ে ও।

উবারের ড্রাইভার আর নিজেকে অযাচিতভাবে মায়া দেখানো থেকে বিরত রাখতে পারলেন না। গাড়িটা হালকা স্লো করে টিস্যুর বক্সটা পেছনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন- আন্টি, কাঁদলে কোনোকিছু চেঞ্জ হয় না, তবে হালকা লাগে। আপনি হালকা হন, দুর্বল হইয়েন না। বাসা থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত আবির-স্নেহার সমস্ত কনভারসেশনই ওই ভদ্রলোক শুনছেন। ওদের মধ্যে কী সম্পর্ক, সেটা উনার না বোঝার কোনো কারণ নাই। স্নেহা টিস্যুর বক্সটা হাতে নিয়ে কান্না সামলানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু ওর তখন শুধু আব্বার কথা মনে পড়তেছিল।

চেজিং দ্য ড্রাগন: দ্য ব্লু বার্ড

Comments

    Please login to post comment. Login