Posts

উপন্যাস

চেজিং দ্য ড্রাগন: ৪৬ ঘন্টা ৪২ মিনিট

March 14, 2026

Shifat Binte Wahid

Original Author সিফাত বিনতে ওয়াহিদ

166
View

বসন্তের ভর দুপুরে ছোট্ট স্টুডিও এই অ্যাপার্টমেন্টটার ফ্লোরে দুই পা ছড়িয়ে বসে সুঁইয়ের নড়াচড়া নিয়ে ভীষণ পেরেশান হয়ে আছে স্নেহা। পেছনেই ল্যাপটপের ফোল্ডিং টেবিলটার উপরে রাখা জেবিএল ফ্লিপ সেভেন পোর্টেবল ওয়্যারলেস স্পিকারটায় বাজতেছে উস্তাদ মেহদি হাসান-

“আপ তো নাজদিক সে নাজদিক-তার আ তে গেয়ে

পেহ্‌লে দিল, ফির দিলরুবা, ফির দিল কে মেহ্‌মান হো গেয়ে

রাফতা রাফতা ও মেরি হাস্তি কা সামা হো গেয়ে।”

কিন্তু এই গজলটার একটা সমস্যা এত বছরে এই প্রথম স্নেহা আবিষ্কার করলো এবং তাও আবার এই মুহূর্তেই। এখন তার বয়স চল্লিশ হলে মিনিমাম ত্রিশ বছর যাবত সে এই গজল শুনতেছে, অর্থাৎ দশ বছর বয়সে কিংবা নয় বছর বয়স পূর্ণ করার কয়েক মাস পর থেকে হবে। সে তার আব্বার বিলাতি গ্রামোফোনে প্রথম এই গজল শুনছিল। সন-তারিখ-ক্ষণ যদিও এখন আর মনে নাই, কিন্তু এতকাল কেন তার “প্যায়ার যাব হাদ সে বাড়হা, সারে তাকাল্লুফ মিট গেয়ে” লাইনটারে সমস্যা মনে হয় নাই?

এই ভাবনা ভাবতে গিয়েও কিছুক্ষণ সুঁই-লাইটারের মিস্ত্রিগীরি বন্ধ রাখতে হইছে। মিষ্টিমুখ করার পথে এত যান্ত্রিক ত্রুটি অসহনীয়। এর মধ্যে আবার উস্তাদের এই মিষ্টি লাইন স্নেহাকে যে ঠিক এই মুহূর্তে কী একটা তিতা ভাব দিতেছে, তা নিয়ে সে ভাবতেছে মোটামোটি মি ভার্সেস মি- শিরোনামে একটা বিতর্ক প্রতিযোগীতার আয়োজন হয়ে যেতে পারে।

স্নেহা হালকা রি-ওয়াইন্ড করে আবার গেল একই লাইনে। তারপর তার মনে হলো, নাহ! ঠিকই আছে অবশ্য। গানে-গজলে, গল্প-নভেলে, সিনেমার পর্দায় এইসব মিঠা মিঠা প্রেম কাহিনী থাকতেই পারে, এইগুলা তো আর বাস্তব না! সেই তুলনায় কবিতাকে কিছুটা বাস্তব, গ্রহণযোগ্য মনে হয়। কবিতাগুলা সব কবিদের মতোই চির দুঃখী! ‘তাকাল্লুফ’ শব্দটা কয়েকবার জোরে জোরেই উচ্চারণ করলো সে।

বেশ মজার শব্দ। উচ্চারণে একটা আভিজাত্যের ভাব আছে। এই একলা ফ্ল্যাটে স্নেহা নিজেই নিজের শিক্ষক, নিজেই নিজের শিক্ষার্থী হয়ে একা একা কথা চালিয়ে যাচ্ছে। ’তাকাল্লুফ' বলতে বলতে তার মনে হলো- উর্দু কী মিষ্টি একটা ভাষা! শুধু রাজনৈতিক কারণে এই ভাষাটাকে এই দেশের অনেক মানুষ না বুঝেই কটাক্ষ করে। অথচ উর্দুর শব্দের ভাণ্ডার কত সমৃদ্ধ। এক প্রেমকেই যে উর্দুতে কত নামে ডাকে- ইশক, পেয়্যার, মোহাব্বাত, উলফাত, চাহাত, আশিকি, জুনুন, দিলবারি, দিললাগি…আর না জানি কত কী!

এখানেও কাহিনী আছে, স্নেহার মনে পড়ে। সে কোনো একটা লেখায় একবার পড়ছিল, এই সবগুলা শব্দ দিয়ে ভালোবাসা বোঝায় ঠিকই, কিন্তু এদের মধ্যেও আবার আলাদা আলাদা স্তর আছে। পেয়্যার দিয়ে যেই ভালোবাসা বোঝায়, ইশক বা জুনুন দিয়ে একই ভালোবাসা বোঝায় না! ভালোবাসারও রকম ফের আছে, আবার সেইগুলার জন্য আলাদা আলাদা শব্দও আছে। ভাবা যায় এইগুলা? মাথা চুলকাতে চুলকাতে বিড় বিড় করে স্নেহা। মাথায় প্রচুর সাদা চুল আগাছার মতো গজিয়ে হঠাৎ হঠাৎ চুলকানোর উপদ্রব শুরু হইছে ইদানিং। এটা একটা বিরক্তিকর ব্যাপার।

যদিও তার জীবনে সহনীয় ব্যাপার কী আছে- এটা মনে করতেই হাসির ছলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলার ট্রাই করলো, সেটাও ভেতর থেকে ঠিকঠাক বের হইতেছে না। শালার কপাল! একলা ফ্ল্যাটে চিৎকার করে সে বলে ওঠলো- এসনেহা, দেখো তোমার দীর্ঘশ্বাসেরাও তোমার সঙ্গে বিট্রে করতেছে! ই-উ-জ-লে-স! কিন্তু খালি ফ্ল্যাটে নিজের শব্দ দেয়ালে বাড়ি খেয়ে তার কানেই গম গম করে বাজতে থাকলে স্নেহা খেয়াল করলো, সে নিজেকে স্নেহা না ডেকে, এসনেহা সম্বোধন করছে।

ছোটবেলায় স্নেহাদের বাড়িতে একজন মেইড থাকতেন- স্বপনের মা বুয়া। তার নাম ছিল ফিরোজা। উনার গলায় একটা রূপার চেইনের মাঝখানে ঝুলানো লকেটে ‘ফিরোজা’ লেখা ছিল, স্নেহার এখনো মনে আছে। স্নেহার তখন সম্ভবত মাত্র অক্ষর জ্ঞান হইতেছিল। সে ফিরোজা বুয়ার কোলে উঠলে লকেটটা খুলে বানান করে পড়তো- ফ রশ্‌শো ই ফি, র ও-কার রো, বর্গীয় জ আকার- জা…ফি-রো-জা!

উনার একমাত্র ছেলের নাম স্বপন, মানে ফিরোজা বুয়া তা-ই বলতেন সবার কাছে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময়। নিজেকে উনি পরিচয় করাতে পছন্দ করতেন ‘স্বপনের মাও’ বলে। ময়মনসিংহ-কাওরাইদ অঞ্চলের মানুষ সম্ভবত মাকে মাও বলে ডাকতে অভ্যস্ত ছিল এক সময়, নাকি এখনো ডাকে? এ বিষয়ে তেমন একটা জ্ঞান নাই স্নেহার। তবে ফিরোজা বুয়া খুব গর্ব নিয়ে নিজেকে ‘স্বপনের মাও’ বলতেন।

এই পরিচয়ে তার মধ্যে একটা তৃপ্তি দেখা যেত। ছেলের নামটা তিনিই রাখছিলেন। উনি প্রেগনেন্ট থাকা অবস্থাতেই স্বপনের আব্বা তাকে ছেড়ে চলে গেছিলেন। পরে ওই লোক আরেকটা বিয়ে করছেন। তো এই স্বপন যখন স্নেহার নানাজানের মাদ্রাসায় দাখিল পাশ দিলেন, তখন থেকে সে নিজেকে পরিচয় করাতেন শামীম নামে। স্বপন বললে খুবই বিরক্ত হতেন। স্নেহাকেও কিছুদিন উনি কায়দা পড়াইছেন, সেই সূত্রে তাকে ডাকতে হতো শামীম হুজুর। স্বপন হুজুর ডাকলেই তার চেহারা কালো হয়ে যেত। এই রহস্য স্নেহা উন্মোচন করছে বড় হওয়ার পর।

স্বপন সংস্কৃত শব্দ ‘স্বপ্ন’ থেকে আসছে। এর অর্থও তেমন সুবিধার না। সব স্বপ্ন যে ভালো হবে, সেটার কোনো গ্যারান্টি নাই। স্বপ্ন খারাপ হওয়ার অহরহ নজির আছে। আর শামীম শব্দটা আসছে আরবী থেকে। ফার্সিতেও এই শব্দ বহুল প্রচলিত। এর অর্থ হচ্ছে ‘সুবাস’ বা ‘সুগন্ধী’, তাও আবার এই নামের মাধ্যমে সম্ভবত পবিত্র সুবাসই বুঝাইয়া থাকে। দাখিল পড়াকালীন সময় স্বপন ওরফে শামীম হুজুরকে মাদ্রাসার কোনো বড় হুজুর হয়তো এই দুই নামের বুৎপত্তি স্থল এবং অর্থ বুঝাইয়া মায়ের দেওয়া নাম ত্যাগ করাইছেন। নিশ্চয় মায়ের দেওয়া নামের চেয়ে ধর্মের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বড়!

সেই স্বপন অথবা শামীম হুজুরের মা, ফিরোজা বুয়া স্নেহাকে ডাকতেন ‘এসনেএএহা। তাও আবার ‘এস’ বলার পর ‘হা’ এর আগে ‘নে’ তে উনি দুই আলিফ টান দিয়ে ডাকতেন। এমন ঘোর অমাবস্যা কালে ফিরোজা বুয়ার কথা তার হঠাৎ খুব মনে পড়তেছে। নামটা ঠিকমতো উচ্চারণ করতে না পারলেও উনি স্নেহাকে ছোটবেলায় প্রচণ্ড আদর করতেন। মানুষ আদরের কাঙাল, যেখানেই আদর পায়, ঋণী হয়ে থাকে। স্নেহা চোখটা বন্ধ করে ফিরোজা বুয়ার জন্য আল্লাহর কাছে বিড় বিড় করে বললো- হে খোদা! ফিরোজা বুয়া যেমনভাবে আমাকে ছোটবেলায় স্নেহ-মমতায় আগলাইয়া রাখছিলেন, তুমি তাকে তেমন মমতায় সুরক্ষিত রাইখো। আমিন।

দোয়া-প্রার্থনা শেষে স্নেহা আবার সুঁই-লাইটারের কারিগরিতে মশগুল হওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু কেমন যেন একটা বিশ্রীরকম বিষণ্নতা তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়াইয়া ধরে আছে; দুনিয়ার সবাই তাকে ছেড়ে চলে গেলেও, এই দুঃখবোধ কোনোভাবেই তাকে ছেড়ে যাইতেছে না। বিংশ শতাব্দীতে নাকি মানুষের শোকের আয়ু বড় জোর এক বছর? এমনটাই লেখছিলেন নাজিম হিকমত। কবিরা অবশ্য আবেগে অনেক ভুলভাল লেখেন। কবিদের সব আবেগ আর সব লেখাকে এত সিরিয়াসলি নেওয়ার কিছু দেখে না স্নেহা। এটা অবশ্য একবিংশ শতাব্দী চলতেছে। শোকের আয়ু কি কিছুটা বাড়লো? হিসাবে তো কমার কথা।

দশ টাকার লাইটারের ফুটায় সুঁই সেট করতে ব্যর্থ হয়ে স্নেহা এখন বিশ টাকার লাইটারের সঙ্গে কারিগরি শিক্ষার পরীক্ষা দিতে নামবে। ঠিক এর আগ মুহূর্তে তার ভিকি কৌশলের একটা সিনেমার কথা মনে পড়লো- “মাসান”। ওইখানে ভিকির প্রেমিকা অ্যাক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার পর সে দুঃখে-যন্ত্রণায় বন্ধুদের সঙ্গে নৌকার উপর মদ খেতে খেতে বলতেছিল- “শালা এ দুখ কাহে খাতাম নেহি হোতা বে!” এই ডায়লগটা স্নেহার জীবনের সিলেবাসে কমন পড়ছে।

দুনিয়ার সব বিষয় তো আর স্নেহার জীবনের সিলেবাসে কমন পড়বে না। মাসানের ওই অকালে প্রেমিকা হারানো প্রেমিকের দুঃখের মতো স্নেহার দুঃখও অফুরন্ত! শেষই হইতেছে না! ফলে উস্তাদ জী যখন গাইতেছেন, “পেয়্যার যাব হাদ সে বাড়হা, সারে তাকাল্লুফ মিট গেয়ে”, অর্থাৎ প্রেম যখন চরমে পৌঁছায়, আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজনীয়তা ফুরায় আর কী। 

তাকাল্লুফ বলতে এইখানে জড়তাকে বুঝায়ে থাকবে, যেটা মূলত প্রেম প্রেম বোধ হওয়ার সময়ই শুধুমাত্র থাকে। প্রেমটা দুই তরফ থেকে হয়ে গেলেই আর এসবের বালাই থাকে না। তখন চলে শুধু অভিযোগ করা আর অভিযুক্ত হওয়ার সিলসিলা। কিন্তু দুনিয়ার সব পেয়্যার হাদ সে বেড়ে গেলে কি একই রকম ঘটনা ঘটে উস্তাদ জী?

সিলেবাস কমন পড়ে নাই! আরো কত কথা যে স্নেহার মনে আসতেছে এই এক গজলের লাইন থেকে। যেমন এই দুনিয়ায় যেটাকে বলে পেয়্যার, সেটা কয়জনই বা এক্সপেরিয়েন্স করছে ঠিকঠাক? অধিকাংশই তো একতরফা দাখিলা পদ্ধতির মতো অসম্পূর্ণ। অবশ্য এটা এক হিসেবে ভালো। কখনোই না পাওয়ার বেদনার চেয়ে, পেয়ে হারানোর কষ্ট তুলনামূলকভাবে বেশি যন্ত্রণার।

মিষ্টির দুনিয়ায় প্রবেশ করলে এই এক প্যারা। কত কত যে ভাবনা মাথায় গিজ গিজ করে! কত প্রশ্ন! প্রশ্নের ভেতর আবার গুটি কয়েক এমবেডেড প্রশ্ন! এতসব সওয়াল-জবাব, গজল-কবিতা-গান-সিনেমা-ফিলোসফি কপচাইয়াও মাসানের ভিকি কৌশলের ওই ক্যারেক্টারটার মতো স্নেহার দুঃখ কোনোভাবেই শেষ হইতেছে না।

মুড ভালো থাকলে অথবা নরমাল সময়ে উস্তাদের এই গজলের সঙ্গে স্নেহা নিজেও গলা মেলানো শুরু করতো। বহু আগে থেকেই এই গজল তার পছন্দের। কিন্তু এই মুহূর্তে এই গজল তার বিষের মতো লাগতেছে। তবু সে নিজের ধৈর্য্যের পরীক্ষা করতে পুরাটাই খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতেছে যেন গত ত্রিশ বছর বা তার কাছাকাছি সময় এই গজল শুধু সে শোনার খাতিরে শুনছে, আজকে এই গজলের পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে সন্ধি বিচ্ছেদ করা হবে। দুই-একবার ‘রিপিট’ বাটনে চাপ দিয়ে যতক্ষণ কলিজা পুড়তে পুড়তে আর পোড়া ভাবটা টের পাওয়া যাবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত শুনতে মন চাইলো তার। কিন্তু এরমধ্যেই আসতেছে আবরারের ফোন।

এখন কাউন্সেলিংয়ের সেশনে বসার অথবা থেরাপিস্টের জ্ঞান-গর্ভ উপদেশ শোনার মতো অবস্থা স্নেহার নাই। লাইটার থেকে বারবার সুঁই লাফ দিয়ে কই কই পড়ে যাইতেছে, সেটা আবার দুইটা লাইট জ্বালিয়ে খুঁজে আনতে হইতেছে। এইদিকে মুখের সঙ্গে হাতও কাঁপাকাঁপি শুরু হইছে। যাক, সব ধ্বংস হয়ে যাক৷ আর কী বাকি আছে ধ্বংস হওয়ার- একবার ভাবে সে।

কিন্তু এক সময় নিজেকে এমন দুর্বল অবস্থায় দেখতে স্নেহা ঘৃণা করতো। এখনকার বাস্তবতা ভিন্ন। এখন সে ভেতর থেকে পুরাটাই ১/১১ এর টুইন টাওয়ারের মতো ধ্বংসাবশেষ। যদিও ওইখানে এখন নাকি ওয়ান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার না কী যেন নামে ইউএসএ’র সবচেয়ে উঁচু ভবন বানানো হইছে। ওইটার নাকি আবার একটা নিকনেমও আছে- ফ্রিডম টাওয়ার।

স্নেহা ভাবে- শালা ভালোবেসে, আদর করে, কিংবা অবজ্ঞাতেও তো কেউ কোনোদিন কোনো বিশেষ নামে ডাকলো না তারে! অথচ একটা জড় পদার্থেরও নাকি নিকনেম থাকে! নিজেকে একটা জড় পদার্থের চেয়েও অপদার্থ লাগে তার! টাকা থাকলে মানুষ কত কী যে করে! স্নেহা সুঁই খুঁজতে খুঁজতে ভাবে- টাকায় খালি মানুষ পাওয়া যায় না; নাহ, যায় মনে হয়!

পিকি ব্লাইন্ডার্সে টমি শেলবি তার প্রেমিকাকে একটা ডায়লগ দেয় না? “এভ্রিওয়ান ইজ হোর, গ্রেস। উই জাস্ট সেল ডিফরেন্ট পার্টস অফ আওয়ারসেলভস।” স্নেহার জীবনের সিলেবাসে আবার কিছু একটা কমন পড়ার আনন্দ সুঁইটারে না পাওয়ার বেদনা কয়েক মুহূর্ত ভুলাইয়া রাখে। স্নেহা চিৎকার করে নিজেকে বলে- জ্বি, মুহতারামা, আপনি নিজেও এক প্রকার বেশ্যা! জীবনে নিজের কিছু না কিছু তো সে অবশ্যই বেচছে, স্নেহা ভাবে। এরপর মনে পড়লো- আত্মমর্যাদা! যাহ! সে তো তাহলে দ্য কুইন অফ বেশ্যা!

মন খারাপ থাকলে বসুন্ধরার এই ছোট্ট ফ্ল্যাটটায় এসে নিজের মতো কিছু সময় কাটায় স্নেহা।আজকে খুব ভোরেই চলে আসছিল। বাকিটা সময় এই ফ্ল্যাট তালাবদ্ধই থাকে। একটা সময় স্নেহা একা থাকতেই পছন্দ করতো, একাই তো থাকতো সে। জীবনের একটা বিশাল সময় নিজের মতো একা ফ্ল্যাটে, একাই নিজের সঙ্গে সংসার করছে। যেহেতু সবার কপালে সব থাকে না, তার কপালে কারো সঙ্গে যৌথ সংসার লেখা নাই, এটা সে মেনেই নিছে বহু আগে। যদিও তার যে খুব কারো সঙ্গে সংসার করতে মন চাইছে, এমনও না। তবে হঠাৎ হঠাৎ কেমন যেন বিশ্রী রকম একা একা লাগে। কেমন যেন সব ফাঁকা ফাঁকা।

নিজের সঙ্গ উপভোগ করতে না পারলেই এই নিঃসঙ্গতা তার মনে জোঁকের মতো চেপে বসে, আর তখনই শুরু হয় একবার অস্থিরতা, নয়তো প্রচণ্ড বিষন্নতা। আবির তার জীবনে আসার আগ পর্যন্ত এমন নিঃসঙ্গতা বোধে সে কখনো ভুগছে বলে দূর-দূরান্তের স্মৃতি ঘেটেও তার মনে পড়ে না। কাজ, অফিস শেষে কলিগদের সঙ্গে আড্ডা, সন্ধ্যায় এক ঘণ্টা হাঁটা, অফিস থেকে বাসায় ফেরার পর গাছেদের সঙ্গে আলাপচারিতা, গান শোনা, বই পড়া, লেখালেখি। এরমধ্যেই নিজের জন্য শর্ট টাইমে রেডি করে ফেলা যায় এমন কিছু বানাতে বানাতে রাকিনের সঙ্গে ফোনে কথা বলা। কথা বলতে বলতেই ডিনার শেষ করে আর্লি বেডে চলে যাওয়া। এই ছিল তার কর্মব্যস্ত দিনের রুটিন।

উইকেন্ডে কখনো রাকিন, কখনো বা মিতা আপার সঙ্গে গ্লোরিয়া জিন্সে আড্ডা, আর নইলে বাসায় শুয়ে-বসেই কোনো একটা সিরিজ বা মুভি দেখা। এরমধ্যেই ঘরের সারা সপ্তাহের জমানো কাজ টুক টুক করে করতে করতে নিজেকে স্পেশাল ফিল করাতে কোনো স্পেশাল ডিশ বানানো- ব্যাস! লাইফ ছিল একদম বিন্দাস! এর বাইরে আর কোনো প্যারাই ছিল না স্নেহার। ফ্যামিলি-ট্যামিলির প্যারাতে এর বছর দুয়েক আগে থেকেই সে মাথা ঘামানো ছেড়ে দূরে থাকাটাই নিজের জন্য শান্তির মনে করতেছিল।শান্তিতে আসলেই ছিল কি না, সেটা হয়তো সে শিওর বলতে পারবে না, তবে স্নেহা মনে করে একটা পূর্ণতা ছিল। তখন তার হৃদয় আর আত্মাটা তার ভেতরে নিজ নিজ জায়গাতেই ছিল হয়তো, এখন সেসব স্থানচ্যুত হইছে।

আবিরের সঙ্গে পরিচয় তার এই তিলে তিলে বহু বছর যাবত ধরে গড়ে তোলা শক্ত খোলসটাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিছে। একা ফ্ল্যাটে বহু বছর যাবত যে নিজের মতো একাই জীবন কাটিয়ে যাচ্ছিল, আজকে সেই মানুষেরই একা ফ্ল্যাটে বেশিক্ষণ থাকতে দমবন্ধ লাগে। নিজের প্রতি তার বিশ্বাস এতটাই নষ্ট হয়ে গেছে যে ঘণ্টা খানিক একা থাকলেই মনে হয়- এই বুঝি সে নিজের কোনো ক্ষতি ফাইনালি কার্যকর করে ফেলবে! অথচ আবির যদি গত বছর ওর সঙ্গে টানা ওই ৪৬ ঘণ্টা সময় না কাটাতো, স্নেহার এই একাকীত্বের অনুভূতি অন্তত তাকে এতটা কাবু করার ক্ষমতা রাখতো কি না, এ বিষয়ে তার যথেষ্ট সন্দেহ আর প্রশ্ন আছে!

এর মানে এই না যে স্নেহা মনে করে তার জীবনের সব সমস্যার মূল আবির! আবিরকে রাগ করে স্নেহা যা খুশি বলুক না কেন, যখন নিজের সঙ্গে সে একলা থাকে, তখন তো সে জানে- নিজে না চাইলে কেউই কাউকে ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে না, করতে পারেও না। স্নেহা এখন মনে করে, সে হয়তো তার ধ্বংসের সহযাত্রী হিসেবে আবিরকেই বেশি পছন্দ করে ফেলছিল। এর অর্থ সমস্যা তার বাছাইয়ের মধ্যেই। অন্যের ঘরের ময়লা ঘেটে আর লাভ কী!

গত বছর আবিরকে যেদিন রাজশাহী যাওয়ার জন্য ফ্লাইটে উঠিয়ে স্নেহা বাসায় ফিরলো, মেইন ডোরের লক খুলে ঘরে ঢুকতেই সমস্ত কিছু কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল তার। তিন বেডরুমের ১২০০ স্কয়ার ফিটের একটা বাসায় ঘুরে ঘুরে স্নেহা বারবার বিড় বিড় করছিল-

আমার এ ঘর সমস্তটাই ফাঁকা

সহসা মৃত্যু চুমু খায় কপালে;

ইচ্ছে হলে ঘুরে যেও, ফিরে এসো

আমার পৃথিবী অস্থিরতায় স্থির।

আবিরকে এয়ারপোর্টে ড্রপ করে ফ্লাইট ছাড়া পর্যন্ত সে এয়ারপোর্টের পার্কিংয়েই অপেক্ষা করতেছিল। এর আগের দুইদিনে আবির ৬টা ফ্লাইট আর দুইটা বাসের মধ্যে কোনোটা মিস করছে, কোনোটায় ক্যান্সেল করতে সায় দিছে, কোনোটা নিজের ইচ্ছাতেই ক্যান্সেল করছে। ওইটা ছিল ওর ৭ নম্বর ফ্লাইট। সেটাও মিস হওয়ার পথেই যাচ্ছিল।

শেষমেশ রিজেন্সির সামনে জ্যামের মধ্যে বসেই আবির এয়ারলাইন্সে নিজের পরিচয় দিয়ে ফ্লাইট আধা ঘণ্টা ডিলে করাতে রিকোয়েস্ট করলো। এছাড়া উপায়ও ছিল না। পরদিন সকালে ওর হেড কোয়ার্টার থেকে চিফ যাচ্ছিলেন ওদের ওয়ার্ক স্টেশনে। আবির এর আগে যদি সেখানে না গিয়ে পৌঁছাতে পারে, বিরাট কেলেঙ্কারি ঘটার সম্ভাবনা ছিল!

যদিও জ্যামে বসে থাকতে থাকতেই ফ্লাইট যদি বাই এনি চান্স মিস হয়ে যায়, এর বিকল্প ব্যবস্থাও ভাবছিল স্নেহা। ঢাকায় যেহেতু এই কয়দিন আবির ওর কাছেই ছিল, তাই সহী সালামত তাকে তার ডেসটিনেশনে পৌঁছাইয়া দেওয়াও স্নেহার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এখানে ইশক-মোহাব্বতের রেফারেন্স না টানলেও চলে। যেকোনো অতিথির জন্যই এটা করা কর্তব্য বলেই শিখে আসছে সে। সে যে শিষ্টাচার বিষয়ক বিরাট আলেম, তেমন ভাববার মতো কারণ নাই। কিন্তু যতটুকু না থাকলেই না, ততটুকু তার আছে বলেই সে বিশ্বাস করতো এতকাল! এখন অবশ্য তার ঈমান নড়বড়ে হয়ে পড়ছে নানা কারণে।

আবিরের ৭ নম্বর ফ্লাইটটাও মিস হলে বিকল্প পন্থা হিসেবে বাই রোডে যাওয়ার একটা পরিকল্পনা স্নেহা মনে মনে করে ফেলছিল আবিরকে না জানিয়েই। আবিরের সবকিছুতে অস্থিরতা। ও সমাধান না খুঁজে শুধু সমস্যার সম্ভাবনা আর সমস্যাটাই বারবার রিপিট করতে থাকে। এতে নিজেও অস্থির হয়ে যায়, আশেপাশের মানুষকেও অস্থির বানিয়ে ফেলে। তো আবির যখন জ্যামের মধ্যে চুক চুক করে একবার মামের বোতল থেকে হুইস্কি গিলে, আরেকবার দাঁত দিয়ে নখ কামড়াতে কামড়াতে বলে- স্নেহা! আই হ্যাভ টু গো বাই টুনাইট! দে উইল কিক ইন মাই অ্যাস্‌, নো ডাউট!

নেহা ওর কথায় অস্থির না হয়ে বিকল্প পরিকল্পনাটাকে একটু আগিয়ে রাখতে চট করেই ওর অফিসের এক জুনিয়রকে কল করে মোটামোটি একটা ব্রিফ দিয়ে দেয় যেন ঘণ্টা খানিকের মধ্যেই রেন্ট-এ-কারের মাধ্যমে একটা গাড়ি ম্যানেজ করে রাখতে পারে। ফ্লাইট কোনো কারণে মিস হলেও যেন এর কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা বাই রোডে রাজশাহী রওনা দিতে পারে। আবির স্নেহার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে কতক্ষণ তাকিয়ে কী দেখলো বা ভাবলো স্নেহা বুঝতে পারলো না। ওই মুহূর্তে তা বোঝার প্রয়োজন আছে বলেও ওর মনে হলো না। তখন তার একটাই কনসার্ন, আগামীকাল ভোরের আগে আবিরকে যেভাবেই হোক রাজশাহীতে ওর ওয়ার্কস্টেশনে পৌঁছাতে হবে।

রাতের শেষ ফ্লাইটটা যদি মিসও হয়, তাহলে ঘণ্টাখানিকের মধ্যেই যেন ওরা গাড়ি করে রাজশাহী মুভ করতে পারে, সেটা আরেকবার জুনিয়রকে কল করে বোঝালো স্নেহা। আবিরকে ড্রপ করে আবার ওই গাড়িতেই স্নেহা ঢাকায় ব্যাক করবে বলে মনঃস্থির করে ফেললো। কিন্তু এগুলার আর প্রয়োজন পড়ে নাই। ফ্লাইটটা আবিরের জন্য আধা ঘণ্টা ডিলে করানো হইছিল। ভিআইপি, ভিভিআইপি ছাড়া অন্য কোনো সাধারণ যাত্রীর ক্ষেত্রে এটা হয়তো কোনো এয়ারলাইন্সই করতো না।

আবিরকেও এর আগে কোনোদিন ওর পরিচয় কোথাও দিতে দেখে নাই স্নেহা। অবশ্য বারের বাইরে কয়বারই বা অন্য কোথাও তাদের দেখা হইছে- এটা ভাবলেই স্নেহার হালকা একটা রাগ উঠে আবিরের উপর। সবসময় রাগটা দেখানোও যায় না। দেখালেও খুব একটা লাভ হবে বলে মনে হয় না, তাই পারতপক্ষে না দেখানোর চেষ্টাটাই করে।

কী যেন একটা গান আছে না? রবীন্দ্রনাথের? স্নেহা মনে করতে থাকে। ওহ! “আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ…।” আবিরের জন্য এর প্যারোডি হতে পারে- আমার এই মদ খাওয়াতেই আনন্দ! তো ওর আনন্দকে বাধাগ্রস্ত করবে, সেই সাধ্য কি স্নেহার আছে? আবির মনে করে, দুইটা বছর ও একাই ভয়ে জীবন কাটিয়ে গেছে। আর স্নেহা ভাবে, সে হলো নদীর ওপার, যে দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে নিজের ভয়টাকে ক্রমাগত লুকিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু এই লুকাতে গিয়েই একটা সামান্য ভয়ের ক্ষুদ্র কণা বিশালাকৃতির নিউক্লিয়ার বোমায় পরিণত হলো শেষ পর্যন্ত। ফলাফল-বুউউউউউউউউউম! দুই পারেই এখন অন্ধকার!

এয়ারপোর্টে চেক ইন করে ঢুকার আগে আবির স্নেহাকে ফ্লাইট ছাড়া পর্যন্ত বাইরে অপেক্ষা করতে বলছিল, ওর আশঙ্কা ছিল ওই ফ্লাইটটাও ও মিস করতে পারে, সেক্ষেত্রে স্নেহাই একমাত্র তার পরিত্রাণদাতা। অবশ্য আবির না বললেও ফ্লাইট ছাড়া পর্যন্ত স্নেহা ওইখানে এমনিতেই অপেক্ষা করতো। “তুই তো গল্পের নায়িকা, তুই কেন নায়কের পার্টে অভিনয় করতেছিস?”- স্নেহার এইসব স্বভাবের জন্য রাকিন প্রায়ই এই ডায়লগ দিয়ে ওর লেগ পুল করার ট্রাই করে।

স্নেহা যদিও রাকিনের এসব কথা খুব একটা গায়ে মাখে না। তবে আবিরকে মাঝে মাঝে স্নেহা নিজেই দুষ্টুমি করে বলে- তুমি তো অন্যের আমানত। আমার কাছে থাকলে তোমাকে সুরক্ষিত রাখা এবং সহিসালামত গন্তব্যে পৌঁছিয়ে দেওয়া আমার রেসপনসিবিলিটি, ইভেন যতক্ষণ তুমি আমার সঙ্গে আছো, ততক্ষণই তুমি আমার দায়িত্ব। আমানতের খেয়ানত করা উচিত না- বলেই একটা হাসির আবহ তৈরি করার চেষ্টা করে প্রতিবারই ব্যর্থ হয়- আবিরের দীর্ঘশ্বাসের কারণে।

আবির ফ্লাইটে উঠতে পারছে, ফ্লাইট কিছুক্ষণের মধ্যেই ছাড়বে। খবরটা আবির দেওয়ার আগেই এয়ারলাইন্সের এয়ারপোর্ট শাখায় কল করে নিজেই জেনে নিছিল স্নেহা। উবার ড্রাইভারকে এতক্ষণ ওয়েটিংয়ে রাখছিল, ফ্লাইটে উঠার খবর পাওয়ার পর গাড়ি বাড়ির দিকে নিতে বললো। আবিরের ফ্লাইটে উঠার খবরে একদিকে সে যেমন নিশ্চিন্ত হতে পারলো যে অন্তত তার কাজের কোনো ক্ষতি ইনশাআল্লাহ আর হবে না, আবার অন্যদিকে একটু আফসোসও হচ্ছিল।

নিজেকে তার হঠাৎ লোভী লোভী লাগতেই বিশ্রী একটা ফিলিং হইলো! জীবনে কোনোকিছুতেই সে লোভ করে নাই, অথচ গাড়িতে রাজশাহী পর্যন্ত গেলে আরো কিছুটা সময় আবিরকে পাশে পাওয়া যেতো- এমনটা বিশ্রী লোভে কিছু মুহূর্ত তাকে আফসোস করালো। পরদিনই ছিল স্নেহার জন্মদিন।

অন্তত জন্মদিনের প্রথম প্রহরটায় আবিরের সঙ্গে তার থাকা হতো বাই রোডে রাজশাহী গেলে। স্নেহার জীবনে আনন্দের বা বিশেষ মুহূর্তের উপলক্ষ খুব কম আসছে। সে দাবি করে এসব দিন সে হাতে গুনে বলে দিতে পারবে, সে আরো দাবি করে- এসব আনন্দের দিনগুলার অধিকাংশই আবিরকে কেন্দ্র করেই বা আবিরের কৃপায় পাওয়া। এখন এইগুলাকে তার কৃপাই মনে হয়!

আগামী বছর এইদিনে আবিরই বা কই থাকবে, সে-ই বা কই থাকবে, তাদের সম্পর্কই বা কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে, অথবা থমকে যাবে- এগুলা ভাবতে ভাবতে স্নেহার চোখ সামান্য ভিজে উঠে। সেটা মুছতে যাওয়ার মাঝ রাস্তায় আবিরের ফোন আসলো। স্নেহার উবার তখন এলিভেটর এক্সপ্রেসের দিকে যাচ্ছে। ফোন রিসিভ করেই স্নেহা বললো- খবর পাইছি আমি অলরেডি, তুমি ফ্লাইটে উঠছো। আবির বলতে থাকে- স্নেহা...স্নে...হা...স্নেহা...। স্নেহা শান্ত স্বরে বলে, আমি শুনতেছি তো আবির, বলো। ফ্লাইটের মানুষদের কাছে এটা প্রুভ করার দরকার আছে যে তুমি ড্রাঙ্ক?

আবির আবার বলে- স্নে....হা, এ্যাই মেয়ে...আই লাভ ইউ। স্নে...হা...আই লাভ ইউ...আই লাভ ইউ। হ্যালো। আর ইউ লিসেনিং? স্নেহার দুই চোখ দিয়ে ঝর ঝর করে পানি ঝরতে থাকে। আবির আবার ডাকে- স্নেহা...স্নেহা...। স্নেহা খুব শান্তভাবেই উত্তর দেয়- ঠিক আছে তো। শুনলাম তো। আই লাভ ইউ টু। কিন্তু এরপরই আবির বলে- স্নেহা...স্নেহা..আমাদের আর কখনো দেখা হবে না। স্নেহার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে। সে এরকম কিছু আশঙ্কা আগে থেকেই করতেছিল।

সেদিন ছিল ২৬ ফেব্রুয়ারি। রাত আটটা ৪০ মিনিট। ২৪ ফেব্রুয়ারির রাত পৌঁনে দশটা থেকে ২৬ তারিখ রাত আটটা ২৭ মিনিট পর্যন্ত ৪৬ ঘণ্টা ৪২ মিনিট আবির স্নেহার সঙ্গে ছিল। ৯ বছর আগে বিপুলের সঙ্গে সেপারেশনের পর এই প্রথম টানা এতটা সময় স্নেহা কারো সঙ্গে ছিল, যাকে আবার সে ভালোও বাসে। সম্ভবত আবিরের মতো করে কাউকেই কখনো সে ভালোবাসে নাই- এটা স্নেহার মনে হয় আর কী। তবে সে এর সঙ্গে এটাও ফিল করে- এই অনুভূতি একইসঙ্গে আনন্দের, বেদনার, ভয়ের আবার তার বিষন্নতার কারণও।

স্নেহা...এখন ফ্লাই করবো, নেটওয়ার্ক চলে যাবে। স্নে.....হা। আবিরের কণ্ঠ কানের এত কাছে অথচ মনে হচ্ছে সে অনেক দূরে চলে যাইতেছে। স্নেহা গলা পরিষ্কার করে শান্ত স্বরেই বললো, হ্যাভ অ্যা সেইফ জার্নি, আবির। পৌঁছানোর পর টেক্সট দিও। স্নেহার ইচ্ছে করতেছিল তখনই ফোনটা ভেঙে চুরমার করে দিতে। কিন্তু সে আবির সেইফলি পৌঁছানো পর্যন্ত ধৈর্য্য ধরতে চাইলো। তবে নিজের ভেতরের কান্নাটাকে কন্ট্রোল করতে পারলো না কোনোভাবেই।

উবারের ড্রাইভার লুকিং গ্লাসে কিছুক্ষণ পর পর স্নেহাকে দেখতেছিলেন। বয়স্ক ভদ্রলোক। তার চোখেমুখে একটা মায়াও দেখা যাচ্ছিল। নেহাতই উবার চালাচ্ছিলেন বলে সেই মায়া তার কণ্ঠ পর্যন্ত আনা থেকে সম্ভবত তিনি বিরত থাকতেছিলেন। স্নেহা কয়েকবার চেষ্টা করলো নিজেকে সামলানোর। শেষ পর্যন্ত আর পারলো না। অবশ্য আবিরের সঙ্গে স্নেহার মোটামোটি সমস্ত বিদায় পর্ব এমনই হয়।

এবারই প্রথমবার আবির এমন নির্বোধের মতো কাণ্ড করে নাই। প্রতিবারই স্নেহা এভাবেই যন্ত্রণা পায়, কখনো কান্না লুকায়, কখনো নিজেকে হাউমাউ করে কাঁদতে দেয়। সেদিনও ওই মুহূর্তে যেমন অনেক চেষ্টা করার পর নিজেকে ছেড়ে দিলো আল্লাহর ওয়াস্তে। নাও, কাঁদো তোমার প্রভুর নামে! উবারে বসেই নিজেকে সে কাঁদতে দিলো, ইচ্ছামতো বুকের যন্ত্রণা নামতে দিলো। কিন্তু যন্ত্রণা আর কমে কই!

হাতিরঝিলের কাছাকাছি আসতেই আবিরের টেক্সট আসলো- এ্যাই মেয়ে...স্নেহা...মা...তুমি আমার আম্মা...একটার পর একটা টেক্সট করতে থাকে আবির, অধিকাংশই এলোমেলো। এখনো সে কিছুটা ড্রাঙ্কই আছে, স্নেহা বুঝতে পারে। সে জানতে চায়, তুমি পৌঁছাইছো? আবির লেখে, জাস্ট ল্যান্ডেড। স্নেহা আস্তে আস্তে টাইপ করে- ওকে, আবির। টেক কেয়ার অফ ইউরসেল্ফ। আল্লাহ যেন আজকে থেকেই তোমার মনোবাসনা পূর্ণ করে। এটা বলার পরই স্নেহা ফোনের সুইচড অফ করে আবার কান্নায় ভেঙে পড়ে।

উবারের ড্রাইভার আর নিজেকে অযাচিতভাবে মায়া দেখানো থেকে বিরত রাখতে পারলেন না। গাড়িটা হালকা স্লো করে টিস্যুর বক্সটা পেছনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, আন্টি, কাঁদলে কোনোকিছু চেঞ্জ হয় না। তবে হালকা লাগে। আপনি হালকা হন, দুর্বল হইয়েন না। বাসা থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত আবির-স্নেহার সমস্ত কনভারসেশনই ওই ভদ্রলোক শুনছেন। ওদের মধ্যে কী সম্পর্ক, সেটা তার না বোঝার কোনো কারণই নাই। স্নেহা টিস্যুর বক্সটা হাতে নিয়ে কান্না সামলানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু তার তখন শুধু আব্বার কথা মনে পড়ছিল।

চলবে…

Comments

    Please login to post comment. Login