"আম্মু আমি অলরেডি লেট, আর খাবো না!"
ডাইনিং টেবিল থেকে প্রায় ছুটতে ছুটতে কথাটা বলল অদ্রি। ঢাকা মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী সে, সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে চলাই তার স্বভাব। মিসেস রোজা চৌধুরী কপালে ভাঁজ ফেলে রেগে বললেন, "প্রতিদিন এরকম করে না খেয়ে বের হলে তুই ডাক্তার হওয়ার আগে নিজেই পেশেন্ট হয়ে যাবি, বলে রাখলাম!"
অদ্রি ব্যাগটা কাঁধে ঝোলাতে ঝোলাতে মিষ্টি করে হাসল, "খুব করে দুঃখিত ম্যাডাম! আজ দেরি করলে নৈতিক স্যারের ক্লাস মিস হবে। তারপর তিনি আমাকে যা দেবেন, তাতে আমি এমনিতেই পেশেন্ট হয়ে যাব। আই প্রমিজ, ক্যান্টিনে খেয়ে নেব!"
খাবার টেবিলে আয়ান চৌধুরী তার আদরের মেয়ের কাণ্ড দেখে নিঃশব্দে হাসছেন। সাথে বড় ছেলে রোদও আছে। মিসেস রোজা গজগজ করতে থাকলেন, "আয়ান, তুমি কিছুই বলো না ওকে? দিনদিন মেয়েটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। আমি আজই রাদিফের সাথে যোগাযোগ করব, ও যেন কিছু বলে।"
হাত ধুতে ধুতে রোদ গম্ভীর গলায় বলল, "রাদিফ এই নিয়ে কিছু বলবে বলে তো মনে হয় না। আর বাবা, আমার ফ্লাইট আগামী বৃহস্পতিবার।"
মুহূর্তেই টেবিলের পরিবেশ থমথমে হয়ে গেল। মিসেস রোজার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। "আগামী বৃহস্পতিবার! আর তুই আজ বলছিস?"
রোদ শান্ত স্বরে জবাব দিল, "আম্মু, আমি এখন আর ছোট নেই। কোম্পানির অনেক কাজ জমেছে। রাদিফের দুইদিন পরপর এসব কাহিনী আমার ভালো লাগে না। বড়বাবা-মা কি ওকে বিয়ের জন্য রাজি করাতে পারে না? না হলে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিক!"
মিসেস রোজা হতাশ হয়ে বললেন, "রাদিফ তোর বড় ভাই, ও বিয়ে না করলে তুই করবি না—এই পণ তো তোরাই করেছিস!"
রোদ মুচকি হেসে বলল, "আমি বলেছি রাদিফ আগে করলে তারপর আমি করব। এখন ও ঝামেলা করলে আমি কী করব? বাবা, তোমাকে কি অফিসে ড্রপ করে দেব?"
মেডিকেলের তিন-তিনটে ক্লান্তিকর ক্লাস শেষে অদ্রি যখন ক্যান্টিনে বান্ধবীদের সাথে বসল, তখন তার চোখমুখ ভেঙে আসছিল। বান্ধবী শশ্মি ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠল। তুবা ভ্রু কুঁচকে তাকালে শশ্মি বলল, "আরে তেমন কিছু না!"
অদ্রি একমনে খাচ্ছিল, বান্ধবীদের কথা শুনে বলল, "কী নিয়ে এত রহস্য? বলবি তো!" কিন্তু শশ্মি আর রহস্য ভাঙল না। বিকেল ৩টায় যখন অদ্রি বাসায় ফিরল, তখন তার শরীর আর চলছে না। সোজা নিজের রুমে গিয়ে গা এলিয়ে দিল সে।
আহসান উল্লাহ চৌধুরীর বড় দুই ছেলে রাজিব আর আয়ান (অদ্রির বাবা)।রাজিব চৌধুরী বাবার ব্যাবসা ধরে রাখলেও অদ্রি বাবা আয়ান চৌধুরী পেশায় একজন ডাক্তার। আতিয়া অস্ট্রেলিয়ার সিটিজেন পরিবারসহ সেখানেই থাকে।
পুরো চৌধুরী বাড়িতে একটা জরুরি খবর এল—ময়মনসিংহে তাদের ফুফাতো ভাই শাহরিয়ার আঙ্কেলের মেয়ের বিয়ে। সবাই হুটহাট করে বের হয়ে গেলেও অদ্রি বাসায় থেকে গিয়েছিল। কিন্তু সন্ধ্যায় সে দেখল তার বড় ভাই রাদিফ ফোনে কথা বলতে বলতে নিচে নামছে।
"বড়দা, সবাই কি ময়মনসিংহ গেছে?" অদ্রির প্রশ্নে রাদিফ ফোন নামিয়ে গম্ভীর মুখে বলল, "হুম, সামিহা আপুর বিয়ে। তুই যাবি? গেলে পাঁচ মিনিটে তৈরি হয়ে আয়!"
Almost, সন্ধা ৭টা বেজে গেছে পৌঁছাতে। শাহরিয়ার আংকেল আব্বুর ফুফাতো ভাই ; সামিহা আপুর বিয়ে হচ্ছে রাজশাহীতে। পুরো বাড়ি খুব ভালো ভাবেই ডেকোরেশন করা হয়েছে, একমাএ মেয়ের বিয়ে বলে কথা। হলুদের স্টেজটা বাগান বাড়ির পাশেই, আজ গায়ে হলুদে তামিম ভাইদের বাড়ি থেকে লোকজন আসবে হলুদ লাগাতে। সবাই স্টেজে গিয়ে গায়ে হলুদ লাগিয়ে দিলেন।গোধূলি বেলা পেরিয়ে রাত ৯ঃ৪৫। ময়মনসিংহের সেই বিশাল বাগানবাড়ি আলোকসজ্জায় ঝলমল করছে। গায়ে হলুদের আসর বসেছে।আতিয়া ফুফিদের আজকে আসার কথা ছোট্ট রূপকে কোলে নেওয়ার জন্য মনটা ছটফট করছে। আতিয়া ফুফির দুইজন ছেলে-মেয়ে। প্রায় ২ বছর হলো রাদিল ভাইয়ার ছেলে রূপের কিন্তু সেই যে রাদিল ভাইয়ার বিয়ের পর গেলো আর দেশে আসে নাই। এই দিকে অদ্রির আর তরে সইছে নাহ তাই উঠে বাড়ির দিকে গেলো।অদ্রি হলুদ লাগিয়ে যখন একটু নিভৃতে বাগানবাড়ির দিকে গেল, তখন তার সামনে এসে দাঁড়াল জিসান—গ্রামের প্রভাবশালী এমপির ছেলে।
"এই যে সুন্দরী বেয়াইন, গায়ে হলুদের একটুখানি হলুদ কুমারী মেয়েদের লাগিয়ে দিলে তাড়াতাড়ি বিয়ে হয়। আপনি তো অপ্সরা, আমাকে বিয়ে করবেন?" জিসানের গলার স্বরে নোংরামি স্পষ্ট।
অদ্রি হাত ছাড়িয়ে নিতে গিয়ে বলল, "উফ অসহ্য! হাত ছাড়ুন। ঝামেলা করবেন না।"
জিসান এবার সীমা ছাড়িয়ে গেল। "বিয়ে করবেন কি না বলেন? আর না করলে এক রাতের জন্য আমার হলেই চলবে... কি রাজি?"
অদ্রির গলার স্বর বুজে আসছে। জিসানের ওই নোংরা চাউনি আর কুৎসিত প্রস্তাবগুলো ওর কানে বিষ ঢালছে।জিসান যখন দাঁত কিড়মিড় করে হাতটা তুলল অদ্রির নরম গালে বসিয়ে দেওয়ার জন্য, অদ্রি ভয়ে চোখ দুটো খিঁচে বন্ধ করে ফেলল। কিন্তু থাপ্পড়টা আর পড়ল না।
অন্ধকার চিরে একটা পাথরের মতো শক্ত হাত জিসানের কব্জিটা মাঝপথেই মট করে চেপে ধরল।
খান বাড়ির বড় ছেলে সান-ইয়াত খান ফাহমিদ।পাশের অন্ধকার কোণায় ল্যাপটপে কাজ করতে করতে সে কখন যে উঠে এসে পেছনে দাঁড়িয়েছে, কেউ টেরও পায়নি। ফাহমিদ কোনো কথা বলল না, শুধু জিসানের কব্জিটা এমনভাবে মোচড় দিল যে হাড়ের মটমট শব্দ ছাপিয়ে জিসানের আর্তনাদ পুরো বাগানবাড়িতে প্রতিধ্বনি তুলল। জিসান যন্ত্রণায় হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়ল।
"নিজের সীমাটা ভুলে গেছিস বোধহয়," ফাহমিদের কণ্ঠস্বরটা ছিল বরফশীতল, কিন্তু তাতে মেশানো ছিল এক অদ্ভুত ঘৃণা।
ঠিক সেই মুহূর্তে অদ্রির চিৎকার শুনে ঝড়ের বেগে সেখানে এসে হাজির হলো রাদিফ। নিজের কলিজার টুকরো বোনকে বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে রাদিফের মাথায় যেন রক্ত চড়ে গেল। ওর সারা শরীর কাঁপছে রাগে। ও দৌড়ে এসে অদ্রিকে আগলে ধরল। অদ্রির ছেঁড়া ওড়না আর গালের কাছে জিসানের আঙুলের ছাপ দেখে রাদিফ চিৎকার করে উঠল, "কুত্তার বাচ্চা! তোর এত বড় সাহস!"
রাদিফ বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল জিসানের ওপর, কিন্তু ফাহমিদ এক হাত দিয়ে রাদিফকে রুখে দিল। ফাহমিদের চোখ তখনো জিসানের ওপর স্থির।
রাদিফ অদ্রির মাথায় হাত রেখে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, "অদ্রি, তুই ঠিক আছিস বোন? এই হারামিটা তোর গায়ে হাত তুলেছে? আমি আজ একে মেরেই ফেলব!" রাদিফের চোখে তখন জল আর জিঘাংসা মিশে একাকার। ভাইয়ের এই আকুলতা দেখে অদ্রি আর সামলাতে পারল না, রাদিফকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
ফাহমিদ একবার অদ্রির কান্নায় ভেজা মুখটার দিকে তাকাল। কোনো মায়া বা পরিচিতি নয়, বরং এক অদ্ভুত শূন্যতা কাজ করছিল তার চোখে।
জিসানকে এক ঝটকায় দূরে সরিয়ে দিয়ে ফাহমিদ খুব শান্তভাবে বলল, "রাদিফ, এখানে সিন করো না। বড়রা জানলে লঙ্কাকাণ্ড হবে। মেয়েটাকে ভেতরে নিয়ে যাও।"
ফাহমিদ চলে যাওয়ার সময় ওর পারফিউমের সেই কড়া ঘ্রাণটা অদ্রির নাকে এসে লাগল। মেয়েটা ভেজা চোখে তাকিয়ে রইল সেই নির্লিপ্ত পিঠটার দিকে। যে মানুষটা তাকে বাঁচাল, সে কি একবারও জানতে চাইল না মেয়েটা কে? এই অবহেলাটা কেন যেন অদ্রির মনে তীরের মতো বিঁধল।
চলবে…
অবরুদ্ধ প্রণয় — পর্ব: ০১
Written by Fahmi Khan
কেমন লাগল প্রথম পর্ব? কমেন্টে জানিও! তোমাদের সাড়া পেলে দ্রুতই দ্বিতীয় পর্ব নিয়ে আসব।
