Posts

প্রবন্ধ

কোয়ান্টাম মেথড: মেডিটেশন নাকি মাইন্ড কন্ট্রোল

March 16, 2026

আলিফ রহমান বিজয়

25
View

একটি সুপরিকল্পিত Psychological & Spiritual Engineering। বাংলাদেশে এক ঈমান বিধ্বংসী আধ্যাত্মিক মরণফাঁদ!

২০২৩ সালের ৩ এপ্রিল, ভোর ৪টা ২৫ মিনিট। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী আরাফাত সিয়াম তার ফেসবুক ওয়ালে একটি দীর্ঘ ইংরেজি পোস্ট করেন। আর সেদিনই ঝুলন্ত অবস্থায় তার নিথর দেহ পাওয়া যায়।
 

আপনাদের কি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই আরাফাত সিয়ামের কথা মনে আছে? সে আত্মহত্যা করার আগে একটি বড়সড় ফেসবুক পোস্ট (3 April 2023; 4:25 AM) করেছিল। তার সেই ইংরেজি পোস্টটি আংশিকভাবে আমি বাংলায় তুলে ধরছি,
 

"আমি বর্ণনা করতে পারছি না যে আমি কীসের মধ্য দিয়ে গেছি, এমনকি আমি চাইও না। যদি সম্ভব হয়, তাহলে সেই ঐশ্বরিক অনুভূতিটি উপলব্ধি করার চেষ্টা করো। আমি জানি না কত সময় কেটে গেছে। আমি নিশ্চিত ছিলাম না যে আমি আবার আমার শরীরে ফিরে আসব কি না। কিন্তু যখন আমি আমার জ্ঞানের দুনিয়ায় ছিলাম, তখন আমি আমাকে মেঝেতে বজ্রের মতো বসে থাকতে দেখলাম। আমি আমার শরীর নড়াচড়া করতে পারছিলাম না, অনেকক্ষণ কিছু বলতে পারছিলাম না। আমি কেবল চিরকাল আমার ওই দুনিয়ায় থাকতে চেয়েছিলাম। আর সেখানে স্থায়ীভাবে যাওয়ার জন্য, হয়তো শারীরিক দেহের মৃত্যুই একমাত্র সমাধান।"  (Original পোস্ট এবং তার বাংলা অসুবাদসহ  অন্যান্য রেফারেন্সের লিংক কমেন্টে দেয়া থাকবে।)

সিয়াম যে অবস্থার কথা বর্ণনা করেছিল, নিউ এজ স্পিরিচুয়ালিটিতে একে বলা হয় Astral Projection বা Out of Body Experience। বিভিন্ন ডার্ক মেডিটেশন এবং ফ্রিকোয়েন্সি সেশনের মাধ্যমে মানুষের রূহকে শরীর থেকে সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন করার এক ধরণের মানসিক বিভ্রম তৈরি করা হয়। সিয়াম মনে করেছিল সে কোনো জ্ঞান বা নূরের জগতে পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু আসল বিষয়টি হলো, যখন একজন মানুষ শরীয়তের সুরক্ষা কবজ ছাড়া আধ্যাত্মিক জগতের পোর্টাল খোলার চেষ্টা করে, তখন জিন-শয়তান তাকে এমন এক মায়াজালে (Hallucination) বন্দি করে যা তাকে বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এটিকে বলা হয় Reality Shifting। এটি বর্তমান সময়ের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং ভয়ংকর ওকাল্ট ট্রেন্ড। এখানে শেখানো হয় যে, আপনি আপনার বর্তমান দুঃখ-কষ্টের পৃথিবী (Current Reality) বদলে আপনার কল্পনার কোনো সমান্তরাল পৃথিবীতে (Desired Reality) স্থায়ীভাবে চলে যেতে পারেন। সিয়াম মনে করেছিল তার এই শরীরটি একটি শেকল, তাই সে ভেবেছিল আত্মহত্যার মাধ্যমে সে সেই শেকল ভেঙে অন্য এক পরম সুখের জগতে পা রাখাবে । সিয়ামের মতো যারা গভীর চিন্তাশীল এবং মেধাবী, তাদেরকে কেউ সরাসরি মূর্তিপূজার দিকে ডাকে না। সে আসে নিখুঁত জ্ঞান (Esoteric Knowledge) এর প্রলোভন নিয়ে। দাজ্জালের অন্যতম অস্ত্র হবে এমন এক বৈজ্ঞানিক আধ্যাত্মিকতা যা মানুষকে বোঝাবে তুমিই ঈশ্বর, তোমার ইচ্ছাই সব। সিয়ামের পড়ার টেবিলে ভারতের 'সাদ গুরু'র একটি বইও পাওয়া গিয়েছিল। ধারণা করা হয়েছিল ওখান থেকেই সে প্ররোচিত। 
 

সিয়াম তার পোস্টে নিজেকে বজ্রের মতো মেঝেতে বসে থাকতে দেখেছিল। এটি মূলত গভীর ধ্যানে লিপ্ত ওকাল্টিস্টদের একটি শারীরিক অবস্থা। সে একটি 

লুপে আটকে গিয়েছিলেন, যেখানে শয়তান তাকে বারবার প্ররোচিত করে তার কাছে এই বাস্তব জগতটিকে তুচ্ছ করে তুলেছে। সম্ভবত এভাবেই সে এক সুপরিকল্পিত Psychological Engineering এর শিকার হয়েছে। মহাচেতন (Superconscious) স্তরটি এমন এক 'নো ম্যান্স ল্যান্ড', যেখানে আল্লাহর নূর বা নিরাপত্তা ছাড়া পা রাখা মানেই হলো শয়তানের কাছে নিজের আত্মাকে বিক্রি করে দেয়া।

Human Mind, Spiritually মূলত তিনটি ভাবে বিভক্ত, 

1. Conscious - চেতন

2. Subconscious - অবচেতন

3. Superconscious - মহাচেতন
 

আমরা দৈনন্দিন জীবনে সচেতনভাবে যে কাজগুলো করি সেগুলো চেতন বা Consciously করি।

অন্যান্য শারীরবৃত্তীয় অঙ্গকে (যেমন : kidney, Liver, Heart) কাজ করতে সচেতনভাবে বলা হয় না। এরা সবাই নিজ নিজ কাজ (Blood Pump, Filtering etc) করে যাচ্ছে। আর এগুলো হচ্ছে অবচেতন বা Subconsciously। 
 

তারপরই মস্তিষ্কের এমন একটি পর্যায় রয়েছে যা মস্তিষ্কের সবচেয়ে Intelligent part। সাধারণ মানুষের পক্ষে মস্তিষ্কের এই অংশটিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। যারা একনিষ্ঠ ইবাদত, জিকির ও অন্যান্য গভীর ইবাদতের মাধ্যমে নিজের আত্মাকে সেভাবে প্রস্তুত করে কেবল তাদের পক্ষেই তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আর তারাই হলেন আল্লাহর ওলী। তারা সৃষ্টিজগত ও আল্লাহর স্বরূপ বুঝতে সক্ষম। তারাই তাদের এই মহাচেতন অবস্থাকে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, ইনশাআল্লাহ। এর বাইরে যারা হিন্দুধর্ম থেকে আনিত কুন্ডলী চক্র, থার্ড আই, Astral Travel ইত্যাদি পদ্ধতির মাধ্যমে যারা Superconscious হয়ে উঠার চেষ্টা করবেন তাদের অবস্থা হয় আরাফাত সিয়ামের মতো হবে নয়তো নিজের ইমান-আমল বিসর্জন দিয়ে শয়তানের দাসে পরিণত হবেন। কারণ, এই পর্যায়টি মস্তিষ্কের সবচেয়ে বিপজ্জনক ও স্পর্শকাতর অবস্থা। এখানে দুই ধরণের তাত্ত্বিক Phase রয়েছে Lower Dimensional & Upper Dimensional। আপনি যখন আল্লাহর সাথে রুহানি সম্পর্কের বাইরে গিয়ে বিভিন্ন শয়তানি পদ্ধতির মাধ্যমে আপনার Consciousness কে জাগ্রত করবেন। তখনই সেখানে আগমন ঘটবে বিতাড়িত শয়তানদের। সেই ডাইমনেশনে জিনরা সরাসরি আপনার ক্ষতি করা ও আপনাকে নিয়ন্ত্র করার ক্ষমতা পেয়ে যায়। কারণ আপনি তাদেরই চক্রকে অনুসরণ করে নিজের এই গোপন দুনিয়াকে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। 
 

চলুন এবার বাংলাদেশ Quantum Foundation এর একটি চক্র Quantum Method কে নিয়ে কথা বলি। প্রথমত আপনাদেরকে তাদের বিভিন্ন মেথডের নামসহ সংক্ষিপ্ত বিবরণে শুনাই। পরবর্তীতে এদের কার্যপ্রণালী নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
 

১. শিথিলায়ন বা আলফা মেডিটেশন (Relaxation/Alpha State Training): 

এটি হলো তাদের মূল ভিত্তি। বিশেষ সুর ও নির্দেশের মাধ্যমে মস্তিষ্ককে শিথিল করে আলফা স্তরে নিয়ে যাওয়া হয়। এই অবস্থায় মানুষের বিচারবুদ্ধি কাজ করে না এবং সে হিপনোটাইজড হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে।
 

২. কোয়ান্টাম প্রোজেকশন বা রিয়েলিটি শিফটিং (Reality Shifting/Astral Projection):

সিয়াম এটাই করেছিল। এটা হলো কল্পনার জগতে নিজের অস্তিত্বকে ছড়িয়ে দেওয়া এবং শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্য কোনো ডাইমেনশনে যাওয়ার চেষ্টা করা।
 

৩. অটো-সাজেশন এবং এফারমেশন (Auto-suggestion & Affirmation):

নির্দিষ্ট কিছু বাক্য বারবার আওড়ানো (যেমন: আমি পারি, আমি করবো)। এখানে Water Memory-র fact দিয়ে বলা হয় আপনার কথা আপনার কোষ বদলে দেবে। অথচ এর আড়ালে থাকে আল্লাহর তকদীরকে অস্বীকার করার হীন প্রচেষ্টা। 

৪. মিরর টেকনিক (Mirror Technique):

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে নির্দিষ্ট কমান্ড দেওয়া। ওকাল্ট বিজ্ঞানে এটি সেলফ-সিহির বা আত্ম-সম্মোহনের একটি পদ্ধতি।

৫. ল অফ অ্যাট্রাকশন ও ম্যানিফেস্টেশন (Law of Attraction & Manifestation):

Like attracts like আপনি যে ফ্রিকোয়েন্সি হোল্ড করবেন, ইউনিভার্স আপনাকে তাই দেবে। এটি সরাসরি আল্লাহর ইরাদা বা ইচ্ছাকে অস্বীকার করে মানুষের উইল পাওয়ারকে খোদায়ি রূপ দেওয়ার কৌশল।

৬. চক্র ব্যালেন্সিং ও কুন্ডলিনী জাগরণ (Chakra Balancing & Kundalini Awakening):

হিন্দুধর্মের তন্ত্রবিদ্যা থেকে আসা এই পদ্ধতিতে মেরুদণ্ডের বিশেষ পয়েন্ট এবং থার্ড আই বা তৃতীয় নয়ন খোলার চেষ্টা করা হয়। এর মাধ্যমেই মূলত জিনদের জন্য মানুষের রূহানি পোর্টাল উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

৭. ভিশন বোর্ড (Vision Board):

নিজের ইচ্ছাগুলোকে ছবির আকারে সাজিয়ে রাখা এবং সেগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকা। এটি মূলত আধুনিক মূর্তিপূজার একটি সফট কপি বলতে পারেন।

৮. হো-পনোপনো (Ho'oponopono):

এটি একটি হাওয়াইন প্যাগান রিচুয়াল। চারটি বাক্য (I'm sorry, Please forgive me, Thank you, I love you) বারবার পড়ার মাধ্যমে মনে করা হয় মহাজাগতিক এনার্জি সব ঠিক করে দেবে। এখানে আল্লাহর কাছে তওবার বদলে  এনার্জির কাছে ক্ষমা চাওয়া হয়, আসতাগফিরুল্লাহ।

৯. মাইন্ড কন্ট্রোল ও সাইকো-ওরিয়েন্টেশন (Mind Control/Psycho-orientation):

অন্যের মন নিয়ন্ত্রণ করা বা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মনকে ডিরেকশন দেওয়া। এটি সরাসরি মানুষের ফিতরাত বা আল্লাহ প্রদত্ত স্বভাবকে বিকৃত করার নামান্তর।

এবার চলেন এদের কার্যপ্রণালীগুলো বিস্তারিত বুঝি। 
 

১। শিথিলায়ন ও আলফা মেডিটেশন:

কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন বা নিউ-এজ গুরুদের কোর্সে ঢুকলে প্রথমেই আপনাকে যা শেখানো হবে, তা হলো শিথিলায়ন। তারা বলবে, আপনার মস্তিষ্ক এখন খুব অশান্ত, এটাকে শান্ত করতে হবে। এর জন্য তারা আপনাকে একটি চেয়ারে বা মেঝেতে আরাম করে বসাবে, চোখ বন্ধ করতে বলবে এবং ব্যাকগ্রাউন্ডে খুব হালকা, ঝিরঝিরে বৃষ্টির শব্দ বা বিশেষ কোনো ফ্রিকোয়েন্সির মিউজিক বাজিয়ে দেবে। এরপর একজন গাইড তার সম্মোহনী কণ্ঠে আপনাকে নির্দেশ দিতে থাকবে, "আপনার শরীর ছেড়ে দিন, আপনি এখন অনেক হালকা অনুভব করছেন।
 

এর Mechanism টা কি?

আমাদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ মূলত বিদ্যুৎ তরঙ্গ বা Electrical Waves এর মাধ্যমে চলে। সাধারণ অবস্থায় যখন আমরা কথা বলি বা কাজ করি, তখন আমাদের মস্তিষ্কের ফ্রিকোয়েন্সী Beta (১৩-৩০ হার্টজ) স্টেটে থাকে।

শিথিলায়নের মাধ্যমে তারা আপনার মস্তিষ্ককে জোর করে Alpha (৮-১২ হার্টজ) স্টেটে নিয়ে যায়। এই আলফা স্টেট হলো ঘুমের ঠিক আগের মুহূর্ত বা তন্দ্রা। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় State of Suggestibility।

বিপদটি ঠিক এখানেই। আপনার মস্তিষ্কের একটি অংশ আছে যাকে বলা হয় Critical Filter। এটি পাহারাদারের মতো কাজ করে। কেউ আপনাকে কোনো ভুল তথ্য দিলে আপনি তা সচেতনভাবে বুঝতে পারেন এবং সেই পাহারাদার সেটা আটকে দেয়। কিন্তু আপনি যখন আলফা স্টেটে চলে যান, তখন এই পাহারাদার বা ক্রিটিক্যাল ফিল্টার ঘুমিয়ে পড়ে। এই অবস্থায় আপনার অবচেতন মনের সদর দরজা খুলে যায়। তখন গাইড আপনাকে যে তথ্য বা অ্যাফারমেশন দেবে, আপনার মস্তিষ্ক সেটাকে ধ্রুব সত্য হিসেবে গ্রহণ করবে। একেই বলা হয় Psychological Engineering। অনেকেই দাবি করেন, কোয়ান্টাম মেডিটেশনের গভীরে গিয়ে তারা তাদের মৃত বাবা-মাকে দেখেছেন, তাদের সাথে কথা বলেছেন। এটি কীভাবে সম্ভব?

ক. মেমোরি প্রজেকশন: আলফা বা থিটা স্টেটে আপনার অবচেতন মনে জমা থাকা স্মৃতিগুলো হ্যালুসিনেশনের মতো জীবন্ত হয়ে ওঠে। আপনি যা দেখতে চান, আপনার Intelligent মস্তিষ্ক সেই ডেটা ব্যবহার করে একটি অবাস্তব দৃশ্য তৈরি করে।

খ. জিনের হস্তক্ষেপ: এটি সবচেয়ে ভয়ংকর দিক। যখন আপনি শরীয়তের সুরক্ষা ছাড়া আপনার অবচেতন বা মহাচেতন (Superconscious) জগতকে উন্মুক্ত করে দেন, তখন সেখানে সর্বদা আপনার সাথে কারিন জিন বা শয়তানি শক্তিগুলো সুযোগ পেয়ে যায়। তারা আপনার মৃত প্রিয়জনের রূপ ধরে আপনার সামনে আসে। আপনি মনে করেন এটি একটি আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা, কিন্তু আসলে শয়তান আপনার রূহের দখল নিয়ে নেয়। তারা আপনাকে এমন সব তথ্য দিতে পারে যা কেবল আপনার বাবা-মা জানতেন, ফলে আপনার বিশ্বাস আরও মজবুত হয়। এভাবেই তারা আপনার ঈমান চুরির চূড়ান্ত কাজটি সম্পন্ন করে।
 

২। কোয়ান্টাম প্রোজেকশন ও রিয়েলিটি শিফটিং:

কোয়ান্টাম মেথড বা নিউ-এজ প্র্যাকটিসে শিথিলায়ন যখন গভীর হয়, তখন তারা আপনাকে শেখায় প্রোজেকশন। তারা আপনাকে কল্পনা করতে বলবে যে আপনি আপনার শরীর থেকে বেরিয়ে আসছেন, আপনি দেয়াল ভেদ করে চলে যাচ্ছেন, বা আপনি হাজার মাইল দূরে আপনার প্রিয় কোনো জায়গায় পৌঁছে গেছেন। আরাফাত সিয়াম তার শেষ পোস্টে ঠিক এই অবস্থার কথাই বলেছিল, "আমি নিশ্চিত ছিলাম না যে আমি আবার আমার শরীরে ফিরে আসব কি না।"

এর Mechanism কি?

এই প্রক্রিয়াটিকে ওকাল্ট পরিভাষায় বলা হয় Astral Projection বা Remote Viewing। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় Dissociation।
 

১. সেন্সরি ডিপ্রাইভেশন (Sensory Deprivation): যখন আপনি দীর্ঘক্ষণ চোখ বন্ধ করে বাহ্যিক জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সি শোনেন, তখন আপনার মস্তিষ্ক তার পঞ্চইন্দ্রিয়ের ইনপুট হারিয়ে ফেলে। তখন ব্রেইন বাধ্য হয়ে ভেতরের জগত থেকে ছবি তৈরি করা শুরু করে (Hallucination)।
 

২. সিলভার কর্ড বা রূপালী সুতো: ওকাল্টিস্টরা দাবি করে শরীর ও আত্মার মধ্যে একটি অদৃশ্য সুতো থাকে। কিন্তু ইসলামিক আকিদা অনুযায়ী, মানুষের রূহ বা আত্মা একটি অত্যন্ত সংরক্ষিত বিষয়, যা কেবল আল্লাহর হুকুমে চলে। যখন আপনি জোর করে কৃত্রিমভাবে রূহানি জগত দেখার চেষ্টা করেন, তখন আপনি মূলত আপনার রূহকে এক ধরণের Unprotected Zone-এ ঠেলে দেন।
 

রিয়েলিটি শিফটিং: তারা বলে, আপনি চাইলে আপনার এই দুঃখী জগত (Current Reality) থেকে আপনার পছন্দের জগত (Desired Reality) এ শিফট করতে পারেন।
 

এটা কীভাবে ইফেক্ট করে?
 

এটি সরাসরি আল্লাহর সন্তুষ্টি (সবর) এবং তকদীরের ওপর রাগান্বিত হওয়ার একটি ছদ্মবেশ।

কেন এটি মরণফাঁদ?
 

যখন আপনি আপনার রূহকে প্রোজেক্ট করছেন, তখন আপনি আপনার শারীরিক শরীরের নিরাপত্তা বলয় বা Aura কে ছিন্ন করছেন। এই অবস্থায় শয়তানি জিনেরা খুব সহজেই মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে বা মানুষের চেতনার ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে।

যারা নিয়মিত এই প্রোজেকশন বা শিফটিং প্র্যাকটিস করে, তাদের মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে আসল জগত আর কল্পনার জগতের পার্থক্য করতে পারে না। তাদের মধ্যে অনেকের কাছে তখন বাস্তব পৃথিবী জেলখানা মনে হয় এবং তারা সিয়ামের মতো মনে করে যে আত্মহত্যাই হলো সেই স্বপ্নের দুনিয়ায় স্থায়ীভাবে যাওয়ার পথ।

মানুষ যখন এই মায়াবী জগতের নেশায় পড়ে যায়, তখন তার কাছে নামাজ, জিকির বা ইবাদত ম্যাড়মেড়ে মনে হয়। কারণ ইবাদতে ধৈর্য লাগে, আর এই জাদুকরী প্র্যাকটিসে তাৎক্ষণিক ভিজ্যুয়াল আনন্দ পাওয়া যায়।

৩। অটো-সাজেশন ও এফারমেশন :

ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা জানি, প্রতিটি জড় পদার্থই আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করে এবং তারা সংবেদনশীল। জমজমের পানির ওপর দোয়ার প্রভাব বা পানি পড়া খাওয়ার মাধ্যমে শেফা পাওয়া এগুলো আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু কোয়ান্টাম বা নিউ-এজ হিলাররা এই সত্যটিকে এমনভাবে টুইস্ট করে যা সরাসরি শিরকের দিকে নিয়ে যায়।

ক. মাধ্যম বনাম গন্তব্য (Medium vs. Destination)

ইসলামে পানি হলো একটি মাধ্যম (Medium)। আমরা যখন পানি পড়া খাই, আমরা বিশ্বাস করি শেফা দিচ্ছেন আল্লাহ, পানি নয়। কিন্তু এফারমেশন বা ম্যানিফেস্টেশনে শেখানো হয় যে, পানি নিজেই আপনার শব্দ ধারণ করে আপনার ভাগ্য বদলে দিচ্ছে। এখানে আল্লাহকে মাঝখান থেকে সরিয়ে দিয়ে আপনার ব্যক্তিগত ইচ্ছাশক্তি এবং পানির রিঅ্যাকশন কে চূড়ান্ত গন্তব্য বানানো হচ্ছে। এটিই হলো সুক্ষ্ম শিরক।

খ. মিরর টেকনিক:  আয়নায় যখন আপনি নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে নির্দিষ্ট কিছু শব্দ বারবার উচ্চারণ করেন, তখন আপনার মস্তিষ্ক দ্রুত একটি হিপনোটিক লুপ তৈরি করে। আপনি যখন নিজেকে বলেন "আমি পরিপূর্ণ" বা "আমি যা চাইব মহাবিশ্ব তা দিতে বাধ্য", তখন আপনি মূলত আপনার রূহকে এক ধরণের খোদায়ি মিথ্যা অহংকারে টিউন করছেন। এটি আপনার আত্মাকে বিনয় থেকে বের করে দিয়ে শয়তানের পছন্দের অ্যারোগেন্স বা দম্ভের ফ্রিকোয়েন্সিতে নিয়ে যায়।

গ. শব্দের জাদুকরী অপপ্রয়োগ পানির অণু বদলে যাওয়ার দোহাই দিয়ে তারা আপনাকে দিয়ে এমন সব কথা বলায় যা তকদীরের ওপর মানুষের কর্তৃত্ব দাবি করে। তারা বলে, Like attracts like অর্থাৎ আপনি যা বলবেন, পানি তা গ্রহণ করবে এবং মহাবিশ্ব থেকে তেমন ঘটনা টেনে আনবে।

এটি একটি চূড়ান্ত মিথ্যা। নবী আইয়ুব (আ.) বা নবী ইয়াকুব (আ.) বছরের পর বছর ধরে আল্লাহর প্রশংসা করেছেন, তাঁদের ভাইব্রেশন ছিল সর্বোচ্চ। তবুও আল্লাহ তাঁদের বড় পরীক্ষা নিয়েছেন। এই এফারমেশন থিওরি যদি সত্যি হতো, তবে নবীদের জীবনে কোনো বিপদ আসত না। এই থিওরি মূলত মানুষকে আল্লাহর ফয়সালার (তকদীর) বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করে তোলে।

৪, ৫, ৮। Law of attraction, Manifestation and  visionboard :

এই তিনটি পদ্ধতি মূলত একটি দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আপনিই আপনার মহাবিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু। "Like attracts like", অর্থাৎ আপনি যদি কোটিপতি হওয়ার কথা চিন্তা করেন এবং ভিশন বোর্ডে লাগিয়ে রাখেন, তবে ইউনিভার্স আপনার জন্য তা হাজির করবে। ভিশন বোর্ড এমন একটি বোর্ড যা তাদের অবচেতন মনে তারা মেডিটেশনের মাধ্যমে তৈরি করে। আর যেখানে তা তৈরি করে তাকে বলে Alpha Station।

এখানে আল্লাহ শব্দটিকে সরিয়ে ইউনিভার্স শব্দটি বসানো হয়েছে। এটি মূলত প্রাচীন প্যাগানদের প্রকৃতি পূজার সমান্তরাল। এখানে আপনি দোয়া করছেন ইউনিভার্সের কাছে।
 

৭,  ৯। হো-পনোপনো ও ওকাল্ট সিম্বলিজম:

হো-পনোপনো একটি প্রাচীন হাওয়াইন তুকতাক। তারা শেখায় চারটি বাক্য : I am sorry, Please forgive me, Thank you, I love you বলার মাধ্যমে আপনার মেমোরি ক্লিন করতে।

ইসলামে গুনাহ মাফের জন্য আছে তওবা। কিন্তু হো-পনোপনোতে আপনি কোনো সত্তার কাছে নয়, বরং নিজের ভেতরের মেমোরির কাছে ক্ষমা চাচ্ছেন। এটি মানুষকে তওবার প্রকৃত স্বাদ থেকে বঞ্চিত করে এক ধরণের ছদ্ম-আধ্যাত্মিকতায় ডুবিয়ে রাখে।
 

একই পদ্ধতিতে অনুসরণ করে সিনেমা বা মিউজিক ভিডিওতে বিভিন্ন সিম্বল বারবার দেখানো হয় যাতে আপনার অবচেতন মন এগুলোকে স্বাভাবিক মনে করে। আর যখন আপনার ঘরে বা পোশাকে এই সিম্বলগুলো থাকে, তখন সেগুলো প্রত্যক্ষভাবে আপনার জীবনে প্রভাব ফেলে।
 

৫, ৬। থার্ড আই ও চক্র ব্যালেন্সিং বা জিনদের জন্য উন্মুক্ত পোর্টাল:

এটি হলো সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশ। তারা বলে শরীরের ৭টি এনার্জি সেন্টার বা চক্র (Chakra) আছে যা জাগাতে হবে।
 

 বিশেষ সাউন্ড এবং ধ্যানের মাধ্যমে যখন কেউ থার্ড আই (Third Eye) খোলার চেষ্টা করে, সে মূলত তার মস্তিষ্কের Pineal Gland।কে অতি-সক্রিয় করার চেষ্টা করে। আধ্যাত্মিক জগত বা গায়েবি জগত দেখার একমাত্র বৈধ উপায় হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে নূর পাওয়া। কিন্তু চক্র জাগরণের মাধ্যমে মানুষ যখন জোর করে এই পর্দা সরানোর চেষ্টা করে, তখন সে মূলত জিনের জগতের পোর্টাল খুলে দেয়। 

ভাই, এই সবগুলো পদ্ধতি (LoA, চক্র, ভিশন বোর্ড, হো-পনোপনো) মিলে একটি জাল তৈরি করে। এই জালের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ প্রদত্ত প্রাকৃতিক শক্তিকে বিকৃতভাবে ব্যবহার করে আপনাকে বোঝানো যে আপনার সাহায্যকারী আল্লাহ নন, বরং ভাইব্রেশন এবং ফ্রিকোয়েন্সী বা অন্যান্য Universal Materials। আপনি যখন এই জালে পা দেন, তখন আপনি ধীরে ধীরে আপনার রূহানি ইমিউনিটি হারিয়ে ফেলবেন। আপনি চরম Materialistic হয়ে যাবেন। বিভিন্ন আলেম-ওলামাদের কথা শুনলে আপনার হাসি পাবে। আপনার কাছে মনে হবে, "আরে উনি কি জানে? উনি তো কেবল অন্ধভাবে বিশ্বাস করে। উনি জানেই না এসব কীভাবে কাজ করে।" কিন্তু ভাই বিশ্বাস করেন উনার জানার প্রয়োজন নাই। একজন উত্তম মুসলিম ধার্মিক মানুষ যদি তার ধর্মীয় বিধানগুলো কঠোরভাবে পালন করেন, তবে সে সরাসরি আল্লাহর নূর ও রুহানি শক্তির মাধ্যমেই নিজেকে মহাচৈতন্যে উন্নীত করতে পারবে।
 

যা আজ নিউ এজ স্পিরিচুয়ালিটি বা কোয়ান্টাম মেথড নামে পরিচিত, তা মূলত Occult বা জাদুরই একটি আধুনিক রূপ। ওকাল্টিস্ট বা জাদুকররা যেভাবে শয়তানি শক্তির সাহায্য নিয়ে অলৌকিক কিছু ঘটাতে চায়, এই পদ্ধতিগুলো ঠিক একই মেকানিজম ব্যবহার করে। একজন ওকাল্টিস্ট বা তান্ত্রিক যখন কোনো শয়তানি শক্তিকে ডাকতে চায়, সে নির্জনে বসে বিশেষ কিছু মন্ত্র পড়ে এবং ধূপ জ্বালিয়ে নিজের চারপাশের পরিবেশ ও ফ্রিকোয়েন্সীকে পরিবর্তন করে। অন্যদিকে, একজন নিউ-এজ প্র্যাকটিশনার যখন আলফা মেডিটেশনে গিয়ে বিশেষ ফ্রিকোয়েন্সি শোনে এবং থার্ড আই খোলার প্র্যাকটিস করে, সেও মূলত একই কাজ করছে।

ওকাল্টিস্ট যাকে Jin/Demon বলে, নিউ-এজ গুরুরা তাকে Spirit Guide বা Higher Self বলে চালিয়ে দেয়।
 

নাম বদলালেও উৎসটি একই  তা হলো বিতাড়িত শয়তান। যখনই আপনি শরীয়তের গণ্ডি পেরিয়ে গায়েবি জগতের দরজা খোলার চেষ্টা করবেন, তখনই সেখানে আল্লাহর বদলে শয়তানের রাজত্ব শুরু হবে।
 

যখন আপনি বিশ্বাস করেন যে ইউনিভার্স বা এনার্জি আপনার রিজিক বা সফলতার দাতা, তখন আপনি আল্লাহর সার্বভৌমত্বে অন্যকে অংশীদার বানাচ্ছেন। আল্লাহর দেওয়া তকদীরকে অস্বীকার করে নিজের ইচ্ছাশক্তিকে ভাগ্যবিধাতা মনে করাও শিরক।

ভাই, বিজ্ঞান বা মেডিটেশনের মোড়কে যা আমাদের ঘরে ঢুকেছে, তা মূলত ডিজিটাল সিহর বা ডিজিটাল জাদু। যারা এগুলো চর্চা করছেন, তারা অজান্তেই শয়তানি ফ্রিকোয়েন্সির সাথে নিজের রূহকে টিউন করছেন। ইসলাম আমাদের সুপার ন্যাচারাল হওয়ার কথা কোথাও বলে না, ইসলাম আমাদের যথাযথ বান্দা হওয়ার কথা বলেছে। আর কেবল আল্লাহর গোলামির মধ্যেই আছে সেই প্রকৃত রুহানি প্রশান্তি, যা দাজ্জালের এই গোলকধাঁধায় কক্ষনো পাওয়া সম্ভব নয়।

শেষমেশ রুহানিয়্যাত বা প্রকৃত মহাচৈতন্যের নূরানী পথ নিয়ে একটু আলোচনা করি।

 ইসলাম বরাবরই আমাদের শেখায় এক দীর্ঘস্থায়ী এবং নূরানি সফরের কথা। ইসলামে মহাচেতন’

 (Superconscious) হওয়ার অর্থ হলো মাকামে ইহসান অর্জন করা। অর্থাৎ এমনভাবে ইবাদত করা যেন আপনি আল্লাহকে দেখছেন, অথবা আল্লাহ আপনাকে দেখছেন।
 

ইবাদত আপনার রূহকে নূর দিয়ে পূর্ণ করে রুহানি শক্তির সাথে সংযুক্ত করে।
 

হাদীসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, "বান্দা যখন নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নিকটবর্তী হয়, তখন আমিই তার কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শোনে, আমিই তার চোখ হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে...।" (সহীহ বুখারী)

 ইবাদত আপনার Consciousness বা চেতনাকে এতই প্রখর করে যে, আপনি সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে থাকা সত্যগুলো বুঝতে শুরু করেন। এটাকেই বলা হয় Basirah। এটাই চেতনার প্রকৃত জাগরণ। Basirah প্রাপ্ত একজন ওলীর সিজদাহ হলো রূহের প্রকৃত আসমানি সফর। আল্লাহ সকলকে তা দান করুন, আমিন!

Comments

    Please login to post comment. Login