Posts

সমালোচনা

শিবিরের 'মেধাতন্ত্র' ও 'হেজিমনি' সংকট: একটি তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ

March 17, 2026

তাহসিন আরিফ হিমেল (INNOVA JOURNAL)

Original Author তাহসিন আরিফ হিমেল

9
View

​শিবির আসলে কী? আমার পর্যবেক্ষণে, শিবির একটি 'মিডওকার' বা গড়পড়তা মানের সংগঠন। এটি খুব খারাপ কিছু না, আবার খুব ভালোও কিছু না। বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় শিবিরের যে ‘লায়োনাইজেশন’ বা অতি-মানবিকীকরণ চলছে, বিশেষ করে সিজিপিএ-কেন্দ্রিক যে ইমেজের স্রোত তৈরি হয়েছে, আমি তার ঘোর বিরোধী। কারণ, শিবিরের এই তথাকথিত মেধাতন্ত্র আসলে একটি 

'যান্ত্রিক ও স্থবির মেধা' (Stagnant Merit)। শিবিরের শতকরা ৯০ ভাগ কর্মীর সিজিপিএ ৩.৬-এর নিচে। বৈশ্বিক মানদণ্ডে হার্ভার্ড বা অক্সফোর্ডের মতো এলিট ইনস্টিটিউশনে তাদের পদচিহ্ন নেই। তারা কোনো মৌলিক ফিলোসফার, সোশ্যাল সায়েন্টিস্ট বা গ্লোবাল আইকন তৈরি করতে পারেনি। শিবিরের মেধাতন্ত্র মূলত মফস্বলীয় বা প্রান্তিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা স্রেফ পরীক্ষায় ভালো ফল করার ‘টেকনোক্রেটিক’ দক্ষতায় আটকে আছে।

​শিবিরের সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক সংকট হলো তাদের '

হেজিমনি' বা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের অভাব। গ্রামশিয়ান তত্ত্ব অনুযায়ী, রাজনৈতিক বিজয়ের আগে প্রয়োজন বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক নেতৃত্ব। কিন্তু শিবির আজও বাংলাদেশের 'আরবান মিডল ক্লাস' বা নগর মধ্যবিত্তের মনোজগতে প্রবেশ করতে পারেনি। তাদের সাহিত্য কেন শেক্সপিয়ার বা ফেলুদা হতে পারে না, তাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কেন 'কোক স্টুডিওর' মতো নান্দনিক বা 'হিরো আলমের' মতো সাব-কালচারাল—কোনোটাই হতে পারে না, সেই প্রশ্নের জবাব তাদের কাছে নেই। তারা সবকিছুই স্পর্শ করে (যেমন গান, সাহিত্য, মিডিয়া), কিন্তু কোনো কিছুতেই 'অথেন্টিসিটি' বা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারে না। তাদের সব কাজই যেন পারফরমেটিভ, যেখানে প্রাণের অভাব স্পষ্ট।

​রাজনীতিতে শিবিরের অবস্থান অনেকটা সেই ব্যাটসম্যানের মতো, যে প্রতি ম্যাচে ৩০-৩৫ রান করে গড় ঠিক রাখে, কিন্তু কখনোই বড় কোনো ইনিংস খেলতে পারে না। এমনকি তাদের আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্স বা ইনফিল্ট্রেশনের কৌশলও যান্ত্রিক। ইউনিয়ন যেভাবে অন্যান্য রাজনৈতিক দলে নেতৃত্ব সরবরাহ করে এক ধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক নিয়ন্ত্রণ বা ‘হেজিমনি’ প্রতিষ্ঠা করেছে, শিবির সেখানে স্রেফ ‘ইনফরমার’ তৈরির স্তরে আটকে আছে। তাদের কর্মীদের মধ্যে সেই সৃজনশীল অটোনমি নেই যা দিয়ে তারা অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে গিয়ে শীর্ষ নেতৃত্বে পৌঁছাতে পারে।

​জুলাই বিপ্লবে শিবিরের যেটুকু ইতিবাচক ভাবমূর্তি আমরা দেখেছি, তার কৃতিত্ব আসলে দলীয় স্ট্রাকচারের নয়। বরং এটি সম্ভব হয়েছে সেইসব 

'সাবেক শিবির' এক্টিভিস্টদের কারণে, যারা জামাতের কঠোর খবরদারি বা সাংগঠনিক জড়তার বাইরে এসে স্বাধীনভাবে মধ্যবিত্ত ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সেতুবন্ধন তৈরি করতে পেরেছেন। এই স্বাধীন অংশটিই শিবিরের একমাত্র কার্যকরী সেতু হিসেবে কাজ করেছে। অথচ আজ যখন মেধার লড়াই হয় বা কৃতিত্বের প্রশ্ন আসে, তখন দেখা যায় শিবির সেই ‘এভারেজ’ ইমেজের কারণেই প্রান্তিক হয়ে পড়ছে। আন্দোলনের ইঞ্জিন হওয়ার পরও কেন 'আকাশ পোদ্দার বসুরা' সমস্ত ফুটেজ নিয়ে যায়—সেই উত্তর শিবিরের ‘হেজিমনি’ সংকটের মধ্যেই নিহিত।

​পরিশেষে, আমি শিবিরের নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানাব—এই ভুয়া মেধাতান্ত্রিক ইমেজের খোলস থেকে বের হয়ে আসুন। নিজেদের ‘ডেডিকেটেড মিডওকার’ বাস্তবতাকে স্বীকার করুন। সিজিপিএ-র ডুগডুগি বাজিয়ে মধ্যবিত্তের কাছে যে প্রত্যাশার পারদ আপনারা আকাশচুম্বী করছেন, তা যখন রূঢ় বাস্তবতার ধাক্কায় ভেঙে পড়বে, তখন তার ফলাফল আপনাদের জন্যই সুখকর হবে না। শিবিরের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দলীয় কাঠামোর ভেতরে থেকেও কীভাবে আরবান মিডল ক্লাসের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে নিজেদের বৈধতা তৈরি করা যায়। সাবেক শিবিরের সাথে কোলাবোরেশন এবং সৃজনশীল বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাই হতে পারে এর একমাত্র পথ।

Comments

    Please login to post comment. Login