Posts

চিন্তা

(বিভক্তি Vs মতভেদ) মতভেদ এর ক্ষেত্রে করণীয় কী?

March 23, 2026

মোঃ রেজওয়ানুল ইসলাম

15
View

কোরআন ও সহিহ হাদিসে আলেমদের এবং সামগ্রিকভাবে উম্মাহর বিভক্তি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। 
যে মুসলিমদের মধ্যে বিভক্তি আনে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়। একটি বিষয়ে একাধিক জনের একাধিক মতামত থাকতেই পারে। তার কারনে একজন আরেকজনকে কখনোই কাফের বা মুশরিক ফতোয়া দিতে পারে না। আর যেসব বিষয়গুলো কুরআন এবং হাদিসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে সেসব বিষয়ে অযথা মতভেদ সৃষ্টি করাও নিষিদ্ধ।
আজ বিভক্তি হওয়ার কারণে মুসলিম বিশ্ব অমুসলিমদের হাতে নির্যাতিত হচ্ছে। মুসলিমদের শক্তি কমে গেছে। যখন তখন যে কোন অমুসলিম দেশ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে মুসলিম দেশের উপর আক্রমণ করছে। এটা পুরোটাই মুসলিমদের দোষের জন্যই। তারা একতাবদ্ধ হতে পারেনা, একসাথে শক্তি প্রয়োগ করতে পারেনা। এবং অমুসলিমরা তাদের বিরুদ্ধে যে শক্তি প্রয়োগ করে সেই শক্তিকে একসাথে প্রতিহত করার চেষ্টা করে না। অনেক মুসলিম দেশগুলো একে অপরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত। তারা নিজেদের শক্তি নিজেদের উপরেই প্রয়োগ করতেছে। তারা নিজেরা নিজেরাই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। যার কারনে তাদের প্রতিরোধের এবং প্রতিরক্ষার হাত দুর্বল হয়ে পড়েছে। মুসলিমরা যত বিভক্ত হবে তাদের শক্তি তত কমবে এবং তাদের উপর নির্যাতনের হার বাড়বে। আলেমরা যত বিভক্ত হবে তাদের শক্তি তত কমবে এবং তারা তত একা হয়ে যাবে এবং তাদের উপর ইসলাম বিরোধী শক্তি নির্যাতন করবে, এটাই বাস্তবতা।
ইসলামের মত একটি শান্তির ধর্ম অশান্তিতে সময় পার করছে যার মূলে রয়েছে বিভক্তি। আল্লাহ সমস্ত মুসলিম বিশ্বকে একতাবদ্ধ করুক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

নিচে ক্বুরআন ও হাদিস এর আলোকে ব্যাখ্যা করা হলো:
📖 ক্বুরআন শরীফে আলেম ও উম্মাহর বিভক্তি নিষেধ:
১️⃣ ঐক্যের নির্দেশ, বিভক্তির নিষেধ
সূরা আলে ইমরান (আয়াত:১০৩): “তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিভক্ত হয়ো না।”
➡️ এই আয়াত আলেমদের জন্য আরও বেশি প্রযোজ্য, কারণ তারাই জাতিকে পথ দেখায়। আলেমদের বিভক্তি মানেই উম্মাহর বিভক্তি।

২️⃣ ধর্মকে খণ্ড-বিখণ্ড করা হারাম
সূরা আল-আন‘আম (আয়াত:১৫৯): “নিশ্চয়ই যারা নিজেদের ধর্মকে টুকরো টুকরো করেছে এবং দলে দলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের সঙ্গে তোমার কোনো সম্পর্ক নেই।”
➡️ এখানে “দল” বলতে এমন বিভক্তি বোঝানো হয়েছে, যা হক থেকে বিচ্যুত করে।

৩️⃣ আগের উম্মাহর মতো না হতে সতর্কতা
সূরা আশ-শূরা (আয়াত:১৩–১৪): “তাদের কাছে স্পষ্ট প্রমাণ আসার পরও তারা পরস্পরের হিংসার কারণে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল।”
➡️ আলেমদের মধ্যে হিংসা, পদ-মর্যাদার লড়াই—এসব থেকেই বিভক্তি জন্ম নেয়।

৪️⃣ বিভক্তি দুর্বলতা ডেকে আনে
সূরা আল-আনফাল (আয়াত:৪৬): “পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হয়ো না, নতুবা তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে।”

🕌 সহিহ হাদিসে বিভক্তি সম্পর্কে নির্দেশনা
১️⃣ বিভক্তি ধ্বংস ডেকে আনে
রাসূল ﷺ বলেন: “তোমাদের পূর্ববর্তীরা ধ্বংস হয়েছে পারস্পরিক মতবিরোধ ও বিভক্তির কারণে।” 📚 সহিহ মুসলিম
➡️ আলেমদের বিভক্তি সবচেয়ে ভয়ংকর, কারণ মানুষ তাদের অনুসরণ করে।

২️⃣ জামাআত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নিষিদ্ধ
রাসূল ﷺ বলেন: “যে ব্যক্তি জামাআত থেকে এক বিঘত পরিমাণও বিচ্ছিন্ন হলো, সে ইসলামের বন্ধন খুলে ফেলল।” 📚 সুনান আবু দাউদ (সহিহ)

৩️⃣ দলাদলি জাহিলিয়াত
রাসূল ﷺ বলেন:
“যে ব্যক্তি দলাদলির আহ্বান জানায়, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।” 📚 সুনান আবু দাউদ

৪️⃣ আলেমদের মতভেদে আদব থাকা জরুরি
ইমাম মালিক (রহ.) বলেন:
“প্রত্যেকের কথাই গ্রহণযোগ্য ও বর্জনযোগ্য—শুধু এই কবরবাসী ছাড়া।” (তিনি রাসূল ﷺ–এর কবরের দিকে ইশারা করেন)
➡️ মতভেদ থাকবে, কিন্তু বিদ্বেষ, তাকফির ও দলাদলি হারাম।

🧠 সারসংক্ষেপ (মূলনীতি)
✔️ ইখতিলাফ (ফিকহি মতভেদ) → অনুমোদিত
❌ ফিরকা, দলাদলি, হিংসা, একে অন্যকে পথভ্রষ্ট বলা → হারাম

🔹 আলেমদের দায়িত্ব:
১. কোরআন ও সুন্নাহকে কেন্দ্র করে ঐক্য বজায় রাখা
২. মতভেদে শালীনতা ও সহনশীলতা বজায় রাখা
৩. উম্মাহকে বিভক্ত না করা


আলেম–ওলামাদের মধ্যে মতভেদ হলে এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ কী বলেছেন???
১️⃣ মতভেদ হবে—এটা স্বাভাবিক
রাসূলুল্লাহ ﷺ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে উম্মতের মধ্যে মতভেদ হবে।
হাদিস: “ইহুদিরা ৭১ দলে বিভক্ত হয়েছে, খ্রিস্টানরা ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছে, আর আমার উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে।”
— সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৫৯৬; তিরমিজি ২৬৪১ (হাসান সহিহ)

২️⃣ তাহলে কোন দল সঠিক?
সাহাবারা জিজ্ঞেস করেছিলেন—কোন দলটি নাজাতপ্রাপ্ত?
রাসূল ﷺ বললেন: “যারা আমার ও আমার সাহাবাদের পথ অনুসরণ করবে।”— তিরমিজি, হাদিস ২৬৪১
➡️ অর্থাৎ: কুরআন, সহিহ সুন্নাহ, সাহাবাদের বুঝ অনুযায়ী ইসলাম---এই তিনটির সাথে যে মত মিলে, সেটাই গ্রহণযোগ্য।

৩️⃣ আলেমদের ইখতিলাফ (মতভেদ) সম্পর্কে দিকনির্দেশনা
রাসূল ﷺ বলেছেন—“তোমরা আমার সুন্নাহ ও আমার পরবর্তী হেদায়েতপ্রাপ্ত খলিফাদের সুন্নাহ আঁকড়ে ধরো।”— সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৬০৭ (সহিহ)

➡️ অর্থাৎ আলেমদের মতভেদ হলে:
যে মত কুরআন ও সহিহ হাদিসের সাথে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সালাফে সালেহিন (সাহাবা–তাবেয়িন) যেভাবে বুঝেছেন সেই মতটাই গ্রহণযোগ্য।

৪️⃣ সব মতভেদ কি খারাপ? 
উত্তর: না।
ফিকহি (আইনগত) বিষয়ে মতভেদ থাকতে পারে—এটা সাহাবাদের মধ্যেও ছিল।
কিন্তু—
❌ আকিদায় বিভ্রান্তি
❌ কুরআন–হাদিসের বিরোধিতা
❌ নিজের মতকে দ্বীনের চেয়ে বড় করা
এসব কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

৫️⃣ সাধারণ মানুষের করণীয় কী?
রাসূল ﷺ–এর নির্দেশ অনুযায়ী—
✔️ দলান্ধতা নয়, কুরআন ও হাদিসের আলোকে ইসলাম জানা।
✔️ অন্ধ অনুসরণ নয়, ইসলামী বিষয়ে পড়াশোনা করা।
✔️ কুরআন ও সহিহ সুন্নাহভিত্তিক আলেমদের অনুসরণ করা 
✔️ মতভেদে শালীনতা ও আদব বজায় রাখা, মতভেদের উপর ভিত্তি করে বিভক্ত না হওয়া। 

Comments

    Please login to post comment. Login