Posts

গল্প

অলস আষাঢ়ে বিকেল

March 31, 2026

Bishwajit Das

Original Author বিশ্বজিৎ দাস

14
View

ঠিক বিকেল পাঁচটা। ঢং… ঢং… ঢং… শব্দ। দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির পেন্ডুলামটা যেন ঘরের নীরবতাকে কেটে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছিল। শব্দে ঘুম ভেঙে গেল আমার। আধো–জাগা চোখ খুলতেই দেখলাম পাশে তমা এখনও গভীর ঘুমে ডুবে আছে। তার চুল এলোমেলো হয়ে গালে লেগে আছে, নিঃশ্বাসের মৃদু ওঠা–নামা। মুহূর্তটাকে দেখে মনে হলো জীবনের সবচেয়ে শান্ত বিকেল হয়তো এখনই।

আমি আস্তে করে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালাম, যেন তার ঘুম না ভাঙে। মুখ ধুয়ে বারান্দায় এলাম। মুখ ধুতে গিয়ে জানালার ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগলো।

আষাঢ় যেন নিজের নিয়মে চলে। প্রতিবছরের মতো এবারও সে জমিয়ে এনেছে টানা বৃষ্টির আয়োজন। সকাল থেকেই আকাশে ভারী মেঘ, আকাশের মুখ ভার, চারপাশে নেমে এসেছে ঘন অন্ধকার। বাইরে গাছগুলো বৃষ্টির সঙ্গে দুলছে, দমকা হাওয়া বইছে, আর টুপটাপ বৃষ্টি ঝরছে অবিরাম। নিরবচ্ছিন্ন বৃষ্টির শব্দ বারান্দা ভরিয়ে রেখেছে। চারদিকে এক ধরনের মায়াবী শান্তি।

আমি বারান্দার চেয়ারে বসলাম। বৃষ্টির গন্ধ নাকে লাগল মনে হলো, এ যেন প্রেমেরই আবহাওয়া। শরীরজুড়ে এক ধরনের শীতল আলস্য। বারান্দার রেলিংয়ে টুপটাপ শব্দে মনে হচ্ছে কেউ যেন অচেনা কোনো ছন্দ বাজাচ্ছে। আলো–ছায়ার মিশেলে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত, শান্ত একাকিত্ব।

আমাদের বাসার বারান্দার সামনে অনেকগুলো নারকেল গাছ। পাতাগুলো একবার ডানে যায়, আবার বামে ফিরে আসে, বাতাস যেন নিজের ছন্দে নেচে ওঠে। আমি অনেকক্ষণ বসে থাকলাম, শুধু সেই দৃশ্যটা উপভোগ করলাম। এরপর পত্রিকাটা হাতে তুলে নিয়ে শিরোনামগুলো পড়তে শুরু করলাম। প্রায় দশ মিনিট কেটে গেল অজান্তেই।

হঠাৎ হালকা এক বজ্রপাতের শব্দে আমি একটু চমকে উঠলাম। তমারও ঘুম ভেঙে গেল। পেছন থেকে পায়ের হালকা শব্দ। তমা মুখ ধুয়ে এসে আমার পাশে দাঁড়াল। চোখে ঘুমঘুম ভাব। আমি তাকে বসতে বললাম, কিন্তু সে বসলো না; শুধু নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলো। কিছুক্ষণ বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকলো। থমকে থাকা দৃষ্টিতে তার চোখে নরম উজ্জ্বলতা ফুটে উঠলো।

কিছুক্ষণ পর মৃদু গলায় জিজ্ঞেস করলো
চা খাবে?

এই আবহাওয়ায় এমন প্রশ্নে না বলার উপায় নেই। তমা ভেতরে চলে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই দু’কাপ ধোঁয়া ওঠা চা নিয়ে ফিরে এলো। এসে আমার পাশে বসল। আমরা দু’জনে পাশাপাশি বসে নীরবে চা খেতে খেতে শুধু বৃষ্টি দেখছিলাম। দুজনের চুপচাপ চা খাওয়ার মধ্যেই ছিল একটাই ভাষা, স্মৃতির ভাষা।

আমি প্রথম চুমুক দিলাম। চায়ের গরম ধোঁয়া আর বৃষ্টির গন্ধ মিলেমিশে এক অদ্ভুত ভালো লাগা তৈরি করলো। তমাও চায়ে চুমুক দিলো। কেউ কিছু বললাম না, শুধু মৃদু বাতাস আর বৃষ্টির শব্দে হারিয়ে গেলাম। বৃষ্টি একই ছন্দে ঝরতে থাকে, থামার কোনো লক্ষণ নেই।

বারান্দার সামনে একটু খালি জায়গা আছে, ছোট্ট একটি বাগানও। বৃষ্টির কারণে বাগানটা আরও সবুজ দেখাচ্ছিল। সেই খালি জায়গায় কয়েকটি ছেলে বৃষ্টির মধ্যে খেলছিল। একটি ছোট ছেলে সাইকেল চালাচ্ছিল। রাস্তা দিয়ে এক বৃদ্ধ আস্তে আস্তে হেঁটে যাচ্ছিলেন, কেন যেন মনে হলো, আমার খুব আপন কেউ হেঁটে যাচ্ছে। দূরে কোনো গাছে হয়তো শালিক বা দোয়েল বসে ছিল। সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত শান্ত অনুভূতি।

নীরবতা ভেঙে আমি তমাকে জিজ্ঞেস করলাম
কেমন লাগছে?

তমা মৃদু হেসে বললো, অনেক ভালো লাগছে।

আমি বললাম
তমা, মনে আছে? আমাদের প্রথম দেখাটা? প্রথম বৃষ্টিটা? সেদিনও এমনই আবহাওয়া ছিল…

তমা হেসে মাথা নাড়লো
হ্যাঁ, সবই মনে আছে… সে কথা কি ভোলা যায়? তুমি বলো, আজ শুনতে ইচ্ছে করছে।

আমি বলতে শুরু করলাম, আর আমরা দুজনেই ফিরে গেলাম অতীতে।

সেদিন তুমি আর তোমার বান্ধবী ভিজতে ভিজতে বাসায় ফিরছিলে। তোমাকে প্রথম দেখার সেই মুহূর্তে আমি থমকে গিয়েছিলাম। বুকের ভেতর ঝড় বয়ে গিয়েছিল। এক পলকের সেই দৃষ্টি আজও মনে গেঁথে আছে। তুমি এগিয়ে যাচ্ছিলে, আর না বুঝেই আমিও তোমার পেছনে হাঁটা শুরু করলাম। তুমি বাসার গেটে ঢোকার পর আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম।

সেদিন আর দেখা হলো না। পরের দিন আবার তোমার হলের সামনে এলাম। বৃষ্টি পড়ছিল। আমি তোমার বারান্দার দিকে তাকিয়ে রইলাম, এক পলক দেখার আশায়। অনেকক্ষণ পর তুমি বারান্দায় এলে। ঠিক পাঁচ সেকেন্ডের জন্য তুমি আমার দিকে তাকালে। সেই পাঁচ সেকেন্ডই আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়।

বহুদিন পর আজ নিজেকে হালকা লাগছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো মনে পড়ছিল। তোমার সাথে বৃষ্টির দিনের সেই স্মৃতিগুলো আরও তীব্র হয়ে উঠছিল।

মনে আছে? প্রথম যেদিন আমরা অনেকক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম, সেদিন তুমি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলে। আমি দ্রুত সুস্থ হলেও তোমার প্রায় এক সপ্তাহ লেগেছিল। সেদিনই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, তোমাকে আর বৃষ্টিতে ভিজতে দেবো না।

এরপর বৃষ্টি নামলেই আমি তোমার হলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম। ভিজে যেতাম মাথা থেকে পা পর্যন্ত, শুধু তোমাকে দেখার জন্য।

একদিন ক্যান্টিনে তুমি রাগ করে বললে নিজের দিকে তাকাও! এইভাবে আর কতদিন চলবে?

তোমার চোখে উদ্বেগ, বিরক্তি আর গভীর মমতা ছিল। তোমার সেই কথা আমার মনে গেঁথে গেল। বাইরে বৃষ্টি ঝরছিল, আর ভেতরে জমছিল না-বলা গল্প।

তমার কণ্ঠ আমাকে বর্তমানের বারান্দায় ফিরিয়ে আনলো। বৃষ্টি তখনো পড়ছে। চায়ের কাপ প্রায় ফাঁকা। তমা আমার দিকে তাকালো, চোখে মোলায়েম উষ্ণতা।

আমি বললাম তোমাকে প্রথম দেখার সেই অনুভূতি আজও আছে। তমা কিছু বললো না। শুধু আমার কাঁধে মাথা রাখলো।

আমি বললাম মনে আছে? ক্যাফেটেরিয়ায় প্রথম তুমি হাসলে…আর সেই হাসি আমার বাকি জীবনের আলো হয়ে থাকে।

তুমি চায়ে চিনি দিতে ভুলে গিয়েছিলে। সেই হাসি আমার জীবন বদলে দিয়েছিল।

আরেকদিন বৃষ্টিতে তুমি বললে আপনি খুব বাজে মিথ্যে বলেন।

আমি লজ্জা পেয়েছিলাম। তারপর আমরা হাঁটতে হাঁটতে ক্যান্টিনে গেলাম। তোমার হাতটা আমার হাত ছুঁয়ে গিয়েছিল। আমি থেমে গিয়েছিলাম। তুমি বললে জানি, ছুঁয়েছে। আমি হাতটা ধরলাম। তুমি ছাড়লে না। সেই প্রথম আমরা হাত ধরে হাঁটলাম।

তমা হঠাৎ বলল লাল শাড়ির দিনের কথা মনে আছে? আমি হেসে বললাম অবশ্যই। আমরা হাসতে লাগলাম।

আমি বললাম আরেকটা দিন? প্রথম ঝগড়া?

তুমি রাগ করেছিলে। কিন্তু রাতে মেসেজ দিলে রাগ করোনি তো?

আমি সব ভুলে গিয়েছিলাম।

আমি বললাম মনে আছে, যেদিন তোমাকে প্রোপোজ করেছিলাম?

আষাঢ়ের বৃষ্টিতে, ছাদের চাতালে…
তুমি কি আমার হবে?

তুমি বলেছিলে অনেক আগেই হয়েছি। সেদিন তোমার চোখের জল আর বৃষ্টির ফোঁটা আলাদা করতে পারিনি।

আমরা আরও কাছে চলে এলাম।

আমরা কি এখনো সেই মানুষ দু’জন?
হয়তো।

তমা মাথা কাঁধে রাখলো।
সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলো এখনো বাকি আছে।

তারপর আমরা বাইরে তাকিয়ে রইলাম।
বৃষ্টি ঝরছে… স্মৃতি ঝরছে…

আমাদের বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। বাড়িতে উৎসবের হাওয়া।
তোমার বাবা বললেন মেয়েকে দেখে রেখো।

বিয়ের পর আমরা বুঝলাম ভালোবাসা শুধু রোমান্স নয়; এটা ধৈর্য, অভিমান, আর ছোট ছোট যত্নে গড়া।

আমাদের প্রথম ভালোবাসা দিবস তুমি লাল শাড়ি পরে এসেছিলে। আমি ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমরা শুধু হাসছিলাম। দিনটা ছোট ছিল, কিন্তু স্মৃতি বড়।

পহেলা ফাল্গুন তুমি হলুদ শাড়ি, আমি হলুদ পাঞ্জাবি।
লেকের পাশে বসে গল্প…
সাধারণ, অথচ অসাধারণ।

সন্ধ্যা নেমে এলো। আলো জ্বালালাম। পরে বিদ্যুৎ চলে গেল।
মোমবাতির আলোয় ঘরটা অন্যরকম হয়ে উঠলো।
তমা গান ধরলো, আমি বই খুলে বসে রইলাম।

আমি বললাম রাগ নেই, অভিমান নেই… আছে শুধু বৃষ্টি।

আমরা কি এমনই থাকবো?
থাকবো। কারণ আমরা গল্প হয়ে গেছি।

রাত গভীর হলো।
বৃষ্টি থেমে গেল।
মোমবাতির আলো নিভে আসছে।

আমি তমার কপালে চুমু খেলাম।
সে বললো এটাই আমার সুখ।

বৃষ্টি থেমেছে। ভালোবাসা থামেনি।

Comments

    Please login to post comment. Login