Posts

উপন্যাস

ত্রি-রমনী (পরিচ্ছেদ ২২)

April 4, 2026

M. Khanam

9
View

মারজিয়া তার বাবার দিকে তাকায়। সাদিকের চেহারাটায় দুঃখভাবটা এখনও আছে তবে জোর করে একটু হাসার চেষ্টা দেখা যায় তাতে। এ দুঃখ যে আপত্তির দুঃখ না তা সে ভালোই বুঝে। একখানা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, আপনারা বেশ ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এসেছেন দেখে ভাল লাগল। তবে চাকরি-বাকরি একটা বড় বিষয়, আলু আর জাকি বর্তমানে একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছে। ভবিষ্যতে বিষয়টা এমন নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে ওর কর্মজীবনে কোনো প্রভাব পড়বে কি? 

জাকির মা খানিকটা অবাক হয়ে জাকির বাবার দিকে তাকায়। জাকির বাবা বলে, কিসের প্রভাব পড়বে? জাকির? 

পারিবারিক প্রভাব। মেয়েদের চাকরি করা নিয়ে একটা ইতস্তত বোধ তো থাকেই। এখন না থাকলেও ভবিষ্যতে বাচ্চাকাচ্চা হলে তখন হতে পারে। 

জাকির মা হেসে বলে, আপনারা হয়ত ভাবছেন আমরা অন্য আট-দশটা শ্বশুড়-শ্বাশুড়ির মত ছেলে-মেয়েদের জীবনে দখল দিব। তরকারির লবন, নাতি-নাতনির জন্য জোরাজুরি করব। কিন্তু বিষয়টা এমন না। আমরা শুধু ওদের সাথে এক বাসায় থাকব। তাও ওরা যদি চায় অন্যত্রও থাকতে পারে, আমাদের এতে কোনো দ্বিমত নেই। কর্মসূত্রে আমি এদিক-ওদিকই বেশি থাকি। জাকির বাবা যতটুক সময় ঘরে থাকে, ঘুমের উপরই থাকে নাহয় নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। ওদের জীবনে দখল দেওয়ার মত বাসায় কেউ নেই। 

জাকি মারজিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে, আপু, শুধু কর্মক্ষেত্র না, আলুর কোনো বিষয়েই ওর সিদ্ধান্তের বাইরে কারো মতামত প্রাধান্য পাবে না। আঙ্কেল যেটা বললেন, ওর সিদ্ধান্ত ওর উপর ছেড়ে দিলেই ও সবচেয়ে ভালটা খুঁজে বের করে। 

মারজিয়া জাকির দিকে তাকায়। বলে, আমাদের আম্মু সারাজীবন পরিবারের জন্যই খেঁটে গেছে। তার নিজের জীবন বলতে কিছুই ছিল না। তুমি বেশ ভাল করেই জানো আলু একদমই এমন না। সেক্ষেত্রে চিন্তাটা আসা আসলে অস্বাভাবিক না। একটু থেমে বলে, তোমার মা-ও চাকুরীজীবী। তাই তোমার জানাই আছে, ঘরের বউরা চাকরি করলে সংসারে না চাইতেও একটা প্রভাব পড়ে। এসব বিষয়ে কথা বলে একটা স্পষ্ট ধারণা নিয়ে নেওয়া উচিৎ। ভবিষ্যতে দেশে থাকবে নাকি বিদেশের ইচ্ছা আছে, বাচ্চাকাচ্চা কিভাবে মানুষ করবে, ঘরের খরচ কিভাবে মিলেমিশে চালাবে— এগুলো জেনে এগুলে অনেকগুলো সমস্যা তৈরির আগেই সমাধান হয়ে যায়।

আমি আপনার সাথে একমত, আপু। আন্টি আপনাদের জীবনে যতটা উপস্থিত ছিল, চাকরির কারনে মা আমার জীবনে এতটা ছিলেন না। ছোট বয়সে খানিকটা রাগ-ক্ষোভ হত, কেন মা সবসময় কাছে থাকে না। অন্যসব বাচ্চাদের মত, আমি যে আমার মায়ের পুরো পৃথিবী না, পৃথিবীর একটা অংশ– এটা মেনে নেওয়া আমার জন্য কষ্টকর ছিল। 

আলিশা তাকিয়ে জাকিকে দেখে, তার চোখ দুটো ছলছল করে। 

ভালবাসায় সিক্ত দুটো চোখের দিকে তাকিয়ে অজান্তেই মৃদু হাসে জাকি। মৃদুস্বরে বলে, বড় হতে হতে বুঝেছি যে দোষ আমার মায়ের না, এই সমাজের। এই সমাজ আমাকে বোধ করিয়েছে যে মায়ের অনুপস্থিতিটা অস্বাভাবিক আর বাবারটা স্বাভাবিক। অনুপস্থিতির প্রশ্ন যদি করতেই হয়, তবে দুইজনকেই করতে হবে। শুধুমাত্র সমাজ রক্ষার জন্য কাউকে ধরে-বেঁধে ঘরসংসারের চার দেয়ালে আটকে দেওয়া উচিৎ না। সবাই ঘর-সংসারের জন্য তৈরি না, কিছু মানুষ জগৎ-সংসারের জন্য তৈরি। একটু থেমে আলিশার দিকে তাকিয়ে বলে, আলুর জীবনের সিদ্ধান্ত আলুর নিজেরই হবে। 

মারজিয়া ঘুরে তার মায়ের দিকে তাকায়। 

মিলি এক নজরে জাকির দিকে তাকিয়ে আছে। 

জাকির মা পাশ থেকে আলত করে জাকির হাতটা ধরে। ছেলেটা যে এতটা বড় হয়ে গেছে সে অনুভবই করতে পারে নি। মৃদু হেসে বলে, জীবনে এমন সময়ও গেছে যখন আমার নিজের মা-বোনেরা বলেছে যে মেয়ে মানুষের এত শখ থাকা ভাল না। স্বামী-সন্তানই মেয়েদের জীবন। আমার শ্বাশুড়ি একমাত্র মানুষ যিনি বলতেন, যে মেয়ে বিয়ে দিয়ে দিছেন, এখন সে আমার ঘরের বউ। আমার ছেলের বউ পড়াশোনা করবে নাকি চাকরি এটা তার বিষয়। জাকিকে ওর দাদিই কোলেপিঠে মানুষ করেছে, আমি তেমন কিছুই করি নাই। প্রথম প্রথম যখন ঢাকাতে বদলি হয়ে এলাম, তখন ঢাকার রাজনৈতিক অবস্থা ভাল না। সারাদিন এদিকে-ওদিক দৌড়ের উপর থাকতে হত, তিন-চার দিনে হয়ত দুই ঘন্টাও ঘুম হয়নি। জাকি তখন বেশ ছোট, হঠাৎ তার খুব জ্বর। কোনোদিকেই সামলে উঠতে পারছিলাম না। তখন আমার শ্বাশুড়ি হাতে তুলে খাইয়ে দিয়েছেন, মাথা তেল-পানি দিয়ে হাত বুলিয়ে দিয়েছেন যতক্ষণ না ঘুমিয়ে পড়েছি। তাকে জড়িয়ে ধরে জীবনে যতবার কেঁদেছি, তার কোলে যতদিন মাথা রেখে ঘুমিয়েছি, আমার মায়ের কোলেও ততদিন ঘুমাই নি। আলিশার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলে, এতটা ভাল শ্বাশুড়ি হয়ত হতে পারব না, তবে চেষ্টায় কমতি থাকবে না। আলিশাও তার দিকে তাকিয়ে একটা মিষ্টি হাসি দেয়।    

আনিসা জাকির মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, আন্টি, আপনি কি চাকুরি করেন?

জাকির মা হেসে আনিসার দিকে তাকায়। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রনালয় আছে না? আমি বর্তমানে ওখানের ভারপ্রাপ্ত সচিব। 

পাশে বসে থাকা আলিশা খানিকটা ঘুরে একবার তার দিকে তাকায় এরপর জাকির দিকে। সাদিক আর মিলিও একজন আরেকজনের দিকে তাকায়। 

আনিসা চোখ বড় করে জিনিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। 

জিনিয়া ঘুরে একবার সবাইকে দেখে। কোনো সমস্যা? 

মিলি খানিকটা হকচকিয়ে বলে, নাহ মানে, জাকি শুধু সরকারি চাকরির ব্যাপারেই বলেছিল, আপনি যে এত বড় পদে চাকরি করেন তা আমরা কেউ জানতাম না। আলুও বোধহয় জানত না। আলিশা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়।

জিনিয়া হাসে। বলে, কিছু মনে না করলে আপনাকে একটা বিষয় জিজ্ঞেস করি? 

মিলি সৌজন্যতার হাসি দিয়ে বলে, জী, অবশ্যই।

চোখের চিকন ফ্রেমের চশমাটা ঠিক করতে করতে জাকির মা বলে, আপনি কোথা থেকে পড়াশোনা করেছেন?

প্রশ্নটার সাথে সাথেই যেন বসার ঘরটাতে খানিকটা গম্ভীরতা ছেয়ে গেল। ছোট দুই বোন বিস্ময়ের সাথে বড় বোনের দিকে তাকায়। মারজিয়ার চোখে-মুখে খানিকটা গম্ভীরতা। সাদিকও অবাক হয়ে মিলির দিকে তাকায়। 

জাকি হকচকিয়ে হয়ে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, এসব জিজ্ঞেসের কি কোনো প্রয়োজন আছে? 

জিনিয়া বুঝতে পারে বিষয়টা অন্যরকম লাগছে। দ্রুত বিব্রতকর হাসি দিয়ে বলে, আমি দুঃখিত। বিষয়টা আমি কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে জিজ্ঞাসা করি নি। 

মারজিয়া খানিকটা গম্ভীর মুখে জাকির মায়ের দিকে তাকায়। বলে, মেয়ের মায়ের ব্যাপারে জানতে চাওয়াটা মেয়ে-দেখার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ, আমরা বুঝি। আম্মু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকোনোমিকসে পড়তেন। তবে পড়াশোনা শেষ করেন নি। 

সাদিক জাকির মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, মিলি পড়াশোনায় বেশ ভাল ছিল। তবে বিয়ের পর আমার পরিবার আর চায় নি যে সে পড়াশোনা করুক। তাই মাঝ পথে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়েছিল। 

মিলি খানিকটা বিব্রত বোধ করে। হঠাৎ করে বিষয়গুলো যেন তাকে নিয়ে হয়ে গেল। 

জিনিয়া খানিকটা ভ্রু কুঁচকে বলে, ইকোনমিকস ৬৫তম ব্যাচ? 

মিলি খানিকটা অবাক হয়ে তার দিকে তাকায়। মাথা নাড়িয়ে বলে, হ্যাঁ— 

জিনিয়া হেসে বলে, উত্তরা থাকতেন?

মিলি বিভ্রান্তির সাথে সাদিকের দিকে তাকায়। এরপর জিনিয়ার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ায়। 

জিনিয়া হেসে তার স্বামীর দিকে তাকায়। বলে, পৃথিবীটা ছোট জানতাম। এত ছোট জানতাম না। আমাকে এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলা, মিলি আপা?

সবাই অবাক হয়ে জিনিয়ার দিকে তাকায়। মিলির নাম তাকে কেউ জানায় নি। 

জাকি নিজেও তার প্রেমিকার মায়ের নাম জানে না। অবাক হয়ে বলে, আম্মু, তুমি চিনো আন্টিকে? 

চিনি! হেসে মিলির দিকে তাকিয়ে বলে, জিনিয়া কবির, ৬৬ ব্যাচ। উইমেন্স হলের নীচতলার কর্নারের রুমে থাকতাম। জীবনে প্রথম মাকে ছেড়ে দূরে এসে অসুস্থ হয়ে গেছিলাম, তুমি তিন দিন আমার হলে থেকে আমার সেবা-যত্ন করছিলা, বাসা থেকে রান্না করে এনে আমাকে খাওয়াইতা কারন আমি হলের খাবার খেতে পারতাম না। 

মিলি বিস্ময়ের সাথে জাকির মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। বিরবির করে বলে, জিনিয়া কবির— 

আরে, তেল দিয়ে সবসময় দুইটা বেনী করে রাখতাম! তুমি কতবার আমার চুল আঁচড়ে দিসো!

মিলি ভাবে। এত বছর আগের কথা, সবটা স্মৃতিতে ধুলো পরে আছো। এতগুলো বছরে কেউ ছিল না যাকে এসব ঘটনা সে বলতে পারত, যে শুনতে চাইত। পাঠক না থাকলে যেমন বই ছাপানো বন্ধ হয়ে যায়, শোনার মানুষ না থাকলে যেমন রেডিও বন্ধ হয়ে যায়— তেমনি জীবনের গল্পগুলো শোনার কেউ না থাকলে ধীরে ধীরে আমাদের মস্তিষ্ক সেগুলোকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে চিন্তাসীমার দূরে কোনো এক অন্ধকার ঘরে ফেলে দেয়। সেখানে ধীরে ধীরে ধুলো-ময়লায় ছেয়ে যায় আমাদের সবচেয়ে সুন্দর কিন্তু অপ্রয়োজনীয় স্মৃতিগুলো। মিলি তাকিয়ে জাকির মাকে দেখে।  

জিনিয়া সোফা থেকে উঠে এসে মিলির পায়ের কাছে বসে। মিলির পায়ের উপর হাত দিয়ে মুখ তুলে তার চোখের দিকে তাকায়। জিনিয়ার চেহারায় একটা মলিন হাসি। বলে, একটু বড় হয়ে গেছি তো তাই হয়ত চিনতে পারছো না। কিন্তু আমি তোমাকে দেখেই চিনে গেছি। দেখো আজও তোমার শেখানো ভাবে শাড়ি পরি। 

মিলির ঠোঁট কাঁপে। চোখগুলোতে অস্থিরতা। ধুলো পড়া স্মৃতিগুলো পরিষ্কারের কাজ চলছে মস্তিষ্কে। জাকির মায়ের চেহারাটায় চোখ বুলিয়ে দেখতে থাকে। ভ্রু কুঁচকে বলে, জিনি? 

জিনিয়া দাঁত বের করে হাসে। উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলে, তোমাকে একটু জড়িয়ে ধরি, মিলি আপা?

মিলি উঠে দাঁড়াতেই তাকে জড়িয়ে ধরে জিনিয়া। মিলির চোখের সামনে কয়েক দশক পুরানো ঘটনাগুলো অল্প অল্প করে পরিষ্কার হতে থাকে। দুই বেনী করা ভয়ে কাঁচুমাচু হয়ে থাকা এক মেয়েকে কল্পনা করে সে। যার সাথে এই জিনিয়া কবিরের কোনো মিল নেই। না চিনতে পারাটাও অস্বাভাবিক না। জিনিয়া শক্ত করে মিলিকে জড়িয়ে ধরে রাখে, মিলিও তাকে জড়িয়ে ধরে। যেন কতকাল নির্জন দ্বীপে একা বাস করার পর মানুষের দেখা পেয়েছে। 

বাকিরা হাসিমুখে তাদের দুইজনকে দেখে। শুধুমাত্র আনিসার চোখেমুখে হাসি নেই। আনিসা ধীর পায়ে উঠে জাকি আর আলিশার কাছে যেয়ে নিচু হয়ে মৃদুস্বরে বলে, বোনের ছেলে-মেয়েদের মাঝে বিয়ে হওয়াটা কি ভাল দেখাবে? তার কণ্ঠে গম্ভীরতা থাকলেও চেহারায় দুষ্ঠামি। যেন কত কষ্টে ঠোঁট চেপে নিজের হাসি থামানোর চেষ্টা করছে। 

আলিশা ভ্রু উঠিয়ে দাঁত খিটমিট করে তাকায় ওর দিকে। জাকি মৃদু হাসে। পাশ থেকে মারজিয়াও তাদের কথোপথন শোনে। কিন্তু আনিসার কথাটায় তার খানিকটা দুশ্চিন্তা হয়। এই নতুন সম্পর্কের মোড়টা যদি সত্যিই কোনো প্রভাব ফেলে! 


 

Comments

    Please login to post comment. Login