Posts

নন ফিকশন

নওগাঁর দীঘিঃ জলের ভেলায় অঞ্চলের ইতিহাস

April 6, 2026

সাজিদ রহমান

8
View

ফরাসি শব্দ ‘নও’ বাংলা শব্দ ‘গাঁ’ এর সাথে যুক্ত হয়ে ‘নওগাঁ’র উদ্ভব হয়েছে। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমভাগে বাংলাদেশ-ভারত আন্তজার্তিক সীমা রেখা সংলগ্ন এই ভূখন্ড স্বাধীন বাংলাদেশে একটি নবীন জেলা হিসেবে আবির্ভুত হয়। সেটা খুবই সাম্প্রতিক ইতিহাস, ১৯৮৪ এর মার্চ মাস,  নওগাঁ মহকুমা ১১টি উপজেলা নিয়ে জেলার বারান্দায় প্রবেশ করে। নওগাঁ অর্থ নতুন গ্রাম হলেও এর রয়েছে সুপ্রাচীন ও বৈচিত্রময় ইতিহাস। অতি প্রাচীন আমল থেকে আত্রাই নদী বন্দর এলাকা ঘিরে নতুন নতুন গ্রাম গড়ে উঠে, কালক্রমে তা-ই নওগাঁ শহর এবং সর্বশেষ নওগাঁ জেলায় রূপান্তরিত হয়। প্রাচীন নওগাঁ পুন্ড্রবর্ধনের অংশ ছিল। এই জনপদ মৌর্য ও গুপ্ত যুগে বাংলার অন্যতম প্রধান প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক হিসেবে গড়ে উঠে। পার্শ্ববর্তী এলাকা মহাস্থানগড় (বগুড়া) ছিল এর রাজধানী। সাম্প্রতিক সময়ে নওগাঁর বিভিন্ন স্থানে প্রাপ্ত প্রাচীন ইট, মুদ্রা ও ভগ্নাবশেষ থেকে জানা যায়,  খ্রিস্টপূর্ব কয়েক শতক আগেও এই অঞ্চলে নগর ও জনবসতি ছিল। পাল যুগে (৮ম–১২শ শতক) গড়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বৌদ্ধ বিহার-পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহার । সেই স্বর্নযুগে ধর্ম (বৌদ্ধ), শিক্ষা ও শিল্পকলা বিপুলভাবে বিকাশ লাভ করে। সোমপুর মহাবিহার নালন্দা ও বিক্রমশীলার মতো আন্তর্জাতিক শিক্ষাকেন্দ্রের মর্যাদা পায়। এসকল স্থাপনা বর্তমান নওগাঁ জেলায় অবস্থিত। 

১৪–১৫শ শতকে নওগাঁ বাংলার স্বাধীন সুলতানদের (ইলিয়াসশাহী, হোসেনশাহী বংশ) শাসনের আওতায় আসে। নওগাঁ ও আশপাশে গড়ে ওঠে বহু প্রাচীন মসজিদ (উদাহরণ হিসেবে কুসুম্বা মসজিদ), দিঘি ও সরাইখানা সুলতানদের স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে টিকে আছে। প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম নিদর্শন হলো চর্যাপদ। পাহাড়পুর–মহাস্থান–বরেন্দ্র অঞ্চল ছিল চর্যাপদের সাধকদের প্রধান কর্মভূমি। অনেক গবেষক মনে করেন, চর্যাপদের রচনাস্থলগুলোর একটি অংশ আজকের নওগাঁ অঞ্চলের আশপাশে। বরেন্দ্র অঞ্চলের শক্তিশালী সাহিত্য ছিল বৈষ্ণব পদাবলি এবং কীর্তন বাউল ও ফকিরি গান, পালাগান, জারি–সারি, এবং বিশেষ করে কৃষ্ণভক্তি, রাধাকৃষ্ণ প্রেমকাহিনি, দেহতত্ত্ব ও সুফি দর্শন। এসমস্ত চর্চা নির্দেশ করে যে, নওগাঁ সুপ্রাচীন কাল থেকে মানব সভ্যতার উর্বরভূমি ছিল। এবাদেও সাম্প্রতিক কালের নওগাঁর উদ্ভবের সাথে গাঁজা চাষেরও গভীর সম্পর্ক আছে। ধারণা করা হয়, ১৭২২ সালে এই অঞ্চলে গাঁজার চাষ শুরু হয় এবং ১৯০৬ সালে ব্রিটিশ সরকার গাঁজা চাষের সুবিধার জন্য নওগাঁকে কেন্দ্র (হাব) হিসেবে গড়ে তুলে। ১৯১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় নওগাঁ গাঁজা চাষি সমবায় সমিতি যা ‘গাঁজা সোসাইটি’ নামে পরিচিত। বাংলা সাহিত্যের বরেণ্য লেখক অন্নদাশঙ্কর রায় এক সময় নওগাঁর মহকুমা প্রশাসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘নওগাঁ মহকুমা সৃষ্টির মূলে ছিল গাঁজার চাষ।’


২। 

ডিসেম্বরের মাসের শেষ। একবিংশ শতকের সিকিভাগ শেষ হয়ে আসলো। চাকরির সুবাদে ৫ বছর আগে নওগাঁয় এসে কাজ করা শুরু করি। নওগাঁ ছেড়ে আসারও আড়াই বছর পার হয়ে গেছে। আবারও নওগাঁর অভিমুখে যাত্রা করেছি। যদিও এর মাঝে নওগাঁয় ২/১ বার ঢু মেরেছি, কিন্তু এবারের যাত্রার উদ্দেশ্য সম্পুর্ন ভিন্ন। ঘন কুয়াশার সাদা শুভ্র চাঁদরে ঢাকা পড়েছে উত্তরের প্রাণ ও প্রকৃতি। মননরেখার সম্পাদক নাসিম ভাইয়ের বিশেষ আগ্রহে খুব ভোরেই রওয়ানা হয়ে যাই আমরা। সাথে যোগ দেয় বাল্যবন্ধু তাজুল, ভ্রমণে যার ক্লান্তি নেই। তিন-দুই-এক বলে দৌড় শুরু করতে যে সময় লাগে, সে তাঁর চেয়েও কম সময়ের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে। জয়পুরহাট শহরে যখন প্রবেশ করছি, সূর্য একটু একটু করে উঁকি দিচ্ছিল। আর আমাদের পেটের খিদেও চড় চড় বেড়ে চলছিলো। নাস্তা করার জন্য গাড়িতে ব্রেক কষি। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল, দিনজুড়ে আলতাদীঘি ও দিবর দীঘি এবং এর আশেপাশের এলাকা চষে বেড়ানো। অতীত ইতিহাসের সাথে বর্তমান আঁকর এর মেলবন্ধন ঘটানো। কিন্তু নাস্তার টেবিলে দাবার চাল উল্টে যায়। নাসিম ভাই তখন ফোনে। একজনের সাথে কথা বলছেন। মোবাইলের অপর প্রান্তের ব্যক্তি ‘ভালোবাসার ৩৬৫ পুকুর’ এর সন্ধান দেন। সেই ফোনালাপের কীর্তিতে আলতাদীঘির পথকে অপেক্ষায় রেখে আমরা ছুটি ‘ভালোবাসার ৩৬৫ পুকুর’ এর উদ্দেশ্যে। ক্রিস্টোফার কলম্বাস স্পেনের রাণীর আশির্বাদ নিয়ে রওয়ানা হন। ইউরোপ থেকে ভারতে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ১৪৯২ সালে ভুলে পৌঁছে যান আমেরিকা (বাহামা দ্বীপুঞ্জে)। কালের বিবর্তনে আধুনিক পৃথিবীর অনেক কিছুই আমেরিকা ঘিরে গড়ে উঠেছে। আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য আমাদেরকে সেই ১৪৯২ সালের আগের দুনিয়াতে ফেরাতে চান। যে দুনিয়ার নিয়ম ছিল ‘জোর যার মুল্লক তাঁর’।     

নওগাঁয় আড়াই বছরেও ৩৬৫ পুকুরের নাম শুনিনি। এই অজ্ঞতায় বিরক্ত লাগে না, বরং নতুন কিছু দেখার আগাম আনন্দ মন ভরিয়ে দেয়। ভালোবাসার ৩৬৫ পুকুর দেখবো বলে গাড়ি ঘুরিয়ে নিই। সেখানে পৌঁছানোর আগে নেট ঘেঁটে বেশ কিছু কিংবদন্তি জানতে পারি। 

প্রাচীন কালের এক রাজা তাঁর রাজপ্রাসাদ, সৈন্যসামন্ত আর রানিকে নিয়ে সুখেই দিন কাটাচ্ছিলেন। হঠাৎ করে রাণী এক দুরারোগ্য অসুখে পড়লেন, রাজার পক্ষ থেকে এলান জারি হল। বড় বড় হেকিম, বৈদ্য, কবিরাজ এলেন রাজসভায়। তাদের একজন বললেন,রাণীর অসুখ সারাতে হলে ৩৬৫টি পুকুর খনন করতে হবে। প্রতিদিন নতুন একটি পুকুরে স্নান করতে হবে, তবেই মিলবে সমাধান। হেকিমের কথামত রাজা পুকুর খনন করেন। পরবর্তীতে রাণীর অসুস্থতার কী হয় তা জানা যায়নি, কিন্তু কালের সাক্ষী হয়ে নওগাঁর ধামইরহাটের চক-চান্দিরা গ্রামের উত্তরে রামপ্রসাদ ও দক্ষিণে কামারপাড়া গ্রামের ত্রিমোহনী মোড় পর্যন্ত প্রায় ছয় কিলোমিটার জুড়ে পুকুরগুলো নিজেদের অস্তিত্ব ঘোষণা করে যাচ্ছে। ভালোবাসার ৩৬৫ পুকুর নিয়ে ‘রূপকথার গল্প’ এর শেষ নেই। কিন্তু সেসব রূপকথায় ইতিহাসবিদ এবং প্রত্নতত্ত্ববিদদের ভিন্নমত রয়েছে। অন্য একটি সূত্রের বরাতে জানা যায়, পুকুরগুলো পাল শাসনামলে খনন করা হয়ে থাকতে পারে। পাল শাসক দেবপাল অথবা তাঁর পরের শাসক মহীপালের সময়ে কোনো এক রাজা এসব পুকুর খনন করেন।

ভালোবাসার ৩৬৫ পুকুর নিয়ে চকচান্দিরা গ্রামের নুরুল আমিনের (৪৭ বছর) সাথে আমাদের কথা হয়। চকচান্দিরার পাশের ধুরইল গ্রামে একটি রাজ বাড়ি ছিল বলে শুনেছেন। সেই রাজার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লে হেকিমের উপদেশে পুকুর খনন করা হয়। যা আগের তথ্যের সাথে সংগতিপুর্ন। নিজেদের জমি জমার কাগজ ঘাটতে গিয়ে বেশ কিছু অভিজ্ঞতা হয় নুরুল আমিনের। সিএস ম্যাপে অত্র অঞ্চলের বেশিরভাগ জমির মালিকানা বাহাদুর সিং এর নামে ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। ৩৬৫ পুকুর পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের সময়কার বলেও শুনেছেন নুরুল আমিন, এদের সাথে বৌদ্ধবিহারের নিবিড় সম্পর্ক ছিল। কোন এক এলাকায় একটি বড় বা মাঝারি মানের কলকারখানা গড়ে উঠলে সেটাকে কেন্দ্র করে অনেক ধরণের ছোট ছোট অর্থনৈতিক কর্মকান্ড গড়ে উঠে। অর্থনীতির ভাষায় যা ‘ব্যাক লিংকেজ’ বলে পরিচিত। সোমপুর মহাবিহারের আয়তন ও বিশাল কর্মপন্থার আশেপাশে এরকম আরও অনেক কিছু সংশ্লিষ্ট থাকতে পারে। তবে এ শুধু আমার অনুমান, তথ্য উপাত্তের অনুপস্থিতি সেটা সমর্থন করে না। 

দীর্ঘ ৬ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে পুকুরের অবস্থান। আমরা নুরুল আমিনকে সাথে নিয়ে আরও কিছু পুকুর দেখি। ভিন্ন ভিন্ন আয়তনের পুকুরগুলো বর্তমানে সরকারের মালিকানায় রয়েছে। বেশিরভাগ পুকুর স্থানীয়রা লিজ নিয়ে মাছ চাষ করছেন। পুকুরের পাড়ে, ফাঁকা জায়গায় গাছ লাগানো হয়েছে। পুকুরের জল, জলে মাছ, পুকুর পাড়ে সারি সারি গাছ, সব মিলিয়ে বেশ একটা নির্মল পরিবেশ। 

ভালোবাসার ৩৬৫ পুকুর ঐতিহাসিক ও প্রত্নতত্ত্বের দিক থেকে অনেক গুরুত্বপুর্ন। জয়পুরহাট-নওগাঁ সড়কের শুরুতে ভালোবাসার ৩৬৫ পুকুর সম্বলিত কোন সাইনবোর্ড বা অন্য কোন নির্দেশনা নাই। পুকুরের স্থানেও কোন তথ্য নাই। সাধারণ পুকুর হিসেবে অযত্নে অবহেলায় পড়ে আছে। কিছু পুকুরের মুখে জেলা প্রশাসনের সাইনবোর্ড জমির মালিকানা নিশ্চিত করলেও এর ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বকে একরকম অস্বীকার করা হয়েছে। যোগাযোগের ব্যবস্থার প্রতিও রয়েছে বেশ অবহেলা। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মনোযোগের অভাবে এরকম গুরুত্বপুর্ন স্থাপনায় তেমন কোন দর্শনার্থী নাই বললেই চলে। এসমস্ত উপসর্গ আমাদের গৌরবময় অতীত ইতিহাসের প্রতি অবহেলারও নিদর্শন। আমরা আশাকরি সংশ্লিষ্ট দপ্তরসমুহ এবিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।  

৩। 

সরকার ২০১১ সালে ৬৫২ একর আয়তনের (৪৩ একর পুকুরসহ) আলতাদীঘিকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা দেয়। বাংলাদেশ ভারত সীমান্ত ঘেঁষে আলতাদীঘির অবস্থান। এর হাতছোয়া দূরত্বে দক্ষিণ দিনাজপুর (ভারত) জেলার প্রধান শহর বালুরঘাট। কিংবদন্তি আছে রাজা বিশ্বনাথের রাজমাতা ছিলেন অত্যন্ত প্রজাবৎসল। প্রজাদের প্রতি উনার অগাধ ভালোবাসা। তাঁদের পানীয় জলের অভাব পূরণে ছেলেকে দীঘি খননের নির্দেশ দেন। রাজমাতার শর্ত, তিনি যতদূর হেটে যেতে পারবেন, ততদুর পর্যন্ত পুকুর কাটতে হবে। নির্দিস্ট দিনে রাজমাতা হাটা শুরু করেন, কিন্তু রাজমাতার থামার লক্ষণ নেই। অবশেষে রাজা রাজমাতার হাটার পথে আলতা ছিটিয়ে বলেন, রাজমাতার পা কেটে গেছে। আর হাটা ঠিক হবে না। এরপর রাজমাতা ক্ষান্ত দেন। রাজা সেই পর্যন্ত পুকুর কাটেন। রাজমাতার সম্মানার্থে পুকুরের নাম রাখা হয় আলতাদীঘি। ‘বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ’ গ্রন্থে আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া উল্লেখ করেন, ‘এক সময় আলতাদীঘি থেকে জগদ্দল বিহার পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার জুড়ে অসংখ্য জলাশয়ের অস্তিত্ব ছিল। বর্তমানে অবশ্য সেসব জলাশয়ের অস্তিত্ব নেই। এই দীঘির খনন কাল নিয়ে ভিন্নমত আছে। অন্য একটি মতে, এটি জগদ্দল মহাবিহারের সমসাময়িক অথবা পাল যুগ পুর্ববর্তী সময়ের।‘

         

ভালোবাসার ৩৬৫ পুকুর থেকে বের হয়ে একেবেকে চলা রাস্তা ধরে ধামইরহাট-জয়পুরহাট মহাসড়কে উঠি। মহাসড়ক থেকে নামার পরেই সড়কের দুপাশে গাছের সারি দেখতে পাই। বিশেষ করে শাল গাছের সংখ্যাই বেশি। এছাড়াও আছে আমলকী, হরিতকী, বহেরা,ইত্যাদি ইত্যাদি। এই উদ্যানে শিয়াল, মেছোবাঘ, বনবিড়াল থেকে শুরু করে অনেক প্রকার পশু রয়েছে। আছে অনেক জাতের পাখিও। মূল উদ্যানের ভিতর দিয়ে অনেকটা পথ পেরিয়ে মূল দীঘির পাড়ে চলে আসি। শীতের সকাল, খুব বেশি দর্শনার্থী নেই। আলতাদীঘির উঁচু পাড়ে দাঁড়িয়ে যাই। শীতের হিমেল হাওয়ার পরশ পাই। সেখানে দাঁড়িয়ে আলতাদীঘির কিংবদন্তি নিয়ে আলাপ হয়। আলতাদীঘির পাড়ে যুগ যুগান্তর আগে রাজা রাণীর পদাচরনায় চঞ্চল ছিল এর জল। সেই ইতিহাসকে অনুভব করতে হলে এর জলের গভীরে ডুব দিতে হবে। এই সময়টায় পুকুরে পানি কম, জলের উপর ছোটবড় প্ল্যাঙ্কটন ছটিয়ে ছড়িয়ে আছে। জলের উপর ভেসে থাকা অবশিষ্ট পদ্মগুলো আমাদের উঁকি দিয়ে দেখতে থাকে। 

এর আগে ২০২৪ সালে আলতাদীঘি সংস্কারের জন্য দুপাড়ের বেশ কিছু অংশ পর্যন্ত গাছ কেটে ফেলা হয়। এ নিয়ে বেশ সমালোচনা হয়েছিল। আমাদের ভিজিটের সময়ে নতুন করে রোপণ করা গাছ বড় হতে শুরু করেছে। তবে প্রাকৃতিক ভাবে বেড়ে উদ্যানের গাছপালার সাথে বৈসাদৃশ্য রয়ে গেছে। শুনেছিলাম, শীতকালে এই দীঘিতে অনেক অতিথি পাখির আগমন ঘটে। আমাদের চোখে তেমন কিছু পড়েনি অবশ্য। 

৪। 

নওগাঁ জেলায় অবস্থিত সবচেয়ে আলোচিত দীঘির নাম দিবর দীঘি। সাপাহার উপজেলার পত্নীতলা-সাপাহার মহাসড়কের উত্তরে; পত্নীতলা থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। প্রায় বর্গাকৃতির হলেও উত্তর-দক্ষিণে কিছুটা দীর্ঘ এই সুবিশাল জলাশয়ের প্রতিটি বাহু ছিল প্রায় ১ হাজার মিটার দীর্ঘ। বহু শতাব্দী আগে খননকৃত এই জলাশয়ের পাড়গুলো ধীরে ধীরে ধসে পড়ে উঁচু বাঁকড় বা বনভূমিতে পরিণত হয়েছে, যা শত শত একর জমিতে বিস্তৃত। ধীরে ধীরে এই বিশাল জলাশয়টি ক্ষুদ্রাকৃতিতে রূপ নিয়েছে। ফলে আধুনিক কালে (বিশেষ করে ১৯৭০-এর দশক থেকে) সরকারের অনুমতিক্রমে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের উদ্যোগে মাঝখানের জল নিষ্কাশন করে সেচের সুবিধার্থে একাংশ জলাশয় ভরাট করে খনন করা হয়। এই অতি প্রাচীন জলাশয়ের কেন্দ্রে একটি প্রাচীন শিলাস্তূপের অস্তিত্ব দেখা যায়। ১৮০৭–০৮ খ্রিস্টাব্দে স্যার ফ্রান্সিস বুকানন এই স্থান পরিদর্শন করে স্তূপটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩০.৭৫ ফুট বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, স্তূপটি গ্রানাইট পাথরে নির্মিত। পরবর্তীতে স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম ১৮৭৯ সালে স্তূপটি পরিদর্শন করে জানান, পানির ওপর স্তূপটি প্রায় ৩.০৩ মিটার (১০ ফুট) উঁচু ছিল এবং পানির নিচে জলাশয়ের তলদেশ পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৩.৬৬ মিটার (১২ ফুট)। মাটির নিচে স্তূপটি ২.৪৪ থেকে ৩.০৩ মিটার (৮ থেকে ১০ ফুট) পর্যন্ত প্রোথিত ছিল। সব মিলিয়ে স্তূপটির মোট উচ্চতা ছিল প্রায় ৯.০৯ মিটার (৩০ ফুট)। কানিংহামের বর্ণনাতেও এটি গ্রানাইট পাথরের তৈরি বলে উল্লেখ আছে।

নয় কোণ বিশিষ্ট স্তম্ভটির শীর্ষদেশ পরপর তিনটি বৃত্তাকার স্ফীত বলয় সহ রাজ মুকুটের ন্যায় বিশেষ অলঙ্কৃত। বুকানন দৈর্ঘ্য ১০.৩৩ মিটার বলে উল্লেখ করলেও কানিংহাম এর মতে সেটি ৯.১৪ মিটার। স্তম্ভটির প্রতিটি কোণের পারস্পরিক দূরত্ব প্রায় ৪ মিটার। আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া স্তম্ভটিকে মিশরের স্ফিংস এর সাথে তুলনা করেছেন। স্ফিংসের ন্যায় এই স্তম্ভও একটি পাথরখন্ড কেটে তৈরি করা হয়, যা অনেক দূর থেকে আনা হয়েছিলো। কয়েক শত বছর পেরিয়ে গেলেও স্তম্ভটি একটুও কাত হয়নি এবং এখনও জলাশয়ের মাঝখানে বরাবরের মতো স্থির অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। যদি এর তলদেশে ধাপে ধাপে ভিত্তি নির্মাণ না করা হতো এবং তা সোজাভাবে স্থাপন করা না থাকত, তবে এতদিনে এটি নিশ্চয়ই হেলে পড়ত—বিশেষ করে জলাশয়ের নরম মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকার কারণে।

স্থানীয় জনমত ও কিংবদন্তি অনুযায়ী কৈবর্ত রাজা দিব্য বা দিব্যক পাল রাজা দ্বিতীয় মহীপালকে পরাজিত করে পাল সিংহাসন অধিকারের পর সম্ভবত দিব্যকের বিজয়ের স্মৃতি হিসেবে এ স্তম্ভটি নির্মাণ করেন। এই মত অনুসারে স্তম্ভটি দিব্যক অথবা তাঁর উত্তরাধিকারী রুদক কিংবা ভীম কর্তৃক এগারো শতকের শেষার্ধে নির্মিত হয়েছিল। পার্শ্ববর্তী গ্রামের নাম ‘দিবর’ সম্ভবত ‘দিব্য’ বা ‘দিব্যক’ নামের অপভ্রংশ হতে উদ্ভূত হয়েছে। যদিও এই মতবাদের বিপক্ষেও অনেক ভিন্ন আলাপ আছে।  দ্বিতীয়ত, স্তম্ভটি একটি অখণ্ড গ্রানাইট পাথরে নির্মিত। গ্রানাইট পাথরের প্রাপ্তিস্থান সাধারণত মধ্য ও দক্ষিণ ভারতে। পাল, চন্দ্র, সেন বা কৈবর্তদের রাজ্যসীমা কোনো দিনই মধ্য বা দক্ষিণ ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল না। পাথরের ক্ষেত্রে রাজমহলের কালো পাথর বা বেলেপাথর ছিল এসব রাজবংশের একমাত্র ভরসা। 

এ কারণে এসব রাজবংশের প্রস্তরকর্মের প্রায় সবই এই দুই স্থানের পাথরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এছাড়াও, গ্রানাইট পাথরটির তলদেশসহ এর যে পরিচয় পাওয়া যায়, তাতে মনে হয় যে বর্তমান অবস্থায় এর ওজন হবে বেশ কক টন। আদি ও অক্ষত অবস্থায় এর ওজন যে আরও বহু গুণ বেশি ছিল, তা বলাই বাহুল্য। মধ্য বা দক্ষিণ ভারত থেকে এত বড় ও এত ভারী পাথর কৈবর্ত বংশীয় একজন ক্ষুদ্র নৃপতির পক্ষে এ দেশে আনা আদৌ সম্ভাব্য ঘটনা বলে ধারণা করা যায় না। কৈবর্ত বংশীয় নৃপতিটা কেন, প্রবল প্রতাপশালী পালবংশীয় নৃপতিরাও তাঁদের প্রস্তরকর্ম কালো পাথর বা বেলেপাথর দিয়েই তৈরি করেছিলেন বলে দেখা যায়। দৃষ্টান্তস্বরূপ মঙ্গলবাড়ী, গরুড় স্তম্ভ অথবা পাহাড়পুর বিহারের প্রস্তরকর্মের উল্লেখ করা যেতে পারে। আরও উল্লেখ্য, আলোচ্য দিবরদীঘির স্তম্ভ কৈবর্ত রাজবংশের জন্য এমন কোনো বিশেষ স্থান ছিল না যে এখানে একটি সুবিশাল জলাশয় খনন ও এত বড় একটি স্তম্ভ প্রতিষ্ঠার কোনো কারণ ছিল। এটিকে তৃতীয় পাল নৃপতি দেব পাল-এর কীর্তি বলে ধরে নেওয়ার পেছনে কোনো কারণ দেখা যায় না। এতে বিরাট এক দীঘি খনন ও দীঘির মধ্যে স্তম্ভ প্রতিষ্ঠা যে কোনো বিশেষ বিজয়কে চিরস্মরণীয় করার জন্য সৃষ্টি হয়েছিল, তা অতি সহজেই অনুমেয়। কিন্তু এ স্থানে বা ধারেকাছে এমন কোনো উল্লেখযোগ্য স্থান দেখা যায় না যে যার জন্য দেব পাল কর্তৃক এত বড় একটি কীর্তি একটি জনশূন্য মাঠের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আর এই বিজয়স্তম্ভ কোন বিজয়ের উপলক্ষে এখানে স্থাপিত হয়েছিল এবং দেব পাল কোথা থেকে এত বিশাল গ্রানাইট পাথর এনেছিলেন, সে প্রশ্ন খুবই যুক্তিসংগত।

নওগাঁ জেলার ধামুইরহাট উপজেলার চক চান্দিরা গ্রামে অবস্থিত ৩৬৫ পুকুরের একটি পুকুরে 

এই স্তূপ ঘিরে মহাভারতের কাহিনিনির্ভর যে গল্প প্রচলিত আছে, তা ঐতিহাসিক আলোচনার উপযোগী নয়। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী এটি দেবরাজ ইন্দ্রের ধ্বজ বা পতাকা, তাঁর অস্ত্র বজ্র অথবা অর্জুনের তীরের স্মারক হিসেবে কল্পনা করা হয়। তবে দ্বিতীয় মহাভারতের কাহিনিতে দিবরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে রাজ্যের অর্ধাংশ আণম দানবের হাতে তুলে দিয়ে তাকে সিংহাসনে বসানো হয়। পরে দিবরের ভ্রাতা রোদক ও রোদকের পুত্র ভীম সিংহাসনে আরোহণ করেন। ভীম রামপালকে যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত করে পিতৃসিংহাসন পুনরুদ্ধার করেন। এই ঘটনার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে তৎকালীন কোনো এক সময়ে জলাশয় খনন করে সেখানে বিজয়স্তম্ভরূপে এই স্তূপটি স্থাপন করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

 দীঘি শুধু জলের আধার নয়, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের সভ্যতা বিকাশের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। খরা মৌসুমে পানীয় জলের অভাবে গ্রামের পর গ্রাম জনশূন্য হয়ে যেত। এর বিপরীতে একটি দীঘি, দীঘির জল বাঁচিয়ে দিয়েছে গোটা অঞ্চলকে। সাধারণ ও দরিদ্র জনগণের পক্ষে দীঘি খনন করাও সম্ভব ছিলোনা। সেই সময়ের শাসকদের মধ্যে যারা জনদরদি ছিলেন তাঁরা দীঘি খনন করেছেন। সেই অর্থে ঐ সকল দীঘির ঐতিহাসিক মূল্য অনেক। কালের বিবর্তনে সেই সময়ও নেই, শাসকরাও নেই। একদিন আমাদেরও কোন চিহ্ন থাকবে না। আমাদের উচিৎ পুর্বের ইতিহাসকে আগামী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা। তাঁরা আবার তাঁদের পরের প্রজন্মের জন্য সেসব পদ চিহ্ন রেখে যাবে। এভাবেই যুগ যুগান্তর ধরে সভ্যতা গড়ে উঠেছে, সমাজের কাঠামো টিকে আছে। ভালোবাসার ৩৬৫ পুকুর,আলতাদীঘি জাতীয় উদ্যান কিংবা দিবর দীঘি ঐতিহাসিক দীঘি। এরকম অসংখ্য স্থাপনার মাঝে লুকিয়ে আছে আমাদের ইতিহাস,আমাদের পুর্ব পুরুষের ছাপ কিংবা পদক্ষেপ। সেসবের সংরক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব। এর মাঝে আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য টিকে থাকবে।  

সহায়ক গ্রন্থ/সূত্রঃ 

১। naogaon.gov.bd

২। বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ, আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া

৩। www.prothomalo.com/bangladesh/d8fm0f11w4

৪। বিশ্ব ঐতিহ্যে সোনালী নওগাঁ, জেলা প্রশাসন, নওগাঁ 

৫। ব্যক্তিগত সাক্ষাতকার  

Comments

    Please login to post comment. Login