০১ ভিড়ের ভেতর একা
রাত ৪:১৫। রুশার ঘুম ভেঙে গেল, সে জেগে উঠল। এত ভোরে পাখিরাও কেবল তাদের নিজেদের মধ্যে একটু আধটু কথা বলা শুরু করছে। হয়ত তারাও পরিকল্পনা করছে আজকের নতুন ভোরটা তারা কীভাবে উদযাপন করবে। ফিসফিসিয়ে একে অপরের খোঁজ নিচ্ছে। রুশার এই মুহুর্তটা খুব পছন্দের।সে বিছানা ছেড়ে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবল। কিছুক্ষণের মধ্যেই পাখিদের ফিসফিসিয়ে আওয়াজ টা অনেকটা জমজমাট গল্পের মত রূপ নিল। একট নতুন শিহরণ জাগলো রুশার মনে।আজ তো নববর্ষ। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের প্রথম ভোর। মনে মনে সাজতে লাগল রুশা। একটু পরেই জানালার ফাঁক দিয়ে যখন এবছরের প্রথম মিষ্টি নরম রোদ এসে মুখ ছুঁয়ে গেল, তার মনে হলো—আজ মনেহয় একটু অন্যরকম দিন কাটাবে সে, শহরের ব্যস্ততা-কোলাহল একটু থেমে থাকবে, আজ মানুষ একটু নিজের মতো করে হাসবে, নিজের ভেতর উঁকি দেয়া নতুন নতুন স্বপ্ন নিয়ে দিনের কাজ শুরু করবে। আর নিজের ভেতরের মানুষটাকে নতুন করে চিনতে পারবে।
কিন্তু বাসা থেকে বের হতেই সব ধারণা একসাথে উল্টে গেল।
রাস্তায় নামতেই মনে হলো—শহরটা আজ হাঁটছে না, দৌড়াচ্ছে।
ঢাকের শব্দ যেন বাতাসের গায়ে আছড়ে পড়ছে, রঙ যেন মানুষের মুখে নয়—হাওয়াতেই ছড়িয়ে আছে, আর মানুষের ভিড় যেন একটা অস্থির নদী, যেটা নিজেই জানে না সে কোথায় যাচ্ছে।
রিকশাওয়ালা পাশ দিয়ে যেতে যেতে চেঁচিয়ে উঠল—
—“আপা,কই যাবেন? ভার্সিটির বৈশাখ মেলায়?”
রুশা মাথা নাড়ল।
কিন্তু রিকশার পেছনে বসা ছোট ছেলেটা তাকে দেখে হাত নাড়িয়ে হাসল—চোখে মুখে শুধু রঙ আর রঙ, চেহারায় এক অন্য রকম উচ্ছ্বাস, যেন পৃথিবীটা তার জন্যই সাজানো।
রুশা হালকা হাসল ঠিকই… কিন্তু সেই হাসিটা মুখে ভেতরই থাকল, ঠোঁট গড়িয়ে বাইরে অতটাও বের হল না।
চারপাশে শুধু মানুষের স্রোত, তারা শুধু হাঁটছে না,কেউ কেউ ঢোল তবলা বাজাতে বাজাতে জোর কদমে এগুচ্ছে, কেউ বাউল সেজে নৃত্য করছে,কেউ গলা ফাটিয়ে গান গাইছে, কেউ মঞ্চ কাপিয়ে তুলছে, কেউ ছবি তুলছে এমনভাবে, যেন প্রতিটা মুহূর্ত প্রমাণ করতে হবে সে আনন্দে আছে।
—“এই, আরেকটু হাসো! না না, ওই পোজটা দাও!”
—“ক্লিক! আবার ক্লিক!”
একটা মেয়ে আয়নার মতো ফোনের স্ক্রিনে নিজের হাসি ঠিক করছে।
তার পাশে থাকা ছেলেটা বিরক্ত হয়ে বলল—
—“তুমি তো পুরো ফটোশুটে ঢুকে গেছো!”
মেয়েটা হেসে বলল—
—“আজকের দিনটাই তো এর জন্য!”
রুশা পাশ দিয়ে যেতে যেতে অজান্তেই ঠোঁট বাঁকাল—
মনে মনে বলল,
“তাহলে আনন্দটা কে করছে… মানুষ, নাকি ক্যামেরা?”
ঢাকের শব্দ হঠাৎ খুব কাছে চলে এলো।
বুকের ভেতরটা একবার কেঁপে উঠল তার।
একদল মানুষ গোল হয়ে নাচছে, কেউ হাত তুলে চিৎকার করছে, কেউ আবার এমনভাবে হাসছে, যেন এই হাসির মধ্যেই জীবনের সব উত্তর লুকিয়ে আছে।
রুশা দাঁড়িয়ে পড়ল।
তার মনে হলো—সে যেন একটা দেয়ালের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ, যে ভেতরের দৃশ্য দেখছে, কিন্তু ঢুকতে পারছে না।
সে নিজেকে প্রশ্ন করল—
“আমি কি এই আনন্দের অংশ, নাকি আমি শুধু পথচারী?”
এই প্রশ্নটা হঠাৎ খুব অচেনা লাগল তাকে নিজের কাছেই।
হঠাৎ পাশের ভিড় একটু ফাঁকা হতে, রুশা দেখল—একটা ছোট মেয়ে মাটিতে বসে কাঁদছে।
হাতে একটা লাল বেলুনের সুতো, কিন্তু বেলুনটা উড়ে গেছে আকাশে।
মা তাকে টেনে তুলছে—
—“আরে পাগলি, কাঁদিস না! আরেকটা কিনে দেব!”
মেয়েটা কান্নার মধ্যে বলছে—
—“আমি ওইটাই নেব…”
এই ছোট্ট দৃশ্যটা রুশার বুকের ভেতর কোথায় যেন কেটে গেল।
সে বুঝতে পারল—এই উৎসবের ভেতর হাসি যেমন সত্যি, কান্নাও তেমনি সত্যি।
শুধু কারো চোখে হাসিটা বেশি দেখা যায়, আর কান্নাটা হারিয়ে যায় ভিড়ের শব্দে।
রুশা ধীরে ধীরে রাস্তার এক পাশে সরে গেল।
একটা গাছের নিচে দাঁড়াল।
এখান থেকে ভিড় দেখা যায়, কিন্তু ভিড়ে ঢুকতে হয় না।
তার কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটা একটু ভারী লাগছিল, আর ব্যাগের ভেতরে থাকা বাংলা কবিতার বইটা যেন তাকে টেনে ধরছিল।
সে বইটা বের করল না, শুধু ছুঁয়ে রইল।
তার ভেতরে আবার সেই পুরোনো প্রশ্নটা ফিরে এলো—
“আমি কি রঙ ভালোবাসি না?
নাকি আমি শুধু এইভাবে রঙকে নিতে পারি না?”
এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো—
সমস্যা রঙ না,
সমস্যা তার ভেতরের শান্তি আর বাইরের কোলাহলের ব্যবধান।
দূরে ঢাক বাজছে, মানুষ হাসছে, আকাশে রঙ উড়ছে—
আর রুশা দাঁড়িয়ে আছে একেবারে মাঝখানে,
একটু হারানো, একটু সচেতন, আর পুরোপুরি নিজের মধ্যে ফিরে যাওয়ার পথে।
আজকের বৈশাখ এখনো শেষ হয়নি।
কিন্তু তার ভেতরের বৈশাখ… এখনো শুরুই হয়নি।
০২ ভিড়ের বাইরে একটুখানি শ্বাস
গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে রুশা প্রথমে কিছুক্ষণ শুধু চারপাশ দেখল।
এখান থেকে ভিড়টা আর আগের মতো আঘাত করে না—বরং মনে হয় দূরের কোনো নদীর শব্দ, যেটা কাছে থাকলেও ছুঁয়ে ফেলতে পারে না।
কিন্তু তার ভেতরের অস্থিরতা তখনো পুরোপুরি থামেনি।
সে ব্যাগটা একটু শক্ত করে ধরল।
মনে হলো, যেন ব্যাগের ভেতরের বইটাই তাকে ভিড় থেকে আলাদা করে রাখছে।
হঠাৎ সে লক্ষ্য করল—একটা লোক তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে, বয়স চল্লিশের মতো। হাতে একটা ছোট পানির বোতল, কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ। চোখেমুখে কোনো তাড়াহুড়ো নেই।
লোকটা হালকা স্বরে বলল—
—“এখানে এসে দাঁড়ালে একটু শান্ত লাগে… না?”
রুশা একটু চমকে তাকাল। তারপর মাথা নাড়িয়ে বলল—
—“শান্ত… আবার কেমন অস্বস্তিও লাগে।”
লোকটা হালকা হেসে বলল—
—“হয়। দুটো একসাথেও লাগে। তো, তুমি কি প্রথমবার এমন ভিড় দেখছো?”
রুশা একটু থেমে বলল—
—“না… কিন্তু আজকে মনে হচ্ছে আমি ভিড়ের অংশ না।”
লোকটা দূরের দিকে তাকিয়ে বলল—
—“ভিড় কখনো কাউকে জোর করে নিজের বানায় না। মানুষ নিজেই কোথায় দাঁড়াবে সেটা ঠিক করে।”
এই কথাটা রুশার মাথায় সরাসরি কোনো উত্তর দিল না, কিন্তু একটা জায়গা নরম করে দিল।
ঠিক তখনই পাশের রাস্তা থেকে একটা হঠাৎ হাসির শব্দ ভেসে এলো।
একজন বিক্রেতা চিৎকার করছে—
—“এইটা নেন! বৈশাখী স্পেশাল!”
এর মাঝেই তার সামনে ভিড় জমে গেছে। কেউ কিনছে, কেউ দরদাম করছে, কেউ হাসছে।
একজন ক্রেতা বলল—
—“ভাই, দাম একটু বেশি না?”
বিক্রেতা হাসতে হাসতে বলল—
—“বৈশাখে তো ভাই, আনন্দের দাম একটু বেশি হয়!”
চারপাশে হাসির ঢেউ উঠল।
রুশা নিজেও অজান্তে হেসে ফেলল।
কিন্তু পরক্ষণেই থেমে গেল।
সে বুঝতে পারল—এখানে আনন্দ আছে, কিন্তু সেটা একরকম শব্দে ভরা আনন্দ।
সে একটা গাছের গায়ে হেলান দিল।
হঠাৎ তার মনে পড়ল—ছোটবেলায় সে যখন নতুন বই পেত, তখন সেই গন্ধটাই ছিল তার জন্য উৎসব।
কেউ দেখছে কি না, সেটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।
সে চোখ বন্ধ করল।
মনে মনে বলল—
“তাহলে এখন কেন সবকিছু এত দেখানোর মতো লাগে?”
তার ভেতর থেকে আরেকটা প্রশ্ন উঠল—
“আমি কি বদলে গেছি, নাকি চারপাশটাই বদলে গেছে?”
কিন্তু এবার সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর খুঁজল না।
বরং প্রথমবারের মতো সে প্রশ্নটাকে থাকতে দিল।
হঠাৎ পাশ থেকে একটা ছোট ছেলে এসে তার সামনে দাঁড়াল।
হাতে একটা কাগজের তৈরি রঙিন মুখোশ।
ছেলেটা বলল—
—“আপু, নেবেন নাকি? ফ্রি দিচ্ছি,, শুধু,, বৈশাখের জন্য.. ”
রুশা একটু থমকে গেল।
ছেলেটার মুখে এত সহজ আনন্দ, যেন পৃথিবীর কোনো জটিলতা নেই।
রুশা মাথা নাড়িয়ে হাসল—
—“না, থাক।”
ছেলেটা কাঁধ ঝাঁকিয়ে চলে গেল, কিন্তু যাওয়ার আগে বলল—
—“আজকে সবাই তো খুশি, আপু!”
এই কথাটা রুশার ভেতরে অদ্ভুতভাবে থেকে গেল।
রুশা এবার চারপাশটা আবার দেখল।
ভিড় এখন আর ভয় দেখাচ্ছে না।
আবার সুন্দরও লাগছে না।
এটা শুধু… অনেক মানুষের একসাথে থাকা একটা দিন।
তার মনে হলো—
সমস্যা হয়তো উৎসব না,
সমস্যা হয়তো তার নিজের “চাওয়ার ধরন”।
সে রঙ চাইছে—শব্দ ছাড়া।
সে আনন্দ চাইছে—চাপ ছাড়া।
সে মানুষের সাথে থাকতে চায়—
কিন্তু নিজেকে হারিয়ে নয়।
রুশা ধীরে ধীরে গাছ থেকে সরে দাঁড়াল।
তার হাঁটায় এবার তাড়াহুড়ো নেই।
নেই পালিয়ে যাওয়ার তাড়না, আবার ভিড়ে মিশে যাওয়ার চাপও নেই।
সে শুধু হাঁটছে।
এবং প্রথমবারের মতো তার মনে হলো—
আজকের দিনটা তাকে কিছু হারাতে বাধ্য করছে না, বরং কিছু বুঝতে শিখাচ্ছে।
দূরে ঢাকের শব্দ এখনো বাজছে।
কিন্তু এবার সেটা তার ভেতরে আঘাত করছে না।
বরং… একটা দূর সুরের মতো থেকে যাচ্ছে।
রুশা মনে মনে বলল—
“আমি এখনো জানি না আমি কোথায় দাঁড়াবো…
কিন্তু অন্তত আমি এখন বুঝতে পারছি—আমি হারিয়ে যাইনি।”
০৩ নিজের মতো করে উৎসব
বিকেলটা যখন শহরের গায়ে ধীরে ধীরে নেমে আসছিল, তখন বৈশাখের উচ্ছ্বাস আর আগের মতো তীক্ষ্ণ নেই। সকালবেলার যে শব্দগুলোকে মনে হচ্ছিল একটা অস্থির ঝড়, সেগুলো এখন ক্লান্ত হয়ে পড়েছে; ঢাকের আওয়াজ দূর থেকে ভেসে আসে, মাঝে মাঝে হারিয়ে যায়, আবার ফিরে আসে—যেন নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না আজকের দিনটা শেষ করা উচিত কি না।
রুশা হাঁটছিল।
কোনো পরিকল্পনা ছিল না তার। কোথাও পৌঁছানোর তাড়াও ছিল না। তবুও আশ্চর্যভাবে তার মনে হচ্ছিল না যে সে পথ হারিয়েছে। বরং মনে হচ্ছিল, আজ প্রথমবার সে হাঁটছে নিজের ভেতরের অনুমতিতে—কারো চাপ, কারো ভিড়, কারো চোখের প্রত্যাশা ছাড়া।
হাতে ধরা ব্যাগটা হালকা দুলছিল। তার ভেতরে থাকা কবিতার বইটা যেন এখন আর ভারী নয়, বরং একটা পরিচিত উপস্থিতি—যেটা তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে, সে কোথা থেকে এসেছে, আর কীভাবে ভাবতে শিখেছে।
হঠাৎ ফোনে একটা নোটিফিকেশন এল।
একটা ছবি এসেছে।
ছবিটা দেখেই সে চমকে গেল।
চায়ের দোকানে তোলা সেই ছবিটা—জানালার পাশে বসে আছে সে, বাইরে ভিড়ের অচেনা ঢেউ, আর ভেতরে খুব সামান্য কিন্তু স্পষ্ট এক ধরনের প্রশান্তি। ছবিটা তুলেছিল সেই ক্যামেরা হাতে থাকা মেয়েটা।
ক্যাপশনটা পড়তেই রুশার ভেতরে একটা অদ্ভুত টান অনুভব হলো—
“ভিড়ের মাঝেও নিজের মতো থাকা মানুষগুলোই সবচেয়ে সুন্দর।”
সে কিছুক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। মুখে কোনো বড় প্রতিক্রিয়া নেই, কিন্তু চোখের ভেতরে যেন একটা পুরোনো গিঁট একটু আলগা হলো।
তারপর সে ফোনটা বন্ধ করে দিল।
কিন্তু ছবিটা তার ভেতরে থেকে গেল—শব্দ হিসেবে নয়, অনুভূতি হিসেবে।
রুশা এবার আর ভিড়ের মূল স্রোতের দিকে গেল না। তার পা নিজের মতো করেই এক পাশে সরে গেল, যেন ভেতরের কোনো অদৃশ্য সিদ্ধান্ত তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সে পৌঁছে গেল একটা ছোট পার্কে।
এখানে উৎসবের সেই তীব্রতা নেই। বড় কোনো মঞ্চ নেই, আলো-ঝলকানি নেই, চিৎকার নেই। শুধু কয়েকটা গাছ, কিছু ক্লান্ত মানুষ, আর দূরের শহরের অস্পষ্ট শব্দ—যা আর মনকে আঘাত করে না, শুধু উপস্থিতি জানান দেয়।
সে একটা বেঞ্চে গিয়ে বসল।
প্রথমে শুধু বসে রইল। কিছু ভাবল না, কিছু বিশ্লেষণ করল না। চোখের সামনে থাকা গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল, যেন বহুদিন পর সে কোনো কিছু না বোঝার অধিকার পেয়েছে।
তার মনে ধীরে ধীরে এক ধরনের স্পষ্টতা তৈরি হতে লাগল।
সে বুঝতে পারল, সকাল থেকে তার সমস্যা উৎসব ছিল না। সমস্যা ছিল—সে একটি নির্দিষ্ট ধরনের আনন্দকে বাধ্যতামূলক মনে করছিল, আর সেই কাঠামোর সাথে নিজের ভেতরের অনুভূতি মিলিয়ে নিতে গিয়ে বারবার ভেঙে পড়ছিল।
কিন্তু এখন আর সেই চাপ নেই।
সে রঙ ভালোবাসে—কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে রঙ তাকে অস্থির করবে।
সে উৎসব ভালোবাসে—কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে উৎসব তাকে হারিয়ে দেবে।
সে ভাষাকে ভালোবাসে—আর সেই ভাষাই তাকে নিজের ভেতরের সত্যটা বোঝার শক্তি দেয়।
সূর্যটা তখন একটু নেমে এসেছে। আকাশের কমলা আলো গাছের পাতায় ছড়িয়ে পড়ছে, খুব ধীরে, খুব স্বাভাবিকভাবে—কোনো জোরজবরদস্তি ছাড়াই।
রুশা উঠে দাঁড়াল।
একবার চারপাশে তাকাল।
কোথাও আর কোনো অস্বস্তি নেই, কিন্তু অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসও নেই। শুধু একটা বাস্তব পৃথিবী, যেটা আগেও ছিল, এখনো আছে, আর থাকবে।
তার ভেতরে এবার কোনো যুদ্ধ নেই। কোনো প্রশ্নের চাপ নেই। বরং আছে একটা সহজ উপলব্ধি—সব জায়গা তার জন্য না হলেও, সবকিছুকে অস্বীকার করাও জরুরি না।
সে ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল।
এই হাঁটায় কোনো ঘোষণা নেই, কোনো সমাপ্তি নেই, কোনো বিজয় নেই। শুধু একটা স্বাভাবিক গতি—যেটা বলে দিচ্ছে, সে এখন আর নিজেকে হারাচ্ছে না।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে, রুশা বুঝতে পারল—
বৈশাখ তাকে পাল্টে দেয়নি।
সে শুধু শিখেছে—
ভিড়ের মাঝেও নিজের ভেতরের জায়গাটা ধরে রাখা যায়।
শব্দের মধ্যেও নিজের নীরবতা বাঁচিয়ে রাখা যায়।
আর উৎসবের ভেতর থেকেও—
নিজের মতো করে থাকা যায়।