আবিদ জহির একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। এখন তারও চেয়ে আরও অধিক একটি নিম্ন মধ্যবিত্ত সংসারের অধিকর্তা। পিতৃপ্রদত্ত নাম মোহাম্মদ জহির উদ্দিন। ডাকনাম আবিদ। তার থেকেও বড় পরিচয় সে একজন কবি। স্বপ্নভূক কবি। কবিতার বাজারে নিজের ভাগ্যের চাকা ঘোরানোর জন্য আকিকা ছাড়াই তার নাম হয়ে যায় আবিদ জহির। এ ধরণের নাম নাকি আজকাল সাহিত্যের সাথে খুব যায়। অবশ্য আবিদ জহির খুব একটা পার্থক্য খুঁজে পায় না। মোহাম্মদ জহির উদ্দিন আবিদ ও যেখানে ছিল আবিদ জহিরও সেখানেই আছে। শুধু নামটা লিখতে জায়গা কম লাগে। কালিও একটু কম খরচ হয়।
সাধারণত মধ্যবিত্ত পরিবারে যা হয় আর কী। বাবা মা তাদের সব ব্যর্থতা ভুলতে চান সন্তানের সফলতা দেখে। আবিদ জহিরের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয় নি। বাবা মা স্বপ্ন দেখতেন তাদের তিন ছেলে বড় হবে। বড় হয়ে তাদের মুখ উজ্জ্বল করবে। ছেলেদের মতামতের তোয়াক্কা না করে তারা নিজেরাই ঠিক করে ফেললেন- একজন ডাক্তার, একজন ইঞ্জিনিয়ার আর একজন আমলা হবে। বড় দুই ভাই বাবা মায়ের স্বপ্ন সত্যি করে ঠিকই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হয়েছেন। কিন্তু আবিদ জহির আমলা হওয়ার মামলায় জড়ায়নি। বরং সে পুরো উল্টো পথেই হাঁটা শুরু করেছে।
কৈশোরেই তার মাথায় কবিতার ভূত চাপে। বড় কবি হওয়ার স্বপ্নে সে বিভোর হয়ে যায়। কলম থেকে দুই পংক্তি বের হতেই তাকে আর পায় কে। তখন সে আর রবীন্দ্রনাথ একই গোত্রের লোক। কই রবীন্দ্রনাথ তো স্কুলে যান নি। কিন্তু তার কবিতার লাইন না জানলেতো বিসিএস হয় না। আর আমলাও হওয়া যায় না। তার মানে আমলার থেকে কবি বড়। আর রবীন্দ্রনাথ, নজরুল যেহেতু স্কুলে যাননি অতএব সেও যদি ওদিকটায় না যায় তাতে দেশের খুব একটা ক্ষতি হবে না। বরং বাংলা সাহিত্যের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ যদি ব্যারিস্টারি পড়ে ব্যারিস্টার হতেন তবে এখনও হয়তো বাংলা সাহিত্যে নোবেল প্রাইজটা অধরাই থেকে যেতো। তাই সে পড়াশুনা থেকে এক ধরণের ইস্তফা দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু বাবার শাসন আর মায়ের অনুরোধে সে শেষমেশ ডিগ্রি পরীক্ষার দরজা পর্যন্ত যেতে পেরেছে। ডিগ্রি ফাইনাল পরীক্ষার সময়েই ঘটলো চূড়ান্ত ঘটনা কিংবা দুর্ঘটনা।
কলেজের দেয়ালে আঁকা ম্যুরালে হঠাৎই তার চোখ আটকে যায়। দেখে কবি সুকান্তের গালে হাত দেয়া বিখ্যাত সেই ছবি। দেখেই তার ভাবনা আসে। ভাবে পড়াশুনার পেছনে অযথা এতটা সময় নষ্ট না করলে সে নিশ্চয়ই এতদিনে সুকান্তের কাছাকাছি মাপের একজন কবি হতে পারতো। ভাবনা আসতেই সে আর দ্বিধা করে না। পরীক্ষার হলে না ঢুকে ইউটার্ন নিয়ে সোজা গিয়ে সে কবিতার ক্লাসে ঢুকে পড়ে। কবিতার লাইনের প্রিয় বড় ভাই মামুন হাসানের ঢেঁড়ায় গিয়ে হাজির হয়। হাজির মানে তো হাজির, সোজা পায়ের উপরে পড়ে- বস্, আমি চইল্যা আইছি। এক্কেবারে চইল্যা আইছি। এতদিনে বুঝছি আমারে দিয়া কবিতা ছাড়া আর কিছু অইবো না। বস্, আপনিই আমার শেষ আশ্রয়।
মামুন হাসানের কবি মন অল্পতেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে তিনি আবিদকে বুকে জড়িয়ে ধরেন- আরে পাগল তোদের জন্যই তো আমি আছি। আমি জানতাম তোকে এ পথে আসতেই হবে। এখন সাধনা করা। একান্ত সাধনা। তোকে দিয়ে হবে। কবিতা হবে। বাংলা কবিতা তোর হাতে নতুন বাঁক নিবে। তুই কোমর বেঁধে নেমে পড়।
সেই থেকে তার নেমে পড়া শুরু-কবি মামুন হাসানের অনিয়মিতভাবে প্রকাশিত মাসিক পত্রিকার বিভাগীয় সম্পাদক হিসেবে। পাশাপাশি চলছে তার কবিতা লেখা। সে এক তুমুল সময়। কবিতা নিয়ে তুখোড় তুখোড় সব ভাবনা সারাক্ষণ মাথায় কিলবিল করে। তবু কিছুতেই যেন কিছু হয় না। মামুন হাসানের অনিয়মিতভাবে প্রকাশিত মাসিক পত্রিকা ছাড়া তার কবিতার অন্য কোথাও কোনো জায়গা হয় না। এরপর মামুন হাসানের পরামর্শেই সে তার পিতৃপ্রদত্ত নামটি কেটেকুটে ছোট করে। মোহাম্মদ জহির উদ্দিন আবিদ হয়ে যায় আবিদ জহির। এটাতে অবশ্য বেশ কাজ হয়। একই কবিতা নতুন নামে দ্রæত ছাপা হয় জাতীয় সব পত্রিকায়। সেই আনন্দে সে আরও বুদ হয়ে যায়। সময় চলে যায় তার আপন নিয়মে। আবিদ জহির এখন মামুন হাসানের সেই অনিয়মিত মাসিক পত্রিকারই নিয়মিত সম্পাদক।
মামুন হাসানও নেই। আবিদ জহিরের বাবা মাও নেই। ভাইয়েরা সবাই ইউকে, ইউএসএ তে সেটেলড। আবিদ জহিরও বিয়ে করে থিতু হয়েছে। বাচ্চা আছে দ’ুটো। কবি হিসেবে দিনে দিনে তার নাম খ্যাতি যতই বৃদ্ধি পাচ্ছে অর্থনৈতিকভাবে তার অবস্থা ততই সংগীন হচ্ছে। কবিতা লেখাকে এখন মাঝে মাঝে তার কাছে গরীবের ঘোড়ারোগ বলে মনে হয়। বাইরে যতই ভালো থাকুক ঘরে ফিরলেই বউ এর ঘ্যানঘ্যানানি তার অস্বস্তিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এটা নেই সেটা নেই, এই আনতে হবে সেই আনতে হবে, ইত্যাদি, ইত্যাদি। আর লিখতে বসতে দেখলেতো কথাই নেই। একদম তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে- কী হবে ওসব ছাইপাশ লিখে! ওতে কি চাল জোটে না কাপড় জোটে! ওর থেকে পত্রিকায় ফিচার লিখো। তাতে করে কিছু পয়সা পাবে। তা দিয়ে ছেলে মেয়ের জন্য প্রাইভেট টিচার রাখতে পারবো।
বউ এর যন্ত্রনায় এখন সে ঘরে বসে লেখা বন্ধ করে দিয়েছে। বেশিরভাগ লেখালেখি সে বাইরে বসেই করে। অথচ তার আর বিউটির মানে তার বউ এর শুরুটা হয়েছিল কবিতা থেকেই। তার কবিতা বিউটির ভালো লাগতো। আর সেই কবিতা পড়েই সে আবিদের সাথে যোগাযোগ করে। তারপর ধীরে ধীরে পরিচয় গাঢ় হয়- প্রণয়ে গড়ায়। তারপর বিয়ে। বিউটির আগ্রহেই। সে ই তার বাড়ি ছেড়ে- বাবা মাকে ছেড়ে চলে এসেছে। এমনকি আবিদকেও ঘর ছেড়ে যেতে বাধ্য করেছে। তারপর দুঃখে কষ্টে অনেকটা সময় পার হয়েছে। বিউটি সবকিছু হাসিমুখে মেনে নিয়েছে। কিন্তু রাহুল আর রাকা মানে তাদের ছেলেমেয়েরা যত বড় হচ্ছে ততই বিউটির আচরণ পরিবর্তিত হচ্ছে। আবিদ তার অনুভূতির জায়গাটা বুঝতে পারে। তাই সে কোনো পাল্টা জবাব দেয় না। মুখ বুজে সব অপমনা গঞ্জনা সহ্য করে। আর তার সাধ্যমতো চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। আসলে কবিতা লেখা ছাড়া সে আর কিছুই জানে না। মাঝখানে সে একটা নামী দৈনিকে বেশ ভালো বেতনে ফিচার এডিটর হিসেবে চাকুরী নেয়। কিন্তু সেখানকার কর্পোরেট কালচারের সাথে সে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না। তাই মাস দুয়েকের মাথায় সেই চাকুরী ছেড়ে দিয়ে সে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে। সেই অনিয়মিতভাবে প্রকাশিত মাসিক পত্রিকার সম্পাদনার কাজে। তাই বিউটির লাঞ্চনা গঞ্জনা সয়ে যাওয়া ছাড়া তার আর অন্য কোনো উপায় থাকে না। শুধু ভালো লাগে যখন দেখে তার নাম কিংবা লেখা পত্রিকায় দেখে ছেলেমেয়ে দু’টোর চোখে আনন্দ ঝিলিক মারে। তারা নিমেষেই সব ভুলে যায়। ছেঁড়া জামার কষ্ট, জুতার কষ্ট। বাবাকে নিয়ে গর্বে তাদের বুক ফুলে উঠে। সেটা দেখে আবিদ জহিরের সব দুঃখ মাটি হয়ে যায়। অদ্ভুত ভালো লাগা তাকে ছুঁয়ে যায়। তবু বিউটির লাঞ্চনা গঞ্জনা সমান তালে চলতে থাকে। সেটা বাদ দিলে আর সবকিছু তার কাছে স্বাভাবিকই লাগে। তবে ইদানিং তার মনে একটা শঙ্কা যোগ হয়েছে। যেটা তার জন্য ভীষণ ভীতিকরও বটে। সে শুনেছে যখন জীবনানন্দ দাস মারা যান তখন নাকি তার স্ত্রী লাবন্য দেবী সবাইকে বলেছেন- তোমাদের দাদাতো তোমাদের জন্য- ঝরা পালক, ধূসর পান্ডুলিপি, সাতটি তারার তিমির, মহাপৃথিবী রেখে গেছেন। কিন্তু আমাকে কী দিয়ে গেছেন? এই কথাটা কতটুকু সঠিক আবিদ জহির তা জানে না। তবু সে ভাবে স্ত্রীর মুখে এমন কথা শুনে নিশ্চয়ই জীবনানন্দ বাবু অনেক লজ্জ্বা পেয়েছেন। লজ্জ্বায় নিশ্চয়ই তার লাশও নীল হয়ে গেছে। জীবনানন্দ বাবুর জায়গায় আবিদ নিজেকে কল্পনা করে। ভাবতেই তার গা শিউড়ে উঠে। ভাবে সে মারা যাওয়ার পরে যদি বিউটিও এখনকার কথাগুলো সবাইকে বলে বেড়ায় তবে লজ্জ্বায় তার মাথা হেঁট হয়ে যাবে। অপমানের কোনো সীমা পরিসীমা থাকবে না। তাই যখনই সে সময় পায় এবং বিউটির মেজাজ শান্ত থাকে তখনই সে হাতজোড় করে তাকে অনুরোধ করে- যা কিছু বলার বিউটি যেন তা তার জীবিত অবস্থায় তাকেই বলে। তার মৃত্যুর পরে যেন অন্য কাউকে এসব কথা বলে না বেড়ায়।
বিউটি তার এমন অনুরোধের মানে বোঝে না। তাই সে জিজ্ঞেস করে-মানে?
তখন আবিদ জহির একটু ঢোক গিলে নেয়। বলে- না মানে, ব্যাপারটা আমার জন্য একটু বেশিই অপমানজনক হয়ে যাবে।
এ কথা শুনে তো বিউটি আরও তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে- আহারে অপমান! জিন্দা মাইনষের অপমানবোধ নাই মরা লাশের আবার অপমান!
আবিদ জহিরের গলা আরও নিচু হয়ে যায়- না মানে, মানুষতো জোর করে আমাকে কবিতা লিখতে বলে নাই। আমি তো নিজের থেকেই কবিতা লিখছি। তাই তাদের কাছে এসব বলে বেড়ানো লজ্জ্বাকর হবে না!
-আহারে লজ্জ্বা! এখন ছেঁড়া জামা পড়ে অফিসে যেতে লজ্জ্বা করে না! বলেই বিউটি কাজে মন দেয়। তবু আবিদ জহির ক্ষান্ত হয় না। সে বারবার একই অনুরোধ করে। তবুও সে আশ্বস্ত হতে পারে না।
সেদিন সন্ধ্যার পরে অনেকক্ষণ পর্যন্তই আবিদ অফিসের কাজ করে। সামনে পত্রিকার নতুন সংখ্যা বের হবে। তাই সবকিছু গুছিয়ে নিতে হচ্ছে।
রাত দশটা সাড়ে দশটা করে বিউটির মোবাইলে এক পরিচিত সাংবাদিকের নম্বর থেকে ফোন আসে-ভাবী আবিদ ভাই আর নেই। ট্রেনে কাটা পড়েছে। স্পট ডেড।
বিউটি কিছু বলে না। কথা শেষ হলে মোবাইলের সুইচ অফ করে দেয়। তারপর ঘরের দরজা বন্ধ করে এক কাপড়েই ছেলে মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। তাদের অবশ্য সাথে নেয়ার মতো আর তেমন কিছু ছিলও না। তারপর সিলেটের বাসে উঠে পড়ে- বাপের বাড়ির উদ্দেশে।
এদিকে অনেকটা নিভৃতেই আবিদ জহিরের দাফন সম্পন্ন হয়। তার শেষ আশ্রয় হয় সিটি কর্পোরেশনের সাধারন কবরস্থানে। আর কোনো আলোচনা, স্মরনসভা কিছুই হয় না। শুধু তারই মতো এক স্বপ্নভূক তরুণ কবি একটি জাতীয় দৈনিকে তাকে নিয়ে একটি কবিতা লিখে-
একজন আবিদ জহিরের জন্য
প্রিয় আবিদ জহির এই ছিল আপনার স্বপ্নে
একবার যদি বলতেন মুখ ফুটে-
আমরা সব মন্ত্রনালয়ের সুষম সমন্বয়ের মাধ্যমে
সারাদেশে বসিয়ে দিতাম ট্রামলাইন
এমনকি এশীয় মহাসড়কে-
আন্তঃমহাদেশীয় সংযোগও সম্ভব ছিল খুব।
বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এর তহবিলে
আমদানী হতো প্রাগৈতিহাসিক
মৃদু গতির ট্রাম।
তার মোলায়েম ধাক্কায় জীবনানন্দ টিকে ছিলেন ছয়দিন
আপনি দিব্যি ছয়মাস টিকে যেতেন নির্বিঘেœ।
প্রিয় আবিদ জহির এই ছিল আপনার স্বপ্নে
একবার যদি বলতেন মুখ ফুটে-
সদা জাগ্রত ছিল ষোল কোটি জনতা
দুর্ণীতি কিংবা দুর্ণীতির ষড়য়ন্ত্রের কোনো অভিযোগ তোলার
দুঃসাহসও করতো না বিশ্বব্যাংক কিংবা আইএমএফ-
কিছুই বাঁধা হতো না প্রকল্প বাস্তবায়নে
আপনার স্বপ্ন কিংবা চাহিদামাফিক মৃত্যুর।
কবিতাটি যতটা না আলোচিত হয়েছে আবিদ জহিরকে স্মরন করার জন্য তার চেয়েও বেশি বিখ্যাত হয়েছে রাজনৈতিক কারণে। আর সেই সুবাদে সেই স্বপ্নভূক তরুণ কবি রাতারাতি পরিচিতি পেয়ে যায় জাতীয় পর্যায়ে। আর তার আড়ালে চিরতরে হারিয়ে যায় কবিতাগ্রস্থ একজন আবিদ জহির।