প্রেমিক পুরুষ বলতে আমি আক্ষরিক অর্থে যা বুঝি তার বাস্তব প্রতিমূর্তি বলতে আমি 'কমরেড চরবেতকান্দি সংক্ষেপে কমরেড -সি'-কে (ছদ্মনাম) চিনি। যেহেতু বাস্তব চরিত্র তাই গোপনীয়তা রক্ষার্থে সকল চরিত্রের ক্ষেত্রেই আমি ছদ্মনাম ব্যবহার করবো।
২০১৫ সালের মিড সামার, খুব সম্ভবত মে কিংবা জুন মাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সেমিস্টার পরীক্ষা দিয়ে সদ্য আবাসিক হলে উঠেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে থেকে একটা প্রবল ইচ্ছে ছিলো হলে থাকবো। কিন্তু উঠবো উঠবো করে ওঠা হচ্ছিলো না। রাজধানীর শহরতলীর যে মেসটায় থাকতাম সেখানেও ইন্টারমিডিয়েটের বন্ধুদের সাথে থাকতাম বলে সহসাই মেস ছেড়ে হলে উঠে যেতে ইচ্ছে করছিলো না। কিন্তু একদিন ইমিডিয়েট সিনিয়র আমিনুদ্দিন (ছদ্মনাম) ভাইয়ের কথা শুনে হলে ওঠার জেদ চেপে গেলো মাথায়। যেহেতু সেকেন্ড টাইম পরীক্ষা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম তাই কিছু ইমিডিয়েট সিনিয়রও বন্ধু হিসেবে জুটে গেছিলো। বলতে গেলে কিছু বন্ধু ছিলো যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে একবছর সিনিয়র হয়ে গেছিলো। সেই সূত্রেই ক্লাসের ফাঁকে একদিন আমিনুদ্দিন ভাইদের সাথে বটতলায় আড্ডা দিচ্ছিলাম। আড্ডার এক ফাঁকে বাসগামী শিক্ষার্থীদের দেখে আমিনুদ্দিন ভাই বলে উঠলেন “বাসা থেকে যেইসব পোলাপান আসে এদের দেখলে আমার ফার্মের মুরগীর মতো লাগে। সকাল বেলা বের হয় সন্ধ্যায় খোঁয়াড়ে ঢোকে।”
কথাটা শুনেই কানটা লাল হয়ে গেলো। বলতে গেলে মনে হলো কেউ কানের মধ্যে একটা বাড়ি দিলো ঠাস করে। আমিওতো একটু পর খোঁয়াড়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিব। অপমানে চুপি চুপি কান লাল হয়ে গেলেও কিছু প্রকাশ করতে পারছিলাম না। পাছে কেউ বুঝে ফেলে আমিও ওই ফার্মের মুরগিদের একজন। নাহ! এমন অপমান সহ্য করার মতো না। তিন দিনের মাথায় মেস ছেড়ে এক সিনিয়রের বদৌলতে হলে উঠলাম। জায়গা হলো গনরুমে। ২০/২২ জন মানুষ আমরা একসাথে থাকি। ধীরে ধীরে সবার সাথেই টুকটাক বন্ধুত্ব জমে উঠছিলো। সবাই ভিন্ন ভিন্ন রকমের বৈশিষ্ট্যে অনন্য। এর মধ্যে মনযোগ কেড়ে নেয় দিনের বেশিরভাগ সময় রুমের এককোনে বসে কটকট করে বাটন ফোনে মেসেজ লেখা কমরেড-সি।
কমরেডের সাথে আমার বন্ধুত্ব সেই গণরুম থেকে শুরু করে আজ অবদি বিদ্যমান। বন্ধু হিসেবে সে অসাধারণ, মানুষ হিসেবেও অমায়িক। অসম্ভব রকমের ভালো মনের এবং ভালো স্বভাবের কিন্তু একটু বদমেজাজি একটা ছেলে। গণরুমের বন্ধুরা আদর করে তার নাম দিয়েছিলো 'এসএমএস কমরেড'। তার আরো কতিপয় উপাধি এবং উপনাম থাকলেও সেইসব নিয়ে আজকে আলোচনা করবো না। কমরেডও তার একটি উপাধি। প্রতিটা নামের পেছনে যে গল্প আছে সে প্রসঙ্গে যদি কোনোদিন লিখি তবে পাঠক নিশ্চয়ই সেইসব নাম সম্পর্কেও জানতে পারবেন। কথিত ছিলো, ঘুমের মধ্যেও যদি কোন মেসেজ আসতো কমরেড ঘুমের মধ্যেই তার ঠিকঠাক উত্তর লিখে পাঠিয়ে দিতো। এ প্রসঙ্গে পাঠকের জ্ঞাতার্থে একটা ঘটনার অবতারণা করি, তৎকালীন কমরেড-সি'র সকাল বেলা একটা রুটিন ছিলো, ঘুম থেকে উঠে সবাইকে গুড মর্নিং মেসেজ পাঠানো। এমনই একদিন সকাল বেলা কমরেড গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ঘুমের মধ্যেই সে শুনতে পায় ফোনে তার কোনো একজন প্রেমিকা তাকে গুড মর্নিং লিখে মেসেজ পাঠিয়েছে; কমরেডও ঘুমের মধ্যেই ঠিকঠাক 'গুডমর্নিং টু' লিখে মেসেজের রিল্পে দিয়ে দিয়েছে কোনো প্রকার স্পেলিং মিস্টেক ছাড়াই। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে কমরেড ফোনের সেন্টবক্সের ওই মেসেজ দেখে নিজেই মনে করতে পারেনি সে এটা কখন-কীভাবে লিখলো।
তখনও আমাদের বয়সীদের কাছে স্মার্টফোন এবং সোশ্যাল মিডিয়া ততটা ফ্রিকোয়েন্ট ছিলো না। কমরেডেরও তখনো স্মার্টফোন দুনিয়ায় প্রবেশ করা হয়নি। তার কাছে তখন একটা সিম্পোনি ব্র্যান্ডের ফিচার ফোন ছিল। সারাদিন দেদারসে তিন চারজন নারীকে সমানতালে মেসেজ পাঠাতো সে। ফোনের বাটনগুলো এতটাই মুখস্ত ছিলো যে কারো সাথে কথা বলার সময়ও না তাকিয়েই ফোনে এসএমএস লিখতো সে। কী মেসেজ পাঠাতো সেটা বোধকরি পাঠকদের আলাদা করে বলে দেওয়ার প্রয়োজন নাই। প্রেম যে সে কেবল একাই করতো রুমে তা কিন্তু না। কিন্তু যেখানে কমরেড অনন্য তা হলো তাকে আমি কখনও তার প্রেমিকাদের সাথে খুব একটা ঝগড়া করতে দেখিনি। সম্ভবত কয়েকজনকে সময় দিতে গিয়ে ঝগড়া করার সময় পেতো না সে। অন্যরা প্রেমিকার সাথে বারান্দা কিংবা রুমের কোণে অতি নিচুস্বরে প্রেমালাপ সারলেও কমরেড খুব একটা কথা বলতো না, তার পছন্দ ছিলো মেসেজ লেখা। কথা বলতে গেলে যদি কেউ কল দিয়ে দেখে ওয়েটিংয়ে তখন তো আরেক বিপত্তি। তবে তার এই এসএমএস কিংবদন্তি কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের আগে ততটা প্রকট আকার ধারণ করেনি। একসময় 'কমরেড-সি' ফোনেও কথা বলতো। যখন কমরেড ফোনে কথা বলতো তখনও সে খুব এক্সট্রিম ছিলো। কমরেড যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কোচিং করে তখন তার একটা মেয়ের সাথে নতুন নতুন প্রেম হয়। নতুন প্রেমালাপ যে কতোটা মধুর হয় এটা বোধকরি পাঠকদের আলাদা করে বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কমরেড তখন রাজশাহীতে তার কোচিং সেন্টারের অদূরে একটা মেসে থাকে। মেসের বাইরে একটা রেইনট্রি গাছ ছিলো। তো এই মধুর স্বাদ পেতে কমরেড সেই গাছের গুড়িতে বসে বসে সারারাত কথা বলতো। কখনও কখনও এমনও হতো, যেই খালা সকাল-সন্ধ্যা এসে খাবার রান্না করে দিয়ে যেতেন তার সাথে কমরেডের সন্ধ্যায় যে স্থানে দেখা হতো সকালেও সেই একই স্থানে দেখা হতো এবং এর মধ্যে কমরেড বাথরুম কিংবা ফোন রিচার্জ ছাড়া একবারও ওঠেনি। সেসময়কার আরেকটা ঘটনা না বললেই নয়। কমরেড-সি যেহেতু প্রেমিক পুরুষ সেহেতু তার প্রেমের গণ্ডিও অনেক বড়ো। ২০১২/১৩ সালের কথা, যারা নব্বইয়ের দশকে জন্ম নিয়েছেন তাদের অনেকেই হয়তো রবি সার্কেলের নাম শুনে থাকবেন। ফেসবুক এতোটা ফ্রিকোয়েন্ট হওয়ার আগে আমাদের যে কয়টা সোশ্যাল মিডিয়া প্লার্টফর্ম ছিলো যেমন— মিগ, ই-বাডি, নিম্বাজ চ্যাট প্রভৃতি। রবি সার্কেলও তার মধ্যে একটি। অন্যগুলো ইন্টারনেট নির্ভর হলেও এটি ছিলো এসএমএস নির্ভর সোশ্যাল মিডিয়া। মূলত তখন থেকেই কমরেডের এসএমএস কার্যক্রম শুরু। তো ফেসবুকে যেমন অনেকের ফেক আইডি থাকে কমরেডেরও তখন রবি সার্কেলে একটা ফেক আইডি ছিলো নারীর নাম দিয়ে। এবং এই নারী নাম দিয়ে সিলেটের এক ছেলের সাথে প্রেমের অভিনয় করে ফোন কেনার কথা বলে বিশ হাজার টাকাও আত্মসাৎ করেছিলো কমরেড। ছেলেটা যে একজন নারীর সাথেই প্রেম করছে সে বিশ্বাসটুকুও কমরেড তাকে দিয়েছিলো অন্য নারীর ভয়েস রেকর্ডিং শুনিয়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথমবর্ষে থাকতে কমরেড কয়েকজনকে সমান্তরাল ভাবে সময় দিলেও এর মধ্যে একজন ছিলো তার স্পেশাল ওয়ান। তার নাম ছিলো তুলি (ছদ্মনাম)। তুলি কমরেডের এলাকার মেয়ে। ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারে থাকতে তাদের সম্পর্কের গোড়পত্তন হয়। তুলি কলেজ শেষ করে এলাকার একটা কলেজে অনার্সে ভর্তি হতে চাইলেও কমরেড প্রেম করার সুবিধার্থে তাকে এনে ভর্তি করায় ইডেন মহিলা কলেজে। উদ্দেশ্য পাশাপাশি থেকে প্রেমের বাড়তি সুবিধা নেওয়া। তুলির সাথে তার গভীর প্রেম ছিলো, একেবারে জানলেওয়া প্রেম। কমরেডের হাতে তুলি ছাড়াও আরো কয়েকটা সাবপ্রেমিকা থাকলেও তুলি কমরেডকে ছাড়া কিছুই বুঝতো না। তাদের প্রেমের গভীরতা প্রসঙ্গে একটা ঘটনার অবতারণা প্রয়োজন; তখন আমরা ফার্স্ট ইয়ারের শেষের দিকে। একদিন কমরেড-সি দুপুর বেলা ভুলে তার মানিব্যাগ রুমে ফেলে ক্লাসে কিংবা অন্য কোথাও গিয়েছিলো। বন্ধু তামিম রুমে বেওয়ারিশ মানিব্যাগ পেয়ে সবাইকে জিজ্ঞেস করছিলো মানিব্যাগটি কার। মালিক খুঁজে না পাওয়া গেলেও ততক্ষণে সবার মনোযোগ মানিব্যাগের দিকে। বেওয়ারিশ মানিব্যাগের পরিচয় উদ্ধার করতে একজন প্রস্তাব দিলো মানিব্যাগের ভেতরে খুঁজে দেখতে কোন পরিচয়পত্র বা এমন কিছু খুঁজে পাওয়া যায় নাকি যাতে বোঝা যায় এর মালিক কে। যথারীতি খোঁজাখুঁজির পর এর মালিকের একখান ছবি পাওয়া যায় (কমরেডের ছবি) আর সাথে পাওয়া যায় একখানি প্রেমপত্র। এসএমএস কমরেডের প্রেমপত্র পাওয়া গেছে শুনে সবাই একযোগে সমস্বরে তামিমকে বলে উঠলো 'চিঠিটা পড়'। পত্রটি তুলি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের আগেই কোন এক সময় কমরেডকে লিখেছিলো। পত্রটির সম্পূর্ণ লেখা এখন আমার মনে নেই তবে যে কথাখানি আজও আমাদের সকলের কানে বাজে তা হলো এর সম্ভাষণ। তামিম আবৃত্তি ভঙ্গিতে অতিরিক্ত আবেগ যোগ করে পত্রটি পড়া শুরু করে। পত্রটি শুরু হয়েছিলো কমরেডকে উদ্দেশ্য করে তুলির লেখা 'প্রিয় মাহাবুবের আব্বুউউ' দিয়ে। বলাবাহুল্য এ ছাড়াও পত্রের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো কিশোর বয়সের উপচে পড়া প্রেমের চিহ্ন। আদুরে ভাব, অসংখ্য চুম্বন, আহ্লাদী আবদার আরোও কতো কী! সে ঘটনার পর কমরেডকে অনেকদিন 'মাহাবুবের আব্বু' ডাক শুনতে হয়েছিলো। রাস্তা-ঘাটে যেখানে সেখানে কমরেডকে দেখলেই 'এই মাহাবুবের আব্বু' বলে উঠতাম সবাই।
কালনেমির লঙ্কাভাগ শেষে তুলির রিয়েলিটি চেক বাকি ছিলো। মানুষ যখন কোনকিছু খুব বেশি আশা করে সেটা মানুষের সাথে খুব একটা হয় না। তুলির ক্ষেত্রেও তাই হলো। বেচারি কমরেডের কথার পাল্লায় পড়ে আসলো ঢাকায়। এখানে ভালো কলেজে ভালো পড়াশোনাও হবে, পাশাপাশি মাহাবুবের আব্বুকে আব্বু বানিয়ে নিজেও মাহাবুবের আম্মু হবে এই আশা করে ইডেনে ভর্তি হওয়ার ছয়মাস যেতে না যেতেই ধীরে ধীরে সমস্যা দেখা দিতে লাগলো। 'মাহাবুবের আব্বু' যে কিনা কিছুদিন আগেও গ্রামের মেয়ে তুলিকে ছাড়া কিছুই বুঝতো না, তার এখন তিন চারটে গার্লফ্রেন্ড, বিশ্ববিদ্যালয়ের অঢেল বন্ধু-বান্ধব, দিন-রাত অবিরাম আড্ডা, পাশাপাশি গণরুমে থাকার সুবাধে সরকার দলের মিটিং মিছিলে বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণ সবমিলিয়ে তুলিকে আর আগের মতো সে সময় দিতে পারছে না। এক বেলা কথা হলে আরেক বেলা কথা হয় না। কথার অপেক্ষায় রাত ১২টা/১টা বেজে যায় কিন্তু কমরেডের দেখা পাওয়া যায় না। এভাবে দিনদিন সমস্যা বৃদ্ধি পেতে পেতে একটা পর্যায়ে 'হয় এসপার নাহয় ওসপার' অবস্থায় চলে আসে। কমরেড প্রেমিক মানুষ, তার ভালো লাগে প্রেমিকার মিষ্টি প্রেমালাপ, রাতের বেলা গুণগুণ সুরে আদুরে কথা, শৃঙ্গাররসে ভরপুর এসএমএস সাহিত্য; তার কি সারাদিন পর এসে রাতের বেলা হাজার প্রশ্নের উত্তর দিতে ভালো লাগে? কমরেডেরও এত প্যারা আর নিতে ভালো লাগছিলো না। একদিন তুমুল ঝগড়াঝাটি করে সে সম্পর্কের ইতি টানে। এখন সে মুক্ত। সারাক্ষণ আর কেউ তাকে খবরদারি করছে না এবং রাতে ফিরে আর কারো ক্যাটক্যাট শোনা লাগছে না। এভাবে মুক্ত অবস্থায় কাটতে থাকে সময়।
গনরুমের আড্ডা মাস্তিতে আমাদের দিনও কেটে যায়। প্রথমবর্ষ শেষ হয়; আমরা গণরুম নতুন জুনিয়রদের নিকট ছেড়ে দিয়ে সবাই আলাদা আলাদা রুমে সিটে উঠি। কমরেড বাটন ফোন ছেড়ে আমাদেরই আরেক বন্ধু বিজয়ের ব্যবহৃত এন্ড্রয়েড ফোনটি স্বল্পমূল্যে কিনে নেয়। ফোনটি কেনার মধ্যস্থতা আমিই করেছিলাম। মানুষ ফোন কেনার সময় ফোনের কনফিগারেশন, ক্যামেরা, ব্যাটারি, ফিচার প্রভৃতি সম্পর্কে জানতে চাইলেও কমরেড জানতে চেয়েছিলো ফোনে ঠিকঠাক মেসেঞ্জার চলবে কি-না?
খুব সম্ভবত সেকেন্ড ইয়ারে ওঠার কিছুদিন পর। একদিন হঠাৎ কমরেডের ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে চোখ আটকে যায়। প্রচন্ড বিষাদময় বেদনা বিধুর এক স্ট্যাটাস। এখানে বলে রাখা ভালো যে কমরেডের আবার টুকটাক কবি প্রতিভাও ছিলো, এখনও আছে; কিন্তু সময়ের অভাবে হয়তো লেখা আর হয়ে ওঠে না। তার বিশেষত্ব ছিল দুই লাইনের কবিতা। অনেক কবি যে কথা পুরো কবিতায় ফুটিয়ে তুলতে পারতেন না কমরেড তা দুই লাইনেই ফুটিয়ে তুলতে ছিলো সিদ্ধহস্ত। তো সেদিন এমনই এক দুই লাইনের কবিতা যার কথাগুলো এখন আমার মনে নেই কিন্তু কথাগুলো থেকে যে একটা আত্মচিৎকার ভেসে আসছিলো তা আমার স্পষ্ট মনে আছে। রাতে তার রুমে গিয়ে দেখলাম সে বারান্দায় পট খেয়ে ঢুলু ঢুলু চোখে বসে বিড়ি টানছে। দেখেই মনে হলো কোন প্রেমিক হৃদয় প্রেমিকার প্রচণ্ড প্রত্যাখ্যানে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে পড়ে আছে। কমরেডকে দেখে মনে হলো একটা আহত পাখির মতো, যে রাতের অন্ধকারে আলো খুঁজছে আর নিকোটিনে খুঁজছে দুদণ্ড স্বস্তি। এমন অবস্থার কারণ জিজ্ঞেস করতেই খুব আহত স্বরে উত্তর দিলো, “এত রিকুয়েষ্ট করার পরও আমাকে আর গ্রহণ করলো নারে...।” ঘটনার আদ্যোপান্ত না জানা আমি কিছু বলার আগেই কমরেড বলতে শুরু করলো, কয়েকদিন ধরেই তুলির সাথে তার মেসেঞ্জারে যোগাযোগ হচ্ছে। ফার্স্ট ইয়ারে দোচনামি করে ব্রেকাপ করার পর এখন সে তুলিকে প্রচন্ড মিস করছে। ফিরে পাওয়ার জন্য সে তুলিকে মেসেজ দিয়ে বিভিন্ন ভাবে সম্পর্ক ঠিক করে নিতে কনভিন্স করার ট্রাই করছিলো। কিন্তু মেয়ে কোনভাবেই রাজী হচ্ছিলো না৷ তাই সে আজ বিকেলে তুলির সাথে দেখা করতে যায়। বিশ্বাস ছিলো মাহাবুবের আব্বুকে দেখে মাহাবুবের আম্মু কোনভাবেই আর না করতে পারবে না। কিন্তু ফল তার পক্ষে আসেনি। মাহাবুবের আম্মু তাকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে মাহাবুবের আব্বুর স্বত্ত্ব এখন সে মুজাহিদ (ছদ্মনাম) নামে অন্য একজনকে দিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ সে নতুন একটা ছেলের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে তাই কমরেডের আর মাহাবুবের আব্বু হওয়ার সুযোগ নেই। এখন সে মাহাবুবের মামা, যাকে তুলির পক্ষে গ্রহণ করা আর কোনভাবেই সম্ভব না। কমরেড ক্ষত-বিক্ষত বিধ্বস্ত হৃদয় নিয়ে কোনোমতে নিজেকে সামলে হলে ফিরেছে। কথা বলার সময় তার চোখে অসহায়ত্ব ঠিকরে বেরোচ্ছিলো। বারবার অনুযোগের সুরে অবিশ্বাসের স্বরে বলছিলো “মেয়েটা কেমনে পারলো? আমাকে ছেড়ে মাত্র কয়েকমাসের ব্যবধানে অন্য একটা ছেলের সাথে সম্পর্কে জড়াতে মেয়েটা কেমনে পারলো?” সান্ত্বনা দিতে আমিও তার সঙ্গে মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম, “হ মামা, মাইয়ার এই কাজটা করা একদমই উচিত হয়নাই।” পাশ থেকে আরেক বন্ধু বলে উঠলো “মাইয়া মানুষই খারাপ মামা! প্যারা নিসনা; এমন একটা গেলে আরেকটা আইবো”।
একটা গেলে যে আরেকটা আসবে এ কথা কমরেডের চেয়ে বেশি কে আর জানে? কিছুদিন পরের কথা, মেয়েদের সাথে কমিউনিকেশনে দুর্বল আমাদের আরেক বন্ধু জারিফ নারায়নগঞ্জের একটা মেয়েকে খুব পছন্দ করতো। কিন্তু পর্যাপ্ত ফ্লার্টিং স্কিলের অভাবে মেয়েটির সাথে তার খুব একটা কথা জমছিলো না। অগ্যতা জারিফ কমরেডের শরণাপন্ন হয় এই আশায় যে কমরেড তাকে সাহায্য করবে। জারিফ কমরেডকে বলে মেয়েটার সাথে কথা বলে যেনো তাকে জারিফের প্রতি আসক্ত করে তোলে। আর এটাই ছিল জারিফের সবচেয়ে বড় ভুল। রাকিব মেয়েটার আইডি নিয়ে কথা বলা শুরু করে। প্রথম দিকে কমরেড জারিফের হয়েই কথা বলা শুরু করেছিলো। জারিফও মাঝে মাঝে জানতে চাইতো কী কথা হলো; তাকে নিয়ে কোন কথা হলো কি-না ইত্যাদি। কমরেড তাকে আশ্বস্ত করতো যে তার ঠিকঠাক কথা হচ্ছে। মাসখানেক পর একদিন জারিফের হাল্লাচিল্লা থেকে জানতে পারলাম কমরেড মেয়েটার সাথে একমাস যাবত প্রেম করছে এবং বারকয়েক ডেটও সেরে আসছে। শেয়ালের কাছে মুরগি বর্গা দেওয়ার বাস্তব উদাহরণ সেদিন আমি নিজের চোখে দেখলাম।
কমরেডের একটা দুর্দান্ত বৈশিষ্ট্য ছিলো ওর উপস্থিত বুদ্ধি এবং কেউ তাকে কোন অফেন্সিভ কথা বললে তৎক্ষনাৎ তার দুর্দান্ত একটা উত্তর ছুঁড়ে দেওয়া। এ প্রসঙ্গে মাস্টার্সের শেষের দিকের একটি ঘটনা বলি, কমরেড একদিন একা একা আনমনা মন নিয়ে মল চত্বর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো; হঠাৎ তার খুব পাশ ঘেঁষে পেছন থেকে একটি গাড়ি সাঁ করে চলে যাচ্ছিলো। এটা দেখে কমরেডের রাগ উঠে যায়। বিরক্তি মুখে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে কমরেড গাড়িওয়ালার দিকে একটা প্রচন্ড গালি ছুঁড়ে মারে। গালি শুনে গাড়িতে থাকতে না পেরে এক ভদ্রলোক নেমে এসে সরাসরি কমরেডকে গালির জন্য চার্জ করতে থাকে। ভদ্রলোক হেঁকে এসে বলে ওঠেন “তুমি চেনো আমি কে? আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন টিচার! তুমি আমাকে গালি দিলে কোন সাহসে?” ঘটনার আকষ্মিকতায় হয়তো আমরা অনেকেই ঘাবড়ে যেতাম, স্যরি স্যার বলে কোনমতে কেটে পড়তাম বা অন্য কিছু। শতহোক তিনি আমাদেরই একজন শিক্ষক বলে কথা। কিন্তু কমরেড সে ব্রিডের মধ্যে পড়ে না। প্রথমে একটু ব্যাকফুটে চলে গেলেও তৎক্ষনাৎ সে ভেবে নিলো এখানে চাপে পড়া যাবে না। পাল্টা আক্রমনে রাগের ভঙ্গিতে সে বলে উঠলো- “আপনি টিচার হইছেন তো কী হইছে? তাই বলে কী আপনি আমাকে মেরে ফেলার লাইসেন্স পাইছেন? আমার উপর দিয়ে গাড়ি তুলে দিবেন?” বেচারা স্যার কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে আমতা আমতা করে “তাই বলে তুমি এইভাবে আমাকে গালি দিবে? এটা তোমার ঠিক হয়নাই” বলেই গাড়িতে উঠে চলে গেলেন। কমরেডও সুযোগ পেয়ে পেছন থেকে গজগজ করতে করতে স্যারকে বিদায় জানালো।
ফিরে আসি কমরেডের প্রেমিক জীবনে। কমরেডের প্রেমিক জীবন যে স্মুথ ছিলো তা কিন্তু না। বিভিন্ন সময় নানা বাঁধা বিপত্তি ডিঙ্গিয়েই কমরেড তার বিশেষত্ব ধরে রেখেছে। যেহেতু তার প্রেমিকার সংখ্যা অধিক অতএব তার এই বর্ণিল প্রেমিক জীবনও বিচিত্র ঘটনায় পরিপূর্ণ। একবার কমরেড প্রচণ্ড আবেগী এক মেয়ের সঙ্গে প্রেমে জড়ায়। যেহেতু মেয়ে অনেক আবেগী এবং আহ্লাদী তাই কমরেডও আহ্লাদ করে তাকে বউ বলে ডাকতো। কিন্তু মেয়ের এই অর্থহীন বউ ডাক শুনতে ভালো লাগছিলো না। সে কমরেডকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। প্রেমিকার আহ্লাদ রক্ষার্থে কমরেডও আকাশ বাতাস সাক্ষী রেখে মেয়েকে বিয়ে করে। এই পর্যন্ত কোন সমস্যা ছিলো না। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে যখন সম্পর্কে ভাঙন ধরে। ব্রেকাপের পূর্ব মূহুর্তে মেয়ে গোঁ ধরে যেহেতু তাকে কমরেড বিয়ে করেছে অতএব এখন তাকে ডিভোর্স দিতে হবে। তাও অফিসিয়ালি মেয়ের সামনে গিয়ে মেয়েকে এক তালাক—দুই তালাক—তিন তালাক! বলে তাকে ডিভোর্স দিতে হবে। যে বিয়ের কোন ভিত্তিই নাই সে বিয়েতে ডিভোর্স দিতে কমরেডেরও খুব মন সায় দিচ্ছিলো না। মেয়ে ছিলো প্রচণ্ড জেদী, তাকে ডিভোর্স দিতেই হবে; আর কমরেড যে কি-না বিয়েকে স্বীকারই করে না সে বিয়ের ডিভোর্স সে কেনো দেবে? শেষপর্যন্ত কী হয়েছিলো জানা যায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে কমরেডের এমন বিভিন্ন মেয়াদি অনেকগুলো প্রেমের ঘটনা থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একদম শেষ দিকে তার আবার একটা সিরিয়াস টাইপের প্রেম হয়। মেয়ের নাম পুতুল (ছদ্মনাম)। মেয়ে ছিলো নাদুস-নুদুস টাইপের আর কমরেড ছিলো হ্যাংলা পাতলা। একদিন আমাদের বন্ধু হাবলু মেয়েটির সাথে কমরেডকে দেখে ডাক দিয়ে জিজ্ঞেস করে তার বড়বোন কি-না? কমরেডের চেহারা দেখার মতো ছিলো সেসময়। যাই হোক, অনেকদিন পর কমরেড কোন মেয়েকে নিয়ে সিরিয়াস। মেয়েকে নিয়ে সে নানা রঙিন স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। বিয়ে করার স্বপ্ন নিয়ে ক্যারিয়ারের প্রতি মনোযোগ দেয় সে। বছরখানেক প্রেম করার পর কোনো এক কারণে সে সম্পর্কও ভেঙ্গে যায়। ঘটনাটা এখানে শেষ হলেও পারতো। কিন্তু না, কমরেডের প্রেমিক হৃদয় আবারো বড়ো কিছুর অপেক্ষা করছিলো। সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়ার ৩-৪ মাস পর মেয়েটির সাথে তার আবারো টুকটাক কথা বলা শুরু হয়। কথার পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে সেই সাথে পাল্লা দিয়ে দেখা সাক্ষাৎও হওয়া শুরু হয়। মানে রিলেশন মোটামুটি প্যাচাপ। কিন্তু পূর্বেকার মতো সম্পর্কের মধ্যে স্পার্কটা মিসিং ছিলো। কোথাও যেনো কিছু একটা পুতুল আটকে রাখে। বারবার সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার জন্য কমরেডকে দুষতে থাকে সে। কমরেডও সব অভিযোগ-অনুযোগ নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে বারংবার নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে। এভাবেই মাস দুয়েক যাওয়ার পর একদিন হুট করেই পুতুল কমরেডের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। চার-পাঁচদিন পর পুতুল জানায় তার বিয়ে। শুধু বিয়ে না, কমরেডকে সে তার বিয়েতে খুশিমনে দাওয়াতও দেয়। কমরেড তো হতভম্ভ! ঘটনার টুইস্ট এখানে শেষ হলেও পারতো, কিন্তু পিকচার আভি বাকি হ্যায়! বিয়ের পরদিন মেয়ের স্ট্যাটাস পড়ে কমরেডের চক্ষু চড়কগাছ! বিয়ের ছবি আপলোড দিয়ে পুতুল ক্যাপশন দিয়েছে “আলহামদুলিল্লাহ! যাকে ভালোবেসেছি তাকেই পেয়েছি।”
অনেকদিন কমরেডের প্রেমিক জীবনের কোনো খবর আর নেওয়া হয়নি। তবে কিছুদিন আগে তাকে জিজ্ঞেস করতেই সে বিরক্তি নিয়ে বললো- “আর বলিসনা! একটা মেয়ে লোনলি ফিল করছিলো, তাকে একটু সঙ্গ দিতে গেছিলাম, এখন নাকি তাকে আমার বিয়ে করা লাগবে।” আমি একটু মুচকি হেসে একজন বিবাহিত বন্ধু তার অবিবাহিত বন্ধুকে সবচেয়ে সেরা যে পরামর্শটি দিতে পারে তাই দিলাম। বললাম 'মামা এইসব ছাইড়া এইবার বিয়েটা কর।'
(সমাপ্ত)
সিরিজ: FellowFolks
গল্প: কমরেডের ইতিকথা।