Posts

উপন্যাস

The Mastermind

April 21, 2026

Nova Script

48
View

রাত তখন প্রায় এগারোটা। রয়্যাল মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির মূল ভবনের চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। বাইরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে—জানালায় লেগে কাঁচের ওপর ফোঁটার রেখা এঁকে দিচ্ছে। তৃতীয় তলার করিডোরের একদম শেষ প্রান্তের ঘরটিতে আলো জ্বলছে। ঘরটি অদ্ভুত সুন্দর—দেয়ালে গাঢ় নীল রঙ, মেঝেতে ইতালিয়ান মার্বেল, দেয়াল ঘেঁষে বইয়ের বিশাল আলমারি। মাঝখানে কাঠের টেবিলের ওপর একটি ল্যাপটপ জ্বলজ্বল করছে।

আরিয়ান চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে। বয়স উনিশ। গায়ে কালো টি-শার্ট, হাতে দামি ঘড়ি—রোলেক্স সাবমেরিনার। চুল সাইডে আঁচড়ানো, চোয়ালের রেখা তীক্ষ্ণ। দেখতে যেন কোনো ফ্যাশন ম্যাগাজিনের মডেল। কিন্তু তার চোখের দৃষ্টিতে নেই কিশোরের চপলতা, আছে শিকারীর ঠান্ডা হিসাব।

তার সামনে বসে আছে সাফা। বয়স আঠারো। পরনে জিন্স আর হালকা গোলাপি শার্ট, চুল খোলা। চেহারায় এখন ক্লান্তি ও ভয়ের ছাপ। চোখের নিচে কালি দাগ। ঠোঁট কাঁপছে। চোখ লাল—সে কেঁদেছে। নিঃশব্দে, দীর্ঘ সময় ধরে।

আরিয়ানের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি। সেই হাসিতে কোনো উষ্ণতা নেই। সে ল্যাপটপের স্ক্রিন সাফার দিকে ঘোরায়।

ভিডিওতে সাফা—আর আরিয়ান। দশ দিন আগের রাত। ক্যাম্পাসের লাইব্রেরির পেছনের নির্জন গলি। ভিডিওর কোয়ালিটি ক্রিস্টাল ক্লিয়ার। কোণটা এমনভাবে ধরা হয়েছে যেন কেউ লুকিয়ে রেকর্ড করেছে। সাফা আরিয়ানের বাহুতে, মুখ কাছাকাছি।

"চমৎকার কোয়ালিটি, তাই না?" আরিয়ানের গলা নরম, প্রায় কোমল। "এইচডি। ইউটিউবের ভিডিও থেকেও ক্লিয়ার।"

সাফা কথা বলে না। তার গলা দিয়ে শুধু এক টুকরো কান্না বেরোয়।

"তোমার বাবা চেয়েছিলেন আমি এই ভার্সিটি থেকে বহিষ্কার হই," আরিয়ান এগিয়ে আসে। চোখে চোখ রাখে সাফার। "গত বৃহস্পতিবার চ্যান্সেলরের কাছে চার পৃষ্ঠার চিঠি দিয়েছেন। খুব সুন্দর লিখেছেন। বিশেষ করে যেই অংশে আমাকে 'ক্যাম্পাসের ক্যান্সার' বলা হয়েছে—সেটা মাস্টারপিস।"

সাফা মাথা নিচু করে। তার গলা দিয়ে বেরোয় ফিসফিসানি। "আমি কিছু জানতাম না।"

"জানা উচিত ছিল।"

আরিয়ান ল্যাপটপে আরেকটি ফোল্ডার খোলে। নাম 'শ্যাডো প্রুফ'। ভেতরে অসংখ্য ফাইল—ভিডিও, ছবি, নথি। তিনি একটি ভিডিও ক্লিক করেন। এবার পর্দায় মিস্টার রহমান—সাফার বাবা। ভার্সিটির অডিটোরিয়ামের পেছনের স্টোররুমে তিনি কার সাথে আড্ডা দিচ্ছেন? সাফা চিনতে পারে—প্রিন্সিপালের সেক্রেটারি সাবরিনা ম্যাম। সম্পর্কটা বোঝা যায় পরিষ্কারভাবে।

সাফার চোখ বড় হয়ে যায়। "এটা... এটা কী?"

"এটাই বাস্তবতা," আরিয়ান ল্যাপটপ বন্ধ করে। "তোমার বাবা নিষ্ঠুর শিক্ষক নয়। তিনি শুধু পর্দা ফেলে রেখেছেন। আর আমি সেই পর্দা সরাতে পারি যেকোনো মুহূর্তে।"

সাফা দাঁড়িয়ে পড়ে। পা কাঁপছে। "তুমি চাও কী?"

"আমি চাই না তোর বাবা আমাকে ধ্বংস করুক। উল্টো আমি চাই সে আমার পাশে থাকুক।"

"এটা ব্ল্যাকমেইল।"

"এটা ব্যবসা," আরিয়ান উঠে দাঁড়ায়। হাঁটতে হাঁটতে জানালার কাছে যায়। বৃষ্টির ফোঁটা কাঁচে আঘাত করছে। "তোর বাবা আমাকে শিক্ষক পরিষদে সাপোর্ট করবে। সব প্রফেসরকে বলবে আরিয়ান ভালো ছেলে। আর বিনিময়ে আমি এই ভিডিও কখনো কোথাও দেখাব না।"

সাফা দরজার দিকে পা বাড়ায়। থেমে যায়। ঘুরে দাঁড়ায়। "আর যদি বাবা রাজি না হয়?"

"রাজি হবেই," আরিয়ান হালকা হাসে। "কারণ রাজি না হওয়ার মানে হলো তার ক্যারিয়ার শেষ, তার সম্মান শেষ, তোর মা ও তোর ছোট বোনের সামনে তার মুখ শেষ। তুই কি সেটা চাস?"

সাফার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোয় না। সে দরজা খুলে বেরিয়ে যায়। করিডোরের অন্ধকার তাকে গ্রাস করে নেয়।

আরিয়ান পেছনে তাকায়। তার মুখে কোনো অনুশোচনা নেই। ল্যাপটপ ব্যাগে পুরে ব্লেজার গায়ে দেয়। আয়নায় নিজের দিকে তাকায়—সব ঠিক আছে, সব জায়গায়।

লিফটে নিচে নামে। কালো মের্সিডিজ দরজার সামনে অপেক্ষা করছে। গাড়িতে বসে চালককে বলে, "পেন্টহাউসে চলো।"

গাড়ি ছাড়ার আগে ফোন বের করে। মিস্টার রহমানকে মেসেজ লেখে: "স্যার, কাল সকাল ৯টায় আপনার অফিসে আসছি। আপনার মেয়ে সাফা সব ব্যাখ্যা করবে।"

দুই মিনিট পর রিপ্লাই আসে: "অভিযোগ তুলে নিয়েছি। তোর দরকার নেই এখানে। চুপ থাকলেই ভালো।"

আরিয়ান মেসেজ মুছে ফোন পকেটে রাখে। জানালা খুলে দেয়। বৃষ্টির ফোঁটা গালে এসে লাগে। ঠান্ডা, কিন্তু আরিয়ানের শরীরের ভেতর জ্বলছে আগুন।

---

পেন্টহাউসের লিফট থেকে বেরিয়ে দরজা খোলে আরিয়ান। লিভিং রুমের আলো ঝলমল করছে। ইতালিয়ান মার্বেলের মেঝেতে দামি কার্পেট। ফরাসি জানালা দিয়ে শহরের আলো দেখা যায়—পুরো শহর যেন পায়ের নিচে।

সোফায় জারিফ বসে আছে। বয়স কুড়ি। গায়ে লাল হুডি, হাতে ড্রিংকসের গ্লাস। তার পাশে মায়রা—বয়স উনিশ, চুল বাঁধা, চোখে কাজল।

জারিফ আরিয়ানকে দেখে গ্লাস নামায়। "দেরি কেন?"

"কাজ ছিল।"

মায়রা হাসে। "কাজ? তোর তো কোনো কাজ নেই।"

"থাকলে এখন নামতাম না।"

আরিয়ান সোফায় বসে। জারিফের দিকে তাকায়। "কাল সকাল সাতটায় মিস্টার রহমানের অফিস। তুই আমার সাথে চলবি।"

জারিফ কিছু জিজ্ঞেস করে না। সে জানে—আরিয়ান যখন কিছু বলে, সেটা ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। জারিফ শুধু ছায়া হয়ে যায়। এটাই তাদের বন্ধুত্ব।

ঠিক তখন দরজা খোলে। রাইসা ভেতরে আসে। পরনে কালো লেগিংস, ঢিলে সাদা সোয়েটার। চুল এলোমেলো। তবুও দেখতে অসাধারণ। তার চোখে আছে তীক্ষ্ণতা, হাঁটায় আছে আভিজাত্য।

রাইসা এসে আরিয়ানের পাশে বসে। হাতটি তার হাতের ওপর রাখে। "কেমন আছো?"

"এখন ভালো আছি।"

মায়রা চোখ টিপে জারিফকে ইশারা করে। দুজন উঠে তাদের রুমে চলে যায়। লিভিং রুমে শুধু আরিয়ান আর রাইসা।

রাইসা আরিয়ানের বুকে মাথা রাখে। চোখ বন্ধ করে। তার শ্বাস ধীর। "তোমার শরীর কাঁপছে। অনেক কিছু ভাবো কেন?"

"টেনশন না। প্ল্যানিং।"

রাইসা চোখ খোলে। সোজা আরিয়ানের দিকে তাকায়। "আমি জানি তুমি অনেক কিছু করো যা আমি জানি না। কিন্তু একটা কথা জানো?"

"কী?"

"তুমি আমাকে ভালোবাসো। আর সেটাই আমার জন্য যথেষ্ট। বাকিটা আমি জানতে চাই না।"

আরিয়ান রাইসাকে জড়িয়ে ধরে। তার চুলে হাত বুলায়। রাইসার শরীরের উষ্ণতা তাকে কিছুক্ষণের জন্য শান্ত করে দেয়। এ মুহূর্তে কোনো ফাইল নেই, কোনো ভিডিও নেই, কোনো ব্ল্যাকমেইল নেই। আছে শুধু দুটি শরীরের নীরব কথোপকথন।

রাইসা কানে কানে বলে, "আজ তোমার সাথে ঘুমাবো।"

আরিয়ানের বুকে টান পড়ে। সে রাইসাকে চোখে চোখ রাখে। "সারারাত?"

"সারারাত।"

তারা বেডরুমে যায়। রাইসা লাইট ডিম করে দেয়। শুধু বাইরের শহরের আলো জানালা দিয়ে এসে পড়ে।

সে রাতে কথা হয় অনেক। গল্প হয় না। কাছাকাছি থাকার ভাষা বোঝে তারা। আরিয়ানের হাতের স্পর্শে রাইসা জানে—একজন পুরো দুনিয়ার জন্য নিষ্ঠুর হলেও তার জন্য সে কতটা কোমল হতে পারে।

ঘন্টা কেটে যায়। এক, দুই, তিনটা বাজে।

রাইসা যখন ঘুমিয়ে পড়ে, আরিয়ান বিছানা ছেড়ে বারান্দায় দাঁড়ায়। বৃষ্টি তখন থেমেছে। আকাশে মেঘ সরে গিয়ে তারা দেখা যাচ্ছে।

ফোন বাজে। অচেনা নম্বর। রিসিভ করে।

"আরিয়ান, আমি সাফা।"

আরিয়ান চুপ করে থাকে।

"আমি বাবাকে সব বলে দিয়েছি। কাল সকালে অফিসে আসছেন তোমার জন্য।"

আরিয়ান ফোন কান থেকে সরিয়ে নেয়। এক মুহূর্ত থামে। তারপর ফোন আবার কানে দেয়।

"তোমার বাবা কিছু করতে পারবে না, সাফা। কারণ আমি আগেই সব ফাঁস করে দেব। শুধু তোমার বাবার ভিডিও না—আমি পুরো শিক্ষক পরিষদের নোংরা কাপড়চোপড় বাইরে করে দেব। তাহলে তোমার বাবা শুধু বেকায়দায় পড়বে না, সে হবে সেই নায়ক যে দেরিতে হলেও সত্যিটা বের করতে চেয়েছিল। তুমি চাও সেটা?"

অপর প্রান্ত থেকে শুধু কান্নার শব্দ আসে। তারপর লাইন কেটে যায়।

আরিয়ান ফোন পকেটে রাখে। বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়ায়। নিচে পুরো শহর জেগে আছে। আলোর মালা, গাড়ির হেডলাইট, দূরের কোনো ক্লাবের গান।

সে নিজের মনে বলে—"ক্ষমতার সিংহাসনে বসতে হলে রক্ত দিতে হয়। কারোটা, না হয় নিজেরটাই দিতে হয়। আমি দিতে রাজি আছি।"

পেছন থেকে রাইসার গলা ভেসে আসে। "আরিয়ান? কোথায় তুমি?"

আরিয়ান বারান্দা থেকে ঘরে ফিরে যায়। রাইসাকে জড়িয়ে ধরে। "এখানেই আছি। কখনো যাব না।"

রাইসা তার বুকে মুখ গুঁজে দেয়। আরিয়ান তার মাথায় হাত বুলায়। চোখ বন্ধ করে।

ঘড়িতে রাত সাড়ে তিনটা।

আগামীকাল আরেক দিন। আরেক যুদ্ধ। আরেক জয়—নয়তো পরাজয়।

কিন্তু আরিয়ান জানে—পরাজয় তার অভিধানে নেই।

Comments

    Please login to post comment. Login