Posts

গল্প

Murder in the Village

April 25, 2026

Zihad Sheikh

Original Author Zihad Sheikh

111
View

১.
শহর থেকে দূরে এসেছি একটি পাকা রাস্তা ধরে। রাস্তাটি গ্রামগুলোর ভেতর দিয়ে পাশের উপজেলা তাড়াশ গিয়েছে। সেই উপজেলা আবার অন্য জেলা তথা সিরাজগঞ্জের অংশ। পাকা রাস্তা হলেও মানুষের চলাচল খুব কম। আর এই সুযোগটাই আমরা নিয়েছি। আমরা মূলতঃ সিগারেট খেতে এসেছি। শহরের ভেতরে কোথাও কোন পরিচিত লোক বের হয়ে যায়, তাই নিরাপদ ধূমপানের জন্য গ্রামের ভেতরে আসা। গ্রীষ্মের ছুটিতে ভার্সিটি বন্ধ, বাসায় আসছি কয়েকদিন আগে। তাই সিগারেট খেতে এত ঝক্কি পোহানো। প্রতিদিন একেকটা রাস্তা ধরে শহর থেকে অনেক দূরে চলে আসি। কখনো অন্য উপজেলায় অথবা অন্য জেলায়। ছুটিটা বেশ ভালোই কাটছে এভাবে।

আজ যে রাস্তা ধরে এসেছি তার নাম ভবানীপুর সড়ক। রাস্তা থেকে গ্রামগুলো বেশ দূরে। পাকা রাস্তা থেকে নেমে কাঁচা রাস্তা ধরে গ্রামে যেতে হয়। তাই রাস্তায় থাকা দোকানগুলোয় ভীড় কম। যাদের প্রয়োজন শুধু তারাই এখানে এসে পণ্য কিনে চলে যায়। আড্ডা দেবার একদম পারফেক্ট জায়গা।

আমরা একটি টঙে বসেছি। দোকানটা ছোটো এবং পাশে ক্যারাম বোর্ড রাখা। কিন্তু কোনো লোকজন চা খেতে এখনো আসেনি। এই গরমে গ্রামের লোকজন চা খাবে, সেটা ভাবাও বোকামি। বেলা এখন প্রায় এগারোটা, কিন্তু সূর্য যেন মাথার উপরে চলে এসেছে।একটা সিগারেট ধরিয়ে আরেফিন আমাকে বলল, 'খেলবি ক্যারাম?? মামা দু'জনকে চা দিয়েন।'

'ক্লাস নাইনের কথা মনে পড়ে? স্কুল ফাঁকি দিয়ে ক্যারাম খেলতাম।' স্মিত হেসে আরেফিন বলল, আমিও হাসলাম। হ্যাঁ, স্কুলে থাকতে প্রচুর ক্যারম খেলেছি ক্লাস ফাঁকি দিয়ে। শহরের এমন কোনো জায়গা বাঁকি ছিলো না, যেখানে আমরা দুজন গিয়ে খেলে আসিনি। জেতার চেয়ে হেরে গিয়েছি বেশি কিন্তু যে অভিজ্ঞতা আমরা পেয়েছি তার কারণে আজ আরেফিন তার ভার্সিটিতে ক্যারম চ্যাম্পিয়ন, আর আমি অবশ্য একবার হল চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম।

'তখন তো একটা নেশা হয়ে গেছিলো। ইন্টারে উঠে আবার কার্ড খেলার নেশা ধরলো।' আমরা কথা শেষ না হতেই দু'জনে হো হো করে হাসলাম।

আমাদের আয়েশি খেলা চলছে, সাথে তৃপ্তির সিগারেট টানা। একটু পরেই একটি ভ্যান আমাদের পাশ কাটিয়ে গ্রামের রাস্তায় মোড় নিল। ভ্যানে থাকা বাচ্চাসহ দুজন মহিলা আর্তনাদ করে কাঁদছে। বিষয়টাকে আমি কোনো গুরত্ব না দিলেও, আরেফিন দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলো, 'কিছু জানেন নাকি মামা, কি হইছে?'

দোকানদার পানের পিচকিরি ফেলে বললো, 'কালকে রাতে একজন মারা গেছে গা। তারই বউ এড্যা।'

'কিভাবে মারা গেল?' স্ট্রাইক দিয়ে গুটিতে মারল আরেফিন। আমি দেখলাম তা পকেটে পড়লো।

'আর কইয়ো না বাবা, এরা রাইতে মাছ মারতে যায়, আর কিছুদিন পরেই একেক জন কইরা মারা যায়।'

'আগেও মারা গেছে কেউ?' আরেফিনের পাশাপাশি এবার আমিও বেশ কৌতুহল নিয়ে তার দিকে তাকালাম। আরেফিন নির্বিকারে ক্যারাম খেলে যাচ্ছে।

'হ বাবা, দুই তিন মাস আগেও একজন এঙ্কা কইরা মারা গেছিলো। আইজ আবার আরেকজন। ঘরের মধ্যে মইরা পইড়া আছিল। দরজা ভাইঙ্গা তারে বের করছে। সারা শরীরে কোপের দাগ। জ্বীন অনেক ক্ষেপা। সবাইতো ওরেই দেগতে গেছে। তাই তো দোকান খালি।' মামা পিছনে ঘুরে গ্রামের রাস্তার দিকে তাকালো। রাস্তা ফাঁকা।

আরেফিন স্ট্রাইক ছেড়ে সিগারেট টানছে। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলো, 'মাছ মারার সাথে মারা যাবার সম্পর্ক কি?'

'কি কও বাপু, জানো না কিছু? রাইত কি সুবিধার?? কত জীব জনতু রাইতে ঘুইরা বেড়ায়। জ্বীন ভূতরাও তো থাকে। আর মাছের সাথেই তো তাদের সখ বেশি।' মামা যেন নিশ্চিত জেনেই সব বলছে।

স্ট্রাইক হাতে নিয়ে আরেফিন বলল, 'তা, উনি কিভাবে মারা গেলেন?'

'শুনছি, চাকুর ঘা'য়ে। সারা শরীল জুইরা চাকু মারছে বদ জ্বীনটা।' রাগ প্রকাশ করতে যেন তিনি কটমট করে বললেন।

আরেফিন আমার দিকে তাকালো। কয়েক পলক চুপ থাকার পর জিজ্ঞেস করলো, 'পুলিশ আসছে দেখতে?'

'পুলিশ আসপি ক্যা? কেউ তো আর মাইরা ফেলে নাই। জ্বীন মারছে।' দোকানদার যেন কিছুটা অবাক।

'রক্তবমি করে মারা গেলে তো বুঝতাম পুলিশের দরকার নাই। কিন্তু জ্বীন যে এবার চাকু মারা শুরু করছে। চাকু মারলে তো পুলিশ ধরবেই' আমি হাসতে হাসতে বললাম।

আরেফিন ক্যারাম ছেড়ে আমার কাছে এসে বলল, 'জীবন, চল দেখে আসি। বাইকটা লক কর'

আমি বাইকের ঘাড় লক করে দাঁড়ালাম, আরেফিন দোকানদারকে মোটরসাইকেলটা দেখে রাখতে বলল। দুজনের হাতে নতুন সিগারেট ধরানো। আমরা তো বাসায় সিগারেট খেতে পারি না। তাই বাইরে আসলে একটার পর একটা ধরাতে থাকি।

মাটির রাস্তা ধরে হাঁটছি প্রায় দশ মিনিট। বাইক থাকতেও হেঁটে আসার কোনো যুক্তি আমি পেলাম না। আরেফিন হয়ত তা বুঝতে পেরেছে। তাই সে বলল, 
'ওইরকম বাইক নিয়ে গ্রামে ঢুকলে সবাই লাশ ছেড়ে বাইকের দিকেই তাকিয়ে থাকবে।'

২. 
গ্রামে ঢুকে কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করা লাগলো মরা বাড়ি খুঁজে পেতে। অবশেষে সবার জটলা দেখতে পেলাম। সবাই গোল হয়ে লাশ দেখছে। উঠোনে লাশটা রাখা। মহিলাদের কান্নার আওয়াজে টেকা দায়। স্বজন হারানোর কষ্টে মানুষ যে কান্না করে তা সবার চোখেই অশ্রু টেনে আনে।

আরেফিন লাশ দেখতে জটলার ভেতরে গেল। আমি উঠোনের কোণে দাঁড়িয়ে রইলাম। স্কুলে থাকতে আরেফিনের গোয়েন্দাগিরির একটা শখ ছিল। যেটা সবারই থাকে৷ তবে ওরটা ভিন্ন রকমের। আমরা যখন তিন গোয়েন্দা বা মাসুদ রানা পড়ে মজা নিতাম। সে এগুলো ছুঁয়েও দেখতো না, তার পছন্দ ফেলুদা ও তার গুরু হোমস!

স্কুলে থাকতে বই ও কলম চোরদের উৎপাত সে বন্ধ করে ছিল। এখন ভার্সিটির শেষ বছরে উঠেছে। না জানি তার স্কুল জীবনের গোয়েন্দা হওয়ার শখটা আবার জাগলো কিনা। 
কিছুক্ষণ পর ফিরে এলো আমার কাছে এবং বলল,' একটা সিগারেট দে তো' আমি প্যাকেট বের করতে যাব এমন সময় বলল, 'না, থাক!'
'লোকটাকে কিভাবে মারছে?' আমি জিজ্ঞেস করলাম।

'পুরো শরীরটা দেখতে পারিনি। তবে বুকে দেখলাম বেশ কয়েকটা ছুড়ির আঘাত। সবাই বলল এরকম বিশ-ত্রিশটা আঘাত করেছে জ্বীন!' জ্বীন বলার পর আমার দিকে তাকালো। মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।

'এ যুগে এসেও মানুষ এসব বিশ্বাস করে?'

'মানুষের বিশ্বাস বড়ই অদ্ভুত ব্যাপার। বিশ্বাস আসে ভয় থেকে। মানুষ যখন বুঝলো আগুন তাদের মেরে ফেলতে পারে, তখনই তারা আগুনের পূজা শুরু করলো আগুনকে খুশী করার জন্য'

'এখানে কি জ্বীনের ভয় বেশি?'

'হ্যাঁ, তা বলা যায়। আমার এক ধর্ম মামার নেশা ছিল রাতে মাছ মারার। নানা অনেক নিষেধ করেছেন। কিন্তু একদিন সকালে সে রক্ত বমি করে মারা যায়' আরেফিন এক প্রশ্বাসে বলে ফেলল।

'আমরা কি পুলিশে খবর দিব?' আমি বেশ আগ্রহ নিয়ে বললাম।

'বুঝতেছি না। অনেক হিসেব আছে। পুলিশ আসলেই অনেককে সন্দেহ করবে। গ্রেফতার করবে। টাকা চাইবে ছাড়া পেতে। শেষে দেখবি পুরো গ্রাম পুরুষ ছাড়া। সবার জীবন এলোমেলো হয়ে যাবে?'

'সেটাও একটা বিষয়। কিন্তু পুলিশে তো পরিচিত মানুষ আছে। তারা তো এমন করবে না।'

'আমি ইউনিয়ন মেম্বরের সাথে কথা বলেছি। তারা লাশ দাফন করবে। তারা এটা স্বাভাবিক মৃত্যু মনে করে' আরেফিনের মুখে বিরক্তির ছাপ।

'তুই কি মনে করিস?'

'জ্বীন চাকু দিয়ে মারতে যাবে কেন? একবার ভয় দেখালেই তো মানুষ শেষ'

'এখন কি করবি?'

'চল, ঘরটা দেখে আসি'

আমরা উঠোনের জটলা পেরিয়ে একটি লাল মাটির ঘরের পাশে দাঁড়ালাম। একটাই মাটির ঘর। ঘরের দরজামুখে মহিলারা বসে কাঁদছে। ওদিকে না গিয়ে আলাদা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মাঝবয়সী লোকের কাছে গেলাম।

'চাচা, লোকটার নাম কি?' আরেফিন জিজ্ঞেস করল। লোকটা আমাদের দিকে কৌতূহল নিয়ে তাকালো। তারপর বলল-
'আলম। কিন্তু তোমরা কারা? এইখানে কি করো?'

'আমরা চা খাচ্ছিলাম তিনমাথায়। শুনলাম জ্বীন মানুষ মারছে, তাই দেখতে আসছি'

'ওই কথা আর মুখে আইনো না। বিপদ হবি'

'কোথায় মাছ মারতে গেছিলো?'

'গেরামের পেছনে, মেঘডুম্বুর পুকুরে'

'আগেরজনও কি ওই পুকুরেই মাছ ধরতে গেছিলো?' আরেফিন জিজ্ঞেস করলো।

'না, সে গেছিলো ময়না খালে মাছ মারতে'

'তারেও কি এই ভাবেই মারছিলো জ্বীন?'

'এ্যাকদম এঙ্কা কইরাই'

'তখন পুলিশ আসছিল?'

'আচ্ছিলো হয়ত, মনে নাই-কা'

লোকটি এবার বিরক্তি নিয়ে তাকানো শুরু করলো। পাছে নানান প্রশ্ন করে, তাই আমরা সরে আসলাম। পাক্কা দুই মিনিট ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো আরেফিন। দৃষ্টি সবার দিকে৷ তারপর আমাকে ইশারা করলো, আমরা গ্রাম থেকে বেরিয়ে পড়লাম।

গ্রামের প্রবেশমুখের রাস্তায় দুজন দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালাম। আমি টঙের দিকে তাকালাম, বাইকটা আছেই। আরেফিন সিগারেটে লম্বা টান শেষে আঙুলের টোকা দিয়ে ছাই ফেলে দিয়ে আমাকে বলল,

'এটা যে একটা পরিকল্পিত খুন হতে পারে, সেটা কারো মাথাতেই আসবে না'

'গ্রামের এই গরীব লোককে কে মারতে যাবে? কেন মারতে যাবে? মোটিভ তো দেখি না'

'সবকিছুর ব্যাখ্যা ঐ পুকুর আর খালই দিতে পারবে' আকাশের দিকে ধোঁয়া ছেড়ে বলল আরেফিন।

'যাবি কি ওখানে?'

'এত সুন্দর রহস্য, আর যাব না? তোরে কি তালপুকুরের কাহিনিটা বলেছিলাম?' আরেফিন মুচকি হাসলো।

'হ্যাঁ। ভুত ধরতে যাবার কাহিনি? শেষে পালিয়ে রক্ষা?'

'ঠিক! ওখানেও একটা রহস্য ছিল। ভেদ করতে পারিনি৷'

'তাহলে এটা কি ভেদ করতে নামবি?'

'দেখা যাক। চল, বাড়ি যাই। খেতে হবে!'
আরেফিন বাইকে চেপে বসলো। আমি পেছনে বসলাম। সে বাইক টান দিল পাকা রাস্তা ধরে। তিন কিলোমিটার এসে আমরা ডানে মোড় নিলাম। সোজা রাস্তায় আর যাওয়া যাবে না। ওদিকে আরেফিনের নানা'র গ্রাম। আমরা হাইওয়ের দিকে চলতে থাকলাম। বেলা এখন সাড়ে বারোটা।

৩. 
এরপর সারাদিন একসাথেই ছিলাম আমরা। ওই ঘটনা নিয়ে আর কোনো কথা হয়নি। কিন্তু আমি বিষয়টা ভুলতে পারিনি। একবার মনে হয়েছিল আরেফিনকে বলি। সে তো একসাথে অনেক চিন্তা করে, কখন যে কোনটা নিয়ে পড়ে থাকে তা বুঝা মুশকিল। তবে বিকেলের আড্ডা শেষে যখন বাইকে করে বাড়িতে ফিরছি, তখন আরেফিন বলল, 'পুলিশ বিষয়টা জানে না। আগেরটাও জানে না'

'আমি তো বিষয়টা নিয়ে পুরো বিকেল ভেবেছি। এটা কিভাবে সম্ভব একটা লোক এভাবে মারা গেল, অথচ কেউ কিছুই করলো না' আমি বললাম।

'চল, বথুয়া ব্রিজে যাই। ওখানে কথা হবে'

পড়ন্ত বিকেল। লাল রক্তিম আভা ছড়িয়ে আছে আকাশে। আমরা সূর্যকে পেছনে ফেলে চলছি। আমাদের ছায়া হালকা হতে শুরু করেছে। ব্রিজের মুখে একটি কড়ই গাছের নিচে আমরা নামলাম। আমি গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়ালাম। সে বাইকে বসলো। সিগারেট ধরিয়ে আমাকে দিল। দুই বার কোনো কথা ছাড়াই সে সিগারেট টেনে গেল৷ তারপর আমার পেছনে থাকা মরা নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,

'জ্বীন কখনো মানুষকে মারতে পারে না। তাদের ক্ষমতা শুধু ভয় দেখানোতেই৷ এটাও তারা পারে শুধু অদৃশ্যতার কারণে। সাপ, জ্বীন ও পশু এরা মানুষকেই বেশি ভয় পায়। মানুষকে মেরে ফেলা তো দূরের কথা'।

এতটুকু বলে কিছুক্ষণ থামলো। হাতের টোকায় সিগারেটের ছাই ফেলে দিয়ে আবার বলল,

'রক্তবমি কি কারণে হয়, জানিস'?

আমি অবাক হলাম। সে ভাল করেই জানে আমি প্রকৌশলের ছাত্র। তারপরেও জিজ্ঞেস করলো। আমি কথার রেশ না ভেঙে বললাম, 'তোর ভাল জানার কথা। তুই ফার্মাসিস্ট'।

'রক্তবমির প্রধান কারণ, পেপটিক আলসার। কোনো জ্বীন এর পেছনে নাই। প্যানক্রিয়েটিক ডিজিস বা ক্যান্সার আরেকটা কারণ। জ্বরের মতই রক্তবমি একটি উপসর্গ মাত্র কোনো রোগ নয়'।

'তাহলে খাবারের অনিয়ম আর ধূমপানও তো পেপটিক আলসারকে প্রমোট করে'

'একদম ঠিক। গ্রামে এখনো বিড়ি চলে, যার কোনো ফিল্টার নেই। তাই তার ক্ষতির মাত্রা ব্যাপক। আর যারা রাত জেগে মাছ ধরতে যায়, তারা তাদের নিরাপত্তার জন্যই বিড়ি সবসময় জ্বালিয়ে রাখে'।

'তাহলে তাদের অসুস্থ হবার চান্স বেশি'

'হ্যাঁ। তাই তাদের মিথ হলো, যাদের জ্বীন ধরে, তাদের রক্তবমি হয়ে মারা যায়'।

'তো, এখানে কি ঘটেছে? খুন? হত্যা'?

'তাছাড়া আবার কি? তোর বাড়ির চারপাশের কথা মনে আছে?' আরেফিন আমার দিকে তাকাল।

'না' আমি কিছুটা চমকে গেলাম। আমি তো ভালো করে কিছু খেয়াল করিনি।

'লোকটার বাড়ি গ্রামের উত্তর পাশে। মাত্র একটি থাকার ঘর, তার পশ্চিমে একটি রান্না ঘর। থাকার ঘরটা মাঝারি ধরনের। ঘরের উত্তর দিকে বাঁশের ঝাড় ও জঙ্গল। তারপরে আরও বাড়ি রয়েছে। গোয়াল ঘরটা পূর্ব দিকে। দুইটা গরু আছে। লোকটা মোটামুটি স্বচ্ছল বলা যায়'।

ওর পর্যবেক্ষণ যথেষ্ঠ ভাল। দুই মিনিট দাঁড়িয়ে এসবই দেখেছে। আমি কিছু না বলে চুপচাপ শুনছি। সে আবার শুরু করলো।

'এমন কাউকে দেখলাম না যে, তার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আছে। তাই এই বিষয়টা কিছুটা দূর্বল, কিন্তু বাদ দেয়া যাচ্ছে না। লোকজন বলছিল তারা দরজা ভেঙে লোকটাকে বের করে এনেছে।  ভেতরে লাশ রেখে খুনী দরজা লাগিয়ে কিভাবে বের হলো? গ্রামের মত জায়গায় এমন করে খুন কেউ করবে, এটা মাথাতেই আসছে না'

'গ্রাম ও শহরের পার্থক্য কিন্তু আমাদের মত গরীব দেশেই বেশি। ধনী দেশগুলোতে কিন্তু ধনীরা গ্রামে থাকে আর চাকুরিজীবীরা শহরে থাকে'! আমি বললাম।

'হ্যাঁ, কিন্তু এতটা সুনিপুণ ভাবে হত্যার চিন্তা কারো মাথায় নিশ্চয় আসবে না?' আরেফিন সিগারেট ফেলে দিলো।

'কাউকে যদি মেরে ফেলার প্রয়োজন পড়ে, তাহলে গ্রামের লোকজন কি করবে?'

'তাকে গ্রাম ছাড়া করাটাই তো সহজ। কিন্তু এখানে মেরে ফেলা হইছে। আমি নিশ্চিত। এবং এটাও নিশ্চিত ছুড়ির আঘাতে সে মরেনি'

'তাহলে কিভাবে মরছে?' আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম ওর কথা শুনে।

'ছবিটা দেখ' বলেই তার নকিয়া ফোনসেটটা আমার দিকে এগিয়ে দিল। আমি লাশটার ছবি দেখে কিছুই বুঝলাম না।

'চোখের ভ্রু-টা দেখ। একদম লেপ্টে গেছে। কপালের উপর মাথার চুল বসে গেছে। সুতরাং তাকে বালিশ চাপা দেয়া হয়েছিল'

আমি বুঝতে পারছিলাম না, বিশ্বাস করব নাকি করব না। সে বিষয়টা বুঝতে পেরে বলল,

'বালিশের কাপড়ের ভাঁজটা ওর গালের উপর ঝাপ হয়ে ছিল। ছবিতে দেখতে পারবি। আর ঘামের কারণ চুলগুলা ওভাবে হয়ে গেছে।'

আমি ফ্যালফ্যাল করে ওর দিকে তাকিয়ে আছি। ও আরেকটি সিগারেট আমার দিকে এগিয়ে দিল। আমি দ্রুত কয়েকটি টান দিলাম। সে আবার বলতে শুরু করলো,

'আমরা যখন ঘুমাই, তখন ঘাড়ের নিচের থাকা বালিশের অংশটা চাপ খেয়ে বসে যায়, ঢালু হয়ে যায়। কিন্তু আমি জানালা দিয়ে দেখেছি, উচু অংশটুকু ঘাড়ের দিকে রাখা ছিল'

'বালিশ চাপা দিয়েই যদি মারবে, তাহলে চাকু দিয়ে খোঁচানোর দরকার কি ছিল'?

'এটাই তো কথা! হয়ত জ্বীনের কাজ বলে প্রচার করতে সুবিধা হত। সবার তো আর রক্তবমি হয় না!'

'তাহলে কি কাল যাবি ওদিকে?'

'এখনই বলতে পারছি না। রহস্যটা কতটুকু টানে সেটাই এখন দেখার বিষয়!'

আমরা ফিরে এলাম বাড়িতে। ওকে ওর বাসায় নামিয়ে দিয়ে চলে এলাম আমার বাড়িতে। রাতে আর এই বিষয়ে আরেফিনের সাথে কথা হয়নি। আমিও আর এটা নিয়ে ভাবিনি। রাত জেগে বান্ধবীর সাথে কথা বলে ঘুমিয়ে গেছি।

ঘুম ভাঙলো আরেফিনের ফোনে। দেয়ালঘড়িতে দেখি সকাল আটটা বাজে। এত সকালে সে সাধারণত ফোন দেয় না। কারণ সে অনেক রাত জেগে বই পড়ে আর দেরিতে ওঠে। আধো জাগা আধো ঘুম নিয়ে ফোনটা ধরলাম।

'ঘুম কি ভাঙেনি? ইয়াসমিন কি জাগিয়ে দেয় না'? ওপাশ থেকে হাসির আওয়াজ আসলো।

'না, রাতে অনেক গরম ছিল। তাই ঘুমাতে পারিনি'

'বুঝি, বুঝি। ফ্রেশ হয়ে, না খেয়ে আমার নানার বাড়ি চলে আয়। চালের রুটি আর গরুর গোশত খাব'

'ওখানে গেলি কখন?'

'গতকাল রাতে এসেছি। তুই আয়। আর অলসদের ডাকার দরকার নাই'

অলসরা বলতে আমাদের অন্য বন্ধুরা। তারা সব কাজেই হাত লাগিয়ে কোনো কাজেই থাকে না। 
আরেফিনের নানার বাড়ি শহর থেকে সাত কিলো দূরে৷ গতকাল যে রাস্তায় সিগারেট খেতে গিয়েছিলাম, সেই রাস্তা এই গ্রামের উপর দিয়েও যায়। আমার বুঝতে বাঁকি রইলো না, আরেফিন বিষয়টা নিয়ে পরিস্কার হতে চাইছে। কারণ, আমরা যেখানে একবার সিগারেট খেয়ে আসি, সেখানে আর যাই না  আমি ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

৪. 
বেশ মজা করে রুটি ও গোশত খেয়ে আমরা বসেছি আরেফিনের নানার বাড়ির দোতালার রেলিং-এ। এটা মাটির তৈরি দোতলা বাড়ি। দ্বিতীয় তলার বারান্দাকে রেলিং বলে। অনেকটা ঝুলন্ত সেতুর মত। এখানে দিব্যি শুয়ে বসে থাকা যায়। আমি জানি আমার মত আরেফিনেরও উসখুস করছে একটি সিগারেটের জন্য। কিন্তু গ্রামে তা সম্ভব না, যতক্ষণ না রাত হচ্ছে। আর নানাবাড়িতে তো একদমই সম্ভব নয়।

'গ্রামে আসার কারণ নিশ্চয় বুঝতে পারছিস?' চামচ দিয়ে আমের আচার মুখে নিয়ে বলল আরেফিন।

'হ্যাঁ, বুঝেছি। কিন্তু এখন কি করব আমরা'? আমি জিজ্ঞেস করলাম।

'ওই গ্রামে আবার যাব। যারা মারা গেছে, তাদের বাড়িতে যাব। আর যারা এখনো মাছ ধরতে যায়, তাদের সাথে কথা বলব।' আরেফিন বলল।

'তারা কি রাজি হবে? যদি কেউ বুঝতে পারে?'

'না পারবে না। আমরাও মাছ ধরতে যাব যে!'

'অ্যাঁ, বলিস কি? আমরা কেন ওখানে মাছ ধরতে যাব।' আমি সত্যিই ভয় পেয়ে গেছি। এই গরমে মাছ ধরতে যাওয়া আর আগুনে পুড়তে যাওয়া একই কথা।

'হ্যাঁ, যাব। নানা'র হুইল বড়শি আছে অনেকগুলো।  তুই একটা পছন্দ করিস।'

মাছ ধরতে যাব শুনে সত্যিই আমি একটু ভড়কে গেছিলাম। নানা তার বড়শির ঝোপা খুলে দেখালেন। হরেক রকমের বড়শি। আমরা দুইজন দুটি বড়শি নিলাম। এর মাঝে নানা আমাদের উদ্দেশ্য নিয়ে কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না। বুঝলাম তিনি ঘটনার আদ্যোপান্ত জানেন।

বড়শি নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে বাইকের কাছে যাচ্ছিলাম, এমন সময় আরেফিন আওয়াজ দিয়ে উঠলো,
'উহু, বাইক না। সাইকেলে চল।' বাইরের বারান্দায় দুটি সাইকেল রাখা। আমি ছোটো সাইকেলটা নিলাম।

এই সাইকেলের ইতিহাস আমি জানি। এটা জাপানে তৈরি ষাটের দশকে। তখনই এটা কোলকাতা থেকে এখানে আনা হয়। এই সাইকেলের কোনো পার্টস আর পাওয়া যায় না। এমনকি টায়ারও না। নানা ফনিক্স সাইকেলের টায়ার কেটে জোড়া লাগিয়ে এটাতে ব্যবহার করে। বড়ই অদ্ভুত! কিন্তু চলে উড়োজাহাজের মত।

সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছি পাকা রাস্তা ধরে। আরেফিন গতি কমিয়ে আমার পাশাপাশি চলছে।

'তোকে দিনের বেশিরভাগ সময় রেলিং এ কেন বসিয়ে রেখেছিলাম জানিস?'

'না' আমি অবাক হয়ে বললাম।

'কারণ রেলিঙের শেষ মাথায় সজিনা গাছ তলায় একটা জ্বীন আছে। হি হি হি' ওর হাসিটা আমার বুকে খচাৎ করে ঢুকছিল।

'বলিস কি? ফান করছিস?'

আমরা সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিলাম। দুইপাশে সবুজ মাঠ, মাঝামাঝি রাস্তা। এ যেন এক সবুজ বিল। আমরা একটি গ্রামে ঢুকলাম। এই গ্রামের পরের গ্রামটাতেই গতকাল লোকটা মারা গেছে। এই গ্রামে কেন আসলাম, তা আমার কাছেও পরিস্কার না। মাটির রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছি৷ আরেফিন একটু আগে, আমি তার পেছনেই সাইকেল চালাচ্ছি। এইদিকের প্রায় সব গ্রাম সম্পর্কে তার জানাশোনা আছে। কিন্তু এর আগে কখনো সে আসেনি। আমি এদিকের কিছুই চিনিনা। শুধু ওর নানা'র বাড়িতেই এসেছি বহুবার।  কিছুদূর যাবার পর একটি বটগাছের নিচে সে দাঁড়ালো। আমিও দাঁড়ালাম।

'এই গ্রামের পেছনে একটি জরাজীর্ণ খাল আছে। যার নাম মইন্যা খাল বা ময়না খাল। খালের ওই পাড়ে কিছু বড় পুকুর আছে। প্রত্যেকটার আলাদা নাম আছে৷ সব নাম আমার মনে নাই৷' আরেফিন আমাকে এলাকার বিবরণ দিতে লাগলো।
সে আবার বলতে শুরু করলো, 'এই গ্রামের নাম ভিটাকাটা। আর পাশেরটার নাম আম্বইল। ওখানে না গিয়ে কেন এখানে আসছি, সেটাই ভাবছিস তো?'

'হ্যাঁ'

'ওই গ্রামের হাঁড়ির খবর তুই এই গ্রামে সহজেই পেয়ে যাবি। আরেকটা বিষয় হলো, সেই নির্দিষ্ট স্থানটা খুঁজে বের করা। যেখানে গেলে মানুষ আর বাঁচে না। এই মিথটা ভাঙতেই হবে।'

'কত বছর হলো এই মিথ চলে আসছে, জানিস?'

'না। চল জেনে আসি।'

আমরা আবার চলতে শুরু করলাম। গরমের তীব্রতা বুঝতে পারছি। গ্রামের শুরুতেই একটা মাচায় কিছু বয়স্ক লোক বসে আছে। মাচা হলো বাঁশ দিয়ে বানানো বসার উঁচু জায়গা। আমাদের দেখে তারাও বেশ কৌতূহল। আমরা সাইকেল থেকে নেমে এগিয়ে গেলাম। পাঁচজন লোক বসে আছে, তারা সবাই বেশ কড়া দৃষ্টিতে তাকালো। 
আরেফিন সালাম দিয়ে বলল, 'জ্বী, আমি আরেফিন। তালুকদার বাড়ির নাতি৷ আপনারা সবাই ভাল আছেন?'

সবাই হু হু বলে মাথা নাড়াল। একজন হাসি মুখে বলল, 'ছোটো তালুকদার এদিকে কি করবার আচ্ছে বারে?'

'বন্ধুর শখ মাছ ধরবে, তাই মাছ ধরতে এনেছি এদিকে'

'একন তো গরম কাল, এই কালে তাই মাছ পাইবা? মাছ মারতে আসা লাগবি বরষা কালে'

'ওই সময় তো আর ছুটি থাকে না। তাই শখ মেটাতে আসা এখন। এদিকে তো বড় কয়েকটা পুকুর আছে। তা, মাছ পাওয়া যায়?'

'সরকারি পুকুর। সবাই মাছ মারে, খুউব কষ্টে শিষ্টে যদি কিছু পাও।' অন্যরাও মাথা নেড়ে সায় দিল।

'আচ্ছা, আপনারা মাছ ধরেন না?'

'হ, আমরাও মারি। তবে রাইতে।'

'পাশের গ্রামের একজন নাকি মাছ ধরতে গিয়ে মারা গেছে, জানেন নাকি?'

অন্যজন যিনি সবার পেছনে মাথা ঘুরিয়ে আমাদের দেখছিলেন তিনি বললেন, 'হ, জানি। আলমের কথা কচ্ছো। সে মইন্যা খালে মাছ মারতি গেছিলো'

'ওই জাগাটা সুবিধার না। নানান ভয় আছে। আমরা ওদিকে যাই না। তোমরা কি মন্যা খালের দিকে যাবা নাকি?' বয়স্ক ব্যক্তি বললেন।

'না,  মেঘডুম্বুরে যাব।'

'ওখানে ভয়ের কারণটা কি?'

'বহুত আগে, যখন তালুকদারি-জমিদারি আছিল, তখন আশপাশের গেরামে খুউব ডাকাতি হইত। তখন তো মইন্যা খাল আছিল না, আমরা তো মইন্যা নদী কইতাম। করতোয়াতেও মেলা পানি আছিল। কত্ত নৌকা যাইতো এইদিক দিয়া। ডাকাতরা ডাকাতি কইরা আইসা মইন্যা খালের ওই পাড়ে আনন্দ উল্লাস করতো। এইদিকে তখন কোনো গেরাম আছিল না। শুধু জঙ্গল। ওইখানে ওরা মাইনষেকে জবাই করতো, মাইরা ফেলতো। ভয়ে দিনেই ওইদিকে কেউ যাইতো না। সেই আত্মারা আইজও মাইনষেকে মাইরা ফালায়। তোমরা যেন ওইদিকে যাইয়ো না।'

আমরা না সূচক মাথা নাড়ালাম।

আমরা সাইকেল চালিয়ে ওখান থেকে চলে আসলাম। গ্রামের ভেতর দিয়ে আসতে গিয়ে অনেকের সাথেই দেখা হলো। কিন্তু কারো সাথেই কথা হলো না। মাটির রাস্তা শেষ হলো। এরপর আইল ধরে এগোলাম পুকুরটার দিকে। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছিল পুকুরটার সীমানা। আমি জানি ওটা পুকুরের পাড়, কিন্তু যে না জানে সে নির্ঘাত ভুল করে একটি গ্রাম ভেবে বসবে। বড় বড় তাল গাছ, খেজুর গাছ মাথা উঁচু করে সীমানার জানান দিচ্ছে। আম, আতা, পেয়ারা ও বড়ই গাছও দেখা যাচ্ছে। আর সব ঘিরে রেখেছে শনের ঝোঁপ। ভেতরে কি আছে তা বাইরে থেকে দেখার উপায় নেই।

ক্ষেতের জমি থেকে পাড় অনেক উঁচু। আমরা সাইকেল টেনে পাড়ের উপরে তুললাম। এ তো পুকুর নয়, দিঘী! আমি তো অবাক। আরেফিন বেশ স্বাভাবিক ভাবেই এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। আমরা একটি পেয়ারা গাছের সাথে সাইকেলকে তালা বন্দি করলাম। তারপর পাড় ধরে হাঁটতে লাগলাম।

আরেফিন একটি ঢিল তুলে আম গাছে ছুড়লো। গাছ ভর্তি কাঁচা আম। এক ঢিলেই তিনটি আম পড়লো। আমাকে দিলো একটি। পরিষ্কার করে একটি কামড় দিতেই আমার দুই চোয়াল এক হয়ে গেল। টক যে এত মারাত্মক হতে পারে, তা জানা ছিল না। কিন্তু সে দিব্যি খেয়ে যাচ্ছে।

কেউ নাই পুকুরে। কেউ মাছ ধরতেও আসেনি। অবশ্য গ্রামের লোকজন শখের বশেই মাছ ধরে। এটা তাদের পেশা না। কিন্তু যারা রাতে মাছ ধরতে যায়, এরা একটু বেশি অ্যাডভেঞ্চারাস! আমরা দুজন আম গাছের নিচে দুটি শিকড়ের উপরে বসলাম। মাছ শিকার যে আমাদের উদ্দেশ্য না, তা নিশ্চয় বলতে হবে না।

'এই পুকুরটা নিয়ে অনেক ভয়ানক গল্প ছড়িয়ে আছে। তোরে কয়েকটা বলি' আরেফিন বলতে শুরু করলো।

'এই পুকুরটার আয়তন  প্রায় ষাট বিঘা। সব পাড় ঘুরে আসতে তোর প্রায় এক ঘন্টা সময় লাগবে। পশ্চিম পাড় দেখে মনে হচ্ছে বেশি জঙ্গলা। আচ্ছা, একটি গল্প হলো। রাতে পুকুর থেকে একটি নৌকা ভেসে ওঠে। নৌকা একা একাই চলে। এরপর ফজরের আগে ডুবে যায়।' সে একটু থামলো।

'আরেকটি গল্প হলো, নুপুরের আওয়াজ শোনা যায়। সাথে খিলখিল আওয়াজ। এগুলো সব পুরনো গল্প, সব বড় পুকুরেই শোনা যায়।  আরেকটি হলো, রাতে মহিষের পালের শব্দ শোনা যায়। মনেহয় মহিষের পাল ওই পাড় থেকে দৌড়ে আসছে। আর ঘোড়ার ডাকের আওয়াজ তো আছেই।...  এখন আমরা পূর্ব পাড়ে বসে আছি। এই পাড়ে অনেক আগে একটা বাড়ি ছিল। তারা বেশি দিন টিকতে পারেনি।' এবার থামলো সে।

আমি বললাম, 'রাতে এখানে মাছ ধরতে আসার কোনো যুক্তি দেখিনা'

'এখানে রাতে কেউ মাছ শিকারে আসে না হয়ত। অন্ততঃ আমি আসতাম না। তাহলে কেন সবাই আসে। একটু খেয়াল করে দেখ, পায়ে হাঁটার পথটা সোজা চলে গেছে। পুকুরের মধ্যে যায় নাই। গরুর পায়ের ছাপ দেখে আবার মহিষ ভাবিস না। হয়ত গরুকে গোসল করায় এখানে। তবে খুব কম।  আমার মনেহয় এই পাড়টা সবাই ব্যবহার করে খালে যাবার জন্য।'

'খাল কি পুকুরের পেছনেই?'

'হ্যাঁ, পুকুর পার হয়ে আরও দশ পনেরো মিনিটের পথ।'

'আমরা তাহলে এখন কি করব?' আমি উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

'আমি বসে বসে ভাবব। আর তুই একটা চক্কর দিয়ে আসবি' আরেফিনের কথা শুনে আমার বুকের ভেতরেই চক্কর দিয়ে উঠলো। সে একটা সিগারেট ধরালো।

আমি উঠলাম। হাতে সিগারেট। দিনে জ্বীন ভুত ঝামেলা করে না। তবুও সিগারেটের আগুন আছে। যত ভুতের গল্প জানি সব মনে পড়তে শুরু করলো। আমি সোজা হেঁটে যাচ্ছি। একটি পরিত্যক্ত পুকুর বলা যায়। কেউ পাতা ঝাড়ু দিতেও আসে না। আর সেখানে কিনা আমি একা হাঁটছি। গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে এই বুঝি মহিষের পাল ছুটে আসলো।

সাহস নিয়েই সামনে আগাচ্ছি৷ একসময় পাড়ের শেষ মাথায় আসলাম।  আরেফিনকে দেখা যাচ্ছে না। আমি শনের ঝোঁপ শেষ করে পাড় থেকে নিচে নামলাম। সামনে উঁচু  ও লম্বা আইল দেখা যাচ্ছে। তাহলে ওটাই খাল। মইন্যা খাল। খালের ওপারে জঙ্গল। ওটাই সেই ভয়ানক জায়গা।  আরও দূরে একটি রাস্তা আছে তা বোঝা যাচ্ছে৷ গাড়ি চলছে। খাল আর পুকুরে মাঝখানে একটি গাছ দেখতে পেলাম। অদ্ভুত গাছ। নাম জানি না। কিন্তু চারটা মাত্র ডাল। আর তাতে কিছু পাতা। ফল বা ফুল কিছুই নেই। এমনকি তার কাছে থেকে ছায়া পাওয়াও দুষ্কর।

আমি আবার আরেফিনের কাছে চলে এলাম। সে আরও তিনটি সিগারেট শেষ করেছে। আমাকে আরেকটি দিল। সে উঠে দাঁড়াল।

'আমরা পুরো পুকুর একটা চক্কর দিয়ে আম্বইল গ্রামে যাব। সাইকেল এখানেই থাকবে'

৫.
আমরা হাঁটছি পাড় ধরে। ওর কথাটা সঠিক। পূর্ব পাড়েই শুধু পায়ে হাঁটার পথ আছে। উত্তর পাড়ে পেলাম না। আমরা উত্তর পাড় শেষ করে পশ্চিম পাড়ে উঠলাম। এটা আরও গাছ গাছালিতে ভরা।

আমার সত্যিই ভয় করছিল। কিন্তু আরেফিন যেন কিছু খুঁজে চলছিল। কিন্তু আমার চোখে তেমন কিছু পড়লো না। তবুও সে খুঁজে চলেছে।

অনেকক্ষণ খুটিয়ে খুটিয়ে দেখার পর অবশেষে আমরা পশ্চিম পাড় শেষ করলাম। দক্ষিণ পাড়ে আমরা আর গেলাম না। পশ্চিম পাড় থেকেই নেমে পড়লাম। আইল ধরে চলেছি, উদ্দেশ্য আম্বইল গ্রাম। আমার ধারণা ভুল না হলে, আলমের বাড়ি যাচ্ছি৷

আমরা আম্বইল গ্রামের পেছন দিয়ে উঠলাম। প্রথমেই পড়ল বাঁশ ঝাড়। সরু হাঁটার পথ ধরে আমরা এগোচ্ছি। প্রথম যে বাড়িটা সামনে পড়লো, সেখানে কেউ আমাদের সামনে পড়লো না। যে কয়জনকে দেখলাম তাদের সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত। আমরা চার বাড়ি অতিক্রম করে অবশেষে আলমের বাসাতে আসলাম।

গতকাল এখানেই অনেক লোকজন ছিল। আজ এখানে কেউ নাই। ঘরের মধ্যে থেকে মৃদু কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। বাড়ির চারপাশ অগোছালো। সব যেন স্থবির।

আরেফিন এবার সরাসরি ঘরের দিকে এগোলো।  আমিও তার পেছনে। দরজায় দাঁড়িয়ে বলল, 'কেউ একজন একটু বাইরে আসবেন?'

কান্না ছাড়া কোনো শব্দ বা কথা শোনা গেল না। একটু পরে আরেফিন আবার দরজায় টোকা দিল। একজন বয়স্ক মহিলা দরজা খুললেন। আরেফিন সালাম দিল।

'গতকাল আমরা এখানে ছিলাম। আপনাদের এ ক্ষতি পূরণ হবার না। আর সবার মত কি আপনারাও মনে করেন এটা জ্বীনের কাজ?'

মহিলাটা সম্ভবত আলমের শাশুড়ী। চোখে পানি টলমল করছে। আঁচল দিয়ে চোখ মুছে আমাদের বললেন, 'বিশ্বাসের কিচ্ছু নাই। আর তো ফেরত আসপি না। তোমরা কি তারে চিনতা?'

'হ্যাঁ, আমাদের প্রায়ই চা-স্টলে দেখা হত। আমরা পাশের গ্রামে থাকি৷ আপনাদের খাবারের ব্যবস্থা কিভাবে হচ্ছে?'

'কি আর খামু বাপ? সবই তো গেছে গা।'

এমনসময় একজন মহিলা গামলা ভরে ভাত ও তরকারি নিয়ে আসছেন। আমাদের দিকে তাকালেন। ঘোমটা দেবার চেষ্টা করলেন।

'চাচী, আপনি নিজে হাত মুখ ধুয়ে নিন। সবাইকে খাওয়ান। বাচ্চারাও কাঁদছে। তাদের কিছু খাওয়ান।' আমি বললাম। মহিলা একটু ধাতস্থ হলেন। খাবারের গামলা হাতে নিতে যাবেন। এমন সময় আরেফিন গামলাটা নিজের হাতে নিয়ে নিল।

'চাচী, আপনি সরেন। আমি রাখতাছি। আপনি বাচ্চাদের ও ভাবিকে নিয়ে মুখ ধুয়ে আসেন।' বলতে বলতে সে ঘরের ভেতর তরতর করে ঢুকে গেল। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সবাই অবাক হলো, আমিও অবাক। যিনি খাবার দিতে এসেছিলেন, তিনি কিছুক্ষণ আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে তারপর চলে গেলেন। চাচীও ভেতরে ঢুকে গেলেন, আমি বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম।

দুই মিনিট পরেই আরেফিন ফেরত এলো। তার মুখে রাজ্য জয়ের হাসি। আমি কিছুই বুঝলাম না। আমার হতভম্বতা দেখে, সে হয়ত আরও মজা পেল। 
এরপর হনহন করে হাঁটতে লাগলো। আমিও তার পিছু হাঁটছি।

'মাটির ঘরের দরজার খিলান বিভিন্ন রকমের হয়। আমি তিন রকমের দেখেছি। তবে এই দরজার খিলান হলো ভাইপারের মত। এক পাল্লার কাঠের অংশ অন্য পাল্লার কব্জার মধ্যে আটকে যায়। আর তাতেই দরজা আটকে থাকে।' আরেফিন বলে থামলো। তারপর বলল, 'এই খিলান বাইরে থেকেও লাগিয়ে দেয়া যায়। ধর, আমার ডান হাত হলো খিলানের একটি পার্ট। এটা চক্রাকারে ঘুরতে পারে। আর বাম হাত হলো কব্জা বা খাপ। যেখানে ডান হাতটা পড়ে আটকে যায়। এখন ডান হাতটা আমি উপরের দিকে আলতো করে তুলে বাম হাতের কব্জার দিকে হালকা ঝুকিয়ে রাখলাম। এখন একটু দরজাটা নড়িয়ে দিলেই ডান হাতটা সোজা গিয়ে বাম হাতের কব্জায় আটকাবে। ব্যাস, বাইরে থেকেই ভেতরে দরজাটা আটকালাম'

'তাতে কি হলো?' আমি কিছুটা এলোমেলো ভাবে বললাম।

'গ্রামের লোকজন ওই খিলানের উপরে ভরসা করে না। তারা দরজার দুই পাশের দেয়াল গর্ত করে বাঁশ ঢুকিয়ে রাখে। যাতে দরজা আরও শক্তভাবে বন্ধ হয়।'

'হ্যাঁ,  তো।' আমার কথা শুনে আরেফিন দাঁড়াল।

'ভেতর থেকে যদি শুকনো বাঁশের সাপোর্ট দিয়ে দরজা আটকানো থাকতো, তাহলে ওই দরজা ভাঙতে বা কাটতে হতো। কিন্তু দরজা ভাঙতে হয় নাই। কিন্তু দরজা ভেতর থেকে খিলান দেয়া ছিল। কোনো বাঁশ দেয়া ছিল না। আর গ্রামে এমন কাজ কেউ করে না। আমি কব্জাটা দেখেছি, সেটা ভাঙা'

'তার মানে?'

'ইট’স আ ওয়েল প্ল্যানড্ মার্ডার'

৬.

আরেফিনের কথা মত আমরা একজন নির্ভেজাল সহজ সরল মানুষকে খুঁজছি। যার কাছে অন্য তথ্য আছে এবং সে আমাদের কোনো পাল্টা প্রশ্ন বা সন্দেহ করবে না। মাটির রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে একটি আম গাছ তলায় একজন বয়স্ক মানুষকে দেখলাম, তিনি কাঁচা বাঁশ কেটে কিছু একটা বানাচ্ছেন।

আমরা এগিয়ে গেলাম। আরেফিনই প্রথম জিজ্ঞেস করলো, 'এগুলো কি বানাচ্ছেন, চাচা?'

লোকটি অনেক পুরনো একটি চশমা পড়ে আছে। তার ঘোলা গ্লাসের ভেতর দিয়ে আমাদের দিকে তাকালো। বলল, 'মাছ ধরার চাঁই বানাচ্ছি।'

বলার পর আবার তার কাজে মনযোগ দিল।

'আমরা মাছ ধরতে চাই। খুব শখ। সবাই বলছে ছেইচ্যা পুকুরে ভাল মাছ আছে। ওখানে কি মাছ ধরতে দেয়?'

'তুমরা কোন গেরামের?'

'আমরা গ্রামের না, শহরের। তিনমাথায় চা-স্টলে বসে মাছ ধরার গল্প শুনলাম। মেঘডুম্বুরের অনেক গল্প শুনলাম। তাই মেঘডুম্বুর দেখতে যাচ্ছি।' আরেফিন তার সামনে বসে বলল।

'মাছ ধরা মেলা ধৈর্যের বেপার। তুমরা কি তা পারব্যা?' তার যথেষ্ঠ সন্দেহ আমাদের ধৈর্য্য নিয়ে।

'চাচা, নানান ভয়ের কথা শুনি। এসব কি সত্যি? '

'হ, সবই সত্যি। সবাই কিছু না কিছু দেখছেই। আমিও দেখছি।'

'বলেন কি? একটু বলবেন?'

'কয়েক বৎসর আগের কথা' কাজ বন্ধ রেখে লোকটি আমাদের দিকে পূর্ণ মনযোগ দিল। 'আমি মইন্যা খালে যাচ্ছি মাছ মারতে৷ মেঘডুম্বুর পুকুর পাড় দিয়া যাচ্ছি। হঠাৎ কইরা দেখি এককান ঘিয়া রঙের শাড়ি পইরা মহিলা খাঁড়ায় আছে। আমিও খাড়াইলাম' লোকটা থামলো, একটা বিড়ি ধরালো।

তারপর আবার বলতে শুরু করলো,'আমার এক হাতে টর্চলাইট আরেক হাতে আগুন। টর্চ মারতেই দেখি তার পা নাইকা। মাটিত ভাসতাছে। আমার দিকে আইসতে লাগিচ্ছিলো, আমি পিছনে সরিচ্ছিলাম। সরতে সরতে পাড়ের শেষ মাথাই আচ্ছি। কিন্তু পেছন ঘুরি নাই। পেছন ঘুরলেই ঘাড় মটকায় দিত। তারপর দুইদিন আমার জ্বর আছিল। আজও ভুলি নাইকা সেই কাহিনি।'

'হাতে বিড়ি থাকায় আপনার অনেক উপকার করেছে।'

'হ, আগুন ছাড়া তো চলি না আমরা। তুমরা ওদিক যাইয়ো না বাবারা।'

'চাচা, আলমকে কি এই ভয়ই মারছে। ও তো মেঘডুম্বুরেই গেছিলো?' আরেফিন বলল

'না, ও মেঘডুম্বুরে যাইয়া মরে নাই। ও গেছিলো মইন্যা খালের ওই পাড় আড়া জঙ্গলে। ওই খানে মেলা মাছ আছে। মইন্যার সব মাছ তো ওইখানেই থাকে। সব্বাই লোভ করে কিন্তু যাইতে চায় না। ও আর মালেক গেছিলো। দুইজনই মরলো।'

'দিনেও যায় না?? আর মালেক কবে মরলো?'

'দিনের বেলাতেও যায় না। মালেক তো দুই মাস হবি।'

'চাচা, আপনি কখনো গেছিলেন?

'না, যাই নাইকা। তয়, নাও নিয়া যাইবার সময় ওইদিক তাকাইছিলাম। গাছের ফাঁক দিয়া দেখছিলাম, একখান বড় গুদি আছে। ভরা কালে সব মাছ ওটি থেকে খালে আসে।'

'চাচা, আপনাদের গ্রামে ডাকাতি হয় নাই কখনো?'

'কও কি। ডাকাইতের অইত্যাচারে ঘুমাই নাই কেউ। গেল বৎসর খুব ডাকাতি বাড়ছিল। আমরা তো রাইতে লাঠি শোটা নিয়া পয়রা দিতাম।'

আমি আরেফিনের কানে ফিসফিস করে বললাম, 'পয়রা আবার কি?' সে কানের কাছে আস্তে বললো, 'পাহারা'। আমি বুঝলাম আগুন মানে বিড়ি আর পয়রা মানে পাহারা!

'ডাকাতি হইছিল এই গ্রামে?'

'না, তয় বিশ্বা, দিঘলাভিটা, বালান্দা ওইসব গ্রামে হছিলো। মাইনষেও মরছিল কয়েকটা।'

'চাচা মিয়া, কোন গ্রামে ডাকাত আছে?' প্রশ্নটা শুনে  কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো আমাদের দিকে। তারপর বলল,

'সব ডাকাইত তো সরদার পাড়া। আর যারা ছুইটকা ফুইটকা তারা হম্বি তম্বি করে, কিন্তু পার পায় না।'

আমি আরেফিনের দিকে তাকালাম, সে বলল 'ছোটো খাটো' আর তারা ডাকাতি জমাতে পারে নাই।'

'ঠিক আছে চাচা। অনেকক্ষণ কথা হলো আপনার সাথে। ভাল থাকবেন'

আমরা ওখান থেকে উঠে চলে এলাম। একটা বড় আম গাছের তলায় দাঁড়ালাম। আরেফিন কিছুটা চিন্তিত। আমি অনেক প্রশ্ন জমা রেখেছি। কিন্তু তাকে জিজ্ঞেস করব কিনা, বুঝতেছি না। সে আমার অবস্থা বুঝতে পেরে নিজে থেকেই বলল,

'ডাকাতদের মধ্যে যদি দ্বন্দ্ব থেকে কাউকে মারার প্রয়োজন হয়, তবে তারা প্রকাশ্যেই গলা কেটে করবে। বন্ধ ঘরে খুন করে পালাবে না। কারণ তার দাপট প্রকাশ করার বিষয় আছে৷ আমি ডাকাতদের সন্দেহের তালিকায় রেখেছিলাম। এখনো রাখছি।'

'আমাদের প্রাইমারি সাসপেক্ট কারা? আমরা তো সন্দেহ করার মত কোনো লোকই পাচ্ছি না।' আমি কিছুটা হতাশ।

'চোর-ডাকাই আমাদের প্রাইমারি সাসপেক্ট। আর তার পরিবারের লোকজনও আছে। সহায় সম্পত্তির বিষয় আছে। পরকিয়ার বিষয় আছে। আর আছে কোনো একটা চক্র। কারণ বন্ধ ঘরে একা খুন করা সম্ভব না। কারণ ঘরে স্ট্রাগলের কোনো চিহ্ন নাই। তারমানে এখানে দুটা বিষয় স্পষ্ট, যারা তার ঘরে এসেছিল তাদের আলম চিনতো। এবং দ্বিতীয়ত, তাকে অজ্ঞান করা হয়নি। তা করা হলে, আমি কোনো চিহ্ন পেতাম।' আরেফিন শেষ করলো।

'তারমানে দুইজন তার হাত পা চেপে ধরেছিল। কিন্তু বাঁধেনি। আর একজন বালিশ চাপা দিয়েছে।'

'দারুণ। ওভাবে চাকু মারলে কেউ চিল্লাবে না, আর চিল্লালে কেউ শুনতে পাবে না। তা আমি বিশ্বাস করি না৷ তাই আগেই বলেছিলাম, মেরে ফেলার পর চাকু দিয়ে যখম করা হয়েছে।

'জখমটার ধরন দেখলে বোঝা যেত চাকুটা কেমন ছিল। আর কারা সেটা ব্যবহার করে' আমি বললাম

'তোর তো দেখি মাথা আপনা-আপনিই কাজ শুরু করেছে। কাহিনি কি?'

'এক কাজে দুই মাথা ব্যবহারের দরকার আছে?' বলার পর দুজনই হাসলাম।

'শোন, ওই বাসার চারপাশে আমরা কোনো কিছু পর্যবেক্ষণ করতে পারব না। করলে হয়ত অনেক কিছুই পেতাম। এখন আমার দুটা হাইপোথিসিস আছে। এক, সে কোনো একটি দলের সঙ্গী; যাদের অন্তর্দ্বন্দের জেরে তাকে হত্যা করা হয়। দুই, সে এমন কিছু জেনে ফেলেছিল যার কারণে তাকে হত্যা করা হয়। হয়ত সে ওই নিষিদ্ধ জায়গাতে যায়নি। কিন্তু সুন্দরভাবে প্রচারণা করা হলো, সে মইন্যা পুকুরর যাওয়ার কারণে জ্বীন এসে মেরে গেছে।' আরেফিন একটানা এতগুলো কথা বলে গেল।

'আমি তাহলে দেখি কারা প্রথম আবিস্কার করলো সে মারা গেছে।' আমি বললাম

'নাজুক! গুড পয়েন্ট।' আরেফিন প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে আমাকে দিল। আমরা দুজন আলাদা হয়ে গেলাম।

৭.

আমি মাটির রাস্তা ধরে হাঁটছি। উদ্দেশ্য কাউকে ধরে কোনো তথ্য বের করা। অবশেষে একটি মুদির দোকান পেলাম। ঘরের মধ্যেই দোকান। জানালা দিয়ে কেনা বেচা হয়। জানালার উপরে লেখা 'ভবানী স্টোর'। আমি এগিয়ে গেলাম। ভেতরে একজন বসে আছে বোঝা যাচ্ছে,  কিন্তু চেহারা বোঝা যাচ্ছে না। বাইরে অনেক রোদ আর লোকটাও মনেহয় কালো বর্ণের।

'চাচা, ম্যাচ হবে?' আমি সিগারেট হাতে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

'এই নেন' লোকটি একটি ম্যাচ বক্স এগিয়ে দিল।

'মেঘডুম্বুর পুকুরে মাছ ধরতে আসছিলাম। অনেক গল্প শুনছি। কিন্তু কালকে একজন মারা গেছে শুনে তো ভয় লাগতেছে।'

'ভয়ের কিছু নাই। ম্যাঘডুম্বুরে কুনু ঝামেলা করে না। ঝামেলা করে মইন্যা পুকুরে। মইন্যা খালের মধ্যিখানে মইন্যা পুকুর।' এ এক নতুন গল্প শোনালো লোকটা। খালের মধ্যে পুকুর!

'ওই লোক কি ওখানে গেছিলো?'

'হ্যাঁ'

'আপনারা নিশ্চিত হলেন কেমনে? কেউ দেখছে ওখানে যেতে?'

'না, আমরা দেখি নাইকা৷ তয়, রইছ কইছিল। ওর সাথে নাকি আগের দিনকা রাতে কথা হইছিল।'

'আপনারা কখন বুঝলেন লোকটি মারা গেছে?'

'সকাল আটটার পরেও যখন আলম দরজা খুলে নাই, তখন গিয়া দরজা ভাঙছে।'

'কারা ভাঙছে?'

'রইছ আর আলিম। আমরাও আছিলাম'

'ওহ, আচ্ছা চাচা থাকেন। সবাই পুকুরে অপেক্ষা করছে। আমি ম্যাচ কিনতেই আসছিলাম।' টাকা দিয়ে আমি মেঘডুম্বুরের দিকেই ফিরতে লাগলাম। যাতে লোকটা সন্দেহ না করে।

গ্রামে মাঝেমধ্যেই পুলিশের লোকজন হানা দেয়। নানান তথ্য নেবার জন্য। বিশেষ করে ডাকতদের ব্যাপারে। অথবা কোনো আসামীকে ধরার জন্য। গ্রামের সাধারণ মানুষজন খুব ভয় পায় বাইরের লোক দেখলে। জানিনা আমাকে তারা বাইরের লোক ভাবছে কিনা। ভাবলে অবশ্য দোকানদার এত কথা বলতো না। তো এই পুলিশের আসামী ধরার জন্য দেয়া রেইডকে তারা আবার 'আন্দোলন' বলে। এটা জানতে পেরেছিলাম সিরাজগঞ্জ গিয়ে। এখানে কি বলে জানিনা।

আমি নতুন তদন্তের আর কিছু পেলাম না। রইছ শুধু জানতো আলম মইন্যা পুকুরে গেছে। একবার ভাবছি আলমের বাসায় গিয়ে জেনে আসি। কিছুক্ষণ ভাবলাম, যাব কি যাব না। অবশেষে আলমের বাসার দিকেই এগোলাম।

বাসা আগের মতই নীরব। শুধু ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্নার আওয়াজ আসছে। কোনা জড়তা না রেখেই ঘরের দরজার কাছে গেলাম। ডাক দিলাম, 'চাচী একটু বাইরে আসবেন। কিছু কথা বলতাম।'

একটি মহিলা বের হয়ে এলো। সেই তিনিই। তাকে বললাম, 'চাচী, আমরা মাছ মারতে যাব এটা আলম ভাই জানতো। তার হঠাৎ এভাবে মৃত্যু মেনে নিতে পারছি না। তাই বারবার আপনাদের বিরক্ত করছি। কিছু মনে করবেন না।'

'মরা বাড়িত বাইরের লোক আসলি যে মাইনষে ভাল কয় না বাবা।' চাচীর স্বরটা একটু নরম হয়েছে

'একজন লোককে এভাবে কেউ মেরে ফেলবে, সে জ্বীন হোক আর মানুষ হোক, তাকে তো ছাড়া যায় না। আপনারা যদি একটু সাহায্য করতেন, তাহলে আমরা অনেক প্রশ্নের উত্তর বের করার চেষ্টা করতাম।'

'পাইরবা না বাবা। তুমরা এইখান থাইকা যাও। তুমাদেরও ক্ষতি হবি।'

'আপনি অনেক কিছু লুকাচ্ছেন। আপনি কিছু জানেন। আমাকে বলেন, কিছু হবে না।'

'দেখো, যে জ্বীন ঘরে আইসা মারে, সে আমাদের কথাও শুনতাছে৷ সে তুমার ক্ষতি করবি।' কার মধ্যে কি! আমি ভাবলাম কোনো মানুষ এর পেছনে আছে, আর তিনি কিনা জ্বীনের কাহিনি বলতেছেন।

'আমার বড় আব্বা কবিরাজ। কবিরাজ ইসমাঈলের নাম শুনছেন? তিনি আমার আত্মীয়। এসব জ্বীন ফিন আমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।' চাপাটা মনেহয় কাজে দিল। মহিলা একটু ভড়কে গেলেন। একটু এগিয়ে এলেন আমার দিকে।

'ইসমাঈল কবিরাজ তুমার আত্মীয়?  বলো কি বাবা। উপরার সমস্যার কারণে কতুবার যে গেছি। তুমি বসো বাবা, ঘরে আসো।'

কবিরাজের আত্মীয় শুনে এমন আতিথেয়তা পাব ভাবিনি। আরেফিন আগেই ঘরের মধ্যে গিয়েছিল। আমার আর যাওয়ার দরকার নাই। আমি রান্না ঘরের পাশ দিযে পেছনের বাঁশঝাড়ের দিকে এগোলাম। আমার পেছনে চাচীও আসলো।

'আপনার জামাই হয়, তাই না?'

'হুম'

'রইছকে চেনেন?'

'টাউট পোলা একখান। সারাদিন ডো ডো করে ঘুইরা বেড়ায়। কুনু কাজ করে না?'

'আপনার জামাই কি করতো?'

'জমি আছিল। তাই আবাদ কইরতো। আর মাছ মাইরা যা হয়, তাই খাইতো।'

'অভাব আছিল না?'

'না, বাপ।

'আপনার মাইয়া তো সব পাইবো এখন?'

'ভাগী শরিরা আছে না বাবা? ওরাই সব নিবিনি।'

'কয় ভাই বোন?

'চার ভাই তিন বুন। সবারই তো লাভ হইলো। আমার মাইয়ার তো দুইটা বিটি। সম্পত্তিও তো পাবিনি না। এই ঘরটাই যদি দ্যায় তো দিলো, না দিলে বিটিক নিয়া চইলা যামু।'

'রইছের বাড়ি কোনটা?'

'উই যে, কাঁঠাল গাছ তলা। উইটাই বাড়ি।'

'আচ্ছা চাচী আসি আমি। ভাল থাকবেন৷ আর কবিরাজ বাড়ি এলে আমার সাথে দেখা কইরেন। দুই বাড়ি পরেই আমার বাড়ি।'

আমি দ্রুত বিদায় নিয়ে রাস্তায় আসলাম। হাত ঘড়িতে দেখলাম একটা বাজে। সূর্য মাথার উপর আগুন ঢালছে৷ রোদের নিচে থাকতেই পারছি না। রইছের বাড়ির দিকে এগোলাম। বাইরে কোনো মানুষ নাই। হয় সবাই ঘরের মধ্যে গরমের কারনে আছে, নয়ত সবাই ক্ষেতে গেছে।

রইছের বাড়ির বাইরে গিয়ে আঞ্চলিক ভাসাতেই জিজ্ঞেস করলাম, 'রইস আছো নাকি বারে?'

একটা নারীর আওয়াজ আসলো, 'নাই'

'কুন্টি গেছে বারে? কয়া গেছে নাকি?'

'না, তাস খেইলবার গেছেগা। আফনেও যানগা!'

হঠাৎ আমার এমন ঠোঁটকাটা বিদায় হবে ভাবিনি। তবে এটা বুঝলাম রইছকে যারা খুঁজতে আসে, তারাও রইছের মত টোট মানে টাউট!

ওখান থেকে বেরিয়ে আরেফিনকে ফোন দিলাম। তার কোনো খোঁজ নাই। সে কেটে দিল। একটু পর মেসেজ আসলো।

'তোর সাইকেল নিয়ে বাড়ি চলে যা। আমার আসতে দেরি হবে। একসাথে খাব!'

কিছু বুঝলাম না। তার এমন একক তদন্ত করতে হবে ভাবিনি৷ আর কিসের তদন্ত, কোনো ধুন্ধুমার এ্যাকশন নাই। একদম সাদামাটা রহস্য। দরজা বন্ধ ঘর থেকে লাশ উদ্ধার। এর চেয়ে বেশি আর কি আছে? আমার নিজেরও বিরক্ত লাগছে। আসলে এত গরমে তদন্ত হয় নাকি? শীতপ্রধান দেশেই কেন এত খুন খারাপি হয় তা এখন টের পাচ্ছি। ওরা বেশ আরাম আয়েশে হত্যার পরিকল্পনা করতে পারে। কোনো গরম লাগে না। ভেতরের গেন্জি ও অন্তর্বাসও ঘেমে চপচপে হয় না!!

গোয়েন্দাও পেগের পর পেগ মদ মেরে দিয়ে তদন্ত চালায়৷ শালার গরমে সিগারেটটাও খেতে ইচ্ছে করছে না৷ রাগ করে আরেকটা ধরালাম। রাগটা অবশ্য আরেফিনের উপর, আমারে একা ওই ভুতুরে পুকুরে যেতে বলছে। হারামির না হয়, ভয় ডর নাই। আমার তো আছে। মনে চাচ্ছিল জেসমিনকে ফোন দিয়ে বলে দিই আরেফিন এখন কোথায় এবং কি করছে। মেয়েটা তো জানে সে আরামে নানার বাড়ি খাচ্ছে দাচ্ছে ঘুমাচ্ছে। সে যে তীব্র রোদের মধ্যে ঘুরছে এবং আমাকেও ঘুরাচ্ছে, এটা তো সে জানে না।

ধানি জমির মাঝখানের আইল ধরে পুকুরের দিকে যাচ্ছি। নানান চিন্তা মাথায় আসছে। কোনো বুড়ি হয়ত দাঁড়ায় আছে, অথবা কোনো নৌকা একাই পুকুরে চলছে। অথবা কোনো গাছ ভেঙে মাটিতে পড়ে আছে, আমি গাছের কাছে গেলেই আকাশে নিয়া ছুঁড়ে ফেলবে। যতই শান্ত থাকার চেষ্টা করছি। ততই বাজে চিন্তা আসছে।

অবশেষে পুকুরের পাড়ে উঠলাম। এবং যথারীতি ভয়ানক একটা কান্ড ঘটলো। লুঙ্গি পড়া মোটা সোটা এক অর্ধ উলঙ্গ লোক, বড় বাঁকানা দা হাতে দাঁড়িয়ে আছে। পায়ের দিকে খেয়াল করলাম। যাক, সে ভুত না। পা আছে এবং সোজা।

'দা নিয়া কি করবেন?' আমিই যেচে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম

'তুমি কেডা? এখানে কি কইরবার আইচ্ছো?' এত জবাব দিতে তো আর ভাল লাগে না। সে তীক্ষ্ণ চোখে আমার দিকে তাকালো।

'আচ্ছিলাম মাছ মাইরতে। লাগলো পানি ঠিসা। তাই পানি খাইতে গেছিলাম' পুরাই আঞ্চলিক মেরে দিলাম। 'আরেকজন গোসল করতেছে, এত গরম পড়ছেরে বাবা। পুকুরে নামার সাহসই হলো না'।

'ভালই তো কথা কচ্ছো বারে। এখান থিকা যাও। আমি গাছের ডাল কাটমু। ভয় টয় পাও নাই তো।'

'কিসের ভয়। স্কুলে ইয়ার ডিমোশনের ভয় যারে কাবু করতে পারে নাই, তার আবার ভয় কিসের?' কি বলছি আর না বলছি জানি না। গরমে নাকি ক্ষুধায় আমার কথার ফুলঝুরি ফুটছে, জানি না। শুধু ইচ্ছে করছে এখান থেকে গিয়ে শাওয়ারের নিচে বসে থাকতে।

আমার সাইকেলটার তালা খুলে আরেকটায় আর তালা দিব কি, চাবি তো ওর কাছে নাই। লোকটা কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বলে ফেললাম, 'তালুকদারের নাতির সাইকেল ওটা। একটু দেইখেন।' নাপাকটা সবসময় তালুকদারি দেখায়, দেখি এবার তোর তালুকদারি সাইকেল বাঁচাতে পারে কিনা!

আমি ওখান থেকে বেরিয়ে আসলাম। আবার আইল ধরে হাঁটতে হবে ভেবে আমার মেজাজ আরও বিগড়ে গেল। এরপর শুধু সাইকেল চালিয়ে নানা'র বাসায় আসলাম। এতটুকুই বলার মত।

গোসল দিয়ে খাইলাম। নানী জোর করে খাওয়ালেন। আরেফিনকে তারা ভাল করেই চেনেন। নানা'র বাড়ি আসলে এমনও দিন গেছে সে নাকি নানা'র বাড়িতে ভাতই খায়নি। কারণ গ্রাম ভর্তি তার আত্মীয়, সবাই ডেকে নিয়ে তাকে খাওয়ায়। তাই আরেফিনের না ফেরাতে তারা চিন্তিত নয়। বরং তারা এতে অভ্যস্ত।

বিকেলে আরেফিন আসলো। গোসল করে আমার কাছে বসলো। নানী শরবত দিয়ে গেছেন। আমার মেজাজটাও একটু ঠান্ডা এখন। আমি সব খুলে বললাম, আমি কোথায় কোথায় থেকে কি কি জেনেছি।

সে হো হো করে হেসে বলল, 'সাব্বাস! দারুণ কাজ করেছিস। তুইই তো সব সমাধান করে দিলি রে!'

আমি কিছুই বুঝলাম না। কাজের কাজ তো কিছুই করিনি।

'কাল সকালে সব ফয়সালা করব। মনেহয় পেয়ে গেছি খুনিকে।  এখন ঘুমিয়ে নে, রাতে মইন্যা খালে যেতে হবে।'

এটা শুনে আর ঘুম আসে!

৮.

কিসের ঘুম? সারা বিকেল ওকে শুধু জিজ্ঞেস করেছি খুনী কে, তা জানাতে। সে হেসেছে আর বলেছে, 'সবুর কর, দেখতে পাবি।'

যখন বুঝলাম সে বলবেই না, তখন তাকে জিজ্ঞেস করলাম পাঁচ ঘন্টা সে কি করেছে? সে এবার কোল বালিশে ঠেশ দিয়ে আয়েশে বসে বলা শুরু করলো।

'আমি তোকে রেখে সোজা চলে গেলাম ওই চা-স্টলে। সিগারেট খেতে খেতে কথা বললাম দোকানদারের সাথে। সে জানালো আগে আলম খুব বাঁকি খেতো। এখন আর বাঁকি থাকে না। কারণটা জানলাম তারা নাকি রাণীরহাটে একটা ব্যবসা শুরু করছে। রানীরহাট হলো বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও নাটোরে মিলনস্থলের একটি এলাকা, যেখানে বিরাট হাট বসে। তো, দোকানদার নিজে দেখেছে একদিন খুব ভোরে ট্রাক থেকে নামতে। এরপর আমি গেলাম রাস্তার উপরে যারা বাসা করে, তাদের একজনের কাছে। তার কাছে থেকে গাড়িতে হেলপারি করে এমন একজনের খোঁজ পেলাম। ভাগ্য ভাল ছিল, তাকে পেয়েও গেলাম। সে জানালো সিংড়া-নাটোর রোডে ইদানিং খুব ডাকাতি হচ্ছে শুধু ট্রাকে। ধান, চাল বা ভুট্টার ট্রাক ওই রোডে গেলেই আর পাওয়া যায় না। পরে খালি ট্রাক অন্য কোনো জেলার টার্মিনালে পাওয়া যায়। এই ভয়ে তারা লং রুটে গাড়ি চালাচ্ছে না। আমি হিসেব মেলালাম, আলমও ট্রাক থেকে নেমেছে। সে হয় ট্রাকে থাকে নয়ত ট্রাক ডাকাতিতে তার হাত রয়েছে। ট্রাক ডাকাতির নিউজটা কিন্তু সব পত্রিকায় এসেছে' এতটুকু বলে আরেফিন থামলো।

'তাহলে কি সে ডাকাতি করতো?' আমি জিজ্ঞেস করলাম৷

'বলছি, তারপর আমি সিংড়ায় ফুপাতো ভাইকে ফোন দিলাম। সে জানালো তাদের একটি ধান বোঝাই ট্রাক সিংড়া থেকে কুষ্টিয়া যাচ্ছিল, কিন্তু হরিষপুর বাইপাস পার হবার পর আর খোঁজ পায় নাই। পরে পাবনা টার্মিনালে ট্রাক পায়। কিন্তু ড্রাইভার ও হেলপার আজও নিখোঁজ। সে আরও জানালো এমন তিনটা ঘটনা তাদের থানায় লিপিবদ্ধ আছে।' আরেফিন কাত ঘুরে আবার বলা শুরু করলো

'প্রথমে সবাই ভাবতো ড্রাইভাররা এই ডাকাতি করতো। কিস্তু যখন তাদেরও খোঁজ পাওয়া গেল না, তখন সবাই হকচকিয়ে গেল। সিংড়া, বনপাড়া, নন্দিগ্রাম ও তাড়াশ থানার পুলিশ হন্যে হয়ে এর রহস্যজট খোলার চেষ্টা করছে। কিন্তু আজও তারা রহস্যভেদ করতে পারে নাই। কিন্তু ডিটেকটিভ জীবন, তোমার জন্য এই রহস্যটা সমাধান হয়ে গেল!' আরেফিন হাসলো। আমার মনে হলো সে টিটকারি দিচ্ছে।

'আমি এটা জানার পর সরাসরি পাকা রাস্তায় চলে আসলাম। কিন্তু রাস্তার কোনো ক্ষতি হয় নাই। তুই আমার বড় খালার বাসায় গেছিস, তাদের এলাকাটা ধান-চালের মিলের এলাকা। রাস্তা কত খারাপ। তাহলে এই রাস্তায় ভারি কোনো যান চলাচল করে না। কিন্তু আমার এ ধারণা ভুল পরে বুঝলাম। আমি গেলাম সরদার পাড়ায়। ডাকাতদের আস্তানা৷ কিন্তু গিয়ে অবাক। সবার মধ্যে আমূল পরিবর্তন। তারা কেউ আর ডাকাতি করে না। গত বছর ডাকাতির রব ওঠায় পুলিশ এসে পুরো গ্রাম ঠান্ডা করে দিয়েছে৷ অন্য গ্রামগুলোও তাদের একঘরে করে দিয়েছিল, তারা হাট-বাজার করতে পারতো না। কিন্তু তারা বরাবরই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এগুলো জানলাম জামসেদ চাচার কাছে থেকে। এটাও জানলাম তারা সন্দেহ করে আম্বইল আর ভিটাকাটার মানুষদের। তারা নতুন নতুন ডাকাত তৈরি করছে। সাথে যোগ হয়েছে কিছু নেশাখোরেরা। মালেক ডাকাতির সাথে থাকলেও থাকতে পারে কিন্তু আলম ডাকাত নয়'

'ওই ট্রাক ডাকাতির সাথে এখানে কোন লিংক আছে'?

'হ্যাঁ, সব যুক্ত একটার সাথে আরেকটা। আমি কালাম মামাকে ফোন দিলাম বাইকটা আনতে। বাইকে করে রায়গঞ্জ-সিংড়া-তাড়াশ রোডে গেলাম। এটা মেইন রোডের মতই। কিন্তু মেইন রোড না৷ এই রোডের পাশে বেশ কিছু ইন্ডাস্ট্রি হয়ে গেছে। তুই গেলে অবাক হবি। একদম ধুধু ফাঁকা মাঠ ছিল। এখন বিল্ডিংয়ে ভরে গেছে। রাইস ব্র্যান ওয়েল, এগ্রো ফুড আরও কয়েকটা ইন্ডাস্ট্রি দেখলাম। কিন্তু সন্দেহজনক কিছুই পেলাম না। কিন্তু আমার বিশ্বাস, ট্রাক ভর্তি ধান-চাল গায়েব করে দিতে অবশ্যই বড় গোডাউন দরকার। আর দরকার দুর্ধর্ষ একটা ডাকাত দল। আবার লোড-আনলোডের ব্যাপার আছে।' আরেফিন থামলো।

আমি শিশুর মত চেয়ে ওর কথা শুনছি। ঘটনা ছিল কোথায় আর গেল কতদূর। আমি শুধু বললাম, 'তারপর'

'আমি বাইক দ্রুত টেনে তাড়াশের বর্ডারে রাণীরহাট বাজারে গেলাম। ওখানে বড় ফুপার দোকান। তার কাছে তথ্য পেলাম, বনপাড়া ও হরিষপুরের মাঝামাঝি জায়গায় সাদা স্কচস্টেপ দিয়ে পেঁচানো একটি লাশ গতকাল পাওয়া গেছে। দেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন নাই। লাশটার পরিচয় এখনো পাওয়া যায়নি। এবং কোনো পরিচয় পত্রও ছিল না। একদম ক্লিন একটি বডি। পুলিশ পুরাই দিশেহারা। তারা রাতে টহল বাড়িয়ে দিয়েছে। মোটামুটি তিন উপজেলার পুলিশ প্রতিনিয়তই পেট্রলিং করছে। কিন্তু কিছুই লাভ হচ্ছে না। আর তাড়াশে এমন ডাকাতির ঘটনা আছে চারটি।' আরেফিন আবার থেমে একটা শ্বাস নিল।

'আমরা এখন আমাদের উপজেলার শেষ প্রান্তে আছি। এর তিনদিকে তিনটি আলাদা জেলার আলাদা উপজেলা। আর বর্ডার এলাকাতে জানিসই তো কতরকম সুবিধা থাকে ও অপরাধ ঘটে! ঘটনা আর বন্ধ ঘরে জ্বীনের কান্ডে সীমাবদ্ধ নাইরে জীবন, ঘটনা এখন সিরিয়াল ডাকাতি ও সিরিয়াল কিলিং এ চলে গেছে।'

'তাই তো দেখছি। স্কচটেপ দিয়ে পেঁচানো লাশ!' আমি মাথা নাড়ালাম

'আমি পাঁচজন লোককে ওই ইন্ডাস্ট্রি গুলোর উপর নজর রাখতে বলেছি। তারা নজর রাখছে। আমার প্রথম সন্দেহ হয়, এখানে এত ইন্ডাস্ট্রি কেন হবে? যেখানে বড় কোনো হাট নাই। বড় কোনো শহর নাই। মেইন রোডও অনেক দূরে। তবে একটা ভাল কারণ হলো তিন জেলা একদম কাছে। খোঁজ নিয়ে জানলাম রাইস ব্র্যান ওয়েলের ম্যাটেরিয়াল আসে রংপুর থেকে। খোঁজটা পাইলাম ওয়হাবের কাছে থেকে। সে এই রানিং বিজনেসটা করে। তাই সেটা সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ। বাকি থাকলো এগ্রো ইন্ডাস্ট্রি গুলো। এখানে ধান থেকে চাল, চাল থেকে আটা, ময়দা আবার ভুট্টা থেকেও নানান পণ্য তৈরি হয়। প্রচুর কাঁচামাল লাগে। আমি বলছি না এরাই ডাকাতি করা মালামাল দিয়ে বিজনেস করে। কিন্তু তারা সন্দেহের বাইরে নয়।'

'এসব ফ্যাক্টরির মালিক কারা?'

'মোট চারটা ফ্যাক্টরি আছে। চারটা ভিন্ন নামে। কেউ বলে তাড়াশের এক সাবেক নেতার। কিন্তু সে একা নয়। তার সাথে আরও অংশীদার রয়েছে। মালিক আমাদের বিষয় না। কারণ সৎ থেকে কেউ কোটিপতি হতে পারে না। হাতে রক্ত না লাগলে ধনী হওয়া সহজ নয়। আমরা তাকে ছুঁতে পারব না। তাই আমি ওদিকে সময় নষ্ট করিনি। আমি প্রত্যক্ষ অপরাধীদের খুঁজতে চেষ্টা করছি।'

'তুই কি বলতে চাচ্ছিস, স্কচটেপ দিয়ে পেঁচানো লাশের সাথে এই খুনের সংযোগ আছে?'

'সেটা সময়ই বলে দিবে। তবে লাশ একটা কেন পেল? বাঁকিরা কই গেল। বয়স অনুযায়ী সে ড্রাইভার। হেলপারের বয়স অল্পই হয়। তার লাশটা কই? তারে কই এবং কিভাবে গায়েব করে দিল?'  আরেফিনের প্রশ্নগুলো আমাকে ভাবিয়ে তুলল।

আরেফিন আবার বলল, 'এবার একটু হিসেব মেলা তো। গতপড়শু নন্দীগ্রামে একটি বড় হাটবার ছিল। সেই রাতেই একটা লাশ পাওয়া গেল বনপারার কাছে। আজ সিংড়ায় হাট। তাহলে কি আরেকটা লাশ পড়বে?'

আরেফিনের কথায় আমি চমকে উঠলাম। তারমানে হাটে সওদা করে যখন আড়ৎদাররা যায়, তখনই ডাকাতি হয়। এবং ট্রাকের সবাই প্রায় গায়েব হয়ে যায়। কোনো মুক্তিপণ নাই, কোনো উদ্ধার নাই। এমন কি করা হয় যে লোকগুলোর কোনো অস্তিত্বই আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তাহলে কি আলম এসব জানতো? নাকি মালেক এসব জেনে গিয়েছিল যে, তাদের এভাবে মরতে হলো। গ্রামের লোকজনকে গায়েব তো করা যাবে না, সবাই খুঁজবে। তদন্ত হবে। কিন্তু অন্য জেলার কেউ এই জেলার উপর দিয়ে গেলে তাকে পরিচয়হীন লাশে পরিণত করা সহজ। তদন্তের শেষ হতে হতেই আরেক ঘটনা ঘটবে,পুলিশও ব্যস্ত হয়ে যাবে। সুন্দর পরিকল্পনা। কিন্তু মাস্টারমাইন্ড কে?

'আমরা আজ সন্ধ্যা রাতে সত্যিই মইন্যা খালে যাব কিন্তু। আর অপেক্ষা করব কয়েকটি খবর আসার। একটা আসবে নাটোর থেকে, একটা আসবে তাড়াশ থেকে আর একটা আসবে থানা থেকে। এখন আর কোনো কথা না। আমি ক্লান্ত। একটু রেস্ট নিতে দে।' আরেফিন বলার পর চোখ বুজলো।

আমি ওর অনুসন্ধান দেখে অবাক হয়ে গেলাম। দুপুরে যার ম্যারম্যারে তদন্ত নিয়ে অনেক বকেছি, গালি দিয়েছি ফালতু সময় নষ্ট করা নিয়ে এখন মনে হচ্ছে এ এক বিশাল ঘটনা। তিন জেলার পুলিশ যে রহস্য উদঘাটন করতে পারছে না, আমরা হয়ত সেটা সমাধান করে ফেলব। আমি খুব উৎফুল্ল। আমার ঘুম বা ক্লান্তি নাই। আমি অস্থির হয়ে পড়েছি, রহস্যের গহীনে যেতে।

৯.

একঘন্টা হলো আরেফিন শুয়ে আছে। আমি তো ইয়াসমিনকে সব ঘটনা বলে দিয়েছি, ভেবেছিলাম সে অনেক খুশী হবে। কিসের কি! সে এক ঝড় বয়ে দিল আমাদের ঝুঁকির মাত্রা নিয়ে। অনেক হাতে পায়ে ধরে তাকে মানাতে পেরেছি, যেন সে জেসমিনকে না জানায়। ভাব নিতে গিয়া টাশকি খাইলাম। হায় ভগবান!

ন্যাপ নেয়া শেষ করে আরেফিন উঠলো। কুশলাদি জিজ্ঞেস করে নানা'র কাছে গেল। কিছু কথাবার্তা বলে আমার কাছে আসলো। জিজ্ঞেস করলো, 'তুই রেডি তো?'

আমি মাথা নাড়ালাম। আমরা দুইটা টর্চ, দুইটা ছোটো চাকু, লেজার লাইট, দুইটা লাঠি আর বুট জুতা পরলাম। নানা' বাইরে উঠোনে দাঁড়িয়ে আছেন। আমরা তার কাছে গেলাম।  তিনি বললেন,

'সত্য জীবনের চাইতেও বড়। তোমরা যখন সত্য উদঘাটনের কাজেই নেমেছো, তখন আমি তোমাদের বাঁধা দিতে পারি না। কিন্তু তোমাদের থেকে আরও কিছু এই সমাজ ও দেশ আশা করে। সেটা বঞ্চিত করো না। শতভাগ মনোবল নিয়ে এগিয়ে যাও। আমরা আছি।'

নানা'র কথায় অনেক শক্তি পেলাম। প্রতিটা কথা আঘাত করলো বুকে। কিন্তু বুকটা আরও প্রশস্ত ও শক্ত হলো।

আরেফিন বাইক স্টার্ট দিল। আমরা ছুটছি এক অসীম রহস্য উন্মোচনে। মইন্যা খালের মিথ আজ ভাঙব। কি আছে ওখানে?  জ্বীন নাকি প্রেতাত্মা? তাদের আজ ধরবই।

আমাদের কাছে আত্মরক্ষার কিছু নাই। শুধু আছে মনের শক্তি আর সততা। এমন পজিটিভ কথা যখন ভাবছিলাম, তখন আরেফিন বলে উঠলো,

'আয়তুল কুরসি পারোস পড়তে?'

ওর কথায় আমার সব শক্তি, মনের মনোবল, বুকের প্রশস্ততা ও শক্তি এক নিমেষেই গায়েব হয়ে গেল৷ হারামিরে মনে চাইলো লাঠি দিয়া বারি মারি। মুডটাই নষ্ট করে দিল, যামুই না মইন্যা চইন্যা খালে। আমার ভয় লাগতাছে! খোদা, কেন রাজি হইলাম!

ভিটাকাটা গ্রামের ভেতরে ঢুকলাম। একদম অন্ধকার। বিদ্যুৎ নাই এসব গ্রামে। মাগরিবের সময়েই সব খেয়ে ঘুমায়। রাতে কেউ বের হয় না৷ ঠিক এ কারণেই নানান ভয়ের কাহিনি রটে।

রাস্তার মধ্যে কোনো সমস্যা হয়নি। আমরা গ্রামের শেষ মাথায় একটি বাড়ির উঠোনে বাইকটা রাখলাম। বাড়ি থেকে একজন লোক বের হয়ে আসলো। বুঝলাম আরেফিন তাকে ঠিক করে রেখেছে। এতটুকু বিশ্বাস আছে ওর প্ল্যান 'বি' বা 'সি' সবই রেডি করা আছে, নয়ত আমার 'প্ল্যান ডি' এক্টিভেট হয়ে যাবে। 'প্ল্যান ডেথ!'

'জীবন, উনি এখানে আছেন। আমাদের পেছনে থাকবেন৷ আমরা কোনো বিপদে পড়লে সংকেত দিব।'

'সংকেতটা কি? '

'গুড কোশ্চেন। একদম সহজ, গলা ছেড়ে চিৎকার!'

কি করতে ইচ্ছে করে একে? গলাটাই যদি জ্বীন চেপে ধরে তাহলে চিৎকার দিব কেমনে?

'তুই বাইক নিয়ে আম্বইল যাবি। বাইকটা মাটির রাস্তায় স্ট্যান্ড করে রাখবি। তারপর হেঁটে হেঁটে মেঘডুম্বুরের দিকে আসবি। আর আজ যে দোকানে গিয়েছিলি। দেখবি সেটা খোলা আছে কিনা। থাকলে সিগারেট কিনে নিস। সাহস পাবি। আমরা এদিক দিয়ে মেঘডুম্বুরে যাব। পারবি না এতটুকু করতে?' আরেফিনের কথা শুনে মনে হলো কাজটা ছেলের হাতের মোয়া! কিছু বললাম না। ওর কথা শুনে আমার হাত পা ভারি হয়ে গেছে।

'এ আর এমন কি? গ্রামই তো, মইন্যা খাল তো না।' আমি মিন মিন করে বললাম

'শোন, গ্রামের মাথা থেকে শেষ পর্যন্ত হেঁটে আসতে তোর বিশ মিনিট সময় লাগবে। কোনো দিকে তাকাবি না। কিন্তু দোকান বা মাচায় বসে কেউ আড্ডা দিতে দেখলে দূর থেকেই কথা বলে চলে আসবি। হাঁটা শুরুর ঠিক দশ মিনিট পর বট গাছের কথা মনে আছে, ওখানে লেজার মারবি৷ আমি বুঝব তুই কতদূর এগোলি। ভয় পাস না, ভয়ের কিছু নাই। আমরা আছি।' আরেফিন আমার পিঠ চাপড়ে দিল। আমি বাইক স্টার্ট করলাম।

দশ মিনিটের রাস্তা বাইক চালিয়ে আসতে যেন আমার আধা ঘন্টা লাগলো। আমি জানি আরেফিন সব ক্যালকুলেশন করে রেখেছে। তাই সময় নষ্ট করলাম না। যা হবার তা দেখা যাবে। তবে মনটা খুব খারাপ। যা করতাম, এক সাথেই করতাম। রাস্তার মধ্যে একা অজ্ঞান হয়ে গেলে কাউকে মুখ দেখাতে পারব না৷ সবাই পঁচাবে!

বাইক গ্রামের মুখে রেখে আমি হাঁটতে শুরু করলাম৷ একটি নিস্তব্ধ রাতে কত প্রকার ও কত বিদঘুটে যে শব্দ শোনা যায়,  তা আজ বুঝলাম। রাত আসলেই ভয়ানক। আরেফিন বলেছিল দোকান খোলা থাকলে সিগারেট কিনে খেতে। কিন্তু আমার কাছে সিগারেট রয়ে গেছে একটা। আর গ্রামের দোকানে সিগারেট পাব, নিশ্চয়তা নাই।

সিগারেট ধরিয়ে হাঁটছি। ঠিক দশ মিনিট হাঁটার পর আমি বট গাছের উপরে লেজার মারলাম। আলোটা ছড়িয়ে গেল। এর এক মিনিট পরেই দোকানটা সামনে পড়লো। হারিকেনের আলোয় দোকানটা খোলা। এতদূর আসতে কোনো সমস্যা হয় নাই। দোকানে গিয়ে সিগারেট চাইলাম। অবাক কান্ড পেলামও। আরেকটা ধরিয়ে চলতে শুরু করলাম। মনে সাহস এসেছে। বুঝলাম আরেফিনই দোকানটা খুলে রেখেছে।

এবার ভয় একদমই কেটে গেল। হাঁটছি একা। হঠাৎ পেছন থেকে একজন আমার মুখ চেপে ধরলো। আমি বুঝলাম আমার হাত দুটো পেছনে বাঁধা হলো। সেকি! স্কচটেপ দিয়ে। কি সাংঘাতিক। আমি সব বুঝছতেছি, আমার করার কিছুই নেই। আমি একটু চিৎকারও করতে পারতেছি না। আরে গ্রামের মধ্যেই কি আমাকে মেরে ফেলবে? আমি কি এখন মারা যাব? আরেফিন ভন্ডটা কই? তার এত প্ল্যান,  এত পরিকল্পনা গুলো কোথায় এখন? আমি মারা গেলে মা-বাবার কি হব? ইয়াসমিন এসে কি বলবে? গোয়েন্দা হতে যাও, না? গোয়েন্দা ছুটায় দিব?

আমাকে একজনের কাধে তোলা হলো। আমি কি বস্তা? আমার কাছে চাকু আছে, ওরা কি জানে? ওরা কয় জন? আমি তো জানি না৷ নিশ্চয় দুজন, মুখ চেপে এক হাতে বাধা সম্ভব না। আমি প্রচন্ড ঝাঁকি খাচ্ছি৷ বদ লোকের কাধের হাড় আমার কিডনিতে পেটে আঘাত করছে। আমি এই ব্যাথাতেই গোঙানো শুরু করেছি৷ কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না।

পনের মিনিটের মত হবে দৈত্যটার কাধে শুয়ে হাটছি। আমি মাথা ঠান্ডা করার চেষ্টা করছি৷ একবার তো ভাবলাম, এক ঘন্টা হয়েই গেছে। পরে বুঝলাম যখন মেঘডুম্বুরের উঁচু পাড়ে উঠলাম, তখন মনে পড়লো দুপুরে হেঁটে আসতে দশ মিনিট লেগেছিল। এখন কাধে চড়ে আসতে মনেহয় পনের মিনিট লাগার কথা। ক্রমেই মৃত্যুর দিকে আগাচ্ছি।

আরেফিন যে আমার জন্য এমন বাহনের ব্যবস্থা করেছে জানতাম না। হারামি কি জানে, আমার এই অবস্থা। কই সে? কই তার বাহাদুরি।  আমি মারা গেলে সত্যিই ভুত হব। তারপর ব্যাটার গোয়েন্দাগিরি ছুটাব।

আরও কিছুক্ষণ চলার পর আমাকে ফেলে দিল মাটিতে। যে আঘাত পেয়েছি বেঁচে থাকলে আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে। এবার ওদের কথা শুনতে পাচ্ছি৷ শয়তানরা এতক্ষণ কোনো কথা বলেনি৷

'তদন্ত ফুটাইতে আইছে। এবার মর হারামজাদা। মাছ মাইরতে আইছে, মাছ দিয়াই তোরে খাওয়ামু। চল মইন্যা পুকুরে' একজন হুংকার দিয়ে বলল

আমি কন্ঠটা যেন কোথায় শুনেছি। হ্যাঁ হ্যাঁ শুনেছি। মইন্যা পুকুর! খালরে বলে পুকুর। আরে এ তো সেই দোকানদার। হায় হায়,  আমি কি ভাবলাম  আর হলো কি। ভাবছিলাম আরেফিন একে খোলা রাখছে আমাকে সিগারেট দেবার জন্য, এখন দেখছি সে আমার মাংস খেতে চায়। ওরে বন্ধু! কই তুই!

জানি আমার কোনো কথা বের হবে না। আর তো চিৎকার। এমন সংকেতের ব্যবস্থা সে করেছিল, যা কোনো কাজেই আসলো না। আমার মুখেও স্কচটেপ মারছে হারামজাদারা। সারা শরীরে ব্যাথা শুরু হয়েছে। আমি মনেহয় জ্ঞান হারিয়ে ফেলব৷ তার আগে প্রতিরোধ কোনো ব্যবস্থা তো আমাকে নিতেই হবে।

আমি পকেটে রাখা চাকুটা ধরার চেষ্টা করলাম। একটু পরেই একটা ঘুষি পড়লো কপালে। তারপর আর মনে নাই। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম।

জ্ঞান যখন ফিরল। তখন দেখি আমি মাটিতে পড়ে আছি। আলো জ্বলছে মশালের মত। কয়েকজন লোকের আওয়াজ শুনছি। আরেফিন আমাকে কই ফেলল। দা-ছুরির ঝনঝনানি আওয়াজ পেলাম। তাহলে কি কাপালিকের পাল্লায় পড়লাম। এরা কি আমাকে বলি দেবে? তারপর কি আমার মাংস খাবে? এই একবিংশ শতাব্দিতেও সম্ভব?

আমাকে একটা লাথি মারলো। আমি উল্টে পড়লাম অন্যদিকে। দেখলাম একটা ছোটো পুকুর পাড়। মাঝে একটা গাছ। গাছে লাল কাপড় পেঁচানো। লাল কাপড়ে ছেয়ে আছে সবকিছু৷ সবাই মদ খাচ্ছে। নাচতেছে। ঢোল বাজাচ্ছে। এই শব্দ কি কেউ শোনে না। আরেফিনের কানে যায় নাই?

লাঠির বারির আওয়াজ শুনলাম। ওরা কি লাঠি খেলছে? আরে, ওরা কি মাদার খেলছে? তাহলে কি এটা মাদারের উৎসব। এখন তো গ্রীষ্ম কাল, বর্ষা আসলো বলে। এখনই তো মাদার উঠবে। হায় খোদা, এই নাপাকদের হাতে আমার মরণ লিখে রাখছো?

একটি ধপাস করে পড়ার শব্দ শুনলাম। তাহলে কি আরেফিনকেও ধরে আনছে? ঢোলের শব্দে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কে কাকে পেটাচ্ছে, কি হচ্ছে,  কি জবাই হচ্ছে, কিছুই বুঝতেছি না। একজনকে দেখলাম আলোতে, পুরো শরীর লাল। সে কি মানুষের রক্তে লাল করেছে?

'কারে আগে খাবু? শিশুরে নাকি মদ্দারে?' একজন বলে উঠলো শুনলাম।

তবে কি হিজড়ারাও মাদার হইছে? মদ্দা বলে কেন? আরেফিন মদ্দা, আমি না?? আমি শিশু? বাচ্চা? নাকি আরেফিনের সাথে থাকা ওই লোককে ধরছে? আরেফিন এখনও মুক্ত? তাহলে তো সে আমাকেও মুক্ত করবে।

মাংস পোড়ানোর উৎকট গন্ধ নাকে আসলো। কি পোড়াচ্ছে? মানুষের মাংস নাকি কুত্তার? নাকি সেইসব নিরুদ্দেশ ড্রাইভারদের? কোনো উত্তর নাই। আমার চোখে পানি চলে এসেছে। ওরা আমাকে পুড়িয়ে খাবে। ছোটো বেলায় গল্প শুনতাম, আজ নিজের জীবন দিয়া প্রমাণ করব।

হঠাৎ করে বিশাল টর্চের মত আলো জ্বলে উঠলো। সাথে সাথে সাদা আলোয় ছেয়ে গেল। থ্যাংকস গড, আমি জান্নাতে অবশেষে যাচ্ছি। ওহ শান্তি!

আবার বাঁশি বাজায় কে? এত বাঁশির আওয়াজ কেন? আমারে পাড়িয়ে গেল কে? সেকি! আমি কি দুনিয়াতেই আছি? আগুনে তো জ্বলছেও না। আমার কি হ্যালুসিনেশন হচ্ছে? আরেফিন নামের সত্যিই কেউ ছিল? যে আমাকে এই মাদারিদের মধ্যে ফেলেছে? নাকি স্বপ্ন দেখছি?

'জীবন, এই জীবন, তুই ঠিক আছিস? আমি আরেফিন, ওঠ ওঠ।'

হারামিটা এখনও মজা করছে। হাত পা মুখ স্কচটেপে বাধা, আর সে আমাকে উঠতে বলছে৷ না, আমি জান্নাতে যাব। আমি মরব। মেরে ফেল। আমি মরে যাচ্ছি। সব সাদা হয়ে আবার অন্ধকার হয়ে গেল মনেহয়৷

১০.

চোখ যখন খুললাম৷ সামনে আব্বা মা' বসে। আরেফিন দূরে দাঁড়িয়ে। আরেফিনের বাবা-মা'ও আছে। পুলিশের ড্রেসে ওটা কে? সবাই কি জান্নাতে?

মা' এসে আমার কপালে চুমু দিলেন। আরাম পেলাম। কিন্তু ইয়াসমিন কোথায়? ও কি মরেনি এখনো? নাকি জাহান্নামে গেল? তিন বছরে কম অত্যাচার তো করেনি!

'তুমি ঠিক আছো বাবা। সারারাত অজ্ঞান ছিলে। মাত্র জ্ঞান ফিরলো৷' মা'র কথা বুকে খচাৎ করে বিঁধলো। হে হে হে, আমি বেঁচে আছি। কিন্তু শরীরে প্রচন্ড ব্যাথা।

আরেফিন হাসছে। ছুটে এসে আমাকে জরিয়ে ধরলো। সেকি! ও কাঁদছে। ফুপিয়ে কাদছে। তোর কি ফুপা মারা গেছে, যে ফুপিয়ে কাঁদছিস?

আরেফিন স্থির হলো। বলল, 'তোর কিছু হলে আমি বাঁচতাম না। অনেক বড় বাজি ধরেছিলাম। ভুল করেছিলাম। মাফ করে দে।'

এই ঘাগুমাল আমার কাছে মাফ চাচ্ছে? কি সাংঘাতিক!

আমাকে ডাবের পানি দিল খেতে। আরও ফলমূল আমার সামনে রাখা। দুধও রাখা।

আরও প্রায় আধাঘন্টা পর আমি ধাতস্থ হলাম। সত্যিই আমি বেঁচে আছি, ভাল আছি। হাতে, গলায় কেটে যাবার দাগ এবং পুরু শরীরে ব্যাথা। সবাই আমাকে ঘিরে বসে আছে৷ আমি শুধু মনে করতে পারছি, কেউ একজন আমার মুখ চেপে ধরেছিল।

পুলিশের ড্রেস পরা লোকটি আমার কাছে এলেন। বললেন, 'তোমার সাহসিকতার জন্য আমরা খুব ধূর্ত এক অপরাধী চক্রকে ধরতে পেরেছি। তুমি অনেক বড় ডিটেকটিভ হবে।' তিনি আমাকে বাহবা দিলেন। কিন্তু সব কাজ তো করেছে আরেফিন।

তিনি আবার বললেন, 'তিন জেলার পাঁচটি উপজেলার পুলিশ যে রহস্য সমাধানে মরিয়া সেটা তোমরা দুদিনে সলভ করে ফেলেছো। আমার জেলার ছেলে তোমরা, আমি সত্যিই গর্বিত!'

কথা শুনে মনে হলো উনি এসপি। মা'কে ইশারা করে ডেকে বললাম, উনি কে? মা' বললেন 'এসপি'। প্রমাণ হয়ে গেল, ডিডাকশন ক্ষমতা আমার বেড়ে গেছে!

উনি আবার বললেন, 'তিন জেলার পুলিশের প্রধানের কাছে থেকে তোমরা সম্মানিত হবে। আমি নিজেও তোমাদের রহস্য উন্মোচনের কাহিনি শুনতে আগ্রহী। আরেফিন, এখন বলবে?'

আরেফিন বলতে শুরু করলো, 'এটা আমরা বিশ্বাসই করতে পারিনি, একটা জ্বীন চাকু দিয়ে একজন মানুষকে সমস্ত শরীরে ক্ষত বিক্ষত করবে। এটা নির্ঘাত কোনো অপরাধীর কাজ। যে ভয় ছড়িয়ে দেবার জন্য এমন কাজ করেছে। ওই বিশেষ জায়গার প্রতি, যেখানে কথিত আছে বহু আগে ডাকাতেরা ওখানে মানুষ জবাই দিত। মানুষ পুঁতে রাখতো৷ এই রহস্যের সমাধান ওখানে গেলেই হয়ত হয়ে যেত, কিন্তু কারা এর পেছনে আছে এবং কি ধরনের সুবিধা নিচ্ছে তা জানা হতো না। তাই আমরা মইন্যা খালকে পাশ কাটিয়ে মেঘডুম্বুরকে হাইলাইট করে ডাকতদের পেছনে ছুটতে থাকি' আরেফিন থামলো।

'যখন জানলাম, মাছ ধরা সবারই পার্শ্ব কাজ। সবার নিজ নিজ চাষবাসের কাজ আছে। দোকান ও সরদার পাড়া থেকে জানতে পারলাম, কিছু পরিবার আছে যারা কি কাজ করে কেউ জানে না। কিন্তু কখনো কোথাও বাঁকি খায় না। ওদের ধর্ম কর্ম করতেও কেউ কখনো দেখে নাই। আমি নানা'র কাছে থেকে জানলাম, বহু আগে একদল মানুষ ছিল, যারা কিছুটা কাপালিক, কিছুটা নয়। তাদের থেকেই মাদার চর্চাটা এসেছে। কিন্তু মাদার তো প্রকাশ্যেই আছে। মাদারের মেলা হয়। তাহলে এরা কারা? আমি সরদার পাড়া যেয়ে এদের সম্পর্কে কিছু ধারণা পাই। এরা সবাই রাতে মাছ ধরতে যায় মইন্যা খালে। তবে সব রাতে না। বিশেষ রাতে। এরা মেঘডুম্বুরের পাড়েও নানান আসর করে। চিল্লাচিল্লি করে। সবাই বিরক্ত, কিন্তু ভয়ে কিছু বলে না।'

'এদিকে জানতে পারলাম, ট্রাক ভর্তি ধান-চাল-গম-ভুট্টা ডাকাতির কাহিনি। এটা ডেয়ারিং কাজ৷ কিন্তু ড্রাইভার -হেলপারদের গায়েব হয়ে যাওয়াটা রহস্যজনক। তখন খোঁজ নিলাম বর্ডার ভিত্তিক উপজেলায় এটা বেশি ঘটছে। তার মানে পুলিশের সীমানা জটিলতার সুযোগ কেউ নিচ্ছে। কিন্তু এমন দুর্ধর্ষভাবে কেন? স্কচটেপে মোড়ানো লাশ আর বন্ধ ঘরের লাশের বিভৎসতা দেখে আমার মনে হলো, দুইটা কাজ একই ধরনের মানুষ থেকে। মেলানোর চেষ্টা করলাম। ডাকাতরা যেমন ধন সম্পদ চুরি করে মাটিতে পুঁতে রাখতো, তেমনি নব্য ডাকাতরা মানুষকে মাটিতে পুঁতে রাখছে না তো? কিন্তু এত লোকজনকে তো মেরে ফেলা সম্ভব না? কোন কারণে মেরে ফেলবে? লজিক কি?? তখন মাথায় খেলল, রিচ্যুয়াল! প্রাচীন রিচ্যুয়াল যা, ভারতে এখনো আছে। তাহলে কি তাদের গোত্ররা আজও এখানে রয়ে গেছে? আরেকটু ভাবনাটা এগিয়ে নিলাম৷ এদেরকে কাজে লাগিয়ে কেউ সুবিধা নিচ্ছে না তো??' আরেফিন পানি পান করে নিল।

'কারণ, ধান-চাল হারিয়ে যায় সাথে মানুষও। ধান-চাল না হয় কাজে লাগে হারানো মানুষগুলো কি কাজে লাগে? তখন দুইটা চিন্তা আসলো, তাদেরকে কেউ আটকিয়ে রাখছে নয়ত রিচ্যুয়াল অনুযায়ী মেরে ফেলছে। তাহলে আটকিয়ে রাখছে কোথায়? আমি লোক লাগালাম। কোন ফ্যাক্টরি থেকে অফিস আওয়ার শেষে কম মানুষ বের হয়। সেটাই আমাদের সাসপেক্ট। নানা'র মাধ্যমে পুলিশকে সব জানিয়ে রাখলাম। যেন ওই ফ্যাক্টরিতে রেইড দেয়।'

'এদিকে হাটবার আর লাশ পাওয়ার একটা সম্পর্ক টের পেলাম। সিংড়ার মিঠুন ভাইকে বললাম ওদের হাট থেকে যত বস্তা মালামাল লোড হবে, সকল বস্তার ভেতরে-বাইরে যেন একটা চিহ্নের ব্যবস্থা করে। শুধু বস্তার উপর চিহ্ন বা প্রমাণ রাখলে তা ব্রেক করা সম্ভব৷ কিন্তু ধান-চালের ভেতরে চিরকুট রাখলে তা নজরে আসবেই। আর এভাবেই মোল্লা এগ্রো ফুড ইন্ডাস্ট্রি ধরা পড়লো। সাথে সেখানে আটকে রাখা ড্রাইভার-হেলপারদের উদ্ধার করা গেল। এ যুগে এসেও এভাবে বন্দি করে রেখে গোলাম বানিয়ে কাজ আদায় করা সত্যিই বিষ্ময়কর। লোকটির ক্ষমতা মনেহয় অনেক উপরে।' কথাটি শুনে এসপি সাহেব কিঞ্চিত লজ্জিত হলেন।

'মালেক নামের প্রথম যে ব্যক্তিটি খুন হয়, জানতে পারি সে ওই ফ্যাক্টরিতেই কাজ করতো। আর সেই ফ্যাক্টরির একটি ট্রাকে থাকতো আলম। আলম আর মালেকের বাড়ি একই গ্রামে হবার সুবাদে, ওরা পরস্পরের পরিচিত ছিল। মালেকের মাছ ধরার অভ্যাস ছিল। সে রাতে-দিনে, যখন তখন মাছ ধরতে যেত। একদিন গিয়ে সে তার ফ্যাক্টরির বড় কর্তাকে মইন্যা খালে দেখতে পায়, মুদির দোকানদারের সাথে। তার নাম ভবানী দাস। সে বিষয়টাকে সাধারণ মনে করে নিজের কাজে চলে যায়। ঘটনাটির পুনরাবৃত্তি যখন ঘটে, তখন সে ভবানী দাসকে দোকানে বসে জিজ্ঞেস করে। ফ্যাক্টরির মালিকের লোকের সাথে ভবানীর কি সস্পর্ক? ভবানী তো ফ্যাক্টরিতে কাজও করে না?'

'ভবানী এটা শোনার পর পাত্তা দেয় না। মালেককে ভুল ভাল বুঝায়। কিন্তু মালেকের মাছ ধরার হার বেড়ে যায়। ভবানী দাসের কাজে ব্যাঘাত ঘটতে থাকে। তাই সে মালেককে অভিনব কায়দায় খুন করে। এবং এক ঢিলে দুই পাখি মারে। মইন্যা খালে জ্বীনের ভয় প্রচার করে তাদের রিচ্যুয়ালকে গোপন রাখা ও মালেককেও সরানো' আরেফিনের কথায় এসপি সাহেব বেশ আনন্দ নিয়ে শুনছেন। আমরাও শুনছি।

'মালেকের মৃত্যুর পর আলম তা নিয়ে ঘাটায় নাই। কিন্তু একদিন সেও ভবানী দাসকে দেখে ফেলে গোপন কিছু লুকাতে। ভবানী দাসও খেয়াল করেছে আলম প্রায়ই তার দোকাসে বসে মালেকের গল্প করে। সে ধরেই নিয়েছিল, আলম তাকে সন্দেহ করে৷ তার সন্দেহটা আরও পাকাপোক্ত হয় সেদিন, যেদিন আলম মেঘডুম্বুর পুকুরে তার পেছন পেছন যাচ্ছিল। তবে আমার বিশ্বাস এটা কাকতালীয় ভাবেই ঘটেছে। আর নিজেদের কুকর্ম প্রকাশ হওয়ার ভয়ে ভবানী দাস আর ঝুঁকি নেয় নাই।'

'সেই দিন রাতেই ভবানী দাস তার সঙ্গীকে সাথে নিয়ে আলমের বাড়িতে যায়। গিয়েই সে নিজের ভুলটা বুঝতে পারে। আলম কিছুই জানতো না। কিন্তু তখন দেখেই আলম বুঝতে পারে, এরা সাধারণ কেউ নয়। ততক্ষণে ভবানী দাসও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। তারা আলমকে চেপে ধরে বালিশ চাপা দিয়ে মেরে ফেলে। তারপর চাকু দিয়ে উপুর্যুপরি দেহে কোপাতে থাকে। এরপর বাইরে থেকে খিলান লাগিয়ে চলে আসে। পুলিশ যদি আসতো, তাহলে সহজেই ধরতে পারতো৷ কিন্তু কোনো কারণে পুলিশ পর্যন্ত এমন মৃত্যুর খবর যায় না। কারণ রটনা রটেছে, জ্বীন মানুষকে মারছে।'

'এদিকটার সব বুঝলাম। কিন্তু ডাকাতিটা কিভাবে হয়?' আমি জিজ্ঞেস করলাম।

'ডাকাতাটি সাধারণ নিয়মেই হয়। ডাকাতিতে অংশ নেয় একটি নকল লোডেড ট্রাক। যার মধ্যে ডাকাতরা থাকে। সাথে থাকে একটি মাইক্রোবাস, এর ভেতরেও ডাকাত থাকে। কখনো মাইক্রোবাস নষ্ট হবার নাটক করে, কখনো গাছের গুঁড়ি ফেলে অস্ত্র দেখিয়ে তারা ডাকাতি করতো। নকল লোডেড ট্রাকটা আগেই অন্য কোনো জেলার টার্মিনালের আশেপাশে চলে যেত। আর মাইক্রোবাস সহ লোডেড ট্রাক ফ্যক্টরিতে চলে আসতো। পরে ট্রাক আনলোড করে চলে যেত টার্মিনালে যেখানে তাদের আরেকটি ট্রাক বসে আছে।'

'আমি প্রথম জানতে পারি প্রায়ই লোডেড ট্রাকের পেছনে একটি মাইক্রোবাস ফ্যাক্টরি কম্পাউন্ডে ঢোকে।'

'কিন্তু মাদারিরা কীভাবে ড্রাইভারদের মইন্যা খালে নিতো?'

'গুড কোশ্চেন। আসছি ওখানে। ট্রাকের যেসব ড্রাইভার বা হেলপার ওদের জিম্মায় যেতে রাজি হতো না, তাদের তারা মেরে ফেলে রেখে আসতো। আর যারা রাজি হতো, ভয় পেতো তাদের ফ্যাক্টরিতে আনতো। এদের মধ্যে থেকে যাদের ডাকাত বা মাদারদের পছন্দ হতো তাদেরকে মইন্যা খালের পেছনে যে রংপুর-রাজশাহী মেইন রোড আছে, সেখানে নিয়ে যেত। তারপর হেঁটে মইন্যা খালে আনতো। আবার সিংড়া-রায়গঞ্জ রোড থেকে নেমে নৌকাতে ফেলেও আনতো। আমরা তো দেখেছি।' দরজায় দাঁড়ানো একজন পুলিশ অফিসারের দিকে তাকিয়ে বলল আরেফিন।

'জীবন, তুই গতকাল যখন ওই দোকানে গিয়ে কথা বললি৷ তখন ভবানী দাস একটু তোকে ভয় দেখানোর জন্যই মইন্যা পুকুরের কথা বলে। কেউ ওখানে যায় নাই, অথচ ওখানে কি কি আছে, সব সে বলে দিল। আমি তখনই বুঝে নিলাম ডাকাতদের একজনকে পেয়ে গেছি। আমার কাজ সহজ হয়ে গেল। তোকে শহরের ছেলে ভেবে সে বলে দেয়, ভেবেছিল ভয় পেয়ে চলে যাবি। কিন্তু তুই গেলি আলমের বাড়িতে।   সে বুঝলো আবার ভুল করেছে। তখন একজন সঙ্গীকে পাঠায় মেঘডুম্বুর পুকুরে, তোকে ভয় দেখানোর জন্য। তুই বাসায় গেলি আরেকটা সাইকেল রেখেই। সে বুঝলো আরেকজন আছে।'

'আমি নিজে না গিয়ে ভিটাকাটার একজনকে সাইকেল আনতে পাঠাই। সে জানায়, একজন লোককে অযথাই বসে থাকতে দেখেছে৷ জানতে পারি সে কেল্লাপোষী ও মাদার মেলাতে মাদার খেলে। তখন আমার কাছে সব জলবৎ তরলং হয়ে যায়। এখন শুধু প্রমাণের অপেক্ষা।'

'আমি চলে যাই পুরনো তত্ত্বে৷ জীবনকে আবার পাঠাই ওদের কাছে৷ ওরা এবার ওকে ধরে মইন্যা খালে নিয়ে যায়। আবার ওদিক থেকে একজনকে তারা আনবে বলি দিতে। কারণ আজ হাটের দিন। ডাকাতির দিন। আমি পুলিশ ও গ্রামের লোকজন নিয়ে তোর পেছনেই ছিলাম। একদল পুলিশ মইন্যা খালের ওপার ছিল। একদল পুলিশ মেঘডুম্বুর পুকুরের পশ্চিম পাড়ের নিচে ছিল। আরেকদল আমার সাথে তোর পিছনে চলছিল।'

'আমি জানতাম, তুই থাকবি। আমার একটুও ভয় লাগেনি৷' চিৎকার দিয়ে আমি বললাম। কিন্তু কত যে গালি দিয়েছি ওকে, বেমালুম ভুলে গেলাম।

'তোকে নৌকায় তোলা হলো। ওই জায়গায় নিয়ে যাওয়া হলো। আমরা অপেক্ষা করলাম, আরেকটি ডাকাত দলের আসার জন্য। ওরা আরেক বন্দিকে আনলো। তারপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। ওরা ওখানে মাদার তুলে বলি দিয়ে উৎসব করতো।'

'আচ্ছা, মাদার তো সবাই খেলে? আমরাও তো দেখেছি।'

'কেল্লাপোষী মেলাকে কেন্দ্র করে মূলতঃ মাদার খেলা হয়। মাদার খেলা কিছুটা জব্বারের বলি খেলার মত। শরীরকে পোক্ত করাই উদ্দেশ্য। এটা ১৫৫০ এর দিকে গাজী মিয়া নামক একজন রাজার ছেলে প্রথম শুরু করে যুদ্ধে জয়ী হবার জন্য। যুদ্ধে সে জয়ী হয়ও। সেটাকে বলবৎ রাখতেই একটি খেলার আয়োজন করে। তখন লাল কাপড়ে লম্বা বাঁশ পেঁচিয়ে নিশানা দেবার জন্য ব্যবহার হত। এরপর এই খেলার উদ্দেশ্য ও ধরণও পাল্টেছে। অনেকে নেশা করে, মদ খেয়ে মাদার খেলে। অথচ এটা আত্মরক্ষার কৌশল রপ্তের জন্য চালু করা হয়েছিল।'

আরেফিনের কথা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে সবাই শুনছিল। কথা শেষ হবার পরেও সবাই চুপচাপ। সবার মুগ্ধতা কাটলো নানী'র আওয়াজে। তিনি খাবার রেডি করেছেন। সবাইকে ডাকছেন। ঘরে থেকে বেরিয়ে দেখি হুলুস্থুল কান্ড। ইউনিয়ন মেম্বর থেকে শুরু করে চেয়ারম্যান ও বড় বড় নেতারা উঠোনে বসে আছে। সাথে অনেক লোক ও পুলিশ। সবাই আমাদের দেখে প্রশংসাসূচক হাসছে।

পরেরদিন পত্রিকা হাতে আরেফিসের বাসায় বসে আছি। সবাই একেকটা পত্রিকা পড়ছে। সব পত্রিকাতেি ফলাও করে প্রকাশিত হয়েছে আমাদের রহস্য উদঘাটনের কাহিনি।

আমার ফোন আসলো। ইয়াসমিন ফোন করেছে, খুশীতে আমার চোখ ছল ছল করছে।

'তোমাকে নাকি বলি দিতে চাচ্ছিল?... তোরে আর ওইটারে আমি বলি দিব....'

Comments

    Please login to post comment. Login