মা
আকাশ ভরা তারার মেলা
চাদেঁর আলোয় জোছনার খেলা
মনের ভেতর দুঃখের ভেলা
মা নাই পাশে সারাবেলা
হ্যাঁ, মা পাশে না থাকলে সন্তানরা দুঃখের ভেলায় ভাসতে থাকে অতল পাথারে। মা যে সন্তানকে জড়িয়ে রাখে অনুক্ষন সারাবেলা। জননী, জন্মদাত্রী। কেউ বলে মা, আমরা ডাকি আম্মা। আম্মাকে নিয়ে কিছু লিখতে গেলে অনেক আবেগ, অনেক কথা, অনেক স্মৃতি একসাথে এসে মাথায় জট পাকিয়ে যায়। কোথা থেকে শুরু করবো, কি লিখবো, কিভাবে শেষ করবো কিছুই বুঝে উঠতে পারি না। তাই অনেক কথা বলার থাকলেও কিছু কথা হয়তো বলা হবে না। অনেক কিছু লেখার থাকলেও কিছু হয়তো অলেখাই থেকে যাবে। অলেখা আর না বলা কথাগুলো আকাশের তারার মতই সত্য। তাই সেগুলো না হয় হৃদয়েই গাঁথা থাক। কথায় বলে, জনম দুঃখী মা। আমি বলি, মা কেন জনম দুঃখী হতে যাবে, আরে জনম দুঃখী হল সে, যে মায়ের মূল্য বুঝে না!! যে বুঝে না, মা ছাড়া জীবন মূল্যহীন। মা যে তার সন্তানের জন্য কত বড় নিয়ামত একথা দুনিয়ার কে না বোঝে। মা কথাটি যে কত বড় আনন্দের, মা ডাক যে কত মধুর, এ কথা কে না জানে! মা, যে সারাটি জীবন নিজের সুখ শান্তি, স্বাদ আল্লাদ, চাওয়া পাওয়া বিসর্জন দিয়ে সংসারের জন্যে, সন্তানদের জন্যে, স্বজনদের জন্যে জীবনকে বিলিয়ে দেয়। আমার আম্মাও তাই করেছেন। নিজের কষ্টকে আজীবন লুকিয়ে রেখেছেন। সন্তানদের বুঝতে দেননি জীবনের তেতো অনভূতিগুলো। নিজেকে রোবট বানিয়ে সারাজীবন শুধু কাজই করে গেছেন সংসারের জন্য। নিজেকে বৃত্তাবন্দি করে সবাইকে করেছেন মুক্ত, নিজের কষ্ট মেনে করেছেন সন্তানের সুখের ব্রত। আমরা সত্যিই অনেক সৌভাগ্যবান। এমন মায়ের গর্ভে জন্মেছি। সংসারের সমস্ত অভাবগুলোকে বুঝতে না দিয়ে, অন্যের কাছে মুখাপেক্ষী না হয়ে, আত্নমর্যাদা নিয়ে কিভাবে বাঁচতে হয় আম্মা তা দেখিয়েছেন। নিজের যা কিছু আছে তা নিয়ে কিভাবে সংসার সামলাতে হয়, কিভাবে সবকিছু সুন্দরভাবে ম্যানেজ করতে হয়, তা আম্মার চেয়ে আর কেইবা ভাল জানে। তাই আম্মা হলেন আমার কাছে একজন সবচেয়ে ভাল "ম্যানেজার"।
আব্বা সীমিত মাইনের সরকারি চাকুরে। আমরা ছয় ভাইবোন পড়াশুনা করি। এরপর বাসা ভাড়া এবং সংসারের খরচ। নিশ্চয়ই অনেক টানাটানি করে চলতে হত। তবু জীবনে কখনো কোনো কিছুর অভাব মনে হয়নি। আম্মার ক্যারিশমা কখনো বুঝতে দেয়নি আমার এটা নাই, ওটা নাই। অল্পতে, নিজেদের যা আছে তাই নিয়ে তুষ্ট হওয়ার মানসিকতা ছোটবেলা থেকেই আম্মা আমাদের মনে অবচেতনভাবে গেঁথে দিয়েছেন। কোনো না পাওয়াই আমাদের কষ্টের কারণ হতে পারেনি। আমাদের ভাইবোনদের যখন যার যেটা প্রয়োজন আম্মা ঠিকই বুঝতে পারতেন এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতেন। তাই আমার কাছে আম্মা হলেন একজন সবচেয়ে ভাল "সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী"।
আমাদের গ্রামের বাড়িতে আম্মার সংসারজীবনের গোড়াপত্তন হয়েছিল। স্বাভাবিক ভাবেই প্রথম জীবনে অনেক কষ্ট করে সংসারের ভীত মজবুত করতে হয়েছিল আম্মাকে। সেখান থেকে শুধুমাত্র ছেলেমেয়েদের পড়াশুনা, নিরাপত্তা আর মানুষ করার জন্য আম্মাকে অনেক বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে গ্রামের বাড়ি ঘর ছেড়ে বরিশাল শহরে থিতু হতে হয়েছিল। এরপর বরিশালে ছেলেমেয়েদের ভাল স্কুল কলেজে লেখাপড়া করানো, বসবাসের জন্য এক টুকরো জায়গা কেনা, সেখানে বাড়ি ঘর করা আম্মার বুদ্ধিমত্তার সুন্দরতম প্রকাশ। আম্মার দূরদর্শীতা আমাদের এগিয়ে নিয়ে গেছে অনেকদূর। তাই আমার কাছে আম্মা হলেন সবচেয়ে সেরা "দুরদর্শী"।
যখন ক্লাস ফোর কি ফাইভে পরি। আব্বার পোষ্টিং বরিশালের বাইরে। ভাইয়াও ঢাকায় পড়াশুনা করে। সংগত কারনেই তখন থেকে বাজার করার দায়িত্ব আমার কাধে পড়ে। আম্মাই বিশাল সংসার সামলাতো দক্ষ হাতে আর ক্ষুরধার মস্তিষ্কের সফল প্রয়োগে। দেখা গেল কোনো কারণে হয়তো কোনদিন বাজার করতে পারিনি, সমস্যা নেই আম্মা ঠিকই চালিয়ে নেবেন। একদিন, দুইদিন বা আরো কিছুদিন। এরকম ম্যাজিক শুধু আম্মার পক্ষেই দেখানো সম্ভব। এভাবে সংসারের হিসাব নিকাষে আম্মার দক্ষতা প্রশ্মাতীত। তাই আম্মা হলেন আমার কাছে একজন সফল "হিসাববিদ"।
আমরা হয়ত অনাহুত কোনো বিষয়ে অল্পতেই বিচলিত হয়ে যাই, অস্থির হই। আর আম্মা!! সবার আশ্রয়স্থল। ধৈর্য্যর মূর্ত প্রতীক। বিপদের কান্ডারী। সন্তানরা, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন সবার কথা- হোক সেটা ভাল, হোক সেটা খারাপ, আম্মাকে বলে সবাই ভারমুক্ত হয়। এই বয়সেও আম্মা সকলের বোঝা নিজের মাথায় নিয়ে কিভাবে যে দিন কাটায়! তার কি অস্থির লাগে না! তার কী প্রেসার বাড়ে না! কিভাবে তিনি সবকিছু সামলান! এতকিছু তিনি কিভাব সহ্য করেন!! বরিশালে বাসায় থাকলে দেখি আম্মা ফোনে কথা বলেই যাচ্ছে। মাঝে মাঝে ফোনে সিরিয়াল পড়ে যায়। সবার যেন ভরসাস্থল হল আম্মা। আর আম্মা ও চেষ্টা করেন সবার বিপদের সাথী হতে। তিল তিল করে নিজের জমানো টাকা পয়সা অকাতরে বিলিয়ে যাচ্ছেন অসহায় গরীব আত্মীয় স্বজন আর পাড়া প্রতিবেশীদের মাঝে। মাঝে মাঝে মনে হয় আম্মার জন্য সবার প্রানখোলা দোয়া আছে বলেই আল্লাহর রহমতে তিনি এখনো ভাল আছেন। এত মানুষের অন্তরের দোয়া আল্লাহ্ কি না শুনে পারেন! অন্তরালে থেকে কি সুন্দরভাবেই না আম্মা গ্রামের বাড়ির মসজিদটি পরিচালনা করছেন। তাই আমার দেখা আম্মা হলেন একজন সেরা 'নেতা'।
আম্মার হয়তো অনেক সার্টিফিকেট নেই। কিন্তু তার জ্ঞানের পরিধি অসামান্য। যতটা না তিনি বিদ্যালয়ে শিখেছেন তার চেয়ে অনেক বেশী স্বশিক্ষায় নিজেকে সুশিক্ষিত করেছেন। কথাবার্তার পরিমিতবোধ, ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা অনুধাবনে অসাধারণ ক্ষমতা, সব মানুষের সাথে ইন্টারাকশনের অভাবনীয় দক্ষতা আম্মাকে করেছে অনন্য। আব্বা অর্ন্তমূখী স্বভাবের হবার কারনে আম্মাই সামলে যাচ্ছে পরিবারের যতসব সামাজিক কর্তব্য অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের সাথে মিশতে পারার এক অদ্ভুত ক্ষমতা আল্লাহ্ আম্মাকে দিয়েছেন। আম্মার সেন্স অব প্রপর্শন আর সর্বাবস্থায় খাপ খাইয়ে নেবার সক্ষমতা চোখে পড়ার মতো। তাই আমার কাছে আম্মা হলেন সবচেয়ে "স্মার্ট" ।
আম্মার হাতের রান্না কথা কি বলবো!! অসাধারণ, সুস্বাদু, মুখরোচক যাই লিখি না কেন মনে হবে এখানে ভাষার প্রবল আকাল। কিছু অনুভূতি আসলে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না! একবার যে খেয়েছে আম্মার রান্না- প্রশংসা করতে বাধ্য হয়েছে বারবার। আম্মার রান্নার যাদুতে বিমুগ্ধ ছোট বড়, আত্নীয় স্বজন সবাই। এককথায় সবাই আম্মার রান্নার ভক্ত। আর আমরা তো অবশ্যই ভাগ্যবান আম্মার হাতে রান্না খেয়ে বড় হয়েছি আম্মার হাতের রান্না কবুতর লাউ, শাপলা ইলিশ, গরুর মাংশ, ডিম বেগুন, চডা পিঠা, চুই পিঠা, তাল পিঠা, ঝাল পিঠা, ফুল পিঠা, ফিরনীর কথা মনে আসলে আজও জিভে জল চলে আসে। পাতলা খিচুড়ি, পুই চিংড়ি ভুনা বা তাল সাসের নাস্তা লিখতে গেলে এরকম লিষ্ট শুধু বাড়তেই থাকবে। আম্মার রান্নার সাথে আর কারোর রান্না তুলনা হয় না। কত জায়গায় কত ধরনের খাবারইতো খেয়েছি, আম্মার হাতের রান্নার স্বাদ কোথাও পাইনি। আম্মা সত্যিই রান্নার যাদু জানে। তাই আমার কাছে আম্মা হলেন সবচেয়ে সেরা "রাধূনী"।
আম্মার জীবনাচরন ধর্মীয় চেতনা এবং মূল্যবোধের সমন্বয়ে গড়া এক ইসলামী জীবন। মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন এর প্রতি অগাধ বিশ্বাস আর ভরসার কমতি ছিল না কখনো। জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে সৃষ্টিকর্তার প্রতি অবিচল আস্থা তার জীবন যাপনকে করেছে অনেক সরল। তিনি সবসময়ই চেষ্টা করেছেন তার ছেলেমেয়েরাও যেন ইসলামী ভাবার্দশে বিশ্বাসী হয়ে নিজেদের জীবনকে গড়তে পারে। তাই ছোট বেলা থেকেই আমাদের মক্তবে পাঠানো, বাসায় হুজুরের কাছে কুরআন শিক্ষা, এক সন্তানকে মাদ্রাসায় ভর্তি করানো ছিল তার চিন্তা চেতনার যথার্থ প্রতিফলন। নামাজ রোজাসহ ধর্মীয় বিধান পালনে কখনো তিনি উদাসন্য দেখাননি। আম্মা বলতে গেলে তার একান্ত প্রচেষ্টায় এবং ঐকান্তিক ইচ্ছায় পবিত্র হজ্জ পালন করে সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছেন, "ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়"।
বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে আম্মা অনেক শক্ত হৃদয়ের একজন মানুষ। সহজে ভেঙ্গে পরার পাত্র তিনি নন। কিন্তু আম্মারও আছে কঠিনত্যর আড়ালে এক নরম হৃদয়ের স্নেহময়ী মাতৃসুলভ মন। তিনিও সবার বেদনায় ব্যাধিত হন। সবার বিপদে অশ্রুসিক্ত হন। তার ভালোবাসার ক্ষমতা অনেকের তুলনায় একটু বেশীই!! অনেকবারই দেখেছি আম্মা তার নিজের কষ্টগুলো চেপে রেখে আড়ালে চোখের জল
মোছেন আর ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদেন অন্য কারো কষ্টের বেদনায় নীল হয়ে। এখনো বাসায় গেলে ফেরার সময় প্রচন্ড খারাপ লাগে আব্বা আম্মাকে বাসায় রেখে চলে আসতে। আম্মার দিকে তাকাতে পারি না, চোখ ভারী হয়ে আসে। না জানি তখন আম্মার কেমন লাগে!! পায়ে ব্যাথা, হাটতে তার কষ্ট হয়, তবু আম্মা পেছন পেছন রাস্তায় চলে আসেন। আর নাতি নাতনী সহ যখন কোন ছেলে মেয়ে বরিশালে বাসায় আসে, আম্মার ব্যাস্ততা বেড়ে যায় বহুগুণে। কি রাধবে, কি খাওয়াবে, কিভাবে আদর যন্ত করবে, কার কি লাগবে; আম্মার অস্থিরতার শেষ নেই!! এক আম্মা তখন হয়ে ওঠেন সবার যাবতীয় আবদারের কেন্দ্রবিন্দু। আবার সমস্ত কোলাহল শেষ করে সবাই যখন বাসা শূন্য করে আপন আপন গন্তব্যে যাত্রা করে আম্মার অশ্রুসজল চোখ বুঝিয়ে দেয় তার ভিতরের কষ্টের কথা। আপনজনের বিরহ ব্যাথায় হাহাকার করে ওঠে তার মন। তখন তার মন খারাপ করা মুখের দিকে তাকানো কতটা কষ্টকর তা কিভাবে বুঝাই! ছেলেমেয়ে, নাতি নাতনিদের যে তিনি বড় ভালবাসেন। মেয়ে জামাইরা যেন তার এক এক জন ছেলে। তাদের সমাদরে আম্মা সর্বদা নিজেকে ছাপিয়ে যান। আম্মার এই দরদী মন আর স্নেহ ভরা মমতা আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
আসলে আম্মাকে নিয়ে এভাবে যতকিছুই লিখিনা কেন বা যত বিশেষণেই তাকে ভূষিত করিনা কেন তার গুনের কথা লিখে শেষ করা যাবে না!! পৃথিবীতে এমন কোন শব্দ আছে কি যা মায়ের প্রতি সন্তানের আবেগ কে ধারন করতে পারে। আছে কি এমন কোন বাক্য যা আম্মাকে বিবৃত করবে। মাঝে মাঝে রাত যখন গভীর হয়, কোনো কারন ছাড়াই দু চোখের পাতা বুজতে পারি না, জানালা দিয়ে চোখ চলে যায় আকাশে জ্বলে থাকা মিটিমিটি তারার দিকে। মন চলে যায় ঐ তারার জগত ছাড়িয়ে নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে আরো দূরে কোন সদূরতম প্রান্তে। যাপিত জীবনের নানান রকম ঘাত অভিঘাত এসে মনকে ভিজিয়ে দেয়। আরো মনে পরে যায় আব্বা আম্মার কথা। মনে পরে আব্বার সততা আর পরিশ্রমের কথা, আম্মার সংসারের জন্য অবিরাম যুদ্ধ আর সংগ্রামের কথা। মনে হয়, যে আম্মা আমাদের জন্য তার নিজস্বতা ভুলে গেছেন, আমরা কি করেছি তার জন্য। ছোট বেলায় দেখেছি, অসুখ করলে আম্মা পরম মমতায় খাটের শিয়রে বসে কপালে হাত বুলাতেন, কাপড় ভিজিয়ে মাথায় পট্টি দিয়ে দিতেন, এসব স্মৃতি এসে মনের কোনে উকি মারে। মা ছাড়া আর কে এভাবে সন্তানের পাশে থাকে। মনে পড়ে যায়, কোনো এক রোজার মাসের শেষের দিকে প্রচন্ড কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এসেছিল। আম্মা এমনিতেই ব্যাস্ত থাকেন তারপর আবার আমার জ্বরের হ্যাপা। আম্মা আমাকে এই দেখতে আসে তো আবার দৌড়ে রান্নাঘরে যায়। এরই মাঝে আম্মার মমতা মাখানো হাতের স্পর্শ কপালে পরলে বুঝে নিলাম এরচেয়ে বড় ওষুধ দুনিয়ায় নেই। জ্বরের যন্ত্রণা অচিরেই জুড়ায়। আমাদের ভালর জন্য, মঙ্গলের জন্য যে কয় ফোটা জল আম্মার চোখ দিয়ে ঝরেছে কখনও কি পারব তার দাম দিতে। নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়। অব্যাক্ত যন্ত্রনায় বুকটা ফেটে যেতে চায়। শব্দহীন কান্নায় চোখ ভিজে যায়। আম্মা কি না করেছে আমাদের জন্য! সারাজীবন তার সাধ্যর সবটুকু ঢেলে দিয়েছেন আমাদের জন্য। এখনো বাসায় গেলে সেন্ডেল বের করে দেয়, খাবারের প্লেটটা এগিয়ে দেয়। মগে পানি ঢেলে দেয়। আমার লজ্জা লাগে। কিন্ত মা দের যেন লজ্জা থাকতে নেই। তারা সন্তানের জন্য যে কোন কাজ অবলিলায় করতে পারে। এখনো গাছ থেকে পেয়ারা, কাঠাল বা গাব পেরে কতো যত্নে রেখে দেয় আম্মা আমাদের খাওয়াবে বলে। আমরা খেলেই যেন তার খাওয়া হয়ে যায়। আমরা মজা পেলেই যেন তার তৃপ্তি। কাঁচা আম, আমড়া, চালতা বানিয়ে খাওয়া আম্মা না থাকলে হয়তো এতদিনে ভুলেই যেতাম। এসব ছোট ছোট বিষয় আর কে খোঁজ রাখে এ নিষ্ঠুর দুনিয়ার! মায়ের চেয়ে আপন আর কে আছে!
কখনো দেখিনি আমাদের না খাইয়ে আম্মা খেয়েছে। আমরা ছয় ভাই বোন, আব্বা, আম্মা। দুই একজন পারমানেন্ট আত্মীয় ছাড়াও মেহমান লেগেই থাকত বাসায়। এত লোকের তিন বেলা খাবার দাবারের আয়োজন করতে সারাক্ষন আম্মাকে রান্নাঘরেই থাকতে হতো। ছিল না গ্যাস, না ছিল রান্নার আধুনিক সরঞ্জাম। লাকরী দিয়ে চুলায় রান্না করতে কি কষ্টই না হতো আম্মার! নাকে মুখে ধোঁয়ার চাদরে আম্মার চেহারাই ঠেকে যেত। চুলার তাপে, ঘামে গোসলের আগেই একদফা গোসল হয়ে যেত। ঘামে পড়নের কাপড় ভিজে চুপচুপ হয়ে যেত। বৃষ্টির দিনে ঘর থেকে রান্না ঘরে এটা সেটা নিয়ে আসতে যেতে বৃষ্টি ভেজা হয়ে কতবার যে গায়ের কাপড় আবার গায়েই শুকিয়ে গেছে কে রেখেছে তার হিসাব। পিড়িতে বসে কাজ করতে করতে আম্মার পা দুটো ফুলে উঠে কি অবস্থাই না হতো। এখনো ভাবলে গা শিউরে উঠে! রান্নার কাজ শেষ করে শেষ বেলায় তাড়াহুড়ো করে গোসল করে গায়ের পানি শুকাতে না শুকাতেই নামাজে দাড়িয়ে পড়তে হতো, বেলা বয়ে যাচ্ছে, জোহর নামাজের ওয়াক্ত যে যায়। এভাবে আম্মা করে গেছেন দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। কিভাবে আমরা শুধিব এ ঋণ। কত শত নদী সাগর সমান আম্মার ঘামের বিনিময়ে আমরা বেড়ে উঠেছি। কখনো কি ভেবেছি। কিভাবে দিব মায়ের শরীর নিংড়ানো ঘামের দাম। এ কেমনতর জীবন। মায়েরা কি সব এমনই হয়। তারা কোন মাটি দিয়ে গড়া! কখনও দেখিনি আম্মা ৩টা ৪টার আগে দুপুরের খাবার খেয়েছে। মায়েদের কি ক্ষুদা লাগে না!! আমরা যখন খেয়েদেয়ে পরম আবেশে বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছি; আম্মা তখন খেতে বসতো একা একা। তার প্লেটে ভাত বেড়ে দেওয়ার যে তখন কেউ নেই। আহা, আম্মার তখন কেমন লাগত! তার কি মনে হত!কখনও কেউ দেখিনি আম্মা কি দিয়ে খাচ্ছে। মাছ বা মাংসের এক টুকরা কি পড়েছে তার পাতে। না তা সব আমাদের খাইয়ে তার পেট ভরেছে। আর এ নিয়ে কোন অভিযোগ ও তার নেই। আমরা যে তার নাড়ী ছেরা ধন! সন্তানের জন্য মায়ের ভালোবাসা কি এরকমই হয়! লিখতে গেলে কলম থেমে যায়! কষ্টের তীব্রতায় দিশেহারা হয়ে যাই। টের পাই, চোখ ভারী হয়ে গিয়েছে। কখনো বাসায় একা থাকলে ফ্রিজ থেকে রান্না করা ভাত তরকারি বের করে ওভেনে গরম করে খাব, তাই ভাল্লাগে না। আর আম্মা পরম যত্নে নিজের কষ্টগুলো ভুলে আমাদের লালন করছে আজীবন ধরে। আমাদের শরীর খারাপ করলে স্কুল কলেজ এমনকি অফিসে যাই না। অথচ আম্মার শরীর খারাপ করেছে, তিনি অসুস্থ তাই বাসায় রান্না বান্না বন্ধ। কৈ, এরকমটি তো কখনও চোখে পড়েনি। তবে কি আম্মা কখনো অসুস্থ হয় নি? তিনি কি রোগ শোক জ্বরার ঊর্ধ্বে? না, নিজের অসুস্থতা ভুলে, দাতে দাত চেপে আমাদের মুখে খাবার তুলে দিতে কষ্ট করে গেছেন নিরন্তর। আহা!! কি অপরিসীম ধৈর্য্যর পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন আমাদের আম্মা!! ভাবতে গেলে চিন্তা থেমে যায়। বুকের ভিতর খচখচ করে ওঠে। আমি কেমনে সইবো এ ব্যথা! কিভাবে মিটাব এ ব্যাথার দান। আম্মা, তুমি ক্ষমা কর মোদের সমস্ত অক্ষমতা, সমস্ত অপারগতা। মোরা যদি ভুল করেও কখনো তোমায় যদি কখনো বিন্দুমাত্র কষ্ট দিয়ে থাকি তুমি আমাদের ক্ষমা করতে ভুল করো না। তোমার ক্ষমা না পেলে যে সয়ং আল্লাহ্ তাআলা আমাদের কবুল করবে না। তোমার পায়ের নীচেই যে আমাদের বেহেশত। তুমি জান না তোমার হাসি আমাদের বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা। তোমার মায়া ভরা মুখ আমাদের সকল আবেগের কেন্দ্রস্থল। তোমার সরব উপস্থিতি আমাদের প্রতি মুহূর্তের আত্মবিশ্বাস। আমি জানি, আমি বিশ্বাস করি যতই লিখি না কেন তোমাকে নিয়ে কখনই পরিপূর্ণভাবে লিখা যাবে না! কারন, আমি নিশ্চিত আমাদের দেখিয়ে মানুষের জন্য, আত্নীয় স্বজনের জন্য তুমি যা করেছ, তার চেয়ে বহুগুণে করেছ আমাদের না দেখিয়ে। সারাজীবন চার দেয়ালের মাঝে কাটিয়েও তুমি যা করেছ তা সবার পক্ষে করা সম্ভবপর না। তোমার শিক্ষা আমাদের হৃদয়ে হয়ে থাকবে চির অম্লান।
সারাজীবন আম্মা শুধু আমাদের দিয়েই গেছেন। কখনো মুখ ফুটে কিছু চাননি। আম্মাকে যখনি বলি, কি লাগবে, কি খাবে। সব সময় একই উত্তর, আমার কিছু লাগবে না। মা দের কি কিছু লাগে না! আম্মার শখ কি আমরা জানি না!! জানি না আম্মার কি ভাল লাগে!! সারাজীবন আমাদের জন্য উৎসর্গ করে ভুলে গেছেন নিজের শখ নিজের যাবতীয় ভালোলাগা আর ভালোবাসা। নিজের জন্য কিছু না চাইলেও আমাদের ভালো চাইতে কখনো ভুল করেন না। ঠিকমত নামাজ পড়া, রোজা রাখা, দান সদকা করা, কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করা, সর্বোপরি ভাল মানুষ হওয়া, এক্ষেত্রে আম্মার চাওয়ায় যেন শেষ নেই। আম্মার চাওয়া কতটুকু পূরন করতে পেরেছি জানিনা তবে সবসময় চেষ্টা করি একজন 'মানুষ' হওয়ার। আমরা কি হয়েছি জানি না, তবে আম্মা তার নিজ গুনে হয়েছেন একজন সফল মা, একজন রত্ন, একজন সফল মানুষ।
জীবন সায়াহ্নে এসে অনেক মা বাবাকে সন্তানের উপর নির্ভরশীল হয়ে বাচঁতে হয়। প্রায়শই আত্মর্মযাদা বির্সজন দিয়ে এবং নানারকম গঞ্জনা সয়ে বিধির বিধান মেনে নিয়ে। অথচ আল্লাহর অশেষ রহমতে আম্মা মাথা উচু করে এখনো তার জগতে আসীন। আমরাই বরং অনেকাংশে আম্মার উপর নির্ভরশীল। তাই আকুল চিত্তে আল্লাহর কাছে মিনতী করি, আম্মা যেভাবে চিরদিন আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে আছেন এবং বাঁচতে চাচ্ছেন আল্লাহ্ তাআলা যেন আম্মাকে সেভাবেই আজীবন বাঁচিয়ে রাখেন। তাকে যেন কারো দয়ায় বাঁচতে না হয়। কারো উপর নির্ভরশীল হয়ে বাচতেঁ না হয়। আম্মার দৃঢ়চেতা মনোবল অটুট থাকুক আমৃত্যু। আমরা ভাগ্যবান এমন মা পেয়েছি। মহান আল্লাহর তাআলার কাছে আমরা এই দোয়া করি, আম্মা আমাদের পাশে থাকুক সর্বক্ষন। আম্মাবিহীন একটি দিনও আমরা কল্পনা করতে পারি না। আম্মাকে নিয়ে বাচঁতে চাই যুগ যুগ আরো অনেক দিন। আম্মা তুমি ভাল থেকো। তোমার ভাল থাকা আমাদের প্রতি মুহূর্তের প্রার্থনা। আমাদের ছেড়ে তুমি কখনো যেও না। আল্লাহ্, এই দুনিয়ায় তুমি যেমন আম্মাকে দিয়েছ, পরকালেও যেন আমরা আম্মার সাথে থাকতে পারি। আম্মা তুমি কি জান, তোমার সন্তানরা তোমাকে খুব ভালবাসে। এই জীবনে তুমি কি পেয়েছ জানিনা তবে একথা নির্দ্ধিধায় বলতে পারি তোমার ছয়টি সন্তান পাচঁ ওয়াক্ত নামাজ বাদে তোমার জন্য সব সময় দোয়া করে। যে দোয়া আসে অন্তর থেকে, চোখের জল হয়ে। তোমাকে আমরা কখনো হারাতে চাই না। পরিশেষে বলতে চাই,
দুহাত ভরে কুড়াইয়া নিয়েছি
তুমি আমায় দিয়েছ যা
সার্থক আমার হয়েছে জনম
তোমায় আমি পেয়েছি মা