মানুষের জটলা পেরিয়ে একটি বিল্ডিংয়ের সামনে এসে দাঁড়ালো আরেফিনের গাড়িটি। মূলফটকটি খোলা, তিনজন পুলিশ কনস্টেবল দাঁড়িয়ে আছে। গাড়িটি থামতেই সবাই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। ফটকের পাশে খোদাই করে লাগানো আছে একটি নাম, ফ্লোরেন্স টাওয়ার। গাড়ি থেকে নেমে বিল্ডিংয়ের দিকে তাকালো আরেফিন। যত উঁচুতে চোখ যায় ততটুকু দেখলো। সতেরো তলা বিল্ডিংটা রাস্তায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে দেখা সম্ভব না। বিল্ডিংটা ধনীদের জন্যই বরাদ্দ। আভিজাত্যের নামে অতিরিক্ত ব্যয়বহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত হলেই কেবল এখানে থাকা সম্ভব। একজন এসআই তাকে দেখে এগিয়ে এলো। লোকটি বেশ স্বাস্থ্যবান কিন্তু গরমে ঘেমে তার পোষাক ভিজে গেছে। গতরাতে বৃষ্টি হবার পরেও একটা ভ্যাপসা গরম পড়েছে। লোকটির কন্ঠেও বেশ ক্লান্তি। কিছুটা হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে বলতে শুরু করলো।
'স্যার, ঘটনাটা ঘটেছে পাঁচতলায়। দুইটা বডি পাওয়া গেছে। মার্ডার হয়েছে।'
'মি রফিক, আপনি একটু পানি পান করেন' আরেফিন বলার পর একজন কনস্টেবলকে ইশারা করলো। রফিক থমকে দাঁড়ালো। এমন পরিস্থিতিতে গলা শুকিয়ে গেলেও পানি পান করার অবস্থা থাকে না। পানি পান করার পর এসআই আবার বলা শুরু করলো।
'তারা স্বামী-স্ত্রী। বয়স ৪০ থেকে ৪৫ এর মধ্যে। মার্ডার উইপন একটি কিচেন নাইফ। কিন্তু বাসার নাইফ সেটা নয়।'
'চলুন আমরা হেঁটে হেঁটে কথা বলি। খবরটা কখন পেয়েছেন?’ আরেফিনের পেছনে এসআই রফিক এগোল।
'স্যার সকাল সাতটায়।'
'এত সকালে কিভাবে জানা গেল? কে ফোন করেছিল?'
'স্যার, এনোনিমাস। শুধু বলেছে এই এপার্টমেন্টে একটি খুন হয়েছে। সে পাঁচতলায় একজনকে দেখেছে রক্ত হাতে বের হয়ে যেতে।'
'ওসি কোথায়?'
'স্যার উপরে, মার্ডার প্লেসে'
তারা লিফটের কাছে এসে দাঁড়ালো। লিফটে চড়ে এসআই জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়ালো।
'আপনারা কি স্পটে কিছু পেয়েছেন?'
'না, স্যার। ইয়ে মানে সেভাবে তো কিছু দেখা হয়নি'
'আপনারা থাকতে আমাকে কেন ডাকা হলো?
'স্যার, উনি নৌমন্ত্রীর রিলেটিভ। তাই কেসটা সরাসরি পিবিআইকে হ্যান্ডওভার করতে বলেছে। আমরা আপনার আন্ডারে কাজ করব।'
'যে নম্বর থেকে কল এসেছিল, ট্রেস করেছেন?'
না, স্যার। করতে বলছি। আমরা ভেবেছিলাম এই এপার্টমেন্টের কেউ ফোন করেছে। কিন্তু পরে জানলাম কেউ করেনি।
আরেফিন তার দিকে তাকালো। এসআই মাথা নিচু করে রইলো।
লিফট থেকে নেমে করিডোরে দাঁড়ালো আরেফিন। তার পেছনে এসআই রফিক। সে এখনো ঘাঁমছে। সে এএসপি আরেফিনের অনেক নাম শুনেছে। মাত্র দু বছর হলো আরেফিন চাকরিতে এসেছে৷ এর মধ্যে অনেক জটিল কেসের সমাধান করে ফেলেছে সে। তার সুনাম দুর্নাম দুটোই পুলিশ ফোর্সে বেশ প্রচারিত। সুনাম একটিই, তার ডিটেকটিভ ক্ষমতা ভাল। কেস সলভে তার সফলতা শতভাগ। আর দুর্নাম হলো সে বেপরোয়া, বদরাগী, বদমেজাজী ও হিংস্র। সততা ও অসততার মাপকাঠি এখনো কেউ তার উপর প্রয়োগ করেনি৷
করিডোরটা বেশ লম্বা। এপার্টমেন্টটা বেশ বড়। আরেফিন এপাশ ওপাশ তাকিয়ে দেখলো। তারপর চলতে শুরু করলো। উৎসুক লোকজন তেমন নেই। সবাই তাদের ফ্ল্যাটের দরজা হালকা খুলে উঁকি দিয়ে জানবার চেষ্টা করছে, কি হচ্ছে ওখানে।
'স্যার আমরা যাবো 5C তে'
'কয়টা ফ্ল্যাট প্রতিটা ফ্লোরে?
'স্যার সাতটি'
'ফরেনসিক টিম এসেছে?'
'জ্বী, স্যার এসেছে। তবে আমরা লাশটা সরাইনি। আপনি দেখলে তারপর পোস্টমর্টেমে পাঠাব'
'গুড'
5C ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে আরেফিন দাঁড়ালো। দরজার চারপাশটা খুব ভালোভাবে খেয়াল করলো। দরজার পাশে একজন কনস্টেবল দাঁড়িয়ে, সে স্যালুট করে সরে দাঁড়ালো। আরেফিন লকটা চেক করলো।
'দরজা কি আপনারা খুলেছেন বিকল্প চাবি দিয়ে?
'জ্বী না স্যার। দরজা খোলাই ছিল।
'আপনারা সরাসরি পাঁচতলায় চলে এলেন?'
'ইয়ে মানে স্যার, আমরা তো জানতাম এ বিল্ডিংয়ে সানি সাহেব থাকেন। তার উপর যখন বলল পাঁচতলায়, তখন আমরা তাকে ফোন করি। কিন্তু কোন রেসপন্স না পেয়ে, কেয়ারটেকারকে ফোন করে জানার চেষ্টা করি, কলটা ব্লাঙ্ক ছিল কিনা। পরে কেয়ারটেকার এসে দেখে সানি সাহেব আর তার স্ত্রী দুজনই খুন হয়েছেন। আমরা তখন ছুটে আসি।
'কটা বেজেছিল তখন?
'আমরা এসেছি আটটায়।
'ফোর্স এন্ট্রির কোনো প্রমাণ পেয়েছেন?'
'না স্যার'
'দরজার লক ঠিক আছে?'
'জ্বী, স্যার'
ওসি এসে স্যালুট করলো। আরেফিন মুচকি হেসে ফ্ল্যাটের ভেতরে ঢুকলো। দরজা পেরিয়ে ড্রইং রুমে দাঁড়ালো৷
'হুমায়ুন সাহেব, কি বুঝলেন?
'স্যার, পরিকল্পিত ও নিখুঁতভাবে মার্ডার হয়েছে। আশেপাশেরর ফ্ল্যাটে কেউ কোনো আওয়াজ শোনেনি। মার্ডার করা হয়েছে একটি কিচেন নাইফ দিয়ে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেটা এই বাসার নয়।'
'কিভাবে নিশ্চিত হলেন?'
'স্যার কিচেনে নাইফ রাখার জায়গায় কোনো নাইফ মিসিং নেই।
'নাইফ দিয়ে মার্ডার এতে আশ্চর্যের বিষয়টা কি?'
'খুন করতে চাইলে ধারালো ছুরি দিয়ে করা সহজ, কিন্তু কিচেন নাইফ দিয়ে মার্ডার- বিষয়টা অদ্ভুত লাগছে। আবার সেটা ফেলে রেখে যাওয়া। দেয়ালে আবার পুরনো তারিখ লিখে রাখা। প্রতিশোধের পাশাপাশি কেন যেন অদ্ভুত লাগছে বিষয়টা'
'প্রোব্যাবল টাইম ওব মার্ডার?'
'স্যার, রাত এগারোটা থেকে একটা।'
'হ্যাভ ইউ ফাউন্ড সামথিং?
'নাথিং ইয়েট, স্যার?
'ওকে, সবাইকে বাইরে যেতে বলুন।
ওসি সবাইকে ইশারা করলো বাইরে যেতে। ফরেনসিক টিম, পুলিশের কনস্টবেলরা বাইরে চলে গেল। সে নিজেও বাইরে যেতে লাগলো।
'ইউ ক্যান স্টে মি হুমায়ুন! '
'থ্যাঙ্কিউ স্যার'
'বাট, ডন্ট মেক এ্যানি সাউন্ড' লাশ দুটোর দিকে তাকিয়ে কড়া ভাষায় বলল আরেফিন।
'শিওর স্যার', ওসি ও এসআই দুজনই তাদেরসাথে থাকা ওয়ারলেসগুলো রুমের বাইরে দাঁড়ানো একজনকে দিয়ে দিল।
আরেফিন সরাসরি বেডরুমে গেল। সেখানে লাশ দুটো রয়েছে৷ স্বামীর লাশটি সোফায়, আর স্ত্রীর লাশটি বিছানায়। আরেফিন সোফার সামনে গিয়ে বসলো। লাশটির দিকে পাক্কা তিন মিনিট নিবিষ্ট মনে তাকিয়ে থাকলো। রফিক নিজের হাতঘড়িতে সময়টা খেয়াল করল। লোকটিকে গলা কেটে মেরে ফেলা হয়েছে। কাটাটা বেশ সরু ও গভীর। গলগল করে রক্ত বের হয়েছে বোঝা যাচ্ছে। মুখে বা অন্যান্য স্থানে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। লোকটি যে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেছে এমনটা বোঝা যাচ্ছে না। লাশটির নাকের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে শুঁকলো আরেফিন। চোখদুটোর দিকে তাকালো, হাতের এপাশ ওপাশ দেখলো। টি টেবিলে রাখা গ্লাসের কাছে গেল। শুকে কিছু বোঝার চেষ্টা করলো।
মেঝের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। মেঝেতে কার্পেট রয়েছে। তাতে অনেক রকম পায়ের ছাপ। বোঝার উপায় নেই কোনটা ভিকটিমের, কোনটা মার্ডারারের আর কোনটাইবা পুলিশের। তার নজর পড়লো মেঝেতে স্পর্শ করা বেডশিটের কোনটা। খুব ভালো করে খেয়াল করলো সেটা। বেডসাইড টেবিলে রাখা ফোনটাকে দেখলো।
ইশারা করে হুমায়ুনকে একটা গ্লাভসের কথা বললো। হুমায়ুন নিশব্দে বের হয়ে গিয়ে একটা গ্লাভস এনে দিলো আরেফিনকে। সেটা হাতে পরে নিয়ে বেডসাইড টেবিলে রাখা ঘড়িটাকে খেয়াল করলো। মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখলো, আবার রেখে দিল।
মেয়ে ভিকটিমটাকে চাকু দিয়ে বুকের মাঝ বরাবর চিড়ে ফেলা হয়েছে। এমন নৃশংসতা দেখেও আরেফিন নির্বিকার। সে নিবিষ্ট মনে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। মেয়েটির পোষাক ভালোভাবে খেয়াল করলো। মেয়েটি শর্টস ও হাফ প্যান্ট পরে। রেপ হবার কোনো চিহ্ন দৃশ্যমান নয়। তবুও পিএম আসার আগে কিছু বলা যাবে না। মেয়েটার শরীরে অনেক আঘাতের চিহ্ন। হাতে, বাহুতে, গলায়, গালে কালচে হয়ে আছে। মৃত্যুর আগে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিল মেয়েটা।
মেয়েটির মুখের কাছে গিয়ে শুকে কিছু বোঝার চেষ্টা করলো আরেফিন। এরপর তার চোখ পড়লো পাশের দেয়ালে। সেখানে রক্ত দিয়ে একটি তারিখ লেখা আছে। লেখার ফরম্যাট দেখে তারিখ বলেই মনে হল তার।
১৯-১০-১১
লেখাটার দিকে তাকিয়ে রইলো আরেফিন। হাতের ছাপ খোঁজার চেষ্টা সে করলো না।
‘এটা কার রক্ত দিয়ে লেখা, সেটা জানা জরুরী” আরেফিন বলল
‘কোনো আঙুলের ছাপ পাবার আশা করছেন কি?’
“একদমই না'
আরেফিন দেয়ালের বিপরীতে দাঁড়িয়ে মৃত লোকটির দিকে তাকালো। দেখে মনে হলো লোকটিকে বেঁধে রাখা হয়েছে। সে আবার লোকটির কাছে গেল। ভালোভাবে আবার তাকে দেখলো। লোকটির শরীর যেন সোফায় একদম দেবে গেছে।
সে উঠে এসে বেডসাইড টেবিলের ড্রয়ার খুলল। কোনোকিছুতে হাত না দিয়ে আবার লাগিয়ে রাখলো। আলমারি খুলতে ইশারা করলো ওসিকে। তারপর নিজে গিয়ে কয়েকটি দেরাজ খুলে দেখলো। সিন্দুক খুলল না৷ জানালার কাছে গিয়ে পর্দা সরিয়ে দেখলো। জানালার কাঁচ খুলে বাইরে তাকালো।
ইন্সপেক্টরকে কিছু না বলেই সে ডাইনিং রুমে গেল। ডাইনিং টেবিলের উপরে রাখা সবকিছুকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো। তারপর কিচেনে গেল। সেখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে আবার চলে এলো। ইন্সপেক্টরের এসব একদমই ভালো লাগছিল না। পাগলের মত এখান থেকে ওখানে ছুটাছুটি করতে দেখে সে বিরক্ত। ফ্ল্যাটের অন্যান্য রুমেও একবার করে ঘুরে ঘুরে দেখলো। এগুলো ফরেনসিক টিমের কাজ, সেখানে কিনা ফরেন্সিক টিমকে বের করে দিয়ে এএসপি নিজে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। সম্ভবত শার্লক হোমস বা ফেলুদার বই পড়ে সদ্য পুলিশ ফোর্সে এসে সেগুলো প্রয়োগ করতে চাচ্ছে। ওসি এমনটাই মনে মনে ভাবছে, বিরক্তও হচ্ছে আবার হাসছেও।
‘চলুন, এবার আমরা বাইরে যাই। ফরেন্সিক টিম তার কাজ করুক।
‘জ্বী, স্যার' ওসি পেছনে সরে দাঁড়ালো। আরেফিন ডাইনিং রুম থেকে সোজা বের হয়ে ফ্ল্যাটের বাইরে চলে এলো।
বাইরে এসে এসআই রফিককে ইশারায় কাছে ডাকলো।
‘আপনি লাশ নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করুন'
পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করলো আরেফিন। নিজে একটি নিয়ে ওসির দিকে প্যাকেটটি এগিয়ে ধরলো। ইনস্পেকটর কিছুটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে গেল। সে এখন নিবে নাকি নিবে না। তাকে এভাবে ভাবতে দেখে আরেফিন বলল,
‘নিন, নিন'
দুজনই কিছুক্ষণ সিগারেট টেনে গেল। তারপর আরেফিনই নিরবতা ভাঙলো।
‘আমি একটা সম্ভাব্য ক্রাইম পিকচার আপনাদের বলছি। অনেখ সময় ধরে ফ্ল্যাটে ভিকটিমদের সাথে খুনীও ছিল। খুনী তাদের পরিচিত এবং একজনই। সে তাদের সাথে মদ পান করে। তাদের মধ্যে কোনো ধস্তাধস্তি বা জবরদস্তি হয়নি। খুনী ভিকটিম ওয়ান মানে পুরুষটির গ্লাসে কোনো মাদক বা কেমিক্যাল মিশিয়েছিল। যাতে তার শরীর প্যারালাইজড হয়ে যায় কিন্তু সেন্স যেন থাকে” এটুকু বলে আরেফিন থামলো। আরেকটা সিগারেটে টান দিল।
‘এমন কি সম্ভব স্যার? এমন কোনো কেমিক্যাল আছে?’
‘অবশ্যই আছে। লোকাল এনেস্থিসিয়া কি প্যারালাইজড বা অবশ করে দেয় না?’
‘জ্বী, স্যার।
‘তারপর খুনী ভিকটিম টু'য়ের উপর ভিকটিম ওয়ানের সামনে পাশবিক নির্যাতন চালায়। তাকে রেইপ করে এবং অবশেষে ব্রুটালি মার্ডার করে। তখনও ভিকটিম ওয়ান জীবিত ছিল। এরপর ভিকটিম ওয়ানকে কার্ড বা ধারালো ধাতব কিছু দিয়ে গলা কেটে হত্যা করে'
‘চাকু নয় স্যার?
‘আমি পুরো ফ্ল্যাটে দ্বিতীয় মার্ডার ওয়েপন খুঁজে পাইনি। এবং এটা এমন কিছু যেটা খুনী সঙ্গে রাখে'
‘স্যার, তাহলে দুজনই কি খুনীর পূর্বপরিচিত?
‘হতে পারে, তবে তারা কোনো ব্ল্যাকমেইলের স্বীকার হয়ে থাকতে পারে'
‘এমন কোনো প্রমাণ কি পেলেন?’
‘আচ্ছু বলুন তো, এখানে কি শুধু তারা দুজনই থাকতেন? আর কেউ না?’
‘স্যার, এটা তাদের সেকেন্ড হোম। এখানে মূলত তারা পার্টি করতেই আসতেন।‘ এসআই রফিক বলল
‘আপনি জানলেন কি করে?’
‘মাঝে মধ্যে ভিআইপিরা আসতো। তখন আমাদের প্রটোকল মেইনটেইন করতে হতো'
‘গতকাল তো কোনো পার্টি ছিল না। তাহলে তারা কেন এলো?
‘সেটাই তো কথা স্যার। এমনটা খুব কমই হয়েছে। আমরা আগে থেকে না জানলেও পেট্রোলিং করতে বের হলে, আমরা তখন দেখতাম এখানে পার্টি হচ্ছে'
‘আমার বিশ্বাস খুনী তাদের এখানে এনেছিল বা আসতে বাধ্য করেছিল।‘
‘স্যার, এটা কি ব্যক্তিগত আক্রোশ নাকি বিজনেস রাইভালারি?’ ওসি জিজ্ঞেস করলো।
‘বিজনেস রিলেটেড কিছু নয়। তেমনটা হলে এভাবে মেরে ফেলার প্রয়োজন হতো না। যে কোনো জায়গায় মারতে পারতো। এখানে ডেকে এনে নির্যাতন করে মারা একমাত্র ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকেই হতে পারে।‘
‘আমরা এখন কোনটা ফোকাস করে এগোব, স্যার?
‘মি রফিক, দুইটা টিম গঠন করুন। একটি টিম কাজ করবে ভিকটিমদের সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য কালেক্ট করতে। আরেকটি টিম কাজ করবে এখানে আসা সকল ভিআইপিদের উপর নজর রাখতে। আমি আজ দুপুরের মধ্যে সকল ভিআইপির লিস্ট চাই।‘ আরেফিন সিগারেটটা ফেলে বলল
‘স্যার, আমাকে এসপি স্যারকে রিপোর্ট করতে হবে। যদি কোনো আপডেট জানাতেন-' ওসি হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলো।
‘এসপিকে বলবেন “তদন্ত চলমান”। সিগারেটে লম্বা টান দিল।
কথাটি শুনে ওসির মুখ পাংশুবর্ণ ধারণ করলো। এমন জবাব সে আশা করেনি। এসপি তো তাকে কিছু বলবে না, ওসিকেই ধরবে। মনের মত জবাব না পেলে ইচ্ছেমত বকবে।
‘মি রফিক, গত দু একদিন যাবৎ এ ফ্ল্যাটে কোনো কাজের লোক আসেনি। কাজের লোক কি ছিল না? আশেপাশের ফ্ল্যাটের লোকজন কি বলল?
‘স্যার, দু একবার আমি নিজেও এই ফ্ল্যাটে এসেছিলাম। তখনও কাউকে দেখিনি। পার্টির যাবতীয় কাজ বাইরে থেকে ভাড়া করে আনা লোকজন করতো। তবে আমরা জানতে পেরেছি ফ্ল্যাট বন্ধ থাকলেও নির্দিষ্ট সময় পরপর একজন লোক আসতো সবকিছু দেখভাল করার জন্য'
‘আপনি তাকে ধরে আনার ব্যবস্থা করুন। আর ওসি সাহেব, এদিকে কতটুকু ইন্টারোগেইট করতে পারলেন?’
‘স্যার, আমি নিজে এখনো ইন্টারোগেট করিনি। কেউ কিছু দেখেছে কিনা বা শুনেছে কিনা এতটুকুই জিজ্ঞেস করেছি’
‘এখন তো অফিস আওয়ার, আপনি নিচে একজন কনস্টেবল পাঠান। যারা এখানেই থাকে তাদের বের হতে সমস্যা নাই। কিন্তু অতিথি বা আগন্তুক যেই হোক, বিল্ডিং থেকে যেন বের না হতে পারে। আর সিসিটিভি ফুটেজ রিট্রাইভ করুন' আরেফিন কথা শেষ করে আরেকটি সিগারেট বের করলো। ওসির এই কথাটি খুব পছন্দ হয়েছে। তার মনে হলো, আসলেই এবার এএসপির সিরিয়াসনেস জাগ্রত হয়েছে।
আরেফিনের কথামত একজন কনস্টেবলকে নিচে পাঠানো হলো। আরেকজনকে সিসিটিভি ফুটেজ আনতে পাঠানো হলো। এসআই রফিক আরেফিনের নির্দেশ অনুযায়ী দুটি টিম গঠনের কাজ শুরু করলো। কাকে কোন টিমে রাখবে সেটা নিয়ে সে ভাবতে লাগলো। কিছুটা সে বিব্রত। ওসি থাকতে তাকে দিয়েছে টিম গঠনের কাজে। সে একবার ভাবলো ওসির সাথে পরামর্শ করবে। এমনও হতে পারে তার নাম ব্যবহার করে আসলে ওসিকেই নির্দেশনা দিয়েছে।
‘স্যার, কোনো ক্লু পেলেন?’ ওসি প্রশ্নটা করেই বুঝতে পারলো কি ভুলটা সে করে ফেলেছে। নাজানি কোনো বিদঘুটে জবাব আসে এবার।
‘অনেক ক্লু পেয়েছি। যা যা বলেছি সবকিছুই তো ক্লু। তবে আলমারিতে পিস্তল না থাকাটা আমার মাথায় খেলছে না।‘
‘সানি সাহেবের তো পিস্তল ছিল। লাইসেন্সড।‘ ওসির মাথায় পিস্তলের কথাটি ছিলই না।
‘যদি খুনী পিস্তল দেখে থাকে বা সে নিজেও নিয়ে থাকে তাহলে সে পিস্তল দিয়ে কেন মারলো না? আপনার কি মনেহয়?’
‘পিস্তলটা হয়ত গতকাল এখানে ছিল না।’
‘গতকাল না হোক, পিস্তলটা এখানেই থাকতো। আমি নিশ্চিত খুনী ওটাকে সরিয়েছে। এমন পিস্তল ব্যবহার না করার কারণ একটাই, সময় নিয়ে নির্যাতন করে খুন করা। তাছাড়া পিস্তল চালালে সাউন্ড হতো। সবাই জাগা পেত। এটা একটা সু-পরিকল্পিত হত্যা।‘
‘জ্বী স্যার। আমারও তাই মনেহয়'
‘গতকাল রাতে কি এদিকে বৃষ্টি হয়েছে?
‘জ্বী, স্যার। বেশ জোরেশোরে বৃষ্টি হয়েছে'
‘আপনারা কি এমন সময় ইন্ট্রুশনের কোনো চিহ্ন পেয়েছেন কোথাও?’
‘না স্যার। বৃষ্টি হয়েছে রাত দশটার পর থেকে।’
‘তারমানে এর আগেই ভিকটিমরা এসেছিল। এবং খুনীও।‘ কথাটি শেষ করে আরেফিন সিগারেটটি ফেলে দিল। এসআই রফিকের ফোনে একটি কল আসলো। সে ফোনটা পিক করে কথা বলতে লাগলো। আরেফিন ঘুরে দাঁড়িয়ে পাশের ফ্ল্যাটের দিকে যেতে লাগলো।
5C এর বিপরীত ফ্ল্যাটটি 5F। ফ্ল্যাটটি বন্ধ। বাইরে তালা ঝুলছে, তার উপর ধুলোর আস্তরণ। বোঝা যাচ্ছে ফ্ল্যাটটি বহুদিন যাবৎ বন্ধ রয়েছে। 5C এর দুই পাশের ফ্ল্যাটে লোকজন থাকে। 5D এর দরজা বন্ধ। কিন্তু বোঝা যাচ্ছে দরজার ওপাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। সূর্যের আলোর বিপরীতে দাঁড়ানোর কারণে দরজার নিচে দিয়ে ছায়া দেখা যাচ্ছে।
এসআই রফিক খুব বেশী সময় নিলো না কথা বলতে। সকালে যে নম্বর থেকে ফোন এসেছিল তার হদিস পাওয়া গেছে। সে দ্রুত আরেফিনের কাছে গেল।
“স্যার, যে নম্বর থেকে সকালে ফোন এসেছিল, তার ঠিকানা জানতে পেরেছি।“
“এই বিল্ডিংয়ের তো, নাকি?’ আরেফিনের কথাটি রফিকের উৎসাহ পুরোটাই মিলিয়ে দিল।
“জ্বী, স্যার। সাত তলা। 7B এর ঠিকানায় ফারুক নামে রেজিষ্ট্রেশন করা।”
“স্যার, সাত তলার লোক কিভাবে দেখলো পাঁচ তলায় খুন করে খুনী বের হচ্ছে?” ওসি অবাক হয়ে আরেফিনকে জিজ্ঞেস করল।
এমন সময় একটি মহিলার চিৎকারের আওয়াজ ভেসে আসলো। আরেফিন হাতঘড়ি দেখলো। দশটা বাজে। এসআই রফিক ছুটে গেলো সিঁড়ির দিকে। চিৎকারটা এত জোড়ালো ছিল যে সকল ফ্ল্যাটের লোকজন দরজা খুলে বের হয়ে এলো।
ওসি সিঁড়ির দিকে এগোতে লাগলো। আরেফিন তার পিঠে টোকা দিলো। হাতের ইশারায় লিফটের দিকে যেতে বলল। ওসি যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না, আরেফিন সত্যিই লিফটের দিকে ইশারা করছে কিনা। উপরের তলায় যেতে লিফট কেন ব্যবহার করতে হবে।
আরেফিনের পিছনে ওসিও লিফটে চড়লো। আরেফিন লিফটে সাততলা বাটনে প্রেস করলো৷ ওসি বিষয়টা খেয়াল করলো কিন্তু কিছু বললো না৷ সাত তলায় গিয়ে ওসি অবাক হয়ে গেল লোকজনের ভীড় দেখে। ওসি সবাইকে সরে যেতে বলে এগোতে লাগলো। আরেফিন তার পিছে পিছে হাঁটছিল। এসআই রফিক ফ্ল্যাটের ভেতরে। একটি মহিলা দরজার পাশে বসে কাঁদছে। ওসি ফ্ল্যাটে ঢুকতে যাবে এমন সময় আরেফিন তার হাত টেনে ধরলো। দরজার দিকে তাকালো। ওসি দেখলো দরজায় 7B এর ট্যাগ লাগানো। ট্যাগটা দেখে সে আরেফিনের দিকে তাকালো।
‘আপনি এক্ষুণি নিচে বলে দিন, বিল্ডিং থেকে যেন কেউ বের না হতে পারে' আরেফিন ওসিকে বলল। ওসি নির্দেশনা দেবার জন্য ওয়ারল্যাস হাতে নিল।
দরজার পাশে বসে থাকা মহিলাকে পাশ কাটিয়ে আরেফিন ফ্ল্যাটের ভেতরে ঢুকলো। আগের ফ্ল্যাটের মতই এই ফ্ল্যাটটা। ড্রইং, ডাইনিং রুমে সবকিছু গোছানো। রফিক বেডরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। আরেফিন বেডরুমের দিকে না গিয়ে ডাইনিং টেবিলের কাছে দাঁড়ালো। রফিক বিষয়টা বুঝতে পেরে এগিয়ে এলো তার কাছে।
“স্যার, এখানে কিছু পেলেন?’
আরেফিন একটি গ্লাসের দিকে তাকিয়ে ছিল। রফিকের কথায় মাথা ঘুরিয়ে বলল, “এই গ্লাসে রক্তের একটি দাগ আছে। খুনী এই গ্লাসে পানি খেয়েছে।“
“ফরেনসিক টিমকে আসতে বলব স্যার?
‘হ্যাঁ, বলুন।‘
আরেফিন বেডরুমের দিকে চলল। তার হাঁটাটা যেন শিকারী নেকড়ের মতো। নিঃশ্বব্দে পা টিপে টিপে চলছে। বাহ্যিকভাবে মনে হবে খুনী হয়তো বেডরুমের ভেতরে লুকিয়ে আছে। তাকে সে ধরতে যাচ্ছে, একটু শব্দ হলেই খুনী টের পেয়ে পালিয়ে যাবে। তাই তার এমন পা টিপে হাঁটা। কিন্তু সত্যটা হলো, সে নিজেকে খুনীর জায়গায় বসিয়ে ভাবছে। পাশাপাশি খুনীর মুভমেন্টের দৃশ্য কল্পনা করছে।
বেডরুমে একটিমাত্র লাশ বিছানায় পড়ে রয়েছে। লোকটির গলা কাটা। কাটা অংশ দিয়ে রক্ত গলে পড়েছে। বিছানায় পড়ে থাকা রক্ত জমাট বেঁধে গেছে। কপালে গুলি করা হয়েছে, একটা বড় ছিদ্র হয়ে আছে। কপালে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করা হয়েছে। ছিদ্রের চারপাষশে গান পাউডার লেগে আছে। দেখে মনে হচ্ছে, লোকটিকে যখন গলায় ছুড়ি বা ধারালো কিছু চালানো হয়, লোকটি যখন ছটফট করছিল, ঠিক তখনই তার কপালে গুলি করা হয়। একদম কোল্ড ব্লাডেড মার্ডার। কিন্তু গুলি চালানো হলো অথচ কেউ শব্দ শুনলো না, তা কি করে হয়। আরেফিনের এটা মানতে কষ্ট হচ্ছে। ভিকটিমের কন্ডিশন দেখে বোঝা যাচ্ছে খুনটা তাহলে রাতের মাঝামাঝি সময়ে হয়েছে। আরেফিন লাশটির মুখের কাছে গিয়ে শুকলো। লাশটিকে স্পর্শ না করেই হাতের চারপাশে দেখতে লাগলো।
আবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে এক নজরে রুমের চারপাশটা দেখে নিল। কোনো ভাঙচুর, বা অগোছালোর চিহ্নমাত্র নেই। বিছানার চাদরটাও টান টান হয়ে আছে। কোনোরকম ধস্তাধস্তি বা জবরদস্তির চিহ্ন নেই। দেখে মনে হচ্ছে, লোকটি মরার জন্য শুয়ে ছিল, খুনীটা এসে শুধু গলাটা কেটে দিয়ে চলে গেছে।
ওসি এসে আরেফিনের পেছনে দাঁড়ালো। আরেফিন চোখ বন্ধ করলো। চোখ বন্ধ করে খুনীর খুন করার ধরণটা কল্পনা করার চেষ্টা করলো। কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে জানালার পাশে গেল। জানালার পর্দা লাগানো। কিন্তু পর্দাটা দেখে মনে হচ্ছে জোর করে টেনে লাগানো হয়েছে। একটি পর্দা অন্যটির চাইতে বেশি জায়গা নিয়ে রেখেছে। সচরাচার এমন হয়না। দুই পর্দা সমানভাবেই লাগানো হয়। পর্দাটা টান দিলো সে। জানালার কাঁচে রক্ত দিয়ে কিছু সংখ্যা লেখা। ঠিক নিচের ফ্ল্যাটের মতই।
১২-৩-১৫
ওসি চমকে উঠলো। আরেফিনকে তেমন বিচলিত দেখালো না। সে বরং খুব কাছে গিয়ে লেখাটা দেখতে লাগলো। রক্তটা ভিকটিমের এটা নিশ্চিত সে। এবং যে লিখেছে তার হাতে গ্লাভস ছিলো।
“স্যার, কিছু বুঝলেন?” ওসি জিজ্ঞেস করলো
“পরিস্কারভাবে। দুই খুনই এক সূতোয় গাঁথা। পিস্তলটা যদি সানির হয়ে থাকে, তবে আশ্চর্য হব না। আপনি খোঁজ করুন গুলির আওয়াজ কে কে শুনেছে।”
“জ্বী, স্যার। নিচে সাংবাদিকেরা এসেছে। বিষয়টা জানাজানি হয়ে গেছে। এসপি স্যার ফোন করেছিলেন। আমরা থাকতেই আরেকটা খুন হয়েছে, এমন নিউজ প্রচার হচ্ছে। কি করব স্যার এখন?”
“আপনি বিল্ডিংটা সিল করে দিন৷ মালিক বা বিল্ডার্সকে আমি এক্ষুনি চাই। প্রতিটা ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য আমার চাই। আর সেই তথ্য অনুযায়ী কোন ফ্ল্যাটে কে আছে, সেটা যাচাই করুন। সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদের ব্যবস্থা করুন। আমি নিচে যাচ্ছি। আপনার টিমকে পুরো বিল্ডিং ঘেরাও করতে বলুন। প্রয়োজনে আরও লোক চেয়ে পাঠান। দ্রুত।”
“জ্বী, স্যার'
আরেফিন রুম থেকে বের হয়ে ফ্ল্যাটের বাইরে চলে এলো। ফরেনসিক টিম চলে এসেছে। এসআই রফিক করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে। সে অস্থির হয়ে আছে। তার মাথায় কিছুই ঢুকছে না। যে লোকটি তাদের খুনের কথা জানিয়ে দিল, সে নিজেই খুন হয়ে গেল। তবে কি খুনী বিল্ডিংয়ে এখনো অবস্থান করছে। আরও কেউ খুন হবে? এটা কি সিরিয়াল কিলিং? দিনদুপুরে পুলিশ থাকতেই এমনভাবে খুন সে মানতে পারছে না।
“মিঃ রফিক। আপনি ওসিকে ডাকুন। নিচে সাংবাদিকদের সাথে আমি কথা বলব” আরেফিন বলার পর করিডোর ধরে হাঁটতে লাগলো। করিডোর একদম পরিস্কার। টাইলসের উপর কোন পদচিহ্ন পাবার আশা করা বোকামি। সিসিটিভি ক্যামেরা করিডোরের দুই মাথাতেই লাগানো। ফুটেজগুলো দেখতে পেলে অনেককিছুই সমাধান হয়ে যেত। একটি খুনের কিনারা করার আগেই আরেকটি খুনের ঘটনা ঘটলো। প্রথম খুনটা নিয়ে একটুও ভালো করে ভাবার আগেই আরেকটি এসে বিষয়টাকেই জটিল করে দিল। সাংবাদিকদের সে কিবলবে সেটাই একন ভাবছে। তার এখন চিন্তা এই বিল্ডিংয়ে থাকা মানুষগুলোকে নিয়ে। খুনী যদি এদের মধ্যে কেউ হয়ও, তবুও সাধারণ মানুষেরা খুবই ভয়ে আছে। এদের পাশাপাশি সবাইকে অভয় দিতেই তার সাংবাদিকদের সাথে কথা বলা।
ওসি আসলো, তার পেছনে রফিক। ওসি ঘাঁমছে। তার এরিয়াতে এভাবে ফ্ল্যাট ধরে ধরে খুন হচ্ছে, অথচ তার এখানে কিছু করার নেই। দ্বায়িত্ব দেয়া হয়েছে পিবিআইকে। পিবিআই কাজ করবে পুরনো কেস নিয়ে, যেগুলোর রহস্য উদঘাটন করা যায়নি, সেগুলো নিয়ে। টাটকা কেস নিয়ে কেন পিবিআই কাজ করবে সেটাই ওসিকে রাগিয়ে দিচ্ছে। সে হয়ত ভেবেছিল কোনো মিশুক প্রকৃতির কেউ আসবে, কিন্তু এমন একজন এসেছে, যে প্রয়োজনের বেশি কথা বলে না৷ যা বলে, শুধু হুকুম দেয়। আর যা করে, তার মাথামুন্ডু কিছুই বোঝা যায় না। এখন আবার সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলবে। ওসির মনে প্রবল সন্দেহ আরেফিন সাংবাদিকদের সামনে নিশ্চিত মেজাজ হারিয়ে উল্টাপাল্টা কিছু বলে বসবে। মনের ভেতর আর সন্দেহ অবিশ্বাস চাপা রাখতে না পেরে ওসি বলরই বসলো,
“স্যার, কিছু ঠিক করলেন, কি বলবেন?’
‘হ্যাঁ, আপনি আমার সাথে চলুন।‘
লিফট উপরে আনার জন্য বাটনে চাপ দিতে গিয়ে দেখলো লিফট উপরেই আসছে। তবুও বাটনটি চাপলো। লিফট উপরে আসলো এবং একজন কনস্টেবল বের হলো লিফট থেকে। তার চেহারায় হতাশা, চোখে ভয়। সব অফিসারকে একসাথে এভাবে দেখে সে আরও ভয় পেয়ে গেল। তাকে এভাবে দেখে ওসি বলে উঠলো,
“আনিস সাহেব, এমন লাগছে কেন আপনাকে?’
লোকটি বেশি সময় নিলো না। খারাপ খবরটি যত দ্রুত জানানো যায়, তত সেটা থেকে মুক্তি মেলে। লোকটি বলল, ‘স্যার, গতকাল থেকে সিসিটিভি কাজ করছে না। হার্ডড্রাইভে গতকালকের কোনো ফুটেজ নেই।‘
‘আনিস সাহেব, আপনি কি এটা বলতে ভয় পাচ্ছিলেন? এটা তো হবার কথাই। এতগুলো খুন করে খুনী সিসিটিভিতে নিজের চেহারা দেখাবে?” আরেফিন সহাস্যে বলল। ওসি ও অন্যান্যরাও এই প্রথম আরেফিনের মুখে কিঞ্চিৎ হাসি দেখলো।
তারা তিনজন লিফটে চরে নিচে নেমে এলো। নিচে অনেক হইচই হচ্ছে। লোকজনে ভর্তি হয়ে গেছে বিল্ডিংয়ের সামনের রাস্তা। টিভি চ্যানেলগুলোও লাইভ টেলিকাস্ট করছে পুরো বিষয়টা। লোকজনও তাদের হাতে থাকা স্মার্টফোন নিয়ে আনস্মার্টের মত ভিডিও করছে। কিন্তু কি ভিডিও করছে আর কেনইবা করছে তা পরিস্কার নয়। পুলিশের কনস্টেবলগুলো চেষ্টা করছে সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিকদের সামলে রাখতে। আরেফিন হাত দিয়ে ইশারা করলো সাংবাদিকদের এগিয়ে আসতে। সাংবাদিকেরা দৌড়ে তার কাছে চলে এলো। সাংবাদিকেরা মাইক্রোফোন এগিয়ে ধরে একের পর এক প্রশ্ন করতে লাগলো। কোনো কথা না বলে আরেফিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। এভাবে প্রায় দুই মিনিট যাবার পর সবার প্রশ্ন যখন মাত্র একটায় এসে দাঁড়ালো, ‘স্যার কিছু বলুন', তখন আরেফিন বলতে শুরু করলো।
“এই বিল্ডিংয়ের দুটি ভিন্ন তলায় আমরা তিনটা বডি পেয়েছি। মার্ডারগুলো হয়েছে গতকাল রাতে, এমনটা আমাদের ফরেনসিক টিমের প্রথমিক ধারণা। আমরা তদন্ত শুরু করেছি। এই বিল্ডিংয়ের মাসুষজন সহ সাধারণদের প্রতি আমার একটাই কথা, আপনারা ভয় পাবেন না। এটা কোনো সিরিয়াল কিলিং এর ঘটনা নয়। সিরিয়াল কিলার কখনো একরাতে একাধিক খুন করে না। এটা একটা পরিকল্পিত খুন। আমরা সেটার মোটিভ খুঁজতে শুরু করেছি, আশাকরি খুব দ্রুতই খুনের কিনারা করতে পারব। আপনারা আতঙ্কিত হবেন না, পুলিশ সতর্ক রয়েছে। ধন্যবাদ।”
সাংবাদিকেরা আবার একেরপর এক প্রশ্ন করতে শুরু করলো। আরেফিন পেছন ফিরে চলে যেতে লাগলেন। সাংবাদিকদের সেটা পছন্দ না হওয়ায় কিছুটা উদ্ধতভাবে প্রশ্ন করতে শুরু করলো। সেদিকে কোনো কোনো কর্ণপাত না করে আরেফিন ওসিকে চলে আসার ইঙ্গিত করলো। লিফটের কাছে এসে আরেফিন বলল,
“রফিক, আপনি উপরে যান। ফরেনসিক টিমের কাজ শেষ হলো কিনা দেখুন। আর ফারুকের বডিটিও পোস্টমর্টেম করতে পাঠিয়ে দিন”
এস আই রফিক চলে গেল। এমন সময় ভিড় ঠেলে একটি গাড়ি এই বিল্ডিংয়ে আসার চেষ্টা করছে। ওসি গাড়িটি দেখে বলল, ‘স্যার, বিল্ডার্সের কেউ এসে গেছে'
‘এখানে কি বসার ব্যবস্থা করা যায়?’
‘স্যার, একটা অফিসরুম আছে এখানে। আমরা ওখানেই বসি'
‘ঠিক আছে চলুন'
গাড়িটি ভেতরে আসতে পারলো না। গাড়ি থেকে নেমে শিয়ালি রঙের স্যুট-প্যান্ট পরা একজন ব্যক্তি একটি ফাইল হাতে এগিয়ে আসতে লাগলো৷ লোকটি এসে সালাম দিল। পরিচয় দিতে গিয়ে বলল,
‘স্যার, আমি মারুফ আহসান। জেকে কনস্ট্রাকশন এর সিনিয়র এক্সিকিউটিভ।’
‘তাহলে একজন কর্মকর্তাকে পাঠালো আপনাদের প্রতিষ্ঠান? ‘বলার পর আরেফিন অফিস রুমের ভেতরে ঢুকলো। ঘরের মাঝখানে একটি টেবিল রাখা। তার পেছনে একটি বড় চেয়ার। আর টেবিলের সামনে দেয়াল ঘেষে রয়েছে বেশ কয়েকটি সোফা। ওসি আরেফিনকে চেয়ারে বসতে ইঙ্গিত করলো। আর সে নিজে সোফায় বসলো। দাঁড়িয়ে রইলো শুধু মারুফ আহসান। আরেফিন তাকেও বসতে বলল।
“স্যার, আমাদের ডিরেক্টররা সবাই ঢাকার বাইরে আছেন। তারা বিষয়টা সম্পর্কে অবগত। তারা সশরীরে আসতে না পারায় বিব্রত। আপনার সাথে কথা বলতে চান। আমি ফোনটা ধরিয়ে দেই স্যার?’
‘আপনাদের সৌজন্যতা ভাল লেগেছে। আমাকে শুধু তথ্য দিলেই চলবে'
‘স্যার, এই ফাইলে এই বিল্ডিংয়ের সকল ফ্ল্যাট মালিকের মূল ডকুমেন্টসগুলো রয়েছে। আমি একটি ফটোকপিও এনেছি।
‘আপনি দুটোই আমাকে দিন। মূলকপি আপনার কাছে পাঠিয়ে দেব।’
‘স্যার, আর কোনো কোশ্চেন?’
‘জায়গাটার মালিক কে?’
‘স্যার, মি জাফর সাদিক। উনি তিনতলার পুরো এপার্টমেন্ট নিয়ে থাকেন'
‘ভিকটিমদের নাম জানেন?’
‘জ্বী, স্যার। নিউজে দেখেছি।’
“আপনাদের সিসিটিভি ঠিক আছে?’
“জ্বী স্যার। আমরা প্রতি তিন মাস পরপর মেইনট্যানেন্স করি।’
“অপারেটরকে ডাকুন তো' আরেফিন এসআই রফিককে ইশারা করলো। রফিক কিছুক্ষণ আগে এখানে এসেছে৷ পাশের রুম থেকে একজন লোক আসলো। সে অনেকটা জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়াল। লোকটি ভয়ে ভয়ে সালাম দিল। মাঝ বয়সী, বয়স পঁয়ত্রিশের আশে পাশে। শরীরের রং তামাটে। ঘেমে গিয়ে তা কালচে বর্ণ ধারণ করেছে। উচ্চতা সাড়ে পাঁচ ফিটের মত। চোখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। আরেফিন ওসিকে ইশারা করলো প্রশ্ন করতে।
“আপনার নাম কি?’ ওসি জিজ্ঞেস করলো
“স্যার, মোবারাক হোসেন।”
“কতদিন হলো এখানে কাজ করেন?”
“স্যার, তিন বছর।”
“গতরাতের সিসিটিভি ফুটেজ আছে?’
লোকটি চুপ করে রইলো। মারুফ আহসান বিচলিত হয়ে পড়লো। এমন মৌনতা সে আশা করেনি। সে কিছু বলতে গিয়েও বলল না, নিজেকে সংবরন করলো।
“কি হলো, জবাব দিচ্ছেন না কেন? এসআই রফিক জোরে বলল
“স্যার, ফুটেজ ফোল্ডারে নেই। হার্ডড্রাইভে নেই”
“এমন কি প্রায়ই হয়? ফুটেজ হার্ডড্রাইভে সেইভ হয় না?”
“না স্যার। গত পড়শুর ফুটেজও আছে। এখনও সেভ হচ্ছে”
“তাহলে গতকালকেরটা নাই কেন? কে ডিলিট করেছে?”
“জানি না স্যার”
“টেকনিক্যাল কোনো প্রবলেম নেই তো?
“না স্যার, সব ঠিক আছে”
“আপনারা কতজন কাজ করেন?”
“আমরা স্যার দুইজন কাজ করি। এ সপ্তাহে আমার দিনে ডিউটি”
“ওসি সাহেব, ওনাকে, কেয়ারটেকারকে ও আরেক অপারেটরকে থানায় নিয়ে যান। গেস্ট লগবুক ও হার্ডড্রাইভ সিজ করেন।’ আরেফিন বলল। লোকটি কেঁদে ফেলল। রফিক তাকে টেনে বাইরে নিয়ে গেল। মারুফ আহসান হতভম্ব হয়ে পুরো বিষয়টা দেখলো।
“মারুফ সাহেব, আপনি এখন আসতে পারেন। পরে দরকার হলে ডাকবো”
- “স্যার, এ্যাট এনি টাইম। আমরা আমাদের দিক থেকে সর্বোচ্চ সহায়তা করব।”
- মারুফ বের হয়ে গেল। ওসি আরেফিনের দিকে তাকালো। আরেফিন সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটি সিগারেট ধরাল। প্যাকেটটি ওসির দিকে এগিয়ে দিল। ওসি ইতস্ততভাবে একটি সিগারেট নিল। কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ। শুধু সিগারেট টানা হলো।
- “যে মহিলাটি চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে গেল, সে ভিকটিমের কে?” আরেফিন জিজ্ঞেস করলো। ওসি রফিকের দিকে তাকালো।
- “স্যার, ওনার স্ত্রী।”
- “নাম কি?” হাতে থাকা ফাইলের পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে জিজ্ঞেস করলো আরেফিন।
“নামটা তো জিজ্ঞেস করা হয়নি। প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া চলছে। জ্ঞান ফিরলে কথা বলব”
“স্যার, আমরা তাহলে কোন দিকে আগাব?” ওসি সরলভাবে প্রশ্ন করলো।
আরেফিন কিছুক্ষণ সময় নিলো। হাতে রাখা সিগারেটটা টেনে লম্বা একটি দম নিল। গলায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল, “রফিককে যা বলেছি সেটা সে করুক। আর নতুন ভিকটিমের জন্য আরেকটি দল করুন। আজ বিকেলে আমি আপডেট চাই। আমি চাইনা আর কোনো ভিকটিম হোক।“
“আপনি কি সত্যিই বিশ্বাস করছেন এটা সিরিয়াল কিলারের কাজ?” ওসি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো।
“একদমই না , কিন্তু কিছু একটা ব্যাপার আছে খুনগুলোর মধ্যে। খুনগুলো পাশবিক কিন্তু শৈল্পিক। আসলে তিনটি খুন তিন রকম কেন? এটা আমি ভাবছি। যদিও কমন বিষয় হলো, গলা কাটা। ফরেনসিক রিপোর্ট আসুক, আমার বিশ্বাস মেয়ে ভিকটিমটা সেন্সলেস ছিল, আর তার স্বামী ছিল প্যারালাইজড। আর ফারুক ছিল জীবিত। গলা কাটার পর গুলি করা হয়েছে। কিন্তু কেন? কেন সিডেটিভ বা এনেস্থিসিয়া ব্যবহার করলো না? এগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে।“ আরেফিন এবার থামলো
“স্যার, সকলের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। আই উইটনেস তো কেউ নেই, তারপরেও যদি সাসপিশাস কিছু কেউ দেখে থাকে। আপনাকে বিকেলের মধ্যে ফাইলটা দিতে পারব।” হুমায়ুন বলল
“খুনী অবশ্যই এখানে রেকি করতে এসেছিল। এবং তার সহযোগী আছে। গত কিছুদিনের ফুটেজ দেখলে কিছু সাসপেক্ট পাওয়া যেতে পারে। রফিক, আপনি খুব ভালো কাউকে দিয়ে ভিডিওটা বারবার দেখান। আর দ্রুত ভালো কিছু রেজাল্ট দিতে বলুন। কোনো ক্লু না বের করতে পারলে আগামী তিনমাসে কোনো ছুটি পাবে না।” আরেফিন বলার পর রফিক বের হয়ে গেল। তার হাতে হার্ডডিস্ক।
“স্যার, আমাকে এবার অনুমতি দিন। আমি থানায় যাই এখন”
“ওহ, শিওর। ইউ ক্যান মুভ অন। বাট, ডু অন মোর জব প্লিজ। এই এলাকার আবাসিক হোটেলগুলতে গত কিছুদিনের আবাসিক মানুষদের তালিকা যোগাড় করে দিন। ডাজ ইন্ট ইট সিমস্ টু বি এ্যা ফানি জব?” সিগারেটটা আঙুলে টোকা দিল আরেফিন।
“র্যাদার, দ্যাট ক্যান বি আ মাস্টারস্ট্রোক আই থিংক।” ওসি হুমায়ুন আরেফিনের দিকে তাকাল। তবে এবার তার চোখে নতুন কৌতূহল, নতুন করে আরেফিনকে বোঝার চেষ্টা। সচরাচর পুলিশের দৃষ্টিকোণেরও বাইরে তার দৃষ্টি।
ওসি হালকা সাবধান হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। স্যালুট দেবার ইচ্ছা তার নেই। বয়সে ছোটো একজনকে স্যালুট দিতে বড়ই দ্বিধা করে সবার। আরেফিন সানগ্লাস চোখে পরেই ফাইলটা দেখছে। ওসি বুঝলো, এ লোককে বুঝা মুশকিল।
(চলমান)