কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে থেকে থেকে দু’টি চোখ ভীষণ ক্লান্ত। হাতের আঙ্গুলগুলোও আর কিবোর্ডের ওপর চলতে চায় না। হাসান হঠাৎ লেখা বন্ধ করে সামনের দেয়ালের দিকে তাকায়। যেন রঙ্গীন দেয়ালের নিরেট বুকে সে ফেলে আসা জীবনের প্রতিচ্ছবি খুঁজে ফেরে। নিজের অজান্তেই বুক ভেঙ্গে বেরিয়ে আসে একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস। অনেক কিছুই হওয়ার কথা ছিল তার। ক্লাসের মেধাবী ছাত্র থেকে মহাকাশ বিজ্ঞানী কিংবা তরুণ মেধাবী নাট্যকর্মী থেকে বিশ্বের সমকালীন শিল্প সংস্কৃতির অঙ্গন কাঁপানো নাট্যকার কিংবা নাট্যনির্মাতা কিংবা আরও অনেক কিছু। আরও অনেক কিছুই ঘটতে পারতো তার জীবনে। অনেক কিছুই তার এই নিস্তরঙ্গ, বিবর্ণ, বিরস জীবনকে রঙ্গীন, আনন্দময়- অর্থবহ করে তুলতে পারতো। কিন্তু হয় নি। কিছুই হয় নি। কেন হয় নি? হয়ত সে চায় নি। নইলে কলেজের পাট চুকিয়েই তো সে এ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়ার জন্য স্কলারশিপ জোগাড় করে ফেলেছিল স্টেট্স এর একটি নামকরা ইউনিভার্সিটিতে। কিন্তু তার যাওয়া হয় নি। সে যায় নি। নাটকের ওপর হাইয়ার স্টাডির জন্য স্কলারশিপ জুটেছিল জার্মানীতে। সে যায় নি। নিউইয়র্ক-আমাস্টারডাম এর বড় বড় মঞ্চে কাজ করার অফার সে অনায়াসে ফিরিয়ে দিয়েছে। সে চায় নি। কেন চায় নি? এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে অনেকদিন পর একটা মুখের ছবি তার চোখের সামনে ভেসে উঠে।
হ্যাঁ, জেনির মুখ। এই একটা মুখচ্ছবি যার প্রতি শর্তহীন মুগ্ধতা তার জীবনকে এমন নিস্পন্দ করে দিয়েছে। হ্যাঁ নিস্পন্দই তো বটে। এখন কী করে সে? এই মাঝে মাঝে নাটক বিষয়ে টুকিটাকি লেখালেখি, নাটকের প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা, কর্মশালার ক্লাস নেওয়া, মাঝে মাঝে নবীন নাট্যকর্মীদের সাথে আড্ডা দেওয়া আর দেশি-বিদেশি কোনো নামীদামী নাটকের লোক আসলে তাদের সাথে দেখা সাক্ষাত করা-এইতো। এর বাইরে আর কিছুই করা হয় না। তার আর কিছু করারও নেই। অথচ একদিন কত কিছুই না করতো। স্বপ্নের পেছনে কি উদ্যমেই না ছুটে বেরিয়েছে সে। অথচ কোনো এক সর্বনাশা ফাগুনে ঐ মুখের প্রতি তার অপলক দৃষ্টি তাকে চিরতরে স্তব্দ করে দিয়েছে। এরপর অনেক কিছুই সে অনেকভাবে চেষ্টা করেছে। কিন্তু কিছুই তার সেভাবে আর করা হয়ে উঠে নি। সে সত্যিই জেনিকে ভালোবাসতো। অদ্ভুত সে ভালোবাসা। যে ভালোবাসার কথা মুখ ফুটে কোনোদিন সে জেনিকে বলতে পারে নি। বলতে চেষ্টাও করে নি। ভাবতো ভালোবাসা যদি সত্যিই স্বর্গীয় হয় তবে জেনি একদিন না একদিন ঠিকই বুঝতে পারবে এবং তখন তার কাছে ঠিকই চলে আসবে। সেজন্য সে অপেক্ষাও করে। কিন্তু তার অপেক্ষাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে জেনি অন্যের হয়ে যায়। তবু সে হাল ছাড়ে না। অবশেষে জেনি তার চোখের সীমানা থেকেও বহুদূরে চলে যায়। তবুও সে অপেক্ষায় থাকে। সে মনকে প্রস্তুত করে। ভাবে, জেনি যদি শেষ বয়সেও তার কাছে ফিরে আসে তখনও সে তাকে নির্দ্বিধায় গ্রহণ করবে। এই অপেক্ষাতেই দিন গুণে গুণে সে এখন জীবন সায়াহ্নে এসে দাঁড়িয়েছে। এর মাঝে জেনি একবার কি দুইবার বাংলাদেশে এসেছে। কিন্তু সে দেখা করে নি। এখন জেনি অস্ট্রেলিয়ায় আছে। সে জানে এবং তার সব খবরই সে রাখে। তবু তার সাথে যোগাযোগের কোনোরকম চেষ্টা সে করে না। তার বিশ্বাস ভালোবাসা সত্যি হলে জেনি নিজের থেকেই তার কাছে আসবে কিংবা যোগাযোগ করবে। যদিও এখন আর সে তেমন একটা ভরসা পায় না। দিনতো দেখতে দেখতে শেষ হতে চলল। তবে কি এ জগৎ এ জেনির সাথে তার দেখা হবার আর কোনো সম্ভাবনাই নেই? তবে কি পরকালে তার সাথে জেনির দেখা হবে? না কি সেখানেও তাকে এমন ধোকা খেতে হবে। ভাবতেই তার মন বিষাদে ভরে উঠে। ভাবে, তার জীবনটা কি তবে ব্যর্থই হলো? এক মানবীর তরে তার পুরো জীবনই কি তবে উৎসর্গকৃত? তাই কি কবি এটা বলেই জীবন নষ্ট করেছিলেন-
“এক জীবনে কতটা আর নষ্ট হবে,
এক মানবী কতটাই বা কষ্ট দেবে।”
তার আর কিছুই ভাবতে ইচ্ছে করে না। সে কম্পিউটারের টেবিল ছেড়ে ছোট্ট খোলা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকায়। দেখে আকাশ জুড়ে অনেক তারা। হঠাৎ দেখে তার ভেতর থেকে একটি তারা ঝরে পড়ছে। তার হঠাৎ মনে পড়ে ছোটবেলায় শুনেছিলো- তারা ঝরতে দেখে কিছু চাইলে তা পাওয়া যায়। সে এভাবে অনেক অনেক রাত তারা ঝরতে দেখে জেনিকে চেয়েছে। কিন্তু পায় নি। তারপর বিষয়টা ভুলেই গেছে। আজ হঠাৎ করেই তার কিছু চাইতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো তার আর কিছুই চাওয়ার নেই। তবু তার নিজের অজান্তেই মন থেকে বেরিয়ে এলো-“ জেনির সাথে এই জীবনে যেন আর একবার দেখা হয়।” তারপর তার ভাবনা হঠাৎ অন্যদিকে মোড় নেয়। ভাবে, রাতের এত তারারা দিনের আলোয় কোথায় পালায়? ভাবে, পালাবে কোথায়? আকাশেই থাকে। যেমন জেনি তার বুকে আছে অহর্ণিশ। শুধু মাঝে মাঝে অন্ধকারে উঁকি দেয়।