১ম পর্বঃ দ্বিতীয় সাক্ষাৎ
'আপনাকে সরাসরি বলে দেই, আমার একটি ছেলের সাথে প্রণয় আছে' একটু সময় নিয়ে আবার বলল, 'তাই আপনাকে বিয়ে করতে পারব না। সরি, বিষয়টা একটু বুঝবেন আশাকরি।' হাতে থাকা টিস্যু পেপার ভাঁজ করতে করতে লাবণী বলল। সে জানে না তার সামনে বসা ছেলেটা কি ভাববে। সে লজ্জায় চোখ তুলে তাকাতে পারছে না। কিন্তু কিছু করারও নেই তার। বিয়ে সে করতে পারবে না।
লাবণীর বাসা থেকে বিয়ে ঠিক করা হয়েছে একটি ছেলের সাথে। ছেলেটি আমাদের গল্পের নায়ক, জাহিদ। জাহিদের সাথে আজ সে দেখা করতে এসেছে। বসেছে শহর থেকে দূরে একটি রেস্টুরেন্টে। লাবণী আজ তাকে মানা করে দিতে এসেছে, সে বিয়েতে রাজি নয়। ছেলেটিও যেন বিয়েতে অমত দেয়৷ তার সম্পর্কের কথাটি বলে লাবণীর বুকে হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে। এখন ছেলেটির জবাবের অপেক্ষায়। তবে এটুকু বিশ্বাস তার আছে, কোনো সম্পর্কে থাকা মেয়ের সাথে কোনো ছেলে বিয়ে করতে রাজি হবে না।
কিন্তু লাবণীকে অবাক করে দিয়ে জাহিদ বললো, 'সম্পর্ক থাকাটাই তো স্বাভাবিক। আপনি অকপটে প্রকাশ করেছেন, আমার ভাল লেগেছে। আর আপনি যাকে ভালোবাসবেন, তাকেই তো বিয়ে করবেন।'
'তাহলে আপনি এই বিয়েতে না করে দিচ্ছেন?' লাবণী এখন অনেকটাই প্রাঞ্জল।
'আপনি যে সত্য বলছেন, তার প্রমাণ কী?' লাবণীর চোখে চোখ রেখে বলল জাহিদ। তার মুখে দুষ্টুমি সূলভ হাসি।
এমন কোনো প্রশ্ন আসবে, সেটা লাবণী ভাবেনি। তার কোনো প্রস্তুতিও ছিলো না। তার ধারণা ছিলো সম্পর্কের কথা শুনেই হয় ছেলেটি উঠে চলে যাবে, নয়তো ভদ্রভাবে বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে নিবে৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই লাবণী নিজের চিন্তার পরিধি কমিয়ে আনলো। সে বলল,
'আমি তার সাথে আপনার কথা বলিয়ে দিতে পারি।'
'ছেলেটা যে আপনার নাটকের চরিত্র নয়, তার প্রমাণ কী?' হাতে থাকা নকিয়া সেটটা টেবিলে রাখলো জাহিদ। বুঝিয়ে দিলো, সে কথা বলতে রাজি নয়। লাবণীকে বিচলিত হতে দেখে সে আবার বলল 'আপনার সাথে তার কোনো ছবি বা এমন কিছু প্রমাণ আছে, যা দেখে বুঝব আপনারা সত্যিই কোনো সম্পর্কে আছেন?'
হাতের টিস্যু টেবিলের এক পাশে রেখে লাবণী চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলো। সে যতটা সহজে ভেবেছিল কাজটা হয়ে যাবে, ততটা সহজে হচ্ছে না। নিজের জড়তা কাটিয়ে সে এবার বলল 'আপনি হয়তো এমন মানুষ দ্বারা পরিবেষ্টিত যারা মিথ্যা কথা বলে অভ্যস্ত। কিন্তু আমি সেরকম নই। আমি সত্যিই বলছি। ভেবেছিলাম আপনি আমার বিষয়টা বুঝে বিয়েতে অমত জানাবেন৷ কিন্তু এখন সেটা আমাকেই করতে হচ্ছে। আমি এমন সন্দেহবাতিক ছেলের সাথে বিয়েতে রাজি নই।' লাবণীর কন্ঠে দৃঢ়তা।
জাহিদ কিছুটা অবাক হয়ে গেল। লাবণীকে যতটা সরল ভেবেছিল, ততটাও সে নয়৷ কথায় সে জাহিদকে ভালই টেক্কা দিতে জানে।
জাহিদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বলল 'আমি আপনাকে অবিশ্বাস করতে চাচ্ছি না। শুধু এতটুকু নিশ্চিত হতে চাচ্ছি আমাক অপছন্দ হবার কারণে আপনি কোনো মিথ্যে গল্প সাজাচ্ছেন না।'
'আপনাকে অপছন্দ হবার কোনো কারণ নেই, কিন্তু আমি সত্যিই বলছি।'
'নিশ্চিন্ত হলাম। জীবনের দ্বিতীয় ইন্টারভিউতেও সরাসরি রিজেকশন জুটলো না বলা যায়।'
'দ্বিতীয় ইন্টারভিউ মানে? এর আগেও কারো সাথে দেখা করেছেন?'
'হ্যাঁ, চাকুরীর ইন্টারভিউ!' বলার পর মুচকি হাসলে জাহিদ।
লাবণীও হাসলো।
'এবার আপনার ভালোবাসার মানুষটির কথা বলুন। কে সেই ভাগ্যবান মানুষ? খেতে খেতে কিছুক্ষণ গল্প করি' জাহিদ হাত উঠালো ওয়েটারকে ডাকতে।
'সে আমার সিনিয়র ছিল। এখন একটি সরকারী ব্যাংকে চাকুরী করে'
'আপনার সিনিয়র অথচ ব্যাংকে চাকুরী করে, বুঝলাম না।'
'সরি, সে আমার কলেজে সিনিয়র ছিল। পরে আবার পরিচয় হয়। তারপর সম্পর্কটা এগোয়।' নিজের পরিণয়ের কথা কখনো এভাবে বলতে হবে তা লাবণী ভাবেনি।
'আমাকে একটি দিন সময় দিন৷ আমি ভেবে আপনার পরিবারকে জানাব' জাহিদের কথায় লাবণী কিঞ্চিৎ অবাক হয়ে গেল। বিয়েতে অমতের কথা জানাতে আবার একদিন ভাবতে হবে কেন?
'আজকে বলে দিলেই ভাল হতো না?' লাবণী কিছুটা ক্ষোভের সুরেই বলল।
'দেখুন, আজই যদি না করে দিই তাহলে আপনি স্বস্তি পাবেন। কিন্তু দুটি পরিবারে কয়েক ডজন মানুষ কষ্ট পাবে। তারা যেন কষ্ট না পায় সেটার ওয়ে একটা বের করতে হবে। এজন্যই একটা দিন সময় দরকার'
লাবণী বিষয়টা বুঝতে পারলো। সে আর কথা বাড়ালো না৷ তবে তার ভেতরেও প্রশ্ন জাগছিল, জাহিদ সম্পর্কে। কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করতে পারলো না।
'আমার একটা আবদার থাকবে, আপনি দয়া করে স্বাভাবিক হোন। জড়তা ঝেরে ফেলুন। বন্ধু ভাবতে হয়ত কষ্ট হবে, আপনি আগন্তুকই ভাবতে পারেন। আর একদিনের আগন্তুক কিন্তু বন্ধুর মতই।' জাহিদ থামলো
'আপনি আগন্তুক নন, আমার পরিবারের নিশ্চয় পরিচিত। শুধু আমার সাথেই কখনো দেখা হয় নাই, এই যা'
'এই আফসোসটা আপনি সারাজীবন করবেন, আমি জানি।' জাহিদের কথায় লাবণী হেসে দিল। লাবণীর আদ্র ঠোঁট জাহিদের চোখে ঝিলিক দিল।
সে আবার বললো, 'আপনি কতক্ষণ সময় নিয়ে এসেছেন? লাঞ্চটা একসাথে করা যায়? টেবিলটা রিজার্ভ করা ছিল আমাদের জন্য' জাহিদ কথা শেষ করলে লাবণী দেখলো চারপাশের টেবিলও ফাঁকা। এখন অবশ্য এগারোটা বাজে, দুপুরে প্রচুর লোক আসবে। ওয়েটার এসে দাঁড়িয়েছে তাদের টেবিলের কাছে।
'সমস্যা নেই, আমার হাতে সময় আছে। দ্রুত ফিরলে বরং বাবা-মা সন্দেহ করবে। ভাববে কোনো ঝামেলা করে এসেছি।' লাবণী স্যুপের ভেতরে চামচ ঘুরাতে লাগলো।
'বেশি দেরি হলে ভাইয়া রাগ করবে না তো?' জাহিদ হেসে ফেলল
'দেখুন, আপনি এমন কথা বললে আমি সত্যিই চলে যাব' একটা অভিযোগের সুর লাবণীর কন্ঠে
'আচ্ছা, লাঞ্চ অর্ডার করি। আপনি আপনার পছন্দের অর্ডার করুন। অবশ্য আপনি চাইলে আমিই আপনার হয়ে অর্ডার করতে পারি'
'আমি কি খেতে পছন্দ করি, তা আপনি জানেন? কেউ বলে দিয়েছে নিশ্চয়?'
'আপনাকে একবার দেখলেই বলে দেয়া যাবে, আপনি কি কি পছন্দ করেন'
'আপনি বাড়িয়ে বললেন না তো? পরীক্ষা নিলে যদি ফেইল করেন!'
'মেয়েদের পছন্দ রং গোলাপী বা ভায়োলেট হয়, কিন্তু আপনার পছন্দের রং এ্যাকুয়া।' জাহিদের কথায় লাবণীর মুখটা স্থির হয়ে গেল। তার হাসি উবে গেল।
লাবণী আজ হালকা পার্পল রঙের জামা পরেছে। তার সাথে মিল রেখে গহনা ও জুতাও পরেছে৷ তার ভ্যানিটি ব্যাগটা ম্যাজেন্টা রঙের। জাহিদ কিভাবে বুঝলো লাবণীর পছন্দের রঙ এ্যাকুয়া, তার মাথায় আসলো না।
সে আগ্রহ দমাতে না পেরে বলেই ফেলল, 'আপনি সঠিক না ভুল তা বলব না, তবে আপনার কেন এমন মনে হলো?'
'আমি জানি আমি সঠিক। তবে আপনার কৌতুহল দূর করতে বলছি, আপনি যখন গাড়ি থেকে নামলেন, আমি দেখলাম গাড়িতে থাকা কুশনের রঙটা স্কাই ব্লু, পেছনে ও সামনে রাখা টিস্যু হোল্ডারটা নীল। এবং যে শো-পিসটা আছে সেটাও স্কাই ব্লু৷ এবং সবশেষে আপনার ফোনের ব্যাক কভার ফিরোজা রঙের, যেটা আপনার ব্যাগে রাখা। আর কিছু বলতে হবে?'
লাবণী অবাক হয়ে গেল। বলল 'আপনার অবজারভেশন ক্ষমতা ভাল। পছন্দ হলো।'
'আর ঘন্টা দুই থাকলে আমাকেও আপনার পছন্দ হয়ে যাবে! জাহিদ মুচকি হাসলো
'এমন হোক, সেটা নিশ্চয় আপনিও চাইবেন না' লাবণী সহাস্যে বলল
'না, চাইব না৷' এরপর জাহিদ একে একে লাবণীর কয়েকটি পছন্দের খাবার অর্ডার করলো। লাবণী চমকিত হলো এবং কোনোটাতে সে হ্যাঁ বললো আবার কোনোটা এখন খাবে না বলল। অর্ডারকৃত খাবার আরও চল্লিশ মিনিট পর আনতে বলল জাহিদ।
'আমি নিশ্চিত, আপনি আমাকে নিয়ে স্টাডি করেছেন। সেই সুযোগ ও সময় দুটোই আপনার ছিল' লাবণী বলল
'হ্যাঁ ছিল। তবে আমি সে পথে যাই নি। অযথা সময় নষ্ট করতে আমি রাজি নই। আপনি চাইলে এখনই আমার সম্পর্কে সব বলে দিতে পারবেন। এজন্য আপনাকে আমার বাসায় গিয়ে আপনাকে জেনে আসতে হবে না'
'শার্লক হোমস এর খুব ভক্ত মনেহয়? '
'অবশ্যই। তবে কিছু জিনিস ব্যাখ্যা করতে শার্লক হবার প্রয়োজন নেই। আচ্ছা, আপনি আমাকে দেখে বলুন, আপনি কি বুঝতে পারলেন?'
'আপনি ছেলে' বলেই লাবণী হেসে ফেলল
'এলিমেন্টারি মাই ডিয়ার ওয়াটসন! তারপর' কথাটি শুনে লাবণী কিছুটা থমকে গেল। বিষয়ট বোঝার পর দুজনই হাসল।
'তারপর... আপনি বাইক চালিয়ে এসেছেন। আপনার পছন্দের রং লাল। কারণ আপনার বাইকের রঙটা লাল, আমি দেখেছি। আপনি আঙটি পড়েন, কিন্তু কেন?'
'বাইকের রঙ লাল বলে আমার পছন্দের রঙ লাল নয়। আঙটি পড়ি আমার মা'য়ের কারণে। তিনি কোনোভাবে কনভিন্সড যে, আঙটি হাতে পড়লে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয় এবং যে কোনো কাজে গেলে সফলতা আসে!' জাহিদ মুচকি হেসে তাকালো লাবণীর দিকে।
'আপনিও তাই বিশ্বাস করেন?' লাবণী কৌতুহলী চোখে তাকাল।
'না, আমি হাতের রেখায় বিশ্বাসী। কারণ আমি তা পাল্টে যেতে দেখেছি'
'পাল্টে যেতে দেখেছেন মানে? কখন পাল্টালো?'
'ভার্সিটিতে থাকতে। হঠাৎ একদিন সকালে ডান হাতের তালুতে লম্বা একটা দাগ দেখলাম, যেটা লাইন অব সাকসেস ক্রস করে গেল। তারপর একটি ঘটনার পর সেটা মিশে গেল!' জাহিদ নিজেও দ্বিধায় এমন একটা ভাব করলো, ডান হাতের তালুটা লাবণীর দিকে ধরল।
'সেই দাগটি কি ফল দিয়েছিল?' লাবণী স্মিত হেসে জাহিদের দিকে তাকালো। চোখে তার কৌতূহল। এমন কথা সে কখনো শোনেনি। তার ধারণা মানুষের হাতের রেখা সময়ের সাথে সাথে প্রকাশিত হয়, কিন্তু সেটা পরিবর্তনও হয়, এটা কখনো ভাবেনি।
'ক্যাম্পাসে একবার প্রচন্ড আন্দোলন হয়, আমরা প্রচুর চাপে ছিলাম। বিশেষ করে আমিও। রাতে হলে থাকতে পারতাম না, গ্রেফতারের ভয় ছিল। পরে অনেক ঝামেলা পোহানোর পর বিষয়টা সমাধান হয়ে যায়। ঘটনার কয়েকদিন পরে আমি হাতের রেখাটি আর দেখতে পাইনি' জাহিদ হাতের তালুর দিকে তাকিয়ে বলল।
'কি নিয়ে আন্দোলন করেছিলেন?'
'সেমিস্টার ফি কমানোর জন্য'
'পেরেছিলেন কমাতে?'
'হ্যাঁ, ৭০০ টাকা কমেছিলো!' বলেই জাহিদ হেসে দিল। আবার বলল, 'অনেকের কাছে এই সাত'শ টাকাই অনেক। পরিশ্রমটা তাদের জন্য ছিল' জাহিদ লাবণীর দিকে তাকালো। লাবণীও তাকিয়ে আছে জাহিদের দিকে। পরস্পরে নিজেদেরকে আবার লুকালো।
'আঙটিটার বিষয়ে বলুন তো। এটা কোন পাথর?' লাবণী জিজ্ঞেস করলো
'এটা কোরাল রেড। যদিও আমি জিরকন পছন্দ করি। সেটা আমার রাশির সাথে যায়'
'আপনি না বললেন, আপনি এসব বিশ্বাস করেন না!'
'বিশ্বাস করি না, কিন্তু জানতে তো সমস্যা নাই'
'হ্যাঁ, আজ কি মা'কে খুশী করতে পরা হয়েছে?'
'জ্বী, কিছুটা ওইরকমই'
'ইশ, আপনি এবার সফল হতে পারলেন না।.. সরি...' লাবণী লাজুক একটি হাসি দিল
'সফল নাকি ব্যর্থ এখনই বিচার করছেন কেন? আপনার মত একজন ডাক্তারের সাথে বসে কথা বলছি, এটা কি একটা সফলতা নয়?'
'আমি ডাক্তার নই, ডেন্টিস্ট!'
'একই কথা। হিউম্যান ফিজিওলজি তো আপনার পুরোটাই জানা'
'হুমম' লাবণী একটু থেমে বলল, 'আগন্তুকের সম্পর্কে কি কিছু জানা যায়? বলতে কি কোনো দ্বিধা আছে' জাহিদ হেসে ফেলল। এ হাসিটা অন্যরকম, কিছু হেরে গিয়ে জয়ের মত।
'অবশ্যই, আপনি জানতে পারেন। বলুন কি জানতে চান?
'আমি যাবার পর আপনি কিভাবে সামলাবেন বিষয়টা?' লাবণীর এই প্রশ্নটা জাহিদ আশা করেনি। সে তাহলে এখনো পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে।
'সেটার দ্বায়িত্ব তো আমি নিয়েছি। আমি যেটার দ্বায়িত্ব নিই, সেটা আমি একাই নিয়ন্ত্রণ করি। আপনার বিচলিত হবার কিছু না'
'না, না, আমি আসলে আপনার কথা জানতে চাচ্ছিলাম। বিষয়টা কেমন হয়ে গেল না, আমি তো বিয়ে করতে চাচ্ছি না। সবাই জানলে আপনাকে কি বলবে'
'একটু মায়া জন্মেছ তাহলে!' আবার হাসলো জাহিদ। লাবণীর অভিব্যক্তি কষ্টের দেখালো। এরপর বললো, 'আমি একজন উদাসীন মানুষ। স্থিরতা, বন্ধনে আবদ্ধতা এগুলো আমায় টানে না। বাউন্ডুলে জীবন আমার, এটাই আমাকে আনন্দ দেয়। আপনি আমাকে নিয়ে একটুও চিন্তা করবেন না' জাহিদ থামলো। তার চোখে খুশীর আভা চকচক করছে।
লাবণী অনেক চেষ্টা করলো, কিন্তু সেই চোখ পড়তে পারলো না। লাবণী আসলে জাহিদকে ধরতেই পারছে না। মেয়েরা যে কোন চোখের চাহনি বুঝতে পারে, ধরতে পারে চোখের দৃষ্টির পরিসীমা। চোখ আসলে কি চায়, কি খোঁজে - এটা বুঝতে পারা মেয়েদের যেন চিরন্তন ক্ষমতা। কিন্তু লাবণী দ্বিধাগ্রস্ত। সে বোকা বনে বসে আছে। বারবার চেষ্টা করছে।
'আপনি বিয়ে করতে রাজি হলেন কেন?'
'সত্য বলব?'
'বলেন'
'আপনার সাথে এই মিটিংয়ের আয়োজন করতে!' জাহিদ হাসলো
'তারমানে আপনি জানতেন আমি বিয়েতে না করব?' লাবণী যেন আকাশ থেকে পড়ল।
'বিষয়টা এমন নয়। আপনার ছবি দেখে কেউ আপনার সাথে কথা বলতে চাইবে' জাহিদের কথা লাবণীর বিশ্বাস হলো বলে মনে হলো না
'আপনি কি বলুন তো? আপনাকে আমি বুঝতে পারছি না' লাবণী সব জড়তা ছেড়ে যেন হারটা স্বীকার করে নিলো।
'আমি লাইব্রেরিতে থাকা সেই বইটা, যেটা সবাই দেখে কিন্তু হাতে নিয়ে পড়ে না, কারণ সবাই লাইব্রেরিতে যায় বড় বড় বই পড়তে। আমার মত কয়েক পৃষ্ঠার বই পড়তে না' জাহিদ থামলো, সে হাসছে
'আপনার সম্পর্কে বলুন। আপনার জীবনে কি কেউ আসেনি?' লাবণী চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল
'বহু এসেছে। কেউ থাকতে চেয়েছে, কেউ থাকতে চায় নি' জাহিদের কথায় এবারও লাবণী চুপ করে রইলো। এমন উত্তর সে আশা করেনি
'এখন কেউ নেই?' লাবণী খুব ধীরে জানতে চাইলো
'শেষ জনের সাথে গতবছর ডিসেম্বরে ব্রেকআপ হয়েছে'
'কি কারণে, জানতে পারি?'
'অবশ্যই, আমাকে সিগারেট ছাড়তে বলেছিল। আমি তাকেই ছেড়ে দিয়েছি' জাহিদ জোরে হেসে ফেলল।
লাবণী অবাক হলো। এই গোলাপি ঠোঁট নিয়ে সে কিভাবে সিগারেট খায়। মানে, সিগারেট খেলেও তার ঠোঁট কিভাবে গোলাপি থাকে?
'আমার বিশ্বাস হয় না, আপনি সিগারেট খান?'
'মিস লাবণী, আপনি অনেক কিছুই বিশ্বাস করতে চাইবেন না। চলুন এবার লাঞ্চটা করে নিই' জাহিদ ওয়েটারকে ইশারা করলো খাবার দিয়ে যেতে।
'আজ আমার জীবনের সেরা লাঞ্চটি হতে যাচ্ছে' জাহিদের কথা শেষে লাবণী কিছু বলতে চাচ্ছিলো কিন্তু জাহিদ দুই হাত দিয়ে নিজের কান চেপে ধরলো। লাবণী এই কান্ড দেখে হাসি আটকাতে পারলো না।
রেস্টুরেন্টের বাইরে কয়েকজন ছেলে বাইকে বসে দেদারসে সিগারেট ফুঁকছে আর বারবার হাতঘড়িতে তাকাচ্ছে। তারা জাহিদের বন্ধু । তারা খুব চিন্তিত জাহিদ ও লাবণীর সাক্ষাৎ নিয়ে।
ঠিক দুপুর একটা বাজার পর তারা দেখলো জাহিদ ও লাবণী হাসতে হাসতে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে আসছে। তারা অপরিচিত লোকের মত আড্ডায় মজে গেল। আড় চোখে তাকিয়ে দেখলো, জাহিদ লাবণীকে তার গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিলো। লাবণীর গাড়ি চলতে শুরু করলো। লাবণী জানালা দিয়ে হাত বের করে জাহিদকে হাত নেড়ে বিদায় জানালো। জাহিদ ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলো।
নোবেল যে জাহিদের খুবই কাছের বন্ধু, সে সিগারেটটা ফেলে জাহিদের দিকে এগিয়ে গেল। জাহিদের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। সিগারেটের প্যাকেটটা জাহিদকে এগিয়ে দিয়ে বলল, 'কি বুঝলি? প্রেমে পড়বে?'
একটা সিগারেট হাতে নিয়ে জ্বালিয়ে লম্বা একটা টান দিয়ে আবার আকাশে ধোঁয়া ছেড়ে জাহিদ বললো, 'বিশ ভাগ প্রেমে পড়েছে। বাঁকিটা সে নিজে যুদ্ধ করে হারুক!'