Posts

গল্প

Love by Design (পর্ব ২)

April 28, 2026

Zihad Sheikh

Original Author জিহাদ শেখ

61
View

পর্ব ০২ঃ জাহিদ লাপাত্তা

২.
বাসায় ফিরে জাহিদ দেখলো সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে। মা', চাচী, ফুপু ও পিচ্চি ভাই বোনেরা। সে মুচকি হাসি দিয়ে নিজের রুমে চলে গেল। ফ্রেশ হয়ে রুমে বসতেই মা' ভেতরে ঢুকলেন। সাথে ছোটো বোন।

'ভাইয়া, ভাবী কি খাওয়ালো তোমাকে?' বলার পর হাসতে হাসতে ঢলে পড়ল মেহজাবিন। সে জাহিদের চেয়ে দশ বছরের ছোটো।

'কিছু না আপু। আগে তোমাদের সবাইকে খাওয়াবে' জাহিদ চেয়ারে বসল।

মা' মেহজাবিনকে বললেন, 'মামনি, তুমি একটু বাইরে যাও, আমি তোমার ভাইয়ার সাথে কিছু কথা বলি'

মেহজাবিন বাইরে গেল হাসতে হাসতে৷ জাহিদ পকেট থেকে একটা কিটক্যাট বের করলো। এখনো সে চকলেটের ভক্ত। মেহজাবিন দৌড়ে এসে হাতে নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল।

'বাবা, বলো তো,  কি চিন্তা করলে?

'মা' কিছুদিন সময় দাও' জাহিদ বলল

'মেয়ে কি রাজি নয়?'

'ঠিক তেমন না। তবে একটু সময় দাও। সে নিজেদের বোঝাপোড়া বাড়াতে সময় চাচ্ছে৷ তাছাড়া এখন তো এভাবে কিছু হয় না। একটু সময় দিলে দুপক্ষের জন্যই ভাল হয়'

'আমি কি ওই পরিবারের সাথে কথা এগিযে নিব?'

'তাদেরকেও এই কথাই বলো। এভাবেই তোমরা নিজেদের মধ্যে আত্মীয়তা বাড়িয়ে নাও'

'ঠিক আছে। তুমি রেস্ট করো' মা' বের হয়ে গেলেন।

এবার চাচী ও ফুপু ঢুকলেন জাহিদের রুমে। জাহিদ হেসে তাদের বসতে বলল। তারা দুজন পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হাসছেন।

'ছবির মতই সুন্দরী নাকি একটু কম?' ফুপু জিজ্ঞেস করলেন

'হা হা হা, ছবির মতই সুন্দরী। সাথে নিয়ে ঘুরতে পারবেন' জাহিদ আবার হো হো করে হাসলো

'আমরা না, তুই ঘুরিস। দুআ করি। থাক, যাই' ফুপু ও চাচী চলে গেলেন

জাহিদ বিছানায় গা এলিয়ে দিল। তার অনেক কাজ বাঁকী। সে সেগুলো নিয়ে ভাবতে থাকলো। তাকে এই মিশনটা সফল করতেই হবে৷ সবাই যেখানে তাকে সহযোগিতা করছে সেখানে সে জিতবেই৷

৩.
লাবণীর বাসায় যেন একটা উৎসবের আমেজ চলছে। বাসায় খুব বেশী আত্মীয় স্বজন না থাকলেও বিয়ে বাড়ির যে একটা মজমা, তা বোঝা যাচ্ছে। লাবণীর গাড়ি বাসাতে ঢুকতেই ব্যালকণি থেকে সব পিচ্চিরা চিল্লায়ে উঠলো, 'আপু এসেছে'!

বর এসেছে জানাতে যেমন সবাই চেঁচামেচি করে, এখনকার চেঁচামেচিটা তেমনই শোনালো। লাবণীর একটুও ভাল লাগলো না। সে গাড়িতে বসে শুধু ভেবেছে, জাহিদকে নিয়ে। জাহিদের কোনো উদ্দেশ্যেই সে ধরতে পারেনি। জাহিদ কি চায়, সেটা জানে না৷ জাহিদ যে রাগবে তার সম্পর্কের কথা শুনে, সেটাও সে করেনি। লাবণী যতই চেষ্টা করছে অন্য কিছু ভাবতে, ততই তার চোখে জাহিদের হাসিমুখ ভাসছে। 'আহ, ওই পিংক ঠোঁট, সরছেই না'। এটা ঠিক হচ্ছে না। লাবণী জাহিদেে চিন্তা দূর করতে মোবাইল বের করল, কোনো কারণ ছাড়াই বাটন চাপতে থাকলো। কিন্তু কোনো লাভ হলো না।

গাড়ি থেকে নেমে লাবণী বাসার মধ্যে ঢুকলো। বাবা-মা' দুজনই বাসায়। দুই খালামণিও এসেছে লাবণীর প্রথম সাক্ষাতের সাক্ষী হতে। সাথে এসেছে কিছু পিচ্চির দল। তারা যেন ঈদের আনন্দ পাচ্ছে৷ লাবণীর একদমই পছন্দ হলো না৷

সে যদিও হাসছে, তবুও তার মনে নানান সন্দেহ। জাহিদ বিয়েতে অমত দিবে কিনা৷ দিলে কি হবে। বাবা-মা' আত্মীয় স্বজন কি ভাববে। বিয়ে ভেঙে গেলে এখনও সবাই বাঁকা চোখে তাকায়। লাবণীর তো বিয়ে হবেই, সে তো পছন্দ করেই রেখেছে। কিন্তু সবাই কি ভাববে?

লাবণী তার রুমে যেতে লাগলো। তার বড় খালা ডাক দিলো, 'লাবণ্য, এখানে বসো মা'

অগত্যা পেছন ফিরে সে সোফায় এসে বসলো। তার লজ্জা লাগছিল। যদিও সে জানে বিয়ে হবে না, কিন্তু সবার হাসিখুশি চেহারা তাকে বিব্রত করতে লাগলো৷ মনের কোনো কোণে কিছুটা বিষণ্ণতা গ্রাস করেছে। নিজের মনে প্রশ্ন জাগতে শুরু করেছে, নিজের স্বার্থের জন্য এতোগুলা মানুষের মন ভাঙা তার ঠিক হচ্ছে কিনা। লাবণীর নিজের সাথে যুদ্ধ মাত্রই শুরু হতে যাচ্ছে। পাঠক, আমরা দেখতে থাকি লাবণী সে যুদ্ধে জেতে কিনা!

'লাবণ্য, পছন্দ হয়েছে ছেলেকে?' ছোটো খালা জিজ্ঞেস করলেন।

লাবণী চরম অস্বস্তিতে পড়ে গেল। 'হ্যাঁ' তো সে বলবেই না, কিন্তু সে না-ও বলতে পারছে না। 'না' বলার এখানে কোনো কারণই নেই। ছেলে যথেষ্ঠ ভদ্র, নম্র ও সর্বোপরি আকর্ষণীয়। তাকে 'না' বলার কোনো মানেই হয় না। কিন্তু সে যে তাকে নিয়ে ভাবছেই না। তার হৃদয়ে যে সজীবের জায়গা, শুধু সজীব। সজীবকে সে মনেপ্রাণে ভালোবাসে। ভালোবাসা তখনই পাকাপোক্ত হয় যখন সেটা কোনো ঝড়ের কবলে পড়ে। লাবণীর প্রেম মাত্রই এাটি ঝড়ের কবলে পড়েছে।

অনেকক্ষণ লাবণীকে চুপ থাকতে দেখে, তারা পরস্পরের দিকে তাকালেন। বুঝলেন যেটা, সেটা লাবণী বোঝাতে চায়নি।

'মৌনতাই সম্মতির লক্ষণ' বড় খালা বললেন

'এত তাড়াতাড়ি কেন এলি তুই? আমি তো ভেবেছিলাম সন্ধ্যায় আসবি?' ছোটো খালা বললেন

'না, খালা। অনেক দেরি করে ফেলেছি। আমি তো দেখা করতে চাইনি। তোমরাই তো পাঠালে'  লাবণী বলল

'মা, তোমার কি এ বিয়েতে মত নেই?' বাবা জিজ্ঞেস করলেন

'না, বাবা। আমি তা বুঝায়নি। কিন্তু পরিবার ছাড়া একা দেখা করাটা আমার ভাল লাগেনি' লাবণী নিজেকে লুকালো। দেখা করাটা যে তারই উদ্দেশ্য ছিল, সেটা এখন সে লুকাতে চায়।

'বুঝেছি লাবণ্য, তুমি আটকা পড়েছো। যাও, রুমে যাও। পরে কথা হবে' বড় খালা বললেন

লাবণী তড়িৎগতিতে নিজের রুমে গেল। তাকে একটা কাজ করতে হবে। সজীবকে ফোন দিতে হবে৷ কিন্তু লাবণী এটা বুঝলো না, সে যা করছে, যা বলছে সবই তার বিপরীতে চলে যাচ্ছে। তার পরিবার ক্রমশই ভেবে নিচ্ছে, লাবণী এ বিয়েতে অনেক খুশী।

লাবণী দ্রুত জামা পাল্টিয়ে এসে সজীবকে ফোন দিল। তার অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে৷ সজীব হয়ত রেগে আছে। ফোনটা রিসিভ হতেই লাবণী বলল, 'খেয়েছো?'

'তোমাকে ছাড়া আমি কখনো খাই?' ওপাশ থেকে গম্ভীর আওয়াজ আসলো।

'সরি, আমার অনেক দেরি হয়ে গেল। আমি আগেই ফোন দিতে পারতাম, কিন্তু কি একটা কাজে দিতে পারিনি।.. সরি..'

'সমস্যা নেই। তুমি খেয়েছো' সজীবের প্রশ্নে লাবণী কি বলবে বুঝতে পারলো না। সে কিছু সময় নিয়ে বলল,

'আমি দুপুরের আগে নাস্তা করেছি। এখন খাব। বাসায় খালামণিরা আসছে তো'

'কথা হয়েছে ছেলেটার সাথে? সে কি প্রস্তাবে রাজি?' সজীব জিজ্ঞেস করলো

'হ্যাঁ, সে রাজি হয়েছে। তবে একদিন সময় নিয়েছে'

'কেন?'

'আমি জানি না৷ সবাইকে সে হার্ট করতে চায় না। তাই সময় নিয়ে মানা করতে চায়'

'আচ্ছা। ছেলেটার নম্বর আছে তোমার কাছে? দিও তো'

'এই যা, আমি তো নম্বর নিইনি'

'আচ্ছা, সমস্যা নাই। সম্ভব হলে যোগাড় করো, না পারলে থাক'

'আচ্ছা, তুমি খেয়ে নাও। আমি রাখছি এখন'

ফোনটা রেখে লাবণী চিন্তার সাগরে ডুব দিলো। সে একটা ভুল করে ফেলেছে। সে জাহিদের ফোন নম্বরটা নেয়নি এবং নিজেরটাও দেয় নি। এখন সে কিভাবে তার সাথে যোগাযোগ করবে? জাহিদ কি প্ল্যান করছে, সেটা সে কি করে জানতে পারবে?

একটা উপায় আছে তার হাতে। বাব-মা'র কাছে তাদের বাসার নম্বরটা থাাকতে পারে। বাসায় ফোন দিয়ে হয়ত জাহিদকে পাওয়া যাবে। কিন্তু সে বাসার নম্বরটা কিভাবে যোগাড় করবে এখন। লাবণী সত্যিই অনেক চিন্তায় পড়ে গেল।

লাবণীর মা' ঘরে ঢুকে দেখলেন লাবণী পায়চারি করছে। তিনি কিছুটা অবাক হলেন।

'খাবে না এখন?' লাবণীর মা জিজ্ঞেস করলেন।

'না, আম্মু। আমি তো খেয়ে এসেছি'

'লাবণ্য, তুমি যতই লুকানোর চেষ্টা করো, আমার কাছে পারবে না। তুমি জাহিদকে বিয়েতে অমত দিতে বলো নি তো?' মায়ের শিকারী চোখ লাবণীর চোখ খুঁজতে লাগল।কিন্তু লাবণী নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে।

লাবণী চুপ করে রইলো। মাথা নাড়ালো, সে এমনটা করেনি। তার মা'য়ের কাছে জবাবটি পছন্দ হলো না।

'তুমি যার সাথে কথা বলো, আমি সেই ছেলেটিকে দেখেছি। তাকে তখনও পছন্দ হতো না, এখনও পছন্দ হয় না। বাঁকিটা তুমি সিদ্ধান্ত নাও। বড় বোনের মত ভুল করবে, নাকি আমাদের কথা মেনে জাহিদকে বিয়ে করবে' লাবণীর মা' অনেকটাই রেগে কথা বললেন

'আমি আপুর মত ভুল করব না, আম্মু'

আর কোনো কথা না বলে, তার মা' রুম থেকে বের হয়ে গেলেন। লাবণীর চিন্তার পথ আবার ঘুরে গেল।

তারা দুই বোন। বড় বোনের নাম অবণী। সে ভার্সিটিতে পড়াকালীন ক্লাসমেটকে ভালোবেসে ফেলে। বাবা-মা'কে জানায় পছন্দের কথা। কিন্তু বাবা-মা' রাজি হন না। অবণী যে ভুলটা করে, সে ঢাকা থেকে আর বাসাতে ফিরেনি। ওখানে বিয়ে করে সংসার করতে শুরু করে। পরে বাসায় জানতে পেরে, সবাই তাকে পরিত্যাগ করে৷ বাবা এখনও অবণীর সাথে কথা বলেন না৷ মা' লাবণীর মাধ্যমে অবণীর খোঁজ নেন। কিন্তু নিজে কথা বলেন না৷

কিন্তু যে বিষয়টি লাবণী বুঝতে পারে না, তা হলো; তার বাবা-মা' দুজনেই অনেকটা প্রেম করেই বিয়ে করেছেন। দুজনই ডাক্তার। একই মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন তারা। কিন্তু তারা তাদের মেয়েদের সম্পর্কে রাজি নয়। তাদের যুক্তি, তাদের মেয়েরা বোকা। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। লাবণী জানে না কবে তাদের এই ভুলটা ভাঙবে।

লাবণী এখন কিভাবে জাহিদের সাথে যোগাযোগ করবে। লাবণীর মাথায় একটি দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল। জাহিদকে দিয়ে যদি আব্বু আম্মুকে রাজি করানো যায়, তাহলে তো খুবই ভালো হতো। এটা নিয়ে সে ভাবতে লাগলো।

সজীবকে বাবা-মা'র অপছন্দের কারণ লাবণী আজও বের করতে পারেনি। সজীব সোনালী ব্যাংকের বড় কর্মকর্তা। ভাল বেতন ও সুযোগসুবিধা পায়। পৈতৃক সম্পদ অনেক রয়েছে। তাহলে অপছন্দের কারণ কী?

৪.
বিকেলে করতোয়া নদীর পাড়ে জাহিদ তার বন্ধুদের নিয়ে বসেছে। সবার আলোচনার বিষয় জাহিদ এখন কি করে লাবণীকে বিয়ে করতে পারে। আজ রেস্টুরেন্টে তাদের আলোচনার সমস্ত ঘটনাই জাহিদ বন্ধুদের বলেছে। বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানীবান ধরা হয় জয়'কে। সে যতটা না চালাকচতুর, তার চাইতে বেশি সে নিজেকে ভাবে। সবাই প্রথমে তাকেই বলল এখন জাহিদের কি করা উচিত।

জয় অনেকক্ষণ চুপ মেরে থাকলো। সিগারেটটা জ্বালিয়েও খেলো না। সে দেখালো, সে অনেক ভাবছে। হঠাৎ তুড়ি মেরে বলল, 'জাহিদ তুই লাপাত্তা হয়ে যা কয়েকদিনের জন্য। মেয়েটা অস্থির হয়ে যাবে, তোকে খুঁজবে। ততদিনে তোদের বিয়ের কথাও পাঁকা হয়ে যাবে' লঙ্কা জয় করার হাসি হাসলো সে। এবার সিগারেটে ঠোঁট লাগালো।

কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। মানিক বললো, 'লাপাত্তা হয়ে গেলে আর বাসর করতে হবে না'

'ভাই তুই, জয়া আহসানকে নিয়া চিন্তা কর। সেটাতেই তোর মঙ্গল' সাহেদ বলল

'তোরা যাই বলিস, জয়ের আইডিয়াটা আমি আগেই ভেবে রেখেছি। আমি কিছু সময়ের জন্য হারিয়ে যাব। যাতে লাবণী আমাকে খুঁজতে থাকে' জাহিদ বলল

'তোরে ফোন দিলেই তো খুঁজে পাবে৷ ফোন কি বন্ধ রাখতে পারবি?'

'আমি তো আমার নম্বর ওকে দিইনি' জাহিদের কথা যেন কারো বিশ্বাস হলো না। যখন সে চোখ বন্ধ করে সায় দিল, তখন শাফিন হঠাৎ করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

'বলিস কি! যার জন্য এতকিছু, তাকে কাছে পেয়েও ফোন নম্বর নিসনি?' শাফিনের কথাতে যেন সবাই সমর্থন করলো, শুধু নোবেল ছাড়া। সে ও জাহিদ হাসছে।

'দেখ, আমি যদি নম্বর দিতাম সে ভাবতো আমি তার প্রতি দূর্বল। এবং আমি কিছুটা পেছনে থাকতাম। সে নিশ্চিন্ত থাকতো। এখন সে অনেক অস্থির হয়ে আছে, আমার মুভমেন্ট জানার জন্য। আমি ভাবছি, কখন মানা করব, কি বলে মানা করব- তা নিয়ে সে বিচলিত থাকবে এখন। আর এটাই আমার দরকার। তাকে অস্থির করে রাখা' জাহিদ থামলো। সবাই মনযোগ সহকারে শুনলো এবং মাথা নেড়ে সায় দিল।

'এটা বুঝলাম। কিন্তু নিজেকে লুকিয়ে রাখবি কোথায়?'

'বলব, সময় হলেই বলব। তোরাই তো আমার প্রোডিউসার৷ এখন যা একজন, নিত্যের চপ নিয়ে আয়'। নিত্যের আলুর চপ। এ এক বিখ্যাত খাবার। চপের মধ্যে থাকা খাসির মাংসে যখন দাঁতের কামড় পড়ে, তখন যে স্বাদ মুখে আসে তা যেন স্বর্গীয়।

বিকেলের আড্ডাটা পার্টি করে শেষ হলো। জাহিদ নোবেলকে নিয়ে বাসায় ফিরলো। নোবেলকে বাইকটা বাসার ভেতরে তুলতে বলে সে বাসায় ঢুকলো। ফুপু চলে গেছেন। চাচী হাসতে হাসতে জাহিদের কাছে এসে বললেন,

'অনেক দূর তো এগিয়ে গেছো, পাত্রী পক্ষ তো তোমার খোঁজ নেয়া শুরু করছে'

'চাচী, বুঝলাম না। কি হইছে?' জাহিদ মুচকি হেস জানতে চাইলো

'তোমার ছোটো খালা শ্বাশুড়ি ফোন দিছিলো, তোমার নম্বর নিলো। তারা নাকি কথা বলবে' চাচীর কথা শেষ হতেই জাহিদের মুখটা ঝিলিক দিয়ে উঠলো।

ছোটো খালা নয়, লাবণী নম্বরটা চেয়েছে৷ তারমানে জাহিদ একদম ঠিক পথে আগাচ্ছে। লাবণী জাহিদকে খুঁজছে। লাবণী অস্থির হয়ে আছে। কিন্তু এখনো ফোন দেয়নি কেন?

জাহিদ চাচীর কাছে থেকে চলে এসে পকেট থেকে ফোনটা বের করলো। চাপ দিয়ে দেখলো আলো জ্বলে না৷ তারমানে ফোন বন্ধ হয়ে আছে, এজন্য কোনো ফোন আসেনি।

সে রুম থেকে ফোন চার্জার নিয়ে বের হলো। মায়ের কাছে গিয়ে বলল, 'মা' আমি এখন সালমানের বাসায় যাচ্ছি। রাতে ওখানেই থাকব। সকালে চলে আসব'

মা' কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু বললেন না। মেহজাবিনকে ডেকে বিদায় নিয়ে সে বাসার বাইরে আসলো। নোবেলসে দেখলো সে গ্যারেজে বাইকটা স্ট্যান্ড করে রাখছে। দূর থেকেই নোবেলকে বলল, 'নোবেল, বাইক রাখিস না। বের কর। নন্দীগ্রাম যাব'

রাগে নোবেলর মুখ লাল হয়ে গেল। এত ভারি বাইক সে একা রাস্তা থেকে বাসার মধ্যে এনেছে, আবার তার বের করতে হবে। সে বুঝতে পারলো না হঠাৎ এই সিদ্ধান্তের কারণ কী! কিন্তু জাহিদের মাথায় খুব ভালোভাবেই সব পরিকল্পনা চলতে থাকলো।

৫.
বিকেলটা একদমই কাটছে না লাবণীর। সজীবের সাথে কথা বলেছে। কিন্তু তবুও ভাল লাগছে না। তার মাথায় একটাই চিন্তা, জাহিদকে কিভাবে ম্যানেজ করে আব্বু আম্মুকে রাজি করানো যায়।  জাহিদ যদিও কথা দিয়েছে, কিন্তু তার চোখে সে ভিন্ন কিছু দেখেছে। তার চোখে কোনো হারের ঝলক ছিলো না, বরং বিজয়ের ঝিলিক ছিলো।

কফি এনে দিয়ে গেল কাজের মেয়েটি। দুই চুমুক দিয়েই তার তিতা লাগলো। ওভাবেই টেবিলে কফিটা রেখে সে ব্যালকণিতে গেল। দোতলার ব্যালকণি থেকে দেখলো পিচ্চিরা নিচে খেলছে৷ তারও খেলতে ইচ্ছে করছিল। কিন্ত সে অনেক বড় হয়ে গেছে। ওসব খেলা আর খেলা হবে না। ছোটো খালা ঠিকই পিচ্চিদের সাথে খেলেছে। সবার বয়স দশ থেকে বারো। খালাও যেন সেই বয়সেই ফিরে গেছেন।

তার রুমে থাকতে আর ভাল লাগছিল না৷ সে বের হয়ে নিচে গেল। একটু দুরে দাঁড়ালো। সবাই তাকে ডাকছে কানামাছি খেলতে। সে হাত নেড়ে মানা করলো। ছোটো খালা একটু পর লাবণীর পাশে এসে দাঁড়ালেন৷ বললেন, 'কিছু বলবি লাবণ্য?'

'বলতে লজ্জা লাগছে খালামণি'

'লজ্জা কিসের আবার। বলে ফেল'

'আমি তো নম্বর আদান প্রদান করিনি। এখন কি করব?'

'এটা কি করে সম্ভব? এখনও নম্বর জানিস না। তোরা তো অনেক লাজুক' ছোটো খালা হাসলেন। আবার বললেন, 'নম্বর ম্যানেজ করতে হবে তো?'

লাবণী ফিক করে হেসে দিল।

সন্ধ্যার একটু আগে লাবণী তার ছোটো খালাকে নিয়ে ড্রইং রুমে বসলো। ছোটো খালা মিটিমিটি হাসছে আর নম্বর ডায়েল করছেন। কিছুক্ষণ রিং হবার পর ওপাশ থেকে একজন ফোন রিসিভ করলেন।

'আসসালামু আলাইকুম'

'ওলাইকুম আসসালাম। আমি লাবণীর খালা বলছিলাম। কে বলছেন?'

'আমি জাহিদের চাচী বলছি। আপা ভালো আছেন?'

এভাবে কথা চলতেই থাকলো। লাবণীর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছিল। টানা বারো মিনিট কথা বলার পর খালা লাবণীকে লিখতে ইশারা করলেন। লাবণী নম্বরটি লিখে নিল। অবশেষে সে একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। খালা এর পরেও আরও পাঁচ মিনিট কথা বললেন।

'এতো কি কথা বলো খালামণি?' লাবণী অনেকটা বিরক্ত হয়ে বলল

'বারে? নতুন আত্মীয়,  তাদের সাথে কথা বলবো না? তুই ওখানে থাকবি, তোর পরিবার হবে যারা, তাদের সাথে কথা বলবো না?'

'প্লিজ খালামণি থামো একটু। তোমার একেকটা মিনিট আমার কাছে একেকটা ঘন্টা মনে হয়েছে'

'বলিস কিরে, এতো টান! দে-তো আমাকে নম্বরটা, আমি একটু কথা বলি ছেলেটার সাথে। এক দেখাতেই কি জাদু করলো, দেখি তো!' ছোটো খালা হেসে বললেন

'তুমি নম্বর নিয়ে কি করবা?' বলার পর লাবণী উঠে যেতে লাগলো, খালা তাকে আটকালেন।

'তুই তোর মোবাইলে সেইভ করে নে, আমাকে নম্বরটা দিয়ে যা'

অগত্যা নম্বরটি খালাকে দিয়ে রুমে আসলো লাবণী। ফোন দিল জাহিদের নম্বরে, ফোন বন্ধ। আধা ঘন্টা পর আবার ফোন দিল, এবারও বন্ধ। রাগে জেদে ফোনটা আছাড় মারতে ইচ্ছে করলো লাবণীর। কিন্তু পারলো না৷

রাতের খাবারের পর আবার ফোন দিল সে। এখনও বন্ধ। ভাবা যায়? একটা মানুষের ফোন বন্ধ থাকবে কেন? কি পরিমান ইরেসপন্সিবল পার্সন সে। লাবণীর নিজের উপরই রাগ হচ্ছিল। একটা উদাসিন, ভবঘুরে, বাউন্ডুলে ছেলেকে সে বিশ্বাস করেছিল।

রাত দশটার পর লাবণীর ফোনটা বেজে উঠলো। বিরক্তি নিয়ে ফোনটা হাতে নিলো। অবশেষে ফটিক চাঁদ ধরা দিল। জাহিদ ফোন দিয়েছে।

'আমি আপনার ঘুম ভাঙালাম না, তো?' ওপাশ থেকে জাহিদের কন্ঠের আওয়াজ। ঘুম তো তার হারাম করে দিয়েছে সে, এখন বলছে ঘুম ভাঙালো কিনা।

'জ্বী, না৷ আমি জেগেই ছিলাম' এ এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো লাবণীর। তীব্র রাগের পাশাপাশি স্বস্তিও অনুভব করলো সে।

'ফোনটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আপনি যে পাঁচবার ফোন দিয়েছিলেন। আমি দেখেছি। আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত'

'আমি আপনার কাজে কোনো সাহায্য করতে পারি কিনা, এজন্য ফোন দিয়েছিলাম'

'কোন কাজে সাহায্য করতে চাচ্ছেন?'

'আপনি কি ভুলে গেলেন' লাবণী কিছুটা অবাক এবং পুরোপুরি বিরক্ত।

'আমি ভুলিনি মিস লাবণী। একটা কাজে সিংড়া এসেছি। তাই.. ' জাহিদের কথা শেষ করতে দিল না লাবণী, চিৎকার দিয়ে বলল-

'আপনি এখন সিংড়া? কি সাংঘাতিক!' লাবণী যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না।

'দেখুন, বিয়ে করা ছাড়াও আমার অনেক কাজ আছে। সেগুলোও তো করতে হবে। তাছাড়া দূরে এসে আমি ভাল চিন্তা করতে পারছি'

'আমি আসলে কিছু বলতে চাচ্ছিলাম, কিন্তু এখন কিভাবে বলি, আপনি তো আরেকটি কাজে ইনভলভড্'

'সমস্যা নেই বলে ফেলুন। অবশ্য সকালেও বলতে পারেন। আমি ন'টার মধ্যেই বাসায় ফিরব'

'ঠিক আছে। সাবধানে থাকবেন' লাবণী কথা শেষ করলো। জাহিদও রেখে দিয়েছে। রাতে খেয়েছে কিনা, এই প্রশ্নটা লাবণী করতে চাচ্ছিল।  কিন্তু সে করতে পারেনি, লজ্জা লাগছিল। তাছাড়া সে এমন কেউ না, যে এই খোঁজ নেবে।

ফোনটা রেখে সে জানালা গলে বাইরে তাকালো। জাহিদ তার কাজ করতে পারবে কিনা, এখন অনেকটাই সন্দেহ হচ্ছে। যে ছেলে সন্ধ্যায় বাসায় আর রাত দশটায় ৫০ কিলোমিটার দূরে সিংড়ায় থাকে,  তার পক্ষে অনেককিছু করাই সম্ভব। এতটুকু ভরসা নিয়েই লাবণী ঘুমাতে গেল।

পরেরদিন সকালে জাহিদের ফোন দেবার কথা। লাবণীই ফোন দিবে কিনা লাবণী সিদ্ধান্ত নিতে পারলো না। সকাল ন'টা বাজার পর লাবণী ফোন দিল। আবার ফোন বন্ধ। এবারও রাগে লাবণীর মুখ লাল হয়ে উঠলো।

দুপুর পর্যন্ত লাবণী চেষ্টা করেছে, জাহিদকে পায়নি। লাবণীর মেজাজটা খিটমিটে হয়ে আছে।

বেলা দু'টার পর লাবণীর ফোনটা আবার বেজে উঠলো৷ এই সময়ে অবশ্য সজীব ফোন করে। তাই সে দৌড়ে এসে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো জাহিদ ফোন করেছে। মুখটা তার অগ্নিশিখার ন্যায় জ্বলতে লাগলো।

জাহিদকে কথা বলতে না দিয়েই লাবণী বললো, 'আপনি কি বলুন তো। সকাল ন'টায় ফোন দেবার কথা, বাসায় আসার কথা। এখন কই? আজও কি চার্জ শেষ?'

লাবণীর কথা শেষ হলে ওপাশ থেকে আওয়াজ আসলো, 'মিস লাবণী, আমি নোবেল বলছি। জাহিদের ফ্রেন্ড। বড় একটা এক্সিডেন্ট হয়ে গেছে। জাহিদ অজ্ঞান ছিল। জ্ঞান ফিরে প্রথম আপনার কথাই বলেছে। তাই আপনাকে ফোন দিলাম।'

লাবণী যেন আকাশ থেকে পড়লো। কি শুনলো সে এটা৷ কখন চোখ ভিজে গেছে সে জানলোও না। কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে রইলো সে, নিস্তব্ধতা ঝেরে শুধু বললো, 'এখন কেমন আছেন উনি? বড় কোনো ক্ষতি হয়নি তো?'

'শরীরের নানা জায়গায় কেটে গেছে, মাথাতেও সেলাই পড়েছে। হাতটা মনেহয় ভেঙে গেছে'  নোবেল বলল

'বাসার সবাই জানে? ওনারা গেছেন ওখানে?

'আসতেছেন সবাই। আপনি কি আসবেন? সরি, আমি মিন করি নাই। আপনি কোনো কথা বলতেন ওকে। ডাক্তার ওকে কথা বলতে দিচ্ছে না৷ তাই ফোনটা দিতে পারছি না'

'প্লিজ, আমাকে একটু আপডেট দিয়েন। আমি আপনাকে এই নম্বরে ফোন করতে থাকবো'

ফোনটা রেখেই লাবণী দৌড়ে নিচে গেল মা'য়ের কাছে। তার মা' বাসাতেই রোগী দেখেন, কিন্তু সেটা আলাদা বিল্ডিংয়ে। লাবণী দৌড়ে সেখানে গেল। সে জানে না সে কি করছে। তার চোখের পানি পড়তে শুরু করছে। একটা শূণ্যতা সে ভেতরে বোধ করছে। লাবণী না বুঝলেও আমরা বুঝতে পারছি তার কেন এতো খারাপ লাগছে!

সম্পর্ক, পরিণয় না থাকলে কি এমন মায়া আসে না? আসে হয়ত। লাবণীও সেই মায়ায় জড়িয়েছে। তার এখন বুকে পালপিটেশন হচ্ছে৷ তার এ্যাজমাটিক শক হতে লাগল।

সে তার মা'কে শুধু এতটুকু বলতে পারলো, 'আম্মু জাহিদ এক্সিডেন্ট করছে সিংড়ায়, হসপিটালে...' আপন মানুষের কাছে আসলে কান্না আরও গতি পায়। এবার লাবণী কেঁদেই ফেলল।

তার মা' তাকে ফ্যানের নিচে বসিয়ে দিলেন, টেবিল ফ্যান আরেকটা তার দিকে দিলেন। তারপর তার বাবাকে ফোন দিলেন, জানালেন জাহিদের বিষয়টা। লাবণীর বাবা বললেন তিনি এখনই বাসায় আসছেন। সবাইকে তৈরি থাকতে বললেন, তারা এখনই সিংড়ায় যাবেন।

লাবণী বুঝতে পারলো না, তার কেন এত খারাপ লাগছে। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে লাগলে তার মনে এমন প্রশ্ন জাগতে লাগল৷ সে কি সিংড়ায় যাবে?  তার কি যাওয়া উচিৎ? গেলে সজীব কি ভাববে? সন্দেহ করবে নাতো?

সব চিন্তা ছেড়ে সে সিদ্ধান্ত নিল, সিংড়ায় যাবে!

পরবর্তী পর্বঃ আলাপন

Comments

    Please login to post comment. Login