১.
"তুমি কী খাচ্ছো এটা? এলকোহল?"
"নাহ স্যার, ওয়াটারমেলন বাজবলজ", বলল সিলভিয়া। তারপর বোতলটা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে, একটু বোকার মত হেসে বলল, "অহ স্যার, এটাতে ১৫% এলকোহল আছে।"
স্যার ভ্রু কুঁচকালেন, কিন্তু কিছু বললেন না। জানালার বাইরে তাকালেন।
স্যারের স্ত্রী ছবি তুলছেন। ভি সাইন। হাসি। একজন ছেলে খুব আগ্রহ নিয়ে ছবি তুলে দিচ্ছে—যেন এই মুহূর্তটাই পৃথিবীর সবচেয়ে জরুরি ব্যাপার।
পেছন থেকে সিলভিয়া আবার বলল, “অনেক মজা… একটু খাবেন?”
“টাকা দিয়ে কিনে এনেছো বলে ফেলতে বলছি না,” স্যার রুক্ষ স্বরে বললেন, “কিন্তু খেয়ে মাতলামি করবে না অন্তত।”
সিলভিয়া গা এলিয়ে দিল সিটে। বোতলে চুমুক দিতে দিতে হালকা হাসল। সেই হাসির ভেতরে কী ছিল—উচ্ছ্বাস, না শূন্যতা—বোঝা কঠিন।
এই সময় নবনী ফিরে এলো। হাতে ধোঁয়া ওঠা নুডলসের বাটি।
সিলভিয়া তাকিয়ে বলল, "এহ, তুইও এলকোহলিক! এটাতে রাম দিছে, আমি বানানোর সময় দেখছি।"
নবনী একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল। “আমি খাব না তাহলে… তুই খা।”
বাটিটা হাতে নিয়েই সিলভিয়া হঠাৎ কাত করে দিল। এক মুহূর্তে পুরো নুডলস গাড়ির সিটে ছড়িয়ে পড়ল।
তারপর সে হা হা করে হাসতে লাগল—যেন কী মজার কাজটাই না করেছে।
নেপালি ড্রাইভার কিছু বলল না। খুব শান্তভাবে কাপড় বের করে পরিষ্কার করতে লাগল।
স্যারের স্ত্রী গাড়িতে উঠে কেবল বললেন, “চলুন।”
এরপর কী হয়েছিল, সিলভিয়ার ঠিক মনে নেই।
সম্বিত ফিরল হোটেলের সামনে এসে। কারো ধাক্কায় সে ধড়মড় করে উঠে বসলো। বুঝল—সে স্যারের স্ত্রীর কাঁধে হেলান দিয়ে ছিল। তিনি তাকে সরিয়ে দিয়েছেন।
সে নেমে এল গাড়ি থেকে। মাথা ভারী। চারপাশ যেন একটু দুলছে।
২.
সিলভিয়া মাস্টার্সে পড়ছে। শিক্ষাসফরে প্রথমবার দেশের বাইরে এসেছে—ভারতে। উচ্ছ্বাসটা এত বেশি ছিল যে, কখন যেন বাস্তব আর কল্পনার মাঝখানের পর্দা সরে গেছে।
গতরাতে এম.জি. মার্টে দাঁড়িয়ে সে ভেবেছিল—সে বোধহয় আবার স্বপ্নে চীনে এসেছে।
মহাত্মা গান্ধীর মূর্তি দেখে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠেছিল, “চীনে মহাত্মা গান্ধী!” অনিমা তাকে ঝাঁকিয়ে বলেছিল, “তুই ঠিক আছিস?”
না, সিলভিয়া এই জীবনে এলকোহল ছুঁয়েও দেখেনি—আজকের ওই একবার ছাড়া।
তার নেশা অন্যরকম—ঘোরাঘুরি, আর বই।
ঘোরা তার পক্ষে সম্ভব হয় না, টাকা নেই। তাই সে লাইব্রেরিতে বসে থাকে—পাতার পর পাতা উল্টায়, আর ভাবে—একদিন সে-ও লিখবে, সে-ও ঘুরবে, সে-ও হয়ে উঠবে অন্য কেউ। হয়তো কোনোদিন সে মুজতবা আলীর মতো হবে।
বাস্তবের সাথে তার সম্পর্ক ছিল আলগা—একটু দূরত্ব রেখে চলা। কিন্তু এই এক সপ্তাহে, সেই কল্পনার জগত আর বাস্তব একসাথে মিশে গেছে।
৩.
ফেরার আর একদিন বাকি।
সিলভিয়া বারবার ভাবছে—“আমি কেন ফিরব? ঢাকায় আমার কে আছে? কার কাছে যাব?”
প্রশ্নগুলো উত্তর চায় না। শুধু ভেতরে ভেতরে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে।
শেষদিন তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।
স্যার, স্যারের স্ত্রী, নবনী—সবাই খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত।
শেষে দেখা গেল—একটা সরু ঝিরিপথ ধরে নেমে গেছে সে। ঝর্ণার পাশে, পাথরের উপর বসে আছে।
সামনে পাহাড়ি নদী বয়ে যাচ্ছে—নিরবচ্ছিন্ন, উদাসীন।
সিলভিয়া তাকিয়ে আছে। মুখে হাসি। চোখে শূন্য দৃষ্টি।
স্যার কিছু বললেন—বকাঝকা, বিরক্তি, দায়িত্বের কথা—সব মিলিয়ে।
কিছুই তার কানে ঢুকল না।
সে একইভাবে বসে রইল। তারপর উঠে দাঁড়াল, এবং সবার সঙ্গে ফিরে এল—যেন কিছুই হয়নি।
৪.
ঢাকায় ফিরে গাড়ি থামল।
সিলভিয়া নামল। শরীর একটু দুলছে।
সে শুধু বলল, “আমি বাড়ি যাব।”
তারপর ময়মনসিংহগামী একটা বাসে উঠে গেল।
কেউ তাকে থামাল না। কেউ জিজ্ঞেস করল না—সে সত্যিই কোথায় যাচ্ছে।