গত সপ্তাহের রংপুর ভ্রমণ ছিল বেশ বৈচিত্র্যময়।
'একজনের ক্যান্সার হয়েছে। ক্যান্সার সারাতে কেমো দিতে হবে। কেমোর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া আছে। মাথার চুল পড়ে যায়। রোগীর আকুলতা। তাঁকে সারিয়ে তুলতে হবে। কিন্তু মাথার চুল পড়লে তাঁকে খুব খারাপ দেখাবে। মাথার চুল পড়ে যাক, কোনভাবে মানবেন না। কিন্তু বাঁচতেও চান।' পূরাটা পথ এরকম মজার মজার গল্প বলে ভ্রমন-আসর জমিয়ে রাখেন দুই সিনিয়র সহকর্মী ( Mohammad Shaheen Sarker sir ও Santosh Roy sir) বরাবরের মত আমি মনোযোগী শ্রোতা। ভোর ৬ টায় জার্নি শুরু হয়েছিলো, রাত ১২ টায় বাসায় ফিরি। ১৮ ঘণ্টার ননস্টপ ছোটাছুটির পরেও বিরক্ত লাগে নি।
রংপুর শহরে সকালের নাস্তা সারি। সব মিলিয়ে মাত্র ঘণ্টা খানেকের বিরতি। এরপর সাইটের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়া। অন্তরে আমার ১৬ বছরের রংপুরীয়ও মায়া, সেজন্য একটু হলেও কষ্ট লাগে বৈকি।
এলেঙ্গা-বগুড়া-রংপুর মহাসড়কের ৪-লেন (আদতে ৬-লেন) নির্মান কাজ শেষ প্রায়। এই মহাসড়ক উত্তরবঙ্গের মানুষের জন্য আশির্বাদ। ঈদের সময়ের দুর্বিনীত কষ্ট আর নেই বললেই চলে। এই প্রকল্প মানে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের একটি অসামান্য সফলতার গল্প। কিন্তু সেরকম ভাবে প্রচারনা হয়নি।
সড়ক উন্নয়নের পরেও কিছু দুর্ঘটনা ঘটছে। মানুষ হতাহত হচ্ছে। মূলত পথচারীরা বেশি দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। কিভাবে সেটা কমিয়ে আনা যায়, সেটাই এ যাত্রার মূল উদ্দেশ্য।
শাহীন স্যার এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। মহাসড়কের দমদমা নামক স্থানে ইউসেপ নামে একটা এনজিও আছে। বহু বছর আগে একবার ঢুকেছিলাম। এদিন আমরা ঢুকে বেশ মুগ্ধ হলাম। প্রতিটি ক্লাশের আলাদা ড্রেস কোড। নতুন আইডিয়া, বাস্তবায়নটা অভিনব লাগে। ওদের সাথে কথা বলেন মূলত শাহিন স্যার ও সন্তোষ স্যার। আলোচনায় ওদের স্বপ্রতিভ অংশগ্রহণ বেশ লাগে।
সড়কে চলাচতরত মানুষ/পথচারীও যে এক রকমের ট্রাফিক, এরকম স্পষ্ট ধারণায় মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। যে কোন সমস্যায় আলোচনার বিকল্প নেই। সেদিনের আলোচনায় সেই বিশ্বাস আরও পোক্ত হয়।

ইউসেপ, মিঠাপুকুর গড়ের মাঠ ছাড়িয়ে শঠিবাড়িতে চলে আসি। সাসেক-২ প্রকল্প হতে সেখানে একটা পথচারী পারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। হেটে হেটে সেখানে যাই। প্রচুর মানুষ পার হচ্ছে। কোলে বাচ্চা, সাথে সাইকেল, পথচারীর সাথে ছাগল, এমনকি কুকুরও সেটা দিয়ে পার হচ্ছে। মাঝের রেলিং (Refuse Island) ধরে সারিবদ্ধ মানুষ পারাপার দেখছি। আনন্দ লাগছে।
একজন বলল, বেশ কিছুদিন আগে এখানে একটা দুর্ঘটনা ঘটে। বেশ বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। বেশ কিছু মালামাল লুটপাট হয়। লুট হয়ে যায় মাঝের সেই রেলিংও। চুরির বা লুটের মাল ফিরে পাওয়া কঠিন। আর এই জামানায় চিন্তা করাও কঠিন। কিন্তু সেখানে একটা ব্যতিক্রম ঘটনা ঘটে। কয়েকদিন পর এলাকার মানুষ খুঁজে খুঁজে সেই রেলিং নিয়ে আসেন। এরপর সেটা আবার লাগিয়ে দেয়া হয়। গল্প শুনে সেই রেলিং এর সামনে ছবি তোলার জন্য দাঁড়িয়ে যাই।
জনগণের প্রকৃত কাজে লাগে এমন জিনিস জনগণই রক্ষা করে। শঠিবাড়ির রেলিং এর একটি উদাহরণ মাত্র।
শঠিবাড়ি, রংপুর
২০ এপ্রিল ২০২৭