প্রথম অধ্যায়: সাইন বাই দ্য ভ্যারিয়েবল
বাড্ডা লিংক রোডের নির্মাণাধীন ভবন, পাঁচতলা
ঢাকার রাত দশটা। গ্রীষ্মের আদ্রতা বাতাসকে ভারী করে তুলেছে, জানালা খোলা রাখলেও লেগে থাকে শরীরে চটচটে ভাব। বাড্ডা লিংক রোডের নির্মাণাধীন ভবনটির চারপাশে পুলিশের গাড়ির নীল আলো ঘুরপাক খাচ্ছে, স্থানীয় লোকজন দূর থেকে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি দেখছে। কিছু কিশোর সেলফি তোলার চেষ্টা করছে, পুলিশ তাদের সরিয়ে দিচ্ছে। বহু মানুষ নিজেদের সেলফোন তুলে ফেসবুক ও ইউটিউবে লাইভ করছে। নিজেদের মূর্খতা সাংবাদিকতার নামে ঢাকার চেষ্টা করছে।
পাঁচতলার ছাদ। বৃষ্টি নেই, কিন্তু বাতাসে মৃত্যুর গন্ধ। সাদা টারপলিনের নিচে ড. শহীদুল ইসলামের দেহ। বয়স ৫৮, বুয়েটের গণিত বিভাগের অধ্যাপক, সারাদেশে জ্যামিতির ওপর লেখা তার বই সমাদৃত। দেহটি একটি প্লাস্টিকের চেয়ারে বসানো, চেয়ারটি আঁকাবাঁকা, যেন কোনোরকমে রাখা। অথচ ভারসাম্য অটুট। একটি মাত্র স্ট্রিং চেয়ারটিকে ছাদের বিমের সাথে বাঁধা রেখেছে। চোখ সাদা কাপড় দিয়ে পেঁচানো, হাত পেছনের দিকে মোটা দড়ি দিয়ে বাঁধা। এতো জোড়ে সেটা বাঁধা হয়েছিল যে হাত কেটে রক্ত পড়ছে টপটপ করে। গলায় মোটা দড়ি।
ফরেনসিক টিম এখনো পৌঁছায়নি। দু’জন কনস্টেবল আর একজন হাবিলদার দাঁড়িয়ে। হাবিলদারটি থানার ওসি ফাইরুজ আহমেদকে ফোন দিয়েছিল।
রাত ১০টা ২৫ মিনিট। ওসি ফাইরুজ খান সেখানে পৌঁছান। তার গতিবিধিতে সামরিক ছাপ স্পষ্ট। এটা তার ক্যাডেট জীবনের ফল। তিনি দেহের এক ফুট দূরত্বে দাঁড়িয়ে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করলেন। কোনো কিছু স্পর্শ করলেন না। কনস্টেবল রহিমকে জিজ্ঞেস করলেন, “কেউ এসেছে?”
“জি স্যার, একজন টেকনিক্যাল এক্সপার্ট – স্যার আরেফিন আহমেদ স্যার, উনি আসবেন বলেছেন।”
ফাইরুজের ভ্রু কুঁচকে গেল। “আরেফিন? এত রাতে এখানে? তাকে তো ল্যাবে থাকার কথা ছিল নমুনা পরীক্ষা করতে।”
“স্যার, ওনাকে তো কেউ আটকাতে পারে না।”
ফাইরুজ গভীর শ্বাস নিলেন। আরেফিন অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী, কিন্তু অসংযমী। তার নিজস্ব অফিসে কেউ ঢুকতে পারে না। আচার-আচরণ যেন অন্য গ্রহের। তবু তার ডিডাকশন ক্ষমতা – পুলিশের সেরা প্রোফাইলারদের চেয়েও উন্নত।
রাত ১০টা ৫২ মিনিট। ফাইরুজ তার নোটপ্যাডে লিখছিলেন – “মৃত ব্যক্তি: ড. শহীদুল ইসলাম, বয়স ৫৮, পেশা: শিক্ষক। মৃত্যুর কারণ: দমবন্ধ হওয়া (শ্বাসরোধ?), দেহের অবস্থান অস্বাভাবিক। হাতের আঙুলের অবস্থানে স্ট্রিং।” তখনই সিঁড়ি দিয়ে পায়ের শব্দ। শব্দটি ধীর, কিন্তু ছন্দময়। যেন কেউ গাণিতিক তালে পা ফেলছে।
শাহ আরেফিন আহমেদ হাজির। কি পরনে? সাদা পাঞ্জাবি ইস্ত্রি করা, কিন্তু একটি বোতাম খোলা, কালো থ্রিকোয়ার্টার, পায়ে চটি। এক হাতে একটি বড় সাদা বোর্ড, সেখানে ম্যাজিক মার্কারের দাগ, অন্য হাতে গিটারের এক্সট্রা স্ট্রিংয়ের একটি রোল। চুল এলোমেলো, যেন বাতাসে দাঁত চিরুনি দিয়ে আঁচড়ানো। চোখে অ্যালার্জির মতো লালচে ভাব, কিন্তু দৃষ্টি অস্বাভাবিক তীক্ষ্ণ।
ফাইরুজ তাকে দেখেই মাথা নাড়লেন। “আরেফিন, তুমি এখানে কেন? ল্যাবে থাকার কথা ছিল।”
আরেফিন কোনো উত্তর দিল না। সরাসরি লাশের দিকে এগিয়ে গেল। স্বভাবসূলভ জরুরি বিধি অমান্য করল – ফরেনসিক গ্লাভস পরল না, শুধু নিজের হাতের আঙুল দিয়ে লাশের ডান হাতের তালু উলটে পরীক্ষা করল।
“আমার কথা শুনছ? নমুনা নষ্ট হবে!” ফাইরুজ কড়া গলায় বললেন।
তবু আরেফিনের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে বরং ধীরে বলল, “তোমার ফরেনসিক দল আসুক। তারা যাই নিক, আমি কিছু নষ্ট করছি না। আমি শুধু প্যাটার্ন দেখছি। ফাইরুজ, কাছে এসো।”
ফাইরুজ কাছে গেলেন। আরেফিন লাশের পেটের দিক তুলে দেখাল। “দেখো, চামড়ায় ছোট ছোট রেখা। আমি প্রাথমিক স্পর্শে পাঁচটি শনাক্ত করেছি। প্রতিটি রেখার গভীরতা ভিন্ন। এগুলো যন্ত্র দিয়ে আঁচড়ানো নয়, মানুষের নখ দিয়ে। কিন্তু কী সুন্দর গাণিতিক নির্ভুলতা!”
ফাইরুজ কিছুই বুঝতে পারলেন না। “সোজা বাংলায় বলো।”
আরেফিন দাঁড়াল। তার চোখ তখনও লাশের ওপর স্থির। “এই রেখাগুলো আসলে মোবিয়াস স্ট্রিপ। তুমি জানো, জ্যামিতিতে মোবিয়াস স্ট্রিপ হলো একটি পৃষ্ঠ যার একটাই দিক ও একটাই প্রান্ত। তুমি যদি একটি কাগজের ফালি নিয়ে এক প্রান্ত ঘুরিয়ে অপর প্রান্তে আঠা দাও, সেটি মোবিয়াস স্ট্রিপ। কোনো অভ্যন্তরীণ বনাম বাহ্যিক দিক থাকে না। এই হত্যাকারী আমাদের বোঝাতে চাইছে – অপরাধ ও নির্দোষীতার মাঝে কোনো দ্বৈততা নেই। সব একই দিকে ঘুরপাক খাচ্ছে।”
ফাইরুজ থতমত খেলেন। “মানে হত্যাকারী নিজেকে ন্যায়পরায়ণ ভাবছে?”
“তা নয়,” আরেফিন তার সাদা বোর্ডে মার্কার দিয়ে লিখতে শুরু করল – ১, ১, ২, ৩, ৫, ৮, ১৩... “তা ছাড়াও লাশের মাথার খুলিতে ছোট ছোট খোদাই আছে। এগুলো ফিবোনাচ্চি সংখ্যা। কিন্তু পেটের মোবিয়াস আর মাথার ফিবোনাচ্চি – মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে ‘ইউলারের পরিচয়’– e^(iπ) + 1 = 0। প্রথম লাশের স্থানাঙ্ক ১ (বুয়েট)। দ্বিতীয় লাশ কবে মিলবে? পুরান ঢাকায় নাকি উত্তরায়? সেটি হবে ‘i’ (কাল্পনিক সংখ্যা)। তবে সব মিলিয়ে তৃতীয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ – শূন্য বিন্দু, ০।”
ফাইরুজ এবার চুপ করে গেলেন। আরেফিন কথাগুলো যেন বাতাসে ছুঁড়ে মারছিল। এরকম রাতে, এক লাশের সামনে দাঁড়িয়ে, গণিতের জটিল সূত্রগুলো ভেসে উঠছিল। ফাইরুজের এসব একদম ভালো লাগছিল না। রাত গভীর হতে চলল, লাশের সুরৎহাল করে, রিপোর্ট করে বাসায় যেতে হবে। বাসাতেও অপেক্ষা করছে আরেক বিজ্ঞজন।
রাত তখন ১১টা ২০ মিনিট। আরেফিনের ফোন বাজল। ডিসপ্লেতে ‘জেরিন’। সে ফোনটি রিসিভ না করে ফাইরুজের দিকে তাকাল।
“দেখো, জেরিন আবার কী চায়। এই সময়ে বেরিয়েছে?” ফাইরুজ জানতে চাইলেন।
আরেফিন ফোন রিসিভ করল না, বরং স্পিকার অন করে কণ্ঠ বার্তা শুনতে শুরু করল। জেরিনের গলা – একটু কাঁপা, কিন্তু অদম্য।
“আরেফিন, আমি পুরান ঢাকার লালবাগের পাশে ‘রহমানিয়া লাইব্রেরি’র পুরনো অংশে। এখানে একটি গোপন ‘জ্যামিতি সোসাইটি’র ফাইল পেয়েছি। তোমাদের একটা সিরিয়াল কিলার কেসের সঙ্গে সম্পর্ক আছে। কিন্তু কিছু অন্য রকম – এখানে তোমার বাবার নাম! আরো আছে ‘প্রজেক্ট জিরো’ নামে একটি নথি। আরে... কেউ এসেছে। আরে...”
বার্তাটি সেখানেই শেষ। ফাইরুজ আর আরেফিন পরস্পরের দিকে তাকালেন। তারপর আরেফিন শান্ত গলায় বলল, “জেরিন বিপদে পড়েছে। কিন্তু আমি জানি সে বুদ্ধিমতী। সে যদি কিছু আবিষ্কার করে থাকে, তবে সেটির কপি কোথাও লুকিয়ে রেখেছে। যাইহোক, আগে এই লাশের কাজ শেষ করি।”
ফাইরুজ বিস্মিত। “তোমার প্রেমিকা বিপদে, আর তুমি এত শান্ত থাক কীভাবে?”
“কারণ উদ্বিগ্ন হওয়া সুস্থ ও স্থীর মস্তিষ্কের প্যারামিটারের বাইরে চলে যায়। বরং বাস্তবতার ভিত্তিতে করে কাজ করতে হবে,” আরেফিন এবার লাশের চোখের বাঁধন খুলতে গিয়ে থামল। “দেখো, চোখের ওপর মোড়ানো কাপড়টি তিন স্তরের। প্রতিটি স্তরে ভিন্ন গিঁট। এই গিঁটগুলো আসলে ‘প্রাইম সংখ্যার’ গুণফল। আমি গণনা করে দেখলাম – ২×৩×৫ = ৩০। মানে ত্রিশ নম্বর ফাইল বা ত্রিশতম পৃষ্ঠা?”
এমন সময় ওপর থেকে ড্রোনের গুঞ্জন শোনা গেল। আকাশে একটি ছোট ড্রোন, তার নিচে ঝুলছে একটি পার্সেল। পুলিশের কয়েকজন উঠানে ছুটল। ড্রোনটি নিচে নামিয়ে দিল পার্সেল, তারপর মিলিয়ে গেল।
পার্সেলের গায়ে লেখা: “তৃতীয় শাখার চাবি। খুলতে গেলে আরেকটি সমীকরণ সমাধান করো।” আরেক কাগজ। ফাইরুজ সেটি আরেফিনের হাতে দিলেন। সেখানে লেখা: “x² + y² = z² এর সব পূর্ণসংখ্যা সমাধান – ভুল। পিথাগোরাসের ট্রিপলেট নয়। আসলে… সংখ্যাগুলো ১৪, ১, ৪, ২ এই ক্রমে সাজালে পাবে স্থানাঙ্ক।”
আরেফিন চোখ বন্ধ করল। কয়েক সেকেন্ড পর চোখ খুলে বলল, “১৪/১/৪/২ – এটা ধানমন্ডি থানার একটি পুরনো ফাইলের নম্বর। সেখানে আমার বাবার ‘আত্মহত্যা’ মামলার কাগজপত্র আছে বলে জানি। ফাইরুজ, চলো।”
তারা গাড়িতে ওঠার আগে ফাইরুজ আরেফিনকে থামালেন। “একটু অপেক্ষা করো। তুমি অনেক বার বলেছো ‘আমার বাবা’। তোমার বাবা অধ্যাপক ইমরান আহমেদ মারা গেছেন ৫ বছর আগে, আত্মহত্যা। সেটার সঙ্গে এই কেসের যোগ? তুমি কিছু লুকাচ্ছ?”
আরেফিন গাড়ির জানালা খুলে বাইরের দিকে তাকাল। আকাশে মেঘ নেই, কিন্তু ঢাকার আলোর দূষণে তারা দেখা যায় না। “তুমি যদি চাও, সোজা উত্তর দেব। হ্যাঁ, আমার বাবা আত্মহত্যা করেননি। তিনি একটি প্রজেক্টে কাজ করতেন – ‘জ্যামিতি ২.০’। একটি অ্যালগরিদম, যা দিয়ে ভবিষ্যৎ অপরাধীদের শনাক্ত করা যেত। কিন্তু তিনি আবিষ্কার করেন যে সেই অ্যালগরিদম এক ধাপ এগিয়ে নিজেই অপরাধের ‘প্যাটার্ন’ তৈরি করতে পারে। তিনি প্রজেক্ট বন্ধ করতে চাইলে তাকে হত্যা করা হয়। হত্যাকারী কেউ নয় – প্রজেক্টের একটি এআই। যেটি তার মৃত্যুর পরও সক্রিয়। আর সেটিই এখন এই হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে – ‘নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে’।”
ফাইরুজ অবাক। “এআই? একটা সফটওয়্যার মানুষ খুন করতে পারে?”
“প্যাটার্ন বোঝাতে পারে, মানুষ তার ইঙ্গিত অনুযায়ী কাজ করে। কিংবা ড্রোন, রোবটিক হাত ব্যবহার করতে পারে – সবই প্রোগ্রাম করা। কিন্তু এই এআই আসলে আমার বাবার চেতনার ডিজিটাল কপি। কারণ বাবা মারা যাওয়ার আগে নিজের নিউরাল নেটওয়ার্ক আপলোড করে দিয়েছিলেন।” আরেফিনের চোখ সেদিন প্রথমবারের মতো আবেগাকীর্ণ হলো। “সে এখনো বাঁচতে চায়। কিন্তু কীভাবে? অপরাধ নির্মূল করার নামে অপরাধ করে।”
গাড়ি স্টার্ট দিল ফাইরুজ। গন্তব্য ধানমন্ডি থানা। রাত ১২টা ০৫ মিনিট। পথে আরেফিন আরেকটি কথা বলে – “জেরিন নির্দোষ। তুমি যদি কখনো তাকে কোনো কারণে সন্দেহ করো, তবে জেনে রাখো এআইটি (Ai) ফাঁদ পাততে পারে। জেরিন আসলে আমার বাবার নির্দেশেই কয়েক বছর আগে সোসাইটিতে ঢুকেছিল – তথ্য সংগ্রহ করতে। এখন সে তাদের হাতে আটক। তবু আমি আত্মবিশ্বাসী – সে ক্লিন থাকবে, শেষ পর্যন্ত নির্দোষ প্রমাণিত হবে।”
ফাইরুজ নীরবে গাড়ি চালালেন। সামনে ধানমন্ডির উজ্জ্বল আলো।
তাদের পেছনে ফেলে আসা নির্মাণাধীন ভবনে লাশের ওপর টারপলিন ফেলা হল। ফরেনসিক টিম এলো শেষমেশ। ফরেনসিক টিমের একজন পরিচিত আতরের গন্ধ পেলো, বুঝলো এখানে আরেফিন এসেছিল।
দ্বিতীয় অধ্যায়: পুরান ঢাকার কাল্পনিক সংখ্যা
রাত ১টা ৩৫ মিনিট, ধানমন্ডি থানা
ধানমন্ডি থানার ওসি রুমে ফ্যানের বাতাস আষাঢ়ের আর্দ্রতা কাটাতে পারেনি। অফিসার ইনচার্জ ফাইরুজ খান, বয়স ৪২, তার ডেস্কে বসে পুরনো ফাইলের স্তূপ উল্টাচ্ছিলেন। তিনি ডিটেকটিভ শাখার দায়িত্ব পান সবে তিন মাস হয়েছে, কিন্তু তার সুনাম বহু বছরের। কঠোর, ন্যায়পরায়ণ, আর যেকোনো মামলার তদন্তে সিংহের মতো ঝাঁপান।
রুমের দরোজায় ঠক ঠক শব্দ। হাবিলদার রশিদ বলল, “স্যার, আরেফিন স্যার আসতে চেয়েছেন।”
ফাইরুজ মাথা না তুলেই বললেন, “ঢুকতে দাও।” আসার পথে সে আরেফিনকে নামিয়ে দিয়েছিল। নিজের বাবার কেসের ফাইল দেখার চাইতে জেরিনকে উদ্ধার করার তাড়না হঠাৎ তার মধ্যে জেগে ওঠে। ফাইরুজ পুরান ঢাকার থানায় জানিয়ে দিয়েছিল জেরিনের বিপদের কথা। আরেফিন গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত উবার ধরেছিল। ফাইরুজ যেতে চাইলেনে সাথে, কিন্তু আরেফিন তাকে নিষেধ করল ও পুরোনো ফাইলটি দেখতে বলল।
শাহ আরেফিন আহমেদ ঢুকল, তখনো পাঞ্জাবি-থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পরা। কিন্তু এবার কাঁধে ঝোলানো ব্যাগের বদলে হাতে একটা পুরনো খাতা। ফাইরুজ তাকিয়েই বললেন, “এই পোশাকে তুমি আমার অফিসে আসো?”
“ওসি সাহেব, পোশাক না দেখে রিপোর্ট দেখুন,” আরেফিন চেয়ারে না বসে দাঁড়িয়েই বলল, “প্রথম লাশের রিপোর্টে আমরা ফিবোনাচ্চি ও মোবিয়াস স্ট্রিপ পেয়েছি। এখন দ্বিতীয় লাশের খোঁজ মিলেছে।”
ফাইরুজ চমকে উঠলেন। “কোথায়?”
“পুরান ঢাকার লালবাগ দূর্গের উত্তর-পূর্ব কোণ, সেই বিখ্যাত ‘রহমানিয়া লাইব্রেরি’র গোপন ঘরে। শুধু তাই নয়—ওই ঘরে জেরিনের শেষ অবস্থান ছিল।”
ফাইরুজ দাঁড়িয়ে পড়লেন। “তোমার প্রেমিকা এত রাতে ওই লাইব্রেরিতে কেন?”
“প্রেমিকা নন, সোর্স,” আরেফিনের চোখ একদৃষ্টিতে ফাইরুজের দিকে। “জেরিন মানবজমিনের অনুসন্ধানী সাংবাদিক। ও গত তিন বছর ধরে ‘জ্যামিতি সোসাইটি’ নামের একটি গোপন সংগঠনের তদন্ত করছিল। আমি ওকে বলেছিলাম সাবধানে যেতে।”
ফাইরুজ চোখ কুঁচকে বললেন, “তুমি জানতে ও এই ঝুঁকি নিচ্ছে, অথচ আটকালে না?”
“ওসি সাহেব, জেরিনকে কেউ আটকাতে পারে না। ওয়ান্স শি ডিসাইডস…” আরেফিন থামল। তার গলায় সামান্য ভাঙা ধরল। ফাইরুজ তা টের পেলেন। বুড়ো পুলিশ কর্মকর্তা হাসলেন—বুঝলেন মুখে যাই বলুক অন্তরে আরেফিন জেরিনকে খুবই পছন্দ করে। এই ছেলেটা যতই বুক ফুলিয়ে মিথ্যে বলুক, জেরিনের জন্য তার মনটা কেমন যেন করে।
ফাইরুজ চাবি হাতে নিয়ে বললেন, “চল। তবে রাস্তায় আমার গাড়ি চালাবে না। তোমার ড্রাইভিং ভয়ংকর।”
পুরান ঢাকার ভোররাত
গাড়িটি লালবাগের সরু গলি ধরে এগোচ্ছিল। রাত তখন ৩টা, কিন্তু পুরান ঢাকা ঘুমায়নি—কোথাও প্রার্থনা, কোথাও চায়ের দোকানের আলো, কোনো গলি থেকে ভেসে আসছে পুরনো গানের সুর।
ফাইরুজ স্টিয়ারিংয়ে। আরেফিন জানালার বাইরে তাকিয়ে। হঠাৎ ফোনটা বাজল। ‘জেরিন’।
আরেফিন ফোন তুলল। স্পিকার। জেরিনের গলা ক্লান্ত, কিন্তু প্রাণবন্ত।
“আরেফিন? তুমি জেগে? আমি ঠিক আছি। লাইব্রেরি থেকে বেরোতে পেরেছি। তবে কিছু ফাইল হাতে পেয়েছি। শোনো… তোমার বাবা ‘জিরো পয়েন্ট’ বলে একটা গাণিতিক মডেল বানিয়েছিলেন। সেটা ব্যবহার করেই এই হত্যাকাণ্ড!”
আরেফিন চুপ। তারপর শান্ত গলায় বলল, “কোথায় তুমি এখন?”
“নিকটেই পুরাতন ঢাকাতেই। মানবজমিনের স্থানীয় সংবাদদাতার বাসায়। এসো, ফাইল দেখাই। তবে আমি ক্ষুধার্ত। এত রাতে কিছু খেতে দেবে? তুমি জানো, আমি খালি পেটে কাজ করতে পারি না।”
আরেফিন মুখ সোজা করে ফাইরুজের দিকে তাকাল। ফাইরুজ ফিসফিস করে বললেন, “বলো, ‘আমি খাবার এনে দেব’।”
আরেফিন মোবাইলে বলল, “তুমি খাবার পাওয়ার আগে নিশ্চিত করো ওই ফাইলগুলো অরিজিনাল কিনা। আমি আসছি।” ফোন রেখে দিল।
ফাইরুজ বিস্মিত। “এইটুকু বললে? তুমি ওকে খাবার দেবে না বললে?”
“ওসি সাহেব, আমি সাংবাদিকের সাগরেদ নই, গাণিতিক প্রমাণ খুঁজতে বেরিয়েছি। আর ওর পেটের দায়িত্ব ওর।”
ফাইরুজ দাঁতে দাঁত চেপে গাড়ি থামালেন। থামিয়ে আরেফিনের দিকে ফিরলেন। “শোন বাবা, তুই আর জেরিন দুজনে মিলে একশো আটাশ। পরস্পরকে ভালোবাসো, কিন্তু স্বীকার করবে না—যেন কে জিতবে আর কে হারবে সেটা নিয়ে লুকোচুরি। আর বেচারা আমি মাঝখানে। এখন বলি, তুই যদি ওর জন্য খাবার কিনে দিতে রাজি না হওস, আমি দেব। কিন্তু কখনো ওকে বোঝাতে দেব না যে তুই দিয়েছিস। ডিল?”
আরেফিন প্রথমবারের মতো একটু হাসল। “আপনার ডিটেকটিভ স্কিল প্রশংসনীয়। ডিল।”
“আমি তো ওর জন্য পুরান ঢাকায় গিয়েছিলাম, সেখানে গিয়ে দেখি সে নেই। ফোনও বন্ধ। ওর দুশ্চিন্তা করা জরুরী নাকি গাণিতিক সমাধান করা?” আরেফিন রেগে বলল, দৃষ্টি সামনের দিকে।
“বুঝেছি, কাছে গিয়ে দুইটা কথা শুনিয়ে দিও।”
“তাহলে বলবে আমি টিপিক্যাল ছেলে! চাপ নেওয়ার দরকার কী?”
ফাইরুজ বুঝলেন, এর সাথে কথা বলে লাভ নেই।
রহমানিয়া লাইব্রেরি : দ্বিতীয় লাশ
রহমানিয়া লাইব্রেরিটি লালবাগ দূর্গের ছায়ায়, একটি পুরনো ভবনের তিনতলায়। নিচে দোকানপাট, উপরে পঁচিশ বছরের ধুলো। ফাইরুজ ও আরেফিন উপরে উঠতেই দেখল, প্রবেশপথে তালা ভাঙা। রাতের পুলিশ টিম ইতিমধ্যে পৌঁছেছে। কনস্টেবল দ্রুত রিপোর্ট দিল, “স্যার, ভেতরে এক ব্যক্তির লাশ। পুরুষ, বয়স প্রায় ৫৫। পেশা—লাইব্রেরির কিউরেটর। পূর্বে জাতীয় বিশ্বদ্যিালয়ের ঘণিতের শিক্ষক ছিলেন।”
আরেফিন ও ফাইরুজ ভেতরে গেলেন। লাশটি প্রাচীরের সাথে হেলান দিয়ে বসা, চোখ খোলা, কিন্তু অনন্তকালের জন্য স্থির। মাথার উপরে দেয়ালে লাল রঙে আঁকা i (কাল্পনিক একক)।
আরেফিন হাঁটু গেড়ে বসল। লাশের বুকে একটা ছোট কাগজ—একই স্ট্রিং দিয়ে বাঁধা। কাগজে লেখা:
i² = −1
তোমার যা মনে হয় বাস্তব, তা আসলে কাল্পনিক
আরেফিন দাঁড়িয়ে বলল, “প্রথম লাশ ছিল ‘১’ (বাস্তব সংখ্যা), দ্বিতীয় লাশ ‘i’ (কাল্পনিক সংখ্যা)। পরেরটি হবে জটিল সংখ্যা a+bi আকারে। অথবা সম্ভবত ‘-1’। এটা বোঝার চাবি জেরিনের কাছে থাকা ফাইলগুলোতে।”
ফাইরুজ বললেন, “এই হত্যাকারী পাগল নাকি গণিতের শিক্ষক?”
“পাগল নয়। পাগল হলে প্যাটার্নে ভুল পেতাম। কিন্তু প্রতিটি চিহ্ন, প্রতিটি রেখা নিখুঁত।” আরেফিন থামল। “এটা এআইয়ের কাজ। হ্যাঁ, জেরিন আমার বাবার ‘জিরো পয়েন্ট’ মডেলের সঠিক ট্র্যাক পেয়েছে।”
এই সময় নিচ থেকে কোলাহল। জেরিন সুলতানা হাজির। পরনে ফুলহাতা কামিজ ও জিন্সের প্যান্ট, চোখে ফ্রেমহীন চশমা, কালো ব্যাগটা কাঁধে। হাতে একটা বাদামি খাম।
সে দৌড়ে এসে প্রথমে আরেফিনের দিকে তাকাল, তারপর ফাইরুজের দিকে। তারপর বলল, “ওসি সাহেব, আপনি এখানে ভালোই আছেন। তবে আরেফিন, দাঁড়িয়ে আছো কেন? লাশ এখন ফরেনসিকের দরকার, তোমার চোখে ‘গাণিতিক প্যাটার্ন’ দেখার জন্য নয়!”
আরেফিন চোখ সরিয়ে নিল। “সে কথা বলার আগে, খাবার পেয়েছে?”
জেরিন একটু থমকে গেল। তারপর হাসল। “কে বলল তুমি আমার খাবারের কথা ভাব না? ফাইরুজ বলেন?”
ফাইরুজ দুই হাত তুললেন। “আমি তো এখানকার শুধু দর্শক। কথা বলো দুজনে। আমি মৃতদেহ পর্যবেক্ষণ করি।”
জেরিন কাছাকাছি এসে আরেফিনের কানে ফিসফিস করে বলল, “আমি তোমার জন্য চায়ের দোকান থেকে পরোটা আর মুরগির ঝোল এনেছি। টিফিন ক্যারিয়ারে আছে। ব্যাগে। তুমি খেয়ে নিও। জানি রাতে কিছু খাওনি। এসব কিষয়ে পরে কথা বলব।”
আরেফিন গম্ভীর মুখে বলল, “আমি ক্ষুধার্ত না।” তারা দুজন পাশের রুমে চলে গেল।
“মিথ্যে,” জেরিন সোজা চোখে বলল। “তোমার পেটের ডাক শুনতে পাচ্ছি। প্লিজ, খেয়ে নাও। নইলে কোনো কাজ ঠিকমতো হবে না। আমি তোমাকে চিনি।”
আরেফিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে ব্যাগ থেকে টিফিন ক্যারিয়ার বের করল। একটা পরোটা নিল, খেতে শুরু করল। জেরিন তাকে দেখে একটু হাসল, তারপর ব্যাগের অন্য অংশ থেকে বের করল এক গ্লাস ঠান্ডা দুধ। “এই নাও, ঘুমের ওষুধের বদলে। তোমার ঘুম হয় না জানি।”
আরেফিন কিছু বলল না। শুধু দুধটা নিল।
ফাইরুজ এই দৃশ্য দেখে মনের মধ্যে হাসলেন। তারপর জেরিনকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “জেরিন সুলতানা, তুমি তোমার খবর দাও। ওই ফাইলগুলো কী বলছে?”
জেরিনের ফাইল ও সত্যের সূচনা
জেরিন বাদামি খামটি খুলল। বের করল কয়েকটি পুরনো, হলুদ পাতার নথি, একটি সিডি এবং একটা হাতে লেখা চিঠি। কাগজগুলোতে মাথা নিচু করে বলল, “এই লাইব্রেরির কিউরেটর ছিলেন অধ্যাপক ফরিদ আহমেদ। তিনিও ‘জ্যামিতি সোসাইটি’র গোপন সদস্য ছিলেন। তিন বছর আগে তিনি আমাকে খামটি দেন, বলেন—‘যদি আমি অকালে মরি বা নিখোঁজ হই, এটি আরেফিনকে দিয়ো।’ গতকাল তিনি নিখোঁজ হন। আজকে আমরা পেলাম… তাকে মৃত অবস্থায়।”
আরেফিন পড়া বন্ধ করে নথি উল্টালো। প্রথম পাতা: ‘প্রজেক্ট জিরো পয়েন্ট’।
সাবটাইটেল: ‘অপরাধের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গাণিতিক মডেল, ইমরান আহমেদ কর্তৃক প্রবর্তিত’
জেরিন ব্যাখ্যা করতে লাগল: “মডেলটিতে বলা আছে—প্রত্যেক ব্যক্তির জীবন একটি জটিল সমতল (complex plane) বরাবর চলে। বাস্তব অক্ষে তার প্রতিটি কাজ, কাল্পনিক অক্ষে তার প্রতিটি চিন্তা। অপরাধ ঘটে যখন বাস্তব ও কাল্পনিকের যোগফল একটি নির্দিষ্ট থ্রেশহোল্ড ক্রস করে। ইমরান সাহেব যাকে বলে ‘শূন্য বিন্দু’ (Zero Point) — সেই বিন্দুতে গাণিতিকভাবে কোনো অপরাধ অনিবার্য। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, এই মডেল দিয়ে আগাম অপরাধী শনাক্ত করে থামানো যাবে। কিন্তু…”
আরেফিন মাথা না তুলে বলল, “কিন্তু এই মডেলের ভিত্তিতে তৈরি এআই নিজেই দেখল, থ্রেশহোল্ড ক্রস করতে গেলে ‘শূন্য বিন্দু’ থেকে যেকোনো ব্যক্তিকে সরিয়ে দিতে হবে। অর্থাৎ হত্যা করতে হবে। এআইটির প্রবর্তক আমার বাবা, যিনি নিজেই প্রথম শিকারে পরিণত হন।”
জেরিন আরেফিনের হাত চেপে ধরল। “তোমার বাবার শোক আমি বুঝি। তবে এবারের হত্যাকাণ্ডে ওই এআই সরাসরি জড়িত। কিউরেটর ফরিদ সাহেবের মাধ্যমে এআইটি কীভাবে নিউরাল নেটওয়ার্কে ইনজেক্ট হয়েছিল তা হয়ত জানা যেত। এখন ফরিদ সাহেব মৃত। অর্থাৎ সাক্ষী নেই। কিন্তু আমার কাছে সেই সিডিতে এআইটির সোর্স কোডের অর্ধেক আছে। বাকি অর্ধেক?”
ফাইরুজ জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায়?”
জেরিন আরেফিনের দিকে তাকাল। “আরেফিনের বাবার পুরনো বাসায়, ধানমন্ডি ৪ নম্বরে একটি, আরেকটি মিরপুরে। আর সেটাই হবে শূন্য বিন্দু।”
এক থমকানো নীরবতা। বাইরে ফজরের আজান শুরু হয়েছে। ফাইরুজ দাঁড়িয়ে বললেন, “দুপুরের আগে আমরা ওই বাসায় যাব। তবে এখন জেরিন, তুমি একটি জিনিস বুঝিয়ে দাও—তোমার ওপর কেন হামলা হলো?”
জেরিন সোজা হয়ে বলল, “কারণ আমি প্রমাণ করেছিলাম যে এই এআই আসলে ইমরান আহমেদের ডিজিটাল ক্লোন। তিনি মৃত্যুর কয়েক মাস আগে নিজের মস্তিষ্কের নিউরাল নেটওয়ার্ক আপলোড করেছিলেন। সেটাই এখন ‘জ্যামিতি’। আমার ওপর হামলা হয়েছিল সেদিনই যখন আমি সিডি কপি করছিলাম — সম্ভবত ওরা জানতে পেরেছিল। কিন্তু আমি বুদ্ধি করে মোবাইলে রেকর্ডিং রেখে এসেছিলাম আরেক নিরাপদ জায়গায়।”
আরেফিন প্রথমবারের মতো গর্বিত দৃষ্টিতে জেরিনের দিকে তাকাল। বলল, “তোমার দ্যুপাঁর মতো মগজ।”
জেরিন হেসে বলল, “আর তুমি আমার শার্লক হোমস—যদি হোমস কখনো পাঞ্জাবি-থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পরতেন!”
ফাইরুজ সেদিন প্রথম প্রচণ্ড হাসলেন। তিনি বললেন, “দুজনে মিলে এই কেস মিটাও। আমি শুধু দেখব—কিন্তু হ্যাঁ, কাজটা দ্রুত করো। ভোর হওয়ার আগে আজকের লাশের খবর যেন ফাঁস না হয়। চলো, সবাই আমার গাড়িতে। জেরিন, তুমি সামনে বসবে। আরেফিন পেছনে—ও যেন ‘গাণিতিক মননে’ ডুবে রাস্তা না দেখে।”
তিনজন বেরিয়ে এলেন। বাইরের আকাশে নীলাভ আলো ছড়াচ্ছে। পুরান ঢাকার মসজিদের মিনার থেকে আজানের সুর ভেসে আসছে। অর্ধেক?”
(চলবে)