কে ছিলেন এডলফ হিটলার?
বিশ শতকের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত, বিতর্কিত এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম নিলে তালিকার শীর্ষে থাকবেন এডলফ হিটলার। তিনি ছিলেন জার্মানির নাৎসি বাহিনীর নেতা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মূল রূপকার। তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং বিধ্বংসী যুদ্ধনীতি পুরো পৃথিবীর মানচিত্র ও ইতিহাস বদলে দিয়েছিল।
নিচে তার জীবন ও উত্থান-পতনের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হলো:
প্রাথমিক জীবন ও শৈশব
এডলফ হিটলার ১৮৮৯ সালের ২০ এপ্রিল অস্ট্রিয়ার ব্রাউনাউ অ্যাম ইন (Braunau am Inn) নামক এক ছোট শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা আলোইস হিটলার ছিলেন একজন কাস্টমস অফিসার। শৈশবে হিটলারের ইচ্ছা ছিল একজন শিল্পী হওয়ার, কিন্তু ভিয়েনা একাডেমি অফ ফাইন আর্টস তাকে দুবার প্রত্যাখ্যান করে। এই ব্যর্থতা এবং ভিয়েনায় থাকাকালীন তার দারিদ্র্যপীড়িত জীবন তাকে রাজনীতি ও ইহুদি-বিদ্বেষের দিকে ধাবিত করে।
রাজনীতিতে পদার্পণ ও নাৎসি দলের নেতৃত্ব
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হিটলার জার্মান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং সাহসিকতার জন্য 'আয়রন ক্রস' পদক লাভ করেন। যুদ্ধের পর জার্মানির পরাজয় এবং 'ভার্সাই চুক্তি'র অপমানজনক শর্তগুলো তাকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।
- ১৯১৯ সাল: তিনি 'জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি'তে যোগ দেন, যা পরবর্তীতে নাৎসি দল (NSDAP) হিসেবে পরিচিতি পায়।
- ১৯২৩ সাল: ক্ষমতা দখলের ব্যর্থ চেষ্টা (বিয়ার হল পুচ) করে তিনি কারাবরণ করেন।
- মাইন কাম্ফ (Mein Kampf): কারাগারে থাকাকালীন তিনি তার আত্মজীবনী ও রাজনৈতিক দর্শন 'মাইন কাম্ফ' বা 'আমার সংগ্রাম' লিখেন।
ক্ষমতায় আরোহণ
১৯৩০-এর দশকের অর্থনৈতিক মহামন্দা জার্মানিকে পঙ্গু করে দিয়েছিল। হিটলার তার তুখোড় বাগ্মিতা এবং "জার্মানিকে পুনরায় শ্রেষ্ঠ করার" প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে জনগণের সমর্থন অর্জন করেন।
- ১৯৩৩ সাল: তিনি জার্মানির চ্যান্সেলর নিযুক্ত হন।
- ফুয়েরার (Führer): দ্রুতই তিনি বিরোধী দলগুলোকে নিষিদ্ধ করেন এবং নিজেকে জার্মানির সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী বা 'ফুয়েরার' হিসেবে ঘোষণা করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও হলোকাস্ট
হিটলারের আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি এবং ১৯৩৯ সালে পোল্যান্ড আক্রমণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করে। তার শাসনামলে সংঘটিত হয় মানব ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কিত অধ্যায় হলোকাস্ট। নাৎসি বাহিনীর হাতে প্রায় ৬০ লক্ষ ইহুদি এবং আরও লক্ষ লক্ষ সংখ্যালঘু মানুষ পরিকল্পিতভাবে প্রাণ হারায়।
পতন ও মৃত্যু
মিত্রশক্তির সম্মিলিত আক্রমণ এবং রাশিয়ার লাল ফৌজের বার্লিন দখলের মুখে হিটলারের পরাজয় নিশ্চিত হয়ে যায়। ১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিল বার্লিনের একটি ভূগর্ভস্থ বাংকারে তিনি তার স্ত্রী ইভা ব্রাউনের সাথে আত্মহত্যা করেন।
হিটলারের উত্থান এবং পতন সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে এবং সেই সময়কার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বুঝতে ভিজিট করুন: এডলফ হিটলারের উত্থান ও পতন।
পরিশেষ
এডলফ হিটলারের জীবন আমাদের শেখায় কীভাবে অন্ধ জাতীয়তাবাদ এবং ঘৃণা একটি জাতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে। তার শাসনামল যেমন জার্মানির আধুনিকায়নের কিছু প্রচেষ্টা দেখেছিল (যেমন- অটোবান হাইওয়ে), তার চেয়ে অনেক বেশি দেখেছিল মৃত্যু আর ধ্বংসলীলা। আজ অবধি তাকে ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম একনায়কদের একজন হিসেবে গণ্য করা হয়।