
অধ্যায় : ১
নিষিদ্ধ কারখানা
শহরের ঠিক মাঝখানে, যেখানে ব্যস্ততম মোড়, সেখান থেকে মাত্র তিন গলি দূরে একটা মরা গলির শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে আছে FICTION FACTORY D E M। কেউ জানে না কে বানিয়েছে। কেউ জানে না কবে তৈরি। পথচারীরা চোখ ফিরিয়ে নেয়—কারণ কারখানার দেওয়াল ঘেঁষলেই অদ্ভুত এক ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করে, গ্রীষ্মের দুপুরেও।
দরজার ওপর নীল রঙে লেখা: D = Darkness, E = Echo, M = Memory।
ভিতরে কোনো মেশিনের ঘর্ষণ শব্দ নেই, কোনো কর্মচারী নেই। আছে শুধু তিনটে বোতাম। একটি সোনালি প্লেটে খোদাই করা:
“যে কোনো গল্প বেছে নিতে চাপো একটি বোতাম। কিন্তু তিনটে একসঙ্গে চাপবে না।”
অধ্যায় : ২
প্রথম বোতাম, প্রথম ভুল
ষোলো বছর বয়সী অভির স্কুল ফাঁকি দেওয়ার শখ ছিল। একদিন বৃষ্টি নামতেই বন্ধুদের চ্যালেঞ্জ নিয়ে সে ঢুকে পড়ল ওই কারখানায়। মোবাইলের আলোয় সে প্লেটটি পড়ল। কিন্তু টের পেল তার বাম হাত নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে এগিয়ে যাচ্ছে।
সে চাপালো শুধু 'D' বোতাম।
কারখানা কেঁপে উঠল। মোবাইলের আলো নিভে গেল। চারপাশ ঘন কালো। কিন্তু সেই অন্ধকার নিষ্প্রাণ নয়—বরং যেন হাঁটছে। অভি টের পেল কেউ যেন তার ঘাড়ে ফুঁ দিচ্ছে। পেছনে ফিরে কিছু দেখতে পেল না, কিন্তু জানলার কাঁচে অদৃশ্য আঙুলে লেখা হতে লাগল: “তুই আসবি...”
অভি দৌড়ে বেরিয়ে এল। বাইরে সেই বৃষ্টি থেমে গিয়েছিল। কিন্তু তার ছায়া... তার ছায়া এখনও কারখানার ভেতর লাটিমের মতো ঘুরছে। সে বুঝতে পারল—প্রথম বোতাম চাপলে অন্ধকার কেবিনে থাকে না, সে তোমার সঙ্গে বেরিয়ে আসে। সেই রাত থেকে অভির ঘাড় বেয়ে ঠান্ডা ফুঁ বয়ে যায়। তার ছায়া নেই। কেউ তাকে জিজ্ঞেস করে না কেন?
অধ্যায় : ৩
ইকো আর মেমোরি
এক সপ্তাহ বাদে অভি আবার এল। এবার একা নয়—সঙ্গী তার বান্ধবী মেঘলা।
মেঘলা পড়াশোনায় খুব ভালো, যুক্তিবাদী। সে বলল, “অন্ধকার মানে বিদ্যুৎ চলে যাওয়া। কোনো ভূত নেই। রাত জুড়ে বাতাসে ফ্যানের শব্দ। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে।”
অভি চাপাল 'E' বোতাম। মৃদু গুঞ্জন। তারপর পুরো কারখানা জুড়ে বাজতে লাগল মেঘলার নিজের কণ্ঠস্বর, কিন্তু উল্টো ক্রমে। সে বলেছিল “ভূত নেই”—শোনা গেল “এনেই তূভ”। মেঘলার চোখ বড় হলো।
তারপর 'M' বোতাম চাপতেই মেঘলার চোখ ছানাবড়া। কারণ বাতাসে ভেসে উঠল তার মায়ের স্মৃতি—যিনি মাত্র তিন বছর আগে মারা গেছেন। রান্নাঘরে এপ্রন পরা মা, আলু সেদ্ধ করছেন চুলায়, লবণ দিচ্ছেন, গুনগুন করে গান করছেন—যে গান তিনি মেঘলাকে ছোটবেলায় শোনাতেন। হাতা গরম পানিতে সেদ্ধ হচ্ছে। মেঘলা হাত বাড়িয়ে দিল, ছুঁতে পারল না। চোখ ভিজে গেল।
অভি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। “এই মেশিন খারাপ স্মৃতি গায়েব করে দিতে পারে! তাহলে আর কাঁদতে হবে না?”
মেঘলা আটকালো তাকে। “না, জ্বালাও না! খারাপ স্মৃতি না, এটা আমার মা! তুই ওই স্মৃতি মুছতে পারিস না!”
কিন্তু অভি আবেগের মাথায় একসঙ্গে চেপে দিল তিনটি বোতাম—
D, E, M—একসঙ্গে।
অধ্যায় : ৪
জেগে ওঠা গল্পগুলো
প্রথমে নিঃশব্দ। তারপর এক বিকট শব্দ—যেন পৃথিবীর সব কাঁচ একসঙ্গে ভাঙছে। কারখানা ভাঙতে লাগল ধূসর আলোয়, যেন কেউ সময়কেই ভাঙচুর করছে। দেওয়াল থেকে ইট খসে পড়ছে, কিন্তু কোনো ধুলো ওড়ে না।
দেওয়ালে ফাটল ধরে বেরিয়ে আসছে হাজার হাজার ছোট ছোট নীল রঙের আত্মার মতো জিনিস—আসলে সেগুলো ছিল অসমাপ্ত গল্প। যেসব গল্প কেউ শেষ করতে পারেনি। যেসব চরিত্র মরে যায়নি, কিন্তু লেখক ফেলে রেখে গেছেন। তাদের কেউ কাঁদছে, কেউ হাঁটছে এলোমেলো ভঙ্গিতে, কেউ বারবার একই কথা বলছে।
একটা অর্ধ-লেখা নারী চরিত্র, যার নাম ছিল ‘মায়া’, বেরিয়ে এল বাতাসের মতো। তার পরনে ধূসর শাড়ি, চোখ রক্তাভ। তার গলা দিয়ে এলোমেলো শব্দ—“আমি... নদীর ধারে... তেইশ বছর ধরে... কেউ আমার শেষ পাতা লেখেনি... আমি বলতে চাই ‘আমি রাজি’, কিন্তু লেখক বলে দেননি কোন উত্তর আমার।”
আরেকটা গল্পের নায়ক, 'মিস্টার ঘুম', হাঁটতে লাগল রাস্তায়, শুধু গুলিয়ে ফেলা সংলাপ বলতে বলতে—“আমি তাকে ভালবাসি... না, ঘৃণা করি... না, বলতে পারছি না... গল্পের পরের পৃষ্ঠা নেই!” সে বারবার মাথা ঠুকছে দরজায়, কিন্তু তার কোনো ক্ষত হয় না। কারণ অসমাপ্ত গল্পের চরিত্রের ব্যথা ধরা যায় না, শেষ করা যায় না।
অধ্যায় : ৫
শেষ করতে হলে লেখক হতে হবে
মেঘলা প্রথম টের পেল—রাতে তার ডায়েরি নিজে থেকেই পাল্টে যাচ্ছে। নতুন করে যুক্ত হচ্ছে লাইন, যেন কেউ তার অজান্তেই গল্প লিখে দিচ্ছে। কিন্তু সেগুলো অসমাপ্ত থেকে যাচ্ছে। সে লিখতে বসে—কিন্তু কলম নিজেই থেমে যায়।
এক রাতে অভির স্বপ্নে এল এক বৃদ্ধ লেখক। বৃদ্ধ, তার চোখের নিচে স্থায়ী কালির দাগ, চোখের কোনায় রক্ত, হাতে ভাঙা কলম—যার মুখ থেকে কালি পড়ছে। বৃদ্ধ বললেন, “আমি এই ফ্যাক্টরি বানিয়েছিলাম। অসমাপ্ত রাখা প্রতিটা গল্প এখানে জমা হতো। কিন্তু আমি জানতাম না তারা কষ্ট পায়। ওরা না মানুষ, না ভূত, না গল্প। ওরা মাঝামাঝি। এখন তোদের কাজ শেষ করো।”
অভি জিজ্ঞেস করল, “কী করে শেষ করব?”
বৃদ্ধ বললেন, “লিখে। কিন্তু শর্ত—তোমাদের নিজেদেরও শেষ হতে হতে পারে। তবু কি লিখবে?”
স্বপ্ন ভাঙল। ঘামে ভিজে গেল অভির বালিশ।
অধ্যায় : ৬
শেষ লেখা, শেষ নিঃশ্বাস
পরের রাতে অভি ও মেঘলা কারখানায় ফিরল। ভেতরে আর অন্ধকার নেই, বিদ্যুৎ নেই—শুধু হাজারটা অর্ধস্বচ্ছ চরিত্র দাঁড়িয়ে। ‘মায়া’ কাঁদছে এক কোণে। ‘মিস্টার ঘুম’ দরজায় মাথা ঠুকছে—তার ব্যথা নেই, ব্যথা নেই বলেই যন্ত্রণা।
মেঘলার হঠাৎ চোখ পড়ল পুরনো দেওয়ালে ভাঙা প্লেটের উল্টো পিঠে। সেখানে কুচকুচে কালো কালিতে লেখা:
“শেষ করতে হলে লেখককে হতে হবে। আর লেখককে খেতে হবে অসমাপ্ত শব্দ।”
মেঘলা কিছু বুঝতে পেরে উঠল। সে ঝুলে পড়া একটি পুরনো টাইপরাইটারের কাছে গেল—টিনের বডি, কয়েকটা কী ভাঙা, কিন্তু রিবনে কালি আছে। কাগজ ঢুকিয়ে দিল। অভি বলল, “কী করছিস?”
মেঘলা বলল, “এই ফ্যাক্টরির সব গল্প শেষ করে দেব। নিজের হাতে।”
সে টাইপ করতে লাগল। আঙুল কাঁপছে, কিন্তু থামছে না।
প্রথম ‘মায়া’র গল্প শেষ করল:
“মায়া, তুই নদীর ধারে যে অপেক্ষা করে ছিলি, তোর প্রিয় মানুষটা এসে গেছে। সাত বছর পর। সে বলল, ‘চলো বাড়ি।’ মায়া আর অপেক্ষা করে না। তার গল্প শেষ—তাই তাকে আর কষ্ট পেতে হয় না। নদীর পানি আবার নীল। আকাশ পরিষ্কার।”
টাইপ করা শেষ হতেই ‘মায়া’ ধীরে ধীরে আলোকিত হয়ে উঠল—নীল থেকে সাদা, সাদা থেকে স্বচ্ছ। এক ফোঁটা জলের মতো বাতাসে মিলিয়ে গেল। তার মুখে হাসি ফুটল। শেষবারের মতো ফিসফিস করল, “থ্যাঙ্ক ইউ।”
এরপর ‘মিস্টার ঘুম’-এর গল্প শেষ করল মেঘলা:
“মিস্টার ঘুম একদিন ঠিক করলেন, তিনি আর ঘুমাতে যাবেন না। তিনি বরং ঘুমকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটবেন। তাই তাঁর আর বিভ্রান্তি নেই। তিনি জানেন কে তিনি—তিনি স্বপ্নের চেয়েও বড় এক সত্য। ভালোবাসতে পারেন একজনকে, ঘৃণা করতে পারেন আরেকজনকে, কিন্তু সংলাপ আর গুলিয়ে যায় না।”
সেও মিলিয়ে গেল। টাইপরাইটার ‘ডিং’ করে বেজে উঠল।
তারপর একে একে পঞ্চাশটা, একশোটা, পাঁচশোটা, হাজারেরও বেশি চরিত্র—প্রত্যেকের জন্য মেঘলা শেষ লাইন লিখল। দুঃখী রাজকন্যা, হারিয়ে যাওয়া সৈনিক, যে ডিটেকটিভ কখনো মামলা শেষ করতে পারেনি—সবার গল্প লিখে দিল শেষ পর্ব। মেঘলার আঙুল ফুলে গেছে, চোখের পাতা ভারি, কিন্তু থামে না।
হঠাৎ অভি টের পেল—মেঘলা নিজেও ধীরে ধীরে স্বচ্ছ হয়ে যাচ্ছে! তার হাত স্বচ্ছ, তার মুখ স্বচ্ছ, টাইপরাইটারের রিবন দিয়ে তিনি দেখতে পাচ্ছেন। কারণ তিনিও কি কোনো অসমাপ্ত গল্পের চরিত্র?
মেঘলা চমকে উঠল। বুঝতে পারল—যদি তিনি এখনই নিজের গল্প না লেখেন, তাহলে তিনিও মুছে যাবেন চিরদিনের মতো, কিন্তু অসমাপ্ত থেকেই যাবেন। তিনি টাইপরাইটারে শেষ কয়েক লাইন লিখলেন, সবশেষে:
“অভি আর মেঘলা একসঙ্গে সব শেষ করে ফিরে এল বাড়ি। তারা আর কখনো FICTION FACTORY-র কথা বলে না। তারা শুধু গল্প লেখে, আর প্রতিটি গল্প শেষ করে। কারণ তারা জানে—অসমাপ্ত গল্প একদিন তাদের লেখককে গ্রাস করে। কিন্তু শেষ করা গল্প লেখককে বাঁচায়।”
লেখা শেষ হতে না হতেই টাইপরাইটার বেজে উঠল—জোরে, পরিষ্কার ‘ডিং’। মেঘলা আবার আগের মতো স্পষ্ট হলো। শরীর মাংসের, হাতে রক্ত চলাচল করছে। কারখানা ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে লাগল—দেওয়াল গলে যাচ্ছে, ছাদ নামছে, বোতামগুলো ডুবে যাচ্ছে মেঝেতে। কয়েক মিনিটের মধ্যে পুরনো ইটগুদামের মতো নিঃশব্দ পড়ে রইল।
টাইপরাইটারটিও অদৃশ্য। কেবল একটা শব্দ বাতাসে রয়ে গেল: ‘ডিং’।
অধ্যায় : ৭
শেষে যা থাকে
সেদিন রাতে বৃদ্ধ লেখক আবার স্বপ্নে এলেন—এবার হাসিমুখে। চোখের নিচের কালি কমেছে, কলমটা আর ভাঙা নেই। তিনি বললেন, “তোমরা আমার চেয়েও বড় লেখক। কারণ আমি শুধু শুরু করেছিলাম। আমি জানতাম না গল্প কখন শেষ হয়। তোমরা শিখিয়ে দিলে।”
পরদিন সকালে উঠে অভি আর মেঘলা দেখল—কারখানার জায়গায় আছে শুধু শ্যাওলা ধরা একটি ফলক। তাতে অস্পষ্ট অক্ষরে লেখা:
“এখানে একসময় গল্প হাজির হতো। এখন তারা সবার নিজের মনে বাস করে। কারণ প্রতিটা গল্পেরই শেষ আছে—যদি কেউ লিখে দেয়।”
অভি আর মেঘলা আর কখনো ফ্যাক্টরির কথা বলেনি। তারা এখন বড় হয়েছে। অভি ডাক্তার, মেঘলা লেখক। মেঘলা প্রতিটি গল্প শেষ করেন — কোনো গল্প অসমাপ্ত রাখেন না। আর অভি? অভি তার রোগীদের বলে, “ভয় পাবেন না। সব ব্যাথার একটা শেষ আছে।”
তবে কখনো কখনো রাতে, যখন তারা আলো নিভিয়ে ঘুমোতে যায়, তারা দুজনেই একই স্বপ্ন দেখে: নীল আভা, টাইপরাইটারের শব্দ, আর একটি কাগজে লেখা—
“সাবধান। প্রতিটা গল্পের শেষ দরকার। অসমাপ্ত গল্প একদিন তাদের লেখককে গ্রাস করে। কিন্তু শেষ করা গল্প—লেখককেই বাঁচায়।”
তারপর ঘুম। গভীর, নির্মল, সম্পূর্ণ।
লেখক: পাভেল মিয়া
— সম্পূর্ণ —