"পাক সার জমিন সাদ বাদ ও একজন হুমায়ুন আজাদ"
একজন লেখক বা সাহিত্যিকের কোন সাহিত্যকর্ম নিয়ে সমালোচনা করা যতটা না কঠিন তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন কাজ ঐ ব্যক্তিকে নিয়ে সমালোচনা করা। আমাদের বাঙালিদের মধ্যে প্রকৃত অর্থে কোন সমালোচক শ্রেণি গড়ে উঠেনি। যারাই সাহিত্য সমালোচনায় নেমেছেন তারাই সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ আর ব্যক্তি হুমায়ুন আজাদকে এক করে ফেলেছেন। আর যারা সাহিত্য কখনো পড়েন না, 'কান নিয়ে গেল চিলে' শুনে চিলের পিছনে ছুটেন এবং সেই চিলকে ধরতে পারলে কর্তন করেন, সেই সমালোচকরা আরো বেশি ভয়ংকর। শুধু ভয়ংকার না, মানব সমাজের জন্য সাক্ষাৎ যমদূত। আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি, যারা হুমায়ুন আজাদকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আক্রমণ করেছিল তারা কেউই 'পাক সার জমিন সাদ বাদ' উপন্যাস পুরোটা পড়েনি, পুরোটা তো দুরের কথা, দুয়েকটা লাইনের বেশি পড়েছে কিনা তা নিয়েও আমি সন্দিহান।
আমরা বাঙালিরা বুঝে বা না বুঝে 'পাক সার জমিন সাদ বাদ' এর লেখক হুমায়ুন আজাদকে খুন করতে গিয়ে একই সাথে একজন ভাষাবিদ ও ভাষাতাত্ত্বিককে খুন করে ফেলেছি। না, আমি বলছি না, হুমায়ুন আজাদ বাংলা ভাষার সেরা ভাষাবিদ ও ভাষাতাত্ত্বিক, যেখানে ড . সুনীতিকুমার রয়েছেন, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ রয়েছেন, আব্দুল হাই রয়েছেন, মুহম্মদ এনামুল হক রয়েছেন, সুকুমার সেন রয়েছেন। তবে, হুমায়ুন আজাদ সাহিত্যে কি করতে চেয়েছিলেন আর বাংলা ভাষার জন্য কি করতে চেয়েছিলেন তা সূক্ষ অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে না দেখলে বোঝা সম্ভব নয়।
আমার এই প্রবন্ধে আমি চেষ্টা করবো হুমায়ুন আজাদকে দুইটি দিক থেকে তুলে ধরার। একটা হল সাহিত্যিক ও ভাষাবিদ হুমায়ুন আজাদ আরেকটা হল সাহিত্যিক ও ভাষাবিদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা একজন চিন্তাবিদ হুমায়ুন আজাদ। আর, ব্যক্তি হুমায়ুন আজাদ নিয়ে আমি কিছুই বলবো না, কারণ তার ব্যক্তি জীবন সম্পর্কে আমার জ্ঞান অতি সীমিত।
হুমায়ুন আজাদের সম্পর্কে প্রথম বিস্তারিত জেনেছিলাম, যে বছর তিনি বইমেলা থেকে ফেরার পথে ঘাতকদের হামলা শিকার হন অর্থাৎ ২০০৪ সালে। এর পরে 'পাক সার জমিন সাদ বাদ' উপন্যাস বইটা ঢাকা কলেজে পড়ার সময় হঠাৎ করে সামনে পেয়ে যাই। উপন্যাস পড়ার নেশা তখনো হয়নি আমার। হাতে গোনা কয়েকটা উপন্যাস পড়েছি। সম্ভবত বহু আলোচিত এবং নিষিদ্ধ উপন্যাস বলেই বইটা হাতে নিয়েছিলাম। এক পৃষ্ঠার বেশি পড়া সম্ভব হয়নি। এমন অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ আমি আগে কখনো শুনিনি, কারণ সে পরিবেশে আমি বড় হইনি। উপন্যাসের ভাষা এতো খারাপ হতে পারে আমার ধারণা ছিল না। আমি শরতের 'দেবদাস' পড়েছি, রবীন্দ্রনাথের ‘চোখের বালি’ পড়েছি, মানিকের 'পুতুল নাচের ইতিকথা' পড়েছি, আর পাঠ্য হিসেবে 'পদ্মা নদীর মাঝি' পড়েছি, জহির রায়হানের 'হাজার বছর ধরে' পড়েছি, আরো গোটা কয়েক উপন্যাস পড়েছি। এই অল্প কিছু উপন্যাস পড়ে, উপন্যাসের ভাষা, আঙ্গিক, অলঙ্করণ সম্পর্কে হালকা ধারণা আমার ছিল। হুমায়ুন আজাদের 'পাক সার জমিন সাদ বাদ' উপন্যাসের ভাষা হজম করার মত মানসিকতা তখনো আমার হয়ে উঠেনি। যাই হোক, এরপর থেকে সুদীর্ঘ কাল আমি হুমায়ুন আজাদকে একজন খারাপ 'লেখক ও মানুষ (!)' হিসেবেই জানতাম এবং তার আর কোন লেখা পড়ার ইচ্ছা বা রুচি আমার হয়নি।
এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে যখন শিক্ষকতার পেশা গ্রহণ করি তখন আবারো হুমায়ুন আজাদ সামনে আসে। আমি ছিলাম ইংরেজি ভাষাবিজ্ঞানের শিক্ষক। ইংরেজি ভাষাবিজ্ঞান ও শিখন এর পাশাপাশি তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের অংশ হিসেবে বাংলা ভাষা নিয়ে কিছু কাজ করার সিদ্ধান্ত নিই। এক্ষেত্রে হুমায়ুন আজাদের দুয়েকটি বই আমাদের প্রাথমিক লেখালেখির কাজে লেগেছিল। এই বইগুলো বাংলা ভাষায় আগে কেউ লেখার সাহস করেনি বা হয়তো কারো মাথায় আসেনি। না আসার কারণও আছে। বিষয়গুলো একেবারেই নতুন এবং এগুলো নিয়ে বাংলা ভাষায় গবেষণার দরকার আছে। বিশেষ করে "বাংলা অর্থতত্ত্ব ও প্রয়োগবিজ্ঞান" নিয়ে গবেষণা বা লেখালেখি খুব একটা পাওয়া যায় না। ‘ডিসকোর্স বিশ্লেষণ’ নিয়ে তো একেবারেই কাজ হয়নি। হুমায়ুন আজাদ শুরু করেছিলেন, কিন্তু শেষ করতে পারেননি, তার আগেই তাকে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকান্ডের মাধ্যমে আমরা একজন প্রতিশ্রুতিশীল ভাষাবিজ্ঞানী ও ভাষা গবেষককে হারাই।
যাই হোক, একই সময়ে আমি সাহিত্যিক আহমদ ছফার লেখার ভক্ত বনে যাই। এ সম্পর্কে আমার ‘বই পড়া কেন দরকার?' প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা আছে, তাই এখানে পরিসর দীর্ঘ করা অপ্রয়োজনীয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করার মাত্র এক বছরের মধ্যে বাংলা ভাষার সকল সেরা উপন্যাসের পাশাপাশি আহমদ ছফার প্রায় সকল লেখা পড়ে শেষ করি। আহমদ ছফা নিসন্দেহে স্বাধীনতা উত্তর সময়ে বাংলাদেশের সেরা বুদ্ধিজীবী এবং ঔপন্যাসিক ছিলেন। আহমদ ছফার কিছু লেখার মাধ্যমে হুমায়ুন আজাদের লেখার খুঁত সম্পর্কে অবগত হই। এরপর, আমি দুইজনের বেশ কিছু লেখা পড়ি। আহমদ ছফা সম্পর্কে ন্যূনতম মন্তব্য করার মত যোগ্যতা আমার এখনো হয়নি। তিনি অনেক বড় মাপের একজন লেখক ছিলেন। একজন লেখককে তার লেখার সংখ্যা নয়, মান দিয়ে যাচাই করা উচিৎ। আর আহমদ ছফার ক্ষেত্রে তা আরো এক ধাপ এগিয়ে বলতে হয়, শুধু মান নয়, মনন দিয়ে যাচাই করা উচিৎ। আহমদ ছফার সময়সাময়িক ঔপন্যাসিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, যিনি মাত্র দুটি উপন্যাস লিখেছেন, 'চিলেকোঠার সেপাই' আর 'খোয়াবনামা'। উপন্যাস কি জিনিস তা মাত্র দুটি উপন্যাসে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন। সমসাময়িককালে হুমায়ুন আজাদও উপন্যাস লিখেছেন। কিন্তু, দুজনের উপন্যাসে আকাশ পাতাল ব্যবধান। হুমায়ুন আজাদের সব কটি উপন্যাস আমি পড়িনি, তবে এই লেখার জন্য 'পাক সার জমিন সাদ বাদ' উপন্যাসটি পড়তেই হলো। আমার উদ্দেশ্য ছিল মূলত আমাদের দেশের সাম্প্রতিক অবস্থার আলোকে 'পাক সার জমিন সাদ বাদ' উপন্যাসের তাৎপর্য তুলে ধরা।
যদি একেবারে নিরপেক্ষ ভাবে বলতে বলা হয়, আমি বলবো, ভাষার ব্যবহার, আঙ্গিক, সাহিত্যমান, এই বিষয়গুলো দেখলে, 'পাক সার জমিন সাদ বাদ' কোন উপন্যাসের মধ্যেই পড়ে না। উপন্যাসের কোন সংজ্ঞা বা মাপকাঠি দিয়ে এটাকে উপন্যাস বলা যায় না। কোন একজন সাহিত্যিক 'পাক সার জমিন সাদ বাদ'কে বলেছেন 'অপন্যাস'। আমার মতে, 'অপন্যাস' বলাটা Overrated হয়ে গেছে; এটাকে সর্বোচ্চ বলা যায় 'কুপন্যাস'। যারা উপন্যাস হিসেবে 'পাক সার জমিন সাদ বাদ' পড়তে চান, তারা বাংলা সাহিত্যের অন্য যে কোন উপন্যাস পড়তে পারেন, এটা পড়ে সময় নষ্ট করার কোন দরকার নেই।
তবে, এখানে 'কিন্তু' আছে। 'পাক সার জমিন সাদ বাদ' এর ক্যারিশমা অন্য জায়গায়। এটা বাঙালি সম্ভবত বুঝতে পারেনি বলেই আমার ধারণা। আহমদ ছফাও পারেনি, আর হালের ড. সলিমুল্লাহ খান স্যার মনেও হয় বুঝার দরকারই মনে করেন না। আহমদ ছফা শুধু সাহিত্যিক হিসেবে 'পাক সার জমিন সাদ বাদ' এর 'মান' নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, এই উপন্যাসের প্রতিটি বাক্যের পেছনে ঢাকা পরে যাওয়া লেখকের 'মনন' নিয়ে তিনি হয়তো মন্তব্য করার কথা ভাবেননি। 'সংখ্যা, মান এবং মনন' এই তিনের কথা আগেও বলেছি। এদের পার্থক্য বুঝতে হবে। কিছু লেখক হয়তো সংখ্যার কারনে বিখ্যাত কিন্তু লেখার মান নেই, আবার কেউ কেউ মানের কারণে বিখ্যাত সাহিত্যকর্মের সংখ্যা খুবই কম। কিন্তু, মনন দিয়ে যাচাই করা যায় এমন সাহিত্যিক বাংলা সাহিত্যের স্বাধীনতা উত্তর সময় খুবই কম। একজন আহমদ ছফা নিজে, আরেকজন হুমায়ুন আজাদ। আমরা এই দুইজনের বৈপরিত্য ও বৈরিতা সম্পর্কে জানি; তারা একজন আরেকজনের নামও শুনতে পারতেন না তা-ও আমরা জানি। কিন্তু, মননের কোন একটা জায়গায় দুজনেরই মিল ছিল, সেটা হয়তো তারাও জানতেন না। দুজনের সাহিত্যকর্ম এক টেবিলে নিয়ে পড়তে বসে আমার মনে হয়েছে এই জায়গাটি নিয়ে কথা বলার দরকার আছে। দুজনের কেউই আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাদের লেখার মধ্যে মান, আর লেখার পেছনে যে মনন দুজন রেখে গেছেন তা আমাদের বের করার দরকার আছে। আমাদের সাম্প্রতিক সময়ের অসংখ্য সামাজিক ও ধর্মীয় সমস্যার সমাধান আছে সেখানে, আছে ভবিষ্যতের দিকে পা পাড়াবার পাথেয়। আহমদ ছফার লেখার মান ও তার মনন নিয়ে লিখতে আরো বেশ সময় ও গবেষণা দরকার আছে। হুমায়ুন আজাদের লেখার মান নিয়ে যা বলার বলে ফেলেছি, অন্তত 'পাক সার জমিন সাদ বাদ' বিবেচনায় আনলে তিনি কোন ঔপন্যাসিকের মধ্যে পড়বেন না, এছাড়াও তার বেশির ভাগ লেখারই সাহত্যিক মান বিবেচনা করলে তিনি খুব বড় মাপের সাহিত্যিক হবেন বলে আমার মনে হয় না। আমি 'পাক সার জমিন সাদ বাদ' পড়ে যে হুমায়ুন আজাদের মননের সন্ধান পেয়েছি, সেটা নিয়ে অল্প কিছু কথা বলে আজকে শেষ করবো।
'পাক সার জমিন সাদ বাদ' আসলে পিস্তল থেকে বের হয়ে যাওয়া একটা বুলেটের মত, যার নিশানা বা গন্তব্য আগে থেকে ঠিক করা এবং হুমায়ূন আজাদ অব্যর্থভাবে নিশানাকে ছেদ করে দিয়ে বুলেটটি অপর পাশে নিয়ে গেছেন। উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমরা দেখেছি তিনি ভাষার কঠোরতা আর নির্মমতাকে ব্যবহার করে আমাদের দেশের ধর্মের লেবাসধারী একটি শ্রেণিকে তুলোধুনো করে ছেড়েছেন আর সেটি করতে গিয়ে তিনি জলাঞ্জলি দিয়েছেন সাহিত্যের অলঙ্করণ নামক বিশাল একটা জিনিস। বইটি পড়তে পড়তে আমার কেবলই মনে হয়েছে সেই ভন্ড ধর্ম ব্যবসায়ী শ্রেণির প্রতি তার তীব্র আক্রোশ প্রকাশ করছেন কলমের মুখ দিয়ে। তার কাছে যদি হিটলারের মত আগ্নেয়াস্ত্রের ক্ষমতা থাকতো তাহলে তিনি হয়তো ইহুদিদের মত পুড়িয়ে মারতেন মুসলমানদের এই শ্রেণিটাকে যারা ধর্মকে পুজি করে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করে যাচ্ছে যুগের পর যুগ। এই প্রবণতা সৈয়দ ওয়ালীউল্লার মধ্যেও ছিল তবে, সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ যা করেছেন সাহিত্যিক শক্তিতে, হুমায়ুন আজাদ তা করতে চেয়েছিলেন চাপার জোরে, নিয়ন্ত্রণহীন ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে। এই বিষয়টিই মূলত দুজন সাহিত্যিকের মধ্যে যোজন যোজন দুরত্ব সৃষ্টি করেছে।
হুমায়ুন আজাদ 'পাক সার জমিন সাদ বাদ' উপন্যাসের মাধ্যমে প্রকৃত মুসলমানদের প্রতি কোন ক্ষোভ প্রকাশ করেননি, ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভন্ড মুসলমানদের প্রতি, যারা ধর্মকে পুজি করে অর্থের ব্যবসা করে, মানুষকে ঠকিয়ে নিজেরা ফুলে ফেঁপে উঠে। তাদেরকে আমরা হয়তো নিতান্তই ভদ্রতার খাতিরে গালিগালাজ করি না অথবা আড়ালে আবডালে হয়তো দু-চার কথা বলি বা অস্ফুট কন্ঠে গালি দিয়ে দুপাশে তাকাই, কিন্তু হুমায়ূন আজাদ একেবারে দলিল করে তাদের নামে অকথ্য ভাষার সম্পদ লিখে দিয়ে গেছেন। এই সম্পত্তি ধর্ম-ব্যবসায়ীদের পাওনা ছিল এবং তিনি তা কড়ায় গণ্ডায় বুঝিয়ে দিয়েছেন। তার এই লিখিত দলিলের নাম, 'পাক সার জমিন সাদ বাদ'। হুমায়ুন আজাদ মরণশীল মানুষ, তাকে হত্যা চেষ্টা না করলেও তিনি এক সময় মারা যেতেন কিন্তু দুনিয়াতে যতদিন ভন্ড ধর্ম ব্যবসায়ী থাকবে, 'পাক সার জমিন সাদ বাদ' আলোচনায় আসবেই। লেখক না থাকুক, কিন্তু যে কর্ম তিনি সৃষ্টি করেছেন, তা যুগ যুগ ধরে ভন্ড, লেবাসধারী, ধর্ম ব্যবসায়ীদের মুখে থুতু নিক্ষেপ করবেই, করতেই হবে।