অনুপস্থিতি
লেখক: আয়াত চৌধুরী
✨ পরিচিতি
“অনুপস্থিতি” একটি প্রেম ও রহস্যনির্ভর উপন্যাস, যেখানে সম্পর্কের গভীর আবেগের পাশাপাশি লুকানো সত্য ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে।
গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে আফিয়া তাহসিন খান এবং আহনাফ তাহমিদ খান—একটি দম্পতি, যাদের বাহ্যিক জীবন যতটা স্বাভাবিক মনে হয়, ভেতরে ততটাই অজানা প্রশ্নে ভরা। রাতের নিঃশব্দতায় আহনাফের হঠাৎ অনুপস্থিতি আফিয়ার মনে জন্ম দেয় সন্দেহ, যা ধীরে ধীরে তাকে টেনে নিয়ে যায় এক জটিল অতীতের দিকে।
এই উপন্যাসে প্রেম শুধু অনুভূতি নয়—এটি এক রহস্যের দরজা, যেখানে প্রতিটি উত্তর নতুন প্রশ্ন তৈরি করে। অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের জট খুলতে খুলতে পাঠক আবিষ্কার করবে—কখনো কখনো সবচেয়ে বড় রহস্য থাকে সবচেয়ে কাছের মানুষের মধ্যেই।
“অনুপস্থিতি” শুধু একজন মানুষের হারিয়ে যাওয়া নয়—এটি সত্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নীরবতার গল্প।
অধ্যায় ১ — পার্ট ১
“রাতের অনুপস্থিতি”
রাতটা ধীরে ধীরে তার গভীরতম স্তরে নেমে এসেছে।
ঘড়ির কাঁটা যখন ২টা ১৭ মিনিটে এসে থেমে থেমে এগোচ্ছে, তখন সময়ের উপস্থিতি যেন আর বাস্তব মনে হয় না—বরং মনে হয়, সময় নিজেই ক্লান্ত হয়ে গেছে। শহরের বাইরের আলোগুলো অস্পষ্ট, দূরের রাস্তায় কয়েকটি গাড়ি হঠাৎ দ্রুত চলে গিয়ে আবার অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে। তাদের পেছনে যে শব্দ থাকে, সেটাও ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যায়, যেন এই শহর নিজের অস্তিত্বও লুকিয়ে রাখতে চায়।
ঘরের ভেতর নীরবতা এত ঘন যে, তা শব্দের অভাব নয়—একটি উপস্থিতি।
টিক… টিক… টিক…
ঘড়ির শব্দটা শুধু সময় জানাচ্ছে না, বরং সময়কে জোর করে এগিয়ে নিচ্ছে।
আফিয়া চোখ খুলল ধীরে।
প্রথম কয়েক সেকেন্ড তার দৃষ্টি পরিষ্কার ছিল না। ঘুম আর বাস্তবতার মাঝখানে যে একটা সূক্ষ্ম পর্দা থাকে, সেটি তখনও পুরোপুরি সরে যায়নি। কিন্তু খুব দ্রুতই সে বুঝতে পারল—কিছু একটা ঠিক নেই।
সে হাত বাড়াল।
বিছানার অন্য পাশটা খালি।
ঠান্ডা।
কোনো উষ্ণতা নেই, কোনো সাম্প্রতিক উপস্থিতির চিহ্ন নেই।
আহনাফ নেই।
তার শরীর এক মুহূর্তে স্থির হয়ে গেল। এটা তার জন্য নতুন কিছু নয়, তবুও প্রতিবারই বিষয়টা নতুন এক অস্বস্তি নিয়ে আসে। অভ্যাস কখনো অনুভূতিকে সম্পূর্ণ নিঃশেষ করতে পারে না, শুধু তাকে স্থগিত রাখে।
আফিয়া ধীরে ধীরে উঠে বসল। চাদরটা বুকের কাছে টেনে ধরল। এই অভ্যাসটা সে নিজেও পুরোপুরি বোঝে না, কিন্তু যখনই ভেতরের অস্থিরতা বাড়ে, সে কিছু একটা আঁকড়ে ধরে—যেন শূন্যতা থেকে নিজেকে আলাদা করা যায়।
শুরুতে সে প্রশ্ন করত।
স্পষ্টভাবে।
নির্দ্বিধায়।
“তুমি কোথায় যাচ্ছো?”
“এত রাতে কেন?”
“এটা কি জরুরি?”
আহনাফ তখন খুব শান্তভাবে তাকাত। তার চোখে কোনো তাড়াহুড়ো থাকত না, কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তাও যেন অনুভূত হতো না। তারপর খুব সংক্ষিপ্তভাবে বলত—
“কিছু কাজ ছিল।”
এই বাক্যটি যেন এক ধরনের সমাপ্তি।
আলোচনারও, প্রশ্নেরও, এবং সম্ভবত সম্পর্কের একটি অংশেরও।
আফিয়া প্রথমদিকে এই উত্তর মেনে নিতে চাইত না। সে আরও জানতে চাইত। কিন্তু প্রতিবারই একই অভিজ্ঞতা—আরও প্রশ্ন মানে আরও নীরবতা। আর সেই নীরবতা ধীরে ধীরে দেয়ালের মতো শক্ত হয়ে উঠত।
সময় এগিয়েছে।
প্রশ্ন কমেছে।
নীরবতা বেড়েছে।
এবং সেই সঙ্গে আফিয়ার পর্যবেক্ষণও গভীর হয়েছে।
সে এখন আর প্রশ্ন করে না। সে শুধু লক্ষ্য করে।
কখন বের হয়, কখন ফেরে, কোন সময় ফোন অন থাকে, কোন সময় থাকে না।
মানুষ যখন উত্তর দেয় না, তখন অন্য সব কিছুই ভাষা হয়ে ওঠে।
আফিয়া উঠে দাঁড়াল।
ঘরের ভেতর আলো কম। টেবিলের পাশে ছোট ল্যাম্পটা জ্বলছে, হলুদাভ মৃদু আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। সেই আলো ঘরকে উষ্ণ করার বদলে যেন আরও ভঙ্গুর করে তুলেছে।
সে জানালার দিকে এগোল।
কাঁচের ওপাশে শহর নিঃশব্দ। কিছু গাছ হালকা বাতাসে দুলছে, দূরের আলো ঝাপসা হয়ে আছে। জীবন চলছে, কিন্তু খুব ধীরে, খুব অনিচ্ছায়।
আফিয়ার চোখ ধীরে ধীরে টেবিলের দিকে গেল।
একটা ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ জিনিস অনুপস্থিত।
আহনাফের ফোন।
সে থমকে গেল।
এই থামা কোনো নাটকীয় মুহূর্ত নয়। এটি একটি স্বাভাবিক উপলব্ধির মতো—যেটা ধীরে ধীরে আসে, কিন্তু একবার এলে আর উপেক্ষা করা যায় না।
গতকাল রাতে ফোনটা ছিল।
সে নিশ্চিত।
কারণ ঘুমানোর আগে সে নিজেই দেখেছিল টেবিলের ওপর, চার্জারের পাশে রাখা, স্ক্রিনটা নিচের দিকে।
সে ধীরে ধীরে টেবিলের কাছে গেল।
হাত বাড়াল।
টেবিলের পৃষ্ঠ স্পর্শ করতেই ঠান্ডা অনুভূত হলো। একটি নির্দিষ্ট জায়গা, যেখানে কিছুক্ষণ আগেও একটি বস্তু ছিল, এখন শুধু শূন্যতা রেখে গেছে।
আফিয়া কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তার ভেতরে প্রথমে কোনো আতঙ্ক ছিল না। ছিল একটা সূক্ষ্ম হিসাব।
ফোন ছাড়া বাইরে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
কিন্তু রাত ২টায়, বারবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি, এবং কোনো ব্যাখ্যার অভাব—এই তিনটি বিষয় একসাথে সাধারণত “স্বাভাবিক” থাকে না।
সে ঘরের চারপাশে তাকাল।
সবকিছু যথাস্থানে।
কিন্তু এই “যথাস্থান”-টাই অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে।
বিছানা ঠিক করা, বালিশ সামান্য চেপে থাকা, কোনো তাড়াহুড়োর চিহ্ন নেই। যেন কেউ খুব শান্তভাবে উঠে গেছে, কোনো শব্দ না করে, কোনো ব্যাঘাত সৃষ্টি না করে।
মানুষ যখন তাড়াহুড়ো করে বের হয়, তখন ঘরও তাড়াহুড়ো দেখায়।
এখানে তেমন কিছু নেই।
এটাই সমস্যা।
আফিয়ার বুকের ভেতর একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন শুরু হলো। এটাকে ভয় বলা যায় না, আবার কৌতূহলও নয়। বরং এমন এক অনুভূতি, যেটা ধীরে ধীরে একটি প্রশ্নকে বড় করে তোলে—যার উত্তর কেউ দেয় না।
সে আবার জানালার দিকে তাকাল।
বাইরের আলো আগের মতোই।
কিন্তু ভেতরের আলো বদলে গেছে।
ঠিক তখনই—
একটা শব্দ।
খুব হালকা।
প্রথমে সে নিশ্চিত ছিল না। হয়তো বিল্ডিংয়ের কোনো পাইপের শব্দ, বা বাতাসের চাপ।
কিন্তু আবার—
ধাতব কিছু ঘোরানোর শব্দ।
আফিয়া স্থির হয়ে গেল।
এই শব্দ ঘরের বাইরে থেকে আসছে না।
এটা দরজার কাছ থেকে আসছে।
চাবি।
লক।
ধীরে ধীরে ঘোরানো হচ্ছে।
তার শরীর যেন মুহূর্তের জন্য নিজের কাজ বন্ধ করে দিল। শ্বাস স্বাভাবিক থাকলেও, তার মন এখন পুরোপুরি শব্দের দিকে কেন্দ্রীভূত।
এই সময়?
এই ফ্ল্যাটে?
আহনাফ ছাড়া আর কেউ নেই।
তাহলে দরজা খুলছে কে?
সে খুব ধীরে দরজার দিকে এগোল। প্রতিটি পদক্ষেপ স্বাভাবিক হলেও, তার ভেতরের অনুভূতি অস্বাভাবিকভাবে জটিল হয়ে উঠছে। ঘরের বাতাস যেন ঘন হয়ে আসছে, আর টিকটিক শব্দটা আরও স্পষ্ট, আরও ধারালো।
টিক… টিক… টিক…
সে দরজার কাছে এসে দাঁড়াল।
কানে লাগাল।
আবার শব্দ।
চাবি ঘোরানো।
কিন্তু এবার খুব অদ্ভুতভাবে, শব্দটা যেন “ভেতর থেকে” আসছে বলে মনে হলো।
এই উপলব্ধি কোনো যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই, তবুও আফিয়ার মস্তিষ্ক সেটাকেই সত্য হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে।
তার হাত ধীরে ধীরে দরজার হাতলে উঠল।
থেমে গেল।
আঙুলগুলো শক্ত হয়ে গেছে।
একটা মুহূর্তের জন্য তার মাথায় খুব সাধারণ কিন্তু অস্বস্তিকর একটা চিন্তা এল—
আহনাফ যদি ফিরে এসে থাকে, তাহলে দরজা খুলছে কে?
এই প্রশ্নের কোনো যৌক্তিক উত্তর নেই।
তবুও প্রশ্নটা থেকেই যায়।
সে এক পা পিছিয়ে গেল।
ঘরের আলো যেন আরও ম্লান হয়ে এসেছে। বা হয়তো তার চোখ এখন আলোকে ঠিকভাবে গ্রহণ করছে না।
টিকটিক শব্দটা আরও জোরে শোনা যাচ্ছে।
সময়ের মতো।
অথবা কোনো সতর্কতার মতো।
আফিয়া দরজার দিকে তাকিয়ে আছে।
দরজাটা এখনো বন্ধ।
কিন্তু লক ঘোরানোর শব্দ থামছে না।
ধীরে ধীরে, খুব ধীরে—
দরজার হাতল সামান্য নড়ে উঠল।
এতটুকু নড়াচড়া স্বাভাবিক হলে কোনো গুরুত্ব থাকত না। কিন্তু এই মুহূর্তে এটি একটি সংকেতের মতো মনে হচ্ছে।
আফিয়ার শ্বাস এক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেল।
তার মনে হলো—
দরজার ওপাশে যে আছে, সে শুধু প্রবেশ করতে চাইছে না।
সে জানে, ভিতরে কে আছে।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে—
ঘরের আলো একবার ঝিক করে উঠল।