কালপ্রবাহের এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে আজ আমরা দাঁড়িয়ে। আমাদের পকেটে এখন এমন এক যান্ত্রিক মস্তিষ্ক ঘোরে, যে আমাদের চেয়েও ভালো জানে আমাদের পরবর্তী শব্দটা কী হবে। এক ক্লিকে কবিতা লেখা হচ্ছে, কয়েক সেকেন্ডে তৈরি হচ্ছে বিশাল প্রবন্ধ। ২০২৬ সালের এই ডিজিটাল ধুলোবালির শহরে দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে বুকটা হু হু করে ওঠে—তবে কি শেক্সপিয়রের সেই নির্ঘুম রাতগুলো কিংবা জীবনানন্দের সেই বিষণ্ন পাণ্ডুলিপিগুলো স্রেফ কিছু ‘টোকেন’ আর ‘ভেক্টর’-এ পরিণত হলো?
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, মানুষের এই ভয় নতুন নয়। প্রায় ৩৭০০ বছর আগে সক্রেটিস যখন দেখলেন মানুষ পাথর বা প্যাপিরাসে লিখতে শুরু করেছে, তখন তিনি আতঙ্কিত হয়ে বলেছিলেন, “লেখা মানুষের স্মৃতিশক্তি নষ্ট করে দেবে; এটি শুধু স্মৃতির অনুকরণ মাত্র, আসল জ্ঞান নয়”। কিন্তু হোমারের ‘ইলিয়াড’ বা ‘ওডিসি’ প্রমাণ করেছে, লিখে রাখলেও মানুষের হৃদয়ের টান কমে না। ১৪৪০ সালে যখন গুটেনবার্গ মুদ্রণযন্ত্র আনলেন, তখন পণ্ডিতরা আঁতকে উঠেছিলেন—ভেবেছিলেন সস্তা বই মানুষের রুচি নষ্ট করে দেবে, বইয়ের এই ভয়ানক স্তূপ মানুষকে আবার বর্বর বানিয়ে ছাড়বে। কিন্তু সেই মুদ্রণযন্ত্রই আমাদের হাতে তুলে দিয়েছিল ‘হ্যামলেট’ কিংবা ‘ম্যাকবেথ’-এর মতো অমর সৃষ্টি।
১৮ কিংবা ১৯ শতকে যখন উপন্যাসের জোয়ার এল, তখন ধর্মযাজকরা চিৎকার করে বলেছিলেন, “উপন্যাস পড়লে মেয়েরা নষ্ট হয়ে যাবে, যুবকরা হবে অলস”। ফটোগ্রাফি আসার পর লোকে ভেবেছিল কবিতার বর্ণনা আর কে পড়বে? সিনেমা আসার পর ১৯২০-এর দশকে ঘটা করে ঘোষণা করা হয়েছিল, “উপন্যাস এখন মৃত”। কিন্তু প্রতিটি প্রযুক্তির আঘাত সামলে নিয়ে মানুষ বারবার ফিরে এসেছে তার আপন সৃজনশীলতায়। জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’ কিংবা বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’ সেই যান্ত্রিক ভয়ের মুখে সজোরে থাপ্পড় কষিয়ে দিয়েছিল।

আজকের লড়াইটা আরও কঠিন। আজকের প্রতিদ্বন্দ্বী ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা AI। সে শব্দ বোঝে না, বোঝে সংখ্যা; সে বাক্য বোঝে না, বোঝে টোকেনাইজেশন। তার মধ্যে আছে বিশাল ডেটা আর ট্রান্সফরমার আর্কিটেকচার, যা দিয়ে সে নিমিষেই লিখে দেয় কোনো প্রেমপত্র বা শোকগাথা। কিন্তু AI কি জানে—বৃষ্টির প্রথম ঘ্রাণে কেন একজন কবির বুকটা চিনচিন করে ওঠে? সে কি জানে—মিছিলে পুলিশের লাঠির বাড়িতে রক্তাক্ত হওয়ার পর সেই ব্যাথা কীভাবে কলমের ডগায় আগুন হয়ে জ্বলে ওঠে?
AI লেখাগুলো প্রায়ই প্রাণহীন, সমতল। সেখানে ব্যক্তিগত ক্ষত নেই, নেই কোনো অপ্রাপ্তির দীর্ঘশ্বাস। কারণ AI-এর কোনো ‘জেদ’ নেই; সে কোনো আদর্শের জন্য অনাহারে থাকতে পারে না। ২০২৫ সালে আমেরিকায় ৪২ বিলিয়ন ডলারের বই বিক্রি হয়েছে—এই বিশাল অঙ্ক আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ আজও কাগজের ঘ্রাণে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পায়।
এই যান্ত্রিকতার দাপটে আমাদের শেষ আশ্রয় হলো ‘ছোটকাগজ’ বা লিটল ম্যাগাজিন। ছোটকাগজ মানেই এক স্পর্ধার নাম। এটি বাজারের ব্যাকরণ মানে না, বড় প্রকাশনীর করপোরেট চোখরাঙানিকে তোয়াক্কা করে না। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, বড় গাছ তার ছায়ায় ছোট চারাকে বাড়তে দেয় না, তাই ছোট চারাকে আলাদা জায়গায় মাথা তুলতে হয়। ছোটকাগজ হলো সেই চারাগাছের উন্মুক্ত আকাশ। টি. এস. এলিয়ট কিংবা জেমস জয়েস থেকে শুরু করে বাংলার আক্তারুজ্জামান ইলিয়াস কিংবা আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ—সবাই এই ছোটকাগজের গর্ভ থেকেই জন্মেছিলেন।
ডিজিটাল যুগের এই একাকীত্বে স্ক্রিনের নীল আলো যখন আমাদের চোখ ক্লান্ত করে দেয়, তখন একটি ছাপা ছোটকাগজের খসখসে স্পর্শ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমরা রক্ত-মাংসের মানুষ। চ্যাটবট হয়তো নিখুঁত ব্যাকরণ দেবে, কিন্তু এক তরুণ সম্পাদকের নিজের পকেটের পয়সা বাঁচিয়ে ছাপানো সেই কাগজের আন্তরিকতা কোনো অ্যালগরিদম দিতে পারবে না।
ভবিষ্যৎ হয়তো হাইব্রিড হবে; আমরা AI-কে টুল হিসেবে ব্যবহার করব, কিন্তু সৃজনশীলতার চাবিকাঠি থাকবে আমাদের হৃদয়েই। কারণ দিনশেষে, আসল হীরা চেনার জন্য যান্ত্রিক জহুরির চেয়ে মানুষের চোখের এক ফোঁটা অশ্রুর দাম অনেক বেশি। প্রযুক্তির জয় হোক, কিন্তু মানুষের হৃদয়ের আলাপন যেন যান্ত্রিক টোকেনের ভিড়ে হারিয়ে না যায়।
(গত ১১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ছোটকাগজ 'লেখমালা' র যুগপূর্তির অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলাম। সম্পাদক মোস্তফা মামুন ভাইয়ের অনুরোধে উপরের বিষয় নিয়ে রিসার্চ করে বেশ কিছু তথ্য জোগাড় করেছিলাম। অনুষ্ঠানে সামান্য আলাপও করার সুযোগ হয়েছিলো। সব তথ্য জোড়া দিয়ে এটা দাঁড়িয়েছে। এআই কে বললাম, একটা পোস্টার বানিয়ে দাও। সেটাও এখানে ঝুলিয়ে দিলাম।)