আমি সবসময় এমনই। একটু অন্যরকম। সবার ভাবনা যেখানে পৌছানোর সাহস পায় না আমার ভাবনা সেখান থেকেই শুরু হয়। অন্যরকম ভাবনা। বন্ধুরা সবাই মিলে বদলাতে চেষ্টা করেছে। ব্যর্থ হয়ে বলেই ফেলেছে- নাহ্ হবে না। তোকে দিয়ে হবে না। আর আমি এটাকে আমার সফলতা বলেই ধরে নিয়েছি। সবাই যেখানে ক্ষান্ত হয় সেখানেই আমার শুরু। ব্যাপারটা আমার জন্য স্বাভাবিকই হয়ে গেছে। তাই এখন আর বন্ধুরা কিংবা আমি কেউই এই বিষয়ে মাথা ঘামাই না। বরং দেখা হলে পোশাকী কথাবার্তা হয়। খুবই সংক্ষিপ্ত। কিন্তু তার মাঝেও একটু একটু ঈর্ষার গন্ধ পাই। আমার হাই প্রোফাইল কেরিয়ার কিংবা এডুকেশন ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে তাদের গোপন ঈর্ষা তাদের কথাবার্তায় আর গোপন থাকে না। না চাইলেও সেটা বেরিয়ে আসে।
আসলে প্রত্যেক মানুষই নিয়ত নিঃসঙ্গ। ভীষণ একা। আর সফলতা প্রত্যেক মানুষকেই তিলে তিলে নিঃসঙ্গতার কাছে নিয়ে যায়। চরম একাকিত্বের কাছে নিয়ে যায়। ব্যাপারগুলো একটু জটিল। সচারাচর আমাদের ব্যস্ত জীবনে এসব বিষয় নিয়ে ভাবার তেমন একটা সুযোগ হয় না। কিন্তু হঠাৎ করেই জহির ভাইয়ের মর্মান্তিক মৃত্যূ আমাকে এই বিষয়গুলোর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
জহির ভাইয়ের মৃত্যূর ঘটনা পত্রিকা পড়েই জেনেছি। অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যু। পত্রিকার ভাষ্য পড়ে চোখের জল আর বাঁধ মানছে না। বারবার শুধু চোখে ভাসছে জহির ভাইয়ের নিস্পাপ হাসি হাসি মুখ। বারবার ভাবছি এটা কি আল্লাহর বিচার না অবিচার। পরক্ষনেই মনে হলো আল্লাহ বোধ হয় চান নি এমন ভালো মানুষকে এই খারাপ সময়ে খারাপ পৃথিবীতে বেশিদিন বাঁচিয়ে রাখতে।
আসলে জহির ভাই ছিলেন আমাদের ইউনিভার্সিটির বড় ভাই। এক সেমিস্টার সিনিয়র। প্রথম দেখাতেই তার হাসিমুখের অভিবাদন ভীষণ ভালো লেগে যায়। সেই ছবিটি এখনও চোখে লেগে আছে। তারপর থেকে যেকোনো সাহায্য যখনই দরকার নির্দ্বিধধায় তার কাছে চাওয়া যেতো এবং পাওয়াও যেতো নির্বিঘেœ। এবং সবসময়েই তা হাসিমুখেই ঘটতো। অন্যান্য সিনিয়রদের মতো মুরুব্বিয়ানার ব্যাপার তার মাঝে ছিল না। আমরা ধরেই নিয়েছি তিনি ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছেন আমাদেরকে সাহায্য করার জন্য। তাই সবসময় নিঃসঙ্কোচে তার কাছে ছুটে যেতাম।
এভাবে ইউনিভার্সিটি শেষ করে যে যার ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। আগের মতো আর নিয়মিত যোগাযোগ হয় না। তবু মাঝে মাঝে দেখা হয়। আমরা অনেকেই চাকুরী পেয়ে গেলাম। কেউ চাহিদা মতো, কেউ চাহিদার থেকে কম আবার কেউ কেউ চাহিদার থেকে অনেক বেশি ভালো। কিন্তু জহির ভাইয়ের কপালে কেন জানি কিছুই জুটলো না। তিনি বেশ কিছুদিন বেকার থাকলেন। মাঝে মাঝে দেখা হলে তিনি তার সেই পুরনো চেনা হাসিটা দিতেন তবু তার আড়ালে একধরণের বেদনা বাজতো। একধরণের অসহায়ত্ববোধ ঠিকই ধরা পরতো আমাদের চোখে। তারপর অনেকদিন আর কোনো যোগাযোগ হয় নি। এরপর অনেকদিন পরে আবার দেখা। আবার সেই নির্ভেজাল হাসিমুখ। একটি বিয়েবাড়িতে দেখা। জানা গেল তিনি বিয়ে করেছেন। ঠিকানা না থাকাতে দাওয়াত দিতে পারেন নি। খুব ভালো চাকুরী করছেন। তার সব ভালোর খবর শুনে সেদিন আমার ভীষণ ভালো লাগে। তারপর আবার নিয়মিত দেখা হতো। সম্ভবত দু’জনে একই পেশায় থাকার কারণে। সবসময়ই তার নির্ভেজাল হাসি ছিল বাড়তি পাওয়া। এরপর হঠাৎই আবার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
এরপর পত্রিকার খবর। প্রথমে বিশ্বাসই হয় নি। বিশ্বাস করতে পারি নি যে, পত্রিকার খবরের জহির ভাইই আমাদের জহির ভাই। তিনি আর পৃথিবীতে নেই। আমি পত্রিকার খবর বারবার পড়ি। খুটিয়ে খুটিয়ে পড়ি। চোখ, কান, মন কিছুতেই বিশ্বাস করতে চায় না যে জহির ভাই আর বেঁচে নেই। তার সেই নির্ভেজাল হাসিমুখ আর দেখবো না। কাউকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করার সাহসও হয় না। কাকে জিজ্ঞেস করবো? কী জিজ্ঞেস করবো? কিভাবে জিজ্ঞেস করবো? এসব ভেবে ভেবেই দিন পার হয়ে যায়। আমি নিজের ভেতরে নিজে গুম মেরে থাকি। নেটে বসি। ফেসবুকে যাই। সেখানে জহির ভাইয়ের এক ব্যাচমেটের আপডেট দেখি- আমাদের জহির আর নেই। আমার ভেতরের সমস্ত বাঁধার দেয়াল মুহূর্তেই যেন হুড়মুড়িয়ে ভেঙ্গে পড়ে। চোখের জল আর বাঁধা মানে না। অনেকদিনের জমানো অশ্রæ একসাথে ঝরতে থাকে। আমি আবার পত্রিকার পাতায় চোখ বুলাই। খুটিয়ে খুটিয়ে পড়ি ঘটনার নিখুঁত বর্ণনা। এক জায়গায় এসে হঠাৎ চোখ আটকে যায়। সেই অগ্নিকান্ড থেকে বেরিয়ে আসা একজন বলেন- জহির ভাইও নাকি বেরিয়ে এসেছিলেন। সবাইকে বেরিয়ে আসতে সাহায্যও করেছেন। কিন্তু তিনি আবার ফিরে গেছেন। তার সাত মাসের অন্তঃস্বত্ত¡া স্ত্রীকে বের করে নিয়ে আসার জন্য। এই জায়গাটা পড়ার পর মনটা আরও খারাপ হয়ে যায়। ভাবি, তিনি তখন কী করেছেন? তিনি কি ভাবীকে নিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেছেন? নাকি বের হওয়ার কোনো উপায় না দেখে দু’জনেই বসে বসে মৃত্যূর প্রহর গুণেছেন? আচ্ছা, যখন আগুনের লেলিহান শিখা তাদের চারপাশ ঘিরে ফেলেছে তখন তারা কী করেছেন? তারা কি একে অপরকে জড়িয়ে ধরে অনাগত সন্তানের মুখ চিন্তা করেছেন? আমার ভেতরে অনেকগুলো প্রশ্ন একসাথে খেলে যায়। আর কিছু ভাবতে পারি না। আমি তাদের সেই মুহূর্তের কষ্টটাকে নিজের ভেতরে অনুভব করতে চেষ্টা করি। কিন্তু পারি না। শুধু নিয়তির কাছে মানুষের অসহায়ত্বের কথা ভেবে ভেতরে ভেতরে এক তীব্র যন্ত্রনা অনুভব করি। নিজের ভেতরে নিজে গুম মেরে থাকি কয়েকদিন। অফিস বাসা কিছুই ভালো লাগে না। মাঝে মাঝে নেট এ বসি। ফেসবুকে লগইন করি। জহির ভাইয়ের প্রোফাইলে ঢুকি। দেখি আমাদের ইউনিভার্সিটি জীবনের রঙ্গীন মুহূর্তের ছবি, তার বিয়ের ছবি, অফিসের ছবি। সেগুলো এখনও রঙ্গিন। তার পুড়ে যাওয়া শরীরের মতো বিবর্ণ হয়ে যায় নি। এভাবে দেখতে দেখতে হঠাৎ ঘোরের ভেতরে চলে যাই। ভাবি, ফেইসবুকে তো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের কত পরিচিত অপরিচিত মানুষের সাথে প্রতিদিন যোগাযোগ হয়। সেইরকমভাবে মৃত মানুষের সাথে যোগাযোগের কোনো ব্যবস্থা করা যায় না। অথবা এমন কোনো যোগাযোগ ব্যবস্থা যার মাধ্যমে একজন মৃত মানুষ তার স্ট্যাটাস দিবেন কিংবা একজন জীবিত মানুষ একজন পরিচিত মৃত মানুষের অবস্থা জানতে পারবেন। সে ভালো আছে না খারাপ আছে এইসব। ব্যাপারটা মাথার ভেতরে সত্যিই ঝেকে বসেছে। আমি ফেইসবুকে জহির ভাইয়ের প্রোফাইলে ঢুকে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকি। ভাবি এই বুঝি জহির ভাই কোনো স্ট্যাটাস দিবেন- আমি ভালো আছি কিংবা বাচ্চাটির জন্য ও খুব মন খারাপ করে আছে- এই রকম কিছু।
এরপর থেকে যখনই বন্ধুদের সাথে দেখা হয় সবার মুখেই শুনি জহির ভাইয়ের অকাল মৃত্যূ নিয়ে আফসোস। আরও সব প্রাসঙ্গিক অপ্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। যেসব বিষয় একজন পরিচিত মানুষ মারা গেলে সবাই সাধারণত আলোচনা করে। কিন্তু আমার মাথায় একই ভাবনা ঘোরে। আমি অপ্রাসঙ্গিকভাবেই জিজ্ঞেস করে বসি- আচ্ছা মানুষ মারা গেলে তার ফেইসবুক আইডির কী হয়? একজন মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যূর আলোচনার মধ্যে তার ফেইসবুক আইডি বিষয়ে আমার এমন কৌতুহল বন্ধুদের বেশ বিরক্তই করে। তারা মনে মনে ভাবে পুরনো পাগলের আপগ্রেড ভার্সন। তারপর নির্লিপ্তভাবে জবাব দেয়- কি আর হয়- তিনমাস পরে আইডি ইনভ্যালিড হয়ে যায়। তারপর তারা পাশ কাটিয়ে আবার সেই মর্মান্তিক মৃত্যূর আলোচনায় ঢুকে পড়ে।
কিন্তু আমি আমার ভাবনাতেই ডুবে আছি। বন্ধুদের কথা বিশ্বাস হয় না। প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে ফেইসবুকে বসি। জহির ভাইয়ের প্রোফাইলে ঘন্টার পর ঘন্টা চোখ মেলে বসে থাকি। ভাবি এই বুঝি কোনো আপডেট স্ট্যাটাস এলো। অথবা এই বুঝি তিনি ওপার হতে মেসেজ করলেন- আমি ভালো আছি রে শাকের- আমি ভালো আছি।