Posts

উপন্যাস

মাহিসাওয়ার

May 7, 2026

Zihad Sheikh

Original Author জিহাদ শেখ

50
View

প্রস্তাবনা: প্রমত্তা করতোয়ার তীরে, ১০৪৩ সন

রাত তখন নিঃশব্দ। করতোয়া নদীর পূর্বতীরে ধোঁয়া ওঠা মশালের আলোয় দেখা যাচ্ছে ভাঙা রথ, ছিন্ন পতাকা, আর মৃত সৈন্যের স্তূপ। রাজা পরশুরামের প্রাসাদ থেকে শেষ চিৎকারটা ভেসে এলো—সেটা রাজার নয়, এক পাহারাদারের।

শাহ সুলতান বলখী ধীর পায়ে ঢুকলেন প্রাসাদের গোপন কক্ষে। তিনি জানতেন, এই যুদ্ধ তলোয়ারের নয়। তিনি এসেছেন এক গোপন জ্ঞানের সন্ধানে, যার কথা শুনেছেন দূর আফগানিস্তানের বলখ শহরে বসেই—সেটা ‘শ্রুতি’, বেদ-পূর্ব এক দৈববাণী, যা মানুষ কখনো আবিষ্কার করেনি, কেবল ধ্যানের গভীর থেকে শুনেছে। ঋষিরা বলতেন, এটা স্বয়ম্ভু—নিজে নিজেই প্রকাশিত। যুগে যুগে সাধকেরা একে অর্জন করেছেন বছরের পর বছরের সাধনায়। কোনো একক মানুষের আবিষ্কার নয়, এটা চৈতন্যের উত্তরাধিকার।

পরশুরাম সেই পবিত্র জ্ঞানকে ‘অস্ত্র’ বানিয়ে নিজের ইচ্ছায় ব্যবহার করতে চেয়েছিল। সৈন্য ফিরিয়ে আনছিল, একই মানুষকে বারবার মৃত্যু দিয়ে বন্দি করছিল অমরত্বের লোভে। শত শত সাধকের সাধনার ফলে অর্জিত জ্ঞানকে অপমান করেছিল।

বলখী খুঁজে পেলেন তাম্রপাতটি। সাতটি সাঙ্কেতিক চিহ্ন আঁকা। চোখ বুজে কিছুক্ষণ দাঁড়ালেন। তারপর হাতে নিলেন প্রদীপ। পুড়িয়ে দিতে পারেন। কিন্তু তিনি জানেন, ‘জ্ঞান ধ্বংস করলে তার শাস্তি আসবে, রক্ষা করলে আসবে মুক্তি’।

তাই পরদিন গভীর রাতে তিনি ডাকলেন তাঁর পাঁচ সুফি সঙ্গীকে। তারা বসলেন একটি ভাঙা মন্দিরের আড়ালে। শাহ সুলতান বলখী বললেন:

“এই জ্ঞান মাটিতে লুকালে খুঁড়ে বের করা হবে, পুড়ালে ধ্বংস ডেকে আনবে। একে বাঁচাতে গেলে লুকাতে হবে মানুষের অন্তরে। তোমরা প্রত্যেকে এই সূত্রের একেকটি অংশ ধারণ করো নিজের স্মৃতির ভেতর। কোনো দিন লেখবে না, বিক্রি করবে না, অস্ত্র বানাবে না। শুধু যোগ্য মানুষের বুকে সঞ্চারিত করবে—যতদিন মানবজাতি বাঁচবে, এই জ্ঞান জীবিত থাকবে।” 

পাঁচজন মাথা নাড়ল। তারা ধ্যানে বসে পড়ল। পরের কয়েক রাত ধরে ফর্মুলার সব সূত্র তারা নিজেদের অন্তরে ধারণ করল। তারপর তাম্রপাতটিকে একটি কূপের নিচে লুকিয়ে রাখা হলো—যেখানে ভবিষ্যতের কোনো সাধক একদিন খুঁজে নিতে পারবেন।

তারপর বলখী সেই গোপন জ্ঞানের কথা আর কখনো কাউকে বলেননি। কিন্তু মৃত্যুর আগে, এক ভোরে এক শিষ্যকে ডেকে বলেছিলেন:

“আমি যা রেখে গেলাম, তা কোনো শিলালিপিতে নেই। তা আছে বাতাসে, মাটিতে, আর সুফিদের প্রশ্বাসে। একদিন,  হাজার বছর পরে, কেউ যদি খুঁজতে আসে। তাকে বাধা দিও না।”

অধ্যায় ১: মাটির নিচে মৃত্যুর গণিত

শাহরিয়ার হাসান চোখ খুলল রাত তিনটায়।

বাসের জানালার কাচ কুয়াশায় ঝাপসা। বাইরে কিছু দেখা যায় না, শুধু গাছপালা আর দূরের মাঠ—কালো দানবের মতো গাছগুলো ছুটে যাচ্ছে পেছনের দিকে। পকেট থেকে সেলফোনটি বের করলো। অভ্যাসমত ফেসবুকে ঢুকতেই মোবাইলের স্ক্রিনে রিয়ার ফেসবুক পোস্ট ভেসে উঠলো—কনভোকেশন গাউন, পাশে তার স্বামী দাঁড়িয়ে, দুজনের মুখেই হাসি। পোস্টটি সোয়াইপ করে উড়িয়ে দিল। 

গরুর ভুনা ও রুটির শেষ রাতে খেয়েছিল, সেটা পেটে গিয়ে বিষের মতো কামড়ে ধরেছে। কিন্তু ওষুধ খেতে ইচ্ছে করছে না। ওষুধের দরকার নেই। দরকার নেই বন্ধুরও, দরকার নেই কোনো সম্পর্কের।

সে জানে, আজকের এই সফরটা অন্য কোনো কারণে হচ্ছে। যেন ভেতরের কোনো অন্ধকার তাকে টানছে।

খবরটা পাওয়ার আগেই টের পেয়েছিল। ফ্রেইবার্গ ইউনিভার্সিটির ল্যাব থেকে মেইল পেয়ে প্রথমে ভেবেছিল, প্রত্যাখ্যান করবে। কিন্তু চোখটা আটকে গিয়েছিল মেইলের শেষ লাইনে—‘সাইট অ্যাসেসমেন্ট ফর সাবসারফেস জিওলজিক্যাল অ্যানোম্যালি।’ 

মোটা অঙ্কের টাকা। কিন্তু সমস্যা হলো এই কাজের জন্য পিএইচডি শেষ করা প্রয়োজন। আর শাহরিয়ার পিএইচডি শেষ করেনি। ফ্রেইবার্গ ইউনিভার্সিটি থেকে অসমাপ্ত থিসিস রেখে পালিয়েছে তিন বছর আগে।

সেই তিন বছর।

জার্মানিতে মাস্টার্স শেষ করে পিএইচডিতে ভর্তি হয়েছিল ‘প্রাচীন নদীবিধৌত খনিজ স্তরের রেডিওকার্বন ডেটিং’ নিয়ে। জার্মান সুপারভাইজার বলেছিলেন, “আপনার কাজ শেষ হলে বাংলার প্রত্নতত্ত্বের চেহারাই বদলে যাবে।” কিন্তু থিসিসের শেষ দিকে এসে একদিন বসে পড়ে। কারণ অনেক। পরীক্ষাগারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা টেস্টটিউব আর স্ট্র্যাটিগ্রাফিক চার্টের মধ্যে ডুবে থাকতে থাকতে একদিন নিজেকে প্রশ্ন করেছিল – এই পাথর আর কাদার বয়স বের করে কী হবে? এই বয়সের হিসাব দিয়ে আসলে কোনো প্রাসঙ্গিক উত্তর মিলবে কি?

শেষ দোলাচলের সময় রিয়া এসেছিল। রিয়া বলেছিল, “তোমার ভেতরে কোনো আত্মা নেই, শাহরিয়ার। তুমি পাথর খুঁড়ো, পাথরকে প্রশ্ন করো অথচ প্রশ্ন করো না কেন মানুষের দেহ পাথর হয়।”

সে রাতেই শাহরিয়ার বুঝেছিল। তার পক্ষে কোনো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা সম্ভব না। তার উদাসিনতা, খামখেয়ালিপনা ও নিরাবেগ স্বভাব কোনো মানুষ সহ্য করবে না। সম্পর্কটা সে-রাতেই শেষ হয়েছিল। কোনো ঝগড়া নয়, কোনো অভিযোগ নয়। শুধু বলেছিল, “আমি মানুষের প্রয়োজন বুঝি না। গুরুত্ব দিতে পারি না।” 

রিয়া শেষবারের মত তার হাতটি ধরেছিল। বলেছিল, “হারতে শিখো। আমার আফসোস সারাজীবন থাকবে আমি তোমাকে হারতে শেখাতে না পেরে হারিয়েই ফেললাম।” 

কথাগুলো শাহরিয়ারের কাছে বিষের মত লেগেছিল।  তার পরের মাসে থিসিস ‘অসমাপ্ত’ রেখে বাংলাদেশে চলে আসে। এখনো কেউ জানে না কেন ছেড়ে এসেছে। বাবা-মা ভাবে ‘বিদেশে খাপ খাওয়াতে পারেনি’, জার্মানির সুপারভাইজার ভাবে ‘মানসিক অবসাদ’। কিন্তু সত্য হলো, নিজের অসম্পূর্ণতা দেখার মতো সাহস ছিল না শাহরিয়ারের।

ঢাকায় থাকতেই বগুড়া থেকে ফোন করেছিল ড. সাইফুল ইসলাম। বলেছিল, “সময় কম। আরেকজন ভূতত্ত্ববিদ গেছেন। দরকার আপনাকে।”

“আরেকজন ভূতত্ত্ববিদ?” শাহরিয়ার জিজ্ঞেস করেছিল।

“হ্যাঁ। আপনি এখানে আসলে সব জানবেন।”

সেই কথাটির ভেতর একটা দলা পাকানো ভয় ছিল। শাহরিয়ার বুঝেছিল, ড. সাইফুল সব বলছে না।

হাতঘড়ি দেখল। আরও এক ঘণ্টা লাগবে বগুড়া পৌছাতে। পৌঁছাতে ভোর চারটা হবে। তারপর চাচাতো ভাইয়ের বাসায় গিয়ে গোসল করে সকাল আটটার মধ্যে মহাস্থানগড় প্রত্নস্থলে পৌঁছাতে হবে। শাহরিয়ার একটা বিষয় ভেবে পায় না, ১৯৯৩ সালে খনন কাজ বন্ধ হবার পর আবার কেন এত বছর পর খনন করার প্রয়োজন পড়লো।

ভোর পৌনে চারটায় বগুড়ায় নেমে ট্যাক্সি নিল সে। হুমায়ুনের বাসার দরজা খুলতে গিয়ে দেখে দরজার ফাঁকে রাখা ক্যালেন্ডার—১লা অক্টোবর। চৌত্রিশ বছর বয়স আজ। কেউ জানে না। কাউকে জানানোর প্রয়োজনও বোধ করে না।

সকাল আটটা পঁচিশে অ্যালার্মের আগেই ঘুম ভেঙে গেল। গোসল করে কালো জিন্সের প্যান্ট ও নেভি ব্লু শার্ট পরে ব্যাগে তুলল ল্যাপটপ, জিওলজিক্যাল হ্যামার, ইউভি ল্যাম্প, ম্যাগনিফাইং গ্লাস, ক্ষুদ্র নমুনার ব্যাগ, গ্লাভস ও জার্নাল। হুমায়ুন নাস্তা দিতে এসে বলল, ‘তোমার গাড়ি এসেছে, বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।’

নাস্তা করে বেরিয়ে দেখে একটি পুরনো জিপ। চালক স্থানীয়। তাঁকে মহাস্থানগড়ের প্রত্নস্থলে নামিয়ে দিয়ে যাবে।

সকাল নয়টার আগেই গাড়ি ছাড়ে মহাস্থানগড়ের দিকে। গাড়ির জানালা খোলা। দুই পাশের আমন ধানের মাঠ। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে পোড়ামাটির লাল স্তূপ—মহাস্থানগড়। আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস জমে আছে ওই মাটির ভাঁজে, কিন্তু ভোরে ওকে লাগে ঘুমন্ত প্রাণীর মতো। নিশ্বাস নিচ্ছে, ধুলো উড়ছে।

কিন্তু সাইটে ঢোকার মুখেই গাড়ি আটকাল। পুলিশের ব্যারিকেড। একজন কনস্টেবল হাত তুলে বলল, “ভেতরে যাওয়া নিষেধ।”

“আমাকে তো যেতেই হবে।”

কনস্টেবল কিছু বলবে, তার আগেই ড. সাইফুল এগিয়ে এলেন। খাকি প্যান্ট, মোটা গোঁফ, চোখে পাওয়ার ফ্রেমের চশমা। তবে আজ হাসিখুশি ভাব নেই। কপালে চিন্তার ভাঁজ। শাহরিয়ারের হাত ধরে এক পাশে টেনে নিয়ে গেলেন।

“শাহরিয়ার সাহেব, কিছু ঘটেছে।”

“কী?”

“আপনার আগে আরেকজন ভূতত্ত্ববিদ এসেছিলেন। ড. আশফাকুল আলম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক।”

ড. সাইফুল এক নিঃশ্বাসে সব বললেন, যেন নিজের বুকটা হালকা করতে চান।

শাহরিয়ারের পেটের ভেতরটা শূন্য হয়ে গেল। “উনি কোথায়?”

“উনি আর নেই। গত পরশু রাতে সাইটের পূর্ব প্রান্তে একা কাজ করছিলেন। সেখানেই... ভোরবেলা আমাদের সিকিউরিটি গার্ড গিয়ে দেখে, মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন। প্রথমে হার্ট অ্যাটাক মনে হয়েছিল।”

“কিন্তু?”

ড. সাইফুল কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর যেন অনেক সাহস করে বললেন, “ময়নাতদন্তে ধরা পড়েছে, তাঁর শরীরে বিষক্রিয়ার চিহ্ন আছে। তবে কোনো পরিচিত বিষ নয়। ল্যাব রিপোর্ট বলছে, এটা কোনো জৈব-ক্ষারীয় পদার্থ হতে পারে—কিন্তু নিশ্চিত নয়। পুলিশও বিভ্রান্ত।”

“আমাকে কেন কিছু জানাননি?”

“জানালে আপনি আসতেন না।” ড. সাইফুলের কণ্ঠে অপরাধবোধ স্পষ্ট। “আমার হাতে সময় কম। এই সাইটের নিচে কী আছে, সেটা জানতে হলে আরেকজন ভূতত্ত্ববিদ দরকার। আর একটা জিনিস আছে...”

“আমি আসতাম কিনা সেটার অনুমান করার ক্ষমতা আপনার নেই সাইফুল সাহেব। এমনও হতে পারে, ভাল না লাগলে আমি কাজ ছেড়ে মাঝপথে চলেও যেতে পারি।”

কথাটি শুনে সাইফুল সাহেবের মুখ শুকে গেল। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল শাহরিয়ারের দিকে। সানগ্ল্যাসে ঢাকা চোখটার অভিব্যক্তি দেখতে পারল না, তাই ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে রইল। তার স্তম্ভিতভাব ছাড়ল শাহরিয়ারের কথায়, “আর কিছু?”

ড. সাইফুল পকেট থেকে একটা ছোট্ট প্লাস্টিকের ব্যাগ বের করলেন। শাহরিয়ারের হাতে তুলে দিলেন। ব্যাগের ভেতর একটা পোড়ামাটির টুকরো। পুরোটা নয়, ভাঙা। গায়ে খোদাই করা অস্পষ্ট অক্ষর ও জ্যামিতিক নকশার অংশ। ঠিক যেন কোনো অষ্টভুজের অর্ধেক। খন্ডটির দৈর্ঘ্য চার ইঞ্চির মত, প্রস্থে সাড়ে তিন ইঞ্চি।

“উনি মারা যাওয়ার সময় এটা তাঁর মুঠোয় ছিল। আঙুল এত শক্ত করে আটকে ছিল যে ভাঙতে হয়েছে।”

শাহরিয়ার ফলকটা হাতে নিয়ে উল্টে-পাল্টে দেখল। অক্ষরগুলো ব্রাহ্মী, কিন্তু এক জায়গায় এসে মিশে গেছে অন্য লিপির সাথে। যেন আরবি হরফের আদল—কিন্তু তা কী করে সম্ভব? ব্রাহ্মী লুপ্তপ্রায় হয়ে গিয়েছিল এই দেশে আরবি ও ফার্সি আসার বহু আগেই।

“এটা কোনো সাধারণ সিলমোহর নয়,” একজন বলে উঠল পেছন থেকে, নারীকন্ঠ, মোলায়েম এবং আকর্ষণীয়।

শাহরিয়ার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে এক মেয়ে। সরু চোখ, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, গাঢ় কালো চুল। পরনে সাদা ওড়না আর হালকা নীল কামিজ। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। ঠোঁটের কোণে একরোখা ভাব। কপালে সানগ্লাস।

“সুরভী সরকার,” মেয়েটি পরিচয় দিল। “জনশিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রত্নতত্ব সংরক্ষণ ট্রাস্ট।”

শাহরিয়ার কিছু বলার আগেই সে ফলকের দিকে আঙুল তুলে বলল, “এটা ‘শ্রুতি’ ধারার সাঙ্কেতিক লিপি।”

“শ্রুতি?”

“আপনি ভূতত্ত্ববিদ, ধর্ম বা ইতিহাস হয়তো আপনার বিষয় নয়। তবু শুনুন।” সুরভী এক পা এগিয়ে এলো। “এই উপমহাদেশের প্রাচীনতম জ্ঞানভাণ্ডারে ‘শ্রুতি’ বা দৈববাণী একটা আলাদা স্তর দখল করে আছে। বেদ-পূর্ব যুগ থেকে চলে আসছে। এটা দৈববাণী বা দৈবজ্ঞান—অর্থাৎ যা মানুষ কখনো ‘আবিষ্কার’ করেনি, শুধু ধ্যানের গভীরে গিয়ে ‘শুনেছে’। ঋষিরা বলতেন, এটা স্বয়ম্ভু—নিজে নিজেই প্রকাশিত।”

“আর এই ফলক?”

“এই ফলক তারই একটা সাঙ্কেতিক রূপ। এটার লিপি মিশ্র—ব্রাহ্মী ও কুটিল। এরকম লিপি এযাবৎ খুব কম পাওয়া গেছে। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’ প্রথম খণ্ডে পুণ্ড্রবর্ধনের কিছু অপ্রকাশিত শিলালিপি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। সেখানেও মিশ্র লিপির উল্লেখ আছে, কিন্তু এমন আধিভৌতিক সুর নেই।”

শাহরিয়ার চোখ সরু করল। “রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়? তিনিই তো মহেঞ্জোদারো-হরপ্পা আবিষ্কার করেও কৃতিত্ব হারিয়েছিলেন।”

“ঠিক। ইতিহাসবিদদের ভাগ্যই এমন। কিন্তু তার পরও তিনি যা লিখে গেছেন, তা সত্য। আর এই টুকরোটা মনে হয় সেই সত্যেরই অংশ।”

“আপনিও একজন ইতিহাসবিদ?”

“বলতে পারেন।” সুরভীর সোজাসাপ্টা জবাব।

আলোচনা শুনতে ড. সাইফুলের বেশ ভালোই লাগছিল। অন্তত একজন শিক্ষকের হত্যার পর মনে যে কষ্টটা জমা হয়েছিল, তা কিছুক্ষণের জন্য মিলিয়ে গেল । “আপনারা দু’জন মিলে যদি এই ফলকের অর্থ বের করতে পারেন, তাহলে হয়তো ড. আলমের মৃত্যুর কারণও বের হবে।”

শাহরিয়ার সুরভীর দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “আগে কফি খাই। তারপর এই ফলকটা নিয়ে বসি।”

“ভাঙবেন না যেন,” সুরভী বলল।

“ভাঙব না। তবে পাথরের বয়স বের করতে গেলে একটু আঁচড়াতেই হয়।”

দু’জন তাঁবুর দিকে হাঁটা দিল, তাদের পেছনে ড. সাইফুল ইসলাম। খননের স্থান থেকে কিছু দূরে তাঁবু ফেলা হয়েছে।

হাঁটতে গিয়ে নজর পড়ল দূরে মাজারের বারান্দায় একজন বসে আছেন। ধূসর রঙের পাঞ্জাবি, হাতে তসবিহ। বৃদ্ধ। তিনি এদের দিকে তাকিয়ে নেই, অথচ যেন সব জানেন। শাহরিয়ার হঠাৎ থমকে গেল। কিছু বলতে গিয়েও থামল।

“কী হলো?” সুরভী জিজ্ঞেস করল।

“ওই যে... উনি কে?”

সুরভী বৃদ্ধের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটল। “উনি ‘সাধু বাবা’। মাজারের আশপাশে থাকেন। এমন অনেকেই আছেন আশেপাশে, তবে উনি হয়ত স্পেশাল। কেউ জানে না উনার আসল নাম কী। তবে যারা এখানে কাজ করতে আসে, তারা সবাই একসময় না একসময় উনার কাছে যায়। আলম সাহেবও ওনার সাথে অনেক সময় কাটাতেন।”

“কেন?”

“কারণ উনি জানেন—এখানকার মাটি যা লুকিয়ে রেখেছে, বা তার চেয়েও বেশি কিছু।” সুরভী বলল, তার কন্ঠে অবিশ্বাসের সুর।

তাঁবুর বাইরে চেয়ারে বসল, সামনের গোল টেবিলে চা এল। শাহরিয়ার শেষবারের মতো ঘাড় ফেরাল। বৃদ্ধ ততক্ষণে চোখ বুজেছেন। তার ঠোঁট নড়ছে—কী যেন জপছেন। শাহরিয়ার এসব দেখতে পেল না।

বুকের ভেতর আবার একটা টান অনুভব করল। যেন এই মানুষটির কাছেই আছে অনেক প্রশ্নের উত্তর। কিংবা, আরও অনেক প্রশ্ন, যা সে কখনো নিজেকে করেনি।

এদিকে ফজর থেকেই সাধু বাবা ধ্যান করছিলেন। তার ধ্যান ভাঙল যখন শাহরিয়ার গাড়ি থেকে নেমেছিল। তিনি তাকালেন, তার ঠোঁটের কোণে আমরা কিঞ্চিত হাসি দেখতে পাই।

(চলবে)

Comments

    Please login to post comment. Login