Posts

গল্প

আবার………, বারবার…………

May 12, 2026

মোঃ আনোয়ার পারভেজ

76
View

চায়ের মধ্যে এমন কিছু একটা ছিল যার জন্য চুমুক দেওয়া মাত্রই মাজেদের ভেতরটা চনমন করে ওঠে। চায়ের গুণই হবে হয়তো,অথবা সারারাতের অস্থিরতা, ক্লান্তি ও অবসাদে নেতিয়ে পড়া শরীরটা একটা সুযোগের অপেক্ষা ছিল, চায়ে চুমুকের মধ্য দিয়ে সেটা পেয়ে গেল যেন। নিজেরই অজান্তে মাজেদের মুখ থেকে অস্ফুট স্বরে বের হয়ে আসে ‘আহ্‌……’।

তিশা তখনো তার পাউরুটিটা শেষ করে উঠতে পারেনি। খুব একটা আগ্রহ নিয়ে যে খাচ্ছে তাও মনে হয় না মাজেদের। তারা যে বেঞ্চটিতে বসে আছে সেখান থেকে একটু দূরে পায়ের কাছেই কয়েকটা চড়ুই উড়ছিল, বসছিল, তারই ফাঁকে ফাঁকে ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র খাবারকণা খুঁটে খুঁটে খাচ্ছিল। তিশা হঠাৎ করেই পাউরুটি থেকে কয়েকটা ছোট টুকরা ছিঁড়ে নিয়ে চড়ুইগুলোর দিকে ছুঁড়ে দেয়। ছোট্ট বাহুমূল থেকে কবজি পর্যন্ত যেতে যেতে পেশীশক্তি বেশ খানিকটা জোর খুইয়ে ফেলে যেন। বাচ্চা মেয়েদের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হাত অনেকটা ওপরে উঠিয়ে নিয়ে জোরে ছুঁড়ে মেরেও চড়ুই পাখি পর্যন্ত তিশার খাবারকণা পৌঁছে দেওয়াটা সুসম্পন্ন হয় না, পাখিগুলোর সমাবেশ থেকে একটু আগেভাগেই সেগুলো মাটিতে পতিত হয়। চড়ুই পাখিগুলো ভয় পেয়ে প্রথমে একটু দূরে সরে যায়, কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার ফিরে আসে- এবার বেঞ্চের আরেকটু কাছাকাছি। এসে কিচিরমিচির বাড়িয়ে দেয়।

মাজেদের মনে হয় কিচিরমিচিরটা কোনো ঐকতান নয় যেন, বরং বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ঝগড়ার রেশ মেশানো। মাজেদ চায়ের কাপে আরো দুটো চুমুক দেয়, প্যান্টের পকেট থেকে বেশ সংশয়াপন্ন মন নিয়ে খুঁজে তোবড়ানো একটা সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার বের করে। প্যাকেটটা খুলে একটা সিগারেট আছে দেখে বেশ সন্তুষ্ট হয় মনে মনে- আদৌ আছে কি না ঠিক নিশ্চিত ছিল না। সিগারেটটা জ্বালিয়ে টান দেওয়ার আগে চায়ে আরেকটা চুমুক দেয়, তারপর টান দিয়ে বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে ওপরের দিকে ধোঁয়া ছুঁড়ে দেয়। চার বছর বয়সী মেয়ে তিশার কাজকারবারের দিকে একটা নৈর্ব্যক্তিক চোখ চালায়……… ছোট থাকতে মেয়েরাই কোনো কিছু ছুঁড়ে মারতে গিয়ে এমনভাবে হাত অনেকটা ওপরে তোলে………… ছেলেদের বেলায় তা ঘটে না……… কব্জি থেকেই ছেলেরা অনেকটা শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে মাজেদের মুখে, পরক্ষণেই তা মিলিয়ে যায়, চোখ থেকে নৈর্ব্যক্তিকতার চিহ্ন মুছে যায়। মেয়েটাকে বেশ কোমল স্বরে বলে, ‘আরে, তুই তো পুরা পাউরুটিটাই পাখিরে খাওয়াবি, নিজে খাবি কী?’

তিশা কান দেয় না। ঠোঁটের কোণা দিয়ে রুটির একটা অংশ ছিঁড়ে আবার পাখিগুলোর দিকে ছুঁড়ে মারে। এবার টুকরোটা পাখির দঙ্গলের প্রায় মাঝামাঝি পতিত হয়। তিশার ডান পাশে বসা সাদিয়া দূরের কোনো এক অবোধ্য, অজানা স্মৃতি বা বস্তু থেকে দৃষ্টি সরিয়ে এনে তিশার ওপর নিবদ্ধ করে, তারপর অনেকটা হেঁচকা টান মারার মতো করে মেয়ের হাত থেকে পাউরুটিটা ছিনিয়ে নেয়। বড় একটা টুকরো ছিঁড়ে নিয়ে তিশার ঠোঁট ঠেলে মুখে পুরে দেয়। আরেক ঝটকায় তিশার বা হাত থেকে কলাটা টেনে নিয়ে মুখের কাছে ধরে, বলে, ‘কতবার কইছি খাওন নিয়া তেড়িবেড়ি করবি না! দানা সাবধান! খাওন নষ্ট করবি না।’

তিশার খাওয়া শেষ হলে সাদিয়া খানিকটা জোরের সাথে তিশাকে বেঞ্চ থেকে উঠিয়ে একটু দূরের নলকূপের দিকে নিয়ে যায়। এক হাত দিয়ে হাতল চাপতে চাপতে আরেক হাতে পানি নিয়ে তিশার মুখটা ভালো করে ধুয়ে দেয়, ধোওয়া শেষ হলে আঙুল দিয়ে বেঞ্চ দেখিয়ে বলে, ‘যা, বেঞ্চে গিয়া বয়।’

হাতল চাপতে চাপতেই সাদিয়া নিজের মুখটা ভালো করে কচলে ধুতে থাকে, চুলের সামনের দিকেও খানিকটা পানি দিয়ে ভিজিয়ে নেয়। আঁচলের খানিকটা ভিজে যায়, সেদিকে সাদিয়ার নজর থাকে না। মুখ ধোওয়া হলে সাদিয়া হাতল চাপতে চাপতে পা ধুতে শুরু করে- স্যান্ডেলসহ। প্রথমে পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে টিপে টিপে স্যান্ডেলগুলো ভালো করে ধুয়ে লেগে থাকা কাদা সরিয়ে দেয়। স্যান্ডেল ধোওয়া শেষ হলে পায়ের ওপর পানি ঢালতে থাকে ভালো করে- এক পায়ের আঙুল দিয়ে আরেক আঙুল, গোড়ালি ঘষে ঘষে লেগে থাকা কাদা সরাতে থাকে। মাজেদ চেয়ে চেয়ে দেখে। দেখে- কীভাবে কাদার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সাদিয়ার সুন্দর, ফর্সা, সুডৌল পায়ের রঙ, প্রাণ, অস্পষ্ট শিরার নীলচে দাগ পানির ছোঁয়ায় ছোঁয়ায় আবার আস্তে আস্তে জেগে উঠছে……… পা এদিক ওদিক সবদিক ঘুরছে- খুব গতি বাড়ালেই এই ঘূর্ণি হয়তো নাচে পরিণত হবে। মাজেদের বিস্ময় লাগে, মুগ্ধতা জাগে।

পা ধোওয়া শেষ হলে সাদিয়া বেঞ্চটার কাছে এসে বাদামি হ্যান্ডব্যাগ থেকে তিশার ব্যবহারের জন্য রাখা ছোট্ট একটা গামছা বের করে তিশার মুখ মুছে দেয়। তারপর নিজের মুখ, মুখের উপরিভাগের চুলের ভেজা অংশটাও মুছে নেয়। মোছা শেষ হলে গামছা ব্যাগে ঢুকিয়ে তিশার হাত ধরে একটা টান দেয়, মুখে বলে, ‘উঠ!’ তিশা উঠে দাঁড়ায়। 

মাজেদও উঠে পড়ে এবং সাদিয়ার পেছনের তিশাকে অনুসরণ করে। বেঞ্চে সাদিয়ার ছেড়ে আসা জায়গাটায় তার জন্য কেনা একটা পাউরুটির প্যাকেট, কলা রয়ে গিয়েছিল, সেটা সাদিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিতে গিয়েও মাজেদ নিজেকে সংবরণ করে, নিজের ব্যাগে ঢুকিয়ে নেয়। তারপর দোকানীর সামনে এসে জিগ্যেস করে, ‘কত হইছে?’

আর সব পুরাতন জরাজীর্ণ রেল স্টেশনের আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা টং দোকানের মালিকের মতো এই দোকানীও বৃদ্ধ এবং বার্ধক্য ও দূর-দূরান্তে ভ্রমণে অসামর্থ্য বা অনীহার কারণে বেছে নেওয়ার ক্ষমতাবিবর্জিত। বৃদ্ধ দোকানী চিনি, কনডেন্সড মিল্কের ওপর ভন ভন করে উড়তে থাকা মাছিগুলো ঘাড়ের গামছা নামিয়ে তাড়াতে তাড়াতে বেশ খানিকটা সময় নিয়ে হিসাব করে বলে, ‘একশ’ বিশ টাকা’।

মাজেদ মানিব্যাগ থেকে দু’শ টাকার একটা নোট বের করে বৃদ্ধের দিকে বাড়িয়ে দেয়। ভাংতি টাকা ফেরত পেলে সাদিয়া ও তিশার পিছু নেয়। বেশ খানিকটা এগিয়ে গিয়ে তারা মাজেদের জন্য অপেক্ষা করছে। এরি মধ্যে সাদিয়া ও তিশার আপেক্ষিক অবস্থানও পালটে গেছে। তিশা এগিয়ে প্রথমে, তার একটু পেছনে সাদিয়া। মাজেদ কাছে এসে বা দিকে কলাগাছের একটা ঝাড়ের পাশের ঢাল দেখিয়ে বলে, ‘পাকা রাস্তা দিয়া যাওনের দরকার নাই। অনেক লম্বা আর ঘুর পথ। আমরা এই ঢাল বাইয়াই নামমু।’

তিশা বেশ উৎসাহের সাথে এগিয়ে যায়, ঢাল খোঁজে, পেয়েও যায়- কলাগাছের ঝাড় শেষেই। খুব একটা খাড়া নয়, অনেকটা জায়গা নিয়ে আস্তে আস্তে ঢালু হয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে। সতর্কতার দরকার নেই, তবু মাজেদ তিশাকে বলে, ‘আমার লগে লগে আয়।’

কে শোনে কার কথা! কলাগাছের শুকনো, মরা পাতা মাড়িয়ে, ছোট ছোট আগাছা ছাওয়া ঢালটা স্লিপারে পিছল খাওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে দৌড়ে নেমে যায় তিশা। সাদিয়া পেছন থেকে ‘এই, এই’ বলেও তাকে থামাতে পারে না। বরং নিজেও বেশ খানিকটা গতির সাথে ঢাল বেয়ে নেমে যায়।

মাজেদই কেবল ভারী ব্যাগটা টানতে টানতে বেশ খানিকটা শ্লথ গতিতে নামে। সামনে ফসলের মাঠের বিস্তার, কোথাও সরিষা, কোথাও ধনিয়া চাষ করা হয়েছে- ফুল এসে গেছে। মৌমাছির ঝাঁকে ছেয়ে গেছে ক্ষেতগুলো। তারা যেদিক দিয়ে যাচ্ছে সেটাকে ঠিক পথ বলা যায় না- মাজেদ জানে। তবে পথের জন্মপ্রক্রিয়া সম্পর্কে সে অবগত- খুব সোজা। বারবার যাওয়া-আসা করতে করতেই একেকটা পথ তৈরি হয়।

দুপাশের সরিষা, ধনিয়া ক্ষেতের মাঝ বরাবর জমির আলের ওপর দিয়ে তারা যাবে- এমনটাই মাজেদের চিন্তা। সেটা জানাতে হয় না, তিশা, সাদিয়া নিজেরাই বুঝে গেছে যেন। তিশা প্রায় দৌড়াচ্ছে সরু আলের ওপর দিয়ে- পাখির ডানার মতো দুদিকে দুহাত প্রসারিত করে ভারসাম্য বজায় রেখে। সাদিয়া তার বেশ খানিকটা পেছনে।

দুপাশে কেবল হলুদ আর সাদা, হলুদ আর সাদা, হলুদ আর সাদা। সূর্য তখনো পুরো তেতে ওঠেনি, চারপাশে কুয়াশার একটা আবছা বলয় তখনো সূর্যকে ঘিরে আছে। তার কোমলতা তখনো দৃষ্টি ও অনুভবগ্রাহ্য। আলপথে পায়ের তলায় ঘাস- শিশিরভেজা। ক্ষেতের সরিষা-ধনিয়ার গাছে, ফুলে শিশিরবিন্দু খুব স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। ক্ষেত শেষে একটা বড় পুকুর- পুকুরের ওপর ধূলার একটা পাতলা অস্পষ্ট আস্তরণ এত দূর থকেও বুঝতে কষ্ট হচ্ছে না যেন। পুকুরের ওপারে সারি সারি খোলা বাড়ি- কাছারি ঘর, উঠোন, রান্নাঘর, খড়ের গাদা, গোয়ালঘর- এসবের মাঝে মাঝে আবার নারিকেল, সুপারি গাছের সারি, বাঁশঝাড়ের মায়াবী অন্ধকার। কোনো বিভাজক বা সীমা নির্দেশক বেড়া ইত্যাদি নেই বলে পুরো দৃশ্যটাকেই যে কোনো জীবন বেছে নেওয়ার এক অখণ্ড, বিস্তৃত পটভূমি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। 

পুকুরের ওপারে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে নীল, সাদা ইউনিফর্ম পড়ে বগলে বই, খাতা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে- তিশা, সাদিয়া ও মাজেদকে দেখে একটু থমকে দাঁড়িয়েছে- যেমন করে  সপরিবারে ব্যাগ নিয়ে গ্রামে কাউকে ঢুকতে দেখলে তারা প্রতিবারই থমকে দাঁড়ায়। তিশা হাসছে, অনেক দূর এগিয়ে গেছে বলে- পুকুরের বেশ কাছাকাছি, পৌঁছে দাঁড়িয়েও গেছে, সাদিয়া ও মাজেদের জন্য অপেক্ষা করছে। 

ঘাসে ছাওয়া আলপথ ধরে এগোতে গিয়ে সাদিয়ার পিছলে যাওয়ার উপক্রম হয়। দাঁড়িয়ে পড়ে। মাজেদ কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়, বলে,’ব্যাগটা দাও আমারে।’

সাদিয়া আপত্তি করে না, ব্যাগটা মাজেদের হাতে তুলে দেয়।

তিশা তখনো আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। সাদিয়া নির্ভার হয়ে পায়ের স্যান্ডেল খুলে হাতে তুলে নেয়। পচা শামুকের খোল আছে কিনা লক্ষ্য রেখে সন্তর্পণে এগোতে থাকে। কিছুক্ষণ আগে এতো যত্ন করে ধোওয়া সুন্দর, সুডৌল পায়ে আবার একটু একটু করে কাদা লাগতে থাকে, গতি বাড়িয়ে দেয় সাদিয়া। শিশিরে পা ভিজতে থাকে, আরো কাদা লাগতে থাকে। কিন্তু সেদিকে ভ্রূক্ষেপ থাকে না সাদিয়ার।    (সমাপ্ত)।

Comments

    Please login to post comment. Login