((প্রিয় দর্শক আমরা এই উপন্যাসটি দশটি পর্বের একটি সত্য ঘটনার উপর নিয়ে লিখছি, এই উপন্যাসটি পরবর্তী পর্ব যেন অপেক্ষা করুন এবং সার্চ করতে পারেন, ভয়ংকর প্রেম কাহিনী উপন্যাসটির প্রথম পর্ব দেওয়া হল এটি কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে জানাবেন, এবং পরবর্তী পর্ব জন্য কমেন্ট করুন,))
(প্রথম পরবর্তী ১০ টা কমেন্ট এলেই পরের পর্বটা ফ্রি আসবে)
ভয়ংকর প্রেম কাহিনী
পর্ব ১: রক্তের প্রথম চিৎকার
ঢাকার উপকণ্ঠে, সাভারের একটা ছোট্ট গ্রামে, যেখানে নদীর কিনার ঘেঁষে বাঁশের ঝাড় আর কলাগাছের সারি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে, সেখানে এক রাতে ঝড় উঠেছিল। ১৯৯৮ সালের ১৫ই জুন। আকাশ যেন ফেটে পড়ছিল। বৃষ্টির ধারা এত প্রচণ্ড যে মাটি আর আকাশের সীমানা মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।
সেই রাতে, একটা মাটির ঘরের ভিতরে, এক নারী চিৎকার করে উঠল। তার নাম ছিল রোকেয়া। গ্রামের লোকেরা বলতো, “রোকেয়া বেগমের মতো সুন্দরী আর কষ্টসহিষ্ণু মেয়ে এই অঞ্চলে দ্বিতীয়টি নেই।” তার স্বামী আব্দুল করিম, একজন রিকশাচালক, বাইরে দাঁড়িয়ে ভিজছিল। হাতে একটা কেরোসিনের লণ্ঠন, যার আলোতে তার মুখের ভয় আর আশা দুটোই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।
“আল্লাহ, বাঁচাও... আমার বউকে বাঁচাও!” করিমের গলা বৃষ্টির শব্দে ডুবে যাচ্ছিল।
ভিতরে দাইমা আর দুইজন প্রতিবেশিনী চেষ্টা করছিল। রোকেয়ার কপালে ঘাম আর রক্ত মিশে গিয়েছিল। তার পেটের ভিতরের সন্তান যেন দুনিয়াতে আসতে চাইছিল না। যেন জানতো, এই দুনিয়া তার জন্য কোনো স্বর্গ নয়।
অবশেষে, মধ্যরাতের পর একটা তীব্র চিৎকার উঠল। শিশুর কান্না। কিন্তু সেই কান্না সাধারণ ছিল না। এতে যেন কোনো অদৃশ্য যন্ত্রণা মিশে ছিল। দাইমা শিশুটিকে তুলে ধরল। ছেলে। চোখ দুটো খোলা, যেন জন্মের প্রথম মুহূর্ত থেকেই দুনিয়াকে চিনে ফেলেছে।
“নাম কী রাখবা?” দাইমা জিজ্ঞাসা করল।
করিম ভিতরে ঢুকে, ভিজা হাতে ছেলের কপালে চুমু খেয়ে বলল, “আদিত্য। আদিত্য করিম। আলোর মতো জ্বলবে।”
রোকেয়া হাসল। কিন্তু সেই হাসিতে মৃত্যুর ছায়া ছিল। জন্মের ঠিক তিন ঘণ্টা পর রক্তক্ষরণে তার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। আদিত্যর জন্মের সঙ্গে সঙ্গে তার মায়ের মৃত্যু। গ্রামের লোকেরা বলাবলি করল, “এই ছেলে অভিশপ্ত। জন্ম দিয়েই মা’কে খেয়ে ফেলেছে।”
কিন্তু করিম বিশ্বাস করেনি। সে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে রেখেছিল। “তুই আমার আলো। তোর মা’র আলো।”
শৈশবের প্রথম কষ্ট
আদিত্য যখন তিন বছরের, তখন তার বাবা আবার বিয়ে করল। নতুন মা’র নাম সালমা। সুন্দরী, কিন্তু হৃদয়টা পাথরের। সালমা নিজের দুই মেয়েকে নিয়ে এসেছিল। আদিত্য হয়ে গেল বাড়ির অতিরিক্ত বোঝা।
সকালে ঘুম থেকে উঠে আদিত্যকে গরুর ঘাস কাটতে হতো। দুপুরে মাঠে ছাগল চরাতে হতো। রাতে যখন তার সৎবোনেরা খেলত, সে বাবার রিকশার চাকা মেরামত করত। কিন্তু সে কখনো কাঁদত না। তার চোখে একটা অদ্ভুত শান্তি ছিল। যেন সে জানতো, এই কষ্ট তার জীবনের শুরু মাত্র।
একদিন বৃষ্টির দিনে, আদিত্য পাঁচ বছরের। নদীর ধারে বাঁশ কাটতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে গেল। স্রোত তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। ছোট্ট শরীরটা জলে ডুবে যাচ্ছিল। সে হাত-পা ছুড়ছিল, কিন্তু কেউ ছিল না। ঠিক তখনই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। জলের ভিতর থেকে একটা হাত যেন তাকে ধরে তুলল। কোনো মানুষের হাত নয়। ঠান্ডা, কিন্তু নরম। আদিত্য চোখ খুলে দেখল, জলের মধ্যে একটা মেয়ের মুখ। তার চোখ দুটো গভীর কালো, ঠোঁটে হাসি।
“ভয় পেয়ো না, আদিত্য। আমি তোমার সঙ্গে আছি।” মেয়েটা ফিসফিস করে বলল।
আদিত্য জ্ঞান হারাল। যখন জ্ঞান ফিরল, সে নদীর তীরে শুয়ে আছে। গ্রামের লোকেরা তাকে খুঁজে পেয়েছে। কেউ বিশ্বাস করল না তার কথা। “স্বপ্ন দেখছিলি,” বাবা বলল।
কিন্তু আদিত্য জানতো। সেটা স্বপ্ন ছিল না। সেই মেয়েটার চোখ তার মনে গেঁথে গিয়েছিল।
স্কুলের প্রথম দিন
সাত বছর বয়সে আদিত্য স্কুলে ভর্তি হল। গ্রামের প্রাইমারি স্কুল। বই ছিল না, খাতা ছিল না। বাবা রিকশা চালিয়ে যা রোজগার করত, তাতে কোনোমতে চলে যেত। আদিত্য প্রতিদিন দুই কিলোমিটার হেঁটে স্কুল যেত। পায়ে চটি ফেটে গিয়েছিল, কিন্তু সে হাসিমুখে যেত।
স্কুলে তার প্রথম বন্ধু হল রাহাত। মোটা, হাসিখুশি, সবসময় খাবার নিয়ে আসত। “আদিত্য, খা। তোর তো মা নাই, খাইতে দিবে কে?” রাহাত বলত।
আরেকজন ছিল সুমন। চুপচাপ, কিন্তু পড়াশোনায় খুব ভালো। তিনজনে মিলে একটা দল। তারা গাছে উঠত, মাছ ধরত, আর স্বপ্ন দেখত বড় হয়ে ঢাকা শহরে যাবে।
কিন্তু স্কুলের তৃতীয় শ্রেণিতে একটা ঘটনা ঘটল যা আদিত্যর জীবন বদলে দিল।
স্কুলের পিছনে একটা পুরোনো আমগাছ ছিল। গ্রামের লোকেরা বলত, সেই গাছে একটা ভূত আছে। কেউ সেখানে যেত না। একদিন আদিত্য একা সেখানে গেল। তার হাতে একটা ছোট্ট লাল ফুল। সে গাছের নিচে বসে ফুলটা রাখল।
“যদি তুমি সত্যি থাকো, তাহলে আমার মা’কে একবার দেখাও।”
হাওয়া বইল। পাতা ঝরল। আর আদিত্য দেখল, গাছের আড়াল থেকে সেই মেয়েটা বেরিয়ে এল। এবার স্পষ্ট। সাদা শাড়ি, লম্বা চুল, চোখে অসীম মায়া।
“আমি তোমার মা নই, আদিত্য। কিন্তু আমি তোমাকে অনেকদিন ধরে দেখছি। আমার নাম... পরী।”
আদিত্য ভয় পেল না। সে হাসল। “তুমি কি আমার বন্ধু হবে?”
পরী হাসল। তার হাসিতে কোনো শব্দ ছিল না, কিন্তু আদিত্যর বুক ভরে গেল।
সেই দিন থেকে আদিত্যর জীবনে একটা অদৃশ্য সঙ্গী যোগ হল। যখন সৎমা মারত, পরী এসে তার কপালে হাত বুলিয়ে দিত। যখন খিদে পেত, পরী কোথা থেকে যেন ফল এনে দিত। কিন্তু কেউ দেখতে পেত না।
প্রথম যন্ত্রণার বীজ
দশ বছর বয়সে আদিত্য বুঝতে পারল, পরী সাধারণ কোনো বন্ধু নয়। এক রাতে সে স্বপ্ন দেখল। পরী তাকে বলছে, “আমি তোমার জন্য মরেছি। অনেক আগে। এখন তুমি আমার জন্য বাঁচবে। আমাদের প্রেম এই দুনিয়ার নিয়ম মানবে না।”
আদিত্য ঘুম থেকে উঠে দেখল তার হাতে রক্ত। তার নিজের রক্ত নয়। কারও না। শুধু একটা লাল ফুল।
সেই রাত থেকে আদিত্য বুঝল, তার জীবন সাধারণ থাকবে না। এটা একটা ভয়ংকর প্রেমের শুরু। যে প্রেম জন্মের আগে থেকে শুরু হয়েছে, আর মৃত্যুর পরেও শেষ হবে না।
বাইরে ঝড় উঠছিল আবার। আদিত্য জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল। তার চোখে শৈশবের নির্মলতা আর ভবিষ্যতের অন্ধকার মিশে ছিল।
“পরী... তুমি কোথায়?”
অন্ধকার থেকে একটা ফিসফিসানি ভেসে এল, “এখানেই আছি। সবসময়।”
(পর্ব ১ সমাপ্ত)
পরবর্তী পর্বে: আদিত্যর স্কুল জীবনের আরও গভীরে, প্রথম ভালোবাসার ছোঁয়া, প্রথম বড় বিপদ, আর পরীর রহস্যের আরও এক ধাপ।