ফলভারে নত পৃথিবীর বিলিয়ে দেওয়ার সময় যখন এলো-
ঘড়ির বিশ্বস্ত কাঁটা মেপে, মেনে
এলো তোমারও পালা,
আর পৃথিবীর চিরায়ত প্রাচীন পথের ছায়া ধরে
তোমার মিলিয়ে, ছাড়িয়ে যাওয়ার পর এলো-
সব-পাওয়া মানুষের দেশে
জীর্ণ আঁচলের, বানভাসি ঘরের খুঁটি ধরে-
একপ্রান্তে
আমার বিরামহীন দাঁড়িয়ে থাকার পালা;
নির্মেঘ উন্মুক্ত বিরান প্রান্তরে
সেই যে আমার অলীক ঘূর্ণির কুহকী সূচনা;
তারপর-
পৃথিবী অনেক যত্ন করে একে একে সব চিহ্ন তার
তুলে নিলো আমার পথের রেখা থেকে,
উচ্ছ্বাস, উল্লাস, উৎসবের বাধভাঙা প্লাবনের জল
দুকূল ভাসিয়ে সবাইকে নিয়ে গেলো-
আমি রয়ে গেলাম অটল, স্থাণু হয়ে-
পাশ দিয়ে কতো লক্ষ্যভেদী, মর্মভেদী তীর
ছুটে গেলো আকাশের দিকে
যার যার আরাধ্য স্বপ্নের দিকে-
আমার স্বপ্নের দিকে তীর আর ছোঁড়া হয়নি কখনো;
কে কখন আমার সর্বস্ব, সব স্বপ্ন দখল করেছে-
কার অঙুলি হেলনে-
হাসে, কাঁদে, নতজানু ভিক্ষা মাগে
বেলাশেষে সব নাও ছেড়ে যাওয়া ঘাটে বাঁধাপড়া আমি-
সেই বিষণ্ণ আমি-র আর খোঁজ নেওয়া হয়নি মোটেও;
কতো গ্রীষ্ম এলো, গেলো,
কতো দাবানলে জ্বলে পুড়ে সবাই অঙ্গার হলো বারবার
বর্ষার মেঘের ছায়ায় আবার শীতলও হলো-
কতো ফুল ফুটলো, কতোজনে ফুল হয়ে ফুটলো,
সুবাস ছড়ালো-
কতো বুক-ভাসানো বর্ষার জলে ধুয়ে ধুয়ে
কতোজনের বুকের কান্না থেমে গেলো-
আমার আকাশ জুড়ে নিদাঘ, উত্তাপ,
নিষ্করুণ আগুনই ভেসে রইলো;
ছায়ার আশায়, আশ্রয়ের আকাঙ্ক্ষায়
পৃথিবীর আর কারো দরজায়
কড়ানাড়া হয়নি আমার,
উঁকি মেরে দেখাও হয়নি- কী আছে ভেতরে
পাথুরে দেওয়াল, না দূর্ভেদ্য দূর্গ-
শিয়রে সোনার কাঠি, পায়ে রুপোর কাঠির জাদু মেখে
কোন সে রাজকুমারী পালঙ্কে ঘুমিয়ে আছে- দেখাও হয়নি।
আমি অপেক্ষা করিনি,
ভাঙা সৌধ আবার গড়তে, বাঁধতে বসিনি-
শুধু থেমে গেছি, দাঁড়িয়েছি, থামিয়ে দিয়েছি
শুধু এই জেনে-
সবাই বদলায় না, সবকিছুর বদল হয় না মোটেও,
আপনি থেকে না গেলে ডেকে আনা যায় না কখনো;
পৃথিবী এগোবে, সামনে এগিয়ে যাক-
পাথুরে সময় বয়ে যাক অনন্ত প্রবাহ হয়ে-
আমি শুধু থেকে যাবো, রয়ে যাবো,
কোথাও যাবো না, একটু বদলাবো না-
কারণ আমার এই পৃথিবী বদলায় না,
সবকিছুর বদল হয় না এখানে,
নিজ আঙিনায় রয়ে যাবো আমি ধ্বস্ত চূড়া হয়ে,
নিজ ধ্বংসের নিশ্চল, নিথর দ্রষ্টা, সাক্ষী হয়ে।
এক অজানা মেঘের বৃষ্টি-ছাওয়া কাতর বর্ষার ভাবনায়
আমার জীবন কেটে গেছে, কোথাও যাওয়া হয়নি আমাকে ছেড়ে,
আমি আর ‘অন্য কেউ’ হয়ে উঠতে পারিনি,
শুধু দেওয়ার-কিছুই-নেই হাতে শূন্য সেই যুবকই
থেকে গেছি। (সমাপ্ত)