Posts

গল্প

রফিক সাহেবের ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবনিকেশ

May 21, 2026

Md Anwar Parvez

39
View

অণুগল্প

পূত্রবধূ সুহা বৃদ্ধ রফিক সাহেবের বাহুমূলের কাছাকাছি জায়গায় হাত দু’টো ধরে অত্যন্ত সন্তর্পণে ও যত্নের সাথে বিছানায় শোয়া অবস্থা থেকে বসিয়ে দেয়। আগেই বালিশটা খাড়া করে বসানো হয়েছিল, এখন রফিক সাহেব যাতে স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে হেলান দিতে পারেন সেজন্য তার অবস্থানটা ঠিকঠাক করে দেওয়া হয়। রফিক সাহেব খানিকটা আরাম বোধ করেন। সুহা  খুব মোলায়েম স্বরে জিগ্যেস করে,’এক কাপ চা দিই বাবা? আমার মনে হয় খারাপ লাগবে না।’

রফিক সাহেব বসিয়ে দেওয়ার এই সময়টা জুড়ে বুকের ভেতর আটকে রাখা দমটা একটা দীর্ঘ প্রশ্বাসের সাথে ছেড়ে দেন, দিয়ে আরেকটু সহজ, আরেকটু আরাম বোধ করেন। বেশ স্পষ্ট স্বরে বলতে সক্ষম হন, ‘চা দিবে? দাও।’

সুহা রফিক সাহেবের পায়ের দিকে পড়ে থাকা পাতলা চাদরটা একটু ওপরের দিকে টেনে দিয়ে রান্নাঘরের দিকে যেতে উদ্যত হয়, তারপর “ও!’ বলে ফিরে আসে জানালার কাছে গিয়ে পর্দাটা আরেকটু ফাঁক করে দেয়। জানালাটাও ঠেলা দিয়ে আরেকটু মেলে দেয়। সাথে সাথেই অনেক দূর পথ পাড়ি দেওয়া দখিনা বাতাসের মৃদু একটা দমক ভেসে এসে রফিক সাহেবের বুকে, মুখে ঝাপটা মারে, তিনি আরো শান্তি অনুভব করেন। বাড়তি এই যত্ন ও ভালোবাসার জন্য তিনি সুহাকে ‘ধন্যবাদ’ জাতীয় কিছু একটা বলার জন্য উদ্যত হন, সুহা সেটা লক্ষ না করে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। 

রফিক সাহেব যতটুকু পারা যায় ঘাড় ফিরিয়ে সুহার প্রস্থান দেখেন, তারপর আবার জানালার দিকে চোখ ফেরান, বিড়বিড় করে বলেন, ‘মেয়েটার ওপর অন্যায় করা হয়েছে। ভারী অন্যায়। শাদ বুঝল না।’ চোখ বুজে নিজেকে শোনানোর জন্যই যেন অস্পষ্ট স্বগতোক্তি করেন, ‘আমারও বোঝা উচিত ছিল।’

রফিক সাহেব চোখ মুদেই থাকেন যতক্ষণ না সুহার হাতে কাপ-পিরিচের নড়াচড়ার শব্দ শুনতে পান। ‘বাবা ঘুমিয়ে গেলেন নাকি?’ প্রশ্ন শুনে চোখ খুলেন। ম্লান, মৃদু কণ্ঠে বলেন, ‘না। ঘুমাইনি।’ সুহা বিছানার ওপর ছোট একটা ট্রেতে চায়ের কাপ রেখে ঠিকমতো বসিয়ে দেয়, বলে, ‘নেন বাবা, চা খান।’

রফিক সাহেব কাপটা তুলে চায়ে চুমুক দেন। বেশ ভালো লাগে। মাথার হাল্কা ঝিমধরা ভাবটা অনেকটা কেটে যায়। দ্বিতীয় চুমুক দিয়ে লক্ষ করেন যে, সুহা তার দিকেই তাকিয়ে আছে, চা খাওয়া দেখছে। সুহা চোখ ফিরিয়ে নেয়, রফিক সাহেব দৃষ্টি ফিরাতে বিছানার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘বোসো মা।’

বলার পরই তার খেয়াল হয় যে, তিনি নিজেই বালিশ, চাদর, ওষুধের বাক্স, ট্রে ইত্যাদি নিয়ে বিছানার অনেকটা জায়গা দখল করে আছেন, সুহার বসার জন্য বেশি জায়গা নেই। রফিক সাহেব মুহূর্তের জন্য চোখ মুদে একটু বিরাম নেন, পরক্ষণেই তা খুলে কাছের একটা চেয়ার দেখিয়ে বলেন, ‘ঐ চেয়ারটা নিয়ে আসো। বসো।’ চায়ে আরো দু’টো চুমুক দেন।

সুহা চেয়ারটা নিয়ে এলে রফিক সাহেব প্রায় শূন্য কাপটা তার হাতে তুলে দেন, বলেন, ‘আর খাবো না। ভালো হয়েছে। তোমার হাতের চা ভালো। যে খাবে সে-ই প্রশংসা করবে। সত্যি কথা বলতে কী, তোমার অনেক কিছুই ভালো।’ পরপর কয়েকটা কথা বলে তিনি একটু ক্লান্ত বোধ করেন। সুহা নরম স্বরে বলে, ‘এসব কথা থাক, বাবা।’

রফিক সাহেবের কাছে সুহার কথাটা এক ধরনের ‘বাধা’ বলে মনে হয়, নিজের ভেতর থেকে আরেকটু শক্তি টেনে এনে বাধাটা সরিয়ে ফেলবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন। চোখ মুদে বলেন, ‘না, কথাগুলো বলা দরকার। তুমি এতো ভালো একজন মানুষ! আরো অনেক ভালো কিছু পাওয়া উচিত ছিল তোমার। উল্টো কিছু অন্যায় করা হয়েছে তোমার ওপর। এগুলো তোমার পাওয়া উচিত ছিল না। শাদ বোঝেনি। আমারও বোঝা উচিত ছিল। শাদ আর কী-ই বা করবে! আমারই তো ছেলে। আমিই বুঝিনি, আর ও বুঝবে কোত্থেকে?’

সুহাকে একটু উসখুস করতে দেখে অনেকটা সুস্থির করার জন্যই যেন তিনি বেশ দ্রুত গতিতে বলেন, ‘বোসো। মাথা ঠাণ্ডা করো। অনেকদিন ধরেই কথাগুলো ভেতরে ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে। আমার বলা দরকার। বলা না হলে একটা ভীষণ অতৃপ্তি থেকে যাবে। বুঝতেই তো পারছ, আমার সময় বেশি নেই। কিছু বিষয় মীমাংসা করে যাওয়া দরকার। এই জীবনে যথেষ্ট দেখেছি। কিছু বুঝেছি, অনেক কিছুই বুঝিনি। যা বুঝেছি সেগুলো অন্তত বলে যাওয়া দরকার। না হলে ভুল হবে। ভুলগুলো ঘুরতেই থাকবে। তুমি শুনে রাখো। কেউ এই ভুলগুলো করলে অন্তত ধরিয়ে দিতে পারবে। সংশোধন করতে পারবে। শাদকেই বেশি বলা দরকার। কিন্তু এত গোঁয়ার আর একরোখা! কথা শোনানোই কষ্ট। সময় করে অল্প অল্প করে শোনাতে হবে। যে কথাগুলো বলব সেগুলো নিয়ে আমি মনে মনে ভাবছি। বেশ কিছুদিন ধরেই। ওর মন মেজাজটা বুঝে………’

সুহার ঠোঁটের কোণায় এক চিলতে হাসি দেখে রফিক সাহেব কথার গতি একটু বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘তোমাকে বলি, শাদকেও বলব- আমরা বাঁচি, জীবনও পার করি। কিন্তু আমাদের বোঝাটাই শেষ হয় না। না বুঝেই বাঁচি, না বুঝেই জীবন পার করি………

কারণ আমরা নিজেদের যতটা বুদ্ধিমান ভাবি ততটা বুদ্ধিমান আসলে আমরা নই। আমাদের অনেকেরই আই.কিউ কম। শাদেরও কম। আই. কিউ. কম-এটা আমরা তেমন মানতেই চাই না। খুব গভীরভাবে ভাবিও না। আই.কিউ. যদিও বা থাকে, দেখা যাবে গ্রহণ করার ক্ষমতাই কম। জীবনের বড় অংশটাই আমাদের বোধের বাইরে থেকে যায়। এটা অনুভব করিও না, বুঝতেই চাই না। অন্যকে বোঝা তো দূরের কথা, নিজেকেই বুঝি না। চেষ্টাও করি না। চেষ্টা করলেই কিন্তু সমস্যার অনেকটা মিটে যায়। কথাটা বেখাপ্পা মনে হতে পারে- চেষ্টা করলেই বোঝা যায়, এমনকি আই. কিউ. ও বাড়ানো যায়। কথাটা হাস্যকর মনে হতে পারে, কিন্তু আসলে তা না। সবকিছুই গণিতের সমস্যা সমাধান করার ব্যাপার না………

আমি অনেকদিন ধরেই ভাবছি। আমাদের ইচ্ছাটাই আসল। ইচ্ছা করলেই আমরা চেষ্টা করতে পারি, নিজেকে, অন্যকে বুঝতে পারি। ইচ্ছা করলেই আমরা ভালো মানুষও হতে পারি। বুঝতে চাইলেই, চেষ্টা করলেই………

আমার কথাগুলো শেষ হয়নি। অনেক দিনের জমানো কথা। সব যে পুরোপুরি বুঝেছি, তাও না। যেটুকু বুঝেছি তা-ই বলি------

আমার চাকরি জীবনের প্রথম দিককার কথা। একটা বেসরকারি কোম্পানিতে এক্সিকিউটিভ পদে যোগ দিয়েছিলাম। আমার ডিপার্টমেন্টে দুজন সেকেন্ডম্যান ছিল, একজন ছিলেন মামুন সাহেব। ভালো হিসেবে পরিচিতি ছিলো, কিন্তু কেমন ভালো প্রথমে সেটা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। আমি ঢোকার কিছুদিন পরেই বাতেন নামে একজন মামুন সাহেবের সমান পদে যোগ দেয়। বেশ বুদ্ধিমান। যোগ দেওয়ার কিছুদিন পরেই বাতেন সাহেব মামুন সাহেবকে একরকমের টার্গেট করে ফেললেন। সেটা বেশ স্পষ্টভাবেই বোঝা যেত। বাতেন সাহেব মামুন সাহেবকে বেশ কয়েকজনের একটা সাধারণ প্রতিপক্ষ বানানোর চেষ্টায় নামলেন। কেউ কেউ বুঝতে পারল, কেউ পারল না, তবে আমি পারলাম। তো একদিন ডিরেক্টর স্যার মামুন সাহেবকে টঙ্গীতে বাটা কোম্পানিতে পাঠালেন একটা বকেয়া বিলের টাকা আনতে। তখন আমাদের বেশ টানাটানি চলছিল। আর বাটা কোম্পানির টাকাটাও অনেক দিন ধরে বকেয়া হয়ে গিয়েছিল। বাটা কোম্পানির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় সরকারি আমলাতন্ত্রের চেয়ে কিন্তু কম জটিলতা নেই। বেশ কয়েকবার যাওয়া-আসা করে মামুন সাহেব সেদিন সফল হলেন। বিকেল চারটার দিকে চেক নিয়ে এলেন, ডিরেক্টর স্যারকে দিলেন। তার খাওয়াদাওয়া শেষ হলে ডিরেক্টর স্যার তাকে ডেকে একটা কাজ দিলেন। কাজটা বাতেন সাহেবও পারতেন। তো কাজ শুরু করার পর মামুন সাহেব বাতেন সাহেবের কাছে কী একটা কাগজ চাইলেন। বাতেন সাহেব কাগজসহ মামুন সাহেবের টেবিলে এসে বেশ দৃষ্টিকটুভাবেই বাকি কাগজগুলো উঠিয়ে নিয়ে নিজের টেবিলে গিয়ে বসলেন, কম্পিউটারে কাজ করতে লেগে গেলেন। মামুন সাহেব হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইলেন কিছুক্ষন, তারপর বাতেন সাহেবের কাছে গিয়ে বললেন, ‘আপনি কাজটা করবেন বললেই পারতেন, টানাটানি করার কী দরকার! কাজ ভাগাভাগি করা তো খারাপ কিছু না।’

একটু পরেই কী জন্য যেন ডিরেক্টর স্যার বাইরে এসে দাঁড়ালেন, দেখলেন, বাতেন সাহেব কাজটা করছেন। তিনি মামুন সাহেবের টেবিলের দিকে একটু এগিয়েও ফিরে গেলেন। খানিক পরেই মামুন সাহেবের ডাক পড়ল ভেতরে। মামুন সাহেব ভেতরে গেলেন, আমরা সবাই কান খাড়া করে বোঝার চেষ্টা করছি ভেতরে কী হচ্ছে, বাতেন সাহেবকে যতটা বিচলিত দেখব ভেবেছিলাম, ততোটা না দেখে কেমন যেন অবাকই লাগল । 

কিছুক্ষণ পরেই মামুন সাহেব বাইরে এলেন, বাতেন সাহেবের টেবিলের সামনে গিয়ে বেশ খানিকটা নিচু স্বরে বললেন, ‘স্যারকে বলেছি আপনি আমাকে রেস্ট নিতে বলেছিলেন। এত জার্নি……এই আর কি!’ 

কথাগুলো বলে নিজের টেবিলের কাছে এসে ড্রয়ার থেকে একটা সিগারেট বের করে সিঁড়িঘরের দিকে চলে গেলেন।

মামুন সাহেব চলে যাওয়ার পর বাতেন সাহেব কিছুক্ষণ কাজটা চালিয়ে যাওয়র চেষ্টা করলেন বলে মনে হলো, পারলেন না, থামিয়ে দিলেন। একবার স্ক্রিনের দিকে তাকান, একবার মামুন সাহেবের শূন্য চেয়ারের দিকে তাকান। হঠাৎ আমার দিকে চোখ পড়ে যাওয়াতে কেমন একটু অপ্রতিভ হয়ে পড়েন, চোখ ফিরিয়ে নেন। ডেস্ক থেকে উঠে গিয়ে সিঁড়িঘরের পথ ধরেন। আমি এইটুকুই দেখেছিলাম।

আমরা যারা সরকারি, বেসরকারি চাকরি করি বা করতাম তাদের অর্জন-বিসর্জন, সাফল্য-ব্যর্থতা, সুনীতি-দূর্নীতি, ভালো-মন্দ, জয়-পরাজয়ের ধরন অনেকটা এরকমই, এসবের সাথেই জড়িত। তো পরদিন মামুন সাহেব আর বাতেন সাহেবকে বেশ স্বাভাবিকই দেখেছিলাম। সম্পর্কও বেশ সহজ দেখেছিলাম। সেদিন কী ঘটেছিল তার আর কোনো চিহ্ন দেখিনি।

ঘটনাটা নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। এক কোম্পানি থেকে আরেক কোম্পানি, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গা…… এভাবে কম তো ঘুরিনি। কিন্তু যেখানেই গেছি ঘটনাটা মাথায় রেখেছিলাম। ভুলিনি, ভোলার চেষ্টাও করিনি। বোঝার চেষ্টা করেছি। মামুন সাহেব ইচ্ছে করলে সেদিন বাতেন সাহেবকে বরবাদ করে দিতে পারতেন, করেননি। করলে আমরা কেউ দোষও দিতাম না। তিনি সেটা তো করলেনই না, উল্টো নিজেকেই বিপদে ফেললেন। তার নিজের অনেক ক্ষতি হতে পারত। তিনি বিশাল ঝুঁকি নিয়েছিলেন, ঝুঁকি নিয়ে ভালো থাকার চেষ্টা করেছিলেন। অন্য কেউ হলে একটা সিন-ক্রিয়েট করত, নিদেনপক্ষে ডিরেক্টর স্যারের কাছে সাজিয়ে গুছিয়ে বড় একটা অভিযোগ দায়ের করত। তিনি সেটা করলেন না। ঝুঁকি নিলেন।

আসলে মা, আমরা এই ঝুঁকিটাই দেখি, দেখে আর এগোনোর আর সাহস করি না। ভয় লাগে- যদি নিজের ক্ষতি হয়, অন্যেরা সুযোগ পেয়ে যায়, বা দোষ করেও পার পেয়ে যায়! এমন সব আশঙ্কাই মনে আসে, নিজে থেকেই কুঁকড়ে যাই। মাথার ওপর বন বন করে এই ভয়টাই ঘুরতে থাকে সারাক্ষণ। উপায়- একটাই- ছাড় দেওয়া যাবে না, এক বিন্দুও না! এটা কি শুধু অফিসপাড়ায়- যেটা কিনা আমাদের জীবিকার উৎসস্থল, আমাদের বাঁচার, টিকে থাকার রসদ সরবরাহের ক্ষেত্রভূমি! না, আমাদের ঘরে, মহল্লায়, পাড়ায়, বন্ধুদের সাথে আড্ডায়, বিনোদনকেন্দ্রে- সর্বক্ষেত্রে- যত জায়গায় আমাদের টুকরো টুকরো আমিগুলো ছড়িয়ে, ছিটিয়ে আছে- আমরা তাদের কতোটুকু কেন্দ্রীভূত রাখতে পেরেছি সেটা কোনো কথা নয়!

কথাটা কেমন শোনাবে জানি না- মাঝে মাঝেই আমার মনে হয়েছে, আমাদের সবার মাথার ওপর মেঘের স্তরে যেন একটা অলিম্পিয়াড ভেসে বেড়াচ্ছে! সেখানে আমাদের শত্রু-মিত্র, ঊর্ধ্বতন-অধস্তন, আত্মীয়-অনাত্মীয়, জ্যেষ্ঠ-কনিষ্ঠ সবাই এইমাত্র ভোজনশেষে পানপাত্র হাতে নিয়ে বসে পড়েছে, আমাদের কাজকারবার দেখছে! আমাদের সামান্য ত্রুটি, বিচ্যুতি, ব্যর্থতা, হতাশা, বিমূঢ়তা বহুগুণ বিবর্ধিত হয়ে তাদেরকে অফুরন্ত মজার যোগান দিয়ে যাচ্ছে, তাদের অন্তহীন কৌতূহল ও উপভোগের তৃষ্ণা মিটিয়ে যাচ্ছে। আমাদের কাজকারবার দেখছে আর কেবলই একজন আরেকজনের গায়ে ঢলে পড়ছে!

নিচে আমাদের কেউ কেউ আমাদের দিকে তাক করে রাখা তাদের আঙুলগুলো পর্যন্ত দেখতে পায়। যারা ভালো মানুষ হওয়ার ঝুঁকি নেওয়ার সাহস রাখে তারাই কেবল ওই অলিম্পিয়াডের দিকে পাল্টা হাসি ছুঁড়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। অনেকে তাদের অস্তিত্ব পর্যন্ত অনুভব করে না- না কল্পনায়, না সর্বনাশের সকল ধাপ পার করে পৌঁছে যাওয়া বিমূঢ়তায়!

শুধু একটু ঝুঁকি নেওয়ার সাহস, ইচ্ছা! মা, শুধু একটু ইচ্ছা! তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছো মা?

সারাটা জীবন এই কথাগুলো আমার মধ্যে ঘুরপাক খেয়েছে, সব যে পুরোপুরি বুঝতে পেরেছি- তাও না! কিন্তু পূর্ণ হোক আর অপূর্ণ হোক বলতে পারিনি। আজ হয়তো বলতে গিয়ে এতদূর পর্যন্ত এসেছি, বেঁচে থাকলে হয়তো ভবিষ্যতে আরো বহুদূর পর্যন্ত যেতে পারবো, কিন্ত এই পর্যন্ত বোধে আসা কথাগুলো জানানো দরকার। বলা দরকার, খুব দরকার! মা, তুমি……

রফিক সাহেবের কেমন যেন হাঁসফাঁস লাগে, কথাগুলো যেন তার গলায় আটকে আটকে আসে। একটু কেশে গলা পরিস্কার করে তিনি বাকি কথাগুলো বলে শেষ করতে চেষ্টা করেন, সেই চেষ্টা তার গলায় কাশির দমক নিয়ে আসে। দমক তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে, কাশতে কাশতে চোখে পানি পর্যন্ত চলে আসে। চোখের সামনে সবকিছু ক্রমশ ঝাপসা, অস্পষ্ট হতে থাকে। স্বরও কিছুটা তেজ হারাতে থাকে।

বাকি কথাগুলো একটু একটু করে  ক্ষীণতর হতে থাকে, দূরে না গিয়ে বুকের কাছেই অথবা বুকের মধ্যেই ঘুরপাক খেতে থাকে। রফিক সাহেব ঠিক ঠাহর করতে পারেন না কথাগুলো সুহার কানে পৌঁছাচ্ছে কি না। ঘুরপাক খাওয়া কথাগুলো একসময় কেমন যেন তোলপাড় তোলে তার বুকে, ঝাপসা চোখে, চেতনাতে, সমগ্র অস্তিত্বে। চোখ আরো ঝাপসা হতে থাকে, কেমন একটা অন্ধকার পর্দা উঠে আসে চোখের সামনে। সেই অন্ধকারের পর্দা ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টায় রফিক সাহেবের অস্তিত্বের ভেতর থেকে আলোকরশ্মির মতো কথা উঠে আসতে থাকে- ‘মা, তুমি কি শুনতে পাচ্ছো? তুমি কি………? কেউ কি………?’   (সমাপ্ত)

Comments

    Please login to post comment. Login