Posts

চিন্তা

ব্যর্থতার বৃত্তে ব্যর্থদের অনাগ্রহ

June 1, 2026

তাহসিন আরিফ হিমেল (INNOVA JOURNAL)

Original Author তাহসিন আরিফ হিমেল

83
View

মানুষের মনস্তত্ত্বের এক অদ্ভুত ও নির্মম চোরাবালি লুকিয়ে আছে এই সহজ সত্যটির গভীরে—ব্যর্থদের গল্প ব্যর্থ শুনতে চায় না। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, সমব্যথী মানুষ বুঝি অন্য সমব্যথীর মাঝে এক ধরণের আশ্রয় খোঁজে। সমাজ বা সাহিত্যের চিরন্তন ধারণা আমাদের শেখায় যে, ব্যথিত মানুষ অন্য দুঃখী মানুষের পাশে এসে দাঁড়াবে, ভাঙা মন অন্য এক ভাঙা মনের ক্ষত দেখে সান্ত্বনা পাবে। কিন্তু বাস্তব জীবনের কঠোর মনস্তাত্ত্বিক সত্যটি সম্পূর্ণ উল্টো। বাস্তবতার রূঢ় জমিনে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, আহত মানুষ অন্য কারও ক্ষতবিক্ষত রূপ দেখতে চরম অনাগ্রহ প্রকাশ করে। একজন ব্যর্থ মানুষের নিজের জীবনের গ্লানি, হতাশা, আর না-পাওয়ার বেদনাগুলো এমনিতেই তার অবচেতন মনে এক একটা ভারী পাথরের মতো চেপে বসে থাকে। এই দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ক্লান্তির ভেতর সে যখন অন্য কোনো মানুষের ব্যর্থতার কাহিনী শোনে, তখন সেই কাহিনী তার মনের ভেতর কোনো সহানুভূতির উদ্রেক করে না, বরং একটি নির্মম আয়না হয়ে তার সামনে দাঁড়ায়। যে আয়নায় সে নিজেরই এক ভাঙাচোরা, দীর্ণ প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়। নিজের এই কুৎসিত ও অক্ষম রূপটির মুখোমুখি হওয়া এতটাই যন্ত্রণাদায়ক যে, মানুষ স্বভাবগতভাবেই সেই বাস্তবতাকে এড়িয়ে চলতে চায়। সে অবচেতনভাবেই এমন সব গল্প, মানুষ বা পরিস্থিতি থেকে দূরে পালায়, যা তাকে নতুন করে নিজের অন্ধকারের কথা মনে করিয়ে দেয়। এই পলায়নপরতাই হলো মানুষের বেঁচে থাকার এক আদিম প্রতিরক্ষা কৌশল।
​এই অনাগ্রহের মূল উৎসটি সন্ধান করতে গেলে আমাদের মানুষের আদিম মনস্তাত্ত্বিক চাহিদার দিকে তাকাতে হবে। মানুষ যখন নিজে কোনো সংকটে পড়ে বা জীবনের কোনো রেসে পিছিয়ে যায়, তখন তার অবচেতন মন এক ধরণের তীব্র শূন্যতা অনুভব করে। এই শূন্যতা পূরণের জন্য তার প্রয়োজন হয় এমন কিছুর, যা তাকে মাটি থেকে টেনে তুলবে। কিন্তু একজন ব্যর্থ মানুষ যখন আরেকজন ব্যর্থ মানুষের মুখোমুখি হয়, তখন সেখানে কোনো উত্তরণের শক্তি থাকে না। ডুবতে থাকা মানুষের যেমন বেঁচে থাকার জন্য আরেকটি ডুবন্ত মানুষের শরীর আঁকড়ে ধরলে চলে না—তার প্রয়োজন হয় তীরে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো শক্ত হাত বা কোনো ভাসমান কাঠখণ্ড—তেমনি ব্যর্থ মানুষের মনও অবদমিতভাবে কেবলই আশার আলো আর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প খোঁজে। সে ব্যাকুল হয়ে দেখতে চায় কীভাবে কেউ একজন শূন্য থেকে শিখরে পৌঁছাল, কীভাবে সমস্ত প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে একজন মানুষ বিজয়ী হলো। এই সফলতার গল্পগুলো তাকে এক ধরণের ক্ষণস্থায়ী মানসিক সান্ত্বনা দেয়, তার ভেতর এক অলৌকিক পরিবর্তনের অবাস্তব স্বপ্ন বুনে দেয়। সে অবচেতনভাবেই বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, যদি অন্য কেউ পারে, তবে হয়তো কোনো এক অলৌকিক উপায়ে সে নিজেও একদিন এই অন্ধকূপ থেকে বের হয়ে আসতে পারবে। এই মিথ্যা আশার আলো বা মোহাচ্ছন্নতা মানুষের মনে এতটাই তীব্র প্রভাব ফেলে যে, নিজের শ্রেণির বা নিজের চারপাশের মানুষের চিরচেনা বাস্তব সংগ্রাম ও ব্যর্থতার গল্প তখন তার কাছে চরম একঘেয়ে, বিরক্তিকর এবং মূল্যহীন মনে হতে থাকে।
​সমাজবিজ্ঞান এবং আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থাও এই মানসিকতাকে তৈরি ও লালন করতে বড় ভূমিকা পালন করে। বর্তমান সমাজ সবসময় সফলতার স্তুতি গাইতে পছন্দ করে। আমাদের চারপাশে সাফল্যের যে চাকচিক্যময় প্রদর্শন সাজিয়ে রাখা হয়, তা মানুষের মনে এক ধরণের কৃত্রিম ক্ষুধা তৈরি করে। এই ব্যবস্থায় ব্যর্থতা মানেই হলো এক ধরণের অপরাধ বা অযোগ্যতা। ফলে, একজন ব্যর্থ মানুষ যখন নিজের সমাজেই নিজেকে ব্রাত্য বা মূল্যহীন মনে করে, তখন সে নিজের অজান্তেই সফলদের স্তাবক হয়ে ওঠে। সে সফলদের জীবনধারা দেখতে পছন্দ করে, তাদের উপদেশ শুনতে ভালোবাসে এবং তাদের গল্পে রোমাঞ্চিত হয়। সে মনে করে, সফলদের কাছাকাছি থাকলে বা তাদের গল্প শুনলে তার নিজের গায়ের ব্যর্থতার দাগ কিছুটা হলেও মুছে যাবে। এটি আসলে এক ধরণের মানসিক দাসত্ব বা 'ফ্যান্টাসি', যা তাকে নিজের রূঢ় বাস্তবতা থেকে সাময়িক মুক্তি দেয়। অন্যপক্ষে, নিজের মতোই আরেকজন ব্যর্থ মানুষের গল্প শুনলে তার সেই কল্পনার রঙিন বুদবুদটি এক নিমেষে ভেঙে যায়। তাকে আবার ফিরে আসতে হয় তার নিজের সেই চেনা অভাব, অবহেলা আর অপমানের জগতে। এই কারণেই ব্যর্থ মানুষ অন্য ব্যর্থ মানুষের থেকে এক অদ্ভুত মানসিক দূরত্ব বজায় রেখে চলে। তারা একই নৌকার যাত্রী হওয়া সত্ত্বেও একে অপরের দিকে তাকাতে ভয় পায়, কারণ সেই চাউনিতে কেবলই নিজেদের পরাজয়ের ইতিহাস লেখা থাকে।
​এর বাইরেও মানুষের এক সুপ্ত অহংবোধ বা ইগোর খেলা এখানে কাজ করে, যা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও জটিল। ব্যর্থতার চরম অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকার সময়ও মানুষের ভেতরের অহংকার পুরোপুরি মরে যায় না। একজন ব্যর্থ মানুষ যখন অন্য কারও ব্যর্থতার কাহিনী শোনে, তখন তার মন স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণে লিপ্ত হয়। সে মনের অজান্তেই নিজের ব্যর্থতার সাথে অন্যের ব্যর্থতার পরিমাপ করতে শুরু করে। এই তুলনা দুই ধরণের নেতিবাচক মানসিকতার জন্ম দেয়। প্রথমত, সে যদি দেখে অন্য মানুষটি তার চেয়েও বেশি খারাপ অবস্থায় আছে, তবে সে এক ধরণের সাময়িক ও বিকৃত সান্ত্বনা পাওয়ার চেষ্টা করে, যা তার নিজের মানবিক সত্ত্বাকে আরও ছোট করে দেয়। দ্বিতীয়ত, সে যদি দেখে অন্য মানুষটির ব্যর্থতার গল্প হুবহু তার নিজের গল্পের মতোই, তবে তার মনে এই চরম সত্যটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় যে—এই বৃত্ত থেকে বের হওয়া অসম্ভব। এই উপলব্ধি তাকে আরও গভীর অবসাদ ও হতাশার দিকে ঠেলে দেয়। এই মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন মানুষের মস্তিষ্কের জন্য অত্যন্ত ক্লান্তিকর। মানুষ তার প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধ শেষে আর নতুন কোনো মানসিক ক্লান্তি বা জটিলতা নিজের কাঁধে নিতে চায় না। এই আত্মিক ক্লান্তি ও নিজের অক্ষমতার গ্লানি থেকে নিজেকে বাঁচানোর এক সহজাত ও অবচেতন প্রয়াস হিসেবেই, ব্যর্থতার বৃত্তে থাকা মানুষগুলো অন্য কোনো ব্যর্থতার গল্প শুনতে এক চরম অনাগ্রহ ও উদাসীনতা দেখায়।
​পরিশেষে বলা যায়, ব্যর্থতার গল্প কোনো সংক্রামক ব্যাধি না হলেও মানুষের মনে তা এক ধরণের স্থবিরতা ও গতিহীনতার জন্ম দেয়। মানুষ স্বভাবগতভাবেই আশাবাদী, প্রগতিশীল এবং আলোমুখী এক জীব। অন্ধকারের নিজস্ব কোনো আকর্ষণ নেই, অন্ধকারের একমাত্র উপযোগিতা হলো আলোর গুরুত্বকে বাড়িয়ে দেওয়া। তাই ব্যর্থতার বৃত্তে বন্দী থাকা মানুষগুলো নিজেদের চারপাশের জমাটবদ্ধ অন্ধকারকে ভুলে থাকার জন্যই অন্য কোনো অন্ধকারের গল্প শুনতে চায় না। তারা নিজেদের অক্ষমতাকে আড়াল করতে, নিজের ভেতরের ক্ষতকে ঢাকতে এবং বেঁচে থাকার ন্যূনতম রসদ জোগাতে চাতক পাখির মতো সবসময় সফলতার মরিচীকার দিকেই চেয়ে থাকে। যদিও সেই দূরবর্তী আলো হয়তো তাদের নিজেদের জীবনের অন্ধকারকে এক বিন্দুও স্পর্শ করতে পারে না, তবুও সেই মিথ্যে আলোর দিকে চেয়ে থাকাটাই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়। এটাই মানুষের মনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি এবং সবচেয়ে বড় সত্য।

Comments

    Please login to post comment. Login