Posts

প্রবন্ধ

শিকড় ছেঁড়ার আর্তনাদ: ভাঙনের মুখে আমাদের সমাজ

June 1, 2026

তাহসিন আরিফ হিমেল (INNOVA JOURNAL)

Original Author তাহসিন আরিফ হিমেল

20
View

ভেতর থেকে ভেঙে যাচ্ছে সমাজ


​আমাদের যূথবদ্ধ যাপনের চিরচেনা সমাজটা আজ এক গভীর ও অদৃশ্য সংকটের চোরাবালিতে নিমজ্জিত। প্রতিটি চেনা আঙিনায়, প্রতিটি চেনা পরিবারে কান পাতলেই এখন শোনা যায় এক অদ্ভুত টানাপোড়েনের দীর্ঘশ্বাস। বাইরে যে হাসির ঝিলিক আমরা দেখি, তার অনেকটাই আজ মেকি, মুখোশের মতো কৃত্রিম। সেই মুখোশের আড়ালে প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত হচ্ছে আমাদের আজন্মলালিত রক্তের সম্পর্কগুলো। ভেতরে ভেতরে আমাদের সামাজিক কাঠামোটা আজ এমনভাবে ক্ষয়ে যাচ্ছে, ঠিক যেন অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত কোনো জরাজীর্ণ হাড়—যা বাইরে থেকে আস্ত দেখালেও ভেতরে একমুঠো গুঁড়ো ধূলিকণা মাত্র। যে ছেলেটি একসময় মায়ের হাতের পরম মমতার গ্রাস ছাড়া খেতেই পারত না, সময়ের নিষ্ঠুর আবর্তে সে আজ বুড়ো মায়ের দিকে একটু ফিরে তাকানোর সময়টুকুও হারিয়ে ফেলেছে। বউ-শাশুড়ির চিরায়ত মধুর ও মান-অভিমানের সম্পর্কগুলো আজ রূপ নিয়েছে শীতল যুদ্ধে।
​সবচেয়ে বড় আঘাতটা লেগেছে আমাদের আগামী প্রজন্মের গায়ে। যে আদরের মেয়েটিকে বাজিধরা স্বপ্ন নিয়ে বাবা-মা উচ্চশিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে পাঠিয়েছিলেন, আজ তার আঙুলের ডগায় জ্বলছে নিকোটিনের আগুন! বন্ধুদের জমজমাট আড্ডায় কিংবা কৃত্রিম আলোর পার্টিতে অনায়াসে হাত উঠছে মারণ নেশার গ্লাসে। আমাদের অপার সম্ভাবনাময় মেধাবী তরুণ-তরুণীরা আজ বুঁদ হয়ে থাকছে মাদকের নীল বিষে, সর্বগ্রাসী অনলাইন জুয়ায় কিংবা আরও কোনো অন্ধকার অতল গহ্বরে। বিশ্বাসের ভিন্নতা পেরিয়ে সমাজ-সংসারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ঘর ছাড়ছে সন্তান, আর অভিমানে, অপমানে, অসহায়ত্বে বাবা-মা হারিয়ে ফেলছেন অবাধ্য সন্তানকে একটু শাসন করার আদিম অধিকারটুকুও।
​অন্যদিকে, আমাদের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের গল্পগুলো আরও করুণ, আরও রক্তাক্ত। যে যুবকটি সংসারের মুখে একটু সচ্ছলতার হাসি ফোটাতে চড়া সুদে ঋণ করে স্বপ্নের প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিল, তার নিথর দেহটা কখনো ভেসে উঠছে ভূমধ্যসাগরের নোনা জলে, কখনো বা পচে গলে যাচ্ছে কোনো গহিন অরণ্যের অন্ধকারে। নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হচ্ছে তার পরিবার। আবার যাঁরা বুকভরা আশা নিয়ে দেশে ফিরে আসেন, তাঁরা এসে দেখেন ততদিনে ওলটপালট হয়ে গেছে তাঁদের চেনা পৃথিবী। কেউ হারিয়েছেন জন্মদাতা পিতাকে, কেউবা গর্ভধারিণী মাকে। এমনকি এমন নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখিও হতে হচ্ছে—যেখানে প্রবাসের কষ্টের টাকা নিয়ে বিশ্বস্ততার বুক চিরে অন্যের হাত ধরে পালিয়ে গেছে নিজেরই সহধার্মিণী।
​উচ্চশিক্ষিত ও কর্মজীবী নারীদের অন্দরমহলেও আজ সংকটের অন্ত নেই। একদিকে ক্যারিয়ারের তীব্র প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে ফার্টিলিটির জটিল সমস্যা কিংবা প্রিয় সন্তানকে একটু নিরাপদে আগলে রাখার তীব্র দুশ্চিন্তা। ফলে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে ডিভোর্সের সংখ্যা, মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ছে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের বিষবাষ্প। ছায়া ছড়াচ্ছে লিভ-ইন রিলেশনশিপের মতো অপসংস্কৃতি। আমাদের যান্ত্রিক হাত আর চোখের সামনে থাকা ওই পাঁচ ইঞ্চির মোবাইল স্ক্রিন তথা ভার্চুয়াল জীবন তিলে তিলে গ্রাস করে নিচ্ছে আমাদের রক্ত-মাংসের বাস্তব জীবনকে। কেউ আর কারও মঙ্গল कामना করে না; পরম সুহৃদ, প্রিয় বন্ধুটি আজ স্রেফ স্বার্থের দ্বন্দ্বে পরিণত হচ্ছে চরম শত্রুতে। এরই সাথে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অল্প সময়ে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার উন্মাদ প্রতিযোগিতা, তীব্র বেকারত্ব আর অবদমিত হতাশা। যার অনিবার্য পরিণতি—নিত্যদিনের মারামারি, হানাহানি আর খুনাখুনি। কাউকে পৈশাচিক কায়দায় গলা কেটে হত্যা করা হচ্ছে, কেউবা সহ্য করতে না পেরে বেছে নিচ্ছেন আত্মহননের পথ। নিষ্পাপ শিশু রামিসাকে গলা কেটে হত্যার সেই নৃশংস ঘটনা আমাদের সামগ্রিক বিবেককে এক নিমিষে স্তব্ধ ও শোকাহত করে দিয়েছিল। সবচেয়ে ভয়ের কথা, যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকেরা একসময় শিক্ষার্থীদের জন্য ছিলেন নিরাপদ, পিতৃতুল্য ছায়া—আজ তাঁরাও সেই শ্রদ্ধার আসন ধরে রাখতে পারছেন না। রাষ্ট্র থেকে শুরু করে পরিবার—কোথাও যেন আজ কোনো আদর্শ নেই, নেই কোনো নৈতিক मूल्यবোধের বাতিঘর।
​অথচ ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থাকে সবসময়ই একটি রক্ষণশীল সমাজ হিসেবে চিনে এসেছে বিশ্ব। এর পেছনে রয়েছে হাজার বছরের দীর্ঘ সামাজিক বিবর্তন, ধর্মীয় চেতনা, অর্থনৈতিক কাঠামো এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট। কৃষিভিত্তিক প্রাচীন বাংলায় মানুষের জীবন আবর্তিত হতো জমি, পরিবার আর ধর্মীয় আচারকে কেন্দ্র করে। সেখানে স্থিতিশীলতা ও সামাজিক শৃঙ্খলা ছিল বেঁচে থাকার প্রধান শর্ত। ফলে মানুষ পরিবর্তনের চেয়ে প্রচলিত রীতিনীতি ও প্রথা অনুসরণ করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত। পরিবার ছিল সমাজের প্রাণকেন্দ্র; যেখানে বয়োজ্যেষ্ঠদের সিদ্ধান্ত মেনে চলা, পারিবারিক সম্মান রক্ষা এবং সামাজিক মর্যাদা বজায় রাখাকে পরম পবিত্র মনে করা হতো।
​মধ্যযুগে মুসলিম শাসনের বিস্তারের সাথে সাথে এ দেশের মানুষের যাপনে ইসলামি সংস্কৃতির গভীর প্রভাব পড়ে, যার পাশাপাশি সনাতন সম্প্রদায়ের বর্ণভিত্তিক রীতিনীতিও সমান্তরালে বিদ্যমান ছিল। পোশাক-আশাক, নারী-পুরুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, বিয়ে, উৎসব কিংবা পারিবারিক সিদ্ধান্ত—সবকিছুতেই ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসন হয়ে ওঠে প্রধান নিয়ামক। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে পাশ্চাত্য শিক্ষা আর আধুনিক চিন্তার ঢেউ এলেও তা মূলত শহরের ক্ষুদ্র এক মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল; গ্রামীণ বৃহৎ জনগোষ্ঠী তখনো তাদের ঐতিহ্যনির্ভর জীবনধারাতেই অভ্যস্ত ছিল। ১৯৪৭-এর দেশভাগ এবং পরবর্তী পাকিস্তানি শাসনামলে রাজনৈতিক প্রয়োজনে ধর্মীয় পরিচয়কে বারবার সামনে আনা হয়, যা সমাজমানসকে আরও কিছুটা রক্ষণশীল করে তোলে।
​১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হলেও, সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও পারিবারিক রক্ষণশীলতার শিকড়টি ছিঁড়ে যায়নি। স্বাধীনতার পর গত কয়েক দশকে দ্রুত নগরায়ণ হয়েছে, শিক্ষার আলো ছড়িয়েছে, নারীরা ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে কর্মক্ষেত্রে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখছেন এবং বিশ্বায়নের অবারিত হাওয়া এসে লেগেছে আমাদের অন্দরে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আজ ব্যক্তিস্বাধীনতা, অধিকার সচেতনতা আর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে মেনে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়েছে—এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।
​কিন্তু ঠিক এই জায়গাতেই তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতা। একদিকে আধুনিক ও বৈশ্বিক হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে লোকলজ্জা, সামাজিক ভীতি, ধর্মীয় আবেগ আর হাজার বছরের ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরার প্রবল প্রবণতা। মূলত অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার কারণেই এ দেশের মানুষ বারবার পরিবার আর ধর্মকে তাদের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিয়েছে। কারণ, প্রচলিত মূল্যবোধ থেকে সামান্য বিচ্যুতিও এখানে চরম সামাজিক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
​তবে এই রক্ষণশীলতা কোনো স্থবির পাথর নয়। সময় বদলে যাচ্ছে, বদলাচ্ছে মানুষের চিন্তার ধরণও। আজকের এই চরম নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয় আসলে ঐতিহ্য আর আধুনিকতার এক অন্ধ ও লক্ষ্যহীন সংঘর্ষের ফল। সমাজ যদি এই ভাঙন থেকে বাঁচতে চায়, তবে আধুনিকতার নামে সমস্ত অপসংস্কৃতিকে অন্ধ অনুকরণ করা বন্ধ করতে হবে; একই সাথে রক্ষণশীলতার নামে গোঁড়ামিকে বিসর্জন দিতে হবে। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে একটি সুস্থ, সুন্দর ও প্রগতিশীল সমন্বয় তৈরি করতে না পারলে, আমাদের এই সমাজকে ভেতর থেকে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া থেকে কোনোভাবেই রক্ষা করা যাবে না।

Comments

    Please login to post comment. Login