সেই সময়টা কেমন ছিল তা একটু বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করি। পঁচিশ ত্রিশ বছরের আগের কথা তো, দুয়েকটা অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ যেতে পারে, আবার বর্তমান সময়ের দুয়েকটা চিহ্ন বর্ণনায় ঢুকেও যেতে পারে। শত হলেও মানুষের মন তো! আপনারা ঠিকই বুঝে নিবেন, বুঝে যাবেন।
তখন বেশ কিছু বিশ্বখ্যাত বহুজাতিক কোম্পানি বাংলাদেশে কাজ করা শুরু করেছে, দেশীয় বেশ কয়েকটা কোম্পানি ‘জায়ান্ট’দের তালিকায় ইতোমধ্যে ঢুকে পড়েছে। আরও কিছু কোম্পানি তালিকায় ঢুকব, ঢুকব করছে। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোরও কোনো কোনোটি রাজনীতির মাঠে ‘বউছি’ খেলতে এই ঢুকে পড়ল আর কী এমন একটা আবহ দেখাচ্ছে, কখনো কখনো একেবারে অভ্যন্তরীণ বিষয়েও সরব হয়ে যাচ্ছে, প্রায়ই তাদের কান্ট্রি ডিরেক্টর জাতীয় কর্তা ব্যক্তিরা পুরো দেশের কাছে পরিচিতি পেয়ে যাচ্ছেন। দুয়েকটা পত্রিকা বেশ সুদূরপ্রসারী প্রভাব রাখার প্রতিশ্রুতি দেখাচ্ছে, যোগ্যতার মাত্রা অনুযায়ী কাউকে স্বল্পমেয়াদী, কাউকে দীর্ঘমেয়াদী নায়ক তৈরি করার কারখানা স্থাপন করার অবকাঠামো নির্মাণের কাজটা প্রায় গুছিয়ে এনেছে। বহু কোম্পানির চেয়ারম্যান, এমডি, সিইও-র নামধাম, স্বভাব, চরিত্র আমাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা বা প্রয়োজনের তোয়াক্কা না করে মস্তিষ্কের কোষে কোষে ঢুকে পড়ছে। কোন কোম্পানির সিইও আমাদের কোন কোন জাতীয় ইভেন্টের স্পন্সর হওয়ার চেষ্টা করছে, আবার চেষ্টা করতে গিয়ে কোথায় কোথায় প্রতিরোধের সম্মুক্ষীণ হচ্ছে তাও এমনি এমনি আমাদের কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায় ছাড়াই জ্ঞানের আওতায় চলে আসছে।
এমনই এক সময়ে আমাদের আড্ডার পুরোনো বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য রেজা ভাই মাস চারেকের জন্য কানাডা থেকে দেশে এলেন। তিন বছর আগে দেশ ছেড়েছিলেন। তারপর বড় একটা ডিগ্রী (ডিগ্রীর নামটা আমার দুর্বল স্মরণশক্তি ধরে রাখতে পারেনি) এবং বিশেষজ্ঞের সমান দক্ষতা ও জ্ঞান নিয়ে ফিরে এসেছেন। পুরোনো বন্ধুদের সাথে দেদারসে আড্ডা দিচ্ছেন। সেদিনও চা সিগারেটের অফুরান সরবরাহ আর বিষয়ের লাগামছাড়া ছুটোছুটির মধ্যে আড্ডা হচ্ছিল, আড্ডার একপাশে শাহেদ আর বনি ছোট্ট একটা টুলে দাবার বোর্ড বসিয়ে দাবা খেলে যাচ্ছিল। খেলার ফাঁকে ফাঁকে তারাও মাঝে মাঝে আলোচনায় যোগ দিচ্ছিল, আমাদের আবার কেউ কেউ দাবার চাল মুখে মুখে বলে যাচ্ছিল। এক পর্যায়ে আমি আর রেজা ভাই হয়ে গেলাম মুখোমুখি। রেজা ভাই দাবার প্রতি তীব্র অনুরাগ স্বত্ত্বেও খুব যে তুখোড় খেলোয়ার ছিলেন এমন না। দেশ ছাড়ার আগের দিনগুলোতে তিনি আমার কাছে প্রায়ই হারতেন। অনেকদিন পর মুখোমুখি বসে তিন চারটি চাল দেওয়ার পরই বুঝে ফেললাম রেজা ভাই আর আগের সেই রেজা ভাই নেই। অনেক পাকা খেলোয়ার বনে গেছেন। টিকে থাকতে হলে আমার সবটুকু দিতে হবে।
এক পর্যায়ে খুব বুদ্ধি খাটিয়ে একটা কঠিন চাল দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার চেষ্টা করতে করতেই রেজা ভাই পাল্টা এমন একটা চাল দিলেন যেটা দেখে আমার খুব ভালো করেই বোঝা হয়ে গেল যে, তিনি আগেই আমার চালটা অনুমান করতে পেরেছিলেন। চারপাশে কথাবার্তা, হাসিঠাট্টা, কৌতুক সবই যথারীতি চলছিল, আমরাও চাল দিতে দিতে সেগুলোতে অংশগ্রহণ করছিলাম। কিন্তু রেজা ভাইয়ের শেষ চালটার পর আমি খেলার অনেক গভীরে ডুবে গেলাম, চারপাশের কথাবার্তা, শব্দগুলো যেন অনেকখানি মিইয়ে গেল। এক পর্যায়ে রেজা ভাই কী কারণে যেন তার মামা খন্দকার আবুল মোমেনের কথা উঠালেন। খন্দকার আবুল মোমেন তখন সদ্যস্বীকৃতিপ্রাপ্ত ‘জায়ান্ট’দের একজন বলে বিবেচিত। দেড় বছর আগে চাকরিতে ঢুকে ইতোমধ্যে মেরুদণ্ডে প্রনতির বাঁক ধরে যাওয়া একজন সামান্য লোক যেই আমি- সেই আমার কানে খন্দকার আবুল মোমেনের নামটা বহুগুণ বিবর্ধিত হয়ে বাজল। খেলায় দেওয়া মনোযোগ একটু শিথিল হলো, আর রেজা ভাইয়ের মুখে নামটা আরো দুয়েকবার উচ্চারিত হওয়াতে খন্দকার আবুল মোমেন প্রকট থেকে প্রকটতর হতে লাগলেন।
রেজা ভাই সমাজের উঁচু স্তরের মানুষ। তিনি, তার পরিবারের সবাই আজ এদেশে, কাল ওই দেশে যাচ্ছেন, আসছেন, এখানে বিনিয়োগ করছেন, ওখানে ধরা খাচ্ছেন- এমনই সব ঘটনা, কথাবার্তা, আবহাওয়া তার বা তাদের চারপাশ জুড়ে ঘিরে থাকে। দেশের ভেতরে বা বাইরে যেখানেই তারা যান না কেন, এয়ারপোর্ট, স্টেশন বা বন্দর তুলে নেওয়ার লোকের কখনোই অভাব হয় না, কেউ না কেউ আগে থেকেই অপেক্ষা করতে থাকে, পৃথিবীর কোনো জায়গা বা দেশই তাদের পরিচিতির চৌহদ্দির বাইরে নয়। এগুলো সবই তার সাথে আড্ডার তালে তালে উঠে আসে- শ্রোতারা একটু গভীরভাবে ভাবলে এমনই সিদ্ধান্ত, অনুসিদ্ধান্ত বা উপসংহারে পৌঁছুবে বলে আমার ধারণা; কারণ রেজা ভাই যে কখনোই জাঁক করার জন্য বা নিজেকে উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করার জন্য এমনটা বলেন- আমি মনে করি না, আড্ডার অন্য সদস্যরাও না। তার কক্ষপথে বা আড্ডায় আমার কখনোই ঢুকে পড়ার কথা ছিল না, কেমন করে যেন ছড়াতে ছড়াতে, স্রোতে ভাসতে ভাসতে তার পরিচিতির বলয়ে……………
খেলার কথায় ফিরে আসি। আমি আমার মনোযোগ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছি তখন রেজা ভাই খন্দকার আবুল মোমেনের সাথে তার অফিসে আগের দিনের সাক্ষাতের প্রসঙ্গে চলে এসেছেন। তার সাথে কথা বলার এক পর্যায়ে এক জিএমের রুমে প্রবেশ এবং তারপর জিএমের সাথে কথোপকথনের একটা অংশ আমার মস্তিষ্কে বেশ বড় একটা আঘাত করে। খন্দকার আবুল মোমেন জিএমকে ঢাকার বাইরের একটা প্রকল্পের ব্যাপারে জিগ্যেস করেছিলেন এবং জিএম সেখানকার এক এডিসির কথা উঠিয়ে বলেন যে, ‘আমি হিন্টস দিয়েছিলাম কিন্তু কাজ হয়নি। সবাই বলছে উনাকে কেনা যায় না।’
রেজা ভাই খন্দকার আবুল মোমেনের পরের কথাটা বললেন খুবই হাল্কা স্বরে, ‘ধেৎ, এমন কেউ আছে নাকি! তুমি ঠিকভাবে বলতে পারোনি। কাল ঠিকভাবে বলবে।’
আমার মনে এক তিল সন্দেহের উদ্রেক হয়নি যে, রেজা ভাই কথাটাতে কোনো বিন্দু, দাঁড়ি, কমা যোগ করেছেন। খন্দকার আবুল মোমেন যে কথাটা বলেছেন ঠিক সেটাই এবং যেভাবে, যে ভঙ্গিমায় ঠিক সেভাবেই------ মাথাটা একটু একপাশে নাড়িয়ে এবং কিছুটা হেলিয়েও।
হাত বাড়িয়ে চাল দিতে গেয়েও আমি থেমে গিয়েছিলাম। আমি দাবার বোর্ড ছেড়ে চোখ তুলে খুব গভীরভাবে রেজা ভাইয়ের মুখের দিকে তাকালাম। কতক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম তা মনে নেই, সময়টা শোভনতার সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল কি না তাও মনে নেই। আমার চারপাশের সমস্ত শব্দ, চায়ের কাপের টুং টাং, হাঁকডাক, আড্ডার হাসিঠাট্টা, তর্কাতর্কি সব ডুবে গিয়েছিল যেন, আর চতুর্দিক থেকে অন্ধকার এসে আমাকে ঘিরে ধরেছিল। আমি আছি কি নেই সেই বোধও ছিল না; শুধু দেওয়ালের সাথে লাগানো বাল্বের আলোয় আলোকিত ছোট্ট একটু জায়গা, সেখানে রেজা ভাই অনেকটা বিবর্ধিত ও প্রকটিত মুখ নিয়ে বসে আছেন, তার সামনে বুক খুলে দেওয়া খোপ খোপ জায়গায় ঘুটি বসানো একটা সাদা-কালোয় ভরা দাবার বোর্ড……… আর কিছু নেই।
আমি খন্দকার আবুল মোমেনকে সামনাসামনি দেখিনি, দেখা হওয়ার সুযোগও কখনো হবে কি না জানা নেই; কিন্তু আমার মনে হলো রেজা ভাইয়ের মুখটাতেই সামান্য একটু বার্ধক্যসূচক বাড়তি শিথিল মাংস বসিয়ে, জুলফি বা চুলে একটু রং লাগিয়ে শুভ্রতার ছাপ লাগিয়ে, মুখের ভাঁজগুলোর সংখ্যা বাড়িয়ে একটু স্ফীত করে দিলেই ঠিক খন্দকার আবুল মোমেনকে পাওয়া যাবে। হঠাৎ আমার একটা মুহূর্তিক বিভ্রমও হলো- সাদা-কালোয় ভরা বোর্ডের ওপাশে যিনি বসে আছেন তিনি খন্দকার আবুল মোমেনই; আর কেউ নয়; মাথাটা কেবল একপাশে সামান্য একটু হেলানো।
বাকি সময়টাতে আমি আর খেলায় মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে পারিনি, হঠাৎ হঠাৎ মুহূর্তের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এক ভগ্নাংশের জন্য সেই বিভ্রমটা ঝিলিক দিয়ে উঠে সবকিছু আচ্ছন্ন করে দিচ্ছিল, বোর্ডের ওপাশে খন্দকার আবুল মোমেন। আমি উঠে রেজা ভাইকে বললাম, ‘আমি আর পারছি না। মাথা কাজ করছে না।’
রেজা ভাই হো হো করে হেসে উঠে আড্ডার আর সবার দৃষ্টি কেড়ে নিয়ে বেশ জোরে জোরে বলতে লাগলেন, ‘বারবার ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান/ এইবার এইবার তোমার বধিব যে প্রাণ। হুঁ, হুঁ, আগে পাঁচটা খেললে চারটাতে হার, এখন বোঝো……’
আমি আর সেখানে বেশিক্ষণ থাকিনি, রেজা ভাইসহ সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসার পথ ধরলাম। বাসে, টেম্পোতে করে বাসায় আসতে আসতে যখনই একটু চোখ বন্ধ হচ্ছিল, ভেসে উঠছিল একটা দাবা বোর্ড, ওপাশে রেজা ভাইয়ের মতোই কিন্তু আরো স্পষ্ট, আরো উজ্জ্বল, আরো প্রকট একটা মুখ……মাথাটা একটু নেড়ে একপাশে সামান্য হেলিয়ে দিয়েছে………
সেই দিন বাসায় এসে খেলাম, অনেক রাত অবধি টেলিভিশন দেখে ঘুমোতে গেলাম, পরদিন ঘুম থেকে উঠে বাসে, টেম্পোতে করে অফিসে গেলাম, বাকি দিনগুলোতেও যেতে লাগলাম, প্রয়োজনের দিনগুলোতে বাজার করলাম, ঈদের ছুটিতে বাক্স-পেটরা টেনে লঞ্চে তুলে গণমাধ্যমে বহুল বিজ্ঞাপিত ও প্রচারিত ‘নাড়ির টান’ অনুভব করে বাড়িতে গেলাম, প্রিয় মানুষগুলোর সাথে কিছুদিন কাটালাম, তারপর আবার শহরে ফিরে এলাম, কেবলই এলাম, কেবলই গেলাম। মাঝেমধ্যে নিজের খোলনলচে বদলে ভিন্ন একটা মানুষ হওয়ার প্রাণপণ চেষ্টাও করলাম, তারপর যে মানুষটি ছিলাম সেই আমিই হয়ে গেলাম আবার; এভাবে বারবার।
যেখানেই গেছি, যখনই ভিড়ের মধ্যে ঢুকে যেতে পেরেছি, মানুষের মুখের দিকে তাকিয়েছি- কখনো স্পষ্টভাবে, সামনাসামনি চোখে চোখ রেখে, কখনো আড়চোখে, কখনো নমিত চোখ অনেক শক্তি দিয়ে উপরে তুলে কিংবা চোরা চাহনি দিয়ে…………, খুঁজেছি, কেবলই খুঁজেছি, এই পঁচিশ ত্রিশ বছর ধরেই………। ওই দাবাবোর্ডের এপাশে কেউ একজন এসে বসবে, ভেবে চিন্তে ঘুঁটি চালবে……… অনেক অনেক ক্ষণ খেলা চালানোর পর শেষ চালটা চেলে খুব কাঁপা কাঁপা গলায়, কপালের ঘাম মুছতে মুছতে, আত্মবিশ্বাস আছে কি না টেরও পাওয়া যাবে না এমনভাবে বলবে, ‘কিস্তিমাত, স্যার!’ (সমাপ্ত)