Posts

সমালোচনা

গলির মোড়ে বিশ্ববিদ্যালয় চাই

June 12, 2026

ভোঁতা পেন্সিল

4
View

বিশ্ববিদ্যালয় শব্দের সাথে রীতিমত অন্যায় করা হচ্ছে বাংলাদেশে! 

ল্যাটিন শব্দ Universus থেকে Universitas শব্দের উৎপত্তি, যার আক্ষরিক অর্থ "সমগ্র" বা "সবকিছুর সমষ্টি", যা একত্রিত হয়ে কোনো সংঘ বা কর্পোরেশন গঠন করা নির্দেশ করে। মধ্যযুগে এই শব্দটি মূলত "শিক্ষক এবং পণ্ডিতদের একটি সংঘ" বা "সম্প্রদায়" বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। ইংরেজিতে একে University বলা হয়। বাংলায় 'বিশ্ব' (Universe) এবং 'বিদ্যালয়' (School/Institution)—এই দুই শব্দের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। অর্থাৎ, যেখানে সব ধরনের বিশ্বজনীন জ্ঞানের চর্চা ও শিক্ষা প্রদান করা হয়। [১]


 

আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয় একপ্রকার ফ্যান্টাসিতে পরিণত হয়েছে। সব জেলার মানুষ দাবি করে "আমাদের জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় চাই।" সরকারও দিব্যি ভালো ছেলের মত সবার দাবি-দাওয়া মেনে নেয়। এক প্রকার বলতে গেলে মামা বাড়ির আবদারে পরিণত হয়েছে এটা। কিন্তু নামের সাথে কাজের মিল নেই কোথাও। সাংবাদিক সাইফুল সামিনের ভাষ্যে-

" বিদ্যায়তন বা উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লাতিন ইউনিভার্সিতাস শব্দের ন্যূনতম যোগসূত্রও ছিল না। ইউনিভার্সিতাস শব্দের মূল অর্থ একত্রকরণ, সংঘ, সমিতি বা গিল্ড ছিল। মধ্যযুগে নাপিত থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশাজীবীর সংঘ বা গিল্ড লাতিনে ইউনিভার্সিতাস নামে অভিহিত হতো। লাতিনে করপোরেশন, মিউনিসিপ্যালিটিকেও ইউনিভার্সিতাস বলা হতো।" [২]

আমাদের দেশেও তাই হচ্ছে, কিছু একটার সংঘ দাঁড় করিয়ে নাম দিয়ে দিচ্ছি University। 


 

পশ্চিমের চিত্র দেখা যায় এক্ষেত্রে একদম ভিন্ন।  আমেরিকার MIT ( Massachusetts Institute of Technology ) এর কথাই ধরুন। এটির নাম বিশ্ববিদ্যালয় নয়। কিংবা যুক্তরাজ্যের LSE ( London School of Economics and Political Science ) বা Imperial College এর কথা ই বা কেনো বাদ যাবে! অথবা আমাদের উপমহাদেশের IIT ( Indian Institutes of Technology ) এর প্রসঙ্গ টেনে আনুন। যা উপমহাদেশের প্রযুক্তি শিক্ষায় এক নীরব বিপ্লব। শুধু তাই নয়, এর বিভিন্ন শাখা বিশ্বকে উপহার দিয়েছে নামকরা সব প্রযুক্তিবিদ ও প্রকৌশলী। 

ভারতে কেন্দ্রীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫৬টি। [৩]

সেখানে আমাদের দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫৮ টি। প্রশ্ন হলো, আমাদের কি আসলেই এত বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন আছে ? যেখানে ভারতের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং বয়কট করা স্বত্তেও তাদের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ব র‍্যাংকিং এ সেরা ২০০ তে অবস্থান করে। এবং এশিয়াতে ডমিনেট করে। অন্যদিকে বাংলাদেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঢাবি বা বুয়েট কিংবা এনএসইউ থাকে ৬০০-১৫০০ রেঞ্জের মধ্যে। [৪]



 

আমাদের কেনো যেন কলেজ ও স্কুল নামে একটু অ্যালার্জি আছে বোধহয়! তাই, আমাদের দেশে কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রুপান্তরের দাবি, যত্রতত্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি হরহামেশা দেখা যায়। কিন্তু, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেখা যায় যে বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় বলে তেমন কিছু পাওয়া মুশকিল আমাদের উপমহাদেশ ছাড়া। তারা সেগুলোকে কলেজ, স্কুল কিংবা ইন্সটিটিউট নাম দেয়। তবে, সেগুলোকে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা দেয়। আন্তর্জাতিক প্রাঙ্গনে যতগুলো এমন বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় আছে, আমাদের দেশে অন্য যেকোনো সমতুল্য দেশের চেয়ে তা বেশি ।

আমরা একদিকে নাম দিচ্ছি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আবার সেখানে পড়াচ্ছি কলা ও সোশ্যাল সায়েন্সের বিভিন্ন বিষয়। এমন ভৌতিক কাজ বোধহয় অন্য কোথাও খুজে পাওয়া দূরহ। আবার, যেগুলো শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নামে আছে তাদের পড়ানোর গণ্ডি আবার খুবই সীমিত।



 

অন্য দেশে যখন বিশেষায়িত বিভাগ তৈরি করা হয় আমাদের দেশে তখন বিশেষায়িত বিভাগের পরিবর্তে বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা হয়। পরে সেখানে পড়ানো হয় মান্ধাতা আমলের সব পুরনো মোটা-বেটে বিষয়। যেখানে নেই কোনো আধুনিক জ্ঞান। নেই গবেষণার বালাই। সেখানে আছে বিসিএস ক্যাডার বানানোর মেশিন। শেখানো হয় সরকারি চাকরি পাওয়ার ১০২ টি উপায়। 

অন্যান্য দেশ যখন একটি মৌলিক বিষয় পড়ানোর পাশাপাশি তার বিশেষায়িত অনেক বিষয়ও পড়ানো হয়, আমাদের দেশ তখন আটকে আছে মোটা-বেটে মৌলিক বিষয়ে। অর্থাৎ, তারা যেসব বিষয়ে ৩ বা ৪ বছরের স্নাতক করে আমরা সেই বিষয়ে ১ বা দেড় বছরের স্নাতকোত্তর করি। জ্ঞানের তফাত এখানে। আপনি স্নাতকে চার বছর যে বিষয় পড়লেন আমি সেটি এক বছরের পড়লে আমার আর আপনার জ্ঞানের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান হবে এটাই স্বাভাবিক। অথচ, এই সময়টাই হলো স্পেশালাইজেশনের সময়। সব বিষয়ে কিছু কিছু জ্ঞান অর্জন না করে এক/ দুই বিষয়ে ভালো জ্ঞান অর্জন করে প্রত্যেক ফিল্ডের স্পেশালিস্টের সাথে কোলাবোরেশনের মাধ্যমে বেস্ট আউটপুট আনার সময় এটা। কিন্তু, আমাদের মোটা মাথায় তা আর ধরে কবে! 


 

এছাড়া, অন্যান্যরা যখন দুই বা তিনটি ডিসিপ্লিনের মধ্যে ফিউশনের মাধ্যমে আন্তঃবিভাগীয় জ্ঞানের সমন্বয় করছে, আমরা তখনও আটকে আছি সেই মোটা-বেটে ডিসিপ্লিনে। আর শিক্ষা নিয়ে আমাদের অবহেলা আর সংস্কারের নামে নানান রকম কাটাছেড়া আর ভুলভাল এক্সপেরিমেন্টের কথা না হয় বাদ ই দিলাম। আমাদের পাশের দেশ ভারত; যেখানে নামকরা সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আজ সগর্বে বিশ্ব দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। অবশ্যই আমাদেরও এমন অনেক গুণিজন আছে । তবে, তা তুলনামুলক হারে হতাশাজনক। 


 

আমাদের দেশে শিক্ষা সংস্কার মানে বড় বড় দালান কোটা আর অবকাঠামো উন্নয়ন। অথচ ভাঙ্গা টিনের ঘরে ক্লাস করে কত গুণিজন জন্ম নিয়েছে এ ভূমি থেকে! অবকাঠামো উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেটা কি শিক্ষা সংস্কারে কোনো ভূমিকা রাখে কি না সে প্রশ্ন আগে তোলা জরুরি। শিক্ষার দুটি আবশ্যিক উপাদান হলো শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। আমাদের দেশে প্রথম উপাদানটি অর্থাৎ আমাদের জাতি গড়ার কারিগর শিক্ষকদের সংস্কার ও উন্নয়নে কতটুকু প্রচেষ্টা আছে ?


 

আমাদের দেশে শিক্ষকদের গুণগতে মান বিবেচনায় দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে।[৫]

৫ অক্টোবর ২০২৫ দৈনিক বণিক বার্তা`র  '' দেশে শিক্ষা ও শিক্ষকের মান দুটোই নিম্নমুখী''  শিরোনামের প্রতিবেদনে নজর দিলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি করুণ চিত্র দেখা যায়। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) এর বরাতে বলা হয়েছে যে, '' সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সরকারি-বেসরকারি বিদ্যালয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষকই আধুনিক শিক্ষণপদ্ধতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে এসব সমস্যা আরো প্রকট। '' অর্থাৎ সমস্যার শেকড়ের দিক এটা। একই প্রতিবেদনে নেত্রকোনার এক স্কুল শিক্ষক সারোয়ার আলম সাহেবের কথায় উঠে এসেছে এ সমস্যার কারণ, তিনি বলেন,  ‘শিক্ষক হয়েছি দেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে, কিন্তু এখন মনে হয় নিজের সংসারই গড়তে পারব না।’  আমাদের সমস্যাটা এখানে। মোতাহের হোসেন চৌধুরী এ ব্যাপারে দৃষ্টিপাত করেছেন বহু আগে। তার শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব প্রবন্ধে। 

দৈনিক বণিক বার্তা'র একই প্রতিবেদনের কিছু অংশ হুবহু তুলে ধরছি-


 

'' শিক্ষার্থীদের অর্জিত দক্ষতার স্তর নির্ণয়ে তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের বাংলা ও গাণিতিক দক্ষতার ওপর নির্ভর করে দুই বছর পরপর জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ এ প্রতিবেদন তৈরি করে। সর্বশেষ ২০২২ সালে হওয়া প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫১ শতাংশ বাংলায় ও ৩৯ শতাংশ গণিতে শ্রেণী বিবেচনায় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় দক্ষতা অর্জন করেছে। পঞ্চম শ্রেণীর ক্ষেত্রে বাংলায় এ হার ৫০ ও গণিতে ৩০ শতাংশ।

অথচ ২০১১ সালের প্রতিবেদনের তথ্যমতে, সেবার তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬৭ শতাংশ বাংলায় ও ৫০ শতাংশ গণিতে শ্রেণী অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় দক্ষতা অর্জন করেছিল। আর পঞ্চম শ্রেণীর ক্ষেত্রে বাংলায় এ হার ছিল ২৫ আর গণিতে ৩৩ শতাংশ। সে অনুযায়ী প্রায় এক যুগে শ্রেণী বিবেচনায় কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জনের দিক থেকে তৃতীয় শ্রেণীতে বাংলায় এ হার কমেছে ১৬ শতাংশীয় পয়েন্ট। গণিতের ক্ষেত্রে পারফরম্যান্সে অবনতির মাত্রা ১১ শতাংশীয় পয়েন্ট। পঞ্চম শ্রেণীর ক্ষেত্রে বাংলায় পারফরম্যান্সে উন্নতি হলেও গণিতে অবনতির মাত্রা ৬ শতাংশীয় পয়েন্ট।'' [৬]


 

পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই সম্প্রতি ২০ এপ্রিল ২০২৬ দি ডেইলি স্টারে প্রকাশিত ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস প্রফেসর মনজুর আহমদ সাহেবের লেখা কলাম, '' Are teachers failing, or is the system failing them? '' এর পাতায়। কলামে তিনি ইউনেস্কোর ইন্সটিটিউট ফর স্ট্যাটিস্টিক্সের বরাতে উল্লেখ করেছেন, '' বাংলাদেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে মাত্র ৫৫ শতাংশ শিক্ষকের নির্ধারিত যোগ্যতা আছে।''  এছাড়া, বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) এর বরাতে আরও বলেছেন যে, '' মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ৬০ হাজার ইংরেজি শিক্ষকের মধ্যে এক চতুর্থাংশ শিক্ষক উচ্চ মাধ্যমিকের পরে ইংরেজি পড়েননি। মাত্র ১৭ শতাংশ শিক্ষক ইংরেজিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন। এবং গণিতের প্রায় ৬২ হাজার শিক্ষকের মধ্যে ৫৭ শতাংশ শিক্ষক উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে গণিত পড়েননি। গণিতে স্নাতক, স্নাতকোত্তর আছে মাত্র ১৭ শতাংশ শিক্ষকের। '' [৭]

কতটা বেহাল দশা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার চিন্তা করতে পারেন! প্রমথ চৌধুরী তার বই পড়া প্রবন্ধে যেমন বর্ণনা করেছেন আজও কি তার কোনো উন্নতি হয়েছে? বরং তার অবনতি হয়েছে ক্ষেত্রবিশেষে। আমাদের যে সকল শিক্ষক নিজ নিজ বিষয়ে স্নাতক-স্নাতকোত্তর করেছেন তাদের পারফরম্যান্সও আশানূরুপ নয় বরং তা খুবই হতাশাজনক। 

এছাড়া, এখানে দোসরা মে ২০২৬ ডেইলি অবজারভারে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের তথ্য উলেখ করা প্রাসঙ্গিক মনে করছি। প্রতিবেদনে ইউনেস্কো কর্তৃক প্রকাশিত '' গ্লোবাল এডুকেশন স্ট্যাটিস্টিক্স '' রিপোর্টের বরাতে বলা হয়েছে যে, '' বাংলাদেশে দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন পরিমাণে ন্যূনতম-যোগ্য শিক্ষক রয়েছে। এবং প্রায় অর্ধেক শিক্ষক ন্যূনতম-যোগ্যতা পূরণ করেন। '' [৮]


 

এই যদি হয় আমাদের শিক্ষার প্রথম আবশ্যিক উপাদান শিক্ষক সমাজের দশা তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দূরবীন দিয়ে খুজেও শিক্ষা পাওয়া যে ভাগ্যের ব্যাপার তা বলাই বাহুল্য। তাই, এই বেহাল দশার মধ্যে দু-একজন ভালো-যোগ্য শিক্ষক যারা আছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।

প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন আসে যে, আমাদের শিক্ষক সমাজে এই বেহাল দশা কেনো ?

এ প্রশ্নের জবাব বোধ করি মোতাহের হোসেন চৌধুরী তার শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব প্রবন্ধে অনেক আগেই দিয়ে গেছেন। জীবসত্তার ঘরে বিশৃংখলা থাকলে মানবসত্তার ঘরে উঠা সম্ভব নয়। জৈবিক চাহিদা পূরণ করতে না পারলে শিক্ষা যে বিলাসিতা হয়ে দাঁড়ায় তা মোতাহের হোসেনের কথা এবং আমাদের আজকের সমাজ বাস্তবতায় স্পষ্ট প্রতিয়মান। 



 

শিক্ষকদের পর্যাপ্ত জৈবিক চাহিদা পূরণে রাষ্ট্রের অবহেলার ফলে দেশে শিক্ষক সমাজ আজ চরম অবহেলিত। আত্মসম্মান নিয়ে সমাজে দুবেলা খেয়ে পড়ে বেচে থাকা তাদের জন্য খুবই কষ্টকর। ফলে মেধাবীরা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষক হতে আর আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এখানে তুলনামূলক কম মেধাবীরা শিক্ষক হওয়ায় সমাজের করুণ দশা আরও বেড়ে গেছে। কারণ, এই ক্যাটাগরির শিক্ষার্থী সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই, তাদের মধ্যে তুমুল প্রতিযোগিতা হয় এবং সেই প্রতিযোগিতায় পাশ করতে গিয়ে মামা-খালুর আশ্রয় নেন তারা। এভাবে আমাদের একটি প্রজন্মের শিক্ষক সমাজকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। 


 

আমাদের দেশে সরকারি কলেজে শিক্ষক নিয়োগ হয় বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে। সে পরীক্ষা পাশ করে যারা কলেজের শিক্ষক হন, তাদের অধিকাংশ ই ২৬ টি ক্যাডার পদের মধ্যে শিক্ষা ক্যাডারকে পছন্দের তালিকায় ২০ এর পরে রাখেন। অর্থাৎ, এখানেও তুলনামূলক কম মেধাবীরা শিক্ষক হন। আর তাদের চেয়ে একটু বেশি মেধাবীরা চলে যান অন্য পেশায়। ঐ যে শিক্ষক সমাজের আর কিছু থাক না থাক তারা আত্মসম্মান নিয়ে সমাজে মাথা উচু করে বেচে থাকতে চায়। আর শিক্ষকতায় তার বড়ই অভাব। ফলে, শিক্ষা সংস্কার আটকে যায় শুরুতেই। শিক্ষায় যেকোনো সংস্কারে বড় বাধা অযোগ্য শিক্ষক। আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাসহ অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে প্রযুক্তি খাতে পিছিয়ে থাকার কারণও এই ক্যাটাগরির শিক্ষক সমাজ। কারণ, তারা শিক্ষকতা করেন তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ে কিন্তু স্মার্টফোন দিয়ে টিকটক চালানো ব্যতীত অন্য কিছু যে স্মার্টফোন দিয়ে করা যায় সে ব্যাপারে তাদের জ্ঞান থাকার সম্ভাবণা আর্যভট্টের বিখ্যাত আবিষ্কারের কাছাকাছি।

এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান মোটাদাগে প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং কলেজ পর্যায়ের চেয়ে যথেষ্ট ভালো। এখানে, বেশিরভাগ শীর্ষ মেধাবীরা শিক্ষক হন। ফলে এ পর্যায়ে শিক্ষকদের দৈন্যদশা নেই বললেই চলে। তবে, একেবারে নেই বললে ভুল হবে। 



 

এবার শুরুতে করা প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করি-

আমাদের কি আসলেই এত বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন আছে ? 

এককথায় উত্তর হলো, না। আমাদের দেশে যে পরিমাণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দৈন্যদশা নিয়ে কথা বলতে গেলে কয়েক খণ্ডের বিশাল বই রচনা করা সম্ভব। আর পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কথা বললে সেজন্য আলাদা আরেকটি লাইব্রেরী অব কংগ্রেস নির্মাণ করতে হবে সে সম্পর্কিত বই রাখার জন্য! 


 

আমাদের অর্ধ শত বছর পার করা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন নানান সমস্যায় জর্জরিত তখন আমরা সেগুলোর সমস্যা জিইয়ে রেখেই নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করছি কারো মামা বাড়ির আবদার মেটাতে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজের সংকট নিরসন না করে এত এত বিশ্ববিদ্যালয় কি তামাশা নয়! কারণ, উক্ত তিন পর্যায়ে যদি আমরা ভালো শিক্ষার্থী তৈরি করতে না পারি তবে এই যে আমরা খেয়ে না খেয়ে প্রতিদিন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করছি এগুলোতে পড়বে কারা ? গোড়ায় গলদ রেখে এসব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলে সেখানে পড়ার জন্য দূরবীন দিয়ে খুজে মানুষ তো দূর জ্বীন খুজে পাওয়াও দূঃসাধ্য ব্যাপার হবে অদূর ভবিষ্যতে। তাই, আমাদের এখন প্রধান কর্তব্য গোড়ার গলদ সমূলে উৎপাটন করে তারপর বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়ের মান উন্নয়নে নজর দেওয়া। আমাদের ফিকির হওয়া উচিত কীভাবে আমাদের বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশ্বসেরা অবস্থানে নিয়ে যাবো। অন্যথায় নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বর্তমান পরিস্থিতিতে পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ করার পরিবর্তে অন্য কোনো ফায়দা দিবে না। আর আমাদের চাওয়া যদি সেটাই হয় তবে, আমাদের উচিত প্রতিটি মহল্লার প্রতিটি গলির মোড়ে একটি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়, একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, একটি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়, একটি অ্যাভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়, একটি মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়, একটি ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি নতুন প্রজাতির বিশ্ববিদালয় প্রতিষ্ঠা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

তথ্যসূত্র

১। উইকিশনারি ও উইকিপিডিয়া

 https://en.wikipedia.org/wiki/University

https://en.wiktionary.org/wiki/university

২। প্রথম আলো

https://www.prothomalo.com/opinion/column/%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B6%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A7%9F%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%87-%E0%A6%95%E0%A6%9C%E0%A6%A8-%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%87

৩। উইকিপিডিয়া 

https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_universities_in_India#cite_note-Central-4

৪। https://www.prothomalo.com/education/higher-education/gagdyv3paf

https://bangla.thedailystar.net/youth/education/news-574426

৫। https://www.bonikbarta.com/bangladesh/XEUfdljFWEdPxvYM

৬। তথ্যসূত্র ৫

৭। https://www.thedailystar.net/opinion/views/news/are-teachers-failing-or-the-system-failing-them-4155661

৮। https://observerbd.com/news/574902

Comments

    Please login to post comment. Login