দায়িত্ব !!
(XWriter)
বাইরে হালকা বৃষ্টি হচ্ছে। আবহাওয়া টা খুব শান্ত আর নিশ্চুপ।ঠিক এই আবহাওয়ার মতই শান্ত হয়ে, আর এক বোঝা চিন্তা মাথায় নিয়ে, ঘরের এক কোণে বসে আছে রায়হান।চিন্তার ভাঁড়ে যেন তার মাথা টা একদম নিচে পরে যাচ্ছে।
এই সব চিন্তার মাঝেই রায়হান এর বাবা রাগি চেহারা নিয়ে তার রুমে আসে। প্রথমে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে; হইসে, তোর চাকরি?
মাথা টা সামান্য তুলে আর হালকা নেড়ে বোঝায়, না।
এই উত্তর শুনে বের হয় তার বাবার আসল চেহারা, আসল কন্ঠ, হাহহ, আগেই যানতাম, তোর দ্বারা হইব না। ...হাহ, আমিই হইলাম গাধা।যে তোর উপর আবারও বর্ষা করছি। আরে তোর মত হাজার হাজার বাপের ছেলে আছে।কই, তারা তো- তোর মত এমনে বেকার না? তারার বাপরাতো, তারারে নিয়াগর্ভ করে।কিন্তু আমি কেন পারি না? আমি কেনপারি না তোরে নিয়া গর্ভ করতে? তোর জাগায় যদি আমার এরেকটা মেয়ে হইত, আর ভালোহইত।তুবও তুই না হইতি।তোর মত নিষ্কর্মা ছেলে আমার দরকার নাই, দরকার হইতনা। ...তুই কেন হইলি? কেন হইলি তুই আমার ঘরে? ...আর ২দিন পরে তর বয়স হইব ২৬।আর তুই এখনও বেকার। আরে...মানুষ তোআমারে থু দিব রে, থু দিব। পড়ালেখাওকরলি না, আর এখন......ছিহ!
এইসব কথা বলে তার বাবা দরজা টা খুব জোরে বারি দিয়ে চলে যায়।আর নিশ্চুপ ওই রায়হান এর মাথা যেন, তখন আরোনিচু হয়ে যায়।কিছু বলতে না পেরে, মাথাটা কে আরো নিচু করে বসে থাকে সেই মেঝেতেই।
বাবা রুম থেকে বাইরে যাওয়ার পর, মা একটু রাগ নিয়েই বলে কি দরকার ছিল ছেলেটারে এত কথা বলার? সে তো চেষ্টা করতেছে, সে তো চেষ্টা না করতেছে না!
রায়হানের মায়ের এ কথায়, তার বাবা যেন আরো রেগে গেলেন।আর কুঞ্চিত কন্ঠ বললেন হাহ, আর তোমার ছেলের চেষ্টা! তুমি কথা বইললো না।তুমিই খারাপ করছো তারে। মাথায় তুলছ প্রশ্রয় দিয়া দিয়া। আজ তোমার কারণে, শুধু মাত্র তোমার কারনে তার এই অবস্থা। একটু রাগ ও অভিমানে মা আবার বলল আমি যদি ছেলেটার পাশে না থাকতাম, তাইলে তো তোমার জ্বালায় ছেলেটা মইরাই যাইত।
এসব চিৎকার চেঁচা-মেচি শুনে, রায়হান এর মেঝ বোন রামিসা রুমের বাইরে আসে
তোমরা কিশুরু করছ এইসব। আর আব্বু তুমি কি ভাইয়া কে এসব না বললে হইত না? ভাইয়া টিওশন করিয়ে যা টাকা পায়, সব তো তোমাকে দিয়াই দেয়।আর কি লাগে বলো? ভাইয়া তোএক টাকাও নিজের জন্য রাখেন না!
মেয়ের কথাতে বাবা আরো রেগে যান, তোর ভাইয়ের যেই টাকা। এই ১১ হাজার দিয়া তোর পড়ার খরচই তো হয় না।যা, তুই রুমেযা, গিয়া পড়াশোনা কর।
তোমার কাছে কি ১১ হাজার কম লাগে? আর আমার পিছনে কেমনে সব টাকা যায়? শুধু বছরের প্রথম মাসে, বই কিনার জন্য আমার ১১ হাজার টাকা লাগছিল। আর তুমি, এখনও ওই টাকার কথা বলো।ভাইয়া না থাকলে বুঝতা, বুঝতা সংসার টা কেমনে আসলে যাইত।
যেমন বাবা তেমনি তার মেয়ে। বাবা বলে চলে যাবে, আর মেয়ে থেমে থাকবে, তা কি হয়? বাবার মেয়ে, কথার জবাবে পিছু পা হবে তা তো হতে পারে না।
তোর এত বড় মুখ হইসে, তুই আমারে সংসার কেমনে চালায় তা বুঝাইতে আইছোস? আমি তোমাকে বুঝাইতে আসছি না।সংসার কেমনে ভালো চালানো যায়, সেটাতো তুমি আমরার থেকে ভালো জানো। আমি শুধু বলছি, আমাকে, আপুকে, আর জিন্নি কে যেমনে ভালোবাস, ভাইয়াকে তেমনে বাসলে সমস্যাটা কোথায়?
বাবার আর কোনো উত্তর রামিসা শুনতে চায় না। তাই আর এক মুহূর্ত ও না দাঁড়িয়ে সে রুমে চলে যায়। কিন্তু বাবা কি আর থেমে থাকে। গলায় স্বর আরো বড় করে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলতে থাকে, দেখছো, দেখ দেখ, তোমার মেয়ে এখন আমারে শিখায়, যে আমি কারে কতটুক ভালোবাইসসাম আরে কারে কতটুক না। দেখকি বানাইছো দেখ।
রায়হান এর বাবা এগুলো বলতে থাকে আর তার মা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তখনি বাইরে থেকে রায়হান এর আরেক বোন রাইসা ঘরে আসে।
তোমরা কি একটা দিনও একটু শান্তিতে থাকতে পারো না। প্রতিদিন কাজ থেকে আইসা আমাকে এই ঝগড়া-ঝাটি শুনতে হয়। আমি এখন বিরক্ত হয়ে গেছি।
বড় মেয়েকে দেখে রায়হানের বাবার সব রাগ কোথায় যেন নিমিষেই উড়ে যায়। মিষ্টি কন্ঠে মেয়েকে বলে মা~, তুই আইছোস। যাযা, রুমে গিয়া হাত পা ধুইয়া নে, তোর মাতোরে ভাত দিয়া আসব।
ঘরে ঢুকার সময় বাবার রাগি কন্ঠ, আবার নিমিষেই এই মিষ্টি কন্ঠ, রাইসা এটা কোনো ভাবেই নিতে পারে না।তাই সে না বলে আর পারল না, চুপ কর আব্বু। ...আমার সাথে এতো ভালো আচরণ, আর ভাইয়ার সাথে এতো খারাপ আচরণ আমি আর এগুলা নিতে পারতেসি না।তুমি আবার ভাইয়ার সাথে আজকে খারাপ আচরণ করছো, তাই না? কেন, কেন করছো? কেন করছো আব্বু? তোমার কি আমার টাকা গুলা দিয়া হয় না? দেই তো, মাসে তো ৪৫ হাজার টাকা দেই। আর কি লাগে তোমার?
রাইসার কথায় বাবা একদম চুপ হয়ে যায়। আর হাত পিছনে নিয়ে মাথা নিচু করে নেয়।তখনি, রায়হান বেরিয়ে আসে, আর তাদের মাঝখান দিয়ে বের হয়ে যায়। তখন আবার তার বাবা বলতে থাকে; ওই ওই, তুই কইযাস? ওই, তোরে জিজ্ঞেস করতেসি তো।বোন রামিসাও ভাইকে দুইবার ডাকে। কিন্তু রায়হান কোনো কথা না বলে, একবার ও পিছনে না তাকিয়ে বাইরে চলে যায়।এতে করে বাবার আসল চেহারা আবারো বের হয়ে আসে।
দেখছোস, দেখছোস কেন আমি তোর ভাইরে কথা শুনাই।দেখ, এবার তুইই দেখ। বাবার এই মুহূর্তেই মুখ বদলানোতে রামিসা আরো রেগে যায়।আর একটু উঁচু কন্ঠেই বলল বাবা...
কি, দেখ তোর সামনে দিয়াই তো বের হইয়া গেলো। এবার কিছু বলবি না?
তো আর কি করব? এভাবে প্রতিদিন বাসায় এমন ঝামেলা হলে, আর কি করব?
এটা বলে রাইসা ও ঘরে চলে যায়। আর রায়হানের বাবা ও মুখ বাকা করে নিজের রুমে চলে যায়।রুমে যেতে যেতে বলে সবগুলা একই হইছে, এগুলায় আমার কষ্ট কোনোদিনও বুঝতো না।
রাতের আটটা বাজে রায়হান বাইরে রাস্তায় হাটছে। আর বার বার আকাশের দিকে তাকাচ্ছে।মনে হয়, মনে মনে আল্লাহকে বলছে, আল্লাহ, কেন আমার এতো পরিক্ষা নিতেছো? আমার কি দোষ বলো আল্লাহ, আল্লাহ আমার লাইফ টা এমন কেন আল্লাহ? আমি কি অন্যদের মতো একটুও সুখী হইতে পারব না?
হাঁটতে হাঁটতে সে একটি পার্কে আসে। আর সেখানে থাকা একটি বেঞ্চে আবারো মাথাটা নিচু করে চুপ করে বসে থাকে। কিছুখন পর দেখা যায়, তার একবন্ধু ওই পাশ দিয়ে হেটে যাওয়ার সময় তাকে খেয়াল করে। আসতে-আসতে মজার ছলে বলে আরে, দেখি তো এটা কে?
বন্ধুকে দেখেও রায়হান কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। বন্ধুকে একবার দেখে, আবারো মাথাটা নিচু করে নিলো। রায়হানের আর কিছু বলতে হলো না, তার বন্ধু ঠিকি বুঝে গেছে কিছু একটা তো আবার হয়েছে! তাই রায়হানের পাশে বসে, কাধে হাত বুলিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল, আচ্ছা বুঝলাম, আজ আবার বাসায় কিছু হইসে তাই না?
রায়হান তাওকিছু বলে না। বন্ধু আলী আবারও মজার স্বরে বলে আচ্ছা, কিছু বলতে হইব না, নে মুড়িখা। এই মাত্র বাসা থেকে আনলাম।নে খা।
এতেও রায়হান কিছু বলে না, শুধু বড়বড় নিশ্বাস নেয়। আর বার বার উপরে তাকায়। আর আবার মুখটা নিচু করে নেয়। মুড়ির হাতটা রায়হানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে আরে, এতো বড় বড় নিশ্বাস না নিয়া, খা তো।
করুণ এক চেহারায় আলীর দিকে তাকিয়ে এতক্ষণে রায়হান বলে, আলী! একটা সাজেশন দে ভাই। আমি কি করতাম বল।প্রতিদিন এগুলা আর ভাল্লাগে না। একদিনও ঘরে একটু শান্তিতে থাকতে পারি না।
মাথা নেড়ে আলী বলে আচ্ছা বলতেছি, তুই আগে খা।
রায়হান আবারও একটা বড় নিশ্বাস নেয়, আর এক মোট মুড়ি নেয়।কারণ তার ভালোই জানা আছে, সে মুড়ি না নিলে, তার বন্ধু একটাও কাজের কথা বলবে না।
শোন, আমি তোর জন্য একটা চাকরি পাইছি। করবি?
তুই জানস আমার এখন এই চাকরিটাই প্রয়োজন, প্লিজ এইটা নিয়া মজা করিস না। তুই তো সবই জানস, তবুও কেন এগুলা নিয়া মজা করতেছস? মনমরা হয়ে আলীর দিকে তাকিয়ে রায়হান কথাটি একদম নিচু স্বরে বলল।
আলী মুড়ির পেকেট টি নিচে রেখে রায়হান এর বাহু দুটি ধরে বলে সত্যি, তোর কি মনে হয়, তোর সাথে আমি মজা করমু? তাও এই টাইমে?...আরে সত্যি বলতেছি, তোর জন্য চাকরি পাইছি আমি।
আলীর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে রায়হান আবারও বলল মজা করিস না।
আ, আরে আমি সত্যি বলতেছি। বিশ্বাস করানোর জন্য, আলী পেন্টের পকেট থেকে নিজের ফোনটি বের করে একটি মেসেজ রায়হান কে দেখায়। যেখানে লেখা ছিল আলীদের ‘অভিযোগ কেন্দ্র অফিস’-এ একজন কর্মী নেওয়া হবে। মেসেজটি দেখা মাত্র রায়হান একটু উচ্ছ্বাসিত হয়ে বলে, এটা কি সত্যি? ওই পদে কি আমার কোনো চান্স আছে?
আর নয়তো কি? অফিসে সীট খালি হওয়া মাত্র-ই আমি বস কে বলে রাখছি। বস বলছে, তোরে নিয়া যাইতে।তো......!! একটু মুচকি মুচকি হাসি মুখে আলী রায়হান কে কথাটি বলে। এ শুনে রায়হানের যেন খুশির কোনো সীমাই থাকে না।এতক্ষণ যেই মুখটা গোমড়া হয়ে ছিল, তা যেন মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ভিতর থেকে আসা একটা হাসির সাথে রায়হান বলল, তো কবে যাইতে হইব? হাঁ, হাঁ- আমার তো বিশ্বাসী হইতেছে না ভাই...!
তবে ভাই, প্রথম প্রথম সেলারি কিছুটা কম।
মাথা নেড়ে রায়হান বলে কোনো সমস্যা নাই, বেতন যেমনি হোক। এই চাকরির জন্য কত কি করলাম, তুই তো জানস... আল্লাহ (উপরের দিকে তাকিয়ে বলে) তোমার লাখ শুখরিয়া, লাখ শুখরিয়া আল্লাহ।
বন্ধুর মুখে হাসি দেখে আলীর মুখ থেকেও যেন হাশি বের হয়ে এলো। তো তুই কালকে সকাল ৯ টা ২০এ আমার বাড়ি চইল্লা আসিছ।
To be continued!!