Posts

উপন্যাস

পল্টনে জ্যামবন্দি নাসিরুদ্দীন হোজ্জা (রম্য উপন্যাস, সম্পূর্ণ)

June 27, 2026

ইহতেমাম ইলাহী

32
View

পল্টনে জ্যামবন্দি

নাসিরুদ্দীন হোজ্জা

নাসিরুদ্দিন হোজ্জা এসেছেন দেশে। ঘুরছেন পথে পথে। মিশছেন নানা মানুষের সাথে। কিন্তু তিনি কীভাবে এলেন এই দেশে? কেনই বা এলেন? কত দেশ থেকেই তো তাকে নিমত্রণ করা হলো— আমেরিকা, ফ্রান্স, রাশিয়া। কিন্তু তিনি তাদের নিমন্ত্রনে সাড়া না দিয়ে এলেন এই বাংলাদেশে। 

হোজ্জার প্রিয় গাধাটি কোথায়? যা না হলে তার চলে না। না কি তিনি গাধা ছাড়াই চলাচল করছেন দিব্যি? বাংলাদেশে গাধা মেলানো তো সহজ কথা নয়, অপ্রতুল। কিন্তু হোজ্জার সাথে গাধা থাকবে না– তা কি হয়?

মানুষের জীবন অতি সরল, সোজা। বিশেষ করে আমাদের দেশের মানুষগুলোর জীবন তো বেশিই। কি! ভুল বলছি? কেউ বলবেন– ভুল। কেউ বা বলবেন– না, না ঠিক। আমি তর্কে যাবো না। কিন্তু এই বিষয়ে মুরাদ ভুঁইয়ার কী মতামত? ভাবছেন– মুরাদ ভুঁইয়া আবার কে? হা হা। মুরাদ ভুঁইয়া, মাসুম, কবির… আরো কত চরিত্রের সাথে হোজ্জার যে পরিচয় হলো, হলো নানান মিথস্ক্রিয়া! এক নেতা তো খাতিরের নামে শুরু করলেন অদ্ভুত যন্ত্রনা। 

মায়ার এই দেশের পথ প্রান্তর, রাস্তার স্ট্রিট লাইট, নিত্যদিনের যানজট, কোলাহল… কত কত অনুষঙ্গ হোজ্জার সান্নিধ্যে পেল– অদ্ভুত সব অর্থ, মানে। তৈরি হলো কত গল্প। এই গল্প শুনতে আপনাদের নিমন্ত্রণ।


ইহতেমাম ইলাহী
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা



 

                                                                      (১)

মহাযন্ত্রনায় পড়েছি। 

যন্ত্রনায় ফেলেছে আমার বড় ভাই আজাদ ভুঁইয়া। (আমরা ভুঁইয়া বংশের গর্বিত (!) সন্তান) । রাত বাজে ১ টা ১১। আমি গভীর ঘুমে। হঠাৎ ভাইয়ার ফোন কল। মনে চাচ্ছিল ফোনটা আছাড় দিই। দিলাম না। ঘুম ঘুম চোখে ফোন রিসিভ করলাম। 

  –আসসালামু আলাইকুম। ভাইয়া?
  –ওয়া আলাইকুমুস সালাম। আমি না তো কে?
  –এত রাতে কল করেছ কেন? ঘুম ভেঙ্গে বুক ধরফর করছে আমার। 
  –আরে আসল ঘটনা শুনলে তো বুক ধরফর করবে! না শুনতেই বুক ধরফর! হা হা হা ।
  –কী হয়েছে?
  –আচ্ছা তুই এত রাত এত রাত করছিস কেন? আমার এখানে ১০ টা বাজে মাত্র। আমি তুরস্কে আছি, এটা ভুলে যাস নাকি?
  –না, ভুলি নাই। 
  –শোন! আমাদের আনাতোলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে নাসিরুদ্দীন হোজ্জাকে বাংলাদেশ সফরে পাঠানো হবে!
   –হ্যাঁ? 
   –হুম। কাজটা করছে তুর্কি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ছাত্র-শিক্ষকরা। বিশ্বসাহিত্য বিশেষত তুর্কি সাহিত্য আরো সমৃদ্ধ করতেই এই উদ্যোগ। নাসিরুদ্দীন হোজ্জা বাংলাদেশ ঘুরবেন, নানা কাহিনী তৈরি হবে, সেই কাহিনী দিয়ে নতুন নতুন গল্প তৈরি হবে, সাহিত্য সমৃদ্ধ হবে! 

ঘুমের ঘোরে কথা শুনতে বিরক্ত লাগছে। চেষ্টা করছি কত দ্রুত ফোন রেখে দেয়া যায়। ভাইয়া একবার কথা বলা শুরু করলে ছাড়তে চায় না। বললাম, তুমি তো ইকোনমিক্স পড়ো। সাহিত্য বিভাগের কাজের সাথে তোমার কী?

 – সিম্পল জিনিস বুঝলি না? আরে সাহিত্য বিভাগের কাজের সাথে আমাকে জড়ানো হয়েছে কারণ আমি বাংলাদেশি। নাসিরুদ্দীন হোজ্জা তো বাংলাদেশেই যাচ্ছেন। বাংলাদেশ ভ্রমণে তুই হবি তার গাইড! 
  – ভাইয়া, তুমি রাতে আমার সাথে মজা করার জন্য কল দিয়েছ, তাই না? নাসিরুদ্দীন হোজ্জা, বাংলাদেশ ভ্রমণ এগুলো সব বকোয়াজ।
  – না না। মজা করছি না। নাসিরুদ্দীন হোজ্জার মতো বিখ্যাত লোক রাষ্ট্রীয় মেহমান হিসেবে চাইলেই যেতে পারেন বাংলাদেশে। কিন্তু উনি তা চান না। সাহিত্য বিভাগ থেকে বলা হয়েছে হোজ্জা একজন মহান চরিত্র, তিনি গল্পে সাধারণ মানুষদের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাই বাংলাদেশেও সাধারণ ভাবেই থাকবেন, ঘুরবেন ফিরবেন!
  – তো, তুমি বলছ নাসিরুদ্দীন হোজ্জা সাহেব আমাদের বাড়িতে উঠবেন। আর আমি তাকে দেশ ঘুরিয়ে দেখাবো?
  – আইনেন হাকলেসিন কারদেশশিম! 
  – মানে কী?
  – তুর্কি ভাষায় বললাম! অর্থ হলো, একদম যথাযথ বলেছ ভাই!

ফজর নামাজ শেষে বাড়ি আসার পড় রাতের ঘটনা মনে পড়ল। ভাবছি রাতে আজগবি স্বপ্ন দেখেছি কি না। ফোন চেক করি। বোঝা যাবে যে ভাইয়া কল করেছিল, নাকি করে নি।

রিসিভ কলে ভাইয়ার নাম্বার দেখাচ্ছে। সাথে দেখি হোয়াটসএপেও ম্যাসেজ–

   ‘মুরাদ শোন, হোজ্জা সাহেব যাবেন সামনের মাসে। এই ক’দিনে উনি বাংলা কিছুটা শিখে নিতে চান। আমি তাকে বলেছি, আমার পক্ষ থেকে যত সম্ভব সাহায্য করব। আর হ্যাঁ! তুই তো আরবি ভাষার ছাত্র। হোজ্জা খুব সম্ভবত আরবি জানেন। শুনেছি তিনি সালজুক তুর্কিদের শাসনামলে একজন কাজী ছিলেন। আরবি না জানলে কি কাজী হওয়া যায়? তবুও তাকে জিজ্ঞেস করে নিব। তোর সাথে আরবিতে বাতচিৎ করতে পারবে! তুই দোভাষী হিসেবে কাজ করলি, কেমন! 

   উনি মাসখানেক থাকতে পারেন। অতি যত্ন ও আপ্যায়নের সাথে রাখবি তাকে আমাদের বাসায়। মা-বাবা আপত্তি করলে বুঝিয়ে বলবি যে, নাসিরুদ্দিন হোজ্জা সাহেব একজন বিখ্যাত মানুষ। তাকে বাসা বাড়িতে থাকতে দেয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার। 

   মাকে বলবি আমার বিয়ের ব্যাপারে তাড়াহুড়া না করতে। পাত্রী দেখে না বেড়াতে। বিয়ে আমি খুব দ্রুত করছি না। 

  ওহ ভালো কথা, হোজ্জা সাহেবকে ২/৩ দিনের মধ্যে তোর সাথে কথা বলিয়ে দিব। আরবিতে বিস্তারিত কথা বলে নিবি! পারবি না!’

 

ভাইয়ার ম্যাসেজের রিপ্লাই কী দিব? আমার তো মাথায় হাত। সামনের মাসে সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা। এর মধ্যে সে আমাকে হোজ্জার গাইড হওয়ার দায়িত্ব দিয়ে দিল। আগে ভাগে বলা কওয়া কিছুই নেই। যন্ত্রনা! একেই বলে মহাযন্ত্রনা!

                                                    (নতুন পাতা)


হোজ্জাকে সাথে নিয়ে এয়ারপোর্টের বাইরে এসেছি। ফুট ওভারব্রিজ পার হবো। উবারে গাড়ি ভাড়া করেছি। গাড়িতে উঠতে হবে ওপার থেকে । এক্সকেলেটর মানে চলন্ত সিড়িতে পা রাখতে রাখতে হোজ্জা বললেন, বিমানবন্দরের ভেতরেও এরকম সিঁড়ি আছে। বড়ই আজীব বস্তু!

হোজ্জা তার সময়ে এমন চলন্ত সিঁড়ি দেখেন নি। এজন্যই তার কাছে হয়ত আজীব লাগছে। আমি বললাম, জ্বী, আজীব!
হোজ্জা বললেন, ঠিক যেন দুনিয়ার মত!
  –কীভাবে হোজ্জা?
  –দেখো! এই সিঁড়িতে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। মনে হয় স্থির। কিন্তু সিঁড়ি আমাদের ব্রিজের উপর টেনে নিয়ে যাচ্ছে। দুনিয়াতেও মনে হয় যে, আমরা স্থীর অবস্থান করছি, কিন্তু দুনিয়া আমাদের ঠিকই মৃত্যুর দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে!

হোজ্জার উত্তর শুনে আমি চুপ হয়ে গেলাম! বুঝতে পারলাম, হোজ্জা শুধুমাত্র একজন মজার মানুষই নন। বরং খুব জ্ঞানীও বটে । ইন্ট্রোভার্ট প্রকৃতির আমি হোজার গাইড হওয়া আর ঘুড়ে বেড়ানোকে কষ্টকর বোধ করেছিলাম। ভাইয়ার প্রতি একটা লুকানো রাগ ছিল। কিন্তু হোজ্জার সাথে প্রাথমিক আলাপচারিতায় আমার কষ্ট বা রাগ মনে হয় কেটে যাচ্ছে! প্রত্যাশা করছি, তার সাথে সময় ভালোই কাটবে। 

হোজ্জা বললেন, যথেষ্ঠ ক্লান্তি বোধ করছি! তোমার আবাসস্থল পর্যন্ত কীভাবে যাবো? হেঁটে যেতে হবে? 
  –না হোজ্জা। হেঁটে যেতে হবে না। 
  –আচ্ছা, আমার জন্য গাধার ব্যাবস্থা করতে পেরেছ?  আমার গাধাটা তো সাথে আনতে দিল না।


হোজ্জার প্রিয় বাহন হলো গাধা। সবার জানা। ভাইয়ার পরামর্শে আর কিছুটা বুদ্ধি খাঁটিয়ে আমি একটা ব্যাবস্থা করেছি। হোজ্জার জন্য পছন্দসই বাহনের ব্যাবস্থা। বাহন আমাদের বাড়িতে অবস্থান করছে। জানি না, হোজ্জার পছন্দ হবে কি না।  হোজ্জা আনমনে হাঁটছেন। বললাম, হোজ্জা, আপনার জন্য ডিজিটাল গাধার ব্যাবস্থা করা হয়েছে ।
  –আচ্ছা।
  –Honda C50 । আমার দাদা চালাত এই ডিজিটাল গাধা। এখন মাঝে মাঝে আমার বাবা চালায়। আপনার গাধার চেয়ে গুনে মানে কোনো অংশেই কম না। সমানে সমান। তবে ভ্যাটভ্যাট শব্দ করে চলে। 
হোজ্জা হয়ত কিছু ভাবছেন। আমার কথার প্রতি খুব একটা মনোযোগ নেই তার। হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, সমস্যা নেই, মুরদা বৎস। গাধার  খুড়ের টপ টপ টপ শব্দ আর ডিজিটাল ঘোরার ভ্যাট ভ্যাট শব্দ তো একই হলো। 

আমার মুখে কোনো উত্তর এল না। এই ডিজিটাল গাধাটির ভ্যাটভ্যাট কত ভয়ানক তা আর এখন বলতে সাহস পাচ্ছি না হোজ্জাকে। দেখা যাক, যখন এই গাধার পিঠে তাকে চড়াবো তখন কী বলেন। অপেক্ষায় থাকি। 

 

আমরা ওভারব্রিজ থেকে নেমে উবারের কারে উঠে বসেছি। হোজ্জা বললেন, অদ্ভুত বাহন! টানার জন্য গরু নাই, ঘোড়া নাই, চাকা গড়গড়িয়ে চলে। 

গাড়িতে উঠার কিছুক্ষণ পরেই ক্লান্ত হোজ্জা ঘুমিয়ে পড়লেন। গাড়িতে এসি ছাড়া হয়েছে। মনে হচ্ছে তিনি আরাম পাচ্ছেন। রাস্তায় মোটামুটি জ্যাম । গাড়ি থেমে থেমে চলছে । আমিও চোখ বন্ধ করব। তবে ঘুমাবো না।

পল্টনে এসে গাড়ি একেবারে থেমে গেল। কঠিন জ্যাম লেগেছে বোধয়। বিশ মিনিট কেটে গেছে গাড়ি আগানোর নাম নেই ।  হোজ্জার ঘুম ভেঙ্গে গেছে। আমি তার দিকে হাসি মুখে তাকিয়ে বললাম, ঘুম কেমন হয়েছে, হোজ্জা?
  –আলহামদুলিল্লাহ, ভালোই। গাড়ি থেমে আছে কেন?
হোজ্জার চেহারায় ক্লান্তিভাব কিছুটা কেটে গেছে । তাকে উৎফুল্ল লাগছে। বললাম, হোজ্জা, যানজট লেগেছে। আমাদের দেশে এটা খুবই কমন দৃশ্য। 
হোজ্জা দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়লেন।
  -হুমম। আমাদের সময়ে এরকম কিছু ছিল না। টপ টপ টপ করে আমার গাধা যেতেই থাকত যেতেই থাকত।
  –জ্বী, হোজ্জা!
  –এখন তোমাদের দেশে যতসব নতুন ঝামেলা তৈরি হয়েছে।  এক বৎস তো তোমাদের দেশকে দোজখপুর ই নিয়ামত বলেছিল। তাই না? 

 

হোজ্জা তার কথা কোথায় থেকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন বুঝছি না। বললাম, জি, ইবনে বতুতা বলেছিলেন। তবে তার এই কথায় আমরা এ দেশবাসী মনে কষ্ট পেয়েছি! উনি বলেছিলেন আমাদের দেশের আবহাওয়া খুবই অদ্ভুত ও অসহনীয়। গ্রীস্ম, বর্ষায় বৃষ্টি, স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ ইত্যাদি। এজন্য নাকি বাঙ্গালা দোজখ। কিন্তু এই আবহাওয়া আমাদের নিকট অতি পছন্দের। আচ্ছা ভালো কথা, হোজ্জা, আপনি ইবনে বতুতাকে “বৎস” বলছেন কেন জানতে পারি? উনি তো অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি। 
  –তুমি দেখি কিছুই জানো না, মুরাদ! আমার জন্ম ১২০৮ সালে। সে অনুযায়ি ইবনে বতুতা আমার নাতির পুত্রের সমান বয়সী। সে তোমাদের দেশে এসেছিল ১৩৪৬ সালে। তার জন্ম ১৩০৪ সালে। তার জন্মের  বহু আগে আমার মৃত্যু হয়েছে। অবশ্য আমার মৃত্যু কবে হয়েছে এই নিয়ে আমি কিছুটা দোটানায় ভুগি। কোনো ঐতিহাসিক সূত্র বলছে আমার মৃত্যু ১২৭৫ সালে, কোনো সুত্র বলছে ১২৮৫ সালে। এজন্য নিশ্চিত হতে পারছি না ১০ বছর বেশি বেঁচেছিলাম নাকি কম। 

হোজ্জার কথা শুনে আমার মাথা গুলাচ্ছে। উত্তরে কী বলব বুঝতে পারছি না। অবশ্য হোজ্জার কথার উপর কখনো কারো কিছু বলার থাকে না। আমিও চুপ থাকি। তা-ই নিরাপদ। হোজ্জা হঠাৎ কিছুটা উসখুস করতে লাগলেন। 
  –হোজ্জা, কোনো সমস্যা হয়েছে?
  –এসিড বন্ধ করতে বলো। 
  –এসিড কী হোজ্জা? 
  –শীত করছে। আর সহ্য হচ্ছে না। 
বুঝলাম হোজ্জা এসি কে এসিড বলে ফেলেছেন। আমি কথা বাড়ালাম না। এসি বন্ধ করা হলো। হোজ্জা বললেন, জানালা খুলে দাও। 

জানালা খুলে দেয়া  হয়েছে। জ্যাম কিছুটা ছাড়ি ছাড়ি করছে। তবে ছাড়বে বলে মনে হচ্ছে না। বাইরের গাড়ির ভ ভ আওয়াজ আসা শুরু করেছে। হরেনের প্যা প্যা শব্দ। আমি ভয়ে আছি, হোজ্জা না বিরক্ত হয়ে যান। হঠাৎ দমকা বাতাস উঠল।  অনেকগুলো ধুলা আমাদের গাড়িতে ঢুকে গেল!  হোজ্জা হাতের ইশারায় আমাকে গাড়ির জানালা বন্ধ করতে নিষেধ করলেন! তিনি বাইরে তাকিয়ে আছেন। 
আমাদের গাড়ির সামনেই একটা বিশালদেহী বাস দাঁড়িয়ে আছে। ক্ষণে ক্ষনে দুর্গন্ধযুক্ত কালো ধোঁয়া ছাড়ছে। সামনে পেছনে ডানে বামে অসংখ্য ছোট বড় গাড়ি । বাতাস খুবই বিষাক্ত হয়ে গেছে। শ্বাস টানা যায় না ঠিকমত।  অতিদ্রুত জানালা বন্ধ করা দরকার। হোজ্জাকে বললাম, হোজ্জা, জানালা বন্ধ করে দেই? 

হোজ্জা হাসলেন। বললেন, যা দেখার আমি দেখে ফেলেছি, আর মান সম্মান রক্ষার চেষ্টা কোরো না। এই তোমাদের রাজধানী? আমাদের সময় রাজধানী বলতে বোঝাত সবচেয়ে সুরম্য সুসজ্জিত নগরী। আর তোমাদের রাজধানী নাকি বায়ু দূষনে চ্যাম্পিয়ন হতে চেয়েও পারে না? দ্বিতীয় পজিশন থেকে প্রথম হওয়ার জন্য ধাক্কা ধাক্কি চেষ্টা করছ তোমরা? চেষ্টা চালিয়ে যাও। চেষ্টায় কি না হয়!


আমি হতভম্ভ হয়ে গেলাম। হোজ্জার সাথে চলা বেশ মুশকিল দেখছি। ভাবছি এত তথ্য কে তাকে দিয়েছে? যে দিয়েছে সেই লোককে যদি ধরতে পারতাম। দেশের মান সম্মান আর রক্ষা করা যাচ্ছে না। 

হোজ্জা বললেন, যানজট ছাড়বে বলে তো মনে হচ্ছে না। মুরাদ বৎস! দেশ থেকে অন্য দেশ যেতে আকাশপথে যেমন বিমান যাত্রার ব্যাবস্থা আছে, সেই ব্যাবস্থা তোমরা এখানে করতে পারো না? তাহলে অতি আরামে এয়ারপোর্ট থেকে তোমাদের বাড়ির ছাদে শো করে উড়ে চলে যেতাম! কী! এই বুদ্ধি তোমাদের মাথায় কেন আসে না?

হঠাৎ জ্যাম ছেড়ে গেল। গাড়িগুলো যেন চলার জন্য মাতাল হয়ে গেছে । হোজ্জা মাতাল গাড়িগুলোকে দেখছেন। আমিও নির্বিকার ভঙ্গিতে বাইরে তাকিয়ে আছি। আমাদের সামনের ডান দিকের বাসটা যাত্রা শুরু করতে দেরি করেছে কেন বুঝছি না। যা ব্যাটা যা। যাস না কেন? পেছন থেকে আরেককটা বাস এসে দিল সেটাকে সজোরে ধাক্কা। আমি সাথে সাথে হোজ্জার দিকে তাকালাম। বললাম, হোজ্জা দেখেছেন! আমাদের আধুনিক মানুষের বুদ্ধি কম না। এজন্যই শহরের অভ্যন্তরে বিমানের ব্যাবস্থা নেই। ভেবে দেখুন এই জ্যাম যদি আকাশপথে লাগত তাহলে বাসের বদলে বিমানে বিমানে ধাক্কা লাগত। তাহলে উপর থেকে বিমান নিচে পড়ে গেলে যাত্রীরা কি কেউ বাঁচত? 

হোজ্জা কোনো কথা বলছেন না।। মনে হয় আমার যুক্তি তার মনঃপুত হয়েছে! হোজ্জাকে যুক্তিতে হারিয়ে দিতে পেরে আমি মনে মনে আনন্দ অনুভব করছি। 


জ্যাম ছাড়ার পর গাড়িগুলো পাগলের মত ছুটছে । রাস্তা গাড়ির দূর্গন্ধযুক্ত ধোঁয়ায় ভরে গেছে । একটা ডাস্টবিনের পাশ দিয়ে যাচ্ছি, সেখান থেকেও দূর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ভয়ানক সেই গন্ধ। হঠাৎ খুব উঁচু নিচু রাস্তায় এসে পড়লাম। গাড়িতে প্রবল ঝাঁকুনি হচ্ছে। পাশে দেখলাম এক রিকশাওয়ালা যাত্রীসহ চিপার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাকে যেতে হচ্ছে ভয়ানক ভাঙ্গাচোড়া রাস্তা দিয়ে । ব্যাপক ধাক্কা খেল রিকশা। রিকশাওয়ালা চিৎকার করে বলল, জয় বাংলা! 

সবাই রিকশাওয়ালার দিকে তাকাচ্ছে। হোজ্জা বললেন, সত্যিই আজীব দেশ! দুরবস্থায় পড়েও এই লোকটি দেশের জয়গান গাচ্ছে! 


আমাদের এলাকায় প্রায় চলে এসেছি। একটা ব্রিজের নিচ দিয়ে ঢুকতেই সামনে থেকে ধোঁয়া আসতে লাগল কুয়াশার মত। বুনকো বুনকো ধোঁয়া। কীসের ধোঁয়া? ভ ভ আওয়াজ কানে আসে। মশা মারার ওষুধ স্প্রে করছে মনে হয়! দেখতে দেখতেই ব্রিজের নিচের টানেল ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে গেল। টানেলেই ধোঁয়া দিয়েছে সিটি কর্পোরেশনের ধোঁয়াওয়ালা। চারিদিকে ঘোলা। কিছু দেখা যায় না। ড্রাইভার গাড়ির লাইট জ্বালিয়ে দিয়েছে। হোজ্জা বললেন, দোজখপুর ই নিয়ামত! দোজখপুর ই নিয়ামত!

আমার চেহারা লজ্জায় লাল হবার জোগাড়। হোজ্জা আমার দিকেই তাকিয়ে আছেন । 
  ‘বুঝলে মুরাদ ? বৎস ইবনে বতুতা ৭০০ বছর আগে তোমাদের দেশকে এই উপাধি না দিয়ে বরং এই সময় দিলে ভুল করত না। ছেলেমানুষ তো! ভুল সময়ে সঠিক কথাটি বলে ফেলেছিল। তবে আমি তাকে ক্ষমা করলাম।’ 

হোজ্জাকে থামানো দরকার। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। হোজ্জা এসেই আমাদের দেশের এত এত বদনাম করে যাচ্ছেন। বললাম, হোজ্জা, দেশের যা ক্ষতি হয়েছে, তার বেশিরভাগ করেছে একটি বিশেষ খানদান ও তাদের লোকেরা! আমরা এবার কাতারে কাতারে প্রাণ দিয়ে তাদের শাসন উৎখাত করেছি। দেশকে আমরা নতুনভাবে গড়তে চাই। আপনি আমাদের দুর্নাম করবেন না। মনে ব্যাথা পাই। বরং আপনি দুআ করুন। 

হোজ্জা বললেন, বৎস, কষ্ট পেও না। তোমরা এবার যা সাহসিকতা দেখিয়েছ, যে অভ্যুত্থান করেছে তা শুনে আমি বড়ই খুশি হয়েছি। আমি মনে করি আমাদের তুর্কি জাতীর মত তোমরাও একটি সাহসী জাতি! আর এজন্যই তো বই এর পাতা থেকে উঠে তোমাদের দেশে বেড়াতে আসার উৎসাহ পেয়েছি! না হলে কতকাল গেল, কতজন নিমন্ত্রণ করল! আমেরিকা করল, চায়না করল, ফ্রান্স করল। আমি নাক সিঁটকালাম। বলো, ভালো করেছি না?

হোজ্জার উত্তরে আমি খুশি হলাম। আমি বললাম, আমাদের দেশে আপনাকে স্বাগতম প্রিয় হোজ্জা! তিনি বললেন, মারহাবা! মারহাবা! 

হোজ্জা আমার হাতে মোসাফাহা করলেন শক্ত করে। আমি তার চোখে আনন্দের খেলা দেখতে পেলাম। সেই আনন্দে খাঁদ নেই। কারণ, দু’চোখের কোণাতেই আনন্দ অশ্রু জ্বলজ্বল করছে।  




                                                           (২)

হোজ্জার চাওয়া মত বাসা সাজানো হয়েছে। বাসা হলো আমাদের বিল্ডিং এর দ্বিতীয় তলার উত্তর সাইডের ফ্লাট। দুই রুম এক ডাইনিং স্পেস। বাসা ফাঁকা ছিল। এই মাস আর সামনের মাসে ভাড়াটিয়া উঠানো হবে না। রুম বরাদ্দ থাকবে নাসিরুদ্দীন হোজ্জার জন্য। তার সার্বক্ষনিক খেদমতে থাকব আমি। বাসা সাজাতে আমার মোটেও বেগ পেতে হয় নি। কারণ হোজ্জা বলে দিয়েছেন শুধু একটা ৫ ফুট বাই ৭ ফুট তোষক ফ্লোরে দিয়ে এর উপর বিছানার চাদর আর বালিশ দিয়ে দিতে। যথাযথ ভাবে দেয়া হয়েছে। 

হোজ্জা বসে আছেন। লেবুর শরবত খেতে দিয়েছি। তিনি খেয়ে বললেন, অতি উপাদেয়! 
বললাম, ঘর আপনার কথা অনুযায়ী ফাঁকা রাখা হয়েছে হোজ্জা। না হলে কিছু প্রয়োজনীয় আসবাব রাখতাম। হোজ্জা বললেন, অন্য কিছুর দরকার নেই। তবে একটা বড় সাইজের আলমারি হলে ভালো হত।
  –বিশেষ করে আলমারি কেন হোজ্জা? মূল্যবান কিছু রাখবেন আলমারিতে?
  -আমার আর মূল্যবান কিছু কী-ই বা আছে? কিছুই তো নেই। চোর যদি ঘরে আসে কিছুই পাবে না। এই লজ্জায় আমি লুকাবো কোথায়? আলমারিতেই তো! 
  –হোজ্জা, চোরেরই তো লজ্জা নাই, অন্যের জিনিস চুরি করতে এসেছে। আপনি কেন লজ্জা পাবেন?
  –চোরের লজ্জা নাই, এজন্যই আমার লজ্জা পেয়ে শুন্যস্থান পূরন করতে হবে না? হবে তো। আমি অতি দায়িত্বশীল একজন ব্যক্তি। শুন্যস্থান ফাঁকা রাখি না। 

আমি ভ্যাবাচ্যাকা খাচ্ছি। হোজ্জার সাথী হতে হলে মনে হয় ভ্যাবাচ্যাকার উপরেই থাকতে হবে। আল্লাহ মা’লুম। বললাম, হোজ্জা, চোরের ভয় নেই। প্রত্যেক তলার সিঁড়িতেই সিসি ক্যামেরা আছে। ধরার পরার ভয়ে চোর আসবে না। 

হোজ্জা যা বললেন তা শুনে আমার আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল। তিনি বললেন, বৎস মুরাদ, ভেবে দেখো তো, চোর যদি গভীর রাতে এসে সব সিসি ক্যামেরার সরঞ্জাম খুলে চুরি করে নিয়ে যায়। তাহলে কীভাবে আটকাতে পারবে? 
আমি চুপ করে গেলাম। প্রসঙ্গ ঘুরানোর জন্য বললাম, হোজ্জা, যুহরের সময় হয়ে যাচ্ছে। আপনি গোসল করে নিন। নামাজ পড়ে এসেই দুপুরের খাবার খাবো ইন শা আল্লাহ। অনেক পদের খাবার রান্না হয়েছে। 

হোজ্জার নামাজ পড়তে বেশ সময় লাগছে। আমার সুন্নাত নফল শেষ হওয়ার পরেও বসে আছি। এক পর্যায়ে নামাজ শেষ হলো তার। মসজিদের বাইরে বের হয়ে দেখি হোজ্জার জুতা নেই। অনেক খোঁজাখুঁজি করলাম। না, নেই। চুরি হয়েছে নিশ্চয়ই। মসজিদের বাইরে একটা জটলার মত হয়ে গেল। হোজ্জার জুতা চুরি হয়েছে । হোজ্জা কাঁদতে লাগলেন। আমি অবাক হলাম। হোজ্জা কাঁদবে কেন? তিনি না লজ্জা পাওয়ার কথা? আর হোজ্জার জুতা বলতে পুরাতন এক জোড়া খড়ম। এই খড়মের জন্য কাঁদা! 

চুপ থাকতে পারলাম না। বললাম, হোজ্জা! কাঁদছেন? 

হোজ্জা বললেন, আহা বেচারা চোর! এত কষ্টে আছে, জুতা চুরি করতে হচ্ছে তাকে। তাই বলে আমার এই পুরাতন খড়ম জোড়া! আহা, চোরটির দূর্দশার কথা ভেবে কান্না পাচ্ছে। চোরের জন্য বড় দয়া হচ্ছে। চোরের প্রতি আমি কোনো অভিযোগ রাখলাম না।

চারদিকে ছোট জটলা। হোজ্জা চোখ মুছছেন। লোকেরা দাঁড়িয়ে উৎসুক চোখে দেখছে । আমি চুপ করে আছি। হোজ্জাকে কীভাবে বোঝাই যে, চোরের জন্য এত কষ্ট পাওয়ার কিছু নেই? চোর এত মাসুম না। 

‘হোজ্জা! চলুন বাসা যাই।’ 
হোজ্জা সাড়া দিলেন। 

বাসার কাছাকাছি চলে এসেছি এমন সময় কে একজন ডাকল। পেছন ফিরে দেখি– চিকন শরীরের এক ছেলে। মুখে মাস্ক। কাঁধে স্কুল ব্যাগ। সে এগিয়ে আসছে। বললাম, কী চান ভাই? কে আপনি?

ছেলেটা কথা না বলে ব্যাগ খুলতে লাগল। আমি হোজ্জার হাত ধরে পেছনে সরে গেলাম। ব্যাগ থেকে কি না কি বের করে। 
আমাদেরকে অবাক করে দিয়ে ব্যাগ থেকে এক জোড়া খড়ম বের হলো। ঠিক হোজ্জার খড়মের মত দেখতে!
বললাম, কোথায় পেলেন এই খড়ম? 
ছেলেটি বলল, এগুলো এই হোজ্জার খড়ম। চুরি হয়েছিল। 

‘আপনি কিভাবে পেলেন?’
‘কীভাবে আর পাবো। আমিই চোর।’ 
‘তুমিই চোর! এখন খড়ম ফেরত দিতে চাও?’
‘জি। হোজ্জা মসজিদের সামনে বললেন, চোরকে মাফ করে দিয়েছেন। এজন্য ভাবলাম ভালো একটা লোককে কষ্ট দিয়ে লাভ কি? তাই ফেরত দিতে এলাম। তাছাড়া এই খড়ম বিক্রি করে এক টাকা পাবো না।’ 
‘Oh, I see! তুমি চুরি করার পর আবার মসজিদের সামনের জটলায় থেকে আমাদের কথাও শুনেছে! সাহস তো কম না!’

ছেলেটা মাথা চুলকাচ্ছে। হোজ্জা জিজ্ঞেস করতে বললেন, এত জুতা ছেড়ে এই পুরাতন খড়ম চুরি করতে গেছে কেন সে? জিজ্ঞেস করলাম। উত্তরে যা শুনলাম, তা হলো– চোর বালকটির মনে হয়েছে দামি জুতা বাসায় রেখে চোরকে উল্লু বানানোর জন্য পুরাতন খড়ম নিয়ে এসেছে কোনো মুসল্লী। উল্টা সেই মুসল্লীকে উল্লু বানাতে এবং শায়েস্তা করার জন্য সব বাদে খড়ম চুরি করেছে সে। শাস্তি হলো– খড়মের মালিক খালি পায়ে হেঁটে বাসা যাবে। ময়লা রাস্তা মাড়াবে! 

আমি হোজ্জার পায়ের দিকে তাকালাম। 
তার পায়ে আমার জুতাজোড়া। আমিই তাকে দিয়েছি। 

চোর বালকটি এবার আমার পায়ের দিকে তাকাল। স্বভাবতই দেখতে পেল– আমার পা খালি। আমি রেগে তাকালাম তার চোখ বরাবর। ছেলেটা সঙ্কুচিত হয়ে সরে গেল। আমি কিছু বলার আগেই সে বলল, সরি ব্রাদার। 

হোজ্জা আমার পিঠ চাপড়ে বললেন, মুরাদ রেগো না, এই ছেলে চোর হলেও কিন্তু সৎ আছে। সব কথা বলে দিল হরহর করে। তাকে আমার পছন্দ হয়েছে। খুবই সম্ভাবনাময় ছেলে। 

হোজ্জা চোরকে শুধু সম্ভাবনাময় বলে প্রশংসাই করলেন না, কিছুক্ষণের মধ্যে একটি অসম্ভবকেও সম্ভব করলেন। তিনি চোর বালকটিকে দুপুরের দাওয়াত দিলেন। আমাদের সাথে খাবারে শরীক হতে বললেন। আশ্চর্য্য! ছেলেটাও ইতস্তত করল না। আমাদের পিছু পিছু চলে এল। 

আমি একটা ঘোরের মধ্যে আছি বলে মনে হচ্ছে। হোজ্জার সাথে থাকলে অনেক কিছুই আজীব আশ্চর্য্য ঘটবে, কিন্তু এমন আজীব ঘটনা ঘটবে তা কল্পনাও করি নি। চোর ধরা পড়লে তার পিটুনি খাওয়ার কথা ছিল। সে নাকি এখন আমাদের সাথে দুপুরের লাঞ্চ খাবে। 


 

পাবদা মাছ, কাতল মাছ, টাকি মাছের ভর্তা, ডাল ভুনা, খাসির মাংস, লাউ শাক, ডিমের কোর্মা, টমেটো চাটনি, আলু ভর্তা, বেগুন ভর্তা, সালাদ সাথে সাদা ভাত। আমার মায়ের কর্ম! সব খাবার যথেষ্ঠ পরিমাণে মওজুদ। মা’কে এর কমে রাজি করানো সম্ভব হয় নি। তার যুক্তি হলো, হোজ্জা ভিনদেশী মানুষ, নিজ দেশে ফিরে গিয়ে যেন বাংলাদেশের নাম করে। খেতে বসেছি আমি, হোজ্জা এবং বিশিষ্ট ছেলেটি। (ছেলেটির নাম কবির, এখন থেকে এই নামেই তার কারগুজারি উল্লেখ করব। খাবারের দিকে তাকিয়ে তার চোখ বেশ আনন্দিত মনে হচ্ছে।) হোজ্জা বললেন, তিন জন মানুষ এত আইটেম খাবার কীভাবে খাবো। বললাম, আপনি তো খেতে বেশ পছন্দ করেন হোজ্জা। তাই এত আয়োজন। 

 ‘তাই বলে এত খাবার। এত খেলে তো মনে হয় আর নড়াচড়া করতে পারব না। শুয়ে শুয়ে দিন কাটানো তো ভালো বিষয় নয় হে। আর এমনিতেও বুড়ো হয়েছি।’ 

আমি বললাম, আচ্ছা, সব খেতে হবে না হোজ্জা। আপনি যেটা পছন্দ করেন সেটা দিয়েই খেতে পারেন। 
নাসিরুদ্দীন হোজ্জা রুটি খেয়ে অভ্যস্ত। রুটির সাথে কোনো তরকারি। সহজ খাবার। কিন্তু ভাতের সাথে কোন আইটেম দিয়ে খেতে শুরু করবেন, কোন আইটেম দিয়ে শেষ করবেন– এই নিয়ে বোধয় তিনি কিছুটা দোটানায় আছেন, স্পষ্টই বুঝতে পারছি। 

খাবার পরিবেশনের ব্যাপারে আমি যথেষ্ঠই পারদর্শী। হোজ্জাকে পারফেক্ট সময়ে পারফেক্ট আইটেমটা প্লেটে দিয়ে সব আইটেমই খাইয়ে দিচ্ছি।  কবিরও আরাম করে খাচ্ছে। তার চেহারায় লাজুক ভাব। ফাঁকে দিয়ে নিজেও খাচ্ছি। হোজ্জা কবিরকে বললেন, কী করো তুমি,  বৎস?

আমি ভাবছি, চোর আবার কী করে? চুরিই তো করে। হোজ্জার আজীব প্রশ্নের মানে হয়?

কবির বলল, পার্ট টাইম চুরি করি। পার্টটাইম পড়ালেখা। হোজ্জা বললেন, আজীব! বড়ই আজীব। এই লাইনে এলে কীভাবে? 

কবির বলল, ভাবছেন আমি জুতা চোর। পুরাতন জুতা চুরি করে পোষায় না কারো। কত টাকা আর বিক্রি হয় পুরান জুতা। ইদানিং মসজিদে মসজিদে সি সি ক্যামেরা। 

আমি তাকে থামিয়ে বললাম, এই তুমি সি সি ক্যামেরার সরঞ্জাম ইত্যাদি চুরি করেছ কখনো? 
  –হ্যাঁ! করেছিলাম একবার। 
 –ওহ!
 –বাড়িওয়ালার উপর রাগ ছিল ভাই! সুযোগ মত শেষ রাতে ৫ তলা পর্যন্ত সব ক্যামেরা, রেকর্ডার, মনিটর যা যাবতীয় সব চুরি করেছিলাম। 
  –সেই বাড়িতে কেয়ারটেকার ছিল না?
  –না ছিল না। 

আমি হতভম্ভ। হোজ্জার দিকে লজ্জিত ভঙ্গিতে তাকালাম। হোজ্জার চেহারা ভাবলেশহীন। তিনি সুন্দর ভঙ্গিতে পাবদা মাছ ভেঙ্গে মুখে দিচ্ছেন। তার খাওয়া দেখে বুঝতে পারছি– রান্না অনেক মজা হয়েছে। আমি খাসির রেজালা তুলে দিলাম তার প্লেটে। তিনি কবিরের দিকে তাকালেন। বললেন, এখন তাহলে জুতা চুরি ধরেছ? 

কবির খেতে ব্যাস্ত। মুখ ভরা খাবার। সে পানি খেয়ে নিল। বলল, আমরা মূলত যাই মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ চুরির আশায়। 
–Oh! I see (আমি ও হোজ্জা একসাথে বললাম! হোজ্জা বললেন আরবি ভাষায়)
–ফাঁকে দামি জুতা পেলে তাও নিয়ে নিই। 
আমি বললাম, তুমি এই লাইনে এলে কীভাবে কবির ভাই!?

আমি তার প্লেটে ডাল দিলাম, তার খাওয়া প্রায় শেষ। সে লাউ শাক তুলে নিতে নিতে বলল, আমার এক আত্মীয় থাকে বর্ডার এলাকায়। বিশাল চোরাচালান। সে আবার হোজ্জার ভক্ত। ভালো কথা, হোজ্জার সাথে তাকে দেখা করায় দিতে চাই, সমস্যা আছে?

‘সমস্যা আছে।’ হোজ্জা রুঢ় কন্ঠে বললেন। চোরাচালান লোকটা আমার ভক্ত হলো কীভাবে? বানিয়ে বানিয়ে কথা বলছ হে?’

হোজ্জার চেহারায় রাগ ফুটে উঠছে। কবির কাচুমাচু করে বলল,  না হোজ্জা। শুনেন, সে কত বড় চোর। আমাকেও চোর বানায় দিছে সে। একদিন ডিওএইচএস মসজিদে আমাকে নিয়ে ঢুকল। ধনীদের এলাকা। যুহরের ওয়াক্তে নামাজের শেষে শেষে ঢুকেছি মসজিদে। এক চাকরীজীবি লোক তাড়াহুড়া করে দাঁড়াল মোবাইল মানিব্যাগ সামনে রেখে। আমার আত্মীয় পেছনে নামাজে দাঁড়াবে দাঁড়াবে ভাব করছে। যেমনি চাকরীজীবি লোকটি সিজদায় গেল, অমনি মোবাইল মানিব্যাগ টান দিয়ে নিয়ে নিল সে। মুহুর্তে মসজিদে থেকে বেরিয়ে গেল অন্য গেট দিয়ে। আমি তো যা  ভয় পেয়ে গেছি সেদিন। আমার বুক ধুকপুক শুরু করেছে। থামছিলই না। সেখান থেকে পাশের আরেক মসজিদে আসরের নামাজের সময় ঢুকলাম। নামাজ শেষ হয়ে গেছে। আমরা ওজুর ভান করে ওজুখানায় বসে আছি। দেখলাম এক দাড়িওয়ালা হাফেজ সাব ওজু করে তার ব্যাগ মসজিদের বারান্দায় একটা পিলারের কাছে রেখে ভিতরে নামাজ পড়তে গেল। ব্যাগের কথা ভুলে গেছে হয়ত!  বারান্দায় কেউ নাই। আমার সেই আত্মীয় আমাকে এমন একটা ধাক্কা দিল! ধাক্কা দিয়ে বলল, যা জিনিস নিয়ে ভাগ। এমন ভাবে ধাক্কা খেয়েছি, ঠিক ব্যাগের সামনে এসে পড়লাম। মাথা কাজ করছিল না। ব্যাগ নিয়ে সোজা ভেগে গেলাম। রিকশায় উঠে খুব ভয় লাগছিল। যদি ধরা পড়ি সব শেষ। ভয়ে ভয়ে ব্যাগ খুললাম। দেখি রাবারে বাঁধা টাকার তোড়া। গুনে দেখলাম ২৩ হাজার ৫০০ টাকা। এই যে চুরির জিনিসের প্রতি লোভ হলো। এই লোভ আর কমে না।


হোজ্জা ও আমার দুজনের চোখই বড় বড় হয়ে গেছে। এই ছেলে তো ভয়ানক চোর। জিজ্ঞেস করলাম, ভয়ানক চোর ভাই তোমরা। কিন্তু তোমার আত্মীয়কে চোরাচালান বললে যে?
  –সে মাঝে মাঝে ঢাকা এসে চুরি করে আবার ভাগে। মূলত সীমান্ত এলাকায় চোরাচালানে যুক্ত সে। 
 –সে হোজ্জার ভক্ত কীভাবে ? 

কবির কী বলে– তা শুনতে আমরা আগ্রহ নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছি। সবার খাওয়া শেষ। বললাম, দাঁড়াও হাত ধুয়ে নিই সবাই। তারপর তোমার গল্প শুনি। 

খাওয়া শেষে আধশোয়া হয়ে আছি সবাই। কবির বলল, এত কথা বলে দিচ্ছি। পরে আমাকে ফাঁসাবেন না তো? 
বললাম, হোজ্জা ফাঁসানোর লোক না। তুমি নিশ্চিন্তে বলো সব।  
‘হোজ্জাকে নিয়ে আমার চিন্তা নাই। আমি ভাবতেছি আপনার কথা। আপনি তো আর হোজ্জ না।’
বললাম, আমি হোজ্জা না হলেও হোজ্জার শিষ্য। তুমি নিশ্চিন্তে থাকো। 
কবির বলল, একটা গল্প আছে না? হোজ্জা ইরানি সীমান্তে চোরাচালান করে অনেক টাকাপয়সা বানিয়ে ফেলে। সীমান্তের প্রহরীরা ধরতে পারে না হোজ্জা কী চোরাচালান করেন। তারা দেখে– হোজ্জা প্রতিদিন গাধার পিঠে করে খড়ের বস্তা নিয়ে যাওয়া আসা করেন।  প্রহরীরা ছেড়ে দেয়। 
   –তা তো দেবেই।
  –মূল কাহিনী হলো, হোজ্জা প্রতিদিন গাধা চোরাচালান করেন। গাধার পিঠে থাকে খড়ের বস্তা। গাঁধার পিঠে খড়ের বস্তা রাখা হয় ধোঁকা দেয়ার জন্য।  প্রহরীরা বস্তা খোঁজাখুঁজি করে, কিছু পায় না। 

হোজ্জাকে কাহিনী সংক্ষেপে বুঝিয়ে বললাম। তিনি শুয়ে পড়েছিলেন। তিনি শোয়া থেকে উঠে বসলেন। তাকে ক্ষিপ্ত মনে হচ্ছে। তিনি বললেন, এই গল্প মিথ্যা। আমি এমন কাজ করি নি। আমার নামে কে এসব বানিয়েছে। খুবই কষ্টকর ব্যাপার। আমি মানুষটা অতি চালাক বা অতি বোকা হতে পারি, তাই বলে চোর না 

আমি হোজ্জাকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম। বললাম, আপনি কখনোই চোরাচালান করতে পারেন না। এগুলো মিথ্যা গল্প। 
কবির মনে হয় কিছুটা মুষড়ে গিয়েছে। চুপচাপ মাথা নিচু করে আছে। আমি মনে মনে চাচ্ছি হোজ্জার রাগ না কমুক। এই বিশিষ্ট ব্যক্তি কবির দ্রুতই আমাদের থেকে আলাদা হলেই ভালো। তাকে বললাম, তোমার আত্মীয় আর কোনো গল্প পেলো না? বেছে বেছে এই গল্পই অনুসরণ করল। আসলে গল্পটা বানানো হলেও মূল সমস্যা তোমার আত্মীয়ের, চুরি স্বভাব তার চরিত্রেই আছে। 

কবির বলল, হ্যাঁ, চিন্তা করেন, সে আমাকে পর্যন্ত চোর বানিয়ে দিয়েছে। সে সীমান্তে সাইকেল চোরাচালান করে। সাইকেলের মধ্যে থাকে বালুর বস্তা। সীমান্তরক্ষীরা বালুর বস্তা খুঁজে কিছু পায় না। তাকে ছেড়ে দেয়।  

হোজ্জা বেশ রেগে আছেন। তার চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে। তাকে কিছুটা বিমর্ষও লাগছে। আমি হোজ্জার মনোযোগ অন্যদিকে ফেরানোর উদ্দেশ্যে বললাম, খাবারগুলো আমার মা বানিয়েছেন। কেমন রান্না হয়েছে হোজ্জা? খেতে ভালো লেগেছে?  
  –হুম, রান্না ভালো হয়েছে– কিন্তু তোমার মা’কে ধন্যবাদ দিতে পারছি না। তাকে অধন্যবাদ। ধন্যবাদের বিপরীত।

হোজ্জার কথায় রাগ ঝড়ে পড়ছে। কবিরের উপর তৈরি হওয়া রাগ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে পড়বে বুঝছি না! আমি পরিস্থিতি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছি। চুপ থাকাই মনে হয় ভালো এখন।
হোজ্জা আবার বললেন, খাবারগুলো খেয়ে  আমার পেটের ক্ষুধা মিটেছে কিন্তু মনের ক্ষুধা মিটে নি। এত এত আইটেম, সব চমৎকার স্বাদ, সব গুলোই অল্প অল্প খেতে গিয়ে কোনোটাই ভালোমত খেতে পারলাম না। জিভের বিভিন্ন পয়েন্টে বিভিন্ন খাবারের স্বাদ লেগে আছে ।  জিভ সেই স্বাদ আরও পেতে চাইছে। এদিকে পেট ঢোলের সাইজ নিয়েছে। বড়ই অস্বস্তি । খাবার খাওয়ার পরেও আফসোস থেকে গেল। এক দুই আইটেম দিয়ে পেট ভরে খেলে বরং শান্তি পাওয়া যায়। তোমার মা আমার এই অস্বস্তির জন্য দায়ী। আমি দরিদ্র মানুষ, নিজের বাড়িতে যখন থাকব তখন তো এত এত খাবার পাবো না। রুটি, ডাল সবজিই আমি খাই। কোনো কোনো দিন মাংস জুটে। তোমাদের এই বহুপদী  খাবার খেয়ে মুখের যা রুচি তৈরি হবে, আমার বাড়ির সস্তার খাবার তো আর মুখে রুচবে না। তখনও থেকে যাবে আফসোস। আফসোস! বড়ই আফসোস। 

 

আমি এবার সত্যি সত্যি ঘাবড়ে গেলাম। হোজ্জার দৃষ্টিভঙ্গি বড়ই আশ্চর্য্য । তবে তাকে ভুলও বলা যাচ্ছে না। বললাম, হোজ্জা! রাতে তাহলে মাত্র দুই আইটেম করব। এতে সুবিধা হবে। হোজ্জা বললেন, রাতে আরো খাবার!  এত খাবার খেলে আমার ঘুম ভাঙ্গবে না সহজে। ঘুম খাওয়া চক্র চলতে থাকবে। ঘুম খাওয়া ঘুম। ঘুম খাওয়া ঘুম। 
আমি আতংকিত বোধ করছি। হোজ্জার রাগ বোধয় কমছেই না । বললাম, রাতে কিছুই খাবেন না, হোজ্জা?
হোজ্জা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, এক পোয়া ছাগলের দুধ কি ব্যাবস্থা করে দিতে পারো? গরম করে আবার ঠান্ডা করবে। সেই দুধ দিয়ে গলা ভেজাবো। 

গরুর দুধে চলবে কি না, হোজ্জাকে জিজ্ঞেস করব ভাবছি। ছাগদুগ্ধ তো দেশ থেকে উঠেই গেছে। এর মধ্যেই কবির বলল, হোজ্জা, আমি ছাগদুগ্ধের ব্যাবস্থা করতে পারব। আমার মায়ের পোষা রামছাগলের বাচ্চা হয়েছে মাসখানেক আগে। 
হোজ্জার চেহারা উজ্জ্বল হয়ে গেল। বললেন, যাক, আলহামদুলিল্লাহ। তুমি কাজের ছেলে আছো। খালি চুরিটা ছাড়ো। অন্য কোনো কাজ পার না?
কবির বলল, হোজ্জা, লজ্জার কথা আর কি বলব, পকেটমারির ট্রেনিং নিই মাস দুয়েক হলো! কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে চুরি পকেটমারি বন্ধ করে দিতে হবে।  তবে অন্য কোনো কাজ জানি না। 

হোজ্জা বললেন, আচ্ছা। দেখি কি করা যায়। খেয়েছ, এখন ঘুম দাও কিছুক্ষণ। আসরের পরে বের হবো ঘুরতে। 


ঘরের ফ্লোরের দু’দিকে দুটি বিছানা। হোজ্জা শুয়ে পড়েছেন। ছেলেটিও শুবে হয়ত। আমি শোয়ার আগে চারতলায় আমাদের ফ্লাটে গিয়ে মোবাইল মানিব্যাগ রেখে আসব। বলা যায় না, সরষের মধ্যে ভুত অবস্থান করছে। মানে ঘরের মধ্যে চোর । যদিও সে চুরি ছেড়ে দিবে বলেছে। তবুও সাবধানের মার নেই– এই নীতিবাক্য মেনে চলা অপরিহার্য্য মনে করছি।  

আসরের ওয়াক্ত। আসর নামাজ পড়ে বের হয়েছি। কবির চলে গেছে ছাগদুগ্ধ আনতে। এশার আগেই সে চলে আসবে বলেছে। অবশ্য আমি তার কথা বিশ্বাস করতে পারছি না। সে না এলে গরুর দুধ দিয়েই কাজ চালাতে হবে। 

Honda C 50  স্টার্ট দিয়েছি। পা দিয়ে সজোরে কিক মেরে মেরে স্টার্ট করতে হলো। মন্দ না। হোজ্জা আমার পেছনে বসেছেন। হোন্ডা গাধার মত কুৎসিত চি চি করছে না, তবে ভ্যাটভ্যাট শব্দ করছে। এই শব্দও  কুৎসিত। সমস্যা হলো ভ্যাটভ্যাট শব্দটা সার্বক্ষনিক। হোজ্জা বললেন, তোমাদের স্থানীয় রাজা বা বাদশাহর প্রাসাদ অঞ্চল ঘুরিয়ে আনো। বললাম, হোজ্জা এখন রাজা বাদশাহ তো নেই। তবে এলাকার ওয়ার্ড কমিশনার এক ধরণের রাজা বলতে পারেন। তার প্রাসাদতুল্য বাড়ি খুব দূরে নয়। চলুন ঘুরে আসি। 

হোন্ডায় চড়ে মধ্যম গতিতে চলছি। হোজ্জা কোনো সাড়া শব্দ করছেন না। পেছন ফিরে খেয়াল করলাম, তিনি আশপাশ দেখছেন। রাস্তায় তেমন জ্যাম নেই। চলে আনন্দ পাচ্ছি। মোটামুটি সুন্দর পরিবেশ। আকাশে মেঘ করেছে। বিকেলের আলো কিছুটা স্তিমিত। মৃদু বাতাস বয়ে যাচ্ছে। সব মিলে চমৎকার। আল্লাহর শুকরিয়া। 

কমিশনারের বাড়ির এলাকায় চলে এসেছি। এদিকের রাস্তা বেশ খারাপ। খানাখন্দে ভরা। রাস্তার পিচ উঠে গেছে অধিকাংশ জায়গায়। ঝাঁকুনি খাচ্ছি। হোজ্জা নিশ্চুপ। তিনি ঘুমিয়ে গেছেন নাকি আবার? ঘুমিয়ে গেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। কখন যে পড়ে যান ঘুমের ঘোরে…
  ‘হোজ্জা, ঘুমিয়েছেন?'
  ‘ঘুম আসছিল, ঝাঁকুনিতে ঘুম কেটে গেছে।’
  ‘বাহ!  তাহলে ভালোই হয়েছে!’

সব কিছুর উপকার আছে। ঝাঁকুনিরও যে উপকার আছে, তা দেখতে পেলাম আজ। উঁচু নিচু রাস্তা। ঝাঁকুনি সহ্য করে চলছি। সামনের দিক থেকে একটা পিক-আপ আসছে । রাস্তা সংকীর্ণ। বাধ্য হয়ে এক পাশ দিয়ে হোন্ডা চালিয়ে নিতে হচ্ছে আমাকে। সামনে একটা গর্ত পড়ে গেল । উপায় নেই। চালিয়ে দিলাম। মাইল্ড স্ট্রোকের মত মাইল্ড ঝাঁকুনিতে সিট থেকে ফুটখানেক উপরে উঠে গেলাম। ‘সর্বনাশ!’ সম্মিলিত চিৎকার করে উঠলাম আমি এবং হোজ্জা।
পিকাপ আর হোন্ডার সম্মিলিত শব্দ দূষণে আমাদের চিৎকার বোধয় মিলিয়ে গেল। 

 

কিছুদুর গিয়েই হোন্ডা থামালাম। এখন শান্তি!


কমিশনারের বাড়ির সামনেই দাঁড়িয়েছি। দেখছি। সাদা মার্বেলের মোটা মোটা পিলার বাড়িটাকে সুরম্য রূপ দিয়েছে। হোজ্জা বললেন, বাড়িটা মনে হচ্ছে জুতসই। কিন্তু তোমাদের কমিশনার রাজা মশাইয়ের বাড়ির সামনের রাস্তা এত খারাপ কেন? অন্যদিকের রাস্তা তো মোটামুটি ভালোই। এমন ঝাঁকুনি খেলাম– আমার বুড়ো হাড় তো আরেকটু হলে ভেঙ্গে যেত।

আমি চুপ করে আছি। হোজ্জার কথা সত্য, এড়ানোর উপায় নেই।

 বললাম, হোজ্জা, এই রাস্তাটা বরং ফিরে যাওয়ার সময় হেঁটে হেঁটে যাবো। তিনি বললেন, ভালো বুদ্ধি। তবে কমিশনারটা আস্ত বোকা মনে হয়। নিজের বাড়ির সামনের রাস্তা এমন ভাঙ্গা। 

বললাম, উনি বোকা না, হোজ্জা। নিজ এলাকার মানুষজন তাকে ভোট দেয় না। তাদের শায়েস্তা করার উদ্দেশ্যে উনি এই রাস্তা মেরামত ঠেকাতে ক্ষমতার ব্যবহার করেছেন। নিজের চলাচলে একটু সমস্যা না হয় হলো, পাবলিককে তো শায়েস্তা করা গেল। আপনি যেমন লবন বহনকারী গাধাকে শায়েস্তা করার জন্য অনেকগুলো তুলা কিনে বস্তায় ভড়লেন। সেই বস্তা পিঠে নিয়ে গাধা নদীতে ডুব দেয়ামাত্রই ওজন কয়েকগুন বেড়ে গেল। দুষ্টু গাধা শায়েস্তা হলো। যদিও আপনার অনেকগুলো দামি তুলা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। মনে হয় একই ঘটনা।

কীসের সাথে কী যে মিলাচ্ছি! হোজ্জা থমকে আছেন। আমিও চুপ করে গেলাম। 
হোজ্জা হঠাৎ বললেন, ক্ষামোশ! সেদিন গাধাকে শায়েস্তা না করলে সে তো প্রতিদিন আমার লবনের বস্তা নদীতে চুবাত। তাকে  শায়েস্তা না করে উপায় কী?
বললাম, তাও বিবেচনার বিষয়। আমার অযাতিত মন্তব্যের জন্য দুঃখিত, হোজ্জা। ক্ষমা করবেন। 
হোজ্জা তাকিয়ে আছেন আমার চোখ বরাবর।  হঠাৎ আমার পিঠে হাত রেখে দুবার চাপড়ে দিলেন। আমি সেটাকে তার ক্ষমার নিদর্শন ভেবে নিলাম।

 

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাড়ি দেখার কিছু নেই আসলে। কমিশনারের বাড়ি দেখার প্রতি হোজ্জারও কোনো আগ্রহ লক্ষ্য করছি না আর। আমারও আগ্রহ নেই। কি আছে এই বাড়িতে? কমিশনার নিজেই এখন পলাতক। তার বাড়ি খান খান ফাঁকা। শুনশান নিরবতা। হোজ্জাকে বললাম, চলুন ফিরে চলি। 

আমরা (আধুনিক) গাধা হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে নিজেরাও হেঁটে চলছি। সামনের মূল রাস্তা পৌঁছেই আবার গাধার পিঠে সওয়ার হবো। গাধা আর বিশ্রাম পাবে না। ভ্যাট ভ্যাট শব্দে তাকে চলতে হবে। 

                                                                  (৩) (নতুন পাতা)


আজ প্রচুর রোদ পড়েছে। তপ্ত দুপুর। যুহর পরে বাসা চলে এসেছি। সাথে আমার বন্ধু মাসুম। বসে আছি ঘরে । মাসুম একজন অতি ধনী ছেলে (পৈতৃক সূত্রে) । সে নিজে কিছু করে না বললে ভুল হবে, দুই দুইটি আইফোন চালায়। আপডেট ভার্সন। দেখছি, মাসুমের চোখ লালচে। দৃষ্টি করুন। এলোমেলো চাহনী। মনে হচ্ছে কিছুক্ষণ আগেই ফুঁপিয়ে কেঁদেছে। এত হাসিখুশি উতফুল্ল ছেলেটা কাঁদবে কেন?
  ‘মাসুম! কান্নাকাটা করেছিস নাকি রে?’
  --যা ইচ্ছা করেছি। 


মাসুমের কন্ঠে ক্ষোভ। ফ্লোরে সে হাত পা ছড়িয়ে বসে পড়েছে দেয়ালে হেলান দিয়ে। সিলিং এর দিকে তাকিয়ে আছে ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে । হঠাৎ বলল, জীবন বড় করুনার রে, মুরাদ। বড়ই নিরানন্দ। 
মাসুমের দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন হোজ্জা আর কবির (বলতে ভুলে গেছি, কবির ঠিকই ছাগদুগ্ধ নিয়ে এসেছিল গতকাল। সে হোজ্জার পিছু ছাড়ছে না।)  
আমরা সবাই মাসুমের দূর্দশার কারণ জানতে আগ্রহী হলাম। 

কারণ জানা গেল। মাসুমের গার্লফ্রেন্ড (?) মহিমা তাকে ছেড়ে এমন একটা ছেলের সঙ্গ নিয়েছে– যার চাল চুলো নেই। নাম আজগর আলী। নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে। দেখতেও তেমন না। (মাসুম বেশ হ্যান্ডসাম)। তবে আজগর আলী ছাত্র বেশ ভালো। 

মাসুমের কন্ঠস্বর আর্দ্র। বিষাদময়।

‘মহিমা  কাকে ছেড়ে কাকে ধরল, মুরাদ?  দীর্ঘ্য (!) ৫  মাস ১৭ দিনের  সম্পর্ক ত্যাগ করে এক  আজগরের আলীর হাত ধরল। জীবনে অপমানের আর কী বাকি আছে?’
বললাম, অপমান না মন ভেঙ্গে খান খান? 

সে বলল, দুইটাই। 

মাসুম বলে যাচ্ছে– ভেবে দেখ, মহিমাও অবস্থাসম্পন্ন ঘরের মেয়ে। সে এমন একটা লো ক্লাস ছেলের সাথে সম্পর্ক করবে আমাকে ছেড়ে– এটা ভাবলেই সুইসাইড করতে ইচ্ছা করছে। করবও হয়ত। 

মাসুম দু হাতে চেহারা ডলছে। চোখের পানি ঢাকছে হয়ত। বললাম, শুয়ে পড়, বিশ্রাম নে। সে বলল, জীবনে কোনো বিশ্রাম নাই। এই মেয়েটাকে সিরিয়াসলি ভালোবেসেছিলাম। তার জন্য টাকা খরচ করেছি বন্যার পানির মত। কোন চাওয়া বাদ রাখি নাই।

আমি বললাম, দোস্ত, ফ্রী প্রেম প্রীতির এই যুগে কিভাবে আটকাবি এইসব? তোর নিজেরও তো অতীত আছে। আর মহিমা ধনী পরিবারের মেয়ে তো কী হয়েছে? ধন-সম্পদ প্রাচুর্য্যের মধ্যে থেকে থেকে অরুচি এসে গেছে হয়ত তার। একঘেয়েমী! হয়ত সে লাইফে নতুনত্ব চায়। এজন্য একটা নিম্নবিত্ত ছেলের সাথে সম্পর্ক করে নতুন ধরণের সুখ খুঁজছে। এডভেঞ্চার বলতে পারিস। 


আমার দার্শনিক টাইপের কথা বার্তা হোজ্জা ও কবির উভয়েই আনন্দ নিয়ে শুনছে মনে হচ্ছে। হোজ্জার চোখে সন্তুষ্টির ছাপ। কিন্তু মাসুম ধমকে উঠল।  
   ‘তুই বন্ধু নামের কলঙ্ক। এদিকে আমার জীবনে সুইসাইড করা কষ্ট, আর লেকচার শুরু করছে লেকচারার সাহেব। যখন সুইসাইড করব তখন লেকচার লেকচার বন্ধ হবে।’
বললাম, মাসুম, এক কাজ কর। হোজ্জাকে সব খুলে বল। দেখ তিনি কোনো উপায় করে তোর কষ্ট দূর করতে পারেন কি না। 

মাসুম হোজ্জার দিকে তাকালো। চোখে দুঃখ দুঃখ ভাব। কিছুটা লাজুকতা। হোজ্জা বললেন, চিন্তা করো না ,বৎস। সব ঠিক হয়ে যাবে। কোনো কিছুই বেঠিক থাকেনা। 

হোজ্জা আমার উদ্দেশ্যে বললেন, আজ দুপুরের খাবার কী করেছ? 
   ‘খাসির মাংস, ডাল ভুনা, সাদা ভাত।’
   ‘নিয়ে এসো দ্রুত। সবাই মিলে খাবো।’


মাংস রান্না এতই চমৎকার হয়েছে যে, হোজ্জা মুখে নিয়ে আনন্দে চোখ বন্ধ করে ফেলছেন। তিনি আরাম করে খাচ্ছেন। 
‘আলহামদুলিল্লাহ! কী সুস্বাদু! মাসুম বৎস, মজা করে খাও। দেখ, জীবন কত আনন্দের। এত উপাদেয় খাসির মাংস সব সময় পাওয়া যায় না। খাসিটার বয়স মনে হয় কম। তুলার মত নরম মাংস।’
মাসুম বলল, হোজ্জা, খাসির মাংস, উটের মাংস আর সাদা পানি আমার কাছে সব সমান হয়ে গেছে। জীবনটাই পানসে। 
হোজ্জা বললেন, পিপাসা পেলে পানি কিন্তু খুবই উপাদেয় পানীয়!
মাসুম বলল, আমার জীবনে কোনো পিপাসা নেই। সব পিপাসার মৃত্যু হয়েছে। 

মাসুম সত্যিই কয়েক লোকমা খেয়ে উঠে পড়ল। বললাম, দোস্ত, না খেলে শরীর নষ্ট হবে। সকালে কী খেয়েছিস? 
  –খাসির কাচ্চি খেয়েছি। কাচ্চিওয়ালা জোড় করে খাওয়ালো। পকেটে মোটা মানিব্যাগ নিয়ে ঘুড়ি। জোড় তো করবিই! খেলাম। অখাদ্য। জীবনটাই অখাদ্য। শুধু বেদনা আর কষ্ট।

হোজ্জা মাসুমের দিকে তাকিয়ে বললেন, জীবনটা বড়ই নিরানন্দ করে ফেলেছ হে! 



 

সারাদিন মোটামুটি বিশ্রামে কাটল। হোজ্জার শরীর একটু খারাপ। বললেন তার বিশ্রাম দরকার। 
ইশার নামাজ শেষে বাইরে হাঁটতে বের হয়েছি সবাই। আমাদের ছোটখাট দল । হোজ্জা, আমি, কবির ও মাসুম। আমি আর হোজ্জা সামনে। এটা সেটা গল্প করছি। তিনি আমাদের দেশের বিষয়ে অনেক কিছুই জিজ্ঞেস করছেন। আমি সাধ্যমত তথ্য দিচ্ছি। মাসুম ও কবির আমাদের পিছু পিছু পাশাপাশি হাঁটছে। তাদের মুখে কথা নেই। দুজনেই আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। শূন্য দৃষ্টি। 

হোজ্জা জিজ্ঞেস করলেন আমাদের দেশের রাজা সম্পর্কে। জানালেন, তার সময়কার কোনো অঞ্চলের রাজা সেই হত, যে জনগনকে নিরাপত্তা দেয়ার মত বীর বাহাদুর। সেই সময়ে মোঙ্গল হামলায় মুসলিম অঞ্চলগুলোর অবস্থা ছিল সঙ্গীন। হোজ্জা সে সময়ের কিছু করুন ঘটনা শোনালেন। এক তুর্কি গোত্রপতির সাহসীকতার কথাও শোনালেন। আমি তাকে জানালাম, আমাদের রাজাকে বলা হয় প্রেসিডেন্ট। তাকে হতে হয় নিরীহ। চুপ থাকার গুন থাকতে হয়। আমাদের বর্তমান রাজা চুপ থাকতে বিশেষ পারদর্শী। তার উপাধীতেই ‘চুপ” শব্দটা যুক্ত হয়ে গেছে। তবুও মাঝে মাঝে দুই একটা কথা বললেই জনগন বলে– চুপ, চুপ। তাকে আবার নিয়োগ করেছিল এক বয়স্কা মহিলা। 

হোজ্জা আমার কথার মানে ঠিকমত বুঝতে পারছেন না মনে হয়। তিনি তার দাড়িতে হাত বুলাচ্ছেন। থমকে আছেন। ভাবলাম, আমার কথাগুলো ব্যাখ্যা করি। তাকে অনেক তথ্য দিয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝালাম। কিন্তু বুঝে তিনি তৃপ্ত হলেন– এমন মনে হলো না । বরং তার বিভ্রান্তিই মনে হয় বেড়ে গেল। দুষ্ট খোকার কল্পিত রাজা নিয়ে বলা কবিতা টাইপ। কয়েক লাইন মনে পড়ছে, 
…একদিন সেই রাজা, 

ফড়িং শিকার করতে গেলেন, 
খেয়ে পাপড় ভাজা!

আমি রাজনৈতিক বিষয় এড়িয়ে অন্য কোনো আলাপ শুরুর চেষ্টা করছি। রাত প্রায় সাড়ে নয়টা বাজে। রাস্তায় হাঁটতে হচ্ছে সাবধানে। মোড়ে মোড়ে সারি করে কুকুর বাহিনী শুয়ে আছে। রাস্তা তারাই দখল করে রেখেছে একরকম। 

এলাকায় চক্কর দেয়ার মত ঘুরে ফিরে বাড়ির অভিমুখে পথ ধরেছি। কিছু পথ আসতেই মধ্যম উচ্চতার, মাঝারি গড়নের এক লোক আমাদের পথ আটকালো। তার মুখে মাস্ক। উদ্দেশ্য বোঝা যাচ্ছে না। আমি তাকালাম তার চোখের দিকে। তাকে বোঝার চেষ্টা। 
লোকটি বলল, ভাই, আমাকে কিছু সাহায্য করেন। বলতে লজ্জা লাগে কিন্তু আমার ঘরে আজ কোনো খাবার নাই। 
লোকটির পাঞ্জাবী বেশ সুন্দর, দামী মনে হচ্ছে। পরখ করে দেখলাম– তাকে ভিক্ষুকের মত লাগে না। হোজ্জা বললেন, কী চায়? হোজ্জাকে জানালাম। 
আমি ১০০ টাকা একটা নোট দিলাম লোকটির হাতে। বললাম, আল্লাহ রহম করুন। 
লোকটি মনে হয় খুশি হলো। কারণ সে মাস্ক খুলে ফেলল। উজ্জ্বল গৌড় বর্ণের চেহারা। আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু একটা অপমানিত, ভরসাহীনতার ছাপ পড়েছে। তিনি মুখ খুললেন। বললেন, আমি ধনী মানুষ ছিলাম ভাই। আমার ৫ কোটি টাকার জমি এক লোক কমিশনারের সাথে হাত করে দখল দিয়েছিল। আমি সর্বশান্ত হয়ে গেছি। মামলা করলাম। সেই লোক রেগে এমন মামলার প্যাঁচে ফেলল। বাড়ি পর্যন্ত বিক্রি করতে হইছে। ধার দেনায় শেষ হয়ে গেছি। আত্মীয়স্বজনকে মুখ দেখাতে পারি না। 
লোকটির কন্ঠ কাঁপছে। চোখ দিয়ে পানি ঝড়ছে। আমি তার কথা বিশ্বাস করব নাকি অবিশ্বাস করব বুঝছি না। ফ্রডে ভরে গেছে সব জায়গা। লোকটি তখন  আমাদের অবাক করে দিয়ে, ইংরেজিতে কথা বলা শুরু করল। 
I am not a man what you think. I am an educated person. Dhaka university graduate. I am a victim of deception. Now a beggar. 

ভদ্রোলোক ইংরেজিতে কথা বলে তার শিক্ষা ও যোগ্যতার প্রমাণ দিতে চাইছেন। আমরা তার কথা বিশ্বাস করলে তিনি মনে স্বান্তনা পাবেন, এই হয়ত চাওয়া। 
কীভাবে তাকে সান্তনা দেয়া যায়? ভাবছি। বললাম, মুহতারাম আপনার নামটা বলা যাবে?
  --জি, আমি নাসিম। নাসিম মল্লিক।

 --আচ্ছা। 
নাসিরুদ্দীন হোজ্জার দিকে ইঙ্গিত করে বললাম, আর ইনি বিখ্যাত নাসিরুদ্দীন হোজ্জা! 
দেখি লোকটির প্রতিক্রিয়া কী হয়!

লোকটি আনন্দিত চোখে তাকাল । হোজ্জার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। হোজ্জা মোসাফাহা করলেন। তার জন্য দুআ করলেন। দুআ শুনে লোকটি হোজ্জাকে বললেন, যেই লোক আমার এই দূর্দশা করেছে তার জন্য কিছু বদ দুআ করেন। অথবা আমাকে এমন বদ দুআ শিখিয়ে দেন যেন তার জীবন অতিষ্ঠ হয়ে যায়। আপনি মোল্লা মানুষ এজন্য জিজ্ঞেস করছি। 

লোকটির এমন কথা হোজ্জা প্রত্যাশা করেন নি হয়ত। তিনি চুপ করে গেলেন। আমি দাঁড়িয়ে দেখছি তাদের। মাসুম ও কবির পিছিয়ে পড়েছিল। তাদের আসতে দেখা যাচ্ছে। কবির কী যেন বলছে। মাসুম চুপ করে আছে। 

হোজ্জা বললেন, একটা বদ দুআ শিখিয়ে দিতে পারি তোমাকে নাসিম সাহেব। কবুল হলে কাজ হতে পারে। 
   –কী দুআ, হোজ্জা?
   –তুমি দুআ করো ঐ লোক, যে তোমাকে ঠকিয়েছে, সম্পত্তি আত্মসাৎ করেছে, সে যেন শতভাগ সৎ মানুষ হয়ে যায়। 
    –মানে কী হোজ্জা? আমি তো বদ দুআ শিখিয়ে দিতে বলেছিলাম। 
   –হ্যাঁ, তোমার দুআ অনুযায়ী সেই লোক শতভাগ সৎ হয়ে গেলে, তার সততার কারণে সে পদে পদে যন্ত্রনার স্বীকার হবে। কাছের দূরের সবাই তাকে ঠকাবে। তাকে বোকা ভাববে। ঠাট্টা করবে। সে চূড়ান্ত গরীব হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও আছে। ভেবে দেখ। তার জীবন হয়ে যাবে অতীষ্ঠ। সমাজে বাস করা হয়ে যাবে কঠিন। 

আমি থমকে গেছি। হোজ্জার কী আজীব কথা বার্তা! লোকটি পর্যন্ত চুপ করে আছে। দুআ’টা তার মনে ধরেছে কি না কে জানে! তার শরীর কেমন কেঁপে কেঁপে উঠছে। হঠাৎ হাউমাউ করে কাঁদছে শুরু করল সে। এরপর হোজ্জাকে জড়িয়ে ধরল।
হোজ্জা নাসিম সাহেবের পিঠ চাপড়ে সান্তনা দিতে লাগলেন। 

বাড়ি ফিরেই ধুন্দুমার কান্ড ঘটে গেল। মাসুম আর্তচিৎকার করছে। তার দুইটা ফোন, মানিব্যাগ নেই। পকেট থেকে নেই। চুরি হয়েছে। বললাম, এই, কত টাকা ছিল মানিব্যাগে? 
    –ছিল ২৭ হাজার টাকা। মোবাইল দুইটার দামই তো ২ লাখ। 
    –এত ভারি মানিব্যাগ, দুইটা মোবাইল পকেট থেকে নাই হয়ে গেল, বুঝলি না তুই!
    –পকেটে অন্য মানিব্যাগ দেয়া, আর টাইলসের ভাঙ্গা! 
    –বলিস কী!

মাসুম টাইলসের দুইটা টুকরা ছুড়ে মারল বিছানায়। তাকে দেখে মনে হচ্ছে– রাগে দুঃখে মাথার চুল ছিড়তে চাচ্ছে । 
ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই থমকে গেছি ।  কোমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। মাসুমকে কী বলা যায় বুঝছি না। সে গজগজ করছে। ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল।
   ‘এক লোকের সাথে রাস্তায় দুই দুবার ধাক্কা খাইছি। ঐ ব্যাটাই মনে হয় পকেটমারি করছে।’ 
  –তুই শিওর?
 –আরে শিওর শিওর? আমার মানিব্যাগ, মোবাইল নাই এটাই শিওর। আমার গার্লফ্রেন্ড আমাকে ছ্যাকা দিছে এটা শিওর। আ আ আ। 

উত্তেজিত মাসুমকে সান্তনা দেয়ার চেষ্টা করছেন হোজ্জা আর কবির। হোজ্জা বললেন, রাতের খাবার নিয়ে আসো। আমি বললাম, হ্যাঁ, দ্রুত আসছি ইন শা আল্লাহ। দুপুরের খাবারের বাটি, টিফিন ক্যারিয়ার, প্লেট ইত্যাদি ব্যাগে ভরা আছে। এগুলো পাল্টে আবার খাবার নিয়ে আসতে হবে। আমার শরীর হালকা কাঁপছে। কি হতে কি হয়ে গেল!

চারতলায় আমাদের ফ্লাটে যেতে হবে । সিঁড়ি বেয়ে উঠছি। হঠাৎ আমার মনে অজানা ভীতি জেঁকে বসল। মোবাইল, মানিব্যাগ কবির চুরি করে নি তো? সে বলছিল, সে দুই মাস থেকে পকেটমারি ট্রেনিং নিচ্ছে।
সর্বনাশ! 

বাসা এসে টিফিন বাটির ব্যাগ খুলছি। ভুত দেখলেও এতটা চমকাতাম না বোধয়। কারণ, ব্যাগে একটা মানিব্যাগ, দুইটা আইফোন। মাসুমের! 
গা শিউরে উঠেছে আমার। আমি হতভম্ভ। ঠায় দাঁড়িয়ে আছি। মা এসে বললেন, কী রে খাম্বার মত দাঁড়ায় আছিস কেন? কী হইছে? 
 –মা তুমি যাও। আমি আসছি। 

ভাবিছি– ফোন, মানিব্যাগ কী করব? মাসুমকে কি দিয়ে দিব? বেচারা হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে তাহলে। 
নাকি অপেক্ষা করব ঘটনা বোঝার জন্য? কিছু না বুঝে পদক্ষেপ নিলে আবার কোন প্যাঁচে পড়ে যাই। সন্দেহের তীর না জানি আমার দিকে আসে! অপেক্ষা করাই নিরাপদ । ঘটনার পেছনে কবিরের ভুমিকা আছে সুনিশ্চিত। সে কী ফোন লুকাতে না পেরে এখানে রেখে দিয়েছে? কী যে ঝামেলায় পড়লাম। 

রাগ, বিরক্তি, ভয়ে  আমার অবস্থা কেরোসিন কিংবা ডিজেল। (আমার নিকট চুরি অতি ভয়ানক একটা জিনিস)। ছটফট লাগছে। সিঁড়ি দিয়ে নামছিও অতি দ্রুত। কখন যে পা পিছলে! আল্লাহ রক্ষা করুন। 

খাবার নিয়ে হোজ্জার ঘরে ঢুকলাম। দেখি এক মধ্যবয়সী লোক আর তার ছোট শিশুকন্যা এসেছে। হোজ্জার সাথে ছবি তুলছে। আমার রক্তশূন্য চেহারা হোজ্জা খেয়াল করলেন। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ । এর অর্থ হয়ত– শান্ত হও, সব ঠিক আছে। সব ঠিক আছে মানে? 

ছোট্ট মেয়েটার বয়স হবে ৬/৭ বছর। সে বলছে– হোজ্জা আরেকটা ছবি, আরেকটা ছবি! মেয়েটির বাবা বলছে– হোজ্জা, কিছু মনে করবেন না। আজকালকের ছেলে মেয়ে যা হয়েছে। আর আমার মেয়ে তো এক ধাপ এগিয়ে। কোনো কিছুতে না করতে পারি না। কোনো কিছু চেয়েছে, দিই নি। তো কঠিন হুমকি দিবে। 
হোজ্জা বললেন, কী হুমকি দেয়?
    ‘পরীক্ষার খাতা ফাঁকা রেখে আসবে, লিখলেও ভুল লিখবে সব– এই হুমকি। আমি ভাবছি বাচ্চা মানুষ রেগে মেগে বলছে। কিন্তু পরে দেখি প্রত্যেক পরীক্ষায় ফেইল করেছে। অথচ তার সব পড়া। এরপর থেকে সাবধান হয়ে গেছি।’ 
      ‘ওহ হো।’

মাসুম হাত পা ছেড়ে দিয়ে শুয়ে আছে। তার দৃষ্টি সিলিং এর দিকে নিবদ্ধ । চেহারা থমথমে। একই সাথে সে রাগত, দুঃখিত, হতবাক, হতাশ। কবির তাকে বলল, বড় ভাই। আপনি অনেক ক্লান্ত। পা গুলা টিপে দেই? আরাম পাবেন। ছোটবেলায় বাবার পা টিপছি অনেক। 
মাসুম কোনো কথা বলছে না। মনে হচ্ছে সে কবিরের কথাই শুনতে পায় নি। কবির নিজ উদ্যোগে তার পা টিপতে শুরু করল। নাসিরুদ্দীন হোজ্জা ছোট্ট মেয়েটির সাথে কথা বলছেন। 
    ‘মামনি, তুমি আমার সাক্ষাতে এসেছ, কিন্তু আমার সাথে তো কোনো কথাই বলছ না। শুধু ছবি তুলছ! এটা কি ঠিক?’
    ‘ছবিগুলো কাল আমার বান্ধবীদের দেখাবো। নিজেও দেখব। অনেক মজা হবে।’ 
     ‘অনেক ছবিই তো তুললে! কিন্তু কোন আলাপই হলো না তোমার সাথে!’
       ‘আপনার ছবি তুলে রাখছি না? ছবিগুলো পরে দেখব বাসায় বসে।’
       ‘ওহ, জলজ্যান্ত আমার সাথে কথা বলার কোনো আগ্রহ পাচ্ছ না তাহলে।’
        ‘আপনার গোলমেলে কথা কিছুই বুঝছি না আমি। আপনি বৃদ্ধ হয়েছেন বলেই কি এমন গোলমেলে কথা বলেন?’ 
        ‘তোমার কথার কী উত্তর দিব আমি বুঝতে পারছি না, মামনি।’ 

মেয়েটির বাবা এতক্ষণে কথা বললেন, হোজ্জা, কিছু মনে করবেন না। ছোট বাচ্চা মেয়ে। 
হোজ্জা বললেন, না কিছু মনে করি নি। 

ভদ্রলোক মেয়েকে নিয়ে বিদায় নিলেন। কবির পা টিপছে মাসুমের। মাসুম ঘুমিয়ে পড়েছে। খাবার খাওয়ার আগে এটাই সুযোগ। মোবাইল, মানিব্যাগ জটিলতার সমাধান করতে হবে। হোজ্জাকে জিজ্ঞেস করব, তিনি ঘটনা কিছু জানেন কি না।

আমি খুবই আশ্চর্য্য হয়ে শুনছি । হোজ্জাই নাকি কবিরকে বলেছেন মাসুমের মোবাইল, মানিব্যাগ চুরি করতে! কবির তাই করেছে। অতি চমৎকার ভাবে করেছে। মাসুম কিছুই বুঝতে পারে নি। 
আমার অস্থিরতা কিছুটা কমল । সব যেহেতু হোজ্জার পরিকল্পনা, ইনশাআল্লাহ ভালো কোনো সমাধান হবে। কিন্তু কী সেই সমাধান? অপেক্ষায় থাকি। এদিকে বেচারা মাসুমের যা অবস্থা। আরেকটা ব্যাপার আমাকে ভাবাচ্ছে । কবিরের চুরি বিদ্যার পারদর্শিতা! এই ছেলে সাংঘাতি চোর। তার দিকে তাকালাম। সে অদ্ভুত হাসি দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এই হাসির অর্থ কী? পাত্তা না দিয়ে বললাম, এই জনাব, মাসুমকে ডাক। খাব সবাই। 


 

চুপচাপ খাচ্ছি। কারো মুখে কথা নেই। মাসুমের অবস্থা– অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর, নিরবতা হিরন্ময়।

বসে আছি আমরা । খাওয়া শেষ। হোজ্জা ঘরের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করছেন। আরেকটা সিঙ্গেল তোষক নিয়ে আসব ভাবছি। মাসুম রাতে থাকার কথা। কিন্তু হঠাৎ সে মত বদলাল। থাকবে না। বললাম, রাতে ভালো মত ঘুমা। আল্লাহ চাইলে একটা ব্যাবস্থা হবে ইন শা আল্লাহ। 
সে আমাকে উপেক্ষা করে কবিরের দিকে তাকাল।  বলল, পা টেপাটা এত মজা লাগছিল। ১০/১৫ মিনিট গভীর ঘুমিয়েছি। শরীর ঝরঝরা লাগছে। আজ রাতে আর ঘুমানোর দরকার নাই। যেভাবে হোক পাত্তা লাগাবো– কে ফোন মানিব্যাগ চুরি করেছে। কিছু গ্রুপ আছে ওদের টাকা খাওয়াতে হবে খবর বের করার জন্য। থানায় জানাতে হবে। 

মাসুমের চোখেমুখে একটা সিন্সিয়ার সিন্সিয়ার ভাব। কথা বলছে ডিটেকটিভ ভঙ্গিতে। মনে হচ্ছে সে ভালো একটা কাজ খুঁজে পেয়েছে। উত্তেজনা বোধ করছে। সে দাঁড়িয়ে পড়েছে। কবিরকে বলল, কবির, যাবা আমার সাথে? যদি চোররে পাইছি। আচ্ছামত বানাবো। আমার পা যেমন বানাইছো। চোররে তেমন বানাইতে হবে। পারবা না ?
কবির বলল, পারব বস। 
এমন ভঙ্গিতে সে “পারব বস” বলল– মনে হয় আসলেই সেই চোরকে পেটাতে উদগ্রীব। 
মাসুম বলল, চলো তাহলে। সময় নাই।


কবির মত বদলাল। সে মাসুমের সাথে যেতে রাজি হচ্ছে না। সে ভালো করেই জানে চোরকে রাস্তায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। মাসুমকে বলল, ভাই এত ঘুম পাইছে! ঘুমালে ভালো হত এখন।  কাল সকালে কিছু করতে পারি কি না দেখা যাবে!
মাসুম ঘোষণা দিল— যত দ্রুত সম্ভব জিনিসের পাত্তা লাগাতে হবে। দেরি করলে মিস হয়ে যাবে। একাই যাবে সে। 

হোজ্জার কাছে বিদায় নিয়ে মাসুম চলে গেল। গেটে তালা দিয়ে ফিরে এসে দেখি হোজ্জা ঘুমিয়ে পড়েছেন। কবিরও শুয়ে পড়েছে। আমাকে দেখে বলল, মুরাদ ভাই! নিজেকে নিজে পেটাবো কীভাবে, বলেন তো? বললাম, হাতে লাঠি নিয়ে নিজের পায়ে বাড়ি দিবা। 
  –ভয় লাগতেছে মুরাদ ভাই! কোনোভাবে যদি মাসুম ভাই জেনে ফেলে?
  –মাসুমের সাথে খাতির লাগাও। মাফ পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। 
  –কোন প্যাচে যে পড়লাম! অবশ্য হোজ্জা সব সামাল দিবেন আশা করি। মাসুম ভাই কি আগামীকাল আবার আসবেন?
  –হুম, আসার কথা। মজার ব্যাপার কী জানো কবির?
  –কী ভাই?
  –মাসুমের হতাশা, মনঃকষ্ট হঠাৎ নাই হয়ে গেছে। তার আচার আচরণ কিছুটা হলেও স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে! খেয়াল করেছ?
  –তাই তো! হোজ্জার কি এরকমই প্ল্যান ছিল?
  –আল্লাহু আ’লামু! 


 

হোজ্জাকে কিছু জিজ্ঞেস করা গেল না। তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। গভীর ঘুম। মৃদু নাক ডাকার আওয়াজ পাচ্ছি। আমিও শুয়ে পড়ব। হাই আসছে। ঘুমানো দরকার। আগামীকাল নতুন কি এডভেঞ্চার অপেক্ষা করছে কে জানে! বন্ধু মাসুমের প্রতি সমবেদনা। আহারে। একা একা কী করবে সে রাতে?



 

                                                                       (৪)


মাসুম

আমি মাসুম। রাস্তায় রাস্তায় হাঁটছি। এলোমেলো হাঁটা। কিছু ভালো লাগছে না। চোর ধরার ব্যাপারে যে উত্তেজনা বোধ করেছিলাম, এখন তা আর নেই। মনে পড়ছে মহিমার কথা। প্রবল কষ্ট আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। মহিমা হারালো, দুটা আইফোন হারালো, টাকা সহ মানিব্যাগ হারাল। এরপরেও আমি কীভাবে প্রায় স্বাভাবিক আছি? অদ্ভুত। 

বন্ধু মুরাদের সাথে হোজ্জা সাহেবের পাল্লায় পড়লাম। একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেলাম। কবির ছেলেটার পরিচয় কী? ভুলেই গেছি জিজ্ঞেস করতে। এ কীভাবে এসে জুটল মুরাদের বাসায়? পরিচয় যাই হোক, ছেলেটা ভালো আছে। পা টিপে দিল। এত আরাম লাগছিল। ১৫ মিনিটের ঘুমে সব ক্লান্তি মনে হয় কেটে গেছে। মহিমার কথা কীভাবে যেন ভুলে গেছিলাম। শোকে জমে গেছি মনে হয়। আজ শোকেরই রাত! 

আমার কান্না পাচ্ছে। ফোন থাকলে এখন কী করতাম? মহিমার সাথে কথা বলতাম। নাহ! তা হত না। মহিমা এখন অন্য একজনের সাথে কথা বলছে নিশ্চয়ই। কষ্ট, কষ্ট!  জীবনটা এত কষ্টের?

বাবার সাথে হালকা ঝগড়া হয়েছিল, বাসা থেকে বের হয়ে এসেছি সকালে। বাড়িতে ফিরতে পারছি না। এই তথ্য মুরাদকে জানানো হয় নি। সে জানলে জোড় করে আমাকে তার বাসায় রেখে দিত। বা অন্তত কিছুক্ষণ আমার সাথে ঘোরাঘুরি করত। অথবা থানা পর্যন্ত যেত ডায়েরি করে দিতে। এখন একা একা কিছুই ভালো লাগছে না। মোবাইলের আশা বাদ দিলে কেমন হয়? মোবাইল মানেই মহিমার ছবি, ম্যাসেজিং এর স্মৃতি। এখন এগুলো ভুলে থাকা যাচ্ছে।

নিজেকে শূন্য লাগছে। পকেটে একটা টাকাও নেই। কোথায় যাবো? হাঁটতে হাঁটতে অনেকদূর চলে এলাম। রাস্তা ফাঁকা। আধো অন্ধকার। রাত প্রায় বারোটা তো বাজবেই। এলাকার দিকে ফিরতে হবে, কোনো একটা টি স্টলে রাতটা পার করা যায় কি না দেখা যাক। জীবনটা ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেল আমার।

আমার পেছনে ৪ টা ছায়া দেখতে পাচ্ছি। একসাথে হাঁটছে তারা। ছায়াগুলো কার? তারা দ্রুত হাঁটছে। যেন আমাকে ধরতে চায়। পেছনে ফিরলাম। দেখি– মুখে মাস্ক পেঁচানো চারটা ছেলে। 
‘এই ভাই, আপনারা কারা?’
উত্তর পেলাম না। আমি আতঙ্কিত। 

হঠাৎ দুইজন এসে আমার কোমড় আর পা ধরে ফেলল। বাকি দুইজন আমার হাত আর মুখ চেপে ধরেছে। প্রাণপনে চিৎকার করার চেষ্টা করছি। পারছি না। একজন বলল, এই চুপ, চুপ! জানে মাইরা ফালামু একদম। 

এখন আমার গলায় ছুড়ি ধরা। তবে মুখ খুলে দিয়েছে। আমার সব পকেট সার্চ করা হচ্ছে। কিছুই পাচ্ছে না তারা। পাওয়ার কথাও না। একজন বলল, ওস্তাদ কিছু নাই। ওস্তাদ লোকটা বলল, কিছু নাই মানে? এই হারামীরে দেখি দুইটা আইফোন পকেটে রাখে সবসময়, মোটা মানিব্যাগ থাকে। অনেক দিন থেকে ফলো করতেছি এরে। বাটে পাই না। আজ পাইছি। এই বল, মোবাইল মানিব্যাগ কই? বল।
‘ভাই, মোবাইল মানিব্যাগ আগেই চুরি হইছে। পকেটমারি হইছে ঘন্টা দুয়েক আগে। বিশ্বাস করেন।’
লোকগুলো বিশ্বাস করল বলে মনে হয় না। চার জোড়া রাগত চোখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। হাত পা শক্ত করে বেঁধে ফেলেছে আমার। নড়তে পারছি না। ওস্তাদ লোকটা হিঁসহিঁস করছে। হঠাৎ একটা থাবড়া খেলাম ভিষণ জোড়ে। আমি মাটিতে এলিয়ে পড়লাম। 

এখন কয়টা বাজে? রাত কি পেরিয়েছে? অন্ধকার একটা রুমে আমাকে বেঁধে রাখা হয়েছে। মুখও বাঁধা। তবে সময় যে অনেক্ষণ গড়িয়েছে তা বুঝতে পারছি। কারণ পেটে ক্ষুধা জানান দিচ্ছে। পিপাসাও পেয়েছে। খুবই ক্লান্তি বোধ করছি। কেউ কি জানে আমাকে কিডন্যাপ করা হয়েছে?

                                       (৫) (নতুন পাতায় শুরু হবে এখান থেকে)

মুরাদ
হোজ্জা মার্কেটে যেতে রাজি হয়েছেন। প্রথমে ভেবেছিলাম উনি রাজি হবেন না। মা জোড় করে পাঠাচ্ছে আমাকে। আমি, হোজ্জা, কবিরের জন্য তিন সেট পাঞ্জাবী পাজামা কিনতে হবে । টাকা মা’ই দিবে। 
  ‘এখন পাঞ্জাবী দিয়ে কি হবে মা?’ 
  ‘আরে আজাদের জন্য মেয়ে দেখতে যাবো। হোজ্জাকে সাথে নেয়া যায় কি না ভাবছি। উনি মুরুব্বি হিসেবে গেলে একটা অন্যরকম ব্যাপার হবে না!’
  ‘হোজ্জা মনে হয় রাজি হবেন না মা। আর ভাইয়া এখন পাত্রী দেখতে না করেছে।’

মা আমার দিকে চোখ গরম করে তাকালেন। 
  ‘তোকে যেটা বলেছি সেটা কর আগে। হোজ্জাকে সাথে নিয়ে পছন্দ করে পাঞ্জাবী কিনে নিয়ে আয়।’
মা’র জোড়াজুড়িতে রাজি হয়ে গেলাম। নাহয় মার্কেট ঘুড়ে কেনাকাটা করা আমার খুবই অপছন্দের। এই উসিলায় হোজ্জার মার্কেট ঘোরা হবে অবশ্য। 


কয়েকটা দোকান ঘুরে ৪ নম্বর দোকানে হোজ্জার জন্য পাঞ্জাবী পছন্দ হলো। দোকানী হোজ্জার পরিচয় শুনে কফি, কেক খাওয়ালো । সুন্দর আচরণ করল।
একটা পাঞ্জাবী দেখিয়েছে। পাঞ্জাবীর কাপড়, ডিজাইন সবই সুন্দর মা শা আল্লাহ। হোজ্জারও পছন্দ হয়েছে। 
হোজ্জাকে বললাম,  হোজ্জা, আরও দেখি? অন্য দোকানও আছে।  
    –এখানে যত দোকান, আর যত পাঞ্জাবী। দেখলে তো দেখা শেষ হবে না। 
   –তাও ঠিক হোজ্জা। আমারও ভালো লাগে না। 
   –পছন্দ হয়েছে দাম জিজ্ঞেস করে কিনে নাও। বেশি পাঞ্জাবী দেখলে পরে দোটানা তৈরি হবে, এটা ভালো না সেটা ভালো। মাঝে দিয়ে মন অস্থির চঞ্চল হয়ে যাবে। 

দোকানীকে বললাম, ভাই দাম? তিনি আমাদের দিকে নির্মল হাসি নিয়ে তাকালেন। যেন দাম জিজ্ঞেস করে তাকে অপমান করা হয়েছে। ফ্রীতেই পাঞ্জাবী দিতে চান। ভাবছি, ফ্রী দিলেও ফ্রী নিব না। প্রশ্নই আসে না। 
দোকানী বললেন, আপনাদের সাথে দামাদামি করব না। সবার সাথে তো দামাদামি চলেনা? চলে? 
  -- তা অবশ্য চলে না! 
  -- জি। এজন্য শুধু কেনা দামটাই দিবেন। লাভের দিকে তাকালে আর ভিনদেশের ভদ্রলোকের কাছে নিজের দেশের মান সম্মান বলে কিছু থাকে? 
  -- কত দিব বলেন? 
  -- ৩৫০০৳।  একদম এই দামে কিনছি। শুধু টাকাটা দিয়ে পাঞ্জাবী হাত বদল করব।

আমি কিছু বলতে গিয়েও চুপ করলাম। এই পাঞ্জাবীর দাম ৩৫০০ টাকা হতে পারে না। কিন্তু হোজ্জার চেহারায় সন্তুষ্টির ছাপ। তিনি মনে হয় ভাবছেন, দোকানদার লোকটি তো ভালোই! হোজ্জা আমার দিকে সমর্থনের আশায় তাকালেন। আমি চোখ স্থির করে রাখলাম। এই স্থির চোখের বিশেষ কোনো অর্থ বের করা যায় না। একবার ভাবছি দাম নিয়ে কথা বলব।  কিন্তু কেন যেন মনে চাচ্ছে না। জানি দোকানী ডাহা মিথ্যা বলছে। তবুও হোজ্জা লোকটির কথা বিশ্বাস করেছেন। তার এই ভালো বিশ্বাস ভাঙ্গাতে মন সাঁয় দিচ্ছে না । লোকটার প্রতিও রাগ হচ্ছে। হোজ্জার সাথে সে গল্প জমিয়ে ফেলেছে। 

৩৫০০ টাকা বের করে দিয়ে বিদায় নিলাম । 
হোজ্জা বললেন, কেনা দামে পাঞ্জাবী দিয়ে দিল? এত ভালো মানুষ আমাদের সময়েও কম ছিল। খুবই কম। আল্লাহ তার ভালো করুন। 
আমি চুপ করে আছি। 

চারদিকে গিজগিজ ভিড়। ভ্যাপসা গরম। দ্রুত কেনাকাটা শেষ করতে পেরে আরাম বোধ হচ্ছে। কবির নিজের জন্য পাঞ্জাবী কিনে ফিরে এসেছে । সে আমার হাতে ব্যাগের দিকে তাকাল।
   ভাই, পাঞ্জাবী কিনেছেন আপনাদের?
   –হোজ্জার জন্য কিনেছি। আমার আজ কিনতে ইচ্ছে করছে না।     
   –ওহ। 
   –তুমি কিনেছ?
    –জি ভাই কিনেছি। এই যে।
    –পাজামা কিনব এখন, চলো। 


কবির হোজ্জার পাঞ্জাবী হাতে নিয়ে দেখল। হোজ্জা যেন শুনতে না পান এমন স্বরে কবিরকে বললাম, পাঞ্জাবী কত দিয়ে কিনেছি বলো তো?
   – ২০০০৳ - ২২০০৳ হবে।
   – ৩৫০০ নিয়েছে। বলেছে কেনা দাম।
    –আহ হা। এরা মিথ্যার হাড়ি ভাই। দামাদামি করলেন না?
    –যাক। বাদ দাও। ভালো লাগে না। তোমার পাঞ্জাবীটাও সুন্দর হয়েছে কবির। 
    –জি ভাই!


বাড়িতে এসে একটা খবর শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। মাসুমকে নাকি কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তার ফ্যামিলি সন্দেহ করছে, তাকে কিডন্যাপ করা হয়েছে। কী একটা অবস্থা!  গতকাল রাতে নাকি সে বাড়িতে যায় নি। আজও তার খোঁজ নেই। থানায় জানানো হয়েছে। 

দুইটা দুশ্চিন্তা হচ্ছে। এক দুশ্চিন্তা বন্ধু মাসুমের জন্য। আরেকটা দুশ্চিন্তা হলো মাসুমের ফোন আমাদের বাসায়। পুলিশ যদি কোনোভাবে ফোনের অবস্থান খুঁজে বের করে! কঠিন প্যাঁচে পরে যাবো।  বাইরে ভীষন গরম থেকে এসেছি। এসব ভেবে মাথা আরো গরম হয়ে গেছে আমার। দ্রুত গোসল করা দরকার। হোজ্জার গোসলের বন্দবস্ত করে আমি চারতলায় চলে যাবো। 
  ‘বৎস, মুরাদ। চিন্তিত লাগছে তোমাকে! কারণ কী?’
হোজ্জাকে কি সব কিছু খুলে বলব? না বলে থাকাটা ঠিক হবে না। বলি। 
   ‘হোজ্জা, মাসুম কিডন্যাপড হয়েছে সম্ভবত। তাকে পাওয়া যাচ্ছে না।’
   ‘বলো কী!’

হোজ্জা খানিকটা অস্থির বোধ করছেন। তাকে পুরো কাহিনী শুনালাম। বাড়িতে মাসুমের ফোন রাখার বিপদটা বুঝিয়ে বললাম। পুলিশ বিশেষ পদ্ধতিতে ফোনের অবস্থান বের করে ফেলতে পারে। 
পুলিশের কথা শুনে কবির হকচকিয়ে গেছে। সে বসে আছে চিন্তিত মুখে। তার চোখের মনি এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করছে। 
  -মুরাদ ভাই, কী হবে?
  -আল্লাহ জানেন।
  -আল্লাহ এবার বাঁচালে আর জীবনে চুরি করব না। 
 -আচ্ছা । মাসুমের যে ওদিকে কী অবস্থা! আল্লাহ তাকে রক্ষা করুন। আল্লাহ আল্লাহ।
 -আল্লাহ। আল্লাহ। 

যুহরের নামাজ শেষে হোজ্জা দীর্ঘ সময় ধরে সালাতুল হাজত পড়ছেন। দুআ করছেন। আমি আর কবির বসে বসে দরুদ আর ইস্তেগফার পড়ছি। মসজিদের এসি বন্ধ করে দেয় নি। ভালো লাগছে। শান্তি শান্তি লাগছে। কবির বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছে। বললাম, দুআ করো কবির। আল্লাহ রক্ষা করুন বিপদ থেকে। মাসুমের জন্য দুআ করো। বেচারা কী যে অবস্থায় আছে!

বাসায় এসেছি খেতে বসব। কবির বলল, মুরাদ ভাই! মনে হয় আমার সরে থাকা উচিত। ভয় লাগছে! পুলিশ যদি চলে আসে এখানে? 
   ‘দুপুরের খাবার খেয়ে তারপর যাও।’ 

হোজ্জা যিকিরের মধ্যে আছেন। তার চোখ বন্ধ। আমি তাকিয়ে আছি। বোঝার চেষ্টা করছি। তিনি হঠাৎ চোখ খুললেন। তার চেহারা হাসি হাসি। মানে কী?

খাবার সাজানো হয়েছে। কিন্তু খাওয়ার প্রতি তেমন উৎসাহ নেই কারো। দুশ্চিন্তা নিয়ে খেতে ভালো লাগে না। চুপচাপ খাবার বেড়ে দিচ্ছি । হোজ্জা বললেন– চিন্তা কোরো না। আল্লাহ আছেন। ইন শা আল্লাহ সব বিপদ দূর হবে। 

সবাই খাওয়ায় মন দিয়েছি। দেখি কি হয়। বিপদ কেটে গেলে আলহামদুলিল্লাহ পড়ব। কিন্তু যে প্যাঁচ লেগেছে, এটা কি এত সহজে খুলবে? আর ওদিকে মাসুম কি কিডন্যাপড হয়েছে, নাকি আবার সুইসাইড করে ফেলেছে প্রেমিকা হারানোর হতাশায়? কে বলবে?

দরজায় নক পড়ছে। কে আসবে এখন? উঠতে ইচ্ছা করছে না।
  ‘কে?’ 
কোনো আওয়াজ পাচ্ছি না। 
  ‘এই,কবির, দরজার ফুটা দিয়ে দেখো তো, কে এল? দুপুরে কে আসবে?’
  ‘ভাই! পুলিশ নাকি?’
  ‘পুলিশ?’ 

কবির আতঙ্কিত। সে দ্রুত হাত ধুয়ে লুকানোর চেষ্টা করছে। ননসেন্স। এখানে কোথায় লুকাবে সে? 

আমি উঠে গিয়ে লুকিং গ্লাস দিয়ে দেখছি– বাইরে দুইজন ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে। প্যান্ট শার্ট ইন করে পড়া । মধ্যবয়সী। দুজনেই ক্লিন সেভ করা । চোখগুলো চঞ্চল। এরা ডিবির লোক নাকি? সর্বনাশ! 

দরজায় আবার কড়া পড়ল। না খুলে তো দেখছি উপায় নেই! 

দরজা খুলে সালাম দিলাম। 
   ‘আসসালামু আলাইকুম।‘
সালামের জবাব এল--হুম। 
সালামের জবাবে মাথা ঝাঁকিয়ে ভারি স্বরে “হুম” বলা লোকেদের ব্যাপারে সতর্ক হওয়া উচিত। আমি এঁদের ব্যাপারে সতর্ক হয়ে গেলাম! দুজন রুমে ঢুকে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। 
   ‘কী দেখছেন জনাব? আপনাদের পরিচয়?’
   ‘শুনলাম নাসিরুদ্দীন হোজ্জা এখানে অবস্থান করছেন? আপনি কি মুরাদ?’
   ‘জ্বী।’
   ‘বসব কোথায়? চেয়ার নেই?’
   ‘না, হোজ্জা নিষেধ করেছেন। ওই বিছানায় বসতে পারেন।’
কবির পাশের রুমে লুকিয়েছে বোধয়। নাহয় ওয়াশরুমে। এক পাশের তোষক বিছানা খালি। সেটাই বসার জায়গা। লোক দুটি ইতস্তত করছে। আমি লক্ষ্য করছি তাদের ওয়াকিটকি জাতীয় জিনিস কোথায় রেখেছে। প্যান্টের পকেটে লুকিয়ে রেখেছে? হালকা ঠোট নাড়িয়ে দুআ ইউনুস পড়ার চেষ্টা করছি। মনের আতঙ্ক চেহারায় যেন প্রকাশ না পায়– এজন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।  হোজ্জা নির্বিকার বসে আছেন। 
লোক দুটি বসল না। হোজ্জার দিকে তাকালো ।
   'শুভ দুপুর হোজ্জা সাহেব! আমরা দুজন এই দেশের বুদ্ধিজীবী এবং সাহিত্যবোদ্ধা। আপনার অবস্থান বহু কষ্টে বের করেছি। গোপনে এসেছেন। কিন্তু সব কিছু কি গোপন রাখা যায়?' 
হোজ্জা চুপ করে আছেন। আমার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। এরা কি ডিবির লোক নয়? 
   'আপনারা বুদ্ধিজীবী?'
    'জ্বী!'
   'আমি তো ভাবছি পুলিশ… '
   'না, না। পুলিশ টুলিশ খবর দিতে হবে না। হঠাৎ করে বাসায় ঢুকে গেছি বলে ভয় পেয়েছেন নাকি!' 
    'ভয় না পাওয়া উচিত?’
   'শুনুন, আমরা হোজ্জার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে চলে যাবো। আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন। আমরা খাঁটি বুদ্ধিজীবী এবং সাহিত্যবোদ্ধা। সুশীল সমাজ বলতে পারেন।’
    ‘আচ্ছা ! বুদ্ধিজীবি আংকেল! দয়া করে আর কাউকে হোজ্জার অবস্থান সম্পর্কে জানাবেন না, কেমন? তাঁর নিষেধ। আসুন পরিচয় করিয়ে দিই।‘ 

হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। স্বাভাবিক লাগতে শুরু করেছে এখন। এই কবির ছেলেটা অহেতুক আতঙ্ক ছড়াল কেন ! কোথায় লুকিয়ে আছে সে? ওয়াশরুমে যদি থাকে তাহলে থাকুক আরো কিছুক্ষণ। তার শাস্তি হওয়া দরকার। 

লোক দুটি ইতস্তত করতে করতে ফ্লোরের বিছানায় বসল। ফ্লোরে বসে মনে হয় অভ্যাস নেই তাদের । খেতে বললাম। তারা নাকি খেয়ে এসেছেন।
আমি আর হোজ্জা একটু গতি বাড়িয়ে খাওয়া শেষ করলাম। লোক দুটিকে গ্লাসে করে ঠান্ডা পানি দিয়েছি । 
আমি বসেছি হোজ্জার বিছানার এক পাশে। লোক দুটির উদ্দেশ্যে বললাম, আপনাদের পরিচয়? 

একজনঃ আমি সাপেক্ষ সালিম! সাহিত্য মৈত্রী পত্রিকার সম্পাদক। সাপ্তাহিক পত্রিকা।
দ্বিতীয়জনঃ আমি নাজিম কাব্য! একই পত্রিকার সহ সম্পাদক। 

সাপেক্ষ ও কাব্য সাহেবের পরিচয় শুনে  কিছুটা শঙ্কিত বোধ করছি। মিডিয়ার লোক মানেই নানান ঝামেলা। বললাম, হোজ্জাকে আপনাদের পরিচয় জানাই তাহলে? 

আমি হোজ্জাকে খাঁটি আরবি ভাষায় লোক দুটির পরিচয় ব্রিফ করলাম– 
‘তারা দুজন সুশীল সমাজ। নিজেদের বুদ্ধিজীবি মনে করেন। বুদ্ধিজীবির নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই। যেমন এই দুজন একটি পত্রিকার সম্পাদক ও সহ সম্পাদক। যেই পত্রিকার নাম হয়ত ১০০ জন মানুষও জানে না। এই পত্রিকায় কাজের সুবাদে তারা নিজেদের বুদ্ধিজীবী দাবি করছেন। বুদ্ধি যাদের জীবিকার মাধ্যম। এই বুদ্ধি সবসময় তারা ভালো কাজে লাগান না।’
  –ভালো কাজে লাগান না?
  –না। তারা অনেকটা শক্তের ভক্ত নরমের জম ধরণের। নরমের পক্ষ নিয়ে তো টাকা পয়সা আসে না, তাই না?
  –হুম। 
 –তারা খুব কষ্ট করে নিজের বুদ্ধি খাঁটিয়ে সবসময় দেশি বিদেশী ধনকুবের কিংবা মোড়লদের স্বার্থের পক্ষে নিজেদের অবস্থান আবিস্কার করেন। যাই হোক। হোজ্জা, এদের গুরুত্ব দেয়ার দরকার নেই। এড়িয়ে যাওয়ার মত কথা বলে বিদায় করাই ভালো। 

আরবি ব্রিফে হোজ্জা খুশি হলেন বলে মনে হচ্ছে না। তাকে বিরক্ত দেখাচ্ছে। লক্ষণ ভালো নয়। আমি তৎক্ষণাৎ বুদ্ধিজীবীদের দিকে তাকিয়ে মোলায়েম হাসি দিলাম। এ হাসির অর্থ– আপনাদের সুন্দর ও যথার্থ পরিচয় দেয়া হয়েছে।  (পাঠক, বিচার করুন। আমি কি ভুল কিছু বলেছি?)

‘আপনারা কী হোজ্জার নিকট বিশেষ কিছু জানতে চান?’ 
সাপেক্ষ সাহেবঃ  ইন্টারভিউ নিতে চাই। তাছাড়া পারসনাল কিছু কথাও আছে। 
আমিঃ কী কথা?
সাপেক্ষ সাহেবঃ বুঝলেন ভাই? হোজ্জা মধ্যযুগের একজন সাধারণ মোল্লা। তিনি সারাবিশ্বে এত পরিচিত। অথচ আমরা আধুনিক যুগের বুদ্ধিজীবী হয়েও বিশেষ সুবিধা করতে পারছি না। 
আমিঃ ওহ! এই কথা! 
কাব্য সাহেবঃ এটাই কথা! 
নাসিরুদ্দীন হোজ্জাঃ তোমাদের জীবন অস্থির, অশান্তিময়। যিকির ও দুআয় শান্তি। তোমরা বেশি বেশি যিকির করবে। সুবহানাল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ! আস্তাগফিরুল্লাহ। 
সাপেক্ষ সাহেবঃ  এইসব শব্দ বারবার বললে জীবনে শান্তি আসবে! যত সব আজগবি কথা। আমরা আদিম যুগে নেই হোজ্জা! এখন আধুনিক যুগ। 
নাসিরুদ্দীন হোজ্জাঃ এই যিকির গুলো শব্দ? শব্দের কোনো প্রভাব নেই? 
কাব্য সাহেবঃ রেগে যাচ্ছেন নাকি হোজ্জা? হা হা হা। 
নাসিরুদ্দীন হোজ্জাঃ এই গাধাদ্বয় রাগের কী দেখেছিস তোরা? গর্ধবের গর্ধব। এই শোন! আমার গাধা সাথে আনতে পারি নি। তোরা আমার গাধা হবি? আমার বাহন?

সাপেক্ষ ও কাব্য সাহেব হকচকিয়ে গেছেন। হোজ্জা তাদের গাধা বলেছেন এটা তারা বিশ্বাস করতে পারছে না। তাদের চেহারা নীল বর্ণ ধারণ করছে। তারা স্তম্ভিত (স্তম্ভের মত স্থির) । চোখ নড়ছে না। চোখগুলোও স্থির। আমি চুপচাপ পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছি। কারণ বেশি কিছু হয়ে গেলে আমাকেই সামলাতে হবে!  

সাপেক্ষ ও কাব্য একসাথেঃ (রাগত স্বরে) আপনি আমাদের গাধা বললেন? এত বড় স্পর্ধা।
নাসিরুদ্দীন হোজ্জাঃ  ঠান্ডা! ঠান্ডা! তোরা যে বললি শব্দের কোনো প্রভাবে নেই। তো গাধা শব্দের প্রভাবে তোরা স্বাভাবিক মানুষদুটো রেগে এমন উত্তেজিত হলি কীভাবে? হুম?
সাপেক্ষ ও কাব্যঃ (কোন কথা নেই, চুপ)

হোজ্জা কোন কথা দিয়ে কোন দিকে মার দিলেন! আমি তো ভাবতেই পারছি না!  উত্তেজনা বোধ করছি। বুদ্ধিজীবী দুজন নিজের যুক্তিতেই কুপোকাত হয়েছে দেখে আনন্দ লাগছে! কিন্তু এই আনন্দ এখন প্রকাশ করা যাবে না। আমি থমথমে মুখ করে বললাম, আপনারা শান্ত হোন। কিছু মনে করবেন না। আপনাদের অপমানিত করা হোজ্জার উদ্দেশ্য নয়। 
এখনো ঠায় বসে আছে লোক দুটি। তাদের মুখে কোনো কথা নেই। তাদের কি পানি দিব খেতে? ঠান্ডা পানি? বারবার শুধু পানি দিলে কেমন হয়। নাশতার ব্যাবস্থা করতে হবে। কিন্তু এই অবস্থায় উঠে যাওয়াটাও ঠিক হবে না। আচ্ছা, কবির কই?  ভুলেই গেছি  ওর কথা ।  পাশের রুমে নাকি ?  
‘আপনারা একটু শান্ত হয়ে বসুন প্লিজ! প্রিয় হোজ্জা, আপনিও শান্ত হোন। যিকির করুন ইন শা আল্লাহ। আমি এনাদের নাশতার ব্যাবস্থা করি।’ 

কারো মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না। লোক দুটির চেহারা মলিন হয়ে গেছে। হোজ্জা চোখ বন্ধ করে যিকিরে মনোযোগ দিয়েছেন। 

পাশের ঘরে কবির নেই। ওয়াশরুমের দরজায় নক করছি। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। 
    -এই কবির, বের হয়ে আসো। 
   -(নিশ্চুপ)
   -বের হয়ে এসো, সবাই সব কিছু জেনে গেছে।
   -অ্যাঁ! সব কিছু জেনে গেছে! (আর্তনাদ)
   -আরে সবাই জেনেছে এনারা পুলিশ না, দুইজন বুদ্ধিজীবী। হোজ্জার সাথে কথা বলতে আসছে! শুধু তুমিই জানলে না। বের হয়ে আসো। 
   -মুরাদ ভাই!
   -বের হয়ে আসো। 

কবির বেড়িয়ে আড়চোখে সাপেক্ষ ও কাব্য সাহেবকে দেখছে। মনে চাচ্ছে  তাদের বলি, এই হচ্ছে মোবাইল চোর, ধরুন একে। বললে কবির কেমন হকচকিয়ে যাবে! না– থাক। বেচারা এমনিতেও ভয় পেয়েছে। সাপেক্ষ সাহেবের সাথে কবিরের চোখাচোখি হয়ে গেল। কবির চোখ ফিরিয়ে নিল। সাপেক্ষ সাহেব এবার আমার দিকে তাকালেন। তার তাকানোর অর্থ– এই ছেলে কোত্থেকে বের হলো আবার? আমি তার দৃষ্টিকে পাত্তা দিলাম না। কাব্য সাহেব হোজ্জার দিকে তাকিয়ে আছেন। তার দৃষ্টি কিছুটা ক্রূর। হোজ্জার চেহারা থেকে পেট পর্যন্ত উঠানামা করছে তার দৃষ্টি । হোজ্জা চোখ বুজে আছেন। ঘুমিয়ে গেছেন নাকি? কবির এগিয়ে গেছে দরজার দিকে। তাকে থামালাম। 
   ‘কবির, তুমি চারতলায় গিয়ে ফলমূল-নাশতা কিছু নিয়ে আসো ভাই, কষ্ট করে। আমি মাকে ফোন করে দিচ্ছি। নাশতা এনে দিয়ে এরপর তুমি চলে যেতে চাইলে যেও। ভয় নেই তোমার। তোমাকে বিপদে ফেলতে চাই না।’ 

কবির বের হয়ে গেল। আমি হোজ্জার বিছানায় বসলাম। ক্লান্তি লাগছে। কিছুক্ষণ ঘুমাতে পারলে ভালো হত। হোজ্জা যিকির করছেন। বুদ্ধিজীবী দুজন যে কী ভাবছে চুপচাপ, আল্লাহ জানেন। পত্রিকায় নেতিবাচক নিউজ করে আমাদের শায়েস্তা করার ফন্দি আঁটছেন কি না কে জানবে? তাদের চিন্তায় ছেঁদ ফেলা দরকার। বললাম, সাপেক্ষ আংকেল! ওই ছেলেটার নাম কবির। আপনাদের জন্য নাশতা আনাতে পাঠিয়েছি ওকে । দ্রুত চলে আসবে ইন শা আল্লাহ। আসুন গল্প করি। 
   ‘আপনার সাথে কী আর গল্প করব। মনটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল।’
   -আপনারা কী হোজ্জাকে নিয়ে পত্রিকায় কিছু লিখবেন?
   –ঠিক করি নি। আমরা একটা প্লট সাজিয়ে এনেছিলাম। প্লট ভেস্তে গেছে।
  –ওহ আচ্ছা! লিখতে পারেন হোজ্জাকে নিয়ে। তবে হোজ্জা যখন দেশ থেকে বিদায় নেবেন তখন। এর আগে নয়। 
    –হোজ্জা আছেন কতদিন? 
    –মাসখানেক হয়ত বা। 

হোজ্জা নড়ে চড়ে বসলেন। গলায় কাশি দিলেন। আমার পিঠে হাত রেখে বললেন, মাসখানেক হয়ত থাকব না, মুরাদ। ভালো লাগছে না। বুড়ো মানুষ আমি। শ্রান্তি বোধ হয়। 

হোজ্জার কথা শুনে মনটা খারাপ হতে চাচ্ছে আমার। হোজ্জা হঠাৎ এমন করার পেছনে এই লোক দুটির অবদান থাকতে পারে। একদিকে মাসুম নিখোঁজ। নানান ঝামেলা। এর মধ্যে তারা এসে যা তা কথা শুরু করে দিল। যা হোক তারা অতিথি। উত্তম আপ্যায়ন করতে হবে। 
কবির আসতে এত দেরি করছে কেন? আমার ক্লান্তি লাগছে। একটু ঘুমুতে পারলে এত ভালো লাগবে!


মিনিট দশেক হবে শুয়ে শুয়ে ভাবছি। ঘুম আসছে না। কত কিছু যে ভাবছি– তার ঠিক নেই। হোজ্জা ঘুমিয়ে গেছেন। তিনিই বেশ আছেন। আমার কিছু ভালো লাগছে না। অস্থির লাগছে। সব চিন্তা বাদ দিয়ে ঘুমালে ভালো হয়। চিন্তা করেই বা লাভ কি? বুদ্ধিজীবি লোক দুটো চলে গেছে। নাশতা খাবার পর আর বসতে চাইল না। যদিও হোজ্জা কথা বলতে আগ্রহী ছিলেন। যাওয়ার সময় হোজ্জার সাথে গলা মেলালেন দুজন। গলা মেলানো শেষে সাপেক্ষ সাহেবের চোখে পানি চলে এল। তিনি বললেন– আপনি ঠিক ধরেছেন হোজ্জা, আমার জীবনে শান্তির অভাব। আপনার সাথে কথা বলে মনটা আরো  বিষাদ্গ্রস্থ হয়ে গেছে। আপনারা থাকুন আপনাদের মত। আপনাদের বিরক্ত করব না। হোজ্জা তার পিঠ চাপড়ে দিলেন। অন্যদিকে কাব্য সাহেব কেমন যেন অস্বস্তিতে ভুগছিলেন।  তার চেহারার ঈর্ষা, ঘৃনা, বিদ্বেষ তিনি চেষ্টা করেও লুকাতে পারছিলেন না। তার দৃষ্টি আগের মতই ক্রূর। বিদায়ের সময় মোটেও আন্তরিক ছিলেন না । 

 

নানান দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙল ঘন্টা দেড়েক পরে। উঠে দেখি হোজ্জা ওজু করে বসে আছেন। আসরের জামাতের আর ৫ মিনিট বাকি। তাড়া করে উঠতে হবে। কিন্তু উঠতে ইচ্ছে করছে না। শরীর কেমন অবসন্ন লাগছে। বেশি অবসন্ন লাগছে মন। আসর নামাজ শেষ হলে হোজ্জা নিশ্চয়ই হাঁটতে বেরোতে চাইবেন। কিন্তু আমি কেমন যেন দমে গেছি। অনিচ্ছাস্বত্তেও হয়ত হাঁটতে যেতে হবে। 

নামাজ শেষে বের হয়েছি, হোজ্জা আমার পিঠে হাত রেখে বললেন, মুরাদ, আজকে আর বের হবো না। শরীরটা ভালো লাগছে না হঠাৎ। এত ক্লান্তি লাগছে কেন বুঝছি না। 

আমরা বাড়ি ফিরে এলাম। হোজ্জা শুয়ে পড়লেন। তাকে আসলেই অসুস্থ্য দেখাচ্ছে। চোখগুলো ক্লান্ত । বন্ধু মাসুমের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু হোজ্জাকে রেখে মনে হয় যাওয়া ঠিক হবে না। 

সন্ধার পরে পরে হোজ্জার শরীর খুবই খারাপ হয়ে গেল। প্রেশার মাপলাম। ৬০/৯০। আধা ঘন্টার মধ্যে তার পেটেও সমস্যা দেখা দিল। অবস্থা খুবই কাহিল। ফার্মেসি থেকে একজন ডাক্তার নিয়ে এলাম। তিনি কিছু ওষুধ দিলেন। স্যালাইন খাওয়াতে বললেন। হোজ্জার অসুস্থ্যতায় আমি অসহায় বোধ করছি। তার যথাযথ সেবা শুশ্রুষা একা একা করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তার শরীর বেশি খারাপ হলে হয়ত স্যালাইন দিতে হবে। হোজ্জা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন। জিজ্ঞেস করলাম– হোজ্জা, মাথা ঘুরাচ্ছে? 
  –হ্যাঁ, ঘুরাচ্ছে কিছুটা। 
  –আচ্ছা বিশ্রাম করুন ইন শা আল্লাহ। প্রয়োজনে আবার ডাক্তার আনাবো। 

আমি ভাবছি হোজ্জার এমন হঠাৎ অসুস্থ্যতার কী কারণ হতে পারে? সুস্থ্য মানুষটা হঠাৎ এত অসুস্থ্য হয়ে গেলেন। ব্যাপারটা আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। আচ্ছা, দুপুরে যে কাব্য সাহেব এসেছিলেন। উনি সারাক্ষণ কেমন ক্রূর দৃষ্টিতে হোজ্জার দিকে তাকাচ্ছিলেন। যতক্ষণ ছিলেন ততক্ষনই তার এই দৃষ্টি ছিল হোজ্জার উপরে। তার বদনজর কি হোজ্জাকে লেগেছে? সম্ভাবনা তো অস্বীকার করা যায় না। হোজ্জা কি কিছু ভেবেছেন এ ব্যাপারে? জিজ্ঞেস করি।
  প্রিয় হোজ্জা, বদনজরের প্রভাবে কি আপনার এই অসুস্থ্যতা হতে পারে?
  –আমিও সেরকমই ভাবছি। হঠাৎ করে শরীর এত খারাপ হয়ে গেল। তবে নিশ্চিত করে কিছু তো বলা যায় না। বদনজর ব্যাপারটা সবসময় ইচ্ছাকৃতও হয় না। 
  –আল্লাহ রক্ষা করুন। প্রিয় হোজ্জা, আমি কি বদনজরের রুকিয়ার জন্য কুরআন তিলাওয়াত ছেড়ে দিব? আপনি শুয়ে শুয়ে শুনুন?
   –হ্যাঁ, দাও। কুরআন শুনলে এমনিতেও সুস্থ্য অনুভব হয়। 

হোজ্জার জন্য স্যালাইন বানিয়ে দিলাম। তিনি খেলেন। শুয়ে পড়লেন। ৫ মিনিটের মধ্যে তার চোখ বন্ধ হয়ে গেল। হয়ত ঘুমিয়ে পড়েছেন। আগামীকাল ভাইয়ার জন্য পাত্রী দেখতে যাওয়ার কথা ছিল। হোজ্জাকে মুরুব্বি হিসেবে নিয়ে যাওয়ার কথা। (তিনি পুরুষ সদস্যদের সাথে বসবেন, কথা বার্তা বলবেন)  হোজ্জাকে জানিয়েছিলাম।  তিনি অমত করেন নি। তবে এই অবস্থায় মনে হয় তিনি যেতে পারবেন না। মা কি তাহলে প্রোগ্রাম ক্যানসেল করে দেবে? 
  –হ্যালো, মা। 
 –কী রে? হোজ্জা এখন কেমন? 
 –ঘুমাচ্ছেন। রুকিয়ার অডিও ছেড়ে রেখেছি। 
 –খাবার নিতে আসবি কখন? কয়টা বাজে দেখেছিস?
  –আসব, মা। কাল তো ভাইয়ার পাত্রী দেখার প্রোগ্রামে হোজ্জা যেতে পারবেন না। অনেক অসুস্থ্য, কাহিল তার অবস্থা। 
  –হুম। থাক। আমি মেয়ে পক্ষকে কল করে প্রোগ্রাম পেছাতে বলি। হোজ্জা সুস্থ্য হোক ইন শা আল্লাহ। এরপর যাওয়া যাবে।
  –তুমি তাহলে হোজ্জাকে ছাড়ছই না!
  -না, ছাড়ছি না। ওনাকে কি সবসময় পাবো নাকি?
 –আচ্ছা তোমার ইচ্ছা। হোজ্জার অমত নাই। কিছুক্ষণ পর আসব খাবার নিতে ইনশা আল্লাহ। 
  –আচ্ছা, আয় । 

হোজ্জা দেখি চোখ খুলে আছেন। মায়ের সাথে আমার কথার কারণে তার ঘুম ভেঙ্গে গেল কি না কে জানে! পাশের রুমে গিয়ে কথা বললেই ভালো হত। 
‘দুঃখিত হোজ্জা,  ঘুম ভেঙে গেছে?’
  –হুম। কুরআন তিলাওয়াত আপাতত বন্ধ করে রাখো। খাওয়া শেষে মনোযোগ দিয়ে শুনব ইন শা আল্লাহ। 
  –আচ্ছা, করছি। 
  –শরীর এত দূর্বল লাগছে! কথা বলতেও কষ্ট লাগছে আমার ।
  –হোজ্জা কথা বলতে হবে না। আপনি শুয়ে থাকুন। কুরআন শুনুন। আমি খাবার নিয়ে আসি ইন শা আল্লাহ। 
  –আচ্ছা। এক গ্লাস স্যালাইন বানিয়ে রেখো। 
  –জি। 

স্যালাইন গুলাচ্ছি আর ভাবছি হোজ্জা কি এমন খেয়েছেন যে তার পেট এমন খারাপ হয়ে যাবে। খুবই হালকা খাবার খেয়েছেন। আসলেই বদনজরের ব্যাপারটা এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। ভালোমত রুকিয়া শোনাতে হবে ইন শা আল্লাহ। আল্লাহ সুস্থ্য করুন হোজ্জাকে। বুড়ো মানুষ, শরীর বেশি খারাপ হয়ে গেলে সেরে উঠা হয়ত কঠিন হয়ে যাবে। 

আমি উঠে গিয়ে খাবার আনব, দরজার সামনে দাঁড়িয়েছি। এমন সময় দরজায় নক পড়ল। সজোরে কড়াঘাত পড়ছে। কে? মেজাজটাই খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এমন জোড়ে কড়া নাড়ানোর মানে হয়? দরজা খুললাম। দেখি– মাসুম! 
কোথা থেকে এল ও! আমি পুরোপুরি ভড়কে গেছি! 
মাসুম আমার উপর ঝাপিয়ে পড়ল! জড়িয়ে ধরল আমাকে। 
  ‘মাসুম! দোস্ত! কই থেকে এলি তুই!’
মাসুমের মুখে কথা নেই। মনে হয় কেঁদে ফেলেছে। তার জামাকাপড় ছেড়া। শরীর ময়লা। মুখ শুকনো। আমি তাকে হাত ধরে বসিয়ে দিলাম। সে হোজ্জাকে দেখে সালাম দিল। হোজ্জা মৃদু স্বরে সালাম নিলেন। মাসুমকে বললাম, হোজ্জার শরীর বেশ খারাপ। তুই এলি কোথায় থেকে এখন বল! কি যে অবস্থা হয়েছে তোর! 
  –অল্পের জন্য জানে বেঁচেছি দোস্ত। আমাকে মেরে ফেলত কি না জানি না। পুলিশের ভয়ে হয়ত ছেড়ে দিয়েছে। 
  –তুই আসলেই তাহলে কিডন্যাপড হয়েছিলি! আল্লাহ রক্ষা করছেন। আলহামদুলিল্লাহ। দাঁড়া, পানি খা আগে। 

মাসুম পরপর তিন গ্লাস পানি খেয়ে ফেলল। ধপ করে শুয়ে পড়ল বিছানায়। 
  ‘মাসুম, তুই বিশ্রাম নিয়ে ফ্রেশ হ। আমি খাবার নিয়ে আসি। একসাথে খাবো। তোকে দেখে তো মনে হচ্ছে কাল থেকে কিছুই খাস নাই।’
    –সারাদিনে একটা বাটার বান খেতে দিছে। আর এক গ্লাস পানি। জানে বেঁচেছি এটাই তো বড়, দোস্ত! 
  –হ্যাঁ! আলহামদুলিল্লাহ।  মাসুম শোন, হোজ্জা বেশ অসুস্থ্য। তুই খেয়াল রাখিস একটু, আমি আসি। 
   –কীভাবে কি হলো হোজ্জার?
   –সে কথা পরে হবে। বিশ্রাম নে । আমি এলে গোসল দিবি। ভালো কথা, বাড়িতে জানিয়েছিস?
   –না। 
   –নে ফোন নে, বাসায় ফোন কর। 


মাসুম তার বাসায় কথা বলছে। হোজ্জা আমাকে হাতের ইশারায় ডাকলেন। তার কাছে গেলাম। বললেন– মাসুমের ফোন, মানিব্যাগ এনে তাকে দিয়ে দিতে। কিভাবে কি হয়েছে এইসব কৌশলে এড়িয়ে যেতে। হোজ্জার আদেশ শুনে আমার ভেতর আনন্দ, উত্তেজনা আর কিছুটা ভয়ের স্রোত সমান্তরালে বয়ে যাচ্ছে। লাইফটা যথেষ্ঠই এডভেঞ্চারাস মনে হচ্ছে! আমি চার তলার উদ্দেশ্যে উঠে গেলাম।


খাবার আর মাসুমের দুই পকেটের সম্পত্তি নিয়ে এসেছি। খাবার সামনেই রাখলাম। মোবাইল মানিব্যাগ রাখলাম হোজ্জার পাশে। মাসুম কিছু বুঝতে পারে নি। সে শুয়ে আছে। হোজ্জা আমাকে তার হয়ে মাসুমের সাথে কথা বলতে বললেন। একটা শর্ত দেয়ার কথা বললেন। আমি কিছুক্ষণ চুপচাপ ভাবলাম– কিভাবে মাসুমকে মোবাইল মানিব্যাগ নিয়ে বলা যায়। 
  ‘মাসুম!’
 -বল, দোস্ত।
  -গোসল করে আয়? একসাথে খাই।
  -হুম। 
  -হোজ্জা তোর লাইফে আনন্দ ফেরাতে কিছু করতে চান।  তবে তোকে একটা শর্ত মানতে হবে।
  -মুরাদ, হোজ্জার কী কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে? তুই কথা বলছিস যে?
  -হ্যাঁ। হঠাৎ করে তিনি এমন অসুস্থ্য হলেন । 

মাসুম হোজ্জার দিকে তাকিয়ে বলল, হোজ্জা, আমার লাইফে এখন আনন্দ আছে । আজকে জানে বেঁচেছি। যারা আমাকে কিডন্যাপ করেছে তাদের মধ্যে দু’জনের চেহারা দেখেছি। কিন্তু ছেড়ে দেয়ার সময় জিজ্ঞেস করল, কাউকে দেখেছি কি না? কিছু চিনেছি কি না? কিছু জানি কি না? যদি বলতাম দেখেছি চিনেছি। তাহলে হয়ত আমাকে মেরেও ফেলতে পারত। আমি বললাম, কিছু দেখি নি। কিছু জানি না। বলল, বাইরে যেয়ে এটাই বলবি সবাইকে। 

হোজ্জা চুপচাপ মাথা দোলাচ্ছেন। আমি দুজনকে দেখছি চুপচাপ। প্রস্তুতি নিচ্ছি। কীভাবে আসল কথা বলা যায়!

‘আল্লাহ তোকে বাঁচিয়েছেন মাসুম!’
  –হ্যাঁ, ক্ষুধায় তৃষ্ণায় আমার দূরবস্থা হয়েছে ঠিকই। কিন্তু সুস্থ্য আছি আলহামদুলিল্লাহ। নিরাপদে আছি। অথচ দেখ, হোজ্জার শরীর কত খারাপ হয়ে আছে। 
  –হুম। ভালোই বলেছিস! 
  –হ্যাঁ। গোসল করে চারটা খাব। এত ক্ষুধা পাইছে। 
  –আচ্ছা যা, গোসলে যা। হোজ্জা একটা শর্তের কথা বলেছেন, মানবি?
  –১০০ টা শর্ত মানব। আগে গোসল করতে দে। 
  –তাহলে এই যে ধর তোর দুইটা মোবাইল, আর মানিব্যাগ। 
  –What! What! 

মাসুম চিৎকার করছে মোবাইল মানিব্যাগ হাতে পেয়ে । তার চেহারায় মনে হয় চারশো পাওয়ারের বাতি জ্বলে উঠেছে! সে খুশি সহ্য করতে পারছে না। কিন্তু সে হতভম্ভ! ছটফট করে মোবাইল মানিব্যাগ উল্টে পাল্টে দেখছে। বললাম, মাসুম! মানিব্যাগে টাকা গুনে দেখ! ঠিক আছে  কি না।
  – হ্যাঁ? কিভাবে পেলি তুই! কিভাবে পেলি তুই!
  –হোজ্জা জানেন এইসব! তিনি আমাকে দিতে বলেছেন আমি দিলাম। তার বড় কোনো কানেকশন থাকতে পারে। হোজ্জা তো রাষ্ট্রীয় মেহমান। তার আগমনের খবর তুরস্কের এম্বেসিতে থাকাটা স্বাভাবিক। যাক, এগুলো নিয়ে ভেবে কাজ নেই।
  –কি বলিস তুই? কি বলিস তুই?
  –হা হা। 

মাসুমের চমকিত হয়ে প্রত্যেকটা কথা দুইবার করে বলছে! ‘মাথা নষ্ট, দোস্ত! মাথা নষ্ট, দোস্ত!’ আমি হাসি আটকে রাখতে পারছি না। হাসছি প্রাণ খুলে। 
হোজ্জা তাকিয়ে আছেন মাসুমের দিকে। তার মুখও হাসি হাসি। আমি বললাম, মাসুম, হয়েছে থাক। হোজ্জাকে এখন আর কিছু জিজ্ঞেস করিস না। তার কথা বলতেই কষ্ট হচ্ছে।  গোসল করে আয়। এরপর খেতে খেতে কথা বলি। 
   –দোস্ত! গোসল করে পরব কী? আমার কাপড় সব ময়লা ছেড়া। 
  –ওহ হো। উপরে গেলাম তোর জন্য কাপড় আনতে ভুলে গেছি। 
  –আচ্ছা ভালো কথা! কবির কই? এই আনন্দের সময় তাকে মিস করতেছি। 
  –ও চলে গেছে আজ দুপুরে।
  –চলে গেছে মানে? এখুনি কল দে ওকে। আসতে বল। আমি কথা বলি। 

মাসুম যে এতটা উত্তেজিত হয়ে পড়বে ভাবি নি। কবিরের নাম্বার দিলাম ওকে। কবির হঠাৎ মাসুমের কল পেয়ে কি না কি ভেবে বসে আবার! তাই ভাবছি। 


  –কবির?
  –হ্যাঁ, কে বলছেন?
  –আমি মাসুম!
  –মাসুম ভাই! আপনি কোথায়?
  –আমি কোথায় মানে? তুমি কোথায়? মুরাদের বাড়িতে আসো তাড়াতাড়ি। 
  –ভাই আমি একটু দূরে। 
  –আরে আমি গোসল দিব। ততক্ষনে এসে পড়ো তুমি। কিডন্যাপড হয়েছিলাম বুঝছ? জামাকাপড় সব ছিড়ে গেছে। হা হা। 
  –হা হা। আল্লাহ ফিরায় দিছেন আপনাকে। তার হাজার শুকরিয়া। সুস্থ্য আছেন তো ভাই?
  –হ্যাঁ, আলহামদুলিল্লাহ। এসে তো মোবাইল, মানিব্যাগ সব আবার ফিরে পেলাম। মাথাই নষ্ট!
  –মানে? বলেন কি ভাই! আমি তো কিছুই জানি না। না মানে, কিছুই বিশ্বাস হচ্ছে না। 
  -হা হা। 
  -ভাই এক কাজ করেন! আপনার না জামাকাপড় ছিড়ে ফেলেছে। মুরাদ ভাইর মা পাঞ্জাবি পাজামা কিনে দিছিলেন। আমার পাঞ্জাবী পাশের ঘরে রেখে আসছি। গোসল করে সেগুলা পরেন। 
  –হা হা। তোমার পাঞ্জাবি পরব মানে?
  –হ্যাঁ পরেন। 
  –তুমি কী পরবা?
  –পরে কিনে নিব বড় ভাই, ইন শা আল্লাহ! 
  -আচ্ছা। আমি গোসলে যাই। তুমি আসো তাড়াতাড়ি। একসাথে খাবো। 
  -ওকে ভাই। 


রাত সাড়ে দশটা পেরিয়ে গেছে। খেতে বসেছি তিন জন মিলে। হোজ্জা, মাসুম ও আমি। কবির ফোন করে জানিয়েছে, একটা জরুরী কাজের কারণে আসতে পারছে না। সে দুঃখিত। 
মাসুম বেশ মনোযোগ দিয়ে খাচ্ছে। অন্য কিছু খেয়াল নেই তার। তরকারী বিশেষ কিছু নয়। রুই মাছ আর বেগুনের তরকারি। ডাল, পুইশাক। কিন্তু মাসুম খাচ্ছে আগ্রহ নিয়ে। দেখে ভালো লাগছে। কে বলবে এই ছেলে গতদিনই বলেছিল– খাওয়ার প্রতি তার কোনো আগ্রহ অবশিষ্ট নেই। আসলে ক্ষুধা পেলেই খাবার ভালো লাগে। খাদ্যের যথেচ্ছা প্রাপ্তি খাবারের আনন্দকে ফিকে করে দেয়। মাসুমের আজ খাবার ভালো লাগছে। 
হোজ্জা খেতে পারছেন না। কথা না বলে হাতের ইশারায় কাজ নিচ্ছেন। মনে হচ্ছে বসে থাকতেও তার কষ্ট হচ্ছে। পানি খাচ্ছেন বেশি বেশি। এখন কম খেলে রাতে তার ক্ষুধা লাগবে নিশ্চয়ই। কোনো খাবার এনে রাখতে হবে। মিষ্টি স্বাদের কিছু সহজে খেতে পারবেন মনে হয়। 
মাসুমের ফোন, মানিব্যাগ ইস্যু এত দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে ভাবি নি। সব কিছু মোটামুটি স্বাভাবিক। মাসুমকেও স্বাভাবিক আনন্দিত লাগছে। সে খাওয়ায় মনযোগী। মাসুম আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। 
  –কিছু বলবি, মাসুম?
  –হোজ্জা তো অনেক অসুস্থ্য রে।
  –হ্যাঁ। 
  –আজ সুস্থ্য না হলে হাসপাতালে নিতে হবে।
হোজ্জা হাতের ইশারা করলেন– তিনি হাসপাতালে যেতে চান না। মাসুম বলল, হোজ্জা আপনি ভালো মত বিশ্রাম নিন তাহলে। আমি বললাম, মাসুম, হোজ্জার শর্ত তো শুনলি না। 
  –বল শর্ত। 
মাসুমের চেহারা হাসি হাসি।
  –শর্ত হলো মোবাইল মানিব্যাগ হাতে পেয়েছিস, কিন্তু হোজ্জা যতদিন আছেন ততদিন তার নিকট মোবাইল মানিব্যাগ জমা রাখতে হবে। 

মাসুমের হাস্যোজ্বল চেহারা হঠাৎ নিভে গেছে। সে চুপ করে আছে। কী আর করব আমি? হোজ্জা এটাই শর্ত দিয়েছেন। কিন্তু বেচারা মাসুমকে দেখে এখন মায়া লাগছে। 
 –কী ভাবছিস মাসুম?
 –হোজ্জা  যেটা বলছেন, সেটাই হবে।
 –মাশাআল্লাহ! 
 –তবে হাজার পাঁচেক টাকা আমাকে দিলে ভালো হয়। চলার খরচ তো লাগে! 
মাসুমের চেহারায় লাজুক ভাব। সে হোজ্জার দিকে তাকিয়ে আছে। হয়ত প্রত্যাশা করছে—হোজ্জা ৫ হাজার টাকার আবদার রাখবেন। হোজ্জার মনোভাব বোঝা যাচ্ছে না। তিনি খেয়ে আধশোয়া হয়ে আছেন। আমি তাকে মাসুমের কথা জানালাম। তিনি হাতের ইশারায় জানালেন– এটা হবে না। মাসুম সবই দেখল। তাকে আর কিছু বলার নেই। সে নিশ্চুপ। 

 

                                                        (৬) (নতুন পাতা)

আজ সকাল সকাল ভার্সিটিতে গেলাম। ফয়েজ স্যারকে জানালাম–  স্যার, পরীক্ষার ডেট কোনোভাবে পিছানো যায় কি না। তিনি আমাদের কোর্স কো-অর্ডিনেটর। ব্যাচের একটা গ্রুপ এমনিতেও পরীক্ষা পেছানোর পক্ষে। আর আমি যে হোজ্জার গাইড হিসেবে সময় দিচ্ছি– তা-ও জানালাম। এটা শুনে স্যারের চোখে আনন্দ ফুটে উঠল। স্যার অত্যন্ত কঠোর স্বভাবের মানুষ। পরীক্ষা পেছাতে কি আসলেই রাজি হবেন? কিছু কাকুতি মিনতি করতে তো দোষ নেই। তাই করলাম যথারীতি।  
স্যার বললেন, শুনো মুরাদ ভুঁইয়া, একসাথে দুইটা কাজ হয় না। হোজ্জার খিদমতে থাকছ, খুব চমৎকার একটা কাজ করছ । সন্তুষ্ট থাকো। এই কাজের জন্য তোমার পরীক্ষা কিছুটা খারাপ হতে পারে। হোক না, সমস্যা কোথায়? হোজ্জার সান্নিধ্যে থাকবা আবার পরীক্ষাও ভালো হবে– তা তো হয় না। 

স্যারের কথায় আমি আহত হলাম । আমার মন খারাপ দেখে স্যার বললেন, মাস্টার্সের থিসিসে হোজ্জার দেশ ভ্রমণ নিয়ে পেপার তৈরি করো। খুব প্রাকটিকাল কিছু একটা হবে। উপন্যাস আকারে লিখতে পারো, যা যা ঘটেছে। 
এবার স্যারের কথার শুনে আমার মনটা ভালো হয়ে গেল। মাস্টার্সের পেপার তৈরির ব্যাপারে আগে থেকেই দুশ্চিন্তা ছিল । ফয়েজ স্যারের কাছেই পেপার দিতে হবে।  স্যার নিজেই এত চমৎকার আইডিয়া দিয়ে দেবেন ভাবতে পারি নি! (প্রিয় পাঠক! কিছু আন্দাজ করতে পারছেন? এই উপন্যাসটি মূলত আমার মাস্টার্স থিসিস পেপারের জন্যে লিখা বাংলায় খসড়া!)



ভার্সিটি থেকে মোটামুটি খুশি মনে বাড়ি ফিরছি। আকাশে মেঘ করেছে। কিন্তু গরম কমছে না। মনে হয় বৃষ্টি পড়বে। রাস্তাতেই যদি বৃষ্টি আসে, তাহলে ভিজে ভিজেই বাড়ি ফিরব। ভেবেই আনন্দ লাগছে। আগে আমি এমন ছিলাম না। হোজ্জার সাথে ঘুরে আমার মধ্যে বেশ পরিবর্তন এসেছে। পরিবর্তন আসাটাই স্বাভাবিক। আগে ছিল গৎবাঁধা জীবন। এখন সবকিছুই রোমাঞ্চকর মনে হয় । জীবনের ভিন্ন একটা স্বাদ পাচ্ছি। আবার ভাবছি হোজ্জা যখন বিদায় নেবেন, তখন কী হবে? জীবন তো আগের মতই একঘেয়ে হয়ে যাবে। সেটা কি সহজেই মানিয়ে নিতে পারব? কিন্তু জীবন তো থেমে থাকে না। কোনো কিছু বদলিয়ে কোনো কিছু ফেরানো যায় না। আচ্ছা, মানুষের হায়াত কত দিন হয়? ৭০-৮০ বছর। অনেক কম। কিন্তু এতেই ভালো । হায়াত এর চেয়ে দীর্ঘ্য হলে মানুষের জীবন বেশি একঘেয়ে হয়ে যেত। একঘেয়েমী দূর করার জন্য মানুষ যথা তথা আনন্দ খুঁজত। হয়ে যেত স্বেচ্ছাচারী । দীর্ঘদিন বাঁচার নিশ্চয়তা পেলে মানুষ স্বভাবতই অন্যায় কাজে বেপরোয়া হয়ে উঠে। ন্যায়নীতির ধার ধারে না। এজন্য জীবনে মৃত্যুর অনিশ্চয়তা খুবই উপকারী বিষয় । আমরা শান্ত থাকি। সীমালংঘন করতে ভয় পাই। 


হোজ্জার কর্মকান্ডের সাথে আমি ভালোভাবেই জড়িয়ে গেছি। আগে চিন্তা করতাম সোজাসুজি ভাবে। হোজ্জার প্রভাবে কিছুটা বক্রভাবে চিন্তা করতে শুরু শিখেছি। বুঝতে পারছি– ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় মাসুমও হোজ্জার সাথে আটকে গেছে। সে বলেছে– হোজ্জা যতদিন আছেন তার সহচার্যে থাকবে সে। অবশ্য তার ফোন ও মানিব্যাগ হোজ্জার কাছে জমা। মাসুমের পালানোর উপায়ও নেই। তার অবচেতন মন তাকে তার ফোন, মানিব্যাগের আশপাশে থাকার জন্য চাপ দেবে। ফোন-মানিব্যাগের আশপাশে থাকা মানেই হোজ্জার আশে পাশে থাকা। 

হোজ্জা এখনোও সজ্যাশায়ী। মাসুম তার দেখাশোনা করছে। হোজ্জা বলেছেন, কুরআন শুনলে তার শরীর কিছুটা ভালো বোধ হয়। তিনি সারাক্ষণ রুকিয়ার অডিও শুনছেন। দুআ কালাম পড়ে নিজেকে ফুঁকে দিচ্ছেন। 

                                                  (৭)(নতুন পাতা) 

হোজ্জা আজ বেশ সুস্থ্য হয়ে উঠেছেন। আল্লাহর অশেষ শুকরিয়া। তার সুস্থ্য হতে ৫-৬ দিন লেগে গেল।  আমরা সবাই খুশি। তবে, আমার মা’র মন খারাপ। কারণ মেয়েপক্ষ জানিয়েছে– তারা ভাইয়ার সম্মন্ধটায় আগ্রহ বোধ করছে না। অতএব মেয়ে দেখতে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমি খুশি হয়েছি । ভাইয়া এমনিতেও না করেছিল। কিন্তু আমার মা বলেছেন– বাংলাদেশে মেয়ে কি একটাই? অতি দ্রুত আরো ভালো পরিবারের মেয়ের সাথে বিয়ের চেষ্টা করা হবে। হোজ্জা থাকতেই মেয়ে দেখার আয়োজন হবে। মা’র কঠিন পণ। এদিকে হোজ্জা জানিয়েছেন– কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সাথে তিনি দেখা সাক্ষাত করতে চান। আমি ভাবছি কার কার সাথে দেখা করানো যায়। আমার দৌড় বেশি দূর পর্যন্ত না। তাও সাধ্যমত চেষ্টা করব। 

বন্ধু মাসুম বেশ ভালো সাহায্য করতে পারল এ ব্যাপারে। দিন দুইয়ের মধ্যে একজন নেতার সাথে এপয়েনমেন্ট চুড়ান্ত হল। আমরা আসরের নামাজ পড়ে গেলাম তার অফিসে। কিন্তু তিনি ব্যাস্ত। কার সাথে যেন মিটিং করছেন। ফেসবুকে লাইভ করবেন কিছুক্ষণ পর। আমাদের অপেক্ষায় থাকতে হবে। 
সময় পেলাম মাগরিবের নামাজের পর। নেতার শক্তপোক্ত, লম্বা চওড়া শরীর। কাঠের চেয়ারে সোজা হয়ে বসে আছেন। তার শারীরিক শক্তিমত্তার প্রবল প্রভাব অনুভব করা যায়। শারীরিক গড়নও মনে হয় কিছু মানুষকে রাজনীতি করার প্রেরণা দেয়। নিত্যদিন মিছিল মিটিং, হৈ হট্টগোল করা তো সহজ কথা না। বলশালী লোকেরই দরকার। নেতা কি যেন টিপছেন তার ফোনে। আমাদের দিকে তার মনোযোগ নেই। চোখগুলো কেমন অশান্ত। আমাদের দিকে তাকালেন সন্দেহ ভরা দৃষ্টিতে। কিছুটা বিরক্তি ফুটে উঠছে। রাজনৈতিক দলের নেতারা সম্ভবত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বাদে অন্যদের সাথে আলোচনায় আগ্রহ পান না। এতে তাদের ফায়দা নেই। যদিও তারা বক্তব্যে বলেন– তাদের রাজনীতি জনগনের জন্য। যাই হোক, প্যাচাল বন্ধ করি। নেতা আলোচনা দ্রুত শুরু করার তাগাদা দিচ্ছেন। কারণ দ্রুত শুরু হলেই দ্রুত শেষ হবে। আলোচনা শুরু হলো। আলোচনা খুবই সংক্ষিপ্ত।


হোজ্জাঃ আপনারা করছেন টা কি?
বিরোধী নেতাঃ রাজনীতিই তো করছি। ক্ষমতায় যেতে চাই।
হোজ্জাঃ ক্ষমতায় যেতে না পারলে, তখন কী করবেন? 
বিরোধী নেতাঃ জনগনকে সাথে নিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলব। যে সরকার ক্ষমতায় আসবে তাদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলব। বিরোধীতাই তখন আমাদের রাজনীতি।
হোজ্জাঃ লাভ? 
বিরোধী নেতাঃ সামনের টার্মে আমাদের ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। 
হোজ্জাঃ একটা সরকারকে মাত্র পাঁচটা বছর সময় দেয়া হয়। দেশ গড়ার পরিকল্পনা করতে আর পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন শুরু করতেই লাগে দুই থেকে আড়াই বছর। আপনারা তো বিরোধীতা, আন্দোলন চালিয়েই যাবেন। সরকার অস্থিরতায় মন দিয়ে কাজ করতে পারবে না।  এরপর দুই বছর পর আবার নতুন নির্বাচন। সরকারের নতুন দুশ্চিন্তা শুরু। সরকার তো পুরো সময় জুড়ে টালমাল! তবে আপনাদের ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। 
বিরোধী নেতাঃ জি, এটাই গনতন্ত্রের সুবিধা। সরকারে যাওয়ার সখ সবারই পূর্ণ হবে। 
হোজ্জাঃ সব পক্ষ মিলেমিশে সরকার করলেই তো পারেন। 
বিরোধী নেতাঃ হা হা। তাহলে আর রাজনীতি থাকল কই? 
হোজ্জাঃ সারাবছর শুধু রাজনীতি আর রাজনীতি? অস্থিরতা?
বিরোধী নেতাঃ রাজনীতির নেশা বড়ই নেশা। 
হোজ্জাঃ দেশের লাভ দেখবেন না? 
আমি (মুরাদ): রাজনৈতিক অস্থিরতা মানে অসংখ্য নিউজের সোর্স। নিউজ মিডিয়াগুলো বেঁচে বর্তে থাকবে ভালোমত। নিউজ করবে বেশি বেশি। টাকা কামাতে পারবে। নেতারা, বুদ্ধিজীবিরা বেশি বেশি টকশোতে আমন্ত্রন পাবে, তারাও নিয়মিত টাকার খাম পাবে। ইউটিউবারদের কন্টেন্ট এর ঘাটতি হবে না। সবারই লাভ। লাভই লাভ। রাজনৈতিক নেতারা এই লাভের দিকেই খেয়াল রাখেন।  

নেতা তাকিয়ে আছেন। তার মুখে কোনো কথা নেই। আমি এত কিছু বলে ফেলব– ভাবি নি। কিভাবে যেন বলে ফেললাম!  হোজ্জার সাথে ঘুরে এমন হয়েছি নিশ্চয়ই। হোজ্জার চেহারা খুশি খুশি। মনে হয়, তিনি আমার কথায় খোশ হয়েছেন। মাসুমের চোখ চারদিকে ঘুরছে। সে একবার নেতাকে দেখছে। একবার হোজ্জাকে, একবার আমাকে। 
নেতা বললেন, আপনাদের সবার বুদ্ধি আছে ভালো। আমাদের দলে যোগ দেবেন? শুরুতেই ভালো পদ পাইয়ে দিব।

ভালো পদের লোভ জলাঞ্জলি দিয়ে আমরা নেতার অফিস থেকে বের হয়ে এলাম। মাসুম বলল, চলেন আজই এক অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতার সাক্ষাত করে আসি। বললাম, উনি ফ্রি আছেন এখন? 
মাসুম কল করে জানল– নেতার সাথে সাক্ষাত করা যাবে। হোজ্জাকে জানালাম। তিনি বললেন, চলো যাই। 

 
আমরা তিনজন ইজিবাইকে। চেনা পথ। রাস্তার দুধারে সারি সারি দোকান। এক হোটেল ওয়ালা খাবার পরিবেশনে ব্যাস্ত। তার চেহারা হাসি হাসি। আজ হয়ত বিক্রি ভালো হচ্ছে। রাস্তার ডান পাশে গ্রিন চিলি পার্টি সেন্টার । এটা সপ্তাহে ৫/৬ দিন বন্ধ থাকে। শুক্রবার বিয়ের অনুষ্ঠান উপলক্ষে ভাড়া হয় বেশিরভাগ। আজ বুধবার। রাস্তায় প্রচুর যানবাহন। অফিস থেকে ফেরা মানুষেরা ব্যাস্ত পায়ে বাসা ফিরছে। ব্যাস্ত এই শহরে সবাই ব্যাস্ত। কারো প্রতি কারো ভ্রূক্ষেপ নেই। এক অতিবৃদ্ধা মহিলাকে দেখলাম– রাস্তার এক পাশ দিয়ে বসে বসে এগোচ্ছে । জীর্ন দেহ। চলার শক্তি নেই। হয়ত দাঁড়াতে অক্ষম। দেখে মায়া লাগল। আমাদের ইজিবাইক তাকে কাটিয়ে এল। হয়ত কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধার প্রতি আমার মায়াও কেটে যাবে। ব্যাস্ত শহরের ব্যাস্ত মানুষদের কারো প্রতি মায়া ধরে রাখার ফুরসত নেই। জনগনের সরকারও জনগন নিয়ে পড়ে নেই। কিংবা হয়ত এই বৃদ্ধাটি জনগন হয়ে উঠতে পারে নি। 
হোজ্জা মনে হয় কিছু খেয়াল করছেন না। তার চোখ আধ-বোজা হয়ে আছে। মাসুম বসেছে সামনে। তার মুখেও কোনো কথা নেই। 

প্রভাবশালী নেতার অফিসে চলে এসেছি। কল্পনায় দেখতে পাচ্ছি– নেতা সাহেব আছেন খোশ মেজাজে। তার পরনে পাঞ্জাবী। মুখে পান। হাসি হাসি মুখ। সব কিছু আনন্দময়। হবে না কেন? ব্যাবসায়ীরা তাদের তোয়াজ করে। পুলিশরাও মান্য করে। সবাই জানে নেতার জীবন হতে যাচ্ছে বিত্তময়, ক্ষমতাময় । 
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের ডাক পড়ল। নেতা ফ্রি হয়েছেন। 
রুমের ভিতরে ঢুকে দেখলাম ভিন্ন পরিবেশ। নেতা চিন্তিত মুখে সিগারেট টানছেন। তার চোখ লাল। চেহারায় বিরক্তি। হয়েছে টা কী?
মাসুমকে জিজ্ঞেস করলাম– কথা বলার অবস্থা আছে? ও ইশারায় বলল-- সমস্যা নাই। 
নেতা হোজ্জাকে সালাম দিলেন। হাসি হাসি মুখ করার চেষ্টা করলেন, ঠিক পেরে উঠলেন না। 
হোজ্জা জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে ভাই? চিন্তিত লাগছে যে?
  ‘আর বলবেন না, দলের মধ্যে কয়েকটা প্যানেল। এক প্যানেল আমাকে এমপি মনোনয়ন দিবে। মনে হচ্ছে, অন্য প্যানেল আমার প্যানেলকে টেক্কা দিয়ে দিবে। দুশ্চিন্তায় আছি।’
   ‘তাহলে আপনি এমপি হতে পারছেন কি না, এই দুশ্চিন্তায় আছেন ?’ 
   ‘জি।’
   ‘ ধরুন এই টার্মে এমপি হলেন, পরের টার্মে দল তো অন্য কাউকে বেছে নিতে পারে। ক্ষমতা ছেড়ে দেবার পর কেমন লাগে?’
   ‘সামনের বার এমপি হতে পারলেই কামায় নিব।’
   ‘পরেরবার সেই টাকার জোড়ে মনোনয়ন বাগাবেন?’
   ‘হা হা হা। হাসালেন। হা হা হা’ 
   ‘হাসেন। হাসা স্বাস্থের জন্য ভালো।’
নেতা সাহেব একটা সিগারেট এশট্রেতে রেখে আরেকটা ধরালেন। তার চেহারা কিছুটা সহজ হয়েছে। বললেন, হোজ্জা আপনি মুরুব্বী মানুষ। বেয়াদবি নিবেন না। সিগারেট টানতেছি। টেনশনের কারণে টানতেছি। আপনারা মোল্লা মানুষ ভালোই আছেন। শান্তিতে আছেন। 
    ‘আপনিও আমার মত মোল্লা হয়ে যান? শান্তিতে থাকবেন।’
    ‘হা হা হা। হোজ্জা, আপনি বড় মজার মানুষ।’
    ‘আপনারাও মজার মানুষ। জনগনকে মজা দেখান!’
    ‘আপনাকে আমার পছন্দ হয়েছে।’
    ‘ধন্যবাদ।’

নেতা এক কর্মচারীকে ডেকেছিলেন। সে এলে হাতের ইশারায় তাকে চলে যেতে বললেন। নেতার মনোযোগ হোজ্জার দিকেই।
    ‘শুনুন হোজ্জা, রাজনীতি খুব কঠিন খেলা। ফুটবল বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলা কী খেলা? তার চাইতে কঠিন খেলা। কখন যে গোল খাই, কখন বা প্রতিপক্ষকে গোল দেই। এই নিয়ে দিনরাত দুশ্চিন্তা। টেনশন।’
     ‘ক্ষমতায় যাওয়ার পরেও টেনশন?’
    ‘জি। বিরোধী দল কেমনে দমন করব– এই টেনশন। ৫ বছর তো এই টেনশনেই থাকি।’
      ‘আপনাদের জীবন তো দেখি বিশাল খেলার মাঠ।’
      ‘ভয়ানক খেলা।’
নেতা সাহেবের দ্বিতীয় সিগারেটটাও শেষ। তিনি ওয়াশরুমে গেলেন। আমরা বাইরে বের হয়ে একটু শ্বাস নিলাম। সিগারেটের ধোঁয়ায় খুবই জঘন্ন অবস্থা। নেতা ফিরে এসে তাড়া দেখাতে লাগলেন। তার নাকি কোথায় যেতে হবে। আমরাও উঠতে যাচ্ছি। নেতা হঠাৎ থামালেন। বললেন– আপনাদের একটা উপকার করি। দেশি বিদেশি অনেক গুরুত্বপূর্ণ লোকের সাথে আমার উঠাবসা আছে। আমি বললে অনেকেই আপনাদের সময় দেবে। আপনারা ফকির-দরবেশ মানুষ। ঘুরতে ফিরতে দেখতে পছন্দ করেন। আমি কিছু হেল্প করলাম আরকি। সমস্যা আছে? 
হোজ্জা বললেন, ‘কেন হেল্প করতে চাচ্ছেন?’   
  ‘আহহা। বললাম না আপনাকে আমারপ ছন্দ হয়েছে।’
  ‘আচ্ছা। আচ্ছা।’
নেতার চেহারা কেমন শক্ত হয়ে উঠেছে। তিনি কি বিরক্ত বোধ করছেন? আর বেশিক্ষণ না থাকাই ভালো। 
আমরা বের হয়ে আসছি। নেতা বললেন, আপনাদের কোনো নাশতা খাওয়াই নি। মেহমানদারি করি নি। কিছু মনে করবেন না। 
   ‘কেন করেন নি!’ হোজ্জা জিজ্ঞেস করলেন।
   ‘আমার অধিকাংশই অবৈধ উপার্জনের টাকা। এই টাকা আপনাদের পেটে গেলে তো ইবাদাত কবুল হবে না।’

নেতার কথায় আমরা চমকে গেছি। কার কাছে কি শুনছি? বিশ্বাস হচ্ছে না। আমরা চুপ করে আছি। হোজ্জা বসে পড়লেন আবার। নেতাও বসলেন। তিনি সম্ভবত কিছু বলতে চাচ্ছেন। 
    ‘আমার দাদা ছিলেন টাইটেল পাশ মাওলানা। ধর্মীয় জ্ঞান ছোটবেলায় ভালোই শিক্ষা করেছি। দাদা বাবাকে ভার্সিটিতে পাঠালেন পড়তে। সেখানে থেকে বাবার রাজনীতি শুরু। বাবার পরে রাজনীতি করছি আমি।’ 
    ‘আচ্ছা। আচ্ছা।’ 
    ‘আপনারা যান তাহলে। আমার আস্তানায় সময় দিয়ে আপনাদের লাভ নেই।’


 

আমরা বেরিয়ে আসছি। নেতা আমাদের চোখের সামনে দিয়ে তার গাড়িতে উঠে গেলেন। আমাদের দিকে তাকালেন না। তার চেহারা শক্ত। অফিসের একজন কর্মচারী আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন। ফিসফিস করে বললেন, আপনারা এখানে আসছেন কেন? নেতা ডেঞ্জারাস লোক। আপনাদের সাথে কোনো তর্কাতর্কি হলে পরে এসে সমাধান করে নিয়েন। সমাধান না কইরে থাইকেন না। 

আমি তাকে বললাম– কী বলছেন ভাই?
  ‘আপনারা সহজ সরল মোল্লা মানুষ দেইখা বইললাম। যা কইছি সত্য। আমার কথা কাউরে কইয়েন না।’
  ‘না, না। তার সাথে আমাদের ভালোমত কথা হয়েছে। কোনো তর্ক হয় নি।’
  ‘তাহলে তো ভালোই।’

ফেরার সময় মাসুমকে ধরলাম। কী রে কার কাছে নিয়ে এসেছিস? ডেঞ্জারাস লোক– বলল যে?  
   ‘হতে পারে।’
   ‘আচ্ছা সমস্যা নেই। ইন শা আল্লাহ। হাসবুনাল্লাহ।’

হোজ্জা বললেন বাকি রাস্তা হেঁটে হেঁটে ফিরবেন। তিনি আমাদের ইস্তেগফার করার নির্দেশ দিলেন। মাসুমকে ইস্তেগফার শিখিয়ে দিলাম। অতীতের গুনাহ গুলো স্মরন করে বলতে হবে– আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। 

আশা করি আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করবেন। 

                                                  (৮) (নতুন পাতা)

ঘরে বসে আছি। অলস দুপুর।  
হোজ্জা বলেছেন– তিনি ফিরে যেতে চান। বড় জোড় এক সপ্তাহ থাকতে পারেন। তার নাকি ক্লান্তি বোধ হচ্ছে। হোজ্জার চলে যাওয়ার কথা জেনে আমাদের সবার মন বিষন্ন হয়ে গেল। সকাল থেকেই হোজ্জা ঘরে অবস্থান করছেন। কী যেন ভাবছেন সারাক্ষণ। কথা বললে হাতের ইশারায় চুপ থাকতে বলছেন। তিনি চোখ বন্ধ করে আছেন। 

দুপুর আড়াইটা মত বাজে। খাওয়া সেরেছি। হোজ্জা হয়ত ঘুমিয়ে যেতে পারেন। 
অনেক জোড়াজুড়ি করে মাসুমের খালাত ভাই পাভেল ঘরে ঢুকেছে। মাসুম তাকে ঢুকতেই দেবে না। সে নাকি হোজ্জার সাথে দেখা করবে। ছেলেটা একটু বেশিই আধুনিক। একটা ডিজে ডিজে ভাব। মাসুম তাকে ঢোকার আগেই না করে দিয়েছিল কথা বলতে।  হোজ্জা বিষন্ন এবং চুপচাপ। পাভেল ঘরে ঢুকেই বলল, হোজ্জা, আপনার নাকি মন খারাপ? ঘুমিয়েছেন না-কি?
হোজ্জা চোখ বন্ধ করে ছিলেন।  তিনি চোখ খুলে বললেন, ‘না ঘুমাই নি।’ 
পাভেল বলল, চলুন বিকালে গলাচিপা মোড় স্কুলে কনসার্ট হবে। শুনে আসি। মন খারাপ দৌড় দিয়ে পালাবে! হা হা।’
আমরা সবাই হতভম্ভ। এই ছেলে বলে কি? বেশামাল অবস্থা। প
রিস্থিতি সামলানোর ভার হোজ্জার উপরই ছেড়ে দিলাম। 
পাভেল আবার সরব হলো,
  ‘হোজ্জা, যাবেন? চলেন সেই রকম কনসার্ট হবে!’
হোজ্জা বললেন, বাবা এক কাজ করো। তুমি ৫ মিনিট পরে এসে আমাকে আবার জিজ্ঞেস করবে, “হোজ্জা, ঘুমিয়েছেন না-কি?” এরপর যা হয় আলাপ হবে। এখন না।
   ‘পাঁচ মিনিট পরে জিজ্ঞেস করব কেন?’
   ‘কারণ, পাঁচ মিনিট পরে আমি সত্যিই ঘুমিয়ে যাবো ইন শা আল্লাহ।’
   ‘এতে কি লাভ?’
   ‘তোমার প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে না, এটাই লাভ।’

পাভেল বেচারা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। মাসুম তাকে পাশের ঘরে জোড় করে নিয়ে গেল। কি যেন ধমক ধামক দিল। এর কিছুক্ষণ পর পাভেল বের হয়ে গেল। যাওয়ার সময় দেখল– হোজ্জা ঠিকই ঘুমিয়ে পড়েছেন। 


আসরের নামাজ পড়লাম মুকাদ্দাস মসজিদে। মসজিদের পাশে ছোট একটা ডোবা। প্রচুর এডিস মশা জন্মায় এখানে। গতবছর বাড়ি বাড়ি ডেঙ্গু হয়েছিল। অনেক বলার পরেও গতবার ডোবাটা  বন্ধ করা যায় নি। এবার মাটি ফেলে বন্ধ করা হচ্ছে। দাঁড়িয়ে মাটি ভরাট করা দেখছি। আমাদের সাথে আরো কিছু মানুষ। আসরের নামাজ পড়ে বের হয়েছে সবাই। খেয়াল করলাম খয়েরি পাঞ্জাবী পরিহিত একজন এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের খুব কাছে। আমাদের দৃষ্টি আকর্ষনের চেষ্টা করছে। লোকটির মাথায় টুপি, ক্লিন শেভ। বেশ লম্বা চওড়া। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কিছু বলবেন?’
 হোজ্জার সাথে চলে আমার ধারণা হয়েছে, আমার পাশে এসে কেউ দাঁড়ানো মানেই হোজ্জার সাথে কথা বলতে আগ্রহী কেউ। যেমন বাবা ও তারা বন্ধুরা সবাই মিলে নাকি একদিন মিলে হোজ্জার সাথে দেখা করতে আসবে। আমাকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। তাদের দৃষ্টিতে আমি হোজ্জার এসিসটেন্ট। 
লোকটি বলল, ‘ইনি নাসিরুদ্দীন হোজ্জা?’
 ‘জি। ইনি নাসিরুদ্দীন হোজ্জা।’
দেখছি লোকটি একা নয়। তার চারপাশে আরো কয়েকজন ঘিরে আছে। লোকটি নেতা গোছের কেউ হতে পারে। কী যন্ত্রনা! লোকটি আমাকে উপেক্ষা করে হোজ্জার সামনে গিয়ে বলল, ‘হোজ্জা, আমার জন্য খাস করে দুআ করবেন। আমি হজ্জে যাচ্ছি।‘

 লোকটি হোজ্জাকে নিজের পরিচয় দিচ্ছে। হোজ্জা শুনছেন। হঠাৎ আমার পেছনে একজনের আবির্ভাব হলো। আমার কাঁধে হাত রেখে  দৃষ্টি আকর্ষন করল। ফিরে তাকিয়ে দেখি— নাসিম মল্লিক সাহেব! যিনি ফ্রডের শিকার হয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। 
‘ওহ আপনি! কেমন আছেন?’
 ‘এই লোক। এই লোকই আমাকে নিঃস্ব বানিয়েছে। মহাবদটা।’
 ‘কোন লোক?’
 ‘এই যে হজ্জে যাবে। দুআ চায়।’
 ‘ওহ। I see.’

 

আমি হোজ্জাকে ব্যাপারটা জানালাম। নাসিম সাহেব কোথায় থেকে যেন দু’জনকে ধরে নিয়ে এসেছেন। তারা উভয়েই জানালো, নেতা গোছের লোকটির নাম মোতালেব। সে নাসিম সাহেব সহ আরো অনেকের সম্পত্তি আত্মসাৎ করছে। অনেক বড় জায়গায় তার খাতির। এজন্য কিছু হয় না। 
তৃতীয় আরেকজন এসে লোকদুটির কথায় সাঁয় দিল। ফিসফাস আলাপ চলছে। 
হচ্ছে টা কী? আজ কোনো গোলমাল বাঁধবে না তো?
হোজ্জাও সবকিছু শুনেছেন। 
মোতালেব লোকটি অন্য কার সাথে যেন কথা বলছে। হয়ত ডোবাটা ভরাট করছে সে-ই। জমিটা কিনবে হয়ত। এরকমই শুনলাম। সে আবার হোজ্জার দিকে ফিরে এসেছে।
 ‘আমার জন্য খাস করে দুআ করবেন, হোজ্জা!’
মোতালেব সাহেবের মুখে তেলতেলে হাসি। 
ভাবছি হোজ্জাকে বলে এখান থেকে দ্রুত চলে যাওয়াই ভালো। হোজ্জা লোকটির দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবলেন। আমাকে বললেন, মুরাদ একটা ভালো সাবান আনার ব্যাবস্থা করো। মাসুম গেল সাবান আনতে। পাশেই দোকান।

 ‘আপনার নাম কি জনাব?’, হোজ্জা লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন।
 ‘মোতালেব।’

‘মোতালেব সাহেব, আপনি দুআ চান? 
‘জি।‘
‘আপনার জন্য দুআ করব। আগে এই ডোবায় নেমে ভালো মত গোসল দিন। পরিস্কার, পবিত্র হোন।’
আমরা সবাই ডোবার দিকে তাকালাম। ডোবার পানি কুটকুটে কালো। মশা উড়ছে। হোজ্জা কী বোঝাতে চাইছেন বুঝলাম না। লোকটিও অবাক।
 ‘এই ডোবায় গোসল করব মানে?’
 ‘হ্যাঁ, গোসল করে পরিস্কার হন। পবিত্র শরীর পবিত্র মন।‘
 ‘এই নোংরা পানিতে গোসল করলে পবিত্র হব? বলেন কী?’

 হোজ্জা মাসুমের হাত থেকে সাবান নিয়ে লোকটিকে দেখালেন। বললেন, ‘ভাই সাহেব, এই যে সাবান। সাবান দিয়ে গোসল দেন। সাবান মেখে দেবেন ডুব। তাহলে গায়ে ময়লা থাকবে না। নেমে পড়ুন। কয়েকটা ডুব দিয়ে। গায়ে সাবান ভালোমত ডলবেন কিন্তু। এরপর দুইটা ডুব দিয়ে উঠে আসুন। আপনার জন্য দুআ করব। উত্তম কিছু নসীহত করব। আপনি হজ্জে যাবেন, হাজী হবেন।’
চারদিকের অনেক লোক তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। আমরা সবাই অবাক হয়ে হোজ্জার কথা শুনছি। নেতা লোকটির হতভম্ভ ভাব কাটছে না। হোজ্জার এই অদ্ভুত কথার অর্থ বোঝার চেষ্টা করছি। কিছুটা আতঙ্কিত লাগছে। লোকটি যদি ক্ষেপে গিয়ে কিছু করে বসে। আমি হোজ্জাকে হালকা আড়াল করে দাঁড়ালাম। নাসিম সাহেব হঠাৎ পেছন থেকে অট্টহাসি দিয়ে উঠলেন।  সবাই চমকে তার দিকে তাকাল। তার হাসিতে খেলা করছে— একজন হতভাগ্য মানুষের আস্ফালন, ক্রোধ। 
 ‘আরে হোজ্জার কথা কেউ বুঝলেন না?’, নাসিম সাহেবের কন্ঠে কৌতুক।
কেউ কথা বলছে না। সবাই নিশ্চুপ। নাসিম সাহেবের কন্ঠ আবার শোনা গেল। 
‘ নোংরা পানিতে নেমে সাবান দিয়ে গোসল দিলে যেমন শরীরের ময়লা, নোংরা দূর হয় না, তেমনই হারাম টাকা দিয়ে হজ্জ করলে হজ্জও কবুল হবে না। মোতালেব একজন হারামখোর। আত্মসাৎকারী। আমার সম্পত্তি দখল করেছে। এজন্য হোজ্জা তাকে ময়লা ডোবায় গোসল দিতে বলেছেন।’
নাসিম সাহেবের কন্ঠে কি ভিষন ক্রোধ! তিনি মনে হয় রাগে পাগল হয়ে গেছেন। এখন আবার হাসছেন।  হা হা হা। উদভ্রান্ত পাগল মানুষের হাসি। সবাই তার দিকে তাকিয়ে । লেবার লোকগুলো কাজ বন্ধ করে তাকিয়ে আছে। একটা চাপা গন্ডোগোল এর আভাস পাচ্ছি। স্পষ্ট।
মোতালেব সাহেবের চেহারা কঠিন হচ্ছে ধীরে ধীরে। তার দিকে খেয়াল করে তার সাংগপাংগরা শার্টের হাতা গুটাচ্ছে। তাদের খুবই উচ্ছৃঙ্খল লাগছে। আমি এক মুহুর্তে পরিস্থিতির নাজুকতা অনুভব করতে পারলাম। চাপা কন্ঠে মাসুমকে বললাম, হোজ্জাকে দ্রুত রিকশায় উঠায় নিয়ে সরে যা। মাসুমের চেহারা শক্ত হয়ে উঠল। সে হোজ্জাকে আড়াল করে দাঁড়ালো। আমি ধাক্কা দিয়ে নাসিম সাহেবকে একটা অটোর মধ্যে উঠিয়ে দিলাম।


মাসুম আর হোজ্জা চলে গেছেন। মোতালেব সাহেবের চেহারা নীল হয়ে গেছে। তার লোকগুলো আমার দিকেই এগিয়ে আসছে। আমি শান্ত ভাবে দাঁড়িয়ে আছি। ভয় পাব কেন? আমি এলাকারই ছেলে। তাছাড়া ভয় পেলে লোকগুলো আক্রমনের জন্য বেশি উদগ্রিব হবে। এটা করা যাবে না। আবার আক্রমনাত্মক ভঙ্গিও দেখানো যাবে না। আমি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। আমি তাদের বোঝাতে চাচ্ছি—পরিস্থিতি এমন কিছুই হয় নি যে—সংঘাত হবে। আমিও শান্ত, আপনারাও শান্ত হোন। জানি না কতটুকু পারছি।

শেষ পর্যন্ত কিছুই হলো না। পরিস্থিতি ঠান্ডা। তবে মোতালেব সাহেব বলল— সবার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করবে। অনেকে সাক্ষী— মোতালেব সাহেবকে সবার সামনে অপমান করা হয়েছে, অপবাদ দেয়া হয়েছে। কোটি টাকার মানহানির মামলা হবে। কোর্টের বারান্দায় বারান্দায় ঘুরতে হবে আমাদের। জীবন তামা তামা করে দেয়া হবে। ইত্যাদি ইত্যাদি। বকেই যাচ্ছে। 
আমি চুপচাপ হেঁটে যাচ্ছি আর ভাবছি, ‘আরে আমার মামলাবাজ!’ 
আমার মাথা গরম হতে শুরু করেছে। এতক্ষণ ঠান্ডাই ছিল। মাথা গরম হলে মাথা চুলকাতে থাকে আমার। মাথা চুলকাতে চুলকাতে আমি বাড়ি ফিরছি। ভাবছি-- কি একটা ঝামেলায় পড়লাম!


 বাসায় ফিরে আরেকটা দুঃসংবাদ শুনলাম। মাসুমের বোনের ডেলিভারি হবে। হসপিটালে নেয়া হয়েছে। অবস্থা খুবই ক্রিটিকাল। (মাসুমকে আমার বাটন ফোন দিয়েছি, ওখানে সিম ঢুকিয়েছে। সেই ফোনেই সে বাড়ির সাথে যোগাযোগ করছে।)

প্রেগনেন্সির খুবই ক্রিটিকাল কিছু অবস্থা থাকে। হয়ত বাচ্চা না হয় মা, দুজনের একজনকে বাঁচানোর অপশন দেয় ডাক্তার। আমার ছোট খালার সর্বশেষ সন্তান হওয়ার সময় এমন হলো। আমার খালাত বোন চিৎকার করে বলল, আমাদের জীবিত বাচ্চাই লাগবে। বলেই শুরু করল কান্না। অবশ্য এখন আমার ছোট্ট খালাত ভাই আর খালা দুজনই সুস্থ্য আল্লাহর রহমতে। তবে খালা একবারেই সুস্থ্য হন নি। দীর্ঘদিন ছিলেন তীব্র অসুস্থ্য। মাসুমের বোনেরই শুনলাম একই রকম ঘটনা। 
মাসুমের চেহারা ভীত সন্ত্রস্ত। ফ্যাকাশে। আমি বললাম, সাথে যাই? সে বলব, কী লাভ? 
মাসুম বের হয়ে গেল দ্রুত। 
আল্লাহ রহম করুন। 

মোতালেব সাহেব হুমকি ধামকি দিয়েছেন। হোজ্জাকে জানালাম। আইন আদালতের ঝামেলার কথা বললাম। হোজ্জা শুনে বেশ ঝিমিয়ে গেলেন।
 ‘আমাদের সময়ে কোনো ঝামেলা হলে কাজীর নিকট গিয়ে মিটিয়ে নিতাম। এখন তো দেখি আইন আদালত বহু খরচান্তের ব্যাপার। তাছাড়া বুড়ো বয়সে কোর্ট কাচারি ছোটাছুটি তো সহজ নয়। এমন বিপদে পড়ব—তা তো ভাবি নি।’
 আমি বললাম, ‘ হোজ্জা, আপনি যা করেছেন—অন্যায় কিছু করেন নি। আল্লাহ আছেন আমাদের পক্ষে।’
 ‘ভিনদেশে এসে আবার কি ঝামেলায়  না পড়তে হয়—তাই ভাবছি।‘

 হোজ্জা কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। এরপর বললেন, যাক গে, আল্লাহর  উপর ভরসা।
 আমি তার কথা সাঁয় দিলাম।


 মাগরিবের নামাজের পর হোজ্জা বললেন—সব কাজ বন্ধ। এখন নফল নামাজ পড়ব। তুমিও ওজু করে নামাজে দাঁড়াও। আল্লাহর স্মরণেই শান্তি।
 আমি হোজ্জার কথায় সাড়া দিলাম।

ইশার মিনিট বিশেক আগে মাসুম এল। তার চেহারা থমথমে। খুব দ্রুত হেঁটে এসেছে হয়ত। কিংবা দৌড়ে। হাঁফাচ্ছে।
 ‘তোর বোনের এখন অবস্থা কী?’
 ‘ডাক্তার এখনো ভালো কিছু বলে নাই। চেষ্টা চলছে। বলেছে-- হয় মা’কে বাঁচাতে হবে নাহয় বাচ্চাকে।’
 ‘আল্লাহ রক্ষা করুন! আল্লাহই বাঁচানোর মালিক।‘
 মাসুম প্রায় কেঁদে ফেলল।
বললাম, ‘মাসুম, দোস্ত। কাঁদিস না। ওজু করে আয় নামাজ পড়ি। দুআ করি আল্লাহর কাছে। হোজ্জাও নফল নামাজ পড়ছেন।’

 মাসুম কোনো কিছু না বলে ওয়াশরুমে চলে গেল। ওজু করে এসে নামাজে দাঁড়ালো।
 ‘দোস্ত, সিজদায় দুআ কর বেশি বেশি। আল্লাহকে ডাক। আল্লাহ রহম করবেন ইন শা আল্লাহ।’
 মাসুম মাথা ঝাঁকালো।

রাত্রি দশটা পর্যন্ত আমরা এক অদ্ভুত সময় পার করলাম! টানা নফল নামাজ ও দুআয় কাটালাম। হোজ্জা এখনও যিকির করছেন। তার কোনো দিকে খেয়াল নাই। ঘরে জিরো পাওয়ারের বাতি দেয়া। মাসুমও টানা নামাজ পড়ে যাচ্ছে, দুআ করছে। 
নিজেকে অনেক হালকা লাগছে। হোজ্জা বলছিলেন, দুনিয়া রুহকে নিয়ত খোঁচাতে থাকে। 
কিছু সময় নিজের রুহকে, অন্তুরকে দুনিয়ার সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে হয়। নির্মল শান্তি দিতে হয়। বিচ্ছিন্ন করা যায় নামাজের মাধ্যমে, যিকির-দুআর মাধ্যমে। রুহের সুস্থ্যতা আর অন্তের প্রশান্তির জন্য এর বিকল্প নেই। 
মাসুম এতক্ষণ দুআ করছিল, হাত তুলে। কী আশ্চর্য অন্তত ১৫ মিনিট হলো সে হাত নামাচ্ছেই না। এখন নামিয়েছে। আমি তার কাঁধে হাত রাখলাম। সে বলল, দোস্ত! মনে হচ্ছে আমার দুআ কবুল হবে। আল্লাহ আমার দুআ কবুল করবেন।
 আমি বললাম, ইন শা আল্লাহ, ইন শা আল্লাহ! 
মাসুমের চেহারা প্রশান্ত। 
   ‘আজ এত প্রশান্তি লাগছে মুরাদ! এত প্রশান্তি আমার জীবনেও অনুভব করি নাই।‘
   ‘আচ্ছা!’
   ‘সুখ শান্তির জন্য কত কিছু করছি! পানির মত টাকা খরচ করছি! কত কিছু যে করছি। আল্লাহ সেগুলো মাফ করে দেন।‘
   ‘আমিন।‘
    ‘কিন্তু আজকের মত শান্তি কোনদিন অনুভব করি নাই।‘

হোজ্জা চোখ খুললেন। আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। কিছু বলতে চান মনে হয়।
   ‘মাসুম ঠিকই বলেছে। ওজু করে মসজিদে যাও। ঠান্ডা হয়ে নামাজ পড়ো। যিকির, দুআ করো। শান্তি! আল্লাহর দেয়া ফ্রী শান্তি। টাকা খরচের কোনো বালাই নেই।‘

 মাসুম বলল, ‘কিন্তু আমরা মানুষ! এটাই বুঝলাম না!’

 মাসুমের কথা খুবই আধ্যাত্মিক লাইনে চলে যাচ্ছে। আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।
 ‘মাসুম, তোর বোনের খবর নে, দেখ কি অবস্থা।‘

 মাসুম তার বোনের খবর নিল। এখনো ভালো কোনো খবর নেই। মাসুম আবার নামাজ ও দুআয় মনোযোগ দিল। সে মনে হয় তার বোনকে খুবই ভালোবাসে। এই মাসুমকে আমি আগে কখনো খেয়াল করি নি। সে নামাজ পড়ছে। তার চেহারা বেদনা এবং আকুতিতে পূর্ণ হয়ে আছে।

আমি এক ফাঁকে রাতের খাবার নিয়ে আসব ভাবছি। মাসুমকে বলতে হবে কিছু টাকা সাদাকাহ করার জন্য। সাদাকায় বিপদ দূর হয়। আল্লাহ তার বোনের বিপদ দূর করে দিন।

খাবার নিয়ে ফিরে এলাম। হোজ্জাই আমাকে বললেন-- মাসুমকে সাদাকাহ করাতে বলো। মাসুমকে বললাম। সে পাঁচ হাজার টাকা সাদাকাহ করতে চাইল।  টাকার অংকটা হঠাৎ বেশি মনে হলো, কিন্তু পরে ভাবলাম আল্লাহ চাইলে মাসুমের টাকার সমস্যা নাই। সে বলল—জীবনের প্রথম এত টাকা সাদাকাহ করছে। আমি মাসুমকে উৎসাহ দিলাম। মাসুমের মানিব্যাগ উপরে রেখে এসেছিলাম। টাকা আনতে আমাকে আবার উপরে যেতে হবে।
খুব দ্রুত দান করা দরকার। এত রাতে কাউকে পাওয়া যাবে কি না কে জানে? এত রাতে ভিক্ষুকরা থাকে না। অবশ্য যাদের অতি প্রয়োজন তারা রাত করেও এর ওর কাছে হাত পাতে। আজ কি তাদের পাওয়া যাবে? মাথায় একটা আইডিয়া এলো। নাসিম সাহেবের ঠিকানা দিলাম মাসুমকে। মাসুম বলল মাসুম সাহেবকে দেবে চার হাজার আর রাস্তায় কাউকে পেলে দেবে এক হাজার মিলিয়ে। মাসুম রেডি। বললাম,
 ‘মাসুম, চট করে খেয়ে নে। এরপর যা’
 ‘না, আগে সাদাকাহ করে আসি।’

 মাসুম বের হয়ে গেল। 
আমরা রাতের খাবার না খেয়ে মাসুমের জন্য অপেক্ষা করছি। তার আসতে কতক্ষণ লাগবে আর? আধা ঘন্টা বা পৌনে এক ঘন্টা। হোজ্জা একমনে যিকির করছেন আবার। তার তাড়া নেই। 

বাবা কল করলেন। তিনি ও তার বন্ধুরা হোজ্জার সাথে দেখা করতে চান আজ। আজ মানে এখনই আসতে চান তারা। রাত হয়ে গেল, আমরা খানি নি এখনো। বাবাকে কী বলি ? একদিকে মাসুমের বোনের অসুস্থ্যতা। অন্যদিকে মোতালেব সাহেব দিয়েছেন মামলার হুমকি। দুশ্চিন্তা। হোজ্জা বলেছেন, আজ শুধুই ইবাদাত। বাবা ও তার বন্ধুদের কি আসতে বলা যায়? নাকি আগামীকাল আসতে বলব। বুঝছি না। আগামীকাল অবস্থা কি হয় তাও তো বলা যাচ্ছে না। এর চেয়ে ভালো হোজ্জাকে জিজ্ঞেস করি। এরপর বাবাকে কল দিই। 
হোজ্জা অনুমতি দিলেন।

 

বাবা ও তার তিন বন্ধু এলেন । তাদের সবার হাসিমুখ। হোজ্জা এবং আমিও হাসি হাসি মুখ করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ঠিক জমল না। বাবার বন্ধুরা বসে পড়লেন গোল করে।  মাসুম এখনো আসে নি। 

 

হোজ্জার সাথে চাচাদের অনেক কথাই হলো। এখনো হচ্ছে। কিন্তু সব কথা উল্লেখ করার প্রয়োজন বোধ করছিনা। একটা বলা যায়। কারণ সেটা বলারই মত। বাবা ও তার বন্ধুদের বয়স সত্তরের কিছু কম বা বেশি হবে। বাবার বন্ধু হামিদুল চাচার রাতে ঘুম হয় না। ইনসমানিয়ার সমস্যা। কোনো ডাক্তার কোনো ওষুধে কাজ হচ্ছে না। তিনি ডাক্তার, ওষুধ, নানান টোটকা, ভেষজ খুঁজে হয়রান। বিভিন্ন থেরাপিও নিয়েছেন। তাও কাজের কিছুই হয় না।
হামিদুল চাচা হোজ্জাকে হেকিম ভেবেছেন কি না কে জানে?  তিনি হোজ্জার কাছে ঘুমের উপায় বাতলে নিতে আগ্রহী হলেন। বললেন,
 ‘হোজ্জা! রাতে আমার ঘুম হয় না। একদমই হয় না। কোনো উপায় আছে আপনার কাছে?’
হোজ্জা বললেন, ‘ আপনার ঘুম আসে না রাতে! আমার তো এত ঘুম। ডাকলেও টের পাই না। কতদিন হলো ঘুম নেই আপনার?‘
 ‘৩ বছর হবে। আমার জন্য দুআ করবেন, হোজ্জা।‘
 ‘হুম। এর আগে ঘুম হত?’
‘জি। আপনি কোনো উপায় বাতলে দিতে পারবেন—রাতের ঘুমের?’
হোজ্জার মধ্যে একটা চিকিৎসক চিকিৎসক ভাব। আমি অবাক হচ্ছি। হোজ্জা চাচাকে বললেন,
‘ভাই, আপনার বয়স এখন কত?’
 ‘৭১।’
 ‘আচ্ছা, তাহলে ৬৮ বছর তো রাতে ভালোই ঘুমিয়েছেন। আর কত ঘুমাতে চান, আমি বুঝছি না। আপনার ঘুমহীনতার অসুখ হয় নি। আল্লাহ আপনাকে রাতের নামাজের জন্য জাগিয়ে রাখেন। মুসলমানের আবার ইনসমানিয়া কি? এটা ইবাদতময় রাতের মহাসুযোগ। সুযোগ কাজে লাগান।’

হামিদুল চাচা কি বলবেন বুঝতে পারছেন না। হোজ্জার কাছে রাতে ঘুমের চিকিৎসা জিজ্ঞেস করে কি বিপদ হলো—এমন ভাবছেন কি না কে জানবে? তিনি মাথা নিচু করে আছেন।
হায়দার চাচা বললেন, আরে হামু! (হামিদুল) খারাপ কি? রাতে নামাজ পড়বি। আর নামাজের ক্লান্তিতে ঘুমও চলে আসতে পারে। হোজ্জা ভালো কথাই বলছেন।
হামিদুল চাচা  নিশ্চুপ।

হামিদুল চাচার সাথে হোজ্জার কথপকথনের পর মনে হয় বাবার বন্ধুরা আর নতুন কোনোকিছু নিয়ে কথা তুলতে ভয় পাচ্ছেন। তারা কেমন উসখুস করছেন। উঠে যেতে চান হয়ত। আর রাতও হয়েছে। বেশ রাত। আমার ক্ষুধা ও ঘুম দুটোই পাচ্ছে। হোজ্জারও তাই মনে হয়। কিন্তু মাসুম কতদূর? তাকে কল দিয়ে জিজ্ঞেস করি— কোথায় সে।

                                                   (৯) (নতুন পাতা)


সকাল সকাল একটা নাম্বার থেকে কল এল। ওপাশ থেকে ইংরেজিতে কথা বলছে। আমি কিছুটা অবাক হলাম। ইংরেজিতে কথা বললে নিশ্চয়ই অবাক হওয়ার কারণ নেই। কিন্তু লোকটি বিশুদ্ধ এমেরিকান একসেন্ট এ কথা বলছে। এই এমেরিকান আমার নাম্বার পেল কোথায়? 

জানতে পারলাম সেই প্রভাবশালী নেতার পরিচিত এই এমেরিকান ভদ্রলোক। আমার নাম্বার নিয়েছে মাসুম থেকে। নেতা সাহেব এমন ডিরেক্ট একশনে যাবেন ভাবি নি। দেশি কোনো বিশিষ্ট লোক হলে কথা ছিল, কিন্তু এমেরিকান কারো সাথে সাক্ষাতের কোনো কোনো পরিকল্পনাই ছিল না। হোজ্জারও ইচ্ছে নাই। কিন্তু এখন মনে হয় যেতেই হবে। না হলে নেতা আবার কি না কি মনে করেন। নিজের নতুন শত্রু তৈরি করা বা শত্রু বাড়ানো-- কোনোটারই ইচ্ছে নেই। আর যেহেতু সবার সাথেই সাক্ষাত করছি। এমেরিকান গাই (guy) এর সাথে সাক্ষাতে মানা কোথায় ? 


আমরা সকাল সকাল তৈরি হলাম। হলাম। হোন্ডা C ফিফটি রেডি (ready) । সকাল সকাল যাওয়াই ভালো, জ্যাম কম থাকবে। বের হয়েছি– ভাবছি কল করে জানিয়ে রাখি। 
সাথে সাথেই কল ধরল।
যেতে বলল রাত করে। তার নাকি দিনে ব্যাস্ততা আছে। আমি বললাম, তাহলে অন্য কোনো দিন যাই। কিন্তু তার এক কথা—আজই যেতে হবে। তিনি নাসিরুদ্দীন হোজ্জার বিশিষ্ট্য ভক্ত। ওহ! এমেরিকান এই ভদ্রলোকের নাম বলি নি। তার নামটা অদ্ভুত। মি. লং হেয়ার। বিদেশীদের কি অদ্ভুত নাম! নাম শুনে দেখার ইচ্ছা জাগছে— আসলেই তার চুল কি লম্বা লম্বা?
হোজ্জা রাতে যাওয়ার ব্যাপারে রাজি হয়েছেন। অবশ্য দিনের গরমে না গিয়ে রাতের ঠান্ডায় চলাচল সুবিধারই। 

মি. লং হেয়ারের সাথে সাক্ষাত হলো। তার চুল লম্বা লম্বা নয় দেখে আশাহত হলাম। চুল লম্বা তো নয়-ই, তার মাথা পুরোপুরি টাক। অবশ্য তিনি হোজ্জাকে খুবই খাতির করলেন। তিনি জানালেন হোজ্জা তার দেশেও বিখ্যাত। ছোটবেলার পাঠ্য বইয়ে নাসিরুদ্দীন হোজ্জার গল্প তিনি পড়েছেন। নাসিরুদ্দীন হোজ্জাকে সেখানে বলে নাস্ট্রাডিন হোক্সা। Nastradin Hoxa. 

মি. লং হোজ্জার সাথে কিছু ছবি তুললেন, তার ছেলেমেয়েদের কাছে পাঠাবেন বলে। আমি মি. লং কে অনুরোধ করলাম– হোজ্জার আগমনের বিষয়টি যেন গোপন রাখা হয়। 

হোজ্জার সাথে মি. লং এর কী আলাপ হলো— তা বলি। 
হোজ্জাঃ এই দেশে তোমার কাজ কী?
মি. লংঃ ব্যাবসা করতে এসেছি। 
হোজ্জাঃ তোমাদের নিজ দেশ এত উন্নত। আর ব্যাবসা করতে এসেছ এই গরীব দেশে। ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলো দেখি। 
মি. লংঃ হা হা। শুনুন হোজ্জা। 
হোজ্জাঃ বলো।  
মি. লংঃ আমরা এমেরিকানরা পৃথিবীর সব দেশকেই নিজেদের মনে করি। সবখানেই আমাদের অধিকার। আর হোজ্জা মনে হয় জানেন না! আমেরিকাও কিন্তু একসম্য আমাদের ছিল না। রেন্ড ইন্ডিয়ানদের তাড়িয়ে জায়গা করে নিয়েছি। হা হা হা। হা হা। 
হোজ্জাঃ আচ্ছা! আসলেই তোমাদের সবকিছুই বইসিলি পদ্ধতি। মিথ্যা শুনি নি তাহলে।  
মি. লংঃ  বইসিলি পদ্ধতি কী হোজ্জা?
হোজ্জাঃ আরে তোমাদের নীতি এপ্লাই করলেই তো বুঝতে পেরে যাবে—বইসিলি কী। তোমরা যেভাবে নারীদের স্বভাব ফিতরাত উল্টে পাল্টে দিয়ে পুরুষের মত করে ফেলতে চাও। আবার পুরুষদের মধ্যে ঢুকাও মেয়েলি স্বভাব। একদম বইসিলি পদ্ধতি! 
মি. লংঃ বুঝেছি! এবার বুঝেছি! হা হা হা। সবকিছু উল্টাপাল্টা করতে আমরা বড়ই ওস্তাদ। হোজ্জা আপনার বুদ্ধির তুলনা হয় না—বইসিলিকে উলটাপালটা করলে হয় ইবলিসি। তাই না? হা হা হা। আপনি ঠিক বলছেন আমরা সর্বত্র বইসিলি ব্যাবস্থাই চাই! হা হা হা। হা হা হা। 

 

মি. লং হেয়ার সাহেব কেমন উদ্ভ্রান্তের মত হাসছেন। হেসেই যাচ্ছেন। তার হাসি থামছে না। সেই হাসি বসে বসে দেখতে হচ্ছে। অন্যদের কথা জানি না। আমার গায়ে কেমন কাটা দিচ্ছে। শরীরের ভেতরে একটা বিচলিত ভাব। অন্ধকার রাতে হঠাৎ ভয় পেলে যেমন হয়। তাছাড়া বাড়িটার ভেতরেও কেমন একটা ভৌতিক আবহ। মনে মনে দুআ পড়ছি। কতক্ষণ থাকতে হবে এই বাড়িতে?

মি. লং শান্ত হলেন। তিনি হোজ্জাকে প্রশ্ন করলেন, গল্পে আপনাকে কখনো বুদ্ধিমান দেখি, কখনো আবার অতি বোকা। আপনি আসলে কী হোজ্জা?
হোজ্জা বললেন, আমি যদি বোকা হয়ে থাকি, তাহলে আমি ‘বোকা’ না ‘বুদ্ধিমান’ তা বোঝার ক্ষমতা আমার নেই। বোকারা এত কিছু বোঝে না। 
‘তাহলে আপনি বুদ্ধিমান?’
‘আমি যদি নিজেকে বুদ্ধিমান বলি, তাহলে তা হবে নির্বুদ্ধিতা। আবার বোকারাও মাঝে মাঝে বুদ্ধিমানের মত কথা বলে।’ 
‘আপনি তাহলে কী?’
‘আমি নাসিরুদ্দিন হোজ্জা!’ 
‘হা হা হা। হা হা হা…’


মি. লং হেয়ার হাসতে থাকুক। আমরা দ্রুত এম্বেসি ত্যাগ করলাম। থাকার কোনো মানে হয় না। তাছাড়া রাত হয়ে গেছে। বাসা পৌঁছতে কয়টা বাজে কে জানে। 

 

এম্বেসি থেকে ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেল। আমরা বাসার কাছে ১০ তলার মোড়ে চলে এসেছি। ফার্মেসির দোকানটা বন্ধ করছে। এত দ্রুত সাধারণত বন্ধ করে না। ফার্মেসির দোকানের নিচে চোখ আটকে গেল আমার। সেদিনের বৃদ্ধা মহিলাটিকে দেখা যাচ্ছে। যাকে বসে বসে এগোতে দেখেছিলাম। এখন শোয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাস্তার উপরেই। তার মাথার উপর দোকানের বারান্দা। বৃদ্ধা শুচ্ছে গুটিশুটি হয়ে। তার কোমড় মনে হয় স্থায়ী বেঁকে গেছে। গুটিশুটি না হয়ে উপায় নেই। আমার খুবই করুনা অনুভূত হল। বৃদ্ধার কি থাকার কোনো জায়গা নেই? এখানে শুয়ে পড়ল যে? আশ্চর্য্য। প্রত্যেক ভিখারীরই রাতে থাকার শোয়ার কোনো না কোনো জায়গা থাকেই। এনার বোধয় তাও নেই। এমনিতেও হাঁটতে পারে না। আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি। হোজ্জা আমাদের সাথেই আছেন। তিনি বললেন, মুরাদ! চলো একদিন রাস্তায় ঘুমিয়ে দেখি, কেমন লাগে!

‘রাস্তায় ঘুমাবো?’
 ‘এই এলাকায়  না। এখানে তো তোমদেরকে সবাই চিনে ফেলবে। অন্য কোনো এলাকায় গিয়ে ঘুমানো যাক। সব অভিজ্ঞতার প্রয়োজন আছে। ধুলিময় রাস্তা। উপরে খোলা আকাশ। খারাপ হবে না। অবশ্য মশার কামড় সহ্য করতে কষ্ট হবে।‘
 ‘হোজ্জা কি সত্যিই বলছেন?’ 
আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আছি। হোজ্জা চুপ করে আছেন। বৃদ্ধার মাথার পাশে একটা পানির বোতল দেখা যাচ্ছে। কে দিয়েছে কে জানে?
 ‘মুরাদ, মাসুম! শোনো। রাস্তায় খোলা আকাশের নিচে ঘুমাতে হবে সামান্য কিছু খেয়ে। খালি পেটে। তাহলে আমাদের অভিজ্ঞতা চমৎকার হবে। তবে পানি খেতে বারণ নেই।’ 
হোজ্জার কথা মনে হয় এবার বুঝতে পেরেছি। আমি লজ্জা পেয়ে গেলাম। মাসুমের চেহারাও দেখি লাজুক। আমি মুহুর্তের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিলাম বৃদ্ধার জন্য কিছু করতে হবে। কিন্তু কী করা যায়? অন্য সময় হলে কিছু টাকা হাতে ধরিয়ে দিতাম হয়ত। এতটুকুই। কিন্তু এখন মনের ভিতর ভিন্ন একটা শক্তি কাজ করছে। যে আড়ষ্টতা আগে ছিল—তা নেই।

মাসুম একটা বুদ্ধি বের করে ফেলল। তাদের বাসায় এক মহিলা কাজ করেন। আমেনা খালা। খুবই ভালো মহিলা। এই এলাকাতেই থাকেন। মাসুম ভাবছে, তার বাসায় এই বৃদ্ধাকে আপাতত রাখা যায় কি না। প্রয়োজনীয় খরচ দেয়া হবে। 
‘আমেনা খালা রাজি হবেন রাখতে?’
‘আরে হবে। খরচ দিব না?’
মাসুমকে দৃঢ় বিশ্বাসী মনে হচ্ছে। বললাম, আমেনা খালাকে কল দে। বৃদ্ধাকে তুলে নিতে হলে তার প্রয়োজন আছে। 


মিনিট বিশেকের মধ্যে আমেনা খালা চলে এলেন। তিনি আসার পর যা ঘটল– তা আমাদের প্রত্যাশিত ছিল না। আমেনা খালা বৃদ্ধা মহিলাকে দেখে কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলেন। বৃদ্ধা এর মধ্যেই জেগে গেছে। এরপর আমেনা খালা বৃদ্ধা মহিলাকে জড়িয়ে ধরে– দাদি দাদি বলে কাঁদতে লাগলেন। 
আমাদের কারো মুখে কোনো কথা নেই। চুপ চাপ দেখছি কী হচ্ছে। বৃদ্ধা কি আসলেই আমেনা খালার দাদি নাকি? এ তো দেখছি নাটক। বাস্তব জীবনে এত নাটকীয়তা হয়?

কোথা থেকে যেন কবির এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের পেছনে। সে আমাদের দাঁড়িয়ে থাকা আর মহিলার কান্নাকাটা দেখে হয়ত বুঝছে না ঘটনা কী। আমাকে জিজ্ঞেস করে বসল, ঘটনা কী ভাই?
‘আমিই বুঝে উঠতে পারছি না। তোমাকে কী বলব?’ 
‘আপনারা এখানে দাঁড়িয়ে কেন?’
‘বেশি প্রশ্ন কোরো না তো কবির। বুঝতে দাও ঘটনা।’

আমেনা খালার কাছে ঘটনা জানা গেল। বৃদ্ধার নাম ‘অশো’ দাদি। বৃদ্ধা আমেনা খালার গ্রামের বাড়ির একই পাড়ায় থাকত। খালার আপন কেউ না। কিন্তু ছোটবেলায় খালাকে আদর করত। খালা তা মনে রেখেছেন। 
অশো দাদির দুই ছেলে একসময় শহরে আসে। মিরপুর বস্তিতে থাকত তারা। এক ছেলে ঋন করে পলাতক। অন্যজন কি একটা মামলায় জেলে। তার বউ এর সাথে তালাক হয়ে গেছে। এরপর থেকে অশো দাদি নিঁখোজ। তার খোঁজ নেয়ারও কেউ নেই। গ্রামে গিয়ে বছরখানেক আগে আমেনা খালা ঘটনা জানতে পারে। 
অশো দাদি বছর খানেকের মত রাস্তায় রাস্তায় থেকেছেন-- জেনে আমেনা খালা তীব্র দুঃখ প্রকাশ করছেন। তিনি বৃদ্ধার গায়ে হাত বুলাচ্ছেন।  

এই অনভিপ্রেত ঘটনা আমাকের খুব নাড়া দিল। আমেনা খালা এমন ভাবে সব বর্ণনা করলেন। আমরা যথেষ্ঠ বেদনা বোধ করলাম। আমাদের কারো চোখ ভিজে উঠল। কেউ চোখের পানি লুকাতে এক পাশে সরে গেল। সবচেয়ে বেশি আন্দোলিত হল মাসুম। তার চোখ দিয়ে ঝর খর করে পানি পড়ছে।  অবশ্য তার মন এমনিতেই নরম। তার বোন ক্রিটিকাল অবস্থা থেকে ফিরে এসেছে আল্লাহর রহমতে। বোনের বাচ্চাও সুস্থ্য, তবে আছে সিসিইউতে। ডাক্তার আশান্বিত করেছেন। 

 



                                                    (১০) (নতুন পাতা)



আমরা দূর দূরান্তের পথ চলতাম। সময় যেত দিনের পর দিন, মাস, বছর। ধৈর্য্যের প্রশিক্ষন। তখনকার মানুষের ধৈর্য ছিল ভালো। স্বভাবতই। তোমরা এখন বছরের পথ ঘন্টায় যাও। তোমাদের ধৈর্য্যও কম। আশা করো দ্রুত। আশা ভঙ্গও হয় দ্রুত। দুনিয়ার কোনোকিছুই তাড়াতাড়ি পাওয়া যায় না। বেহেশতে চাইবা, সাথে সাথে পাবা। পাওয়ার চিন্তা করা মাত্রই পেয়ে যাবা। কিন্তু দুনিয়া তো বেহেশত না। 
রাতে ভ্রমন করতাম দল বেঁধে। এখনকার মত রাস্তা জুড়ে স্ট্রীট লাইট ছিল না। যা দেখলাম গতকাল। রাস্তা জুড়ে আলো আর আলো। আমরা মশাল জ্বালাতাম সফরে গেলে। তাতে দিগন্তের অন্ধকার দূর হত না। স্পষ্ট হত। দূরের মসজিদের কখনো দেখা যেত কুপির টিমটিম আলো।  পথ চলতাম তারা চিনে চিনে। আকাশ ভরা তারা। আল্লাহর সৃষ্টি সুসজ্জিত আকাশ। তোমরা এখন আকাশের তারা দেখো না। তোমরা দেখ বৈদ্যতিক বাতি। মানুষের কেরামতি।
তুরস্কের এস্কিসেহি এলাকায় আমার বন্ধুবান্ধবে ভরা ছিল। পরিচিত, আত্মীয়ের ছিল না অভাব। ভালোই সুখের দিন ছিল। …

হোজ্জা স্মৃতিচারণ করছেন বসে বসে। আমরা নীরব শ্রোতা। হোজ্জার কন্ঠের আবেগ স্পষ্ট বোঝা যায়। তিনি স্মৃতিকাতর। ধারণা পাচ্ছি– তিনি আর বেশিদিন থাকতে আগ্রহী নন। 

হোজ্জা বললেন, তোমাদের এখানে এত চলাফেরা করলাম, তোমাদের মাটি, ঘাস তো পায়ে মারালাম না। সব জায়গা পাকা। তোমাদের দেশের মাটির ছোঁয়াই পেলাম না। 

পরদিন হোজ্জাকে গ্রাম এলাকায় ঘুরিয়ে নিতে গেলাম। সকাল সকাল। সাথে সেই হোন্ডা সি ৫০ । হোজ্জা চলে যাওয়ার পরে যদি কষ্টবোধ হয়, এই গাধাস্বরুপ হোন্ডাটি চালিয়ে হোজ্জার স্মৃতিচারণ করতে পারব। শান্তনা খুঁজব। হোজ্জা নেই, কিন্তু আমার সাথে তার গাধাটি রয়েছে। এতেই বা কম কী? 

হোজ্জা ঘাসের উপরে খালি পায়ে হাঁটলেন বেশ খানিকক্ষণ। তিনি একটা পুকুরে ওজু করলেন। গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে দু-রাকাত নামাজ পড়লেন। তাকে শান্ত দেখাচ্ছে। আমার ক্ষীন আশা– হোজ্জার মনে তার দেশের স্মৃতিকাতরতা কিছুটা কমবে। তিনি বাংলাদেশে আরো কিছুদিন থাকবেন। কিন্তু হোজ্জা জানালেন– তিনি এখন বেশি স্মৃতিকাতরতা অনুভব করছেন। 

বাসায় ফিরে ক্লান্তি বোধ করছি। কিন্তু হোজ্জাকে তেমনটা মনে হলো না। একটা সংবাদ শুনতে পেলাম আসার সাথে সাথে। ভেবেছিলাম– মোতালেব সাহব শুধু হুমকি দিয়েছেন। বাস্তবে মামলা করবে না। কিন্তু তিনি মামলা করেছেন। আসামী ৪ জন। আমার বাবাও অন্তর্ভুক্ত। ৪ কোটি টাকার মানহানী মামলা। পুলিশ প্রাথমিক তদন্তের পরে নাসিরুদ্দীন হোজ্জার উপস্থিতি জানতে পেরেছে। তারা তুরস্ক এম্বেসিতে যোগাযোগ করেছেন। এম্বেসি হোজ্জার অবস্থানের ব্যাপারে নিশ্চিত করেছে। তারা আরও বলে দিয়েছে– তদন্ত যা করার করতে, কিন্তু হোজ্জাকে কোনো ধরণের বিরক্ত যেন না করা হয়। পুলিশ বিভাগ এম্বেসির কথা রেখেছে। তারা গোপনে অনুসন্ধান চালিয়েছে। অনুসন্ধানে বেড়িয়ে এসেছে মোতালেব সাহেবের অনেক অন্যায়, অপরাধের ফিরিস্তি। দ্রুতই মানহানির মামলা খারিজ করে দেয়া হয়েছে। দুদকে মোতালেব সাহেবের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে। দুদক তদন্ত শুরু করেছে। মোতালেব সাহেব আছেন দৌড়ের মধ্যে। 

মামলা, মামলা খারিজ, দুদক– এত কিছু হয়েছে যখন, আমার মনে হয় হোজ্জার অবস্থানের ব্যাপারটা আর চাপা রাখা সম্ভব হবে না। মিডিয়ায় নিউজ হবে। সবাই জেনে যাবে। দিনে দিনে দর্শনার্থী বাড়বে। কী যে কেলেংকারি অপেক্ষা করছে…

মাসুম খুবই মন খারাপ করেছে। হোজ্জা এত দ্রুত চলে যাবে সে মেনে নিতে পারছে না। কবিরও নির্বিকার। মাসুম ঘোষণা দিয়েছে– সে তার ফোন দুটি বিক্রি করে দেবে। তাদের একটা পতিত জমি আছে, সেখানে দুস্থদের অস্থায়ী আবাস ও চিকিৎসার ব্যাবস্থা করা হবে। ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠান করা হবে। কবির বলেছে– সে সেই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার হিসাবে দায়িত্ব পালন করতে চায়। 

কবিরকে আড়ালে পেয়ে বললাম, ম্যানেজারির দায়িত্ব তো নিবা, ফান্ড থেকে চুরি করবে না তো আবার?
আমার কথায় কবির প্রায় কেঁদে ফেলল। বলল– ভাই আমাকে এত খারাপ ভেবেছেন? সেদিনই তো বলেছি– আর চুরি করব না। হোজ্জাকেও কথা দিয়েছি। 

কবিরের কান্না খেয়াল করে দেখলাম। আমার কাছে মোটেও নকল মনে হলো না। মনে হচ্ছে তার ব্যাপারে ভরসা রাখা যায়। সে ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করবে, মোটামুটি চলার মত বেতন তাকে দিতে হবে শুরু থেকেই। 

দুস্থদের অস্থায়ী আবাস ও চিকিৎসা কেন্দ্রের ব্যাপারে আমি মাসুমকে বেশ উৎসাহ দিয়েছি। সব ধরণের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছি। একা একা কোনো কাজ তো হয় না। তাছাড়া আমি নিজেও উৎসাহী, কারণ আমি মানবিক হয়ে উঠতে উৎসাহ বোধ করছি। হোজ্জার সাথে চলাফেরা করে সয়ংক্রিয় ভাবে তৈরি হয়েছে এই আগ্রহ। আসলে মানবিক হতে চাওয়া মানে ঠিকঠাক মানুষ হতে চাওয়া। আজকাল অন্য কিছু হওয়ার চাইতে মানুষ হওয়ার তাড়নাই বেশি অনুভব করছি। 

যত সময় যাচ্ছে, হোজ্জা কথা বলা কমিয়ে দিচ্ছেন। সময় কাটাচ্ছেন নামাজে, যিকিরে। আমরাও তাকে বিরক্ত করছি না। তবে তার আশপাশ থেকে সরেও থাকছি না। 

মাসুম ও কবির নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। 
  ‘কবির, আগামী পরশু থেকেই কাজ শুরু করতে হবে।’
  ‘কী কাজ ভাই?’
  ‘তোমার ম্যানেজারির কাজ। দুস্থদের আবাস ও চিকিৎসা। দুস্থদের খোঁজাও একটা কাজ।’
  ‘ভাই কয়েকটা দিন পরে শুরু করলে হয় না?’
  ‘অন্তর এমনিতে ফাঁকা ফাঁকা। হোজ্জা আগামীকাল চলে গেলে আরো শূন্যবোধ হবে। ডিপ্রেশন। ডিপ্রেশন মানে নেশা, প্রেম, মাস্তির খোঁজ। লাইফের বারোটা। যত দ্রুত সম্ভব কাজে লেগে যেতে হবে। মজার মজার কাজ। সেদিন বৃদ্ধাকে উদ্ধার করে এত ভালো লেগেছে। এই ভালো লাগার ফিলিংস আগে কখনো পাই নাই। আমি লাইফে এই ফিলিংস আরো চাই।’
  ‘ভাই! মনের কথা বলছেন। লাইফের ম্যারম্যারা ভাব কাটাতেই তো আমি আগে চু…হুম… হুম।’
কবির কাশি দিচ্ছে। তার গলা হঠাৎ আটকে গেছে। কথা বের হচ্ছে না। মাসুম বলল, ম্যারম্যারা ভাব কাটাতে কী  করতে?
  ‘এই নানান হাবিজাবি কাজ করতাম ভাই।’

কবির অল্পের জন্য নিজের চুরির কথা নিজের মুখেই বলে দিচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত সামলেছে। আমি তার দিকে তাকিয়ে হাসলাম। সে ফ্যাকাশে ভঙ্গিতে হাসল। মাসুম আর কবির দুজনই চুপ করে আছে। মনে হচ্ছে তারা কী যেন ঘোরে মধ্যে আছে। থাক ঘোরের মধ্যে থাক। 




 

                                                         (১১) 


হোজ্জাকে নিয়ে নিউজ হয়েছে। এত দ্রুত হবে ভাবি নি। তারা জানাচ্ছে হোজ্জার অবস্থান লুকোনো। তবে ধারণা করা হচ্ছে, তিনি ডেমরার কোনো একটি বাড়িতে অবস্থান করছেন। আমার বাড়ি তো ডেমরাতেই। 

হোজ্জার ছবিও নিউজে এসেছে। আমি আশ্চর্য বোধ করছি। কারণ– সেদিনের ছোট্ট মেয়েটির সাথে তোলা ছবিই নিউজে ব্যাবহৃত হয়েছে। বুঝতে পারছি মিডিয়া খুবই পাওয়ারফুল অনুসন্ধান করছে। কয়েকদিন গেলে আরও কি যে কারিশমা দেখাত তারা! 

আমার ঠিক বিশ্বাস হতে চাচ্ছে না যে, হোজ্জা আজ চলে যাবেন। রাতের ফ্লাইট। হোজ্জা মাসখানেকও থাকলেন না। আমার পরীক্ষা আর ৬ দিন পর। কিছু হলেও প্রস্তুতি নিতে পারব এখন। কিন্তু আমার আনন্দবোধ হচ্ছে না। 

সবার মত আমার মা’রও আফসোস থেকে গেল। তার আশা পূর্ণ হয় নি। ভাইয়ার জন্য যুতসই কোনো সম্মন্ধ বের করা যায় নি। হোজ্জাকেও মেয়ের বাড়িতে নেয়া যায় নি। মা’র মন খারাপ। ভাবছি– সমাজে বিবাহ উপযোগী ছেলের তো অভাব নেই। নেই মেয়েদেরও অভাব। কিন্তু ম্যাচ করে বিয়ে দিতে গেলে তখন কোনো মতেই আর মেলে না। এমন কেন হয়?

মা ডেকে বললেন– তোর ভাইয়ার বিয়ে ঠিক হলে সে যখন তুরস্ক থেকে আসবে, তখন যেন হোজ্জাকে সাথে নিয়ে ফেরে। আর তুই হোজ্জাকেও জানা– তাকে আসতেই হবে। 

মা’র কথা শুনে আমি ফ্যাক্যাশে ভঙ্গিতে হাসলাম। হোজ্জাকে জানালাম মা’র আবদার। তিনিও ফ্যাকাশে ভঙ্গিতে হাসলেন। 



মাইক্রোবাসে করে যাচ্ছি এয়ারপোর্টের উদ্দ্যেশ্যে। নাসিম সাহেব বলেছিলেন– তিনিও আমাদের সাথে যাবেন। কিন্তু তিনি দুদকের অফিসে ঘুরছেন মোতালেব সাহেবের ব্যাপারে আত্মসাতের অভিযোগ দিতে। তিনি আজ ব্যাস্ত সময় কাটাচ্ছেন। তাই আসতে পারেন নি। 

 

ভেবেছিলাম, যাওয়ার সময়টা হোজ্জার সাথে অনেক কথা বলব। অনেক কিছু জিজ্ঞেস করব। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। আমি, কবির, মাসুম সবাই চুপ করে আছি। কারো মুখে কথা নেই। মন ভার হয়ে থাকলে মুখ ফুটতে চায় না। 



হোজ্জার ফ্লাইট ছেড়ে গেল। আমাদের এবার ফেরার পালা। কিন্তু আমরা তা না করে বসে আছি। কারো মুখে কথা নেই। বসা থেকে উঠার মত উৎসাহ পাচ্ছিনা। বাড়ি ফিরে কিই-বা হবে?

এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে রাস্তায় নেমেছি। বাস, উবার, রিকশা কোনো কিছুতেই উঠতে ইচ্ছা করছে না। তিনজন মিলেই ঠিক করেছি– হেঁটে হেঁটে বাসা ফিরব। যত রাত হয় হোক। মন একবার আহত হলে, আহত মন জানায়– নিজেকে আরো কষ্ট দাও। তখন কষ্ট পেতে ভালো লাগে। সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে অবসন্ন শরীরে আমরা তিনজন বোকার মত হাঁটছি। কারো মুখে কথা নেই। কোথাও ভ্রূক্ষেপ নেই। তখন হঠাৎ করে একটা ঘটনা ঘটল। 

রাত কয়টা হবে আর? আন্দাজ সাড়ে দশটা। হঠাৎ করে মুহূর্তের মধ্যে আলো ঝলমলে রাস্তাঘাট, শহর পুরোপুরি অন্ধকারচ্ছন্ন হয়ে গেল। লোডশেডিং? কোনো স্ট্রিট লাইট জ্বলছে না। না কোনো গাড়ির লাইট। পুরো দিগন্তে কোথাও আলোর ক্ষুদ্র কণাও নেই। ঘন কালো অন্ধকার। এটা কীভাবে সম্ভব? তীব্র ভয় আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। আমি কি স্বপ্ন দেখছি? এত অন্ধকার হলে তো চারদিকে শোরগোল পড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু কোথাও কোনো শব্দ শুনতে পাচ্ছি না । আমার চোখ দুটি হঠাৎ আলোর খোঁজে আকাশের দিকে  তাকালো। আমি অবাক হয়ে দেখলাম– কোটি কোটি তারায় ভরা আকাশ। ঝকঝকে সজ্জিত দিগন্ত বিস্তৃত আকাশ। কোনো অস্পষ্টতা নেই। দুনিয়ার নিকষ আঁধার আলোময়-আকাশকে ফুটিয়ে তুলেছে অপরূপ রূপে। হাজার বছেরের সুপরিচিত আকাশ। শতবছর আগেও আমাদের পূর্বপুরুষরা উর্দ্ধের এই তারার মেলা দেখত বিস্ময়ভরা চোখে। মুহুর্তেই আমার ভয় কেটে গেল। আমার চোখেও বিস্ময়। নিজেকে মনে হলো হাওয়ার মত হালকা। যেন ভাসছি। আমার এত ভালো লাগছে! বলে বোঝানো সম্ভব নয়। চারদিকের অন্ধকার এখনো দূর হয় নি। ভাবছি দূর  না হলে মন্দ হত না। হয়ত খানিক্ষণের মধ্যে আবির্ভূত হত রহস্যময় জোনাকির দল। সে এক অপার্থিব দৃশ্য।   


 

                                       


 



 

Comments

    Please login to post comment. Login