আরিফের কাছে ফুটবল মানেই একটা ভয়ের নাম। নবম শ্রেণীতে পড়ার সময়ও সে স্কুলের মাঠের কোণায় লুকিয়ে থাকতে পছন্দ করে। তার ধারণা, সে খুব একটা ভালো খেলে না। তার এই গুটিয়ে থাকা স্বভাবের কারণে স্কুলের ফুটবল টিম থেকে তাকে বারবার বাদ দেওয়া হয়। বন্ধুরা যখন মাঠে হইচই করে খেলে, আরিফ তখন মাঠের পাশের বড় বটগাছটার নিচে বসে বই পড়ে।
স্কুলের বার্ষিক ফুটবল টুর্নামেন্ট সামনে। স্কুলের টিম নিয়ে সবাই খুব উত্তেজিত। টিমের ক্যাপ্টেন রাফি, যে দারুণ খেলে এবং সবার সাথে খুব মিশুক। কিন্তু টুর্নামেন্টের ঠিক তিন দিন আগে স্কুলের প্রধান স্ট্রাইকার পা মচকে ফেলায় টিমের অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। রাফি হতাশ হয়ে মাঠের এক কোণায় বসে ছিল।
হঠাৎ বিকেলে মাঠ ফাঁকা থাকার সময় রাফি দেখল, মাঠের অপর প্রান্তে কেউ একা একাই বল ড্রিবলিং করছে। নিখুঁত সব পাস, আর গোলপোস্টের কোণায় বল জড়ানোর ভঙ্গি দেখে রাফি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। দেখল, ওটা আরিফ! অথচ ক্লাসে আরিফকে কেউ ভালো খেলোয়াড় হিসেবে চেনেই না। কেউ কাছে আসতে দেখলেই সে যেভাবে বল ছেড়ে লুকিয়ে পড়ে, তাতে তার আসল প্রতিভা সব সময় ঢাকা পড়ে যায়।
রাফি চুপচাপ গিয়ে আরিফের সামনে দাঁড়াল। আরিফ চমকে উঠে বলটা ছেড়ে দৌড় দেওয়ার জন্য উদ্যত হলো। রাফি ডাক দিল, “থাম, আরিফ। আমি সব দেখেছি। তুই এত ভালো খেলিস, অথচ আমাদের সামনে আসিস না কেন?”
আরিফ মাথা নিচু করে বলল, “সবাই হাসাহাসি করবে বলে ভয় পাই। যদি গোল মিস করি, সবাই যদি বলে আমি অযোগ্য?”
রাফি আরিফের কাঁধে হাত রেখে বলল, “ফুটবল মানেই শুধু গোল করা নয়, আরিফ। ফুটবল মানে সাহস। ভুল করা কোনো লজ্জা নয়, কিন্তু ভয় পেয়ে পিছিয়ে থাকাটা জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। আমাদের টিমের তুই এখন সবচেয়ে বড় ভরসা।”
অনেকটা অনিচ্ছা আর ভয় নিয়েই আরিফ পরদিন অনুশীলনে নামল। পুরো স্কুলের সবাই তাকিয়ে আছে তার দিকে। প্রথম কয়েকবার সে তাল মেলাতে পারল না, আবার পুরনো ভয় তাকে গ্রাস করতে চাইল। কিন্তু মাঠের ওপাশ থেকে রাফি বার বার চিৎকার করে বলছিল, “ভয় পাস না, শুধু বলের ওপর নজর রাখ!”
ফাইনাল ম্যাচ শুরু হলো। প্রতিপক্ষ বেশ শক্তিশালী। খেলার শেষ দুই মিনিট বাকি, স্কোর তখন ১-১। হঠাৎ মাঠের মাঝখান থেকে একটা লম্বা পাস পেল আরিফ। চোখের সামনে গোলপোস্ট, গোলরক্ষক সামনে এগিয়ে আসছে। আরিফের মনে হলো, এটা তার জীবনের সেরা সুযোগ। সে আর ভয় পেল না। নিজের ভয়ের দেয়ালটা ভেঙে সে এক দৌড়ে ডি-বক্সের ভেতরে ঢুকে গেল। এরপর বিদ্যুৎগতিতে এক কিক। বলটা গোলপোস্টের জাল জড়িয়ে দিল।
পুরো মাঠ তখন আনন্দে ফেটে পড়ছে। বন্ধুরা দৌড়ে এসে আরিফকে জড়িয়ে ধরল। আরিফ বুঝতে পারল, সে শুধু একটা গোল করেনি, সে নিজের ভেতরকার সব জড়তাকে জয় করেছে। আজ থেকে আরিফ আর ক্লাসের সেই লাজুক ছেলেটা নেই, সে এখন সবার প্রিয় ফুটবলার।
রাফি এগিয়ে এসে হাসিমুখে বলল, “বলেছিলাম না তুই পারবি?”
আরিফ হাসল। সেই হাসিতে আর কোনো দ্বিধা নেই, আছে আত্মবিশ্বাস। সে জানল, নিজের ওপর বিশ্বাস রাখলে পৃথিবীর কোনো জেতাই অসম্ভব নয়।