Posts

ফিকশন

FACEBOOK (ফেসবুক)

June 28, 2026

SANJIB ROY

5
View

গ্রামের নাম শালবনি। ছোট্ট গ্রাম, কিন্তু খবরের গতি শহরের ইন্টারনেটকেও হার মানায়। গ্রামের লোকজনের নতুন নেশা—ফেসবুক। কারও হাতে দামি ফোন নেই, কিন্তু সবাই কোনো না কোনোভাবে ফেসবুকে ঢুকে পড়েছে।

এই গ্রামের সবচেয়ে মজার মানুষ ছিলেন পঞ্চানন কাকু। বয়স পঞ্চান্ন, কিন্তু নিজেকে তিনি বলতেন, "আমি এখনও ইয়ং বয়!"

একদিন বাজার থেকে নতুন স্মার্টফোন কিনে এনে ঘোষণা করলেন, — "আজ থেকে আমিও ফেসবুক স্টার হব!"

ছেলে রাহুল অনেক কষ্টে কাকুর জন্য ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে দিল।

প্রথমেই কাকু নিজের নাম লিখলেন— Panchanan The Tiger

প্রোফাইল ছবিতে নিজের ছবি না দিয়ে দিলেন একটা রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ছবি।

পরদিন সকালেই কাকু হাঁক ছাড়লেন, — "রাহুল! আমার তিনজন বন্ধু হয়েছে!"

রাহুল দেখে বলল, — "ওরা সবাই ফেক আইডি, বাবা!"

কাকু গর্ব করে বললেন, — "বন্ধু তো বন্ধু! আসল না নকল দেখে কী হবে?"

এরপর শুরু হলো কাকুর পোস্ট দেওয়া।

প্রথম পোস্ট—

"আজ আমি ভাত খেলাম। সবাই দোয়া করবেন।"

কেউ একজন কমেন্ট করল, — "কাকু, ভাত না খেলে কী খেতেন?"

কাকু উত্তর দিলেন, — "তোমার বাড়িতে গেলে যা দেবে!"

কমেন্ট পড়ে পুরো গ্রাম হেসে লুটোপুটি।

কিছুদিন পর কাকু শিখলেন লাইভ করতে।

ক্যামেরা অন করে বললেন, — "হ্যালো বন্ধুরা! আজ তোমাদের দেখাবো কীভাবে মাছ কাটা হয়।"

কিন্তু তিনি বুঝতেই পারেননি ক্যামেরা উল্টো ছিল।

দশ মিনিট ধরে মাছ কাটলেন, দর্শক শুধু ছাদের পাখা দেখল।

শেষে একজন লিখল, — "কাকু, পাখাটা খুব সুন্দর ঘুরছে!"

কাকুর স্ত্রী মালতী দেবী একদিন রেগে বললেন, — "সারাদিন ফোন! আমাকে একবারও দেখো না।"

কাকু সঙ্গে সঙ্গে একটি সেলফি তুলে লিখলেন—

"আমার প্রিয় স্ত্রী আজ আমাকে খুব ভালোবাসছে।"

মালতী দেবী সেটা দেখে বললেন, — "আমি তোকে এখনই বেলন দিয়ে ভালোবাসা দেখাই!"

তারপর সত্যিই কাকুকে বাড়ির চারপাশে তিনবার দৌড়াতে হলো।

একদিন কাকু শুনলেন, সবাই রিল বানায়।

তিনি ভাবলেন, "আমিও বানাব।"

গান চালিয়ে নাচ শুরু করলেন।

নাচতে নাচতে পিছনে রাখা জলের ড্রামে সোজা পড়ে গেলেন।

ভিডিও আপলোড হওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে হাজার হাজার ভিউ।

গ্রামের ছেলেরা এখন তাকে ডাকে—

"ড্রাম স্টার।"

এদিকে গ্রামের স্কুলশিক্ষক বিমলবাবুও ফেসবুকে এসেছেন।

তিনি সব পোস্টে লিখতেন—

"বানান ঠিক করুন।"

কাকু একদিন বিরক্ত হয়ে লিখলেন—

"স্যার, আপনি মানুষ না অটোকারেক্ট?"

সেটা ভাইরাল হয়ে গেল।

একদিন কাকুর মাথায় এল বড় পরিকল্পনা।

তিনি লিখলেন—

"আগামীকাল বড় সারপ্রাইজ!"

পুরো গ্রাম উত্তেজিত।

কেউ ভাবল বিয়ে।

কেউ ভাবল লটারি।

কেউ ভাবল সিনেমা।

পরদিন সকাল।

কাকু পোস্ট দিলেন—

"আজ নতুন গামছা কিনেছি।"

তারপর যা কমেন্ট!

— "এই জন্য এত উত্তেজনা?"

— "গামছা উন্মোচন অনুষ্ঠান কবে?"

— "রেড কার্পেট হবে?"

একদিন ভুল করে কাকু নিজের বদলে গ্রামের প্রধানকে হার্ট ইমোজি পাঠিয়ে দিলেন।

প্রধান ফোন করলেন—

— "কী ব্যাপার?"

কাকু লজ্জায় বললেন—

— "আঙুল ফসকে গেছে।"

প্রধান বললেন—

— "আমারও হাসি ফসকে গেছে।"

এরপর এল জন্মদিন।

কাকু আশা করেছিলেন হাজার মানুষ শুভেচ্ছা জানাবে।

কিন্তু সবাই ভুলে গেল।

শুধু একটি শুভেচ্ছা এল—

"Happy Birthday from Facebook Team."

কাকু বললেন—

— "দেখেছ? বিদেশ থেকেও মানুষ আমাকে চেনে!"

এরপর শুরু হলো রান্নার ভিডিও।

কাকু ঘোষণা দিলেন—

"আজ শেখাব ডিম ভাজা।"

পাঁচ মিনিট ধরে বক্তৃতা।

শেষে দেখা গেল চুলায় আগুনই জ্বলেনি।

দর্শক লিখল—

"আগুন ছাড়া রান্নার নতুন প্রযুক্তি!"

একদিন গ্রামের সবাই ঠিক করল, কাকুকে একটু শিক্ষা দেওয়া দরকার।

তারা একটি নকল আইডি খুলল—

"ফেসবুক কোম্পানির মালিক।"

সেখানে লেখা হলো—

"আপনি আমাদের সেরা ব্যবহারকারী। পুরস্কার নিতে ৫০০০ টাকা পাঠান।"

কাকু টাকা পাঠাতে যাচ্ছিলেন।

ঠিক তখনই রাহুল দেখে ফেলল।

সে বলল—

— "বাবা, এটা প্রতারণা!"

কাকু অবাক—

— "তাহলে আমি স্টার নই?"

রাহুল বলল—

— "আপনি স্টার, কিন্তু আমাদের গ্রামের।"

এরপর কাকু শিক্ষা পেলেন।

তিনি আর অচেনা লিংকে ক্লিক করেন না।

ভুয়া খবর শেয়ার করেন না।

কিন্তু হাসির পোস্ট করা বন্ধও করেন না।

একদিন তিনি লিখলেন—

"জীবনে টাকা কম থাকলে সমস্যা আছে, কিন্তু হাসি কম থাকলে জীবনই ফাঁকা।"

এই পোস্টে গ্রামের সবাই লাইক দিল।

মালতী দেবীও প্রথমবার একটি লাইক দিলেন।

কাকু খুশিতে বললেন—

— "আজ আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার!"

মালতী দেবী হাসতে হাসতে বললেন—

— "আর বেশি বাড়াবাড়ি করলে আবার আনলাইকও করে দেব!"

সবাই হেসে উঠল।

সেদিন থেকে পঞ্চানন কাকু গ্রামের সবচেয়ে জনপ্রিয় "ফেসবুক তারকা" হয়ে গেলেন। তিনি বড় ইনফ্লুয়েন্সার নন, ভাইরাল সেলিব্রিটিও নন। কিন্তু তাঁর সরলতা, ভুলভ্রান্তি আর রসবোধ মানুষকে প্রতিদিন একটু করে হাসাত।

শেষ।

Comments

    Please login to post comment. Login